শব্দনগর

 

‘কিছু কিছু দুঃখের কথা পথে বিপথে ঘুরে, সবার অবজ্ঞা পেতে পেতে, ব্যস্ত জীবনের ধুলো ধোঁয়ায় হারিয়ে যায়। এরপর পৃথিবীর সব কোলাহল থিতিয়ে এলে সবার অজান্তে মেঘের বুকে জমে জমে ভারি হয়। তারপর কোনও একদিন মিহি বৃষ্টির মতো ঝিরঝির গান হয়ে ফিরে আসে। বুঝলি নূপুর, পারু পাগলি সেই সব দুঃখ চেনে, তাই ওর গলা এত মিষ্টি।’

পরানবুড়োর কথা শুনে নূপুর মৃদু ঘাড় হেলায়। এরপর আকাশের দিকে তাকায় মেঘ করেছে কি-না দেখতে। নুপুরের পরানবুড়োর কথাগুলোকে সবসময় জ্যান্ত বলে মনে করে। তাই চারপাশে খুঁজে দেখে কথাগুলো কোথাও দৃশ্য হয়ে জন্মাচ্ছে কি-না। পরানবুড়োরও এমনি অদ্ভুত কথা বলতে ইচ্ছে হয় নূপুরকে পেলে। বোবা মেয়েটার তো পালটা প্রশ্ন করা সম্ভব নয়। কথাটার মাঝে পালটা কথার অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা নেই। তাই পরানবুড়ো নূপুরকে পেলে নিশ্চিন্তে বকে যেতে পারে। পরানবুড়ো জানে নূপুর এই শব্দনগরের কেউ নয়। এই ব্যস্ততার কোলাহলে নুপুরের অংশগ্রহণ নেই। তাই এই শব্দনগর ওকে নিজের বলে মানে না।

পরানবুড়ো নুপুরের দিকে তাকায়। কী সুন্দর টলটলে দিঘির মতো চোখ মেয়েটার। কিছু না বলেও কত কথোপকথনের মুহূর্ত তৈরি করে চলে যায়। হয়তো এই শব্দনগরে আবর্জনার মতো পড়ে থাকতে হবে। প্রমোদে মত্ত এই শহরে কে পড়বে ওর চোখের ভাষা? ভাবতে ভাবতে পরানবুড়োর বুকটা চিনচিন করে ওঠে।

‘পারু এক দেশের কথা জানে। যেখানে আজও নিরুচ্চার ভাষা মানুষ বুঝতে পারে। তবে সে খবর ওর মুখ থেকে বার করা শক্ত। আমি তো অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। তুই যদি পারিস দেখ!’

নুপুরের কাছে এমন খবর রহস্য গল্পের মতো মনে হয়। সে গল্পের শেষটা চটপট জেনে ফেলার কৌতূহল নিয়ে ছোটার মতো করে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছয় বড় রাস্তার ওপারে নিকাশি খালের ধারে পারুর ঝুপড়ির কাছে। এই খালটা এক সময় নয়ানজুলি ছিল। শালুক ফুল ফুটে থাকত শরৎকালে। রংবাহারি মাছরাঙা গাছের ডালে বসে থাকত। ছোটবেলায় নূপুর দেখেছে। এখন সেই সব স্মৃতিকে বিশ্বাসই হয় না নুপুরের। তবুও নুপুরের সাথে মাঝে মাঝে ম্যাজিক হয়। যেমন এই মাত্র কোত্থেকে একটা মাছরাঙা উড়ে এসে ওর চোখের সামনে খালের ঘোলাটে জলের ওপর একটা মসৃণ জলপথচিহ্ন এঁকে দিয়ে চলে গেল। কোথা থেকে উড়ে গেল পাখিটা? নুপুরের স্মৃতির ভেতর থেকে? নূপুর অবাক হয়ে জলের দিকে চেয়ে রইল। মনকেমন করা একটা বিকেলের মধ্যে যেন হারিয়ে গেছে সে। এটা কি কোনও দুঃখ যা নূপুরকে ছুঁয়ে আছে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া সময়ের মতো? নুপুরের মনে হল, এ কেমন দুঃখ? এমন কিছু যা পারু চেনে, কিন্তু নূপুর চেনেনা? না কি দুঃখই ওকে চেনা দেয় না? ও সে সব কথা সুর করে গাইতে পারবে না বলে।

এখন শহরে একটু দমকা হাওয়া উঠেছে। এলোমেলো উড়ান দিয়েছে খানকতক ফেলে দেওয়া পলিথিন প্যাকেট। নূপুর ধুলোর ঝাপটে চোখ বন্ধ করে নিল। তার কানের পাশ দিয়ে কিছু অর্থহীন ফিসফিসানি বয়ে চলে গেল হওয়ায়। কারা যেন কিছু বলাবলি করছিল নিজেদের মধ্যে।

নুপুরের ইশারা দেখে পারু তো হেসে খুন। সে মৌনমুখর দেশের খবরের ইশারাটা না বুঝে বিদ্রূপ করছে যেন। নুপুরের ব্যাপারটায় বেশ অপমান লাগল। সে মুখ ফিরিয়ে চলে আসছিল। তবে নূপুর জানে পারুর ওপর রাগ-অভিমান করা বৃথা। ওর আচরণে আজকাল কোনও সামঞ্জস্য নেই। তাই লোকে ওকে পারু-পাগলি বলে ডাকে। খাবারের স্টলের লোকেরা শেষরাতে সব হুল্লোড় চুকেবুকে গেলে উচ্ছিষ্ট খাবারের কিছু ভাগ দেয়, শরীর প্রদর্শনের বিনিময়ে।

ভাবতে ভাবতে নূপুর নরম দৃষ্টিতে একবার পারুর দিকে ফিরে তাকিয়ে আবার সামনের পথে নজর ফিরালো। আর তখনই সে দেখতে পেল বাতাসে ফিসফিস করা লোকগুলোকে। লোকগুলো একটা ধুলো-মলিন জামা পরা যুবককে নূপুরকে দেখিয়ে দেখিয়ে কিছু বলছে। নুপুরের বিষয়টায় বেশ ভয় ধরে গেল। এই লোকগুলো যদি হঠাৎ নূপুরকে আক্রমণ করে তাহলেও এই শব্দনগরের লোকেরা ঘটনাটা দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। এই তো পারুর বরটাই ওই দিকের ফুটপাতে একটা পুরনো নীচু ল্যাম্পপোস্টে গলায় দড়ি দিল আলো ঝলমল সন্ধ্যায়। শব্দনগরের রাস্তায় তখন ব্যাস্তসমস্ত লোকে ছড়াছাড়ি। কেউ দেখতে পেল? কেউ বাধা দিতে এগোল?

শব্দনগর জুড়ে সেদিন কী উৎসব! কী উৎসব! পারু মৃতদেহের সামনে কাঁদতে বসে হেসে গড়িয়ে পড়ল। উৎসবে কাঁদলে সবাই দুয়ো দেবে। শেষে যখন হাসতে হাসতে চোখের জল বাঁধ ভাঙল, তখন নতুন খবর হতে পারে এই লোভে কয়েকটা ক্যামেরার ফোকাস আছড়ে পড়ল পারুর ওপর। ফলে কেউ কেউ টিভিতে দেখল কাণ্ডটা। দেখে ভাবল গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়াটাও উৎসবেরই অংশ। কিছু স্বঘোষিত ভাবুক কড়া ভাষায় আলোচনা করল উৎসবের তলানিতে কত বিষাদ পড়ে থাকে সে বিষয় নিয়ে। তাদের ভাবনা কাগজে পড়ে কবিতা লিখল কবিরা। পারু পাগলি সাময়িকভাবে খবরের মুখ হয়ে গেল। এই ঘটনার পর অনেকদিন গড়িয়েছে। শব্দনগর আবার আগের মতো নিরুপদ্রব প্রমোদে ফিরে গেছে।

তবে পারুর পরিচিতিটা রয়ে গেছে। লোকে দেখলে চিনতে পারে। ফুটপাতে গান ধরলে টিকিট কাটার মতো করে পয়সা দেয়। ফলে সেই দিনগুলোতে পারু গলি রাস্তার খাবার গুমটি থেকে কিছু কিনে খেতে পারে কাপড়-চোপড় না খুলেও। কিন্তু সব দিন তো দুঃখ আসে না গান হয়ে ঝরে পড়ার জন্য।

মলিন জামা পরা যুবকটা নূপুরকে ফ্যালফ্যাল করে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। অন্য লোকগুলো নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে করতে নুপুরের পিছু নিল। নূপুর ভয়ে দৌড় লাগিয়েও থমকে গেল। পিছন ফিরে দেখল লোকগুলোও থমকে গিয়ে অপেক্ষা করছে কখন নূপুর আবার দৌড় শুরু করবে। তখন তাঁরা আবার পিছু নেবে। আশ্চর্য এ কেমন তাড়া করা যাতে ধরে ফেলার কোনও তাড়া নেই! নূপুর নিজের চলার অভিমুখ পালটে লোকগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। দেখল লোকগুলো ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। যেন এগোবে না পিছোবে তা ঠিক করতে পারছে না। পালাবে না, মুখোমুখি হবে। সব গোলমাল হয়ে গেছে ওদের। নূপুর লোকগুলোর সামনে গিয়ে উপস্থিত হল। লোকগুলো মাথা হেঁট করে দুঃশ্রাব্যভাবে কী যেন বলতে চেষ্টা করল কয়েকবার। তারপর মাথা নামিয়েই চলে গেল।

পরদিন পরানবুড়ো বলল, ‘শুনলাম তুই নাকি ফিসফিসিয়েদের কবলে পড়েছিলি?’

নূপুর হ্যাঁ-বাচক ঘাড় হেলিয়ে স্থির চোখে চেয়ে রইল পরানবুড়োর মুখের দিকে।

‘ওরা একরকম বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মানুষ। ওদের কথা হুল্লোড়ে চাপা পড়ে গেছে। তাই ওরা প্রাণপণ চেঁচালেও বিড়বিড় করছে মনে হয়। এখন কাউকে নিজেদের কথা শোনাতে না পেরে, নিজেরা মস্তির মিছিলে মিশতে না পেরে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। ওরাও বোধহয় তোর মতোই নৈঃশব্দ্যের দেশ খুঁজছে। তাই তোকে ফলো করছিল। কিছু বুঝতে কি পারলি কী বলতে চাইল? শুনছি ওরা এমন একজনকে পেয়েছে যে না কি তোকে নিয়ে গল্প লিখছে।’

ঘরে একা নূপুর ভেবে বে-আকুল হলো। ওর নিজের আবার কী গল্প আছে? হ্যাঁ বাড়ির লোকের কিছু হুঁশিয়ারি আছে। তার থেকে লুকিয়ে পালিয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি আছে। তবে তার গল্প কোথায়? যে বৃষ্টির দিকে অপলক চেয়ে থেকেও দুঃখ চিনতে পারে না। তার আবার গল্প হয় কী করে?

‘তুমি নাকি সন্ধের দিকে ওভারব্রিজে হেঁটে বেড়াচ্ছিলে? মুখে ভাষা নেই বলে শব্দনগরে নিশ্চিন্ত থেকো না। ভাবছো “আমাকে দেখুন” বলে চিৎকার করতে পারছ না বলে কেউ লক্ষ্য করবে না। আয়নায় নিজের শরীর দেখ। শরীরের কিছু ভাষা আছে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। সেটা তেমন কারও নজরে পড়লে বুঝবে ঠেলা। ভ্যাগাবন্ডদের মতো ঘোরা বেরিয়ে যাবে!’

মা ধমকে নিষেধাজ্ঞা জারি করা শুরু করল।

নূপুর এগুলোকে পাত্তা দেবার জন্য একবেলা নিজেকে গৃহবন্দি রাখে। তারপর আবার নিজের খেয়ালের জগতে পাড়ি দেয়। তবে আজ বোধ হয় মায়ের নিষেধকে ওইটুকু সম্মান জানানো সম্ভব হবে না। দু-দুটো বিষয় তার মাথায় সাড়া ফেলেছে।

প্রথমত, নতুন দেশের কথা পারুর থেকে উদ্ধার করতে হবে। আর তার নিজের গল্পটা কেমন তাও জানতে হবে। আশ্চর্য যে গল্প সে নিজেই জানে না। অথচ কেউ একজন সেই গল্পটা বানিয়ে চলেছে! আচ্ছা গল্পের পটভূমিটা সেই চুপকথার দেশে নয় তো? তাই লেখকও সেটা জানবে বলে নুপুরের পিছু নিয়েছে?

নূপুর পরানবুড়োর কাছে একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে ঘটনা জানতে চাইল। পরানবুড়ো বলল, ‘পারু পাগলির বর সংবিৎ, সুধামুখী গ্রামের পোস্ট পিয়ন ছিল। বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতে গিয়ে গ্রামের অবুঝ মানুষদের চিঠি পড়ে দিত। সেই সব মানুষের চিঠি, যাদের ছেলে, স্বামী, প্রেমিক, বন্ধু জীবিকার টানে দূরে চলে গিয়েছিল। এছাড়া তাকে নিজেকে কিছু মনগড়া কথা লিখতে হতো তাদের জন্য, যাদের এই বিশ্বপ্রকৃতি থেকে কিছু বার্তা পাওয়ার ছিল। সে সব চিঠিতে থাকত কত অল্প আগোছালো অসম্পূর্ণ কথা। “কেমন আছো?” এই ছোট্ট প্রশ্ন। কিন্তু তার মধ্যে-ই কেমন কল্যাণময় জিজ্ঞাসা, দরদি সংলাপ।পড়ে দিতে দিতে, গল্প তৈরি করে সেসব অনুভূতি ধরে দিতে দিতে সংবিৎ নিজেকে ভরে নিত। দিনশেষে ঘরে এসে পাগলের মতো আদর করত পারুকে। কেমন রূপকথার গল্পের মতো না?’

নূপুর নীরবে সায় দিয়ে পরানবুড়োর মুখের দিকে চাইল।

‘এরপর একদিন শব্দনগর নিজেকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল। সুধামুখী গ্রামের দোরগোড়ায় নিজের হুল্লোড় নিয়ে টোকা দিল। নিজের জমকালো বিজ্ঞাপন করল। পারুদের গ্রামের অলস লোকেদের কাছে সে এক নতুন ঘটনা। চোখধাঁধানো আলোর ঝলকানি, মন ভুলানো রঙীন স্বপ্ন। ঘোর লেগে সবার মাথা বশ্যতা স্বীকার করল।

‘যে লোকগুলো নির্জনে অল্প আগোছালো কথায় ভাব বিনিময় করত। শব্দনগরে কলকে পাবার লোভে তারা বাড়িয়ে বলতে শিখল। শব্দনগরের চকচকে চেহারার বাসিন্দাদের মতো হবে বলে শরীরে রঙ বোলাতে লাগল। তার নিজের সেই সব রংমাখা শরীরে টপাটপ আপলোড করতে শুরু করল মায়াবাজারে। আর সারাদিন জুলজুলে চোখে বসে থাকল কতজন পছন্দ করছে সেই সংখ্যা গুনবে বলে।

‘বেচারা সংবিৎ আর কী করে? কিছু ব্যক্তিগত অব্যক্ত অনুভূতি থাকলে তবেই না লোকের কাছে তার কদর থাকবে! মায়াবাজারের ত্বকের ওপরেই সব শুরু ত্বকের ওপরেই সব শেষ।

‘সংবিৎ শব্দনগরের অধঃক্ষেপ হয়ে গেল আরও পাঁচজনের মতো। মানুষ কখন নিঃস্ব হয় জানিস নূপুর? যখন সে শূন্যতার আবর্তে ঘুরে মরে। প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে কিছু না পেয়ে পেয়ে, ফের খেপার মতো খুঁজে মরে প্রিয় কিছুর জন্য। খুঁজতে খুঁজতে নিজের জমানো রসদ ফুরিয়ে যায়, নতুন কিছু জোটে না। তখন সে কেবল ক্লান্ত হয়, ক্লান্ত হয়। এই ক্লান্তি থেকে কখনও বেরোতে না পেরে মুক্তির জন্য নিজেকে শেষ করে দেয়। সংবিৎ নিজেকে শেষ করে দিয়েছিল।’

শুনতে শুনতে নুপুরের চোখ বাষ্প জমে ঝুঁকে পড়ল। তার মনে হল, রূপকথা ফুরলে কি দুঃখ হয়? কে জানে, হয়তো পারু জানে।

পরানবুড়ো বলল, ‘নিজেকে শেষ করে দেবার আগে সংবিৎ একটা ঠিকানা খুঁজছিল। সেটাই মনে হয় সেই বাঙ্ময় নীরবতার দেশের ঠিকানা। পারু নিশ্চয় ব্যাপারটা জানবে। হয় ও শব্দনগরে কান্না পেয়ে যাওয়ার অপরাধ হবে বলে মনে করতে চাইছে না, কিংবা ভুলে গেছে।’

নুপুরের ডাইরির পাতা মেলে ধরে বাবা চেল্লাতে লাগল।

‘নূপুর তুমি ডাইরিতে এসব কী লিখেছ? সুধামুখী গ্রামের খবর তোমায় কে দিল? এসব নিয়ে চিন্তা করে তুমি পিছিয়ে পড়তে চাও? অনেক সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়ে তোমার ছোটবেলার হাবিজাবি চিঠি লেখার ব্যামো সারিয়েছি। নতুন করে এই নগরে তোমার স্মার্ট পুনর্জন্ম হয়েছে। আর তুমি কি না আমাদের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে আবার পুরনো পাগলামিতে মাথা গলাতে শুরু করেছ! তোমার একা বাইরে বেরনো বন্ধ আজ থেকে! এবার থেকে যেখানে সবাই যাবে সেজেগুজে তুমি তাদের সঙ্গে যাবে। ব্যাস!’

নূপুর মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রাগে, ক্ষোভে মাথা ঝাঁকিয়ে বাবাকে ইশারায় বোঝাতে চাইল, তার মানে আমার কোনও নিজস্ব গল্প আছে। তোমরা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছ সেটা।

বাবা বোধহয় ইশারাটা বুঝল। বুঝে মুখটা কঠিন করে বলল, ‘এই শব্দনগরে সবার একটাই গল্প। তেমনটাই বাস্তবে হওয়া নিয়ম। যার অন্য গল্প আছে, সে অবাস্তব!’

নূপুর রাতে বিছানায় গড়িয়ে ছটপট করতে লাগল। কিছুতেই তার ঘুম আসছে না কেন? তবে কি সে ঘুম আসার মতো ক্লান্ত হয়নি? পরানবুড়ো বলে, বোকারা কখনও ক্লান্ত হয়না।

তাহলে সে কি বোকা হয়ে গেছে? ওই মলিন জামা পরা যুবককে খুঁজে পাওয়া দরকার। ও নিশ্চয় জানে, গল্পের সুত্রটা জানে, না হলে বাকিটা বানাতে পারত না। নূপুর মায়াবাজারের দরজা খুলে লক্ষ মুখের মধ্যে সন্ধান করল। এখনও কীভাবে কেউ মায়াবাজারের দেওয়ালের বাইরে রয়ে গেছে কে জানে। তাহলে নূপুরকে নিয়ে ছেলেটা জানল কী করে? ও কি নুপুরের পিছন পিছন আসে? বাড়ির বাইরে রাস্তায় অপেক্ষা করে। নূপুরকে নিয়ে তার জিজ্ঞাসা খোলা জানলা দিয়ে জ্যোৎস্নার সঙ্গে মিশে এসে নুপুরের শরীরের ওপর ঘোরাঘুরি করে?

নূপুর উৎসুক হয়ে বিছানা থেকে উঠে জানলা খুলে দিল। একটা মিষ্টি গান ভেসে আসছে হাওয়ায়। কে গাইছে? পারু পাগলি? পারু সুরে ছন্দে বলছে,’একটা বিষণ্ণ কথার বীজ মাটিতে ফেলে দিয়েছিলাম কেউ শুনতে চায়নি বলে। রোদ বৃষ্টির যত্নে তা কথাগাছ হয়ে আকাশে মাথা তুলেছে। শাখায় শাখায় পাতার আড়ালে নতুন কুড়ি এসেছে, কিছু ফুল পাপড়ি মেলেছে নিঃশব্দে। এই বসন্তের নিঃসঙ্গতায় আমি ফিরে এসে কোল পেতে বসেছি গাছতলায়। হে বৃক্ষ তোমার কিছু কথাকলি আমার ওপর ঝরে পড়ুক। আমি তাদের হাতে তুলে নিজের পুরনো আশ্রুর ওপর ছোঁয়াই।’

পারু পাগলির গানের এ কেমন অদ্ভুত কথা। নুপুরের মন বিষাদে ছেয়ে যেতে লাগল গানের প্রবাহের সাথে সাথে। তার চোখ জলে ভরে এল। কিছু দুঃখের কথা মেঘের স্তরে স্তরে জমে থেকে বৃষ্টির মতো ফিরে আসে। সেই বৃষ্টিই কি জমছে নুপুরের চোখে? নুপুরের মনে হল, একবার ওকে পারুর সামনে যেতেই হবে। নূপুর দরজা খুলে, গেট খুলে দৌড়ে বেরিয়ে এল শেষ রাতের রাস্তায়। কুকুরগুলো কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে ফুটপাতে ঘুমনো মানুষগুলোর গা ঘেঁষে। শব্দনগরের ঝিনচ্যাক শব্দ আপাতত বিশ্রাম নিচ্ছে পরের ব্যস্ত দিন শুরু হলে আবার বেজে উঠবে বলে। দুটো রাতপাখি জঞ্জালের স্তূপের মধ্যে কীটনাশকে মরা ইঁদুর, পতঙ্গ খুঁজছে পেট ভরাবে বলে। ওরা হৈচৈয়ের দাপটে শিকার ধরার পরিবেশ পায়না দীর্ঘদিন। মধ্যরাত্রি পর্যন্ত মত্ত হুল্লোড়ে নিজেকে প্রকাশ করতে না পারার ক্ষোভে একজন মাতাল মদে বিষ মিশিয়ে বাকি মাতালদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।

নূপুর দ্রুত পায়ে পারুর কাছে গেল। পারুর হাত দুটো ধরল নিজের দুহাতের মধ্যে। গানের কথাগুলো কোন অতীত থেকে উঠে এসে নুপুরের ভেতর নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। এই গানের সাথে কী যোগ নুপুরের?

নূপুর পিছন ফিরে দেখল ফ্লাইওভারের নিচের আলোছায়া ফিসফিসিয়েরা জড়ো হয়ে তাকে দেখছে। নূপুর জলদি পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইশারায় জানতে চাইল, পারু পাগলির গান তাঁরা শুনেছে কিনা।

লোকগুলো ফিসফিস করে জানাল, ও গান তো নুপুরের-ই।

এই মুহূর্তে শব্দনগরের শব্দগুলো থেমে আছে। অপেক্ষা করছে আরেকটা ব্যস্ত সূচনার। তাই চারপাশের নিস্তব্ধতায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় মানুষগুলোর কথা।

নূপুর বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

‘ছোটবেলায় তুমি এলোমেলো কথায় গাছ, পাখি, নদী, মেঘকে চিঠি লিখতে নূপুর। তুমি থাকতে সুধামুখী গ্রামের পাশ দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে তার ওপারে। তোমাদের পুরাতন ভৃত্য পরান মণ্ডল তা পোস্ট করে আসত। কোথাও কোনও ঠিকানা থাকত না বলে দপ্তর থেকে সেই চিঠি চলে যেত সুধামুখী গ্রামের পাগলা পিওন সংবিতের কাছে। একজন ছোট্ট মেয়ের দুঃখ, অভাব, অভিযোগের ট্যারাবেঁকা অক্ষরের এক অন্য জগৎ। সংবিৎ সেই জগতের সন্ধান দিয়ে ফিরত সুধামুখীর কথাকারদের। তখন সে মগ্ন ছিল নতুন জগতের গল্প নিয়ে, চিঠির উৎস জানার প্রয়োজন বোধ করেনি।

‘কিন্তু যখন নিঃস্ব হয়ে এই এখানে এসে পড়ল, তখন শব্দনগরে গোলধাঁধায় ঘুরে ঘুরে তোমার সন্ধান করে ফিরেছে সংবিৎ। পায়নি। তোমার বাবা তোমায় কোথায় লুকিয়ে ফেলেছিল। খোঁজ পায়নি। সেই উৎসবের দিনে যে দিন সংবিৎ পোস্টে ঝুলে পড়ল। যেদিন টিভিতে পারুকে কাঁদতে দেখে শব্দনগরের সবাই শহরে ভিনগ্রহের প্রাণী এসেছে বলে মনে করেছিল। সেদিনের পর থেকে পরানবুড়ো তোমার স্মৃতিতে একটু একটু আঁচড় কাটতে শুরু করে ভয়ে ভয়ে। যদি তোমার বাবা আপত্তি করে।’

শুনতে শুনতে নুপুরের চোখের জল গাল বেয়ে নামতে লাগল। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। প্রতিবন্ধী বলে কত অবজ্ঞা, অপমানকর অনুগ্রহ, করুণা, কটাক্ষ সহ্য করতে হতো তাকে। বন্ধুবিহীন একলা দিনগুলোয় খাতায় গাছ, নদী, মেঘ এঁকে তাদের মনের কথা লিখে জানাত নূপুর। কত দুঃখের কথা। যা শোনবার মতো তখন কাছে কেউ ছিলনা। সেই দুঃখের কথাই ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো গান হয়ে ফিরে এল এত বছর পর।

‘শেষের দিনগুলোতে তোমার চিঠিগুলোকে পকেটে নিয়ে ঘুরত সংবিৎ।’

নূপুর বিহ্বল হয়ে ঘাড় ঝাঁকিয়ে ইশারায় জানতে চাইল সেই চিঠিগুলো কোথায়।

‘সংবিতের পকেট থেকে সেগুলো পেয়েছিল ওই লাশকাটাঘরের পাহারাদার ছেলেটা। ও শব্দনগরের আরেকজন তলানি। এক সময় সুধামুখীতে থাকত। সংবিৎকে চিনত। ও তোমাদের গল্প লিখে রাখছে আমাদের মতো বিলুপ্তপ্রায় পাঠকদের জন্য।’

‘ও কি ওই চিঠিগুলো আমার আরেকটিবার আমায় ফিরে পড়ার জন্য দেবে না?’ বাক্যটা বলতে না পারায় শব্দগুলো নুপুরের চোখের জল হয়ে গড়িয়ে নামল।

নূপুর পথনির্দেশ মতো মর্গের দিকে রওনা দিল। শব্দনগরের আরেকটা ব্যস্ত দিনের শুরুর সময় আসন্ন। অল্প আলো ফুটছে পূব আকাশে। রাশি রাশি জিনিস জড়ো করা হচ্ছে বিকিকিনির হাটে। কী উপলক্ষ্যে আজকে, হুল্লোড় কবে, তার জন্য পাঁজি খুলে বসে পড়েছে মস্তি-বিশেষজ্ঞের দল। উসবের অগ্রিম প্রস্তুতি চলছে পাড়ায় পাড়ায়। শহরের স্টেডিয়ামে কে একজন মেগা-এরটেনার আসবে বলে মস্তিবাজরা ঘুম থেকে উঠেই লাইন দিয়েছে টিকিটের জন্য। অনেকে লাইন ভেঙে বিশৃঙ্খলা শুরু করেছে। তাদের লাঠি পেটা করছে শহরের আইনরক্ষকরা। যদিও তারা জানে অভ্যবতা ছাড়া এনজয়মেন্ট হয় না। তবু লাঠি পেটা করছে ক্যামেরা ফোকাসে এসে পরিচিত হবে বলে। সকাল হতেই অন্নের জন্য বেরিয়ে পড়েছে আধঘুম থেকে জেগে ওঠা অনেক মানুষ। যাদের খাওয়া, ঘুম, বেঁচে থাকা সবই অর্ধেক অর্ধেক। তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে নুপুরের মনে হল যেন একটা শবের মিছিলের গা-ঘেঁষে দিয়ে হেঁটে গেল।

মর্গের কাছে এসে দেখতে পেল সেই মলিন পোশাকের ছেলেটা একটা নিমগাছের নীচে মাটির ওপর বসে আছে। পাশে রাখা একটা দামি চামড়ার ব্যাগ। হয়তো কোন কুমির বা গোসাপের চামড়া দিয়ে বানানো এক্সক্লুসিভ কালেকশন।

নূপুর ব্যাগটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতড়াতে লাগল। ‘এখানে আমার শৈশবের কল্পনা, বিস্ময় লুকিয়ে আছে?’, নিজেকেই প্রশ্ন করল নূপুর। কিন্তু এ কি ব্যাগের মধ্যে তো যত শিশুপাঠ্য টেক্সবুক, অডিও বুক, ভিডিও বুক, কার্টুন হিরোদের প্লাস্টিক পুতুল।

নূপুর ব্যাগ ছেড়ে ছেলেটার দিকে তাকাল। সে শূন্য দৃষ্টিতে নুপুরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নূপুর তার চোখে চোখ রাখতেই কাঁপা গলায় বলল, ‘একজন কিশোরীর মৃতদেহের খোঁজ নিতে এসে ওরা বলল ওই কাগজগুলো এগুলো নিষিদ্ধ নথি। খুলে উলটে পালটে দেখে বলল, এর বদলে ওরা আসল খেলনা দেবে। আমায় ধমকে আমুদেরা সব কেড়ে নিয়ে গেল নূপুর। চিঠিগুলো, চিঠির স্মৃতিগুলো। বদলে এই ব্যাগটা উপহার দিয়ে গেল। বলল, নকল আকাশ, নদী, মেঘ, আর একজন মোমের স্ট্যাচু হয়ে বসে থাকা জ্যান্ত কচি মেয়ে। ওই চিঠিগুলোর থেকে স্ক্রিপ্ট বানাবে। সেটা ওদের পরের উৎসবের ইউনিক থিম হবে।

‘আমার জোর খাটানো কাজে দিল না।’

নূপুর নিজের ভেজা চোখ রুমালে মুছে ফেরার পথ ধরল। নূপুরকে চলে যেতে দেখে ছেলেটা পিছন থেকে নরম স্বরে বলল, ‘গল্পটা লেখা হয়ে গেছে নূপুর। গল্পটা তুমি নিয়ে যেতে পারো!’

 
 
top