ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

২য় পর্ব

 

রক্তকরবী-র রাজা বলেছিলেন, ‘এতদিন তো কাজ করলাম এবার অবকাশ উপভোগ করবো।’ কোনো মানুষকে পুরোপুরি যন্ত্রে রূপান্তরিত করতে গেলে এরকম কোনো চাকরিতে আসতে হয়। এর মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের এই মেলা সেই অবকাশের ছোঁয়া সামান্য হলেও এনে দেয়।

কুসুম এসেছে তার স্বামীকে নিয়ে, গোবিন্দের দুটো কিডনি খারাপ হয়ে গিয়েছে। ঘরে শিশুপুত্র ও কন্যাকে রেখে এসেছে। বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা থেকে সে এসেছিল বছর পনেরো আগে। তার আগে সে ছিল সন্দীপ বন্দরে। অল্প বয়সে বাবাকে হারায়, বাবাও গান গাইতেন আর মাধুকরি করতেন। সন্দীপ বন্দরে লোকের বাড়ি কাজ করার সময় মা খবর দিল, ‘ইন্ডিয়া যেতে হবে, বিয়ে হবে সেখানে।’

একটা ফিঙে পাখি কোত্থেকে ঢুকে পড়েছে। মেলা-অফিসের অস্থায়ী টিউবের ঢাকনার ওপর সে বসে রয়েছে। মেলা অফিসের ভিতরে আলো, আর বাইরের মাঠে আলো অন্ধকারের মিশেল রয়েছে। ফিঙে পাখিটা ভেবেছে বুঝি ভোর হয়ে গেছে। সে গলা ফুলিয়ে শিস দিচ্ছিল। চন্দ্রনাথ ব্লক অফিসের বড়োবাবু। টিপিক্যাল বড়োবাবু নয় - জিন্‌সের প্যান্ট, মাথায় হ্যাট। কুসুমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার কী চাই?’

কুসুম বড়োবাবুকে আপাঙ্গে দেখে নিল। ওর স্বামী গোবিন্দ অস্থির হয়ে উঠছে।

বামুন ঠাকুর কলা বউ স্নানের দিন কুসুমকে বলেছিল, ‘তুমি হইলা গিয়া গোবিন্দের চার নম্বর বউ। কলা বউ ছিল তিন নম্বর।’

চমকে উঠেছিল কুসুম কিন্তু তার তো তখন কিছু করার নেই। ফিঙে পাখিটা প্রবল ওড়াওড়ি শুরু করেছে। সে একসময় বড়োবাবুর টুপিতে এসেও বসল। হেসে গড়িয়ে পড়ল কুসুম। তার বউয়ের রঙ্গ দেখে ঠোঁট চেপে খিস্তি করল গোবিন্দ, ‘খানকি মাগি! এহানেও ছেনালি মারাবি।’

কুসুম সংযত হল। গোবিন্দের খুব রাগ।

অনুজ মেলা অফিসে ঢোকার সময় দেখলেন একটা ফিঙে পাখি উড়ে চলে গেল।

কুসুম তার আর গোবিন্দের ভোটার কার্ড বের করল।

‘পাস দেহেন পাঁচখান।’

চন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, ‘দুটো পাবে তুমি।’

‘ক্যান! আমাগো তিনখান বেশি দিতা ন যাইম!’

চন্দ্রনাথ দুটো পাস হাতে দিয়ে বললেন, ‘যাও অহন।’

কুসুম এবার বলল, ‘আমাগোরে কি লাইনে খাড়া হইতে হইব?’

চন্দ্রনাথ বড়োবাবুর দোসর পিওন শংকর তখন বলে উঠল, ‘কেন, তোমরা কোন ভিআইপি এলে!’

গোবিন্দ এবার গর্জে উঠল, ‘আমরা এহানকার মানুষ। বিদেশি গো লাইন দিতা কইবেন।’

এবার অনুজ বলে উঠলেন, ‘কুসুম, তোমার স্বামী অসুস্থ তো? পাঁচ নম্বর জেটিতে গিয়ে পুলিশ অফিসার সঞ্জয়বাবুকে বলবে, তাড়াতাড়ি করে দেবেন।’ কুসুমের মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে উঠল। বিডিও সাহেব কুসুমদের পড়শি, মনে রেখেছেন কুসুমের কথা।

ফুলশয্যায় কুসুম গোবিন্দ দাসকে বলেছিল, ‘আমারে কি সতীনের সঙ্গে ঘর করতি হইব!’

‘তুরে কইল কেডা!’

‘বামুন ঠাকুর কইছে আমারে হক্কল কথা।’

‘আমার পেথম বউ মরছিল জলাতঙ্কে, দ্বিতীয় বউ মেলায় যাইয়া পলায় গেল। পর-পুরুষের সঙ্গে!’

মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল কুসুম। রক্তাভ চোখে তাকিয়ে ছিল গোবিন্দ দাস। তারপর বলেছিল, ‘তুই-ও পলাইবি!’

তখনও বরের সঙ্গে তো তেমন পরিচয় হয়নি, তুবও কুসুম সাহস করে বলে ফেললো, ‘পলাইতেও পারি।’

গোবিন্দ দাস চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে বুকে তুলে নিয়েছিল। তবে সেসব মোহের দিন কবেই কেটে গেল। দেশি মদের নেশা গ্রাস করল গোবিন্দকে আর পুড়ল কুসুমের কপাল। দেশি পেটে পড়লে গোবিন্দ দাস অন্য মানুষ। এখন অবশ্য খেতে পারে না, কিন্তু পুরুষের অধিকারের জোর কমে নি। ঘরে এখনও সে পুরুষ-সিংহ। কুসুমের শুধু মার খাওয়া কপাল। সে শুনেছে মকর-সংক্রান্তিতে সাগরে স্নান করলে যাবতীয় রোগ-ব্যাধি চলে যায়। দেবতারা স্বর্গ থেকে আশীর্বাদ করে।

‘দশ কা বিশ, দশ কা বিশ, মছলিকো খানা খিলাইয়ে মাইজি।’

কুসুমের দেওরের ছেলেও আছে সেই বালকদের দলে যারা ওসব ‘দশ কা বিশ হাঁক’ দিচ্ছে।

‘পল্টন তুই!’

বাঁশের ব্যারিকেডের ভিতর থেকে কুসুম বলল পল্টনকে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে মছলিদের খাওয়ানোর জন্য ছোলা-দানা। ওটা এক হাতে রেখে পল্টন কাকা গোবিন্দ দাসকে প্রণাম করল। কুসুমকে প্রণাম করল না। সে অবশ্য আশাও করেনি।

‘কাকারে দেখবা।’ পল্টন বলল। শুনে গা-পিত্তি জ্বলে গেল কুসুমের। যদিও ভাইপোর জন্য গোবিন্দ দাশের হৃদয় বোধহয় আকুলি-বিকুলি করে উঠল।

সেই ব্যারিকেডের মধ্যে ছিল বিশ্বজিৎ বাউল। সে ত্রিবেণি থেকে এসেছে। তার পরণে বাউলের আলখাল্লা, পায়ে ঘুঙুর। সে কুসুমকে চিনতে পেরেছে।

‘কুসুম-দি,গান শুনবা! খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়।’

কুসুমের উত্তরের অপেক্ষা না করে বিশ্বজিৎ গান ধরল।

গোবিন্দ কড়া চোখে তাকায় কুসুমের দিকে, ‘নষ্টা মায়াছিলা।’

‘আমারে কিন্তু মারবা না। তুমার পাপ হইব।’ ছলছল করে ওঠে ওর চোখ।

 

‘হয়তো ভোরের কাক হয়ে – কে লিখেছে বলো তো ?’

একটি ছোট্ট মেয়ের কণ্ঠস্বর অনুজের চলভাষে ভেসে এলো।

‘তোমাকে কে শিখেয়েছে আগে বলো।’

‘মা।’

‘কে লিখেছেন তুমিই বলো। আমি তো আর ইসুকলে পড়িনি। এবার ভর্তি হব ভাবছি।’

‘জীবনানন্দ দাশ।’

‘বাঃ! তুমি কত কিছু জানো। আমাকে তোমাদের ইস্‌কুলে নেবে!’

‘অনেক টাকা লাগবে।’

‘কতো টাকা?’

‘সাতশ, হাজার।’

‘তোমার তো লক্ষ্মীর ঘটে টাকা আছে, সেখান থেকে দেবে।’

অঙ্গিরা চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘পিসিমনির কাছ থেকে চেয়ে নেবে।’

‘দেবে না বলেছে। তবে কী হবে!’

‘তুমি পাতাবাহার দেখেছ!’

‘পাতাবাহার গাছ!’

‘না।’

খিলখিল করে হেসে ওঠে অঙ্গিরা।

‘পাতাবাহার আমাদের বাংলা বইয়ের নাম। খুব শক্ত কিন্তু তুমি পারবে পড়তে।’

‘ “আমার মা জলের দেশের মেয়ে। তবুও মায়ের নৌকোতে উঠতে ভয় করত।” আছে না পাতাবাহার বইটাতে?’

একটু অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা। সে তো জানে অনুজ আকাট মুখ্যু। লুডু খেলায় তার সঙ্গে বারবার হেরে যায়। পাশ থেকে সাহানার গলা শোনা যায়, ‘তোর পিসুর কি কোনো কাজ নেই!’

অনুজ আবার অঙ্গীঁরাকে বলে, ‘তোমার ইংরেজি বইটার নাম কী?’

‘আমি কি তোমার আন্টি যে সব বলে দেব!’

‘কিন্তু তুমি বলে না দিলে ইস্‌কুলে ভর্তি হব কী করে?’

‘তোমাকে নেবে না। তুমি অনেক মোটা, আমাদের দরজাগুলি তো সরু। তুমি ঢুকতেই পারবে না।’

‘আমি তো তোমার চেয়েও রোগা।’

এবার অঙ্গিরা প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘না, তুমি ভীমের চেয়েও মোটা।’

পাশ থেকে সাহানা বলে, ‘ঘটোৎকচ।’

অঙ্গিরা মজা পায়, সে হাততালি দিয়ে ওঠে।

 

বিশ্বজিৎ বাউল বলল কুসুমকে, ‘দিদি, নাগা সন্ন্যাসী দেখবো!’

গোবিন্দ দাশ ঘুমুচ্ছে। ভোরে সাগরে স্নান হয়েছে। সত্যিই কপিলমুনির দয়া। কতদিন পর গোবিন্দ নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। তার শরীরের সমস্ত জ্বালা যেন চলে গেছে। বিশ্বজিৎ বাউলের সঙ্গে মেলা দেখতে বের হয় কুসুম। মন্দির চমৎকার লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে। ছোটো ছোটো মাটির ঢিবির ওপর আটচালা দিয়ে ঘর। ওতে ছাই মেখে পুরো আদুল গায়ে বসে রয়েছে সাধুর দল। ওদের পরনে কোনও কিছুই নেই। মেলায় গান বাজছে, আমরা ঘুচাব তিমির রাত … চল রে নও-জওয়ান …

বিশ্বজিৎ বাউল পায়ে পায়ে তাল দিচ্ছে। কুসুম পুরো ন্যাংটো সাধুদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। তার স্বামী গোবিন্দ দাস এই সময় যদি কুসুমকে দেখে, তবে চুল ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে। তখন তার শরীরে এমন অসুস্থ অবস্থায়ও বউ পেটানোর আসুরিক শক্তির জোয়ার চলে আসবে।

‘ইস্‌, তুমি এইখানে আমারে আনলা ক্যানে!’

‘কুসুমদি, তোমারে তো কইলাম ওরা আদুল গায়ে থাকে।’

‘তাই বইলা এক্কেবারে কিচ্ছু থাকব না। তুমার দাদা জানতি পারলে আমারে কাইট্যা ফেলাইবে।’

‘ঠিক আছে অহন তুমারে মৌনি বাবার কাছে লইয়া যামু।’

‘অহন আমি কোথাও যামু না৷ তুমার দাদার কাছে ফিরুম।’

‘তুমি একা একা যাবা ক্যামনে!’

  

কুসুম চলে যেতেই বিশ্বজিৎ বাউল যেন ভারমুক্ত হল। সে আবার দো-তারা হাতে নিয়ে গান ধরল, সহজ মানুষ ভজে দ্যাখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে …

এই মেলার চরিত্র অদ্ভুত, অন্য কোথাও গান গাইলে এতক্ষণে প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে যেত। আর এখানে একজন অবাঙালি ব্যবসায়ী ভিখারিদের সঙ্গে তাকেও একশো টাকার নোট ছুঁড়ে দিল। একশো টাকা পেলে খুব ভালো হত, কিন্তু তবুও নিল না বিশ্বজিৎ। এই সময় একজন মানুষ এগিয়ে এলেন বিশ্বজিতের সামনে। তিনি বললেন, ‘তুমি পিট সিগারের নাম জানো!’

বিশ্বজিৎ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। তারপর সে বলল, ‘ওঁর একখান পদ কইবেন?’

লোকটা একটু খ্যাপাটে ধরনের, মাথায় রঙিন টুপি। লাল রঙের শার্ট পরা। সে বিশ্বজিতের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘নলেন গুড়ের সুবাস বাতাসে। গুড় খাওয়াও যদি, শিখাইতে পারি।’

বিশ্বজিতের ঝোলায় শুকনো চিড়ে আর পাটালি গুড় রয়েছে।

সে পাটালি গুড় ভেঙে কিছুটা দিল লোকটাকে। এক ফোঁটা লোভের জল জিভ থেকে গড়িয়ে পড়ল প্যান্টে, সোয়াদে তার চোখ বুজে গেল। বিশ্বজিতের দো-তারা কেড়ে নিয়ে সে সুরে সুরে গাইতে লাগল, ‘দেয়ার্স নো শর্টকাট টু ফ্রিডম …’

বিশ্বজিতের ভালো লাগছে। গানের কথা ইংরেজি ভাষায় কিন্তু লালনের গানের সঙ্গে এর কোনও পার্থক্য নেই। আশ্চর্যভাবে মেলার মাইকে বাজছিল রবিঠাকুর, রোদন ভরা এই বসন্ত সখি …

পুণ্য করতে আসা তীর্থযাত্রীর দল খুব একটা ভ্রূক্ষেপ না করলেও হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে যাচ্ছিল লাল, রবিঠাকুর এবং পিট সিগার।

(ক্রমশ…)

 
 
top