বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী পাঠ : কিরণমালা

 

সাহিত্য সমালোচক কোনোদিনই মেলাননি এ দুটি স্রোতকে - মৌখিক সাহিত্য এবং লিখিত সাহিত্য, অথচ চলেছে পাশাপাশিই। একই রূপকথার শ্রোতা স্কুলে-কলেজে অবসরে পড়েছে বিশেষ সাহিত্যিকদের নির্মিত বিশেষ সাহিত্য। কিন্তু এ দুই ধারণা কি মেলেনি কোথাও? এর না মেলার কারণটাও কি খুব গভীরে? লোককথার মূল বাহক চিরকালই মেয়েরা আর বাংলা সাহিত্যের একটা বড়ো জায়গা জুড়েই পুরুষ-লেখকদের প্রাধান্য। আর তাই-ই কি মৌখিক সাহিত্যে নারী এবং লিখিত সাহিত্যের নারী সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিসরে বিকশিত হন? দুটি নারীযুদ্ধ-ই সম্পূর্ণ ভিন্ন বৃত্তে ঘটে?

লোককথা কিংবা রূপকথার মেয়েদের খুব স্পষ্টভাবে দুটি বিভাজন আছে। তাদের একদল ভালো, অপর দল খারাপ। একদল সুয়ো, অপরদল দুয়ো। এই নারীদের মূল কাজ কেবলই ষড়যন্ত্র করা এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া। একদল অত্যাচার করে, অপরদল অত্যাচারিতা হয়। তবে ইতিহাসমালা-র ‘লহনা-খুল্লনা’ কাহিনিতে দেখা গেছে, দুই সতীন একই রকমভাবে চুলোচুলি মারামারি করে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। আমরা জানি, লোককথার মূল ধারক মেয়েরাই। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের বলা কাহিনিতে মেয়েদের ভূমিকার ক্ষুদ্রত্ব। এই বৃহৎ সামাজিক পরিসরে তারা কর্মহীন – কেবলই ষড়যন্ত্রকারিণী অথবা যন্ত্রণাভোগিনী ।

আর তাইই ‘কিরণমালা’ অনন্য। রূপকথার পরিসরে কিরণমালাই প্রথম নারী যে সরাসরি যুদ্ধ করছে যাবতীয় বাধা-বিপদ এবং প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে। সে-ই প্রায় একমাত্র মেয়ে,যে গৃহবন্দি জীবন কাটাচ্ছে না – বুদ্ধি এবং বল – এই দুইয়ের সাহায্যে লড়াই করে সে উদ্ধার করে নিয়ে আসে হারানো দাদাদের, যাবতীয় হৃত সম্মানও।

কোনো এক স্বদেশি বোধে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে সম্ভবত লোককথা সংগ্রহের কাজটি শুরু হয়েছিল – অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে ও জার্মান দেশে গ্রিম ভাইদের রূপকথা সংগ্রহটি পৃথিবীর প্রথম রূপকথা সংগ্রহ হিসেবে স্বীকৃত, আর আমরা আগেই দেখিয়েছি উইলিয়াম কেরি সম্পাদিত ইতিহাসমালা গ্রন্থটি সম্ভবত গ্রিমভাইদের বইয়ের আগেই প্রকাশিত। কিন্তু এ দুই সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি বিষয়েই তফাত – সেটি হল গ্রিমভাইরা লোককথাগুলির মধ্য দিয়ে নিজ দেশকে খুঁজতে চেয়েছিলেন। আর কেরি বিদেশি হয়েও বাংলাদেশকে খুঁজতে চেয়েছিলেন বাংলার লোককথার মধ্য দিয়ে। বাংলার কথাগুলি সংকলিত হয়েছিল লালবিহারী দে-র Folk Tales of Bengal-এ কোনো তাড়নায় হয়তো। আর দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সংকলিত ঠাকুরমার ঝুলি-তে ভূমিকা লিখতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

অতএব বাঙ্গালীর ছেলে যখন রূপকথা শোনে তখন কেবল যে গল্প শুনিয়া সুখী হয়, তাহা নহে- সমস্ত বাংলা দেশের চিরন্তন স্নেহের সুরটি তাহার তরুণ চিত্তের মধ্যে প্রবেশ করিয়া, তাহাকে যেন বাংলার রসে রসাইয়া লয়।

আর এইখানেই আসে পাঠকের প্রশ্ন। বাংলাদেশের নিজস্ব মাটিতে কেমন করে সম্ভব ছিল কিরণমালার কাহিনি? প্রায় সমস্ত রূপকথা, লোককথা যেখানে নারীর অবনতা, নিবেদিত রূপটিকেই প্রতিষ্ঠা করছে, সেখানে কিরণমালা বাহুবলে উদ্ধার করে আনছে, নিজের জন্য স্বামীকে নয় – তার দুই দাদাকে। শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘দেশের রূপকথা ও রূপকথার দেশ’ (গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্ব সমাস)-এ ‘কিরণমালা’ এবং ‘সুখু-দুখু’ – এ দুই ‘কথা’কে ব্যাতিক্রমী হিসেবেই গণ্য করেছেন, কারণ সেই সময়কার লোকবিশ্বাস এবং মিথ একাই প্রতিষ্ঠা করেছে :

ভালো মেয়েদের জায়গা অবশ্য অন্দরমহলে,তারা নিজেরা যেচে সদর দ্বারটুকুতেও দাঁড়ায় না। একমাত্র ছদ্মবেশী মায়াবিনী রাক্ষসীরা, যারা নির্বোধ পুরুষদের রূপের জালে বাঁধতে,প্রতারিত করতে বদ্ধপরিকর, বনে-প্রান্তরে চরে বেড়ায়।

অথচ এই এরা তথাকথিত ‘খারাপ মেয়ে’র অপবাদ অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়ে। ‘সুখু-দুখু’-র কাহিনির সঙ্গে ‘কিরণমালা’-কে আমি এক করতে পারি না, কারণ ‘সুখু-দুখু’ অজানা এক ভাগ্যের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিল। সেই যাত্রায় আসলে পদে পদে ছিল তাদের চরিত্র পরীক্ষা। আর সবশেষে আছে সেই নীতিবাক্য – যে অল্প চায়, সেই বেশি পায়। আর এছাড়াও আছে লুকোনো সেই বার্তা – সুখী  মেয়েদের চেয়ে দুঃখিনী মেয়েরাই অনেক ভালো এবং প্রশংসিতা। কিন্তু কিরণমালায় আছে নির্ভেজাল অভিযান। বাহু এবং বুদ্ধির।

এই কাহিনির শুরুতেও রানির বড়ো বোনেদের ঈর্ষা আছে, তাদের ষড়যন্ত্র আছে এবং সেই ঈর্ষা রানির রাজসম্পদকে কেন্দ্র করে:

হাসিয়া নাচিয়া দুই বোনে রাণীবোনের আঁতুড়ঘর আগলাইতে আসিল।

সেই রাজপুরীতে রানী-বোন ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী!

দেখিয়া,দুই বোনে হিংসায় জ্বলিয়া জ্বলিয়া ঘরে।

আর এই ঈর্ষারই ফল রানির তিন-তিনবার সন্তানকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে রাজাকে কুকুরছানা-বিড়ালছানা আর কাঠের পুতুল দেখানো। রাজাও রানিকে ‘অলক্ষ্মী,’ ‘ডাকিনী’ সাব্যস্ত করেন:

রাজ্যের লোকেরা ডাকিনী রাণীকে উল্টাগাধায় উঠাইয়া মাথা মুড়াইয়া ঘোল ঢালিয়া, রাজ্যের বাহির করিয়া দিয়া আসিল।

তিন ভাই বোন এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে বড়ো হয়:

কিরণমালা বাড়ীতে কূটাটুকু পড়িতে দেয় না, কাজললতা গাইয়ের গায়ে মাছিটি বসিতে দেয় না।

অর্থাৎ, গৃহকর্মে সুনিপুণা হয়ে ওঠে কিরণমালা:

এমনি করিয়া দিন যায়। অরুণ বরুণ ব্রাহ্মণের সকল বিদ্যা পড়িলেন, কিরণমালা ব্রাহ্মণের ঘর-সংসার হাতে নিলেন।

অর্থাৎ কোনো পুঁথিগত বিদ্যা কিরণমালার হয়নি। সে জীবন অভিজ্ঞতাতেও নেহাতই নবীন। রাজাকে দেখে দাদাদের জিজ্ঞাসা করে, ‘দাদা, রাজার কী থাকে?’ তার এই সারল্যের সঙ্গে মিলেছে তার শারীরিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা – দাদারা অট্টালিকা বানানোর সময় সে-ও ঘাটের জল ভরে ভরে দেয়। আর তারপর দুই দাদা-ই মায়া পাহাড় থেকে না-ফিরলে সে তার পূর্ণ ব্যক্তিত্বে বিকশিত হয়।

অবশ্যই তাকে পুরুষের পোশাক পড়তে হয়। তাই ‘রাজপুত্র’ নামের মায়া আহ্বান তাকে টলাতে পারে না। এ যেন সময়ের বহু আগে জম্মানো এক মেয়ে — যখন একটি মেয়ে যুদ্ধকারিণী  চিত্রটি তার শত্রুরাও বুঝে উঠতে পারছে না, তারাও কল্পনা করতে পারছেনা এই সম্ভাবনা – ‘রাজপুত্র’-র পোশাকে এ কোনো নারীও হতে পারে। আর তাই-ই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে সে, উদ্ধার করছে দুই দাদাকে এবং আরো অনেক রাজপুত্রকে।

এই অভিযান, যাত্রায় কিরণমালা ছিল একা। বুদ্ধি,সারল্য ও মাধুর্যের মিশ্রণ এই নারীকে করে তুলেছে অভিনব। আমরা অবাক হয়ে ভেবেছি, বাংলার প্রেক্ষাপটে এই নারীর অস্তিত্ব কেমনভাবে লুকিয়ে ছিল? বাংলা সাহিত্যে আমরা লোকায়ত নারী যাদের পাই, তাদের কারোর সঙ্গেই কি ‘কিরণমালা’-র তুলনা চলে? মনসামঙ্গলকাব্যা-এর ‘মনসা’-কেও দেখেছি আমরা পরাক্রমী এবং একরোখা এক নারী হিসেবে। কিন্তু মনসার যে ‘অভিযান’, তাতে কোথাও মাধুর্যের কোনো স্থান নেই, – আছে জেদ, একগুঁয়েমি এবং দাপট। কিন্তু কিরণমালা কোথাও তার লাবণ্য, মাধুর্য, নম্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়না, – সে গৃহ পরিষ্কার করে, পোষা গরুটিকে খেতে দিয়ে দাদাদের উদ্ধার করতে যায়। সে পুরুষের পোশাককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই যুদ্ধের। তার ‘লড়াই’-এর মধ্যে কোনো ‘বিদ্বেষ’-এর যোগ নেই। নিজের ‘বুদ্ধি’-র ওপর স্থির আস্থা আছে বরং।

১৯০৯ সালে প্রথম প্রকাশ ‘কিরণমালা’ সম্বলিত ঠাকুরমার ঝুলি-র। ধরা যেতে পারে, তার বহু আগে থেকেই গল্পগুলি প্রচলিত এবং দক্ষিণারঞ্জনও লোককথা সংগ্রহ করে চলেছেন বহুদিন ধরে। আমরা আগে দেখিয়েছি ইতিহাসমালা-র কাহিনিগুলিতেও কীভাবে নারীদের ভ্রষ্ট হওয়ার ছবি আঁকা হয়েছে (‘ইতিহাসমালার মেয়েরা’, অন্যপত্র, অগস্ট, ২০১৪ )। আর কয়েকটা বিক্ষিপ্ত উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি মেয়েদের সম্পর্কে তৎকালীন সমাজভাবনাটিও। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বঙ্গবিদ্যাপ্রকাশিকা -য় (১৮৫৫) লেখা ‘নারী চরিত্র’ নামক প্রবন্ধটিতে এইরকম লেখা হয়:

নারী চরিত্র অতি দুর্জ্ঞেয়, দেবতারাও তাহা বুঝিতে পারেন না, রমণীদিগের অন্তর গরলপূর্ণ অথচ মুখে মধুবর্ষণ করে, তাহারদিগের প্রিয়াপ্রিয় নাই, গোসকল যেমন বনে যাইয়া নব নব তৃণান্বেষণ করে তদ্রুপ রমণীরা সর্ব্বদ নূতন ২ পুরুষ প্রার্থনা করিয়া থাকে…(দ্র: ‘বাঙালি সমাজমানসে নারী’, নারীবিশ্ব, স্বপন বসু)।

এছাড়াও সেকালের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়-এ লেখা হচ্ছে:

যদি স্ত্রীলোকের স্বাধীনতায় অনিষ্ট ঘটিবার সম্ভাবনা না থাকিত তবে মনু কেন তাহা নিষেধ করিবেন। (সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়, ১৮৫১, দ্র: তদেব)

অর্থাৎ উনিশ শতকীয় বা তার পূর্ববর্তী সামাজিক প্রেক্ষাপটে পথে বেরোনো মেয়েরা কেবল ‘রমণী’ মাত্র। পুরুষকে ‘রমণ’ করাই তাদের একমাত্র ভবিতব্য এবং তারা অত্যন্ত নিন্দিতও, ঘরে এবং বাইরে সামান্য ত্রুটিতে নারী অপমান বহন করেছে চিরকাল, যার কার্য চিহ্নিত হয়েছে ‘ডাইনি’ বা ‘রাক্ষসী’ পরিচয়ে। বিক্ষিপ্ত উদাহরণ দেখতে পারি, ১৯০৫-এ জন্মানো তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন:

স্বামীর ব্যবহার অবজ্ঞা ভাত কাপড়ের জন্য ভাইয়ের প্রত্যাশী? যে বিরূপ ক্ষত বিক্ষত করিয়াছে,তাহা তলাইয়া দেখিবার ক্ষমতাও যেন আমার নাই…

এই অসহায়তার দীর্ঘ ইতিহাসে কিরণমালা এক ব্যতিক্রমী নারী। আরও উল্লেখ্য, সে রূপকথার নারী হিসেবেই চিহ্নিত। রাজার মেয়ে হয়েও সে অবস্থার ফেরে অরণ্যকন্যা। কিন্তু কোথাও তার আভিজাত্য হারায়নি সে। ‘কিরণমালা’ যেন সেই ইচ্ছাপূরণের নারী, যার অপেক্ষায় ছিল আপামর বাংলার কথক মহিলামহল – হয়তো পুরুষ সমাজও। সে পৌঁছোয়নি তখনও, হয়-তো বা এখনও।

(ক্রমশ…)

 
 
top