নরেন্দ্র মোদির অর্থনীতি

 

ভূমিকা

এ কথা বহুল প্রচারিত যে গত লোকসভা নির্বাচনে দেশি এবং বিদেশি কর্পোরেট পুঁজি নরেন্দ্র মোদির সমর্থনে ব্যাপক প্রচার সংগঠিত করেছিল, কংগ্রেসের ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র বিরুদ্ধে ‘বিকাশ পুরুষ’ নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি নির্মাণে বিপুল অর্থব্যয় করেছিল তারা। দেশজুড়ে যে ‘মোদি হাওয়া’ উঠেছিল, সেই হাওয়া তৈরির পেছনে এই কর্পোরেট পুঁজি একটি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। বলা বাহুল্য, বিনা কারণে কর্পোরেট পুঁজি এই অর্থব্যয় করেছিল এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নয়া উদারবাদী পথে সংস্কার ঘটানোর বকেয়া কাজটা ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র কারণে, নাকি কংগ্রেস যা যা করে উঠতে পারছিল না, কর্পোরেট ভাবছিল, ‘বিকাশ পুরুষ’ মোদিকে দিল্লির গদিতে বসিয়ে সেই কাজটা স্বচ্ছন্দে করে ফেলা যাবে। এটা ভাবার পিছনে অবশ্যই কারণ ছিল। সীমিত ক্ষমতার মধ্যে একটি রাজ্য সরকার যে পরিমাণে কর্পোরেট-বান্ধব হতে পারে, মোদির গুজরাট ছিল ততটাই কর্পোরেট-বান্ধব। কর্পোরেটের আশা ছিল, গুজরাটের এই কর্পোরেট-বান্ধব মুখ্যমন্ত্রীকে দিল্লির ক্ষমতায় আসীন করতে পারলে তাদের যা আকাঙ্ক্ষা তার পুরোটাই চরিতার্থ হবে – নয়া উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো করে ফেলা যাবে অনায়াসে। কর্পোরেটের এই ভাবনা কতটা পূরণ করতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি, নয়া-উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজটা কত দ্রুত করা সম্ভব মোদির পক্ষে – এই সব নিয়েই আলোচনা করব বর্তমান প্রবন্ধে।

 

অর্থনীতির হাল হকিকৎ ও কংগ্রেসের ‘নীতিপঙ্গুত্ব’

এ দেশের  কর্পোরেট পুঁজি, বিদেশি পরামর্শদাতা এবং বাজার-মৌলবাদী বিশেষজ্ঞরা প্রায় সকলেই একমত হয়ে এ কথা ক্রমাগত প্রচার করছিলেন যে, ভারতের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একমাত্র উপায় হল আরও বেশি বাজারমুখী সংস্কার, দ্বিতীয় ইউপিএ-র জমানায় কংগ্রেস যা আদৌ করে উঠতে পারছিল না। এই প্রচার শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় ইউপিএ-র সময় থেকে আর তুঙ্গে উঠেছিল ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন আসন্ন হয়ে পড়ে। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে তাড়িয়ে চিদম্বরমের হাতে বিত্তমন্ত্রক তুলে দেওয়ার পর কিছুদিন এই বাজার-মৌলবাদীরা এই আশায় বুক বেঁধে ছিল যে, মনমোহন-চিদম্বরম এবং মন্টেক আলুওয়ালিয়ার টিমটার ক্ষমতা বাড়বে কংগ্রেসে এবং এই তিনজনই যেহেতু মতাদর্শের দিক থেকে বিশ্বব্যাঙ্ক-আইএমএফ-পন্থী, যে মাত্রায় নয়া-উদারবাদী সংস্কার তারা চায়, সে সংস্কার এবার করে ফেলবে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার। দেখা গেল, বাঞ্ছিত মাত্রায় সংস্কার করতে এই টিমটিও ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছে৷ বিমা বিল আটকে গেল, ভারতীয় মুদ্রার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরযোগ্যতা আসার ব্যাপারে একটা কথাও বলতে পারলেন না চিদম্বরম, খুচরো ব্যাবসায় বিদেশি বিনিয়োগের আইনটা কোনমতে লাগু করা গেল বটে, তবে ওটা নিয়ে বাস্তবে যে কোনো কিছুই হয়ে উঠবে না, এটা স্পষ্ট হয়ে গেল৷ পরিকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের রাস্তা খোলা, খনি বেসরকারিকরণ, কৃষ্ণা-গোদাবরীর বেসিন থেকে গ্যাস উত্তোলন – এগুলো করার চেষ্টা করা হল বটে, কিন্তু একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে উঠতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেল যে, সংসদে নাজেহাল হওয়া প্রধানমন্ত্রী একেবারে বোবা হয়ে বসে থাকলেন। সংস্কার যে আর করার সাধ্য নেই এই চিদম্বরম-মনমোহন-মন্টেক গোষ্ঠীর, এ ধারণা বধ্যমূল হয়ে পড়ল এই বাজার-মৌলবাদীদের মধ্যে। এটা হলেও না হয় আরও অপেক্ষা করার ধৈর্য্ দেখাতেন এঁরা। কিন্তু দ্রুত কমতে থাকা জনপ্রিয়তার চাপে পড়া কংগ্রেস এবার আসন্ন লোকসভা নির্বাচন মাথায় রেখে হাঁটল উলটো পথে। সোনিয়া গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেস তার জনপ্রিয়তার হৃত জমি পুনুরুদ্ধারের তাগিদে আনতে গেল খাদ্য নিরাপত্তা আইন – বাজার-মৌলবাদীদের গুরুঠাকুর জগদীশ ভাগবতী যাকে বললেন ‘বিষবড়ি’। একশো দিনের কাজের আইনটার জনপ্রিয়তার ওপর ভড় দিয়ে প্রথম ইউপিএ থেকে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার গড়ার মতন জনসমর্থন পেয়ে গিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস – কংগ্রেসের যে লবিটি এটা মনে করত, সংকটে পড়া দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারকে উদ্ধার করার জন্য তাদের পরামর্শ ও চাপে সোনিয়া গান্ধি উঠে পড়ে লাগলেন এই আইনটি পাশ করতে। দ্বিতীয় ইউপিএ গড়ার সময় কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহারে প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল এই খাদ্য নিরাপত্তা। ইচ্ছা থাকলেও, নানাভাবে প্যাঁচ কষে সুবিধে করতে না পারার ফলে মনমোহন-মন্টেকরা এটা মেনে নিলেন এবং চিদম্বরম তাঁর শেষ বাজেটে এই বাবদ কিছু টাকা ধার্য করতেও বাধ্য হলেন। কিন্তু এর নিট ফল দাঁড়াল এই যে, কর্পোরেট পুঁজি এবার মনমোহনের বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়ল। সোনিয়া গান্ধির নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস যে এর ফলে কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে কামান দাগতে নামল, এমন নয়। কংগ্রেস র‍্যাডিকাল দল নয়। কংগ্রেস নয়া- উদারবাদী সংস্কার চায় না, এমনও নয়। সংস্কারপন্থী কংগ্রেস যেমন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে ‘একশো দিনের কাজ’-কে অধিকারভিত্তিক আইনের মর্যাদা দিয়েছিল, খাদ্য নিরাপত্তা আইনটিও তেমনই এই দলটি লাগু করতে গিয়েছিল কোনোমতে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। কংগ্রেস তাই কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে একটা কথাও বলল না। যুদ্ধটা দাঁড়িয়ে গেল একতরফা। এই যুদ্ধে কর্পোরেট ভরসা করল ‘বিকাশ পুরুষ’ নরেন্দ্র মোদির ওপর। ‘মোদি নির্মাণ’-এর জন্য তারা যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করল। বস্তুত ইতিপূর্বের কোনো নির্বাচনে কর্পোরেট পুঁজি এবং তাদের মিডিয়া এইভাবে একটি ব্যক্তির পিছনে দাঁড়িয়ে যায়নি। মোদির বিজেপি জয়ী হল বিপুলভাবে, সরকার চালানোর জন্য নরেন্দ্র মোদিকে এবার মোর্চা শরিকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। কোয়ালিশন রাজনীতির বাধ্যবাধকতা সংস্কার সাধনের পথে আর অন্তরায় হয়ে উঠবে না। এক কথায় কর্পোরেট পুঁজি যা চায়, সেটাই হয়েছে। সুতরাং এবার ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র অবসান ঘটবে, সংস্কারের রথ চলবে অপ্রতিহত গতিতে। মোদি যখন ক্ষমতায় এলেন, এটাই তখন দাঁড়াল কর্পোরেট ধারণা। সেনসেক্স যে লাফিয়ে লাফিয়ে এক চূড়া থেকে অন্য চূড়ায় উঠতে লাগল, তাঁর পিছনে কাজ করেছে এই ধারণা-সৃষ্ট প্রত্যাশা।

আমাদের ধারণা, যাঁরা এই ‘বিকাশ পুরুষ’-এর নামে জয়ডঙ্কা বাজাচ্ছেন, ভারতের অর্থনীতি বাস্তবে কী অবস্থায় আছে এবং এই অবস্থাটি কী ধরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে নীতি-নির্ধারণের জন্য, সেটা ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারছেন না। এটা উপলব্ধি করতে হলে কংগ্রেসের যে ‘নীতিপঙ্গুত্ব’ নিয়ে এত সমালোচনা করা হয়েছে, সেটাকে আলোচনায় আনতে হবে। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস নয়া-উদারবাদ বিরোধী; এটা ভাবারও কোনো কারণ নেই যে জাতীয় কংগ্রেস সেই নেহরু যুগের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার দায় বহন করছে অদ্যাবধি আর সেই কারণেই এই দলটির বাজারমুখী সংস্কারের বিষয়ে দ্বিধা আছে। এদেশে বাজারমুখী সংস্কার ঘটানোর কাজ শুরু করে নরসিংহ রাও-এর কংগ্রেস সরকার৷ রাজীব গান্ধির কংগ্রেস শাসনের শেষ দিকেই অর্থনীতি এই দিশায় তার যাত্রা শুরু করে, এ কথাও বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালের কংগ্রেস সরকারগুলিও সুযোগ এবং সুবিধামতো সেটাই চালিয়ে যায়। এই কাজে কংগ্রেসের দায়বদ্ধতা যে কতটা গভীর, একটা ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়। মনমোহন সিং-এর প্রথম ইউপিএ সরকারের ওপর বামপন্থীদের চাপ থাকায় সংস্কারের কাজটা যে ঠিকমতো করা যাচ্ছিল না এবং বামপন্থীদের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করায় কংগ্রেস যে এই সংস্কারের কাজ আরও ভালো করে করতে পারবে – তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে সে কথা ঘোষণা করেছিলেন। যাই হোক, একটা কথা তবুও উল্লেখ করতে হবে যে, এক ধাক্কায় সব সংস্কার সাঙ্গ করার বদলে কংগ্রেস নিয়েছিল ধীরগতিতে সংস্কার ঘটানোর লাইন, যেটার একটা কারণ এই যে জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের মধ্যে আছে নানা ধরণের সামাজিক শক্তির টানাপোড়েন, যার দরুণ কংগ্রেসকে নিতে হয় মধ্যপন্থা (প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই মধ্যপন্থার সবচেয়ে বড়ো প্রতিনিধি, যে কারণে জাতীয় কংগ্রেসে প্রণব মুখোপাধ্যায় সবসময়ই ছিলেন অপরিহার্য)। কোয়ালিশন রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক সময় সংস্কারের গতি মন্থর হয়েছে। কংগ্রেস সরকার ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-য় ভুগছিল, এ কথা যদি সত্যিও হয়, তার জন্য এটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, জাতীয় কংগ্রেস কর্পোরেট পুঁজিকে তুষ্ট করার মতো নয়া-উদারবাদী সংস্কার করে উঠতে পারছিল না, কারণ এই দলটি সংস্কারের পথ থেকে পিছু হটতে চাইছিল। এটা বরং মনে রাখা ভালো যে, চাইলেও কংগ্রেসের পক্ষে সে সময় এর বেশি কিছু করা সম্ভব হত না। কেন এ কথা বলছি সেটা আমরা ব্যাখ্যা করব। কিন্তু সে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে এ কথা উল্লেখ করা দরকার যে সময়টা যদি না বদলায়, কোনো এক বিকাশ পুরুষকে গদিতে বসালেও আশ্চর্য বা চমকপ্রদ কিছু ঘটবে না। বরং সংকট আরও তীব্র হবে, দেশটা পড়বে আরও গভীর অর্থনৈতিক সমস্যায়।

যাই হোক, কংগ্রেস কেন শেষ দিকে কোনো সংস্কারই করে উঠতে পারছিল না? কারণটা এই যে, অর্থনীতি তখনও এমন একটা সংকটে পড়েছিল যে চাইলেও তখন সংস্কারের গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল না। জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার নেমে এসেছিল ৪.৭ শতাংশে, মূল্যবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশর নীচে নামছিল না, চলতি খাতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ৮৮.২ বিলিয়ন ডলার, জাতীয় আয়ের ৪.৭ শতাংশ। টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছিল অতি দ্রুত, যেটা রোধ করতে মুক্ত অর্থনীতির জমানায় যা করা উচিত নয়, নিরুপায় ভারত সরকারকে সেই কাজটাই করতে হয়েছিল – আমদানির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আনা হয় ২০১৩-১৪ আর্থিক বর্ষে (যা এখনও বলবৎ আছে), যার দরুণ আগের আর্থিক বৎসরের তুলনায় আমদানি কমে ৮.৩ শতাংশ৷ যে দেশে মূল্যবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশের ওপরে আর যে দেশের মুদ্রার ঘটছে ক্রমিক অবমূল্যায়ন, বিদেশি পুঁজি সে দেশে কম আসবে – এটাই মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম। যাবতীয় সংস্কার সাঙ্গ করে ফেললেও বিদেশি পুঁজি সে দেশে আসবে না, বরং পারলে তা সে-দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করবে। কারণটা সোজা। বিদেশি বিনিয়োগকারীর আশঙ্কা থাকবে তার লাভের অঙ্কটা মূল্যবৃদ্ধি আর মুদ্রার অবমূল্যায়নের দরুন কমে যাবে। এমনকী তার বিনিয়োগের প্রকৃত অঙ্কটিও ফেরৎ নেওয়ার সময় ডলারে বিনিময় করলে দেখা যেতে পারে যে তার আসলটাও পুরোটা উসুল হল না। বস্তুত ২০১৩-১৪ সালে এসবের জন্যই এদেশে নিট বিদেশি পুঁজি যা এসেছিল তার সংখ্যাটি ছিল আগের বছরের প্রায় অর্ধেক (৪৭.৯ বিলিয়ন ডলার, আগের বছর এই সংখ্যাটি ছিলো ৯২.০ বিলিয়ন ডলার)। ‘নীতিপঙ্গুত্ব’ নয়, অর্থনীতির অবস্থানটাই ছিল বিদেশি লগ্নি কমে যাওয়ার কারণ। দেশি বিনিয়োগকারীরাও এ বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি নেবে না, কারণ বাজার যেখানে মন্দা সেখানে বিনিয়োগ করাটা আহাম্মকি। ঘটনা এটাই যে, এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক টাকা নিয়ে বসে থাকলেও বিনিয়োগকারীর দেখা মিলবে না। যারা আসবে তাদের ধান্দা থাকবে ব্যাঙ্কের টাকা ধার নিয়ে চম্পট দেওয়ার – কিংফিশার এয়ারলাইন্স যা করেছিল। এই প্রবণতাই বাড়ছিল এ দেশে এবং একদল তোষামুদে পুঁজিপতি রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি ব্যাঙ্কের টাকা লুঠ করছিল আর সেই টাকায় ‘টু-জি স্প্রেকট্রাম’ থেকে ‘কোল ব্লক’ কেনার নামে জনগণের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছিল। এটা ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র জন্য ঘটছিল, এমন নয়। প্যাঁচে পড়া অর্থনীতিতে এটাই ঘটে।

কেন এটা ঘটল? এ নিয়ে সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করার বদলে এই লুঠেরা পুঁজিপতিরা এই ধুয়ো তুলল যে, আরও বেশি করে বাজারমুখী সংস্কার না করলে এই অবস্থার অবসান হবে না। কংগ্রেস ততদিনে এটা বুঝে গেছে যে এই অবস্থা চললে পরবর্তী নির্বাচনে তারা জিতবে না – এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে বাজারমুখী আরও সংস্কারেও কোনো লাভ হবে না। মন্দা কাটানোর একটা উপায় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি ঘটানোর চেষ্টা করা – সরকারি খরচ বাড়িয়ে যা করা সম্ভব৷ নয়া-উদারবাদীরা একেবারেই তা চায় না। তারা মনে করে, এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। তাদের মতে উচিত হল যোগান বাড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারি পুঁজিকে আরো ছাড় দেওয়া, আরো বাজারমুখী সংস্কার ঘটানো। মুশকিল হল, বাজার না থাকলে বেসরকারি পুঁজি নতুন বিনিয়োগে ভরসা পায় না, হাজাররকম ছাড় দিলেও তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চায় না। এই অবস্থায় বাজার চাঙ্গা করতে সরকারকেই খরচ বাড়িয়ে চাহিদা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হয়। কংগ্রেস সে চেষ্টাই করছিল। লক্ষ্যণীয় এই যে, ক্ষমতায় আসার পর, এত হম্বিতম্বির পর, অরুণ জেটলিকেও একই পথে হাঁটতে হয়েছে। সরকারি বাজেটে তার প্রমাণও আছে। ২০১৩-১৪ সালে চিদম্বরমের বাজেটে সরকারের মোট খরচ ধার্য করা হয়েছিল ১৫ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যেটা ছিল তার আগের বছরের বাজেট থেকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। জেটলির প্রথম বাজেটে খরচের অঙ্কটি ধার্য হয়েছে ১৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা – অর্থাৎ এর ওপর আরো ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি খরচ করবেন জেটলি – যিনি নাকি চান সরকারের খরচ কমিয়ে বেসরকারি পুঁজির পরিসর বাড়িয়ে বাজারমুখী সংস্কারের গতি বৃদ্ধি করতে !

অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাসৃষ্ট এই পরিস্থিতির মূল্যায়ন বাজার-মৌলবাদীরা করতে চান না। কেন তাঁরা এটা চান না, এ প্রশ্নের উত্তর এই যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে রাজনৈতিক দায় সৃষ্টি করে, তার ঝক্কি এঁদের পোহাতে হয় না। সে দায় এসে পড়ে রাষ্ট্র যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁদের ওপর। ভারতের অর্থনীতি যে দায় সৃষ্টি করেছে, সেটার বোঝা বাজার-মৌলবাদী অরবিন্দ পানাগরিয়া কিংবা জগদীশ ভাগবতীকে বহন করতে হয় না, সে দায় বহন করতে হয় মনমোহন, মোদি কিংবা জেটলিকে। জেটলিকে তাই চিদম্বরমের ফেলে যাওয়া জুতোতেই পা গলাতে হয়। শুধু ভারতবর্ষে এটা ঘটেছে এমন নয়। ওয়াশিংটন ঐকমত্যের শিকার দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতেও কম-বেশি এটাই ঘটেছে। ২০০২ সালে এই ওয়াশিংটন ঐকমত্যের পাল্লায় পড়ে আর্জেন্টিনায় যখন বেসামাল অবস্থা তৈরি হয়, তখন এই বাজার-মৌলবাদীদের কথায় কর্ণপাত না করে সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তাদের মুদ্রা পেসোকে ডলারের বাঁধন থেকে মুক্ত করে আমদানি নিয়ন্ত্রন করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই ওয়াশিংটন ঐকমত্যের সমাধিও হয় লাতিন আমেরিকায়। ইদানিং বিশ্বব্যাঙ্কমার্কা পরামর্শদাতাদের সুরও যে নরম হয়েছে, মুক্ত অর্থনীতির পথ নিয়ে যে এত কথা উঠছে, তার কারণও এটাই। মোদির অর্থনৈতিক ভূমণ্ডলকেও বুঝতে হবে, এই প্রেক্ষিতটি মাথায় রেখে।

কথা উঠতে পারে, এরকমই যদি হয় তাহলে ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-র অভিযোগ তুলে কর্পোরেট পুঁজির সব লবিই এভাবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘মোদি নির্মাণ’ প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ল কেন? পরিস্থিতির এই বাধ্যবাধকতার বিষয়টি কি কেউ বুঝতে পারেনি? আমাদের অনুমান, যে বেসরকারি দেশি বা বিদেশি পুঁজি এদেশে বিনিয়োগ মারফৎ বাজারি নিয়মে মুনাফা করতে চায়, লুঠেরা পুঁজির তুলনায় যাঁরা অপেক্ষাকৃত বেশি দায়িত্বশীল, তাঁদের একটা বড়ো অংশ অবশ্যই এটা বুঝতে পারছিল৷ তবুও তাঁরা যে কিছু সুযোগসন্ধানীর ‘মোদি আনো’ প্রকল্পে সায় দিয়েছিলেন এই ‘নীতিপঙ্গুত্ব’-রই অজুহাত তুলে, তার কারণ আছে। মোদিকে ঘিরে কর্পোরেটের টার্গেট কী – সেটা বুঝতে হলে, এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

 
 
top