রাজনৈতিক চলচ্চিত্র

 

বুনুয়েল : ক্ষুধার রাজ্য ও প্রত্যাঘাতের রণনীতি

ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড  লুইস বুনুয়েলের প্রথম বাস্তববাদী ফিল্মএকটি তথ্যচিত্র। বলা ভালো, সাতাশ মিনিটের একটি রাজনৈতিক সন্দর্ভ। এ ছবি নির্মাণের পূর্বেই বুনুয়েল অবশ্য ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের তরুণ তুর্কি বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন আঁ সিয়াঁ আন্দারু (অ্যান আন্দলুসিয়ান ডগ, ১৯২৯)এবং লাঁজ ডোহ (দ্য গোল্ডেন এজ, ১৯৩০ছবি দুটির দৌলতে। তবে সেই বুনুয়েল ছিলেন পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্রকার। যিনি চলচ্চিত্রভাষার রাজনীতিতে যতটা মনোযোগী, ততটা আগ্রহী অবশ্য রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণে নন। ১৯৩২ সালে বুনুয়েল হাত দিলেন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে। বিষয় স্পেনের হার্ডেস গ্রামপুঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রা। উত্তর স্পেনের এই পাহাড়-ঘেরা গ্রামগুলি ছিল আধুনিকতা থেকে কিছুটা বঞ্চিত। অবর্ণনীয় দারিদ্য এবং অপুষ্টি ছিল গ্রামগুলির অধিবাসীদের নিত্যসঙ্গী। মরিস লেজেন্ড্রের নৃ-তাত্ত্বিক লেখা ইলাস হার্ডেসের মানবিক ভূগোল পড়ে বুনুয়েলের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় এই গ্রামগুলির অবস্থার প্রতি।

১৯৩৩ সালে লাস হার্ডেসতিয়ের্রা সিন পান  বা ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড বা দ্য আনপ্রমিসড ল্যান্ড  ছবিটি জনসমক্ষে আসে। অচিরেই ছবিটি নিষিদ্ধ হয় স্পেনে। ফ্রান্সও ছবিটিকে মোটেই ভালো চোখে দেখেনি। দেখার কথাও নয়। কারণ বুনুয়েল বরাবরই বিপজ্জনক। পরাবস্তুবাদের অন্তর্ঘাতমূলক ইস্তাহার ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে বুনুয়েলের তৈরি ইমেজে। এবার বুনুয়েল একেবারে সরাসরি কথা বলতে শুরু করলেন। সুররিয়েলিস্ট কবিতার দেশ আর নয়, এবার প্রত্যক্ষভাবে মাটি আর পাথরের ভূখণ্ড; স্বপ্ন নয়, এ হল বাস্তব। অবশ্যই বাস্তববাদী ইমেজের স্রোতের মধ্যে থেকেও চোরাপাহাড়ের মতো মাথা তোলে পরাবাস্তববাদ। কখনো গদ্যময় কঠোর বাস্তবের ছবি, কখনো চকিতে আঘাত হানছে তীক্ষ্ণাগ্র পরাবাস্তববাদী মুহূর্ত। ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড -এর বুনুয়েল যেন পুরোদস্তুর গেরিলা যোদ্ধা। পরবর্তী অধ্যায়ের বুনুয়েল রাজনৈতিক বক্তব্য ছবিতে প্রকাশের জন্য যে ধারালো ভাষা প্রয়োগ করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে বাস্তববাদী ও যার মধ্যে থেকে আঘাত হানে স্বপ্ন আর অ-বাস্তব, তার শুরু ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড  তথ্যচিত্রটি থেকে। তাই সাতাশ মিনিটের ছোটো ছবিটির গুরুত্ব অসীম।

 

00

এ ছবিতে লুইস বুনুয়েল সমাজতান্ত্রিক সমীক্ষার ঢঙে উপস্থাপন করেন এক অনুন্নয়নের ভূগোল। প্রাথমিকভাবে ছবিটির বিশেষত্ব এখানেই যে, ‘অনুন্নয়ন’ খুঁজতে বুনুয়েলকে পাড়ি দিতে হয় না দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা বা এশিয়ার দেশগুলিতে; অনুন্নয়ন সমীক্ষায় গৃহযুদ্ধের দিকে অগ্রসর একদা উপনিবেশবাদী স্পেনের একটি অঞ্চলের সমীক্ষাই তাঁর কাছে যথেষ্ট। অন্ধকার দুনিয়া নয়, প্রদীপের তলার অন্ধকারটিকেই বুনুয়েল বিশেষভাবে লক্ষ্ করেন। পাহাড়ঘেরা হার্ডেস গ্রামপুঞ্জঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে ঐতিহ্যশালী। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকেও ঐশর্য্যশালী। তবু সেখানে মানুষের মুখে অন্ন নেই; শিশুদের জন্য আধুনিক স্কুল নেই। তবে সেখানে খাদ্য অমিল হলেও ধর্ম আছে। মানুষগুলো মৃতপ্রায়, কিন্তু পর্যটকের ভিড় লেগেই আছে। কোনো এক অজানা কারণে এই গ্রামগুলির মানুষ বঞ্চিত আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে। বঞ্চনা থেকেই জন্ম নিয়েছে অনুন্নয়ন।

বুনুয়েল যখন ছবিটির পরিকল্পনা করছেন এবং তা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তখন স্পেনের রাজনীতি নতুন মোড় নিচ্ছে। জার্মানি ও ইতালিতে নাৎসি ও ফ্যাসিবাদ ক্ষমতা কায়েমের পথে। পিছিয়ে নেই স্পেনও। সেখানে ফ্যাসিবাদ প্রভাব বিস্তার করছে জাতীয় রাজনীতিতে। ১৯৩০-এর দশকের শুরু থেকেই স্পেনের রাজনীতির চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। গণতন্ত্রী, সমাজবাদী, রাজতন্ত্রী ও রক্ষণশীল শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমে তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্রী স্পেন জন্ম নিচ্ছে ১৯৩১ সালে। এপ্রিলে উদারপন্থী ও সমাজবাদীরা মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনে জিতছে বেশিরভাগ শহরে। তাদের শাসন মানুষকে তেমন খুশি করতে না পারলেও ওই বছরের শেষের দিকে তারা আবার নির্বাচনে জয়লাভ করছে। তবে রাজনৈতিক ডামাডোলের অবসান হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রক্ষণশীল শক্তি কোমর বেঁধে নেমে পড়ছে উদারনৈতিক, গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের পতন ঘটাতে। তারা মদত পাচ্ছে পদচ্যুত রাজশক্তি, চার্চ এবং বৈদেশিক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির কাছ থেকে। গণতন্ত্রীরা যখন স্পেনের কৃষকের মধ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, রক্ষণশীলরা তখন ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলিতে শক্তি বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেছে।

লুইস্‌ বুনুয়েল, তাঁর বন্ধু ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকার মতোই সরাসরি গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের পক্ষ নিচ্ছেন এবং তীব্রভাবে বিরোধিতা করছেন রাজা ও চার্চের মদতপুষ্ট রক্ষণশীলদের। এইরকম একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড -এর মতো একটি ছবি খুব পরিষ্কারভাবেই এ কথা প্রচার করতে সমর্থ হয় যে, ঐতিহ্য নয়, আধুনিকতার গণতন্ত্রীকরণই একমাত্র পথ কৃষকপ্রধান স্পেনের অর্থনীতি ও সমাজকে রক্ষা করার। স্পেনের তৎকালীন রাজনীতির কথা মাথায় রেখে বলা যায়, বুনুয়েলের ছবি একটা সরাসরি অবস্থান নেয়, তবে অবশ্যই প্রোপাগান্ডার ঢঙে নয়। বরং নৈর্ব্যক্তিকতার শৈলী ব্যবহার করে কার্যোদ্ধার করেন তিনি।

ছবিটির জন্য অর্থসংস্থান থেকে শুরু করে প্রদর্শন পর্যন্ত প্রক্রিয়াটিকে লক্ষ্ করলেই বোঝা যায় যে, ছবিটি রাজনৈতিক লক্ষ্যে বানানো। স্বনামধন্য নৈরাজ্যবাদী চিন্তাবিদ র‍্যামোন অ্যাকিন ছবি প্রযোজনা করছেন। ক্যামেরায় রয়েছেন এলি লোতার, ধারাভাষ্য দিচ্ছেন আবেল জাকঁ। আর ধারভাষ্য রচিয়তা বুনুয়েল রাফায়েল ভেনতুরা এবং পিয়ের উনিক। যে সব নামগুলি এছবির প্রসঙ্গে এসে পড়ল অর্থাৎ কিনা যাঁরা যুক্ত ছিলেন ছবির কাজে, তাঁদের প্রায় প্রত্যেককেই আমরা স্পেনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবি বলেই শনাক্ত করতে পারি। আর এ কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ছবিটিকে স্পেনের রক্ষণশীলরা যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন, তখন ছবির প্রচারে এগিয়ে আসছে সমাজতন্ত্রীদের বিভিন্ন গণসংগঠন। রক্ষণশীলরা বুনুয়েলের স্পেনে প্রবেশও অচিরেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন। প্যারিসেও তিনি তখন পুলিশের হাত থেকে নিরাপদ নন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ইউরোপ ত্যাগ করে চলে যেতে দেখা যাবে মেক্সিকোয়। তবে সে আর এক গল্প।

ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড  আপাতদৃষ্টিতে একটি ট্র্যাভেলগ ফিল্ম। ছবির শুরুটা সেভাবেই করা হয়। হার্ডেস গ্রামপুঞ্জের ভৌগোলিক এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যা করাই যেন ছবিটির উদ্দেশ্য। ছবি আরম্ভ হয় হার্ডেস সম্পর্কে সাধারণ তথ্য দিয়ে। ক্যামেরা ঢুকে পড়ে গ্রামে যেন স্রেফ পর্যটনের উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রাথমিকভাবে দেওয়া নিরীহ তথ্যগুলিকে ব্যাখ্যার জন্যই যেন দৃশ্যমান হতে থাকে হার্ডেস গ্রামপুঞ্জের অধিবাসীদের জীবন সম্পর্কে নানান তথ্য। সেখানকার মানুষের জীবিকার কথা, কৃষির অবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ধর্মাচরণ ইত্যাদি। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে প্রকাশিত হতে থাকে এমন সব তথ্য, যা বুঝিয়ে দেয় অনুন্নয়ন-দারিদ্র-অজ্ঞতার আন্তঃসম্পর্ক, কিন্তু তা বর্ণিত হচ্ছে এতটাই নির্বিকারভাবে, যেন শুকনো তথ্যের বাইরে বুনুয়েলের নিজের অবস্থান থেকে বলার তেমন কিছু নেই।

একটা অদ্ভুত খেলা চলতে থাকে দৃশ্য এবং শ্রাব্যের মধ্যে। ক্যামেরার বর্ণনা এবং ধারবিবরণীর মধ্যে একটা সাযুজ্যের অভাব অনুভূত হতে থাকে। ওপর ওপর দেখলে মনে হয়, দৃশ্যের স্রোত এবং ধারাবিবরণী প্রশ্নাতীতভাবে নিটোল, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। আসলে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় তা এতটাই নির্মোহ যে, এই স্থৈর্য বেশ কিছুটা অ-স্বাভাবিক; কারণ মানুষের চরম দুর্দশার দৃশ্যগুলি যখন আমরা দেখতে থাকি, তখন লক্ষণীয়ভাবে ধারাবিবরণী বড় বেশি আবেগহীন যেন সমাজবিজ্ঞান বা স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ক্লাস চলছে, যেন শব-ব্যবচ্ছেদের ধারাবিবরণী চলছে, যেখানে মৃত্যুর ট্যাজেডি নিয়ে সেখানে কথা বলার কারণ নেই। দৃশ্যগুলি আমাদের প্ররোচিত করে দারিদ্রের কারণ অনুসন্ধানের দিকে, অথচ ধারাবিবরণী কেবল যেন রিপোর্টিং মাত্র—তার আর কোনো দায় নেই। যা ঘটে তা হল, দর্শকের মন একটা অস্বস্তিতে ভরে ওঠে। ধারাবিবরণীতে যে সহানুভূতির ঢেউ উঠতে পারত, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে দর্শকও সহানুভূতির পথে হেঁটে বিবেকদংশন এড়ানোর যে চিরাচরিত পথ, সে পথে যাওয়ার সুযোগ পায় না। পাপস্খালনের রাস্তা নেই। ক্যাথারসিসের পথ সুকৌশলে অবরোধ করে রাখা হয়েছে।

কয়েকটি দৃশ্যের কথা মনে করতে পারি এই সূত্রে। শিশু-কোলে এক মধ্যবয়স্ক মহিলাকে দেখায় ক্যামেরা। শটের কম্পোজিশন ইত্যাদি ভালো করে দেখলে দর্শক বুঝবেন, জন্তু ও মেরি অর্থাৎ পিয়েতার স্পষ্ট রেফারেন্স। ধারাবিবরণী জানায়, ইনি একজন যুবতী, বয়স মাত্র তিরিশ। অপুষ্টি ও ব্যাধির কারণে হার্ডেসের মেয়েরা বুড়িয়ে যায় অকালে। করুণ দৃশ্য ও নির্মোহ ভাষ্যের সংঘাত ঘটে একটা। ফলে এই সংঘাতে জন্ম হয় এক প্রকার শ্লেষ ও তির্যক ইঙ্গিতের। আর একটি দৃশ্যে বুনুয়েল চার্চ-পরিচালিত গ্রামে একমাত্র স্কুলটি দেখান। দেখা যায় ছেলেমেয়েরা বসে আছে—শুকনো মুখ, পোশাক মলিন, পায়ে জুতো নেই কারও। বোর্ডে শিক্ষক লিখে লিখে শেখান, ‘অন্যের দ্রব্য চুরি করা পাপ‘—যেখানে দর্শকের মনে জাগে ছিনিয়ে খায়নি কেন, যেখানে মানুষ একটুকরো রুটি পায় না সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করার নীতিবোধ শেখানো চলছে জোর কদমে! কী বিচিত্র এই ব্যবস্থা!

না, বুনুয়েল সরাসরি এ সব কথা নিজের মুখে বলবেন না। কেবল ব্যবস্থার ফাঁকিটুকু যেন আমাদের চোখ এড়িয়ে না-যায়, তা দেখবেন। অর্থাৎ দর্শকের বিচার-বুদ্ধির কাছে বিষয়টিকে সমর্পণ করবেন সুকৌশলে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক আদো পিউরু বুনুয়েলের এই কৌশলটিকে বলেন ‘ইয়েসবাট…’ কৌশল। অর্থাৎ, বুনুয়েলের ছবিটা এমনভাবে এগোতে থাকে যেন সব বিষয়েই তিনি ভারি ইতিবাচক, নেতির কোনো জায়গাই নেই, অথচ যুক্তিশৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে তিনি কিন্তু…’ বলে একটা ছোট্ট সন্দেহ পোষণ করবেন। ব্যস, তাতেই প্রচলিত ব্যবস্থার নিটোল যুক্তিশৃঙ্খলখানা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। অর্থাৎ কিনা, অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে চলবেন তিনি সময়ে সময়ে। প্রযোজক থেকে দর্শক কারো সাধ্যি নেই তাঁর গেরিলা আক্রমণ কখন কোন দিক থেকে আসবে, তা আন্দাজ করে।

সবচেয়ে বড়ো কথা, আপাত-নিরীহ দৃশ্য-স্রোতের মধ্যে থেকে বিষধর সাপের মতো বুনুয়েলের ছবিতে মাঝে মধ্যেই মাথা তোলে হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা। ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড -এর একটি দৃশ্যে আমরা দেখি, মৌচাক পিঠে নিয়ে যাচ্ছে একদল গাধা। হঠাৎই একটি গাধার পিঠ থেকে পড়ে যায় মৌচাক। কয়েক মিনিটের মধ্যে অগুন্তি দুর্দান্ত পাহাড়ি মৌমাছির কামড়ে মারা পড়ে গাধাটি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৌমাছিরা খুবলে খেয়ে ফেলে তার চামড়া-মাংস, পড়ে থাকে কঙ্কাল। বুনুয়েলের ছবিতে প্রত্যক্ষ ভায়োলেন্স আসলে একটি দারিদ্র-পীড়িত সমাজে বঞ্চনা যে হিংস্রতার জন্ম দেয়, তারই প্রত্যক্ষ রূপ। যাকে সমাজতাত্ত্বিকরা ব্যাখ্যা করেন ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্সবলে, বুনুয়েলের ছবিতে তার একপ্রকার ইন্টিগ্রেটেড ফর্ম অতর্কিতে প্রকাশ হয়ে পড়ে। আর এতটাই অতর্কিত যে, দর্শককে সতর্ক হওয়ার কোনো সুযোগ না-দিয়েই তা এসে পড়ে। আত্মরক্ষার মধ্যবিত্ত বর্মগুলো গায়ে চাপানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকে না। চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক আন্দ্রে বাজাঁ বুনুয়েলের ছবিতে বাস্তববাদের নাভিমণ্ডল থেকে উঠে আসা এইরকম সব পরাবাস্তববাদী মুহূর্তগুলিকে বাস্তবের এক সংশ্লেষিত রূপ বলে চিহ্নিত করেছেন।

লুইস বুনুয়েলের ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড -কে কেবল একটি প্রশংসনীয় ছবি বললে কম বলা হয়। এই ছবির সূত্রে বুনুয়েল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের একপ্রকার গেরিলা কৌশল আবিষ্কার করেন, যেখানে দর্শকের চৈতন্যের জড়তাকে অতর্কিত আঘাতে নাড়িয়ে দেওয়া যায়। হিংস্রতা বুনুয়েলের হাতে হয়ে ওঠে মারাত্মক অস্ত্র, যা এক মুহূর্তে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির মূলে গিয়ে আঘাত করে। ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড ছবিতে যে যাত্রা বুনুয়েল শুরু করেছিলেন, তা অব্যাহত থাকে তাঁর শেষ জীবনের মাস্টারপিস ডিসক্রিট চার্ম অব দ্য বুজোঁয়ার্স  পর্যন্ত।

 

 
 
top