নরেন্দ মোদির অর্থনীতি

 

মুখবন্ধ

নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ঘিরে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। গড়পড়তা পরিবারের আশা, মূল্যবৃদ্ধিতে এবার রাশ পড়বে, বাজারে গিয়ে দেখা যাবে প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই তাদের আয়ত্তের মধ্যে এসে গেছে। শিক্ষিত যুবক-যুবতির আশা, এবার চাকরির বাজার খুলে যাবে, যাকে ‘ডিসেন্ট জব’ বলে অর্থাৎ যাতে মাইনে ভালো এবং কাজ ছাড়লে সমমানের কাজ পাওয়া যায় অতি দ্রুত, সেগুলি পর্যাপ্ত সংখ্যায় পাওয়া যাবে সর্বত্র। অদক্ষ শ্রমের বাজার চাঙ্গা হবে একইসাথে—এই প্রত্যাশাও আছে গ্রাম-শহরের সমস্ত স্বল্প শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের। অন্যদিকে, কর্পোরেট পুঁজির আশা, অর্থনৈতিক সংস্কারে বকেয়া যে সব কাজ পড়ে আছে ‘নীতিপঙ্গুত্বের কারণে’, মনমোহন সিংয়ের সরকার যা করে উঠতে পারেনি, সেগুলির এবার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। সারা ভারত জুড়ে আবার এ সবের সঙ্গে আছে এই আশা যে, প্রশাসন এবার দুর্নীতিমুক্ত হবে, ঘোটালা বন্ধ হবে, কালো টাকা উদ্ধার করা যাবে। প্রত্যাশার ফিরিস্তি আরও লম্বা করা যায়। মোটের ওপর সবারই ধারণা, ভারতে এবার সুদিন আসছে। আসছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। মোদির সরকার হবে অন্যরকম সরকার এবং তাতে দেশের ভালোই হবে।

কোনটা কতটা করে উঠতে পারবে নরেন্দ্র মোদির সরকার, সে নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সমস্যাগুলো কোথায় এবং সেগুলোর মোকাবিলা করতে মোদিকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হবে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মোদির পক্ষে কী করা সম্ভব, কী সম্ভব নয়—সেসব নিয়ে কিছু কথা অবশ্যই বলা যায়। বর্তমান প্রবন্ধে সেই কথাগুলোই বলা হবে।

সাধারণ মানুষের যা প্রত্যাশা সে প্রত্যাশা পূরণে মোদি কতটা সফল হবেন, সেটা আলোচনা করার আগে এ দেশের কর্পোরেট সেক্টরের সাধ এবং সাধ্য নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। এ দেশের অর্থনৈতিক যা কিছু সমস্যা আছে, নয়া উদারবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে তার মূল জায়গাটা হল পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা। এঁদের মতে, পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হলে এ দেশের বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ বাড়লে একদিকে উৎপাদন বাড়বে অন্যদিকে শ্রমের বাজারও চাঙ্গা হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির হাত ধরে আসবে আয়বৃদ্ধি আর আয়বৃদ্ধি ঘটলে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যও বেড়ে যাবে কর্মরত শ্রমজীবীদের। ভারতে এটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটছে না, অর্থাৎ যথেচ্ছ বিনিয়োগ ঘটছে না, কারণ এ দেশে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের পথে যে সব প্রাতিষ্ঠানিক অসুবিধাগুলি আছে, নীতিপঙ্গুত্বের কারণে সেগুলি আজও দূর করা যায়নি। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। আয়বৃদ্ধি এবং নিয়োগবৃদ্ধির হারেও তাই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ত্বরণ ঘটছে না। দেশের সাধারণ মানুষ সঙ্কটে পড়ছেন এর ফলে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এটা প্রথমে বুঝতে হবে যে, বিনিয়োগ করার মূল ক্ষমতা আছে দেশি এবং বিদেশি কর্পোরেটগুলির হাতে। এরা যাতে এ দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়, সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ঘটাতে হবে সেটা মাথায় রেখে। নানা কারণে এতদিন এই সংস্কারের কাজটা ঠিকমতো করা হয়নি। বিকাশপুরুষ নরেন্দ্র মোদির কাছে কর্পোরেটের প্রত্যাশা, মোদি এই সমস্যাটা বুঝবেন এবং অতি দ্রুত এমন সব সংস্কার ঘটাবেন, যাতে কর্পোরেট পুঁজি এ দেশে আরও বেশি করে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। কোম্পানি আইন, শ্রম আইন, জমি অধিগ্রহণ আইন—এ সবে কর্পোরেট যা চায় সে ধরণের সংস্কার ঘটাতে হবে। আইন বদলালে কর্পোরেট হাউসগুলো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এর ফলে। বিনিয়োগের সমস্যা, আয়বৃদ্ধি না হওয়ার সমস্যা—সবই মিটে যাবে যদি বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এ দেশে। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির এটাই হল মূল কথা।

এই ধরণের যুক্তি কাঠামো নিয়ে সমস্যা আছে। বিনিয়োগ বাড়লেই নিয়োগ বাড়বে—অর্থনীতি অতটা সরল পথে না চলতেই পারে। নিয়োগ বাড়িয়ে নতুন প্রযুক্তিতে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে, এটা তো শ্রমিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অঙ্গ হয়ে গেছে। তাছাড়া, পাদ-অর্ঘ্য দিয়ে বরণ করলেও কর্পোরেট পুঁজি যে বিনিয়োগে যথেষ্ট আগ্রহী হয় না, গত কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি অহরহ সে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। বিনিয়োগ এবং আয়বৃদ্ধি ও নিয়োগবৃদ্ধির আন্তঃসম্পর্কটি অতটা সরল নয়। কিন্তু সে যাই হোক, ধরা যাক নয়া উদারবাদ-নির্ধারিত পথেই মোদি সব সংস্কার করে ফেললেন। কী ঘটতে পারে তার ফলে? জগদীশ ভাগবতী, অরবিন্দ পানাগরিয়া মার্কা অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। ফলত, আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ত্বরণ আসবে, উৎপাদনে ত্বরণ এলে নিয়োগ বৃদ্ধি হবে, আয় বাড়বে, দেশ স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিদেশি কর্পোরেটের কথায় পরে আসছি। দেশি কর্পোরেটের হাত ধরে আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির আয় এবং নিয়োগবৃদ্ধির স্বপ্ন যাঁরা দেখান, তাঁদের মনে রাখা দরকার, এ দেশের কর্পোরেট বছরে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তা পায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে। এই সহায়তার পোশাকি নাম ইনসেন্টিভ‘ (ওটা সাবসিডিনয়, ‘সাবসিডিবা ভর্তুকি পায় ইতরজনেরা, আম্বানীরা পায় ইনসেন্টিভবা উৎসাহভাতা )। এত ইনসেন্টিভ পাওয়ার পরও তাঁদের ব্যবসার টাকা যোগাড়ের দায় নিতে হয় সমাজকে, সরকারি ব্যাঙ্কে জমানো সাধারণ মানুষের টাকা যায় তাঁদের কাছে ঋণ হিসেবে। ঋণের বদলে সুদ পাওয়ার কথা ব্যাঙ্কগুলোর। সুদ দূরে থাক, আসলই ফেরত পাওয়া যায় না এদের কাছ থেকে। এ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলিকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে এই ছোটো কর্পোরেটগুলি। এদের দেনার দায় নিয়ে কেউ যাতে উচ্চবাচ্য না করতে পারে সেজন্য আছে কর্পোরেট ডেট রিস্ট্রাকচারিং - যার মোদ্দা কথা হল, দেনার দায়টা তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে উসুল করা যাবে না। ঋণের ওপর আরও ঋণ দেওয়া হবে। বকেয়া ঋণ উসুল করার সমস্যাটা যাতে ধামাচাপা দেওয়া যায়, তার জন্য। স্টেট ব্যাংক এবং ইউবিআই-এর ৮০০ কোটি টাকা গিলে ফেলে মালিয়া বহাল তবিয়তে মদের ব্যবসা আর মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করতে পারে। কিংফিশার এয়ারলাইন্সের কর্মচারী মাইনে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেও ওই মদ ব্যবসার টাকায় হাত দেওয়া যাবে না কিংফিশারের বকেয়া ঋণ উসুল করার জন্য। ব্যাঙ্করা করবে কর্পোরেট ডেট রিস্ট্রাকচারিং, কর্পোরেটের চাঁই মুকেশ আম্বানী কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিনের গ্যাস লুঠ করবে। ওএনজিসি ওই গ্যাসে হাত দিতে পারবে না। তারপর আবার লোকসান সামলাতে ক্রমাগত ওই গ্যাসের দাম বাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মোটামুটি এই হল এই দেশের কর্পোরেটের চেহারা। এ দেশের কর্পোরেট হল রাষ্ট্রের ঘাড়ে বসা কর্পোরেট - রাষ্ট্রকে এদের ঘাড়ে নিয়ে চলতে হবে। নেহরু যুগ থেকেই এই কালচার গড়ে উঠেছে এবং সেটাই চলছে দিনের পর দিন। বাজারমুখী সংস্কার মারফত ছোটো কর্পোরেট হাউস দিয়ে চমকপ্রদ সাফল্য পাওয়া যাবে, এ কথা যাঁরা বলেন তাঁরা বাজারের নিয়ম কতটা বোঝেন জানি না। তবে এ দেশের কর্পোরেটের হাল হকিকত সম্পর্কে এঁরা যে চরম অজ্ঞ না-হয় এই লুঠেরাদের বেতনভুক কর্মচারী এঁরা - এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

মোদি যদি বাজারমুখী আরও সংস্কার মারফত দেশি কর্পোরেট লগ্নি দিয়ে বিনিয়োগে ত্বরণ ঘটাতে চান, তাহলে তাঁকে সবার আগে এই কর্পোরেট হাউসগুলির রিস্ট্রাকচারিং করতে হবে। সরকারি সুবিধে আদায় করে ব্যবসায় টিঁকে থাকার রোগের চিকিৎসা হল, সব সুবিধে বন্ধ করা এবং নিয়মকানুনগুলো স্বচ্ছ এবং জনমুখী করা, যাতে আম্বানী বা বিজয় মালিয়ারা বুঝতে পারে যে, নিজেদের অদক্ষতার দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপানোর দিন শেষ, নিজেদের অদক্ষতার দায় নিজেদেরই বহন করতে হবে, দিল্লির মন্ত্রকগুলিতে নিজেদের লোক বসিয়ে নিজেদের অদক্ষতার দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চালান করা আর সম্ভব হবে না। মোদি এই ধরণের সংস্কার করতে চান কি? লৌহপুরুষের এতটা বুকের পাটা আছে কি? আদৌ না। আজ পর্যন্ত মোদির মুখে কর্পোরেটের কোনো সমালোচনা শোনা যায়নি। সংস্কার অবশ্যই করতে হবে, তবে এ দেশের কর্পোরেট যা চাইছে তেমন নয়। কোম্পানি আইন, শ্রম আইন এবং ব্যাঙ্কের খেলাপি ঋণ উদ্ধারের যে আইনি ব্যবস্থা তাতে নির্দিষ্ট সংশোধনী এনে এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে কর্পোরেট হাউসগুলো এটা বুঝতে বাধ্য হয় যে, ক্রনি ক্যাপিটালের যুগ শেষ হয়েছে ভারতবর্ষে। কে নেবে এই ধরনের সংস্কার আনার ঝুঁকি? নরেন্দ্র মোদি? যাঁকে এ দেশের কর্পোরেট সাজিয়ে গুছিয়ে দিল্লিতে বসিয়ে দিয়েছে? প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় মোদি সরকারের পক্ষে সেরকম কিছু করা সম্ভব নয় বরং যেটা ঘটবে, তা হল এরা যাতে আরও ইনসেন্টিভ পায় তার জন্য কর্পোরেটের করহার আরও কমিয়ে দেওয়া এবং ব্যাঙ্কের সুদের হার আরও কমিয়ে আনা যাতে আরও মোটা টাকা ধার করতে পারে কর্পোরেট হাউসগুলো। যে টাকা তারা গিলে ফেলবে এবং তারপরে তাদের জন্য আবার ডেট রিস্ট্রাকচারিং হবে। সুদের হার সম্ভবত কমানো হবে অতি দ্রুত, যাতে এরা সস্তায় ঋণ নিতে পারে। টাকা শোধ করার দায়ও কমানো হবে ছলে-বলে-কৌশলে। এত অর্থব্যয় করে মোদিকে ক্ষমতায় আনার কাজটা এ দেশের কর্পোরেট হাউসগুলো অকারণে যে করেনি তা প্রমাণিত হবে অতি দ্রুত।

বিদেশি পুঁজি কতটা সদয় হবে? নরেন্দ্র মোদি এমন এক সময় ক্ষমতায় এসেছেন, যখন ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজার মন্দা। ওসব পণ্য রপ্তানি করে আভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর সুযোগ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় যতটা ছিল, এখন আর ততটা নেই। তারপর আবার সারা বিশ্ব জুড়েই নেমেছে চিনা পণ্যের আক্রমণ। এমনকী ভারতের আভ্যন্তরীণ বাজারও চিনা পণ্যের জেরে বাড়ছে। এই অবস্থায় এ দেশের এই সরকারনির্ভর খুঁড়িয়ে-হাঁটা কর্পোরেটের জন্য নানা ইনসেন্টিভ দিলেও তার সুফল মিলবে না বাঞ্ছিত মাত্রায়। রপ্তানি-নির্ভর পণ্যের বাজারের ওপর নির্ভর করে বিদেশি পুঁজিও এ দেশে তার বিনিয়োগ বাড়ানোর ঝুঁকি নেবে না - রপ্তানির বাজারই যেখানে মন্দায় ধুঁকছে, সেখানে ভারতে কারখানা বসিয়ে নতুন করে উৎপাদন করার ঝুঁকি কেন নেবে বিদেশি পুঁজি? তা-ও যদি এমন হত যে ভারতের শ্রমিক অনেক বেশি উৎপাদনকুশল, বিদেশি পুঁজি কিছুটা ঝুঁকি হয়তো নিত। এ দেশের শ্রমিকের উৎপাদন কুশলতার মান এখনও নিম্নস্তরেই বাঁধা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য উৎপাদনে যেসব ক্ষেত্রে কম উৎপাদনকুশল শ্রমের প্রয়োগেই কাজ চলে যায়, পরিচালন শাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে বলে লো-এন্ড জব। ভারতবর্ষের শ্রমজীবির একটা বিপুল অংশ সেই স্তরের উৎপাদনকুশলতায় বাঁধা আছে। বৈদেশিক বাজারে যেসব পণ্যে এই লো-এন্ড জব‘-এর আধিক্য আছে, ভারতের শ্রমজীবিদের সস্তা শ্রম কাজে লাগিয়ে এ দেশে সেসব পণ্য উৎপাদনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ হতেই পারত। কিন্ত সে ক্ষেত্রেও আছে প্রবল প্রতিযোগিতা, যে প্রতিযোগিতায় ভারতবর্ষ খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারছে না। উদাহরণ হিসেবে পোশাক-পরিচ্ছদের আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলা যায়। এ বাজার এখনও, এই মন্দার সময়েও, বেশ ভালো। কিন্তু সেখানেও ভারতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। মায়ানমার এবং ভিয়েতনাম থেকেও আসছে বিপুল প্রতিযোগিতা। ভারত যে সব ক্ষেত্রে সুবিধেজনক অবস্থায় নেই, এই পরিপ্রেক্ষিতে রপ্তানিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের জন্য এদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ঢল নামবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আসতে পারে এদেশের আভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হলে। জগদীশ ভাগবতী ও অরবিন্দ পানাগরিয়ার মতে এ বাজার চাঙ্গা হবে না, এ বাজার চাঙ্গা করতে হলে অমর্ত্য সেন যে ধরণের পরামর্শ দিয়েছেন, ভারতের অর্থনীতিকে সে পথে পরিচালিত করতে হবে। রাতারাতি তাতে সাফল্য আসবে না, কিন্তু ধৈর্য ধরে সে পথে বিনিয়োগ ঘটালে ধীরে ধীরে এদেশে একটা মজবুত অর্থনীতি গড়ে উঠবে। এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় মূল গুরত্ব থাকে সামাজিক ক্ষেত্রে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা) বিনিয়োগে। সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক ঠিক কী, পরবর্তী কোনো এক প্রবন্ধে তা আলোচনা করা যাবে। এখানে এটুকু উল্লেখ করা দরকার যে, কর্পোরেট নির্দেশিত সংস্কারের পথে যে ‘সুদিন’-এর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, প্রবল সম্ভাবনা এই যে, সে সুদিন অধরাই থেকে যাবে সাধারণ ভারতবাসীর কাছে।

নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত সরকারি উদ্যোগগুলির বিলগ্নিকরণ, বিশেষত ব্যাঙ্ক, বিমা বেসরকারিকরণের বকেয়া কাজটা অতি দ্রুত করে ফেলবেন। সেনসেক্স যে ঊর্ধ্বমুখী, তার কারণ এটাই। এর ফলে ভারতে কতটা সুদিন আসবে, কতটাই বা এই সম্ভাবনা যে, ব্যাঙ্ক-বিমায় যে অর্থ পুঞ্জিত হয়ে আছে তা লুঠপাট হয়ে ২০০৮ সালে ইউরোপ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষকে যেভাবে পথে বসানো হয়েছিল, সেটাই ঘটতে চলেছে ভারতবর্ষে - এসব নিয়েও আলোচনা করা দরকার। এই প্রবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে সে আলোচনা সম্ভব নয়। এটিও স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধে আলোচনা করার ইচ্ছে আছে।

ভূমিকা

এ কথা বহুল প্রচারিত যে গত লোকসভা নির্বাচনে দেশি এবং বিদেশি কর্পোরেট পুঁজি নরেন্দ্র মোদির সমর্থনে ব্যাপক প্রচার সংগঠিত করেছিল, কংগ্রেসের ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র বিরুদ্ধে ‘বিকাশ পুরুষ’ নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি নির্মাণে বিপুল অর্থব্যয় করেছিল তারা। দেশজুড়ে যে ‘মোদি হাওয়া’ উঠেছিল, সেই হাওয়া তৈরির পেছনে এই কর্পোরেট পুঁজি একটি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। বলা বাহুল্য, বিনা কারণে কর্পোরেট পুঁজি এই অর্থব্যয় করেছিল এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নয়া উদারবাদী পথে সংস্কার ঘটানোর বকেয়া কাজটা ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র কারণে, নাকি কংগ্রেস যা যা করে উঠতে পারছিল না, কর্পোরেট ভাবছিল, ‘বিকাশ পুরুষ’ মোদিকে দিল্লির গদিতে বসিয়ে সেই কাজটা স্বচ্ছন্দে করে ফেলা যাবে। এটা ভাবার পিছনে অবশ্যই কারণ ছিল। সীমিত ক্ষমতার মধ্যে একটি রাজ্য সরকার যে পরিমাণে কর্পোরেট-বান্ধব হতে পারে, মোদির গুজরাট ছিল ততটাই কর্পোরেট-বান্ধব। কর্পোরেটের আশা ছিল, গুজরাটের এই কর্পোরেট-বান্ধব মুখ্যমন্ত্রীকে দিল্লির ক্ষমতায় আসীন করতে পারলে তাদের যা আকাঙ্ক্ষা তার পুরোটাই চরিতার্থ হবে—নয়া উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো করে ফেলা যাবে অনায়াসে। কর্পোরেটের এই ভাবনা কতটা পূরণ করতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি, নয়া-উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজটা কত দ্রুত করা সম্ভব মোদির পক্ষে - এই সব নিয়েই আলোচনা করব বর্তমান প্রবন্ধে।

অর্থনীতির হাল হকিকৎ ও কংগ্রেসের ‘নীতিপঙ্গুত্ব’

এ দেশের কর্পোরেট পুঁজি, বিদেশি পরামর্শদাতা এবং বাজার-মৌলবাদী বিশেষজ্ঞরা প্রায় সকলেই একমত হয়ে এ কথা ক্রমাগত প্রচার করছিলেন যে, ভারতের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একমাত্র উপায় হল আরও বেশি বাজারমুখী সংস্কার, দ্বিতীয় ইউপিএ-র জমানায় কংগ্রেস যা আদৌ করে উঠতে পারছিল না। এই প্রচার শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় ইউপিএ-র সময় থেকে আর তুঙ্গে উঠেছিল ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন আসন্ন হয়ে পড়ে। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে তাড়িয়ে চিদম্বরমের হাতে বিত্তমন্ত্রক তুলে দেওয়ার পর কিছুদিন এই বাজার-মৌলবাদীরা এই আশায় বুক বেঁধে ছিল যে, মনমোহন-চিদম্বরম এবং মন্টেক আলুওয়ালিয়ার টিমটার ক্ষমতা বাড়বে কংগ্রেসে এবং এই তিনজনই যেহেতু মতাদর্শের দিক থেকে বিশ্বব্যাঙ্ক-আইএমএফ-পন্থী, যে মাত্রায় নয়া-উদারবাদী সংস্কার তারা চায়, সে সংস্কার এবার করে ফেলবে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার। দেখা গেল, বাঞ্ছিত মাত্রায় সংস্কার করতে এই টিমটিও ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছে৷ বিমা বিল আটকে গেল, ভারতীয় মুদ্রার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরযোগ্যতা আসার ব্যাপারে একটা কথাও বলতে পারলেন না চিদম্বরম, খুচরো ব্যাবসায় বিদেশি বিনিয়োগের আইনটা কোনমতে লাগু করা গেল বটে, তবে ওটা নিয়ে বাস্তবে যে কোনো কিছুই হয়ে উঠবে না, এটা স্পষ্ট হয়ে গেল৷ পরিকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের রাস্তা খোলা, খনি বেসরকারিকরণ, কৃষ্ণা-গোদাবরীর বেসিন থেকে গ্যাস উত্তোলন—এগুলো করার চেষ্টা করা হল বটে, কিন্তু একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে উঠতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেল যে, সংসদে নাজেহাল হওয়া প্রধানমন্ত্রী একেবারে বোবা হয়ে বসে থাকলেন। সংস্কার যে আর করার সাধ্য নেই এই চিদম্বরম-মনমোহন-মন্টেক গোষ্ঠীর, এ ধারণা বধ্যমূল হয়ে পড়ল এই বাজার-মৌলবাদীদের মধ্যে। এটা হলেও না হয় আরও অপেক্ষা করার ধৈর্য্ দেখাতেন এঁরা। কিন্তু দ্রুত কমতে থাকা জনপ্রিয়তার চাপে পড়া কংগ্রেস এবার আসন্ন লোকসভা নির্বাচন মাথায় রেখে হাঁটল উলটো পথে। সোনিয়া গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেস তার জনপ্রিয়তার হৃত জমি পুনুরুদ্ধারের তাগিদে আনতে গেল খাদ্য নিরাপত্তা আইন—বাজার-মৌলবাদীদের গুরুঠাকুর জগদীশ ভাগবতী যাকে বললেন ‘বিষবড়ি একশো দিনের কাজের আইনটার জনপ্রিয়তার ওপর ভড় দিয়ে প্রথম ইউপিএ থেকে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার গড়ার মতন জনসমর্থন পেয়ে গিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস—কংগ্রেসের যে লবিটি এটা মনে করত, সংকটে পড়া দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারকে উদ্ধার করার জন্য তাদের পরামর্শ ও চাপে সোনিয়া গান্ধি উঠে পড়ে লাগলেন এই আইনটি পাশ করতে। দ্বিতীয় ইউপিএ গড়ার সময় কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহারে প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল এই খাদ্য নিরাপত্তা। ইচ্ছা থাকলেও, নানাভাবে প্যাঁচ কষে সুবিধে করতে না পারার ফলে মনমোহন-মন্টেকরা এটা মেনে নিলেন এবং চিদম্বরম তাঁর শেষ বাজেটে এই বাবদ কিছু টাকা ধার্য করতেও বাধ্য হলেন। কিন্তু এর নিট ফল দাঁড়াল এই যে, কর্পোরেট পুঁজি এবার মনমোহনের বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়ল। সোনিয়া গান্ধির নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস যে এর ফলে কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে কামান দাগতে নামল, এমন নয়। কংগ্রেস র‍্যাডিকাল দল নয়। কংগ্রেস নয়া-উদারবাদী সংস্কার চায় না, এমনও নয়। সংস্কারপন্থী কংগ্রেস যেমন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে ‘একশো দিনের কাজ’-কে অধিকারভিত্তিক আইনের মর্যাদা দিয়েছিল, খাদ্য নিরাপত্তা আইনটিও তেমনই এই দলটি লাগু করতে গিয়েছিল কোনোমতে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। কংগ্রেস তাই কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে একটা কথাও বলল না। যুদ্ধটা দাঁড়িয়ে গেল একতরফা। এই যুদ্ধে কর্পোরেট ভরসা করল ‘বিকাশ পুরুষ’ নরেন্দ্র মোদির ওপর। ‘মোদি নির্মাণ’-এর জন্য তারা যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করল। বস্তুত ইতিপূর্বের কোনো নির্বাচনে কর্পোরেট পুঁজি এবং তাদের মিডিয়া এইভাবে একটি ব্যক্তির পিছনে দাঁড়িয়ে যায়নি। মোদির বিজেপি জয়ী হল বিপুলভাবে, সরকার চালানোর জন্য নরেন্দ্র মোদিকে এবার মোর্চা শরিকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। কোয়ালিশন রাজনীতির বাধ্যবাধকতা সংস্কার সাধনের পথে আর অন্তরায় হয়ে উঠবে না। এক কথায় কর্পোরেট পুঁজি যা চায়, সেটাই হয়েছে। সুতরাং এবার ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র অবসান ঘটবে, সংস্কারের রথ চলবে অপ্রতিহত গতিতে। মোদি যখন ক্ষমতায় এলেন, এটাই তখন দাঁড়াল কর্পোরেট ধারণা। সেনসেক্স যে লাফিয়ে লাফিয়ে এক চূড়া থেকে অন্য চূড়ায় উঠতে লাগল, তাঁর পিছনে কাজ করেছে এই ধারণা-সৃষ্ট প্রত্যাশা।

আমাদের ধারণা, যাঁরা এই ‘বিকাশ পুরুষ’-এর নামে জয়ডঙ্কা বাজাচ্ছেন, ভারতের অর্থনীতি বাস্তবে কী অবস্থায় আছে এবং এই অবস্থাটি কী ধরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে নীতি-নির্ধারণের জন্য, সেটা ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারছেন না। এটা উপলব্ধি করতে হলে কংগ্রেসের যে ‘নীতিপঙ্গুত্ব’ নিয়ে এত সমালোচনা করা হয়েছে, সেটাকে আলোচনায় আনতে হবে। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস নয়া-উদারবাদ বিরোধী; এটা ভাবারও কোনো কারণ নেই যে জাতীয় কংগ্রেস সেই নেহরু যুগের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার দায় বহন করছে অদ্যাবধি আর সেই কারণেই এই দলটির বাজারমুখী সংস্কারের বিষয়ে দ্বিধা আছে। এদেশে বাজারমুখী সংস্কার ঘটানোর কাজ শুরু করে নরসিংহ রাও-এর কংগ্রেস সরকার৷ রাজীব গান্ধির কংগ্রেস শাসনের শেষ দিকেই অর্থনীতি এই দিশায় তার যাত্রা শুরু করে, এ কথাও বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালের কংগ্রেস সরকারগুলিও সুযোগ এবং সুবিধামতো সেটাই চালিয়ে যায়। এই কাজে কংগ্রেসের দায়বদ্ধতা যে কতটা গভীর, একটা ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়। মনমোহন সিং-এর প্রথম ইউপিএ সরকারের ওপর বামপন্থীদের চাপ থাকায় সংস্কারের কাজটা যে ঠিকমতো করা যাচ্ছিল না এবং বামপন্থীদের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করায় কংগ্রেস যে এই সংস্কারের কাজ আরও ভালো করে করতে পারবে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে সে কথা ঘোষণা করেছিলেন। যাই হোক, একটা কথা তবুও উল্লেখ করতে হবে যে, এক ধাক্কায় সব সংস্কার সাঙ্গ করার বদলে কংগ্রেস নিয়েছিল ধীরগতিতে সংস্কার ঘটানোর লাইন, যেটার একটা কারণ এই যে জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের মধ্যে আছে নানা ধরণের সামাজিক শক্তির টানাপোড়েন, যার দরুণ কংগ্রেসকে নিতে হয় মধ্যপন্থা (প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই মধ্যপন্থার সবচেয়ে বড়ো প্রতিনিধি, যে কারণে জাতীয় কংগ্রেসে প্রণব মুখোপাধ্যায় সবসময়ই ছিলেন অপরিহার্য)। কোয়ালিশন রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক সময় সংস্কারের গতি মন্থর হয়েছে। কংগ্রেস সরকার ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-য় ভুগছিল, এ কথা যদি সত্যিও হয়, তার জন্য এটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, জাতীয় কংগ্রেস কর্পোরেট পুঁজিকে তুষ্ট করার মতো নয়া-উদারবাদী সংস্কার করে উঠতে পারছিল না, কারণ এই দলটি সংস্কারের পথ থেকে পিছু হটতে চাইছিল। এটা বরং মনে রাখা ভালো যে, চাইলেও কংগ্রেসের পক্ষে সে সময় এর বেশি কিছু করা সম্ভব হত না। কেন এ কথা বলছি সেটা আমরা ব্যাখ্যা করব। কিন্তু সে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে এ কথা উল্লেখ করা দরকার যে সময়টা যদি না বদলায়, কোনো এক বিকাশ পুরুষকে গদিতে বসালেও আশ্চর্য বা চমকপ্রদ কিছু ঘটবে না। বরং সংকট আরও তীব্র হবে, দেশটা পড়বে আরও গভীর অর্থনৈতিক সমস্যায়।

যাই হোক, কংগ্রেস কেন শেষ দিকে কোনো সংস্কারই করে উঠতে পারছিল না? কারণটা এই যে, অর্থনীতি তখনও এমন একটা সংকটে পড়েছিল যে চাইলেও তখন সংস্কারের গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল না। জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার নেমে এসেছিল ৪.৭ শতাংশে, মূল্যবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশর নীচে নামছিল না, চলতি খাতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ৮৮.২ বিলিয়ন ডলার, জাতীয় আয়ের ৪.৭ শতাংশ। টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছিল অতি দ্রুত, যেটা রোধ করতে মুক্ত অর্থনীতির জমানায় যা করা উচিত নয়, নিরুপায় ভারত সরকারকে সেই কাজটাই করতে হয়েছিল: আমদানির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আনা হয় ২০১৩-১৪ আর্থিক বর্ষে (যা এখনও বলবৎ আছে), যার দরুণ আগের আর্থিক বৎসরের তুলনায় আমদানি কমে ৮.শতাংশ। যে দেশে মূল্যবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশের ওপরে আর যে দেশের মুদ্রার ঘটছে ক্রমিক অবমূল্যায়ন, বিদেশি পুঁজি সে দেশে কম আসবে, এটাই মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম। যাবতীয় সংস্কার সাঙ্গ করে ফেললেও বিদেশি পুঁজি সে দেশে আসবে না, বরং পারলে তা সে-দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করবে। কারণটা সোজা। বিদেশি বিনিয়োগকারীর আশঙ্কা থাকবে তার লাভের অঙ্কটা মূল্যবৃদ্ধি আর মুদ্রার অবমূল্যায়নের দরুন কমে যাবে। এমনকী তার বিনিয়োগের প্রকৃত অঙ্কটিও ফেরৎ নেওয়ার সময় ডলারে বিনিময় করলে দেখা যেতে পারে যে তার আসলটাও পুরোটা উসুল হল না। বস্তুত ২০১৩-১৪ সালে এসবের জন্যই এদেশে নিট বিদেশি পুঁজি যা এসেছিল তার সংখ্যাটি ছিল আগের বছরের প্রায় অর্ধেক (৪৭.৯ বিলিয়ন ডলার, আগের বছর এই সংখ্যাটি ছিলো ৯২.০ বিলিয়ন ডলার)। ‘নীতিপঙ্গুত্ব’ নয়, অর্থনীতির অবস্থানটাই ছিল বিদেশি লগ্নি কমে যাওয়ার কারণ। দেশি বিনিয়োগকারীরাও এ বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি নেবে না, কারণ বাজার যেখানে মন্দা সেখানে বিনিয়োগ করাটা আহাম্মকি। ঘটনা এটাই যে, এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক টাকা নিয়ে বসে থাকলেও বিনিয়োগকারীর দেখা মিলবে না। যারা আসবে তাদের ধান্দা থাকবে ব্যাঙ্কের টাকা ধার নিয়ে চম্পট দেওয়ার কিংফিশার এয়ারলাইন্স যা করেছিল। এই প্রবণতাই বাড়ছিল এ দেশে এবং একদল তোষামুদে পুঁজিপতি রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি ব্যাঙ্কের টাকা লুঠ করছিল আর সেই টাকায় ‘টু-জি স্প্রেকট্রাম’ থেকে ‘কোল ব্লক’ কেনার নামে জনগণের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছিল। এটা ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র জন্য ঘটছিল, এমন নয়। প্যাঁচে পড়া অর্থনীতিতে এটাই ঘটে।

কেন এটা ঘটল? এ নিয়ে সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করার বদলে এই লুঠেরা পুঁজিপতিরা এই ধুয়ো তুলল যে, আরও বেশি করে বাজারমুখী সংস্কার না করলে এই অবস্থার অবসান হবে না। কংগ্রেস ততদিনে এটা বুঝে গেছে যে এই অবস্থা চললে পরবর্তী নির্বাচনে তারা জিতবে না - এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে বাজারমুখী আরও সংস্কারেও কোনো লাভ হবে না। মন্দা কাটানোর একটা উপায় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি ঘটানোর চেষ্টা করা—সরকারি খরচ বাড়িয়ে যা করা সম্ভব৷ নয়া-উদারবাদীরা একেবারেই তা চায় না। তারা মনে করে, এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। তাদের মতে উচিত হল যোগান বাড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারি পুঁজিকে আরো ছাড় দেওয়া, আরো বাজারমুখী সংস্কার ঘটানো। মুশকিল হল, বাজার না থাকলে বেসরকারি পুঁজি নতুন বিনিয়োগে ভরসা পায় না, হাজাররকম ছাড় দিলেও তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চায় না। এই অবস্থায় বাজার চাঙ্গা করতে সরকারকেই খরচ বাড়িয়ে চাহিদা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হয়। কংগ্রেস সে চেষ্টাই করছিল। লক্ষ্যণীয় এই যে, ক্ষমতায় আসার পর, এত হম্বিতম্বির পর, অরুণ জেটলিকেও একই পথে হাঁটতে হয়েছে। সরকারি বাজেটে তার প্রমাণও আছে। ২০১৩-১৪ সালে চিদম্বরমের বাজেটে সরকারের মোট খরচ ধার্য করা হয়েছিল ১৫ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যেটা ছিল তার আগের বছরের বাজেট থেকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। জেটলির প্রথম বাজেটে খরচের অঙ্কটি ধার্য হয়েছে ১৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা—অর্থাৎ এর ওপর আরো ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি খরচ করবেন জেটলি—যিনি নাকি চান সরকারের খরচ কমিয়ে বেসরকারি পুঁজির পরিসর বাড়িয়ে বাজারমুখী সংস্কারের গতি বৃদ্ধি করতে !

অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাসৃষ্ট এই পরিস্থিতির মূল্যায়ন বাজার-মৌলবাদীরা করতে চান না। কেন তাঁরা এটা চান না, এ প্রশ্নের উত্তর এই যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে রাজনৈতিক দায় সৃষ্টি করে, তার ঝক্কি এঁদের পোহাতে হয় না। সে দায় এসে পড়ে রাষ্ট্র যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁদের ওপর। ভারতের অর্থনীতি যে দায় সৃষ্টি করেছে, সেটার বোঝা বাজার-মৌলবাদী অরবিন্দ পানাগরিয়া কিংবা জগদীশ ভাগবতীকে বহন করতে হয় না, সে দায় বহন করতে হয় মনমোহন, মোদি কিংবা জেটলিকে। জেটলিকে তাই চিদম্বরমের ফেলে যাওয়া জুতোতেই পা গলাতে হয়। শুধু ভারতবর্ষে এটা ঘটেছে এমন নয়। ওয়াশিংটন ঐকমত্যের শিকার দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতেও কম-বেশি এটাই ঘটেছে। ২০০২ সালে এই ওয়াশিংটন ঐকমত্যের পাল্লায় পড়ে আর্জেন্টিনায় যখন বেসামাল অবস্থা তৈরি হয়, তখন এই বাজার-মৌলবাদীদের কথায় কর্ণপাত না করে সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তাদের মুদ্রা পেসোকে ডলারের বাঁধন থেকে মুক্ত করে আমদানি নিয়ন্ত্রন করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই ওয়াশিংটন ঐকমত্যের সমাধিও হয় লাতিন আমেরিকায়। ইদানিং বিশ্বব্যাঙ্কমার্কা পরামর্শদাতাদের সুরও যে নরম হয়েছে, মুক্ত অর্থনীতির পথ নিয়ে যে এত কথা উঠছে, তার কারণও এটাই। মোদির অর্থনৈতিক ভূমণ্ডলকেও বুঝতে হবে, এই প্রেক্ষিতটি মাথায় রেখে।

কথা উঠতে পারে, এরকমই যদি হয় তাহলে ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র অভিযোগ তুলে কর্পোরেট পুঁজির সব লবিই এভাবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘মোদি নির্মাণ’ প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ল কেন? পরিস্থিতির এই বাধ্যবাধকতার বিষয়টি কি কেউ বুঝতে পারেনি? আমাদের অনুমান, যে বেসরকারি দেশি বা বিদেশি পুঁজি এদেশে বিনিয়োগ মারফৎ বাজারি নিয়মে মুনাফা করতে চায়, লুঠেরা পুঁজির তুলনায় যাঁরা অপেক্ষাকৃত বেশি দায়িত্বশীল, তাঁদের একটা বড়ো অংশ অবশ্যই এটা বুঝতে পারছিল৷ তবুও তাঁরা যে কিছু সুযোগসন্ধানীর ‘মোদি আনো’ প্রকল্পে সায় দিয়েছিলেন এই ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-রই অজুহাত তুলে, তার কারণ আছে। মোদিকে ঘিরে কর্পোরেটের টার্গেট কী - সেটা বুঝতে হলে, এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

মোদি এবং সংস্কারের রাজনীতি

মোদি যে বাজারমুখী সংস্কারের উগ্র সমর্থক, গুজরাটে তিনি তার প্রমাণ রেখে এসেছেন। তিনি যে যোজনা কমিশন তুলে দিতে চান, সেটা তিনি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন। এখনই সম্ভব নয় জেনেও, নরেন্দ্র মোদির বিত্তমন্ত্রী বিমার ক্ষেত্রে ৪৯% শেয়ার বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। বিজেপি যখন বিরোধী দল, কংগ্রেসের আনা এই প্রস্তাব যে বিজেপি-ই নাকচ করেছিল, সেটার মর্যাদা দেওয়ার দরকারও মনে করেননি তিনি। শ্রম আইন বদলানো, বিদেশি পুঁজির অবাধ প্রবেশাধিকার ত্বরান্বিত করার জন্য টাকার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরযোগ্যতা আনা, জমি আইনে কংগ্রেসের আনা সংশোধনগুলোর মধ্যে যেগুলি কর্পোরেটের অপছন্দ সেগুলি তুলে দেওয়া, এসবই এঁদের অ্যাজেন্ডায় আছে। কাজের অধিকারনিশ্চিত করার লক্ষে একটিমাত্র আইন আছে এদেশে: মহাত্মা গান্ধি গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইন, অর্থাৎ একশো দিনের কাজ। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, সেটিকে এঁরা ইতিমধ্যেই অধিকার‘-র জায়গা থেকে, আর পাঁচটা সরকারি প্রকল্পের মতো সরকারের মর্জিমাফিক চলার মতো প্রকল্পে, যাকে বলে টার্গেটেড, নামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কী চায় এই সরকার, সেটা নিয়ে তাই সংশয় নেই। তবে কখন কোনটা করতে পারবে এই সরকার, সে নিয়ে বহুবিধ অনুমান করার যুক্তিসঙ্গত কারণ অবশ্যই আছে। একথা যেমন বলাই যায় যে, চিদম্বরম বা মনমোহন যেমন চাইলেও সরকারি খরচ কমিয়ে বাজারের হাতে বিনিয়োগের দায় তুলে দেওয়ার কাজটি করে উঠতে পারেননি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে, জেটলি বা নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রেও সে সমস্যা আছে। অর্থনীতি এই ধরণের অবস্থার মধ্যে পড়ে থাকলে জেটলিকেও চিদম্বরমের পথ অনুসরণ করতে হবে। খুল্লমখুল্লা সংস্কার এখনই এঁরা করতে পারবেন না, করতে গেলে সংকট আরও বাড়বে যার রাজনৈতিক দায় ঘাড়ে নেওয়ার সাধ্য এঁরা এখনও অর্জন করে উঠতে পারেননি।

এই অবস্থায় তাহলে কি দাঁড়াবে মোদির অর্থনীতি? গত কয়েক বছরে বাজার চাঙ্গা করার লক্ষে চাহিদা সৃষ্টির জন্য সরকার যা খরচ করেছে, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন অরুণ জেটলিও,—এই সরকার অনুমান করছে যে, তার ফলে অর্থনীতি কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাক্‌বাজেট বিবৃতিতে জেটলি যা বলেছেন, তাতে এই ইঙ্গিত আছে। জেটলি উল্লেখ করেছেন যে, অর্থনৈতিক লেনদেন খাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে এবং রপ্তানি কিছুটা চাঙ্গা করে ইতিমধ্যেই চলতি খাতে ঘাটতি বেশ কিছুটা কমানো গিয়েছে, জাতীয় আয়ের অংশ হিসেবে এই অংকটি ইতিমধ্যেই ৪.৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭ শতাংশে। মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপ কিছুটা কমেছে। জাতীয় উৎপাদনে বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জেটলির অনুমান এদেশের জিডিপি আগামী বছর ৫.৪ থেকে ৫.৯ শতাংশের মতন বৃদ্ধি পাবে, .৭ শতাংশের তুলনায় যা অনকটাই ভাল। প্রাক্‌বাজেট বিবৃতিতে এ কথাও বলা হয়েছে যে, আগামী বছর বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন বৃদ্ধির হার যদি ৩.৫ শতাংশের ওপরে থাকে (যেটা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা অনুমান করছে)তাহলে ভারতের রপ্তানি বাজারে একটা ত্বরণ ঘটবে এবং তার ফলে চাহিদা-স্বল্পতা কেটে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো হবে, আয় বৃদ্ধির হারেরও ত্বরণ ঘটবে। আয় বৃদ্ধির প্রত্যাশিত হারটি ৫.৪ থেকে ৫.৯ শতাংশর মধ্যে থাকবে, এই অনুমানের এটাও একটা কারণ। কিন্তু সে যা-ই হোক, জেটলি-মোদির আশা বা অনুমান, অর্থনৈতিক মন্দা কিছুটা কাটবে আগামী এক বছরের মধ্যে এবং সেই সুযোগে সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো করে ফেলবেন ওঁরা।

এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, জাতীয় অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেই নরেন্দ্র মোদির সরকার বাজারমুখী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করতে নামবে। প্রশ্ন হল, জাতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবার সম্ভাবনা কতটা? এ বছর বৃষ্টি ভালো হয়নি, দেশের বেশ কিছু জায়গায় খরা পরিস্থিতি বিদ্যমান। কৃষি উৎপাদনে আশানুরূপ বৃদ্ধি না-হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেটা ঘটলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা থেকেই যাবে এবং তার ফলে মূল্যবৃদ্ধির সাধারণ হারটিও কমবে না। যদি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক সংকট বাড়ে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, তার ধাক্কাও পড়বে মূল্যস্তরে। বিদেশি বাজার কতটা চাঙ্গা হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন আছে। গত দু-বছর ধরেই এই কথা শোনা যাচ্ছে যে, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মন্দা কাটিয়ে উঠছে এবং তার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। কার্যত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ এবং আয় বৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়লেও, ২০০৮-র পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে যাওয়ার লক্ষণ নেই এই অর্থনীতির। সম্ভবত একটা বড়ো ধরণের যুদ্ধ না বাধলে এই অর্থনীতিটি চাঙ্গা হবে না অতিদ্রুত (১৯২৯-র মন্দা যেমন শেষ পর্যন্ত কেটেছিল ১৯৩৯-এ যুদ্ধ বাধার পরে, এ অবস্থাটা অনেকটা সে রকমই)। ইউরোপের অবস্থাও একই ধরণের। জার্মান অর্থনীতি ছাড়া দক্ষিণ ইউরোপে কোনো অর্থনীতির অবস্থাই ভালো নয়। নরডিক দেশগুলির অবস্থা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো। তবে বিশ্ব অর্থনীতিকে টেনে তোলার মতন ক্ষমতা নেই এই দেশগুলোর এবং কোনোদিনই সে ক্ষমতা ছিল না এদের। সুতরাং, বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং ভারত তার রপ্তানি বাজার চাঙ্গা করতে পারবে অদূর ভবিষ্যতে, এ সম্ভাবনা কম। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইদানিং চিন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে, বিশেষত ব্রাজিলে, উৎপাদন বৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ব অর্থনীতি এরপর এইসব দেশগুলিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে, এমন সম্ভাবনা অবশ্য এখনই দেখা যাচ্ছে না। তবে এই দেশগুলির গুরুত্ব বাড়ছে, ‘ব্রিকস‘-র মধ্য দিয়ে বাজার সম্প্রসারণের একটা সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। নরেন্দ্র মোদি এটা যে বুঝেছেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ সব থেকে কিছুটা বৈদেশিক চাহিদা বৃদ্ধি ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু অতিদ্রুত চমকপ্রদ কিছু ঘটতে পারে, এটা ভাবার কারণ নেই।

আমাদের অনুমান, চমকপ্রদ কিছু ঘটবে না। অর্থনীতিতে যদি সামান্য গতি সঞ্চার হয়, এই সরকার বাজারমুখী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কর্পোরেটের যে অংশটা বাজারের নিয়ম মেনে বিনিয়োগ মারফৎ মুনাফা বাড়াতে চায় (মাফিয়াবৃত্তি নয়), মোদিকে ঘিরে তাদের আশা এটাই। এঁদের হিসেব এই রকম যেমোদি ভালো প্রশাসক। কোন ভালো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেসেটা কার্যকর করাতে কালক্ষেপ তিনি করেন না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা থাকবে নাকেন না কোয়ালিশন রাজনীতির টানাপোড়েনে মোদিকে বিব্রত থাকতে হবে নালোকসভায় তাঁর আছে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দলের মধ্যেও ইতিমধ্যে অনেকটা সংস্কার সাধন করা হয়ে গিয়েছে। গুজরাটে বিজেপি যেমন শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আরএসএস মদতপুষ্ট মোদি-কেন্দ্রিক একটি দল হিসেবে এবং বিএসএস বা স্বদেশি জাগরণ মঞ্চও সেখানে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল। যারা এ দেশে বাজারমুখী সংস্কার চাননানা ধরণের টানাপোড়েনে পড়ে থাকা মনমোহন সিংহের সরকারের তুলনায় নরেন্দ্র মোদির বিজেপি-র ওপর বেশি আস্থা তাঁরা রেখেছিলেন এই কারণেই।

কেন মোদি এতটা পারবেনতাঁর জোরের জায়গাটা কীএই আলোচনা করতে হলে শুরু করতে হবে ভারতের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নয়া-উদারবাদী সংস্কারের দ্বন্দ্বের বিষয়টি থেকে। মনে রাখা দরকারনয়া-উদারবাদী অর্থনীতি যে মতাদর্শগত পরিমণ্ডল গড়তে চায়যে পরিমণ্ডলটি এই নয়া-উদারবাদী ভাষায় কথা বলতে শেখায়সর্বত্র যা নয়া-উদারবাদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেভারতবর্ষে তা গোড়া থেকেই নানাবিধ কারণে দুর্বল। এমনকী বিজেপি-র মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা কম। এর একটা কারণ এই যে এ দেশে স্বাধীনতার পর অন্তত দুটি প্রজন্ম এই ভাবধারায় বড়ো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের আর্থিক সমস্যা মেটানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একটা বড়ো ভূমিকা আছে—রাষ্ট্রকে পেছনে ঠেলে বাজারকে সার্বভৌম ক্ষমতা দিলে ভাল হবে না সাধারণ মানুষের। কেন এটা জনমানসে এত প্রবলতারও কারণ আছে। এ দেশে যে রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে প্রাক্‌স্বাধীনতা যুগের মা-বাপ সরকার‘ (অর্থাৎ সরকারই শেষ ভরসাথেকে নেহরু চিন্তার জনকল্যাণমুখী সরকার হয়ে বামপন্থীদের সোশ্যালিস্ট সরকার‘ (কম্যুনিস্ট-লোহিয়া-নরেন্দ্র দেব-জয়প্রকাশসব কিছুর মিশ্রনে গড়া একটা ধারণা)—সব কিছুর একটা শক্তিশালী উপস্থিতি আছে। এর সঙ্গে আবার আছে সার্বজনীন ভোটাধিকার—যার ক্ষমতা এত বিপুলদেশবাসী তা ইতিমধ্যেই অনেকটা উপলব্ধি করেছে। সংস্কারের রথে চেপে ইন্ডিয়া শাইনিং‘ করতে গিয়ে অটলবিহারী বাজপেয়ীর বিজেপি সরকার পরাস্ত হয় এই কারণে যে, ভোটদাতারা মনে করে  সংস্কারের ফলে খাস আদমি‘-র উন্নতি হয়েছে, ‘আম আদমি‘-র ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ তাদের রাষ্ট্রচিন্তায়জনগণের যে প্রত্যাশা, বাজপেয়ী তা পূরণ করেননি। একশো দিনের কাজ‘ নিয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে ইউপিএ-১ থেকে ইউপিএ-২ সরকার গড়ার যুদ্ধ লড়েছে কংগ্রেসব্যাঙ্ক বিলগ্নিকরন কিংবা শ্রম আইনের সংস্কারের কথা উচ্চারণ পর্যন্ত করেননি সোনিয়া কিংবা মনমোহন সেই সময়—কারণ ভোটযুদ্ধে লড়তে হলেএ দেশের অধিকাংশ মানুষের মনে যে ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা আছে তাতে তাল মেলাতে হয়। এবারের লোকসভা নির্বাচনেও বিকাশ পুরুষ‘ বাজারমুখী সংস্কারের দামামা বাজাননিবরং সবকে লিয়ে‘ উন্নয়নের কথা বলতে হয়েছে তাঁকে।

এই অবস্থায় কর্পোরেট পুঁজির দায়িত্বশীল অংশটি এটা বুঝেছে যেকংগ্রেস বা বিজেপিক্ষমতায় যে দলটিই থাকুক না কেনসংস্কারের কাজটি বাধাগ্রস্ত হবেই, যদি না এমন একটি শক্তি ক্ষমতায় আসেভারতবাসীর যে রাষ্ট্রচিন্তা সেটিকে নয়া-উদারবাদের পক্ষে নিয়ে আসার ক্ষমতা সে শক্তিটি রাখে এবং সেই কারণেই চাই অনুকুল অর্থনৈতিক পরিবেশে যা দ্বিধাহীনভাবে এই সংস্কারের কাজটি করে ফেলতে পারবে। আমাদের অনুমাননরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নয়া বিজেপি হল কর্পোরেটের দায়িত্বশীল অংশের বিবেচনায় সেই রকম একটি রাজনৈতিক শক্তি। নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় আনার জন্য এরা সব শক্তি প্রয়োগ করেছিল এই কারণেই।  

পরিচয়সত্তার রাজনীতি ও নরেন্দ্র মোদির বিজেপি

ভারতবাসীর রাষ্ট্রচিন্তাকে সরাসরি নয়া উদারবাদের পক্ষে নিয়ে আসা যে সম্ভব নয়গত দুই দশকে তা প্রমাণিত হয়েছে। নেহরুর জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা অথবা বামপন্থীদের সোশ্যালিস্ট সরকারএমনকী বহু পুরাতন মা-বাবা-সরকার‘—সব কিছুই যে পরিচয়সত্তার ভিত্তিতে আম আদমি‘-র স্বার্থর কথা ভাবায়সেই পরিচয়সত্তায় আমরা-ওরা‘ ব্যবধানের এক মেরুতে থাকে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষঅন্য দিকে থাকে খাস আদমি‘ যারা অর্থনীতির যাবতীয় সুফল ভোগ করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, এই বঞ্চিত মানুষদের জন্য সুরাহার ব্যবস্থা করা—এই হল এই ধরণের সামাজিক চিন্তার মূল কথা। এর সঙ্গে নয়া উদারবাদকে মেলান যায় না। নয়া উদারবাদ যে অর্থনৈতিকভাবে যারা সুবিধাভোগী তাদের হাত শক্ত করেএটা এই ধরণের চিন্তাভাবনার একটা বদ্ধমূল ধারণা। সোশ্যালিস্টকম্যুনিস্টকংগ্রেসবিজেপি—সব দলের মধ্যেই এই ধারণার গ্রহণযোগ্যতা বিপুলযে কারণে ভোটের সময় এই সব দলের কেউই বাজারমুখী সংস্কারের ডঙ্কা বাজায় না। এটা ছাড়া উপায় নেই‘, ‘বিশ্ব পরিস্থিতিই বাধ্য করেছে এ ধরণের নীতি গ্রহণ করতে‘—নয়া উদারবাদের হয়ে সাফাই গাওয়ার সময় সবারই কথা থাকে এই ধরণের। সংসদেও চলে এই একই খেলা (যে কারণে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপে এবং কংগ্রেসউভয়ই বিমা বিলের বিরোধিতা করে)

পরিচয়সত্তার জন্য যে রাজনীতি এ দেশে উঠে এসেছেউত্তর ভারতে যা লোহিয়াপন্থী সোশ্যালিস্টদের চিন্তায় ছিল এবং মণ্ডল রাজনীতির পর যা আঞ্চলিক রাজনীতির চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে উত্তর ভারতে আর যা দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে নানা রাজনৈতিক দলের চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছেসেই জাত-ভিত্তিক রাজনীতিও কিন্তু সারের বিচারে নয়া উদারবাদ বিরোধী। এ রাজনীতিও কিন্তু বঞ্চিতদের রাজনীতিঅর্থনৈতিক বঞ্চনা যে বঞ্চনার প্রধান উপাদান। অর্থনৈতিকভাবে যারা বঞ্চিতনয়া উদারবাদ তাদের আরও বঞ্চিত করেএটা তাঁরাও মনে করেন। শুধু তাই নয়নয়া উদারবাদের সুফল পায় খাস আদমিএটা তাঁরাও মনে করেন। তবে তাঁদের চিন্তায় এই খাস আদমি উচ্চ বর্ণের ভারতবাসী। কিন্তু এ সত্ত্বেওএই রাজনীতিটি যেহেতু সুযোগসন্ধানীতে বোঝাই হয়ে গিয়েছেএই রাজনীতির কুশীলবরা প্রায়শই কোনো একটি বড়ো দলের লেজুড় হয়ে দিল্লির ক্ষমতায় ভাগ বসায় এবং সেই সুবাদে নয়া উদারবাদী নীতির পক্ষে ভোটও দেয়। উপজাতি অর্থাৎ ট্রাইবাল পরিচয়সত্তার রাজনীতিরও একই দশা হয়েছে এই দেশে। কিন্তু সে যাই হোকনয়া উদারবাদ এদের ওপর ভর দিয়ে ভারতের মাটিতে তার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেএ সম্ভবনা নেইকেন না এদের কোন কোয়ালিশন দিল্লিতে ক্ষমতায় আসবেসংসদীয় রাজনীতির অঙ্কে সেটা মেলান যায় না বর্তমান ভারতে।

নয়া উদারবাদী রাষ্ট্রচিন্তার অংশীদারত্ব দেওয়া তাই এই ধরণের পরিচয়সত্তার রাজনীতির কোনো একটাকে আশ্রয় করে গড়ে তোলা অসম্ভব। পর্যাপ্ত বুর্জোয়া বিকাশ হওয়া দেশগুলিতে এটা একভাবে সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই ধারণ করা সম্ভব হয়েছেযদিও সে-সব দেশেও এটা নিয়ে সমস্যা আছে। ভারতের মতন দেশে নয়া উদারবাদকে রাষ্ট্রচিন্তার অংশীদারিত্ব দেওয়া অসম্ভব। কীভাবে তাহলে নয়া উদারবাদ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেবলা যায় যেতৎসত্ত্বেও এই নয়া উদারবাদ তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে যদি এমন একটা পরিচয়সত্তার রাজনীতি এ দেশে প্রাধান্যে আসেযে রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলির গুরুত্ব কম। একটি মাত্র পরিচয়সত্তাভিত্তিক রাজনীতি এ দেশে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে। সে রাজনীতিটি হল ধর্মভিত্তিক পরিচয়সত্তার রাজনীতিযা শ্রমজীবিদেরই বিভক্ত করে। ভারতবর্ষের মাটিতে এই রাজনীতির চাষ করলে যে সোনা ফলেউপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের যুগে ব্রিটিশ তার প্রমাণ রেখে গিয়েছে। গত ছয় দশক ধরে ভারতের মাটিতে এই চিন্তার প্রসারটি অনেকটাই আটকে রেখেছিল নেহরু রাজনীতি, সোশ্যালিস্ট রাজনীতি এবং জাতপাতের রাজনীতি। বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে এটাই আবার শুরু হয় নব পর্যায়েযার একটা পর্যায়ে অটলবিহারী তাঁর সরকার প্রতিষ্ঠা করেন কেন্দ্রে। অটলবিহারীর বিজেপির একটা বড়ো উপাদান ছিল আরএসএসমোদি যার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধিটি গুজরাটে এক অন্য বিজেপি-র সূচনা করে। এই বিজেপি-টি মুসলিমকে সবক‘ শেখায়শ্রমজীবিদের কোণঠাসা করে এবং একই সঙ্গে কর্পোরেট যা চায়অঙ্গরাজ্যের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে তার সবটাই করে অসম্ভব দক্ষতায়। শ্রমজীবিদের কর্পোরেট বিরোধী ক্ষোভ কোনোভাবেই দানা বাধে না গুজরাটেকারণ রাজনীতিতে সেখানে কর্পোরেট কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল ধর্ম। মোদির গুজরাট আর একটা ঘটনাও ঘটিয়েছে। ধর্মকে ইস্যু করার অর্থে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধিয়ে রাখাএমন নয়। মুসলমানরা সেখানে সবক‘ শিখে চলবেবেচাল কিছু করলেই বিপদে পড়বে তারা এবং বেচাল কিছু না করলে কর্পোরেটভিত্তিক উন্নয়নের ছিঁটেফোঁটার স্পর্শ তারাও পাবে—এই হল ছকটি। হিন্দুদের কাছে এটা হল একটা মহা আনন্দের রাজনীতিকারণ যাদের তারা ঘৃণা করে, তাদের দাবিয়ে রাখার রাজনীতি এই রাজ্যে কর্তৃত্বকারী রাজনীতি। এই রাজনীতি মসৃণভাবে চললে অন্য পরিচয়সত্তার রাজনীতি ক্রমশ পিছু হটবেগুজরাটে ইতিমধ্যেই যা ঘটেছে। এই রাজনীতি মসৃণভাবে চললে নয়া উদারবাদ নিয়ে রাজনীতি করার পরিসরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে, কারণ শ্রেণি বা জাতভিত্তিক কোনো রাজনীতিই এখানে দানা বাধবে না। গুজরাটের বিরোধী দলগুলির রাজনীতির ব্যর্থতায় এটা প্রমাণিত।

ভারতবর্ষের রাষ্ট্রচিন্তায় কর্পোরেট স্বার্থবাহী নয়া উদারবাদের উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয়। যেটা সম্ভব তা হলএমন একটা পরিচয়সত্তার রাজনীতিকে প্রাধান্যে আনা, যেখানে কর্পোরেট স্বার্থবিরোধী পরিচয়সত্তাই দুর্বল হয়ে পড়ে। মোদির বিজেপি এ দায়িত্ব পালন করতে পারেকর্পোরেটের দায়িত্বশীল অংশটি এ কথা মনে করে। এ কথা মনে করার যে যুক্তিসিদ্ধ কারণও আছেগুজরাট তা প্রমাণ করেছে।

গুজরাটে মোদি যা পেরেছেনদিল্লিতে তিনি কি তা পারবেনএক কথায় এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মোদি যে তাঁর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে বিসর্জন দিতে রাজি নন এবং মুসলিম তোষণ‘ তিনি যে করবেন নাতার লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে। তিনি ইফতার রাজনীতি‘ করবেন নাকিন্তু পশুপতিনাথে সাড়ম্বরে পুজো দেওয়া এবং নির্বাচনের পর বারানসীতে গঙ্গাপুজো তিনি করবেন। শিক্ষায় গৈরিকীকরণের কাজটা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মোহন ভাগবতকে তোয়াজ করার জন্য তিনি প্রস্তুত এবং তাঁর নবগঠিত বিজেপি-র সঙ্গে স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সম্পর্ক যে স্পষ্টসেটা প্রমাণ হয়েছে। দাঙ্গা তিনি বাধাতে চান নাকিন্তু স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে সঙ্ঘাত ঘটিয়ে মুসলিমদের সবক‘ শেখানোর কথাটা তিনি অমিত শাহ মারফৎ চালু রেখেছেন। মুসলিমদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে যে, কোনোরকম বেচাল দেখলে অমিত শাহ বা মোহন ভাগবত গুজরাট মডেলে তা দমন করবেন। ভোটের অঙ্কে যে এই বিভাজন ফলপ্রসূ হয় উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এই মডেলেই ভোট হবে এবং নয়া উদারবাদ নয়ধর্মীয় পরিচয়সত্তাভিত্তিক রাজনীতিই প্রাধান্যে থাকবে। জাতপাতভিত্তিক পরিচয়সত্তার রাজনীতি দিয়ে এই নয়া বিজেপি-কে রুখে দেওয়া যায় কিনাবিহারের উপনির্বাচনে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষায় বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি বটেতবে এই নয়া বিজেপি-র রাজনীতিতে জাতপাতের অঙ্কটার সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের মেলবন্ধন ঘটানোর কৌশল নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। গুজরাটের সাফল্য থেকে এই বিজেপি ভালো রকম শিক্ষা নিয়েছে এবং দলটি যে আরও শেখার চেষ্টা করছেতার প্রমাণও আছে।

ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যাতে ভারতকে আড়াআড়িভাবে ভাগ না করে দেয়আবার একটা পাকিস্তান গড়ার রাজনীতি যাতে এ দেশে মাথাচাড়া না দেয়এ রাজনীতিকে যারা প্রাধান্যে নিয়ে এসেছেনসে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক। মুসলমানদের মধ্যে যারা নরমপন্থীদলটি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাইছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ভারতীয়ত্বর ওপর জোর দেয়। এই জোরটা মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের একটা বড়ো অংশের মধ্যে আছে। বস্তুত, পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর এ দেশের মুসলমানরা যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেরাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যে তাদের আশ্রয় দিতে পারবে না এবং সংকটজর্জর পাকিস্তানে উদ্বাস্তু হয়ে হাজির হলে যে আদৌ সুবিধে হবে নাএ দেশের মুসলমানদের একটা বড়ো অংশ এটা বুঝেছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এটা জানেমোদির পিছনে যে কর্পোরেট আছে, তারাও এ বিষয়ে সচেতন। এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে একটি অন্য ধরণের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি গড়াও মোদির পক্ষে সম্ভব। কোনটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবেসময় সেটা বলবে। তবেকর্পোরেট যে ভারতবর্ষে একটা অন্য ধরণের পরিচয়সত্তার রাজনীতি চায়যে রাজনীতি রাজনীতি থেকে অর্থনীতির মূল ইস্যুগুলিকে বিযুক্ত করতে পারে এবং তার ফলে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে নয়া উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করা যায় এই সার্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক সংসদীয় রাজনীতির পরিসরেইসেটা স্পষ্ট। মোদিকে ঘিরে এটাই তাদের অ্যাজেন্ডা। মোদি সেটা জানেন এবং সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছেন তিনি।

(পুনঃপ্রকাশিত)

 

 
 
top