রাজনৈতিক চলচ্চিত্র

 

শ্রমের কাব্য: বার্ট হানস্ত্রার গ্লাস

বার্ট হানস্ত্রা। ডাচ তথ্যচিত্র নির্মাতা। ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে প্রবেশ করেছিলেন চলচ্চিত্রের জগতে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় দর্শনীয় সব তথ্যচিত্র নির্মাণ করে ১৯৯৭ সালে প্রয়াত হয়েছেন। জীবন শুরু করেছিলেন চিত্রশিল্পী হিসেবে। নিসর্গ ও পোর্ট্রেট এঁকে কিঞ্চিৎ খ্যাতিও পেয়েছিলেন। পরে চলে এলেন চলচ্চিত্রের জগতে। মিরর অব হল্যান্ড (১৯৫০), রেমব্রান্টপেইন্টার অব ম্যান (১৯৫৭), গ্লাস (১৯৫৮), জু (১৯৬২), দ্য হিউম্যান ডাচ (১৯৬৪), এবং ব্রিজেস ইন হল্যান্ড (১৯৬৮)এই ছবিগুলি তথ্যচিত্রের জগতে তাঁর অনবদ্য সব সৃষ্টি।

বার্ট হানস্ত্রার দেশ নেদারল্যান্ডসে তথ্যচিত্র নির্মাণের একটা ধারা চলে আসছিল ১৯২০-র দশক থেকেই। সে সব ছবি ছিল মূলত বাস্তব ও প্রকৃতির কাব্যিক প্রকাশ। ১৯২০-র দশকের শেষ থেকে সোভিয়েত তথ্যচিত্রের প্রভাব পড়তে দেখা যায় ডাচ তথ্যচিত্রে। বিশেষভাবে জরিস ইভেন্সের ছবিতে শ্রম ও শ্রমিকের সঙ্গবদ্ধ উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকে জরিস ইভেন্স হল্যান্ড ছেড়ে চলে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ততদিনে শ্রমের প্রতি এক প্রকার কমিটমেন্ট স্থায়ী প্রভাব তৈরি করে ফেলেছে ডাচ তথ্যচিত্রে।

জরিস ইভেন্সের গভীর প্রভাবকে আত্তীকরণ করে বার্ট হানস্ত্রা পরবর্তী দশক থেকে ডাচ তথ্যচিত্রকে এগিয়ে নিয়ে চললেন। সোভিয়েত চলচ্চিত্রের মন্তাজ, ব্রিটিশ তথ্যচিত্রকার জন গ্রিয়ারসনের সমাজবাদী ধারণা, ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোয়ার কাব্যিক বস্তুবাদ এবং ডাচ চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য মিলেমিশে ডাচ তথ্যচিত্রে বার্ট হানস্ত্রার চলচ্চিত্র ভাবনা নির্মিত হল।

বার্ট হানস্ত্রা অবশ্য তাঁর উত্তরসূরি জরিস ইভেন্সের মতো সরাসরি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। কিন্তু তাঁর ছবিতে শ্রমের ছন্দ আর শ্রমিকের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দেখা দেয় বার বার। ১৯৫৮ সালে তিনি দশ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। বিষয়, একটি গ্লাস ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের কাজকর্ম। ছবির নাম গ্লাস। বিষয় এবং আঙ্গিকের এত অসাধারণ সাযুজ্য চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুব কম ছবিতেই দেখা যায়।

শটের পরে শট জুড়ে হানস্ত্রা দশ মিনিটের একটি অসাধারণ মন্তাজ নির্মাণ করেন, যেখানে দেখা যায় শ্রমিকরা কী সাবলীল ছন্দে বিভিন্ন কাচের দ্রব্য নির্মাণ করছে। তার কোনোটি সাদামাটা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, কোনোটি পরীক্ষাগারে ব্যবহারের নিখুঁত যন্ত্র, আবার কোনোটি-বা সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম। শ্রমের একটা ছন্দ আছে। সেটা আমরা সব সংস্কৃতিতেই দেখতে পাই। কিন্তু সেই ছন্দকে চলচ্চিত্রের ভাষায় অনুবাদ করা সহজ কাজ নয়। বার্ট হানস্ত্রার ছবি সেই কঠিন কাজটাই করে।

নিখুঁত মাপের ছোটো ছোটো শটগুলি পরপর জুড়ে যে দৃশ্যগত ছন্দ তৈরি হয়, তাকে সহায়তা করে শব্দগত ধ্বনি। ট্রাম্পেট জাতীয় বাদ্যযন্ত্র থেকে কিছু বিশেষ ধ্বনি তৈরি করা হয়, যা দৃশ্যে প্রতীয়মান বিষয়বস্তু ও কাজের এক প্রকার অর্ধ-বিমূর্ত প্রকাশ।

বার্ট হানস্ত্রার ছবিতে শ্রমকে বিষয়বস্তু করে এক কাব্যিক দৃশ্য-শব্দমালা তৈরি হয়, যা দর্শকের মনে একগুচ্ছ বিশুদ্ধ আনন্দের ঢেউ তোলে। শ্রমের শরীরী উপস্থিতির সঙ্গে মিশে যায় বিমূর্ত ছন্দ। শ্রমিকের হাত-পা, আঙুল, পেশির নিখুঁত আন্দোলন যেন বস্তুগত রূপ ধারণ করে উৎপাদনে পরিণতি লাভ করে। গ্লাস দেখতে দেখতে একটা কথা মনে হয়: পুঁজিবাদের জগতে পণ্য শ্রমকে গ্রাস করে ফেলে; বার্ট হানস্ত্রার ছবি শ্রম ও বস্তুর প্রকৃত বস্তুবাদী সম্পর্কটা প্রকাশ ক’রে দশ মিনিটের জন্য পুঁজিবাদের বিপরীত এক জগৎ নির্মাণ করে।।

(ক্রমশ…)

 
 
top