রাজনৈতিক চলচ্চিত্র

 

আইজেনস্টাইন, চলচ্চিত্র এবং প্রলেতারিয়েত জনতা

 

[A]n idealist approach to film (film as an art object) is generally easier than a materialist one […]. Thus aesthetic criticism of Eisenstein continues. But denying an artist’s political content is a highly political albeit conservative act.

Murray Sperber (Jump Cut, No. 14,1977)

সাম্প্রতিক কালে আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্রকে দেখার চোখ এবং পর্যালোচনা করার ধরণ অনেকটাই পালটে গেছে। আজকাল আইজেনস্টাইনের ছবিগুলিকে বিশেষ নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার চেষ্টা হয়। এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হল কগনিটিভ স্কুল। এই ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাত্ত্বিক ডেভিড বর্ডওয়েলের আলোচনায় আইজেনস্টাইনের কাজগুলির প্রকরণগত ও শৈলীগত আলোচনা প্রধান হয়ে দেখা দেয়। এই ধারার আলোচনায় আইজেনস্টাইনের ছবির নন্দনতত্ত্বকে বিযুক্ত করা হয় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বর্ডওয়েল খুবই দক্ষ তাত্ত্বিক এবং আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্রকে দেখার যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উনি এনেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তথাপি, এ কথা ভুলে গেলে কী করে চলবে যে, আইজেনস্টাইনের তত্ত্ব, ভাবনা, ভাষা, শৈলী আপাদমস্তক রাজনৈতিকচলচ্চিত্রের জগতে তাঁর প্রবেশের মুহূর্ত থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত। বলশেভিক বিপ্লব তাঁকে নাটক ও চলচ্চিত্রের আঙিনায় এনেছিল, আর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার দিনও তিনি কাজ করেছেন মার্ক্স-এর দাস ক্যাপিটাল-এর চলচ্চিত্রায়ণের অভিপ্রায়ে। বিশেষত, একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, কাহিনিচিত্রের ইতিহাসে প্রথম সচেতন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার তিনিই। আর তার সঙ্গে এ কথাও প্রণিধানযোগ্য যে, আজও রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের আলোচনা করতে গেলে আইজেনস্টাইনের তত্ত্ব ও চলচ্চিত্রকে লোকাস (Locus) ধরে নিয়ে এগোতে হয়। তাই আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্র ও তত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা ও পুস্তক ইন্টারনেট ও গ্রন্থাগারে থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বিষয়ে এই ধারাবাহিক কলমে তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা না-বলে এগোনোর উপায় নেই।

আইজেনস্টাইন তাঁর সব ক-টি ছবিতেই রাজনীতির উপাদান খুঁজে নেন ‘জনগ’ বা মাস-এর মধ্য থেকে। আর এই কাজে তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস বলশেভিক বিপ্লব এবং অ্যাজিটপ্রপ  তথা কিনোপ্রাভদা। কিন্তু আইজেনস্টাইনের ছবিগুলি যেহেতু তথাকথিত বাস্তববাদী ছবি নয়, তাই জনগণ সেখানে সামাজিক-ব্যবহারিক সমষ্টি নয়; কিছুটা বিমূর্তএক প্রকার রাজনৈতিক শক্তির উৎস। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, আইজেনস্টাইনই প্রথম কাহিনিচিত্রনির্মাতা, যাঁর ছবির বিষয় এবং আঙ্গিক সর্বতোভাবে ‘জনগণ’ নির্ধারিত এবং এ কথাও সত্য যে, তাঁর ছবির উদ্দিষ্ট দর্শক ব্যক্তি-দর্শক নয়, সচেতনভাবেই সেই দর্শক হল সমষ্টি।

তাঁর দ্য ব্যাটলশিপ পোটেমকিন  ছবির ওডেসা দৃশ্যের কথা মনে করা যেতে পারে। ওডেসা বন্দরের সিঁড়িতে জমা হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। তারা এসেছে পোটেমকিন যুদ্ধ-জাহাজে বিদ্রোহীদের নেতা শহীদ ভাকুলিনচুককে শেষ অভিবাদন জানাতে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ জমা হয়েছে সেখানে শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ভবঘুরে, গৃহবধূ, নবদম্পতি, বৃদ্ধ, যুবক, শিশু। একটি মন্তাজ দৃশ্যে সারি সারি মানুষগুলোর মুখ দেখা যায় একের পর এক স্বল্প-দৈর্ঘ্যের শটে। বিচিত্র সব মুখের মেলা তাদের বিভিন্ন ধরণের পোশাক, কেউ হাসছে, কেউ হাত নাড়ছে, কেউ-বা টুপি খুলে নাড়ছে। গোটা মন্তাজ দৃশ্যটা ‘জনগণ’ নামক একটা সত্তা (entity)-কে গঠন (constitute)করছে। এ ছবি আইজেনস্টাইন নিয়েছেন ১৯০৫ সালের ব্যর্থ রুশ বিপ্লবের একটি ঘটনা থেকে। ১৯০৫ সালের বিপ্লব প্রত্যক্ষ অর্থে ব্যর্থ হলেও তা রাশিয়ায় ‘আধুনিক জনগণ’-এর অবয়ব গঠন করে দেয় ঐতিহাসিকভাবেযার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকবে পরবর্তী ১৯১৭-এর সফল বলশেভিক বিপ্লব

আইজেনস্টাইনের ছবিতে জনগনের স্বরূপ কী? কী-ই বা তাদের সামাজিক পরিচয়? প্রথম তিনটি ছবি দ্য স্ট্রাইক (১৯২৪), দ্য ব্যাটলশিপ পোটেমকিন (১৯২৫) এবং অক্টোবর (১৯২৮) ছবিতে যে জনগণকে আমরা দেখি, তারা শহরের শ্রমিক। যে শ্রমিককুল প্রথম  ছবিতে ধর্মঘট করে, দ্বিতীয় ছবিতে বিদ্রোহ করে, তৃতীয় ছবিতে দেখি তারা একটা সফল বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। এই জনগণের জন্ম হয়েছে আধুনিকতার গর্ভেযন্ত্র ও মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মাধ্যমে, প্রযুক্তি ও সমাজের মিথষ্ক্রিয়ায় এবং গতি ও দক্ষতার সমন্বয়ে। কোথা থেকে জন্ম নিচ্ছে জনগণ সম্পর্কিত এই ধারণা আইজেনস্টাইনের চিন্তনে? প্রথমত, বলশেভিক বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত সমাজে ও রাজনীতিতে তিনি প্রত্যক্ষ করছেন — জারের শাসন ও অভিজাততন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিয়ে উৎসারিত হচ্ছে নতুন শক্তিরক্ত-মাংসের শ্রমিক জনতা। দ্বিতীয়ত, মার্ক্সবাদ ও লেনিনের রাজনৈতিক সন্দর্ভ থেকে তাত্ত্বিকভাবে জন্ম হচ্ছে এই শ্রমিক জনতার। আর তৃতীয়ত, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির বিদ্যুচ্চমকের মতো সব কবিতার ছন্দ আর ইমেজারি থেকে নন্দনতাত্ত্বিকভাবে জন্ম হচ্ছে এই নতুন জনসমষ্টির, যারা যান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত:

Yesterday it was dozens,

today it’s hundreds,

tomorrow

thousands

into action rising,

till the whole working world

will start rumbling like thunder

and break

into an open uprising.

‘Vladimir Ilyich Lenin’, Vladimir Mayakovsky,

Vladimir Mayakovsky Selected Works: Longer Poems,

Moscow, Raduga Publishers, 1986. p.165

এই যান্ত্রিক ছন্দ, কাটাকাটা শব্দের মন্তাজ, শত-হাজার-সহস্রের বজ্রনির্ঘোষ আইজেনস্টাইনের প্রথম তিনটি নির্বাক ছবিতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

কিন্তু চলচ্চিত্রের পর্দায় একে রূপ দিতে গেলেই চাই উপযুক্ত অাঙ্গিক। বাস্তববাদের পেলব প্রজ্ঞা দিয়ে কাজ হবে না, চাই সূচ্যগ্র তীক্ষ্ন অস্ত্র। দৃশ্যের পিঠে দৃশ্য যোগ করলে হবে না, চাই নিরন্তর সংঘাত। একটা বিপ্লবোত্তর সমাজের চলচ্চিত্রে কেবল ধ্রুপদী মার্ক্সবাদ-বর্ণিত ‘কন্ট্রাডিকশন’ দেখালেই হবে না, কলিশন’ বা সংঘাতের মুহূর্তগুলিকে স্পষ্ট করে তুলতে হবে। যে বিপুল জন-শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে গেছে বিপ্লবে, তার উপস্থাপনা করতে গেলে চাই তীব্র গতিশীল একটা ফর্ম। হতাশা থেকে বিজয়, দুঃখ থেকে চরম আনন্দ, স্থিতি থেকে গতিআবেগের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে দর্শককে দ্রুত ও অব্যর্থভাবে চালনা করতে গেলে চাই গাণিতিক ক্যালকুলেশনে বাঁধা একটা টানটান অাঙ্গিকমন্তাজ।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের কয়েকটি শট পরপর সমান্তরালভাবে যুক্ত হয়ে একটি মন্তাজ দৃশ্যখণ্ড তৈরি হয়। কিন্তু দৃশ্যসমূহের নিপাট সংমিশ্রন এবং (সোভিয়েত) মন্তাজের ধরণ এক নয়। ছোটো ছোটো কয়েকখানা শট পর পর জুড়লে সফল মন্তাজ হয়ে উঠবে যদি তা সচেতনভাবে আখ্যান-অতিরিক্ত (আদর্শগত) তাৎপর্য প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। ১৯২০-র দশকে সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার লেভ কুলেশভ ও সেভোলদ পুদ্‌ভকিন প্রাথমিকভাবে সোভিয়েত চলচ্চিত্রের ধারণাটি গড়ে তোলেন। কুলেশভ একটি নৈর্ব্যক্তিক মুখের দৃশ্যের সঙ্গে বিভিন্ন বস্তুর ছবি আলাদা আলাদাভাবে জুড়ে তিন সেট পৃথক দৃশ্যখণ্ড নির্মাণ করলেন:

মুখ ও একপাত্র স্যুপ

মুখ ও কফিন

মুখ ও একটি বালিকা

তিনটি ক্ষেত্রে একই মুখের ছবি দর্শকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব প্রকাশ করে বলে মনে হল। তিনি বললেন, চলচ্চিত্রে একটি শটের অর্থ আপেক্ষিকতা নির্ভর করে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শটগুলির সঙ্গে ওই শটটির সম্পর্কের উপর। অর্থাৎ মন্তাজ হল চলচ্চিত্রের চারিত্র-বৈশিষ্ট্য।

পুদভকিন বললেন, ইঁটের পর ইঁট সাজিয়ে যেমন বাড়ি তৈরি হয়, শটের পর শট যুক্ত হয়ে তেমনি গড়ে ওঠে মন্তাজ, যা-কিনা আনন্দ, দুঃখ, বিদ্রোহ, ক্ষমতা, বন্দিত্ব, মুক্তি ইত্যাদি ভাবের অনুষঙ্গ তৈরি করে দর্শকের চোখে। কিন্তু কেবল অনুষঙ্গ বা  অ্যাসোসিয়েশন নয়, মার্ক্সীয় দর্শনের প্রেরণায় আইজেনস্টাইনের মন্তাজের মূলমন্ত্র হল কলিশন  বা সংঘাত। তাঁর মন্তাজে পর পর দুটি শটের আখ্যানগত ও আঙ্গিকগত উপাদানগুলির পারস্পরিক সংঘাতে দর্শকের চিন্তায় দানা বাঁধে তৃতীয় সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থশট ক শট খ অর্থ গ।

আইজেনস্টাইন মন্তাজ গঠনের পাঁচটি আঙ্গিকগত পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন। প্রথম, গাণিতিক মেট্রিক পদ্ধতি মেনে স্বল্পদৈর্ঘ্যের শটগুলিকে জুড়ে মন্তাজ দৃশ্যখণ্ডে গতির সঞ্চার করা হয়। দ্বিতীয়, শটের মধ্যে দৃশ্যমান চরিত্র ও বস্তুগুলির চলন এবং দৃশ্যপ্রবাহের গতির সংঘাতে মন্তাজ দৃশ্যখণ্ডে ছন্দ বা রিদ্‌ম সৃষ্টি করা হয়। তৃতীয়ত, মন্তাজে বিষয়বস্তুর একটি কাহিনিগত মূলভাব বা টোন প্রকাশিত হয়। চতুর্থত, গতি এবং/অথবা ছন্দের সঙ্গে মূল ভাব বা টোনের সংঘাতে উপসুর বা ওভারটোন দানা বাঁধে দর্শক-মনে। পঞ্চমত, সংঘাতের আঙ্গিকে মন্তাজে প্রকাশিত আখ্যানাংশ ও বিষয়বস্তু যে অর্থগত তাৎপর্য সৃষ্টি করে, তা দর্শকের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক চিন্তনে অভিঘাত সৃষ্টি করে। আইজেনস্টাইনের মতে, আখ্যান ও ভাবাদর্শের যৌথস্তরে দর্শক-মনে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করাই মন্তাজের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের রূপরেখা কীভাবে আইজেনস্টাইনের ধারণায় দানা বাঁধছে, তা বোঝা যায় তাঁর লেখা প্রথম দুটি চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখা মন্তাজ অব অ্যাট্রাকশনসএবং মন্তাজ অব ফিল্ম অ্যাট্রাকশনসপ্রবন্ধে। মন্তাজ অব অ্যাট্রাকশনস‘-এর প্রাথমিক ধারণাটি তিনি পাচ্ছেন সেভোলদ মেয়ারহোল্ডের প্রলেটকাল্ট থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র সের্গেই আইজেনস্টইন বিপ্লবের পরবর্তী বছর তাঁর পেশাদারি শিক্ষার আঙিনা চিরতরে ত্যাগ করে যোগ দেন মেয়ারহোল্ডের প্রলেটকাল্ট থিয়েটারে। সেখানে তাঁর কাজ ছিল সেট ডিজাইনিং।

প্রলেটকাল্ট থিয়েটারে মেয়ারহোল্ড বাস্তববাদ-বিরোধী এক ধারার প্রয়োগ ঘটাচ্ছিলেন নাটকে। সেই ধারা ছিল অ্যাট্রাকশনস-নির্ভর। মেয়ারহোল্ড মনে করতেন, বাস্তববাদী নাট্যচর্চার প্রেরণা হল বুর্জোয়া এনলাইটেনমেন্ট। এটা বিপ্লবী জনতার নাট্য-আঙ্গিক হতে পারে না। তিনি আঙ্গিকগত উপাদান খুঁজে পেলেন জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপাদান থেকে। কমেডিয়া দেল আর্তে, সার্কাস, ব্যালে, অ্যাক্রোব্যাটিক্স, মাইম, সস্তা কমেডি, জনপ্রিয় সংগীত, খেলাধূলা এবং প্যারোডিএইসব রংদার চাষাভুষোর সংস্কৃতি থেকে মেয়ারহোল্ড আহরণ করলেন তাঁর নাটকের উপাদান। তাঁর নাটকে থাকত না ড্রপসিন; মঞ্চসজ্জা দেখে প্রায়শই মনে হত যেন একটা ফ্যাক্টরি ওয়ার্কশপের অন্দর বা কিম্ভুত এক ইনস্টলেশন আর্ট। নাটকটা এগিয়ে চলত মজাদার উপাদানগুলির একটা সিরিজ হিসাবে। বাস্তববাদী অভিনয় বা নিটোল চরিত্রায়ণ সম্পূর্ণ বর্জন করা হত। প্রত্যেকটা দৃশ্যই হাসির উল্লাস ছড়াত দর্শকের মধ্যে। বিনোদন নয় ‘আমোদ’, কৌতুক নয় ‘হাসির হররা, মস্করা নয় ‘আক্রমণাত্মক শ্লেষ’এই ছিল মেয়ারহোল্ডের উদ্দেশ্য। আর এই অ্যাট্রাকশনগুলো বয়ে নিয়ে যেত রাজনৈতিক বক্তব্যকে। এই নাটকের উদ্দিষ্ট দর্শক ব্যক্তি নয়, মাস  বা জনতা।

প্রলেটকাল্ট থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে দুটি প্রধান জিনিসের পাঠ নিলেন আইজেনস্টাইন।আখ্যানের চরিত্রগুলিকে কীভাবে ব্যক্তি-চরিত্রের বুর্জোয়া আদল থেকে মুক্ত করে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বমূলক রূপ দেওয়া যায়। আইজেনস্টাইনের ছবিতে আমরা দেখি চরিত্রগুলো পোশাকে, অবয়বে, চলনে-বলনে, মুখভঙ্গিতে ও কার্যকলাপে এক একটি সামাজিক প্রতিরূপ। স্বাভাবিকভাবেই চরিত্রগুলির ব্যক্তি-মনস্তত্ত্ব একেবারে অনুপস্থিত। দ্য স্ট্রাইক  ছবির প্রথম দৃশ্যটি দেখা যাক : ছবি শুরু হয় লেনিনের একটি উক্তি দিয়ে। প্রথম দৃশ্যে এক ব্যক্তির ছবি দেখি, মাথায় হ্যাট, দামি পোশাক, নিটোল চকচকে গাল, মুখে সফিস্টিকেটেড ও নির্দয় হাসি। আমরা তার আগে কারখানার চিমনি দেখেছি। এবার দেখি কারখানার অন্দর, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। দেখি যন্ত্রের চাকাগুলো থেমে যাচ্ছে ফাঁকা হয়ে গেছে কারখানা, বাইরে কিছু সাধারণ পোশাক ও চেহারার মানুষের জটলা। আধো অন্ধকার ফাঁকা ফ্যাক্টরির মধ্যে এবার দেখি সিল্যুয়েটে দুটো মাথা কাছাকাছি আসে, ফিসফিস করে তারা কথা বলে। কেবল চেহারা, পোশাক, জেস্‌চার, নড়াচড়া এবং শটগুলির স্থানিক কনটেক্সট থেকে বুঝি চরিত্রগুলোকে। আমরা বুঝি এরা কারাকে কারখানার মালিক, কারা ধর্মঘটী শ্রমিক ও কারা গুপ্তচর। কোনো চরিত্রের নাম দরকার হয় না, তাদের ব্যক্তি-মনস্তত্ত্ব দরকার হয় নাকেবল তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান দিয়েই তাদের আমরা চিনতে পারি। 

রাজনৈতিক চলচ্চিত্র কীভাবে মতাদর্শগত প্রতর্ককে উপস্থাপন করতে পারে সে বিষয়ে আইজেনস্টাইনের ভাবনা চূড়ান্ত রূপ নেয়অক্টোবর ছবিতে।চরিত্রের ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক যুক্তির মধ্যে আখ্যানকে কীভাবে টেনে আনা যায় সেই লক্ষে আইজেনস্টাইন কাজ করেছেন। অক্টোবর  ছবি থেকে একটি মন্তাজ দৃশ্যখণ্ডের উদাহরণ দেওয়া যায়। বলশেভিক বিপ্লবের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে অক্টোবর  ছবিটি নির্মাণ করেন তিনি। ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারি বিপ্লব থেকে ওই বছরের অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত সময়কাল এ ছবিতে ধরেছেন আইজেনস্টাইন। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব জারকে অপসারিত করলেও ক্ষমতা কিন্তু চলে যায় মধ্যপন্থী দুর্বল ফেরেনস্কির প্রভিশনাল সরকারের হাতে। ওদিকে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। দুর্বল ফেরেনস্কির হাতে রাশিয়ার সীমান্ত বিপন্ন। দেশের অভ্যন্তরে চলছে খাদ্য সঙ্কট। অপদার্থক্ষমতালোভী অক্ষম ফেরেনস্কি, কিন্তু নির্বিকার বসে আছে উইন্টার প্যালেসে। বিপ্লব-বিরোধী, জনবিরোধী শক্তিগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতার খোয়াবে মগ্ন। অসাধারণ এই মন্তাজ দৃশ্যখণ্ডে আইজেনস্টাইন তুলে ধরেন ইতিহাস ও রাজনীতিকে। সপারিষদ ফেরেনস্কির ইমেজের সঙ্গে জাক্সটাপোজ করেন তিনি অনেকগুলি জড় বস্তুর ইমেজকেপানপাত্র, লাফিং বুদ্ধ, চার্চের গম্বুজ, ক্রশ, বিভিন্ন ধর্মীয় চিহ্ন, পুতুল, নেপোলিয়ানের মূর্তি, বেশ কয়েকটি ফ্যাশন-অবজেক্ট।কতকগুলো বস্তুর ইমেজ একটি মন্তাজে পরপর এমনভাবে স্থাপন করাহয় যে,একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দর্শক চিনে ফেলেন, সেখানে ফেরেনস্কির ভূমিকা এবং অবস্থাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেটোনমিক কতকগুলি চিহ্নকে (referent) ব্যবহার করে যেভাবে আইজেনস্টাইন একটা মতাদর্শগত অবস্থানকে ইতিহাসের  প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করেন তা চলচ্চিত্রে  মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রয়োগের একটি অনন্যসাধারণ  উদাহরণ।

 

 
 
top