প্রণব দত্তর অনুগল্প

 

মদনের স্বর্গরথ

তিন চার দিন ফুরসত পেয়ে স্বর্গরথ-এর ড্রাইভার মদন কাশ্যপী আজ রমেন সাহার বাঙলা মালের ঠেকে বসেছিল। এক পাঁইট মাল শেষ করার পর তার মনে হচ্ছিল, স্বর্গ থেকে রথ নামিয়ে সে এমন এক জগতে এসেছে যেখানে কোনো মৃত্যু নেই। এতদিন সে যে মৃতদেহগুলো বহন করে আসা-যাওয়া করেছে, তারাও স্বর্গ থেকে নীচে নেমে এসেছে তার সঙ্গে সঙ্গে। তারাও ঘোরাফেরা করছে তার টেবিলের আনাচে কানাচে। প্রতিটি যাত্রায় মদনের গাড়িতে একজনই সওয়ার থাকে। সে এক মৃতদেহ। এইভাবে শবসঙ্গ করতে করতে মদনের মনে হয় চলিষ্ণু গাড়িটা, সে এবং শবদেহ মিলেমিশে যেন একটাই সত্ত্বা। শবদেহটা কাচের ঘরে স্থির শুয়ে থাকে। তার চোখে রাস্তার পাশের গাছের ছায়া পড়ে, রোদ্দুর পড়ে। মদন সাবধানে রাস্তার খানাখন্দর, বাম্পার পার হয়। প্রতিদিন সে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীদের অসংখ্য প্রণাম পায়। প্রণাম তাকে, গাড়িটাকে, নাকি শবদেহকে বুঝতে পারে না মদন। তার মাঝে মাঝে মনে হয় একটাই সওয়ারী সে বয়ে চলেছে আজীবন। সে যেন আঠার মতো লেপ্টে রয়েছে তার সঙ্গে। বেশ একটা ঘোলাটে খোয়াব দেখছিল মদন। তখনই পকেটের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মালিক বলল, দন এখন সোজা হাসপাতালে যা। বডি নিয়ে বাড়ি ছুঁইয়ে শ্মশানে চলে যাবি মদন কিছুক্ষণ কথা বলল না। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, চিন্তা করবেন না, আমি আসছি। স্বর্গরথ সকলেরই। কখন যে কার!

 

সিরাজের ছাগল ও বধ্যভূমির মায়া

খাদেমের ছেলে সিরাজ বাপের ধারা পেয়েছে। সে এই তাবত এলাকার কনিষ্ঠতম মাংস বিক্রেতা। সে এই বারো বছর বয়সেই খাসির চেহারা দেখে বলে দিতে পারে খাসিটার বয়স কত, কাটবার পরে তার মাংস কতটা জল খাবে, সামনের পায়ে কতটা চর্বি আছে ইত্যাদি। সুরুতহালের ডাক্তারের মতো খাসির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার মুখস্ত। বাপের সঙ্গে ওর একটাই তফাৎ, সে ছাগলগুলোকে ভালোবাসে। নিজের হাতে সে ছাগলগুলোকে কাঁঠালপাতা খাওয়ায়, তাদের সঙ্গে খেলা করে, তাদের শরীরের লোম আঁচড়ে দেয়। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও ছাগলগুলো আদর খায়, পুটুস পাটুস নাদে। আমিও সিরাজকে ভালোবাসি। তার কচি মুখে একটা মিষ্টি হাসি লেগে আছে। সেখানে নিষ্ঠুরতার চিহ্নমাত্র নেই। একদিন সে কথাপ্রসঙ্গে আমাকে বলেছে, জানো কাকা, এদের দেখলে আমার রাঙির কথা মনে পড়ে। ছোটোবেলায় বক্রি ঈদের আগে রাঙিকে এনেছিল আব্বা। দারুণ সুন্দর মুখের ছাগলটা। আমি ওর গলায় ঘণ্টা বেঁধে খেলতাম। মাকে তালাক দিয়েছিল বাবা। আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী ছিল রাঙি। একদিন সকালে উঠে বারান্দার কোনায় শূন্য দড়ি দেখে খুব কেঁদেছিলাম আমিআমি একদিন বললাম, তুইও তো একই কাজ করছিস, সিরাজ সিরাজ হাসল, মি তো আর কোনো কাজ জানি না, কাকা একদিন আমি দেখলাম সিরাজ ছুটছে, তার সামনে বধ্যভূমি থেকে পালিয়ে আসা একটা ছাগল। একসময় সিরাজ দাঁড়াল। হাঁপাচ্চে সে। ছাগলটা রাস্তার গাড়ি-ঘোড়ার পাশ কাটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, তোর খুব লস হয়ে গেল রে, সিরাজ সে বলল, নাকাকা, ও দেখো ঠিক ফিরে আসবে। জগতে আমি ছাড়া ওর কোনো চেনা জায়গা নেই হলও তাই। কিছুক্ষণের মধ্যে ছাগলটা টাল খেতে খেতে ফিরে এল। সিরাজের হাঁটুতে সে মাথা ঘষছে। আদর করতে করতে সিরাজ ওকে নিয়ে চলেছিল বধ্যভূমির দিকে।

(ক্রমশ…)

 
 
top