সার্ধশত জন্মবর্ষে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

 

এই বছর সাহিত্যিক সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০-তম জন্মবার্ষিকী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হিসেবে তিনি যতটা খ্যাত, তার থেকেও বেশি পরিচিত সম্পাদকরূপে, যদিও তাঁর লিখিত সাহিত্যের সংখ্যাও কিছু কম নয়।

১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে বাঁকুড়ার এক স্বনামধন্য সংস্কৃত পণ্ডিত বংশে রামানন্দের জন্ম। পিতা শ্রীনাথ চট্টোপাধ্যায় আর মাতা হরসুন্দরী দেবীর তৃতীয় পুত্র। পাঁচ বছর বয়সে পারিবারিক টোলে অক্ষর পরিচয় দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু হয়। একটু বড়ো হলে বাঁকুড়া জিলা স্কুলে তথাকথিত বিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ। ছোটো থেকেই অত্যন্ত মেধাবী রামানন্দ বিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি ধাপেই বৃত্তিপ্রাপ্ত হতে থাকেন এবং ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রাস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। এরপরে শুরু হয় তাঁর কলেজজীবন।

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন এবং মেসে থেকে পড়াশোনা করতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে কিছু আর্থিক সমস্যার কারণে প্রেসিডেন্সি কলেজ পরিবর্তন করে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন এবং চতুর্থ স্থান অধিকার করে এফ পরীক্ষা পাশ করেন।

জীবনের এই সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে । ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দেই বাঁকুড়া জেলার ওন্দানিবাসী হারাধন মিশ্রের ১২ বছরের কন্যা মনোরমার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে সিটি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম স্থান অধিকার করে গ্র্যাজুয়েট হন এবং রিপন স্কলারশিপ লাভ করেন।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করার জন্য তিনি স্টেট স্কলারশিপপ্রাপ্ত হন এবং ইংল্যান্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু স্বদেশভক্ত ও স্বাধীনচিত্ত যুবক রামানন্দ ব্রিটিশরাজের অধীনে কাজ করতে অসম্মত হন আর এই বৃত্তি প্রত্যাখ্যান করেন।এরপরে ১৮৯০ সালে খ্রিস্টাব্দে পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন।

রামানন্দের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর কর্মজীবন। তাঁর সামগ্রিক কর্মজীবনকে আমরা অনেকগুলি অধ্যায়ের সন্নিবেশ বলে চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর শিক্ষকতা জীবন, তাঁর পত্রিকা সম্পাদনা জীবন এবং ব্রাহ্মসমাজের একনিষ্ঠ কর্মী ও সদস্যরূপে তাঁর কর্মজীবন এবং পরাধীন ভারতবাসীরূপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সহযোগী সহযোদ্ধারূপে তাঁর কর্মজীবন।

সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পরেই তিনি ওই কলেজেই তাঁর অধ্যাপনা জীবনের সূচনা করেন। প্রায় দুই বছর তিনি সেখানে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন।পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১০০ টাকা পারিশ্রমিক দিতে সম্মত হন। এই সময় স্ত্রী মনোরমাদেবীকে তিনি কলকাতায় নিয়ে আসেন এবং একটি ভাড়া বাড়িতে নতুন সংসার পাতেন। অর্থের প্রয়োজনে তিনি হিন্দু পত্রিকার কলকাতা সংবাদদাতারূপেও কাজ শুরু করেন।

এরপর ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। তিনি এই সময় এলাহাবাদের কায়স্থ পাঠশালার কলেজ বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং পরিবারসহ এলাহাবাদে বসবাস শুরু করেন। অধ্যক্ষভার গ্রহণ করে রামানন্দ কলেজে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, ভালো শিক্ষক, ভালো গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, খেলার মাঠ ইত্যাদি উন্নত করার দিকে নজর দেন। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নীতিগত দিক দিয়ে কিছু মতবিরোধ হওয়ার দরুণ ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ও সপরিবারে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন।পরবর্তীকালে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ মাসের জন্য তিনি বিশ্বভারতীর শিক্ষাভবনের অধ্যক্ষের দায়িত্বভারও গ্রহণ করেছিলেন।

 

কলকাতায় ফিরে এসে শুরু হয় তাঁর পুরোদমে সম্পাদক জীবন। যদিও সম্পাদনার কাজে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ধর্মবন্ধু নামে একটি ব্রাহ্ম পত্রিকা সম্পাদনার মধ্যে দিয়ে। এই সময়েই তিনি ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার পত্রিকাটিরও সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং অপর একটি ব্রাহ্ম পত্রিকা সঞ্জীবনীতেও লিখতে থাকেন।

এর কিছুকাল পরে তাঁর শিক্ষাগুরু হেরেম্বচন্দ্র মৈত্রের অনুরোধে তিনি দাসাশ্রম নামক ব্রাহ্ম সমাজসেবা সংগঠনের মুখপত্র দাসী পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি সিটি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। ক্রমে দাসী পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে রামানন্দ নিজেই নিজের উদ্যোগে একটি স্বতন্ত্র পত্রিকা প্রকাশের কথা চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন, এবং অবশেষে ১৮৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে (বাংলা ১৩০৪ সাল) কলকাতা থেকে প্রদীপ পত্রিকা প্রকাশ করেন। যদিও তিনি তখন শিক্ষকতার কাজে এলাহাবাদবাসী।

অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, নারী প্রগতি থেকে শুরু করে মহাপুরুষের জীবনী প্রভৃতি বিবিধ ও বিচিত্র রচনায় শোভিত ছিল এই পত্রিকা। বাঙালি জাতিকে তার স্বগৌরবে গর্বিত করাই ছিল এই পত্রিকার উদ্দেশ্য। অলস, শ্রমবিমুখ, কাপুরুষ বলে অপখ্যাত বাঙালিজাতির এই অপবাদ দূর করার জন্য তিনি প্রদীপ মাসিকপত্রটির সম্পাদনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ছিলেন।

এই মাসিক পত্রের সূচনায় রামানন্দ জানিয়েছিলেন, শিক্ষা এবং চিত্তবিনোদন উভয়ের যথাযথ সংমিশ্রনের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া আমরা প্রদীপ সম্পাদনা ও পরিচালনার চেষ্টা করিব(প্রদীপ১৩০৪পৌষ সংখ্যা)

রবীন্দ্রনাথসহ সেই সময়কার প্রায় সব স্বনামধন্য ব্যক্তিই এই পত্রিকায় লিখেছেন। প্রদীপ-এর লেখকবৃন্দের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, স্বর্ণকুমারী দেবী, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, জলধর সেন, দিনেন্দ্রনাথ রায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। এছাড়া প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, জগদানন্দ রায়, সরলা দেবী, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রমুখ অপেক্ষাকৃত তরুণ লেখকদের লেখাও স্থান পেত।

সম্ভবত এই পত্রিকাতেই বেরিয়েছিল শ্রীম লিখিত রামকৃষ্ণ কথামৃত-র অংশবিশেষ। প্রথম দুই বছর এই পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। রামানন্দ প্রদীপ পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন ১৩০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়েই এলাহাবাদে মুনশি রামপ্রসাদের অনুরোধে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত কায়স্থ সমাচার ইংরাজি ভাষায় সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেন রামানন্দ। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে এই পত্রিকার নাম হয় হিন্দুস্তান রিভিউ

এলাহাবাদে অবস্থানকালেই রামানন্দ তাঁর বিখ্যাত প্রবাসী মাসিক পত্রিকা সম্পাদনার কাজ শুরু করেন (প্রথম প্রকাশ এপ্রিল, ১৯০১)প্রবাসী-তে সম্পাদক সাহিত্য ছাড়াও সর্বভারতীয় আবেদন, প্রবাসী বাঙালির কথা এবং উচ্চমানের দেশি-বিদেশি চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের চিত্ররূপ প্রকাশে মনোযোগী ছিলেন। ধীরে ধীরে প্রবাসী বাংলা সাহিত্যজগতের প্রতিনিধিস্থানীয় পত্রিকায় পরিণত হয়।

প্রবাসী পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যরূপে রামানন্দ বলেছিলেন পত্রিকাটিকে প্রথম শ্রেণির লেখকদের রচনাসম্ভারে পূর্ণ করা, নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা, প্রত্যেক লেখককে সামান্য হলেও কিছু সম্মানদক্ষিণা দেওয়ার রীতি প্রবর্তন করা, সর্বোপরি পত্রিকাটিকে স্বদেশিভাব ও ভাবনা প্রচারের বাহন করে তোলা।

সমসাময়িক প্রায় সমস্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিকই প্রবাসী পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, যেমন শিবনাথ শাস্ত্রী, রামপ্রাণ গুপ্ত, রজনীকান্ত গুহ, অপুর্বচন্দ্র দত্ত, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ চৌধুরী বেদান্তবাগীশ, দেবকুমার রায়চৌধুরী, জ্ঞানেন্দ্রনাথ দাস, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, নগেন্দ্রচন্দ্র সোম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ। তবে তাঁদের সকলের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রবাসীকে মূলত রবীন্দ্রকেন্দ্রিক পত্রিকা বলা চলে। শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের বিবিধ রচনা প্রবাসী-কে আকর্ষক করে তুলেছিল। বিশেষত গোরা উপন্যাস (ভাদ্র ১৩১৪ থেকে চৈত্র ১৩১৬ পর্যন্ত), জীবনস্মৃতি (ভাদ্র ১৩১৮ থেকে শ্রাবণ ১৩১৯ পর্যন্ত), অচলায়তন নাটক (আশ্বিন ১৩১৯), মুক্তধারা নাটক (বৈশাখ ১৩২৯), রক্তকরবী নাটক(আশ্বিন ১৩৩১), শেষের কবিতা উপন্যাস (ভাদ্র-চৈত্র ১৩৩৫), কর্তার ইচ্ছায় কর্ম (ভদ্র ১৩২৪), ছোট ও বড় (অগ্রহায়ণ ১৩২৪), শিক্ষার মিলন (আশ্বিন ১৩২৮), সত্যের আহ্বান (কার্তিক ১৩২৮), সমস্যা ও সমাধান (অগ্রহায়ণ ১৩৩০); এমনকি রাশিয়ার চিঠি থেকে সভ্যতার সঙ্কট পর্যন্ত প্রবন্ধাবলীর প্রকাশের মাধ্যম ছিল প্রবাসী পত্রিকা।

মাসিক পত্রিকায় বহুবর্ণ চিত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে রামানন্দ ছিলেন পথিকৃৎ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সব ছবি - সুজাতা ও বুদ্ধ, বজ্রমুকুট ও পদ্মাবতী, সাজাহানের মৃত্যু, বিরহী যক্ষ, ভারতমাতা, দীপান্বিতা, লঙ্কায় বন্দিনী সীতা ইত্যাদি বহুবর্ণ চিত্রের একবর্ণ প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী-তে। শিল্প সমালোচক অর্দ্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের (.সি. গাঙ্গুলী) আত্মপ্রকাশও ঘটে এই পত্রিকায়।

কলকাতায় অবস্থানকালে রামানন্দের সম্পাদিত অপর গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা হল ইংরেজি মাসিক পত্রিকা দ্য মডার্ন রিভিউ (প্রকাশ ১৯০৭)। পত্রিকাটির প্রথমে নাম ছিল দ্য মডার্ন রিভিউ অ্যান্ড মিসেলেনি। বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করা এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল না, পরাধীন বুদ্ধিজীবী ভারতবাসীর মুখপত্র হয়ে উঠেছিল এই পত্রিকাটি। জওহরলাল নেহরু পর্যন্ত চাণক্য ছদ্মনামে রাষ্ট্রপতি শীর্ষক আত্মসমালোচনা লেখেন দ্য মডার্ন রিভিউএর পাতায় (১৯৩৭ নভেম্বর)। ফলে শুধুমাত্র বাঙালিদের মধ্যে নয়, সারা ভারতবর্ষেই ছড়িয়ে পড়ল সম্পাদক রামানন্দের নাম।

এই পত্রিকার লেখকসূচিতে ছিলেন শিল্পরসিক হ্যাভেল, সুপণ্ডিত হেরেম্বচন্দ্র মৈত্র, ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার, সিস্টার নিবেদিতা, কৃষ্ণলাল মোহনলাল কাভেরি, রজনীকান্ত গুহ, এ.ওয়াই.চিন্তামণি, শিবনাথ শাস্ত্রী, বামনদাস বসু, আনন্দ কুমারস্বামী, দীনেশ ওয়াচা, লালা লাজপত রায় প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। প্রথম থেকেই এটি জাতীয়তাবাদী পত্রিকারূপে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, ফলে সরকারের আক্রোশেও পড়তে হয়েছিল।

পূর্বস্মৃতি গ্রন্থে শান্তা দেবী লিখেছেন, বাবাকে ইংরেজ সরকার মোটেই ভালো চোখে দেখতেন না। মডার্ন রিভিউ প্রকাশিত হবার পর থেকে তাঁদের রাগ আরও বেড়ে গেল। কোনো প্রকারে তাঁকে তাড়াতে পারলে তাঁরা বাঁচেন….১৯০৮-এ বাবার লেখায় কী একটা ছিদ্র পেয়ে সরকারপক্ষ হুকুম করলেন যে মডার্ন রিভিউ বন্ধ করতে হবে, নয় সম্পাদককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এলাহাবাদ ছেড়ে যেতে হবে।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কর্মজীবনের অপরদিক হল ব্রাহ্মসমাজের একনিষ্ঠ কর্মী ও সদস্যরূপে তাঁর বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে রামানন্দের আজীবন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। বাঁকুড়ায় এবং এলাহাবাদে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দাসাশ্রম কমিটির সভাপতিরূপে তিনি দেওঘরে কুষ্ঠাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং রুগ্ন মরণাপন্ন রোগীদের সেবায়  অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। দাসাশ্রমের সেবার ভাব এলাহাবাদেও ব্রাহ্মসমাজের বিভিন্ন কাজে লক্ষ করা গেছে। সাপ্তাহিক উপাসনা ও বাৎসরিক উৎসব ছাড়া এলাহাবাদে ব্রাহ্মসমাজের প্রধান কাজ ছিল প্লেগ, বসন্ত, কলেরা আক্রান্ত রোগীদের সেবা করা। দুর্ভিক্ষ ও ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়েও রামানন্দ সেবাকর্মে আত্মনিয়োগ করেন।

তবে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাধারণীদের মতো সবরকম হিন্দু সংস্কার তিনি বিসর্জন দিতে পারেননি। রাজনারায়ণ বসুর মতো তিনিও ব্রাহ্মধর্মকে হিন্দুধর্মের সমুন্নত আকার বলে মনে করতেন।

কন্যা শান্তা দেবী জানিয়েছেন, রামানন্দ নিজে ব্রাহ্মধর্মকে হিন্দুধর্ম হইতে উদ্ভূত বলিয়া জানিতেন এবং বিশ্বাস করিতেন বলিয়া যে-সকল হিন্দু অনুষ্ঠান ও আনন্দে উচ্চনীচ ভেদ কিংবা প্রতীক পূজার বাধা ছিল না, তাহা তিনি কখনো বর্জন করেন নাই। তিনি যে শুধু নিজে পালন করিতেন তা নয়, অপরকে তৎপালনে উৎসাহী করিতেন। নিজ মাতার শ্রাদ্ধে তিনি অপর ভাইদের সঙ্গে সমস্ত নিয়ম পালন ও মস্তক মুণ্ডন করিয়াছেন, নিঃসন্তান দিদির মৃত্যুর সময়ও এই সকল নিয়ম পালন করিয়াছেন। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ায় দূর প্রবাস হইতেও প্রতি বৎসর ভগিনীদের তিনিই প্রথম স্মরণ করিয়াছেন, দীপান্বিতা অমাবস্যায় পুত্র কন্যা ও পৌত্রী দৌহিত্রীদের লইয়া আলোয় ঘর সাজাইয়াছেন এবং বিজয়ায় বহু প্রিয় আত্মীয়-স্বজনকে আশীর্বাদ ও প্রণাম জানাইয়াছেন।

তবে তিনি ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে বা তাদের কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকলেও তাঁর সম্পাদিত প্রবাসী বা দ্য মডার্ন রিভিউ পত্রিকা কখনই ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র হয়ে ওঠেনি। ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে একযোগে সেবামূলক কাজ করতে করতে তিনি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরেন। এলাহাবাদ অবস্থানকালে তিনি মদনমোহন মালব্যের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এডুকেশনাল কমিটিতেও কাজ করেন। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের প্রায় প্রতিটি অধিবেশনে তিনি উপস্থিত থেকেছেন, কংগ্রেসের মঞ্চে তাঁকে লালা লাজপত রায়, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, মহাত্মা গান্ধী, তেজবাহাদুর সাপ্রু, অ্যানি বেসান্ত, বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে দেখা গেছে। কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী বিরোধের সময় তিনি মনে করেছেন উভয়কে মিলিতভাবে সংগঠনমূলক কাজে এগিয়ে আসতে হবে।

রামানন্দের উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদী চিন্তা ভাবনাকে ডেভিড কফ ক্রিয়েটিভ ন্যাশানালিজম বলে অভিহিত করেছেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে রামানন্দ লিগ অফ নেশনসের বা জাতিসংঘের সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দেতিনি সান্ডারল্যান্ড লিখিত ইন্ডিয়া ইন বন্ডেজ, হার রাইট টু ফ্রিডম গ্রন্থটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের রাজদ্রোহিতার রোষে গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনায় তৎকালীন রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ওঠে এবং গান্ধীজি তাঁর ইয়াং ইন্ডিয়া পত্রিকায় কড়া সমালোচনা লেখেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে সুরাটে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার দ্বাদশ অধিবেশনে রামানন্দ সভাপতিত্ব করেন। পরবর্তীকালে ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর হিটলারের নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদে ভারতীয় বামপন্থী লেখক-শিল্পী সংগঠন যে জনমত সংগ্রহে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তরুণ বামপন্থী লেখক সোমেন চন্দের নিষ্ঠুর হত্যার প্রতিবাদে কলকাতায় যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক সম্মেলন হয় সেখানেও পৌরোহিত্য করেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

রামানন্দের স্বাজাত্যবোধ, নির্ভীক দৃপ্ত লেখনী তাঁকে সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্যিক সাংবাদিকদের থেকে  পৃথক পরিচিতি দান করেছিল। সারাজীবন দেশের প্রতি তাঁর অবিচল ভক্তি ও প্রীতি জাগরূক ছিল। সাংসারিক ও পারিবারিক দিক দিয়ে তিনি চিরকালই এক সুযোগ্য পতি ও পিতার ভূমিকা পালন করে এসেছেন। তাঁর স্ত্রী মনোরমা দেবী সারাজীবন যোগ্য সহধর্মীনীর মতোই তাঁর জীবনের বিভিন্ন চরাই উৎরাই-এ তাঁর পাশে থেকেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল পারিবারিক পর্যায়ের। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে কাটান। কিন্তু ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মুলুর (প্রসাদ) আকস্মিক মৃত্যুর পরে তিনি মানসিক ও শারীরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। পুত্রশোকাতুরা স্ত্রী মনোরমা দেবীকে নিয়েও শেষজীবনে তাঁকে বহু দুশ্চিন্তা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও তাঁর দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল এবং ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুও তাঁকে বিশেষভাবে বিচলিত করে তুলেছিল। এরপর কিছুদিন রোগভোগের পর ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা সীতা দেবীর বাড়িতে ৭৯ বছর বয়সে এই নির্ভীক কর্মযোগীর মৃত্যু হয়।

 

ঋণস্বীকার

কোরক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা, বইমেলা, ২০১৫

প্রবন্ধ পঞ্চাশৎপ্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, আনন্দ, আগস্ট ২০১১

 
 
top