সন্ত্রাসের সাম্রাজ্যবাদ—বিপর্যস্ত স্বাধীনতা-সাম্য-সৌভ্রাতৃত্ব: কেমন আছ ভারতবাসী !

 

ফ্রান্সে উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠনের আত্মঘাতী আক্রমণে প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্রের সন্ত্রাস দমননীতি। মুক্ত চিন্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা যে দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রবাসীর মজ্জায় নিহিত, সে দেশে সন্ত্রাসের এমন নারকীয় আত্মপ্রকাশের যোগ্য জবাব যে আপসহীন যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং নির্বিচার প্রত্যাঘাত হবে—সে বিষয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। কবিতার দেশে আতঙ্ক ক্ষীণজীবী বলে কবিতা আর মোমের আলো সাথে নিয়ে অকস্মাৎ অকারণ রক্তপাতের মুখোমুখি হওয়া যায় না। অন্তত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিহিংসা থাকবে একশো ভাগ। আক্রমণ যতটা নির্মম হবে, প্রতি-আক্রমণ হবে ঠিক ততটাই আপসহীন। তাই, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হলে আতঙ্কের রাজ্যে পৃথিবী হয় রক্তাক্ত।

এখন প্রশ্ন হল আশু প্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে সহায়ক হবে, নাকি সন্ত্রাসবাদের বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রটিকেই পরোক্ষে আরও মজবুত করবে। চোখের বদলে চোখ মেনে নিলে হিংসায় হিংসা বাড়তে থাকবে এবং নিহত হবে নিরপরাধ। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথম, ফ্রান্সের রাষ্ট্রনীতিতে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার যে স্বতন্ত্র ভূমিকা রয়েছে তার ইতিবাচক দিকটি হল রাষ্ট্রের সংগঠিত ধর্মমতগুলির (অর্গানাইজড রিলিজয়ন্স) থেকে রাষ্ট্র-রাজনীতি ও অর্থনীতির নীতিগত বিচ্ছেদ (প্রিন্সিপলড সেপারেশন) অর্থাৎ, রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মবিশ্বাসের অনুগামী নয়—রাষ্ট্র, ধর্ম-নিরপেক্ষ। এর নেতিবাচক দিকটি হল এই বিচ্ছেদের ফলে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রবাসীর জীবনচর্যা ও চিন্তনের স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরির সম্ভাবনা রয়ে যায়। এই দূরত্ব স্বাভাবিক কারণে বাড়তে পারে যেহেতু মুক্ত চিন্তার প্রকাশে ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই, প্রশ্রয় আছে। এই ধরণের পরিবেশে জনজীবন-সমাজ-রাজনীতি তথা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তি-তর্কের, নিজের মতামত প্রকাশের উন্মুক্ত পরিসর থাকে। সেক্ষেত্রে এই অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা যেমন প্রগতিশীল চিন্তাধারার বাহক হতে পারে, তেমনই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের দাবি-দাওয়া-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থতার বা ক্ষোভ প্রকাশেরও উর্বর জমি হতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের প্রিন্সিপলড সেপারেশন আসলে হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তি/গোষ্ঠীমানসের আশা-হতাশার প্রতি উদাসীনতার-ই নামান্তর। ভুললে চলবে না, ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্স এর আগে পশ্চিম এশিয়ায় জঙ্গি দমনে এতটা কঠোর পদক্ষেপ করেনি। ইওরোপে অনুপ্রবেশকারী শরণার্থীদের স্থান না দেওয়া যেমন অমানবিক, তেমনই এও মনে রাখা দরকার, এই বিসদৃশ জাতি-ধর্ম-ভাষাগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে যে রাষ্ট্রবাসী, তার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ যে-কোনো গণতান্ত্রিক, স্বাধীন চিন্তায় আস্থাশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত জটিল। তাই, প্যারিস আক্রমণের ছক সিরিয়ায় তৈরি হলেও আট জন দুষ্কৃতির মধ্যে তিন জনই হয় ফরাসি নাগরিক—তথাকথিত বহিরাগত অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসবাদী নয়। এবার যদি উপরের আলোচনাকে ইওরোপের শেঙেন ব্যবস্থার কার্যকারিতার দিক এবং তার সাথে অবাধ উদ্বাস্তু অনুপ্রবেশের সাথে সম্পর্কিত করে ভাবা যায়, তাহলে সহজেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার শোচনীয় দুর্বলতার বিষয়টি বোঝা যাবে

দ্বিতীয়ত, জাতি-ধর্ম-মতাদর্শগত বহুত্ব যদি একটি আর্থ-সামাজিক পরিসরের বৈশিষ্ট্য হয় তবে উদার রাষ্ট্রনীতি ও নাগরিক অধিকার সচেতন সাংবিধানিক পরিকাঠামো সত্ত্বেও বিসদৃশ জাতি-ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াই থাকতে পারে। তাই লিবার্টি-ইকুয়্যালিটি-ফ্রেটারনিটির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত যে দেশ, সেখানেও আজ দেশবাসীর ইন্টিগ্রিটি, টলারেন্স সলিডারিটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একজন ভারতবাসীর কাছে ফ্রান্স তথা ইওরোপের বর্তমান সমস্যাগুলির অধিকাংশই খুব পরিচিতআজ যে উগ্র-জাতীয়তাবাদী শক্তি সারা পৃথিবীর মানচিত্রকে নতুন করে সাজাতে চায়, তার আগ্রাসী চরিত্রের আংশিক পরিচয় পাওয়া যায় ভারতের মাটিতে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা চরমভাবাপন্ন মতাদর্শের অনুগামীদের রাজনৈতিক স্বার্থ-সচেতনতায় যখন বার বার স্বাভাবিক জনজীবন ত্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়। তাই একজন ভারতবাসীর পক্ষে ফরাসিদের দুঃসময়ে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

দেশের মাটিতে বিদেশি শক্তির ক্ষমতাবিস্তার তখনই সম্ভব হয় যখন দেশের অভ্যন্তরে তার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে পুঁজিবাদের পুরোনো আঁতাত। একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। একটি বিষয় স্মরণে রাখা দরকার। কোনো দেশের সাধারণ মানুষ কখনও তাদের জীবনে অশান্তি বয়ে আনার পক্ষপাতী নয়। এ সত্য সর্বকালের। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, যে অন্য সব জীবের মতোই বিপদ বুঝলে আতঙ্কিত হয়—আক্রান্ত হলে হিংস্র হয়। আর এই সুযোগের অপব্যবহার করে কোনো-না কোনো সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ নির্মাণের মধ্য দিয়ে জাতি/ধর্মগত মেরুকরণ করে রাজনৈতিক স্বার্থসচেতন কিছু অত্যুৎসাহী ব্যক্তি। এই প্রক্রিয়াটি জটিল এবং সাফল্য সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সাফল্য একবার এলে দীর্ঘস্থায়ী হয়, কারণ ততদিনে সাম্প্রদায়িকতার গরল সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনার গভীরে প্রবেশ করে যায়। এবার আসা যাক প্রক্রিয়াতে। যে কোনো কম্যুনালিস্ট আইডিওলজি বা রিলিজিয়াস ন্যাশানালিস্ট আইডিওলজি-এর নির্মাণে সর্বপ্রথম উপাদান হল কল্পনা। একটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তার জাতিগত, ভাষাগত, ধর্মগত উৎকর্ষের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হলে একপ্রকার জিনিওলজিক্যাল ফ্যান্টাসি-র প্রয়োজন। কল্পনার উপাদান বাদ দিলে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস নাও হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন হয় ইতিহাসের পুনর্নিমাণের অর্থাৎ রিকন্সট্রাকশন অব হিস্ট্রি যাতে প্রাধান্য পায় কম্যুনাল মিথিফিকেশন পাঠক ভাবতে পারেন, বললেই হল! মানছে কে? অর্থাৎ প্রশ্ন উঠছে এই কাল্পনিক ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। এই বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি মাথায় রেখে যে-কোনো সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ বা উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের নির্মাণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। প্রথমত, কাল্পনিক ইতিহাসকে বাস্তব সময় ও স্থানের সাথে সম্পর্কিত করা। স্মরণে থাকবে, রামচন্দ্রকে রাষ্ট্রপুরুষ ঘোষণা করে ১৯৯২ সালে যে বাবরি মসজিদ অভিযান হয়েছিল, সেখানে রামচন্দ্রের মতো একটি কল্পিত মহাকাব্যিক চরিত্রের জন্মভূমি খুঁজে বের করা হয়েছিল একটি রিয়েল স্পেস-এ। বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যদি সাধারণ মানুষ ভাবিত হতেন, তাহলে লক্ষাধিক ভক্ত গিয়ে এত প্রাচীন একটি নির্মাণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারতেন না। অবশ্য এটুকু বলে ছেড়ে দিলে অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রাককালে অভূতপূর্ব হেট ক্যাম্পেন পরিচালনা করা হয়েছিল এবং তাতে মুখ্য দায়িত্বে ছিলেন সংঘ পরিবারের সদস্য সাধক-সাধিকারা, রাষ্ট্রসেবক-সেবিকারা। সে আলোচনার পরিসর এখানে নেই। ফিরে আসা যাক সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের নির্মাণের বিষয়টিতে। দ্বিতীয়ত, এই কাল্পনিক ইতিহাসকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য ইতিহাস হিসাবে উপস্থাপন করা। যে বিবরণকে ইতিহাস না-বলে কাহিনি বলাই সঙ্গত, তাকে প্রয়োজনে ইস্কুল পড়ুয়াদের ইতিহাসের পাঠ্য করে দেওয়া—অপর একটি রাজনৈতিক কৌশল। এর ফলে একটি শিশু জীবনের শুরু থেকেই নিজের দেশ-জাতি-প্রতিবেশী ধর্মীয় সম্প্রদায় সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করতে শুরু করবে। যা পরবর্ত্তীকালে তার মননে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাবে। এই মতাদর্শ নির্মাণে অপর উল্লেখযোগ্য বিষয় হল মেরুকরণ। অর্থাৎ আমি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করব তোমার বিশেষত্ব দিয়ে। তুমি অধম, তাই আমি উত্তম। আলোচনার সুবিধার্থে একটি দূর সম্ভাবনার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক। এই প্রবন্ধের পাঠক যেহেতু বাঙালি, তাই ধরা যাক বাঙালি জাতি সচেতনতার প্রয়োজন উপলব্ধি করলেন কিছু অত্যুৎসাহী বঙ্গসন্তান। বাঙালিকে তার ধর্মবোধ থেকে পৃথক করে দেখা মুশকিল। তাই, আমাদের আলোচ্য বিষয়কে আর একটু গুটিয়ে আনা যাক। ধরা যাক, হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে যদি কিছু কল্পনা করা যায়, তবে তার মতাদর্শ কেমন হবে। তার নির্মাণ-ই বা কী প্রকার হবে। প্রথমেই যে উপাদানটি প্রয়োজন, তা হল ইতিহাস। হিন্দু বাঙালির ইতিহাস প্রাচীন হওয়া চাই। না-হলে মেরুকরণ বিশ্বাসযোগ্য হবে না। এই তত্ত্বে হিন্দু বাঙালির আর্চ এনিমি বা অ্যান্টিথেটিক্যাল আদার হতে পারেন মুসলমান বাঙালিরা। এবার প্রয়োজন হিন্দু বাঙালি জাতির উৎপত্তির ইতিহাস। এক্ষেত্রে অন্যান্য উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের মতোই কোনো বিশেষ প্রাচীন জাতি, বা ঐতিহাসিক চরিত্র অথবা স্থান, বা কোনো বিশিষ্ট মুনি-ঋষি হতে পারে জন্মদাতা বা উৎপত্তি স্থল। শুরুটি বিশেষ হওয়া দরকারবর্তমান প্রজন্মের গুণাগুণ যাই থাক না কেন, এই পূর্বগরিমার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই জিনিওলজিক্যাল ফ্যান্টাসি-র মাধ্যমে কম্যুনাল মিথিফিকেশন প্রক্রিয়াটির অবতারণা হয়। এভাবে হিন্দু বাঙালির একটি স্বতন্ত্র ইতিহাস নির্মাণ করা যেতে পারে, যেখানে জাতীয় প্রতীকের বাঙালিকরণ হতে পারে, আবার হিন্দু বাঙালি প্রতীকের জাতীয়করণও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ভাবা যেতে পারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতাকে খর্ব করে হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে প্রাধান্য পেল হয়তো শুধুই তাঁর বাঙালিয়ানা, বাংলা কবিতা ও গান, হিন্দুধর্ম বিষয়ে তাঁর সচেতনতা ও মতামত। তাঁর জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনা স্থান না-ও পেতে পারে এরূপ মতাদর্শেনেশন-এর ধারণাটি-ই তাঁর মতে একটি আহৃত ধারণা। জাতীয়তাবাদের ধারণায় স্ব-জাতি, স্ব-ভূমি, স্ব-ধর্ম এবং স্ব-দেশ-কে রূপায়িত করতে একটি পরিধির কল্পনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথের মানবধর্মে এই গণ্ডীর কল্পনা ছিল না, কারণ পরিধির ভিতরের মানুষ তার বাইরের জনগোষ্ঠীর সাথে সরল-স্বাভাবিক আদান-প্রদানে অংশগ্রহণ করে না। বরং বিদ্বেষপরায়ণ হয়। নতুন মতাদর্শের নির্মাণে এরূপ সংকোচন প্রসারণ খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। যখন বলা হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ পুজো দুর্গাপূজো, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মুসলমান বাঙালিদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়। অর্থাৎ বাঙালি শব্দটি সংকুচিত অর্থে ব্যবহৃত হয় আর দুর্গাপূজোর এক প্রকার জাতীয়করণ হয় অর্থাৎ প্রসারণ হয়। পাঠকের মনে থাকবে রাম জন্মভূমি বিতর্কের সময় রামচন্দ্রকে রাষ্ট্রপুরুষ প্রতিপন্ন করতে গিয়ে রামের এক অদ্ভুত মুসলমানবিদ্বেষী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, বলিষ্ঠ, অস্ত্রধারী, সৈনিকবেশ প্রতীক রূপে নির্মিত হয়েছিল—যা আমাদের অতি পরিচিত উদার, স্নেহপরায়ণ, ভক্তবৎসল মহাকাব্যিক চরিত্র থেকে একেবারে আলাদা। হিন্দু বাঙালির ইতিহাস এরূপে হবে গর্বের ইতিহাস, বীরত্বের ইতিহাস—এক নির্ভরযোগ্য বিবরণী। এক্ষত্রে উল্লেখযোগ্য হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পুনর্নিমিত ভারতবর্ষের জাতীয় ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে হিন্দু জাতির গৌরবের ইতিহাস। যাই হোক, হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদাহরণটির কল্পনা শুধুমাত্র এই ধরণের মতাদর্শের নির্মাণ বোঝানোর জন্যই করা হল। পাঠক এরকম উদাহরণের কল্পনা আরও করতে পারেন। ধরুন যদি কাল একদল বাঙালি হাঁক পাড়ে, বাঙলার ঘটি এক হও। বাঙালরা নিজ দেশে ফিরে যাও। পশ্চিমবঙ্গ ঘটিদের পিতৃভূমি। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। অবাক হবেন না। স্বাধীনতার আটষট্টি বছর পরেও সংঘ পরিবার ভারতীয় মুসলমানদের তাদের দেশে ফিরে যেতে বলছে—এই পুণ্যভূমি/পিতৃভূমি-র তত্ত্ব খাড়া করে। তত্ত্বটি সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতার তত্ত্ব—যা সাম্প্রদায়িকতার তকমা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ বলে। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, আর্যভূমি আর্যাবর্তে আর্যদের একমাত্র উত্তরসূরি হিন্দু। হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ বেদ, যা (নাকি) আর্যদের দ্বারা রচিত। অর্থাৎ, হিন্দুদের পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি হিন্দুস্থান। যাদের তা নয়, তারা এই ভূমিতে বহিরাগত এবং সংখ্যালঘু। তাদের হিন্দুরীতি ও ধর্মকে সম্মান করেই বাঁচতে হবে এ দেশে, না পারলে, এই তত্ত্ব অনুসারে, এ দেশ ছেড়ে যেতে পারেনএই তত্ত্ব মেনে নিলে ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের এদেশে স্থান হওয়ার কথা না। কমিউনিস্টদেরও কিন্তু এই মতাদর্শ সুনজরে দেখে না। তাই মনে রাখবেন, আপনারাও বহিরাগত। আপনাদেরও পিতৃভূমি/পুণ্যভূমি অন্যত্র কী না !

যে-কোনো সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ তার নির্মিত ইতিহাসকে প্রোপাগান্ডা হিসাবে ব্যবহার করে। এর কারণ যে কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ মূলত একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। অসহিষ্ণুতাও তাই ম্যানুফ্যাকচার্ডএকটি গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত আত্মসচেতন ও স্বার্থসচেতন করে তার সংঘবদ্ধ শক্তিকে অপর একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে রাজনৈতিক জমি দখলের অভীপ্সাই এই ধরণের মতাদর্শের বেঁচে থাকার পিছনে একমাত্র চালিকাশক্তি।

সম্প্রতি গো-ধন সংরক্ষণ, গো-মাংস ভক্ষণ রোধ, গো-দুগ্ধ বিতরণ এবং সর্বোপরি গো-মাতার কৃপাধন্য রাষ্ট্রনেতৃত্বের রাজনৈতিক কর্তৃত্বে আরও একবার উঠে এল এদেশের সহিষ্ণুতা বিতর্ক। এ দেশের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস এই বিতর্কের সাক্ষী থেকেছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে উত্তরপ্রদেশসহ দেশ জুড়ে নানান স্থানে নতুন গোশালার নির্মাণ হয়। প্রচুর পোস্টার ও হ্যান্ডবিল প্রকাশিত হয়, যা এই কর্মকাণ্ডে ইন্ধন যোগায়। ১৮৯০-এর দশকে বারাণসী থেকে প্রকাশিত হয় গোসেবক নামক একটি সংবাদপত্র। ফারুখাবাদ থেকে প্রকাশিত হয় অপর একটি মাসিক যার নাম গোধর্ম প্রকাশ। মুসলমান কর্তৃক নির্বিচার গো-নিধন এবং এর প্রতিবাদে মুখর হিন্দুদের বিদ্বেষ ও হিংসা প্রদর্শনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরার ক্ষেত্রে গোধর্ম প্রকাশ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গোমাতার স্তুতিতে আরতি ও ভজন রচনার পাশাপাশি বহু নাটক এই সময় লেখা হয়। লক্ষ্ণৌ থেকে হিন্দিতে প্রকাশিত ভারত ডিমডিমা নাটক দেশব্যাপী গোহত্যাজনিত অপরিসীম দুর্দশার একটি মর্মস্পর্শী বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে। গোমাতাকে বিভিন্নভাবে চিত্রায়িত করা হয়—কখনও ভারতবর্ষের রক্তাক্ত মানচিত্রে মৃত গরুর অস্থি-কঙ্কালের মাঝে অশ্রুসজল ভারত/গোমাতা রূপে, কখনও সমগ্র পৌরাণিক দেবকুলকে নিজ অঙ্গে শিং থেকে ক্ষুর পর্যন্ত ধারণ করে স্বরূপে প্রকাশিত, কখনও-বা অস্ত্রসজ্জিতা অষ্টভুজা দেবীর বেশে যার মহিষ স্থানে নিহত গরু এবং অসুর স্থানে মুসলমান কষাই। অর্থাৎ রূপগত সাদৃশ্য থাকলেও ইনি মহিষাসুরমর্দিনী নন, মুসলমানদলনী। এমনকী শ্রীকৃষ্ণের মতো কালজয়ী মহাকাব্যিক চরিত্র—কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রধান কূটনীতিক—বিজয়ী পক্ষের উপদেষ্টা—রণকুশলী ত্রিকালদ্রষ্টা মহাবীরও ঘোর কলিযুগে গোধন সংরক্ষণ আন্দোলনে আত্মগৌরব হারিয়ে পরিণত হয়েছেন এক গোপালকে। ওই যে আগে বলা হল, সময়বিশেষে প্রতীকের অর্থের গণ্ডী মেপে দেওয়া হয়। এখানে কৃষ্ণের শৈশব ও কৈশোরের ননীচোর, বংশীধর রাখাল পরিচয়টি তাঁর প্রাপ্তবয়সের মহাকাব্যিক সত্তাকে একেবারে গ্রাস করে ফেলল। তখনকার রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইটা অনেক বড়ো ছিল বোধহয়। অথচ বর্তমানে দেখুন, এত বাগবিতণ্ডা, এত প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, রেস্তোরাঁ হামলা, লোকের বাড়িতে হানা, খুন-জখম সব কেমন রাতারাতি শান্ত হয়ে গেল বিহারের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর।

এই উদাহরণটি দেওয়া হল এটুকু বোঝানোর জন্য যে, সাধারণ মানুষ কখনওই নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে তাদের দৈনন্দিন শান্তি ভঙ্গ করে না। তাদের খেটে খেতে হয়। খামোখা ঝগড়া-বিবাদ মারামারি-কাটাকাটিতে কালবিলম্ব করার মতো সময় কোথায় তাদের। ভারতবর্ষ অতি প্রাচীনকাল থেকেই নানান বিসদৃশ পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের বিকাশে সহায়ক হয়েছে অসহিষ্ণুতার বীজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের হাতিয়ার। যখন যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ছড়ানো হয়, সেই বীজ কখনও মহীরূহে পরিণত হয় (যেমনটি হয়েছিল এ দেশ বাটোয়ারার সময়), কখনও-বা অঙ্কুরিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ পায় না (যেমন এতকাল ফ্রান্সে পায়নি) যুদ্ধ বাধলে পুঁজিবাদী শক্তি সমৃদ্ধ হয়। তাই সন্ত্রাসবাদ ও পুঁজিবাদ একে অপরের পরিপূরক—একটু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে টেররিজমকে কেন, কীভাবে স্পন্সর করা হয়। এতে রাষ্ট্রশক্তি ও কর্পোরেটের মুনাফার জায়গাটি একটু খতিয়ে দেখলে সহজেই বোঝা যায়। পুঁজিবাদ সমাজে বৈপরীত্য, বিরোধিতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িকতাকে বাঁচিয়ে রাখে নিজ স্বার্থে। একদিকে তার জনকল্যাণকারী মুখ, অন্যদিকে অস্ত্র-শস্ত্রে তার বিপুল বিনিয়োগ। ধ্বংস না হলে নির্মাণ হবে কী করে? সহিষ্ণুতার রাজনীতিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, এ বিষয়ে ফ্রান্স, ভারতবর্ষ তথা গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশেষ তৎপর হওয়া প্রয়োজন। না হলে অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র মানব সভ্যতা সন্ত্রাসবাদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশে পরিণত হবে।

 
 
top