খালেদ হোসাইনের কবিতা

 

না, শুধু আনন্দের জন্য নয়

 

না, শুধু আনন্দের জন্য নয়

সুখ-দুঃখের বিচিত্র অভিজ্ঞতার জন্য দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে

অনন্ত যতদিন তুমি বেঁচে থাকবে, ততদিন

 

মেঘের চেয়েও দ্রুত তোমার মন বদলায়

খুবই আকস্মিকভাবে আমার সঙ্গে সব সম্পর্ক

চিরতরে শেষ করে দাও আর তারপর

এক অন্তহীন কান্নার মৌসুম

তুমি ভুলে যাও, বলেছিলে, সম্পর্ক কখনো

শেষ হয়ে যায় না

 

আমাকে বিস্মিত মুগ্ধ আর যন্ত্রণাকাতর করে

তোমার প্রেমময় অতীত বা অতীতময় প্রেম

আমি ভাবি, তারা কারাকোন পুণ্য বলে

তোমাকে কাতর করে তুলতে পেরেছিল

দেখতে পেয়েছিল তোমাকে, ছুঁতে পেরেছিল

ভরা পূর্ণিমার জোছনাকে

 

না, কোনো খেদ নেই

আমি স্বস্তি শান্তি পাই তোমার কথা সঙ্গীতে

তোমার চিন্তা আর তৎপরতায়

এর চেয়ে বেশি সইতেও পারবো না

 

আমার ইচ্ছে করে, একটা জীবন তোমার

মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিই তাকাই তোমার

চোখের মণিতে, দেখি সেখানে ষড়ঋতুর রূপ-রূপান্তর

আর ওখান থেকেই আমি সংগ্রহ করি প্রতিবাদের

শক্তি ভাষা

 

কীট-পতঙ্গের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তুমি জড়িয়ে রাখো নিজেকে

দূর বলে কোনোকিছু নেই তোমার দুর্নিবার ইচ্ছের করতলে

চাইলেই তুমি সবাইকে কাছে টেনে নিতে পারো, নাও

 

শুধু আমাকেই তুমি মাঝেমধ্যে ঠেলে দাও খুব দূরে

অথচ

দূর বলে কিছু নেই তোমার

তুমি ক্রমসমৃদ্ধমান

 

আমি তোমার অভিজ্ঞতা উপলব্ধির আঁচে

ঝলসে যেতে যাই

সিক্ত হতে চাই

 

 

শরীর কোথায়?

 

অনেকদিন কবিতা লেখা হয়নি

দেশের যা অবস্থা

আমরা মনে হয় পরস্পরকে ভুলেই গিয়েছি

 

তোমাকে বললাম

 

কবিতা লেখার সমস্যা কম নয়

কেউ ভাবে বোকা-সোকা, শোধ-বোধ কম

কেউ ভাবে চতুর লম্পট

তারা তো তাদের মতোই ভাববে, নাকি?

 

কবিদের মাথায় রাখতে হয় নানা-রকম ধারা

রক্ষা করতে হয় স্ত্রীর মন

আত্মীয়-স্বজনের সম্মান কবি যদি

সত্যের দেবতা হন, তবে তাঁর

হাত-পা বাঁধা

মুখ খুব নিখুঁতভাবে সেলাই করা

 

কবিদের দল-কোন্দল আছে

এমন কোনো দল নেই, যে দলে

কোনো কবি নেই

 

সাধারণত পত্রিকা পড়েন না তবে বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিলে

পরদিন সব পত্রিকা কিনে এনে

ড্রয়িংরুমে ছড়িয়ে রাখেন

তার আগে দেখে নেন, কার নাম তার আগে ছাপ হলো

মানুষের মূর্খতা দেখে তখন তাঁর খুব দুঃখ হয়

 

আমি আসলে এতসব বলতে চাইনি

আর এতটা ছড়িয়ে-জড়িয়ে কথা বলা আমার স্বভাবও নয়

 

খুব মানুষ-টানুষ মরলো তো পুড়ে টুড়ে

খুব গুম খুন হলো তো এখানে ওখানে

পত্রিকায় তো প্রায় প্রতিদিন ক্রশ ফায়ারের খবর-টবর আসে

মনটা সত্যি নির্বাক

 

আমি অনেকদিন পরে তোমাকে দেখলাম

কী ফর্সা আর মসৃণ তোমার বাহু

আমার খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল

 

আর-কিছু নয়, শুধু এই বিষয়টাকে নিয়ে

একটি কবিতা হয়তো লেখা হবে আজ

 

তোমাকে বললাম

 

তুমি বললে, কেন শরীর-টরীর নিয়েই লিখতে হবে তোমাকে?

 

আমি হতভম্ব হয়ে সেই তখন থেকে বসে আছি

ভাবছি,

এখানে শরীর এলো কোত্থেকে,

শরীর কোথায়?

 

না, আমি কখনো যাবো না

 

না, আমি কখনো যাবো না

ভেসে আছি জলের ভেতর

বেড়ে উঠছি চোখ বন্ধ করে

সব দেখি, মা যতটা দেখে

তারচেয়ে বেশি শুনি

মা যতটা শোনে, তারচেয়ে বেশি

গন্ধ পাই, স্পর্শস্বাদইন্দ্রিয়ের

যাবতীয় খেলা

ষড়েন্দ্রিয় বেড়ে ওঠে সত্তার নিজস্ব উত্তাপে

 

সুন্দর নীল আকাশ, নদীনালা

গাছপালা মায়াবী ভুবন

আর মানুষের মুখএমন আহ্বান করে

মনে হয় নাড়ি ছিঁড়ে

ছুটে যাই শস্যফলা প্রান্তরের দিকে

খোলা মাঠে, প্রভূত বিস্তারে

 

হঠাৎ বারুদগন্ধচাপাতি চিৎকার

দেহ থেকে ছিন্নমাথাবিস্ফারিত চোখ

সেই চোখে অপার বিস্ময়

 

আবিরল আবহসঙ্গীত

মানে, মানুষের আর্তনাদ

হাহাকারঘর পোড়েছেলে মেয়ে শিশু, নারী

ধর্ষণে বিধ্বস্ত হয়ে যায়

 

গুলি ছুটে আসে গর্ভের শিশুকে লক্ষ্য করে

 

না!

এইখানে রাখো মা গো! তোমার এই

জলের বাগানে রক্তগন্ধে, আর্তনাদে, হাহাকারে

দূষিত বাতাসে

না, আমি কখনো যাবো না

 
 
top