জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরীর তিনটি কবিতা

 

খুঁজে ফেরা

আমি অর্ধেকটা জীবন ধরে জনহীন স্টেশনের ধারে মাথাচাড়া দেওয়া একটা নিঃসঙ্গ পাকুড় গাছ খুঁজে বেড়িয়েছি। অলীক ট্রেনে চেপেছি অনেক, গন্তব্যস্থলে পৌঁছে ধাক্কাধাক্কি করে ফিরতি গাড়িতে ফিরেও এসেছি নিয়মিত। কোথাও বট, অর্জুন, তেঁতুলের সন্ধান পেয়েছি প্রতিবেশী পক্ষীকূল সমেত; তারা আমায় পাতা নেড়ে নেড়ে বাতাস করেছে বড়ো জোর, আত্মনিমগ্নতা দিতে তারা অক্ষম। সমুদ্রের তলে ইন্দ্রধনুর খোঁজে নিক্ষেপ করেছি শব্দভেদী বাণ, ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা পেয়ে ব্যহত হয়েছে তরঙ্গ; রঙিন প্রাণীরা ফিরে গেছে নিরাপদ কৃষ্ণগহ্বরে। নদী-অরণ্য ছেড়ে পুঞ্জীভূত ছায়াপথে খুঁজতে গেছি বিশুদ্ধ সুর, সৃষ্টির প্রাক্কালে ফিরতে খুঁড়েছি সময়ের সুড়ঙ্গ; রশ্মির বিকীর্ণতায় এখন আমি প্রায়ান্ধ। সঙ্গমের চূড়ান্তে যোনিপথে কান চেপে খুঁজেছি আদিম শিশুর ক্রন্দনধ্বনি, রক্ত ঝরেছে কিছু, আঙুল বিঁধেছে; সবুজ গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছি অহেতুক। সন্ধ্যাকাশের মিলিয়ে যাওয়া আলোয় শেষবারের মতো খুঁজতে চেয়েছি আহিরভৈরবীর রেশ, ফিরে আসেনি কোনো অসময় রাগিণীর বিষাদছায়া; পিঙ্গল আকাশে শুধুই ব্যর্থ বেহাগের তান বেজে গেছে একটানা। হিমেল রাতে মত্ত সাধুর আখড়ায় বসে জ্বলন্ত ধুনীর উড়ে আসা ছাইয়ে ছুঁতে গেছি জোনাকবাতির শীতলতা, হাত পুড়েছে একচিলতে জড়ুলের মাপে। একবুক ফুটন্ত লাভার মাঝে আঁতিপাঁতি খুঁজেছি প্রাচীন স্নেহের ফল্গুধারা, পায়ের তলায় চেয়েছি চোরাবালির মুক্ত স্রোত; অবান্তর উত্তাপে শুধু গলে গেছে প্রেমের জমাট মোমবাতি। হৃদয় ভাঙার রাতে সাদা ঘোড়ায় চেপে পাগড়ীসওয়ার ঢুঁড়ে ফিরেছি কালো ভ্রমরের বুকের মাঝে রাক্ষসীর প্রাণ, তরুণাশ্ব বুড়িয়ে গেছে, অস্থিচর্মসার; আজো খুঁজে পাওয়া হয়নি সে অচিনপুর। কখনো বা অবকাশে আনমনা কলকাতার ঈশানকোণে সন্ধান করেছি অরুন্ধতীর ঝাপসা মুখচ্ছবি, ধুলোমাখা কালবৈশাখীই ধেয়ে এসেছে মাত্র; চক্ষু নিয়েছি ফিরায়ে। অচেনা প্রেয়সীর অবলুপ্ত ভাস্কর্য খুঁজতে হানা দিয়েছি কখনো মন্দিরে মন্দিরে, প্রস্তরপ্রতিমা লুট করেছে অনুগত আমার সেনার দল; আমি খুলে এনেছি বৃথা পাথরফলক। আঁধার কাটাতে আমি প্রখর দিবসে জ্বেলেছি পঞ্চপ্রদীপ, বায়ু হয়েছে লঘু, শ্বাস হয়েছে ভারী; নেবেছে অকালনিশি। স্বচ্ছ আলোর নেশায় ঘষেছি পরশপাথর, চামড়া বিষিয়ে গেছে, বালার্ক নিভে গেছে লোলচর্ম লালসার শিথিল ঝাপটায়; আমি সোনাসামর্থ্য বিলিয়ে রিক্ত চর্মপেটিকা বয়ে পথে নেমেছি ভিক্ষু হয়ে।

আমি অর্ধেকটা জীবন ধরে অর্ধেক জীবনটাকেই খুঁজেছি বারেবারে, বিশদরূপে। অন্য সবাই তো আজীবন মৃত্যুকেই খুঁজে ফেরে, আমি আমরণ শুধু খুঁজেছি অমৃত্যু।

ডিমেনসিয়া

নদীর তীর থেকে কুড়োনো রঙিন নুড়িপাথরে বাজারের ব্যাগ ভর্তি করে বাড়ি ফিরি। রাগী চেহারার একজন বয়স্কা মহিলা তা দেখে চিৎকার করে বলেন, ‘তোমার কী আক্কেল গো!’ আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই একটু; অভিমানের বাষ্প জমে বুকেইতিউতি মাকে খুঁজি অভিযোগ জানানোর জন্য, পাইনা কোথাও। ইদানীং কী যে হয়েছে, ঘুমের মধ্যে বালিশের মতো হাল্কা লাগে নিজেকেস্মৃতিরা পোর্সেলিনের ফুলদানী যেন; ঝনঝনিয়ে ভাঙে একটু অসতর্ক হলেই। আমি নিজের সাথে শব্দ নিয়ে খেলা করি অঢেল অবসরেসঙ্গীত শব্দটা উচ্চারণ করলেই কোথা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা এসে গায়ে আছড়ে পড়ে যেন, সোঁদা গন্ধ ভেসে আসে। প্রেম শব্দটা শুনলে কেন জানি গর্ভবতী কিশোরীর ন্যায় নতমুখ এক চতুর্থীর চাঁদের রাতের কথা মাথায় আসেপ্রতিশোধ কথাটা শুনলেই আমার সাধের লোটন পায়রা দাঁতে চেপে ধরা অপরাধী চেহারার সেই বেড়ালটাকে মনে পড়ে। এই হেমন্তলগ্নে এসে আমার মাথার ভেতরে কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে যায় সব কিছু; ছেলেবেলায় চড়া রেলগাড়িটা শুধু কু ঝিকঝিক শব্দে এগিয়ে আসে মেঘলা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। নিজের বিয়ের স্মৃতি ভাবতে গেলেই ছাঁদনাতলায় কাঠের পিঁড়িতে এক নবোদ্ভিন্না যুবতীকে বসে থাকতে দেখি, লাল বেনারসিতে আমার মাকে কী সুন্দরই না লাগছে! এখন মৃত্যু শব্দটা শুনলেই বর্ষাকালের দামাল মহানন্দার কথা মনে পড়ে; মৃত্যু যেন তরণী তছনছকারী এক নাছোড়বান্দা নদীদুপুরবেলায় আধাচেনা এক স্নিগ্ধ তরুণ সামনে এসে দাঁড়ায়, ডাকে ‘বাবা’, অম্নি আমি ছেলেবেলায় দেখা জটাজুটওলা একটা বৈদিক বটগাছ দেখতে পেলাম চোখের সামনে।

ডিলিউশন

চোদ্দশো পঞ্চাশ বঙ্গাব্দে তোমাকে স্বাগত’—পেছন দিকে ঘাড় ফেরাতেই বোকা বোকা চেহারার যন্ত্রমানবীটা চোখে পড়ল। জায়গাটা আদতে পরিত্যক্ত গাড়িদের কবরস্থান। শহরে পা রেখেই মনটা অস্বস্তিতে খচখচ করেছিল, কারণটা বুঝতে মিনিট চারেক লাগল। এখানে প্রাণের—মানে প্রোটোপ্লাজম নির্ভর প্রাণের কোন অস্তিত্ব নেই। চৌরাস্তায় একটানা দু’মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে থাকলেই কানে সুগম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’ তবে তা নেহাৎই নগর পরিদর্শনকারী ড্রোনের দেহগহ্বর থেকে নির্গত। উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেলাম ভগ্ন স্কাইস্ক্র্যাপারের সারি ডানদিকে রেখেআমি কী খুঁজছি? আমি কি খুঁজছি কিছুই? অতঃপর এই মৃত গাড়ির নগরীতে অনুপ্রবেশযন্ত্রমানবী আমাকে একেকটা ভাঙাচোরা গাড়ির সামনে নিয়ে যাচ্ছিল। ‘এটা তেরশো ছেষট্টির ক্যাডিলাক, এটা তেরশো ঊনআশির ফেরারি, ওই যে লম্বামতন, ওটা চোদ্দশো কুড়ির মার্সিডিজ সিএলএ ক্লাস। এককালের বিশিষ্ট সব গাড়ি, এখন গাড়িদের শব।’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ওটা একটা লালবাতিঅলা গাড়ির বনেটের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। ক্যাঁচক্যাঁচ প্রতিবাদে মুহূর্তের জন্য নির্জনতা ভঙ্গ হল। হঠাৎই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলল, ‘আমি রবীন্দ্রনাথের আড়াই হাজার গান জানি।’ ‘কে রবীন্দ্রনাথ?’ ও কিছু উত্তর দিল না। আমি ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। গাড়িদের কঙ্কালের আনাচেকানাচে জীবনের কিছু চিহ্ন আছে দেখলাম, রোমশ ক্যাকটাসগোত্রীয় প্রাণ, বেঁটে বেঁটে ধূসর রঙের। এবার আমি প্রশ্ন করলাম। ‘এ নগরে প্রাণ নেই কেন? কী ঘটেছিল? যুদ্ধবিবাদ? ভূমিকম্প? ধাতু বিষক্রিয়া?’ উত্তর দেবার সময়, হতে পারে কানের ভুল, যান্ত্রিক কণ্ঠ বিষাদী শোনাল, ‘না, বাতাসে প্রেমের পরিমাণ কমে গেছিল মারাত্মকভাবে।’ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে তক্ষুনি একটা তক্ষক আমাকে চমকে দিয়ে প্রথমবারের মতন ডেকে উঠল—ঠিক ঠিক ঠিক।

 
 
top