ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

২য় পর্ব

জীবদ্দশায় কখনো আকাশপথে বিহার করার সৌভাগ্য হয়নি ত্রৈলঙ্গের। আপিসের কাজে একবার মার্কিনমুল্লুক যাবার কথা উঠেছিল, টিকিটও কাটা হয়েছিল একটি জার্মান বিমানসংস্থার, কিন্তু মক্কেলের শেষ মুহুর্তের খামখেয়ালিপনায় সেটা কেঁচে যায়। ওফ্‌ সে এক সময় গিয়েছে ত্রৈলঙ্গের জীবনে।

গত ফাগুনের শুরুর দিকের কথা। মেসবাড়িতে শেষ মুহূর্তের গোছগাছ সেরে নিয়েছেন ত্রৈলঙ্গ, চাল-ডাল-নুন-মশলার পুঁটলিটি চাকা লাগানো বোঁচকাটাতে ঢুকিয়ে ফেলেছেন সকালেই, স্টিলের থালাটি, একটি গেলাস আর ছোট্ট একটি প্লাস্টিকের মগও নিয়েছে্ন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ও যাচ্ছে সঙ্গে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই লৌহপক্ষীর পেটে সওয়ার হয়ে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার করবেনতিনি।‘সাত-সমুদ্দুর তেরো নদীর পার’- কথাটা ভেবেই শিউরে উঠছেন ত্রৈলঙ্গ রায়! সত্যিই পাড়ি জমাচ্ছেন তাহলে! তিনমাস ধরে টানাপোড়েন চলছে তাঁর এই ‘মক্কেল মুলুক’-এ পাড়ি জমানো নিয়ে, বার চারেক যাত্রার নির্ঘণ্টের অদলবদল হয়েছে, মার্কিন ভিসা নিয়ে সমস্যা হয়েছে, কখনো ঈর্ষান্বিত সহকর্মীদের রাজনীতির শিকার হয়েছেনতিনি। শেষমেশ ওঁর মায়ের মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতয় কাজ দিয়েছে, ছাড়পত্র মিলেছে মার্কিনমুলুক যাবার। দীঘলগাঁয়ের ত্রৈলঙ্গ রায় মহানগরীর দক্ষিণশহরতলীর একটি এঁদো পাড়া থেকে বিদেশযাত্রা করছেন– খবরটা নিয়ে ইতিমধ্যেই পাড়াপ্রতিবেশী-আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে উন্মাদনা। বিমানবন্দরে যাবার ‘ক্যাব’ এসেছে, ত্রৈলঙ্গ আলুসেদ্ধ-ভাত নাকেমুখে গুঁজে উঠে দাঁড়িয়েছেন– ট্রলিটি হিঁচড়ে হিঁচড়ে দ্বারের দিকে এগুচ্ছেন। এমন সময় ম্যানেজারের কল!

‘যাত্রার আর প্রয়োজন নাই, মক্কেলসাহেব একটু আগেই টেলিফোন করিয়া এই সূচনা দিয়াছে, সত্ত্বর ফিরিয়া যাও, সত্ত্বর ফিরিয়া যাও!’

দূরভাষে ম্যানেজারের সেই নির্ঘোষ! এ তো প্রায় লৌহপক্ষীর সিংদরজা থেকে মক্কেলমুল্লুক-অভিযাত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা!সেদিন বজ্রস্পৃষ্টের দশা হয়েছিল ত্রৈলঙ্গের।

এ নিয়ে বেজায় আপশোষ ছিল ত্রৈলঙ্গের। সদর হাসপাতালে্র আকাচা বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতেও অনুভব করেছেন সেই আপশোষের উপস্থিতি। অবিশ্যি শুধু তিনি কেন- তাঁর চোদ্দগুষ্টি সেই একই আপশোষ নিয়েই অক্কা পেয়েছে। হাওয়ার সওয়ারি করা কী আর মুখের কথা! অবিশ্যি ধরাধাম থেকে উবে যাবার পরে ব্যাপারটা জলভাত হয়ে যায়- হাওয়াকে পোষ মানানোর কায়দাটা রপ্ত করতে হয় সব্বাইকে- সাঁতার শেখার মতন ব্যাপার অনেকটা। দীঘলগাঁয়ে থাকাকালীন প্রথম কয়েকদিনেই প্যাঁচপয়জারটা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন ত্রৈলঙ্গ, যদিও প্রথম দিকে কিঞ্চিত্‌ বেয়াড়া একটা অনুভূতি হত– এই বুঝি ধপাস্‌ করে আছড়ে পড়লেন, এই বুঝি আছড়ে পড়লেন! অবিশ্যি এখন দিব্যি হুশ করে ভেসে যেতে পারেন যেখানে খুশি, হাওয়ায় আর হাবুডুবু খান না, একটা হাত জেব-এ সেঁধিয়েও দিব্যি ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন, নিয়মিত অভ্যেস করে উড্ডয়ন ক্ষমতা আর গতিও বেড়েছে খানিকটা। যদিও দীঘলগাঁ থেকে কলকাতা উড়ানে সময় লাগল বেশ। অচেনা কক্ষপথ, মাঝে বেমালুম রাস্তা গুলিয়ে ফেললেন- দার্জিলিং মোড়ে ভুল করে ইলামবাজারের রাস্তা নিয়ে ফেললেন। ঘণ্টাখানেক ওড়ার পর খেয়াল হল- ‘ল্যাংচাকারগার’, ‘ল্যাংচাবাগিচা’, ‘ল্যাংচাবঙ্গ’– শক্তিগড়ের এই দোকানগুলির নিয়ন-নিশান তো চোখে পড়ল না এখনও! ফিরতে হল আবার। দু’চারটে ভবঘুরে প্রেতের সাহায্য নিয়ে মহানগরীতে যখন পৌঁছালেন ততক্ষণে সুয্যির হুজ্জুতি শুরু হয়ে গিয়েছে।

কলকাতায় পৌঁছেই ত্রৈলঙ্গ হাজির হলেন দক্ষিণশহরতলীর সেই মেসবাড়িতে, পাঁচ নম্বর কিম্পপুরুষ লেনের চার নম্বর বাড়িটা। এখানের একটি ঘুপচি ঘরে যৌবনের পাঁচ-পাঁচটি বছর কেটেছে তাঁর, সেই মলিন-ম্যাদামার্কা-আঁঠালো-এলোমেলো মেসবাড়ি। বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছে এই বাড়িটির উপর।

মেসবাড়ির সিংদরজার সামনে দাঁড়াতেই দেখতে পেলেন তাঁর পরমসুহৃদ ও আমৃত্যু মেস-সঙ্গী সন্ন্যেসি ঘোষাল চৌকাঠের সামনে কৃতাঞ্জলি হয়ে দাঁড়িয়ে, আপিসে বেরুনোর আগে চৌকাঠে নমোনমো করে নেওয়া ওর নিত্যদিনের অভ্যেস। সে-ই হস্টেলজীবনের শুরুর দিন থেকে সন্ন্যেসিকে এই একই রকম দেখছেন ত্রৈলঙ্গ– বন্ধুবত্‌সল, পরোপকারী, মেধাবী আর ধার্মিক। হস্টেলের ওই হট্টমেলাতেও নিয়মিত গায়ত্রী জপ করত- সন্ধ্যাহ্নিক করত– রেচন করার সময় নির্ভুল প্যাঁচে বাঁ কানে পৈতে পেঁচিয়ে নিত, ব্রত-উপবাস তো করতই- আবার বেশ কিছুদিন বশীকরণ-উচাটনবিদ্যার চর্চাও করেছিল। বশীকরণের কথাটা খেয়াল পড়তেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসলেন ত্রৈলঙ্গ– ওফ্‌ কীর্তি করেছিল বটে একখানা সন্ন্যেসিটা!

ময়ুরাক্ষী নদীর পাড়ে সতীঘাট শ্মশান, সেখানে সেবার এক সাধুর আবির্ভাব হয়েছিল– ত্রৈলঙ্গরা তখন দ্বিতীয়বর্ষ। সাতহাত লম্বা আর অ্যায়সা বুকের ছাতি বাবার, বেবাক গায়ে শুধু চুল দাড়ি আর ভস্ম। বলে বলে শত্রুকে বাণ মারতে পারেন বাবা, বশীকরণ-স্তম্ভন-সম্মোহনে সিদ্ধহস্ত। খবরটা এনেছিল পাশের রুমের মুষল, সন্ন্যেসি আর একদণ্ড সময় নষ্ট করেনি, ত্রৈলঙ্গের কোনো বাধাই সে মানেনি। তিনরাত পড়েছিল বাবার ডেরায়, গুহ্যবিদ্যে আয়ত্ব করার আশায় বিস্তর ত্যাগ স্বীকার করেছিল, খেঁচেজাফরানের ঝুপড়ি থেকে সবচেয়ে দামি পাতাটা কিনে এনে খাওয়াতবাবাকে, ‘মায়ামুকুর’ রেঁস্তোরা থেকে চপকাটলেটও জোগাড় করে আনত। সে সব অব্দি মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু সন্ন্যেসির গুরুসেবা শালীনতার সব সীমা লঙ্ঘন করে গিয়েছিল।

‘এ ক’দিন প্রাণ ভরে খিদমত খেটেছি বাবার- তবে ওই আরকি–কুঁড়ি ফুটে ফুল হয়ে গিয়েছে। চরিত্তিরের আর অবশিষ্ট নেই। বেচারা বাবাজী বিপরীতলিঙ্গ-সঙ্গসুখ বিমুখ কিনা।’

সাধুবাবার ডেরা থেকে ফিরে নির্লজ্জের মতো সে বলেছিল ত্রৈলঙ্গকে।

‘তুই সামান্য বশীকরণ শিখতে গিয়ে নিজেকে জখম করে ফেললি? তিলতিল করে জমানো সব বিলিয়ে দিলি!’ত্রৈলঙ্গ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন সেদিন। শতাব্দীর সেই সূচনাকাল থেকে সন্ন্যেসির সঙ্গে ত্রৈলঙ্গর হৃদ্যতা- সেই সূত্রে তার জীবনের অনেক আজন্মলালিত শপথ এবং অভীপ্সা ত্রৈলঙ্গের সঙ্গে সে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ‘নিজ দারেষু’ নামক তার গোপন কবিতাটি সে ত্রৈলঙ্গকে দেখিয়েছিল ইতিমধ্যেই। তার প্রথম পংক্তিটিই ছিল–

‘দিলাম তোমায় আমার সবই- সকল শৌর্যবীর্য,

আর যা বাকি সবই দিলাম সঙ্গে কৌমার্য।’

ওই বস্তুটি তো ওর ভাবীস্ত্রীর জন্য বাক্সবন্দি করে রাখার কথা! অথচ খামখেয়ালের বশে কী উদ্ভট একটা কাণ্ড করে বসেছিল উড়নচড়েটা। ত্রৈলঙ্গের নিজেরই হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল।

‘শোন ব্যাটা, বশীকরণ কোনো সামান্য বিদ্যে নয়। বেহদ সাধনা লাগে, শক্তি লাগে। সময় বিশেষে শৃগাল অব্দি শিকার করতে হয়, তাও একচোটে! তার ওপর আবার বেছে বেছে কৃকলাসের অন্ত্র, করঞ্জাবীজের মজ্জা, জটামাংসীর রস জোগাড় করতে হয়- সেসব কী আর মুখের কথা! যা শিখেছি আর যা খুইয়েছি- তার কোনো তুলনা হয় না!’ সন্ন্যেসিটা বলেছিল সেদিন, চোখেমুখে তৃপ্তি।

হায় রে, অ্যাতো চেষ্টা সব প্রায় বিফলে গিয়েছিলছোকরার! দু’চারটে কুটুসঝোপকে বশীকরণের সাহায্যে দুহাত দূর থেকে ঝাঁকিয়ে দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছুই করতে পারেনি ছেলেটা। সাধুবাবা ততদিনে পগারপার, সন্ন্যেসি বিফলতার শোকে মুহ্যমান। এরপর থেকেই ওর কাশির সিরাপে আসক্তি- সে অন্য এক আখ্যান।

সেইসব হস্টেলজীবনের কথা মনে করলেই মনটা পরাগরেণুর মতো নির্ভার হয়ে যায় ত্রৈলঙ্গের। চারবছরের আবাসিকজীবনে কত যে সখা জুটেছিল, কত যে জ্ঞানবৃদ্ধ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন! সন্ন্যেসির মতো সঙ্গী তো ছিলই, স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের মতো গুরুদেবও ছিল। স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়! ‘তারাশংকর’ হস্টেলের দোতলার সেই বিখ্যাত কুঠুরিটি, কুঠুরির দরজায় পার্সিয়ান ক্যালিগ্র্যাফিতে ‘মাং নমস্কুরু’ লেখা। ত্রৈলঙ্গের মতো জন পাঁচ-ছয় বালক গুটিগুটি পায়ে স্যার বর্গীনারায়ণের সেই কুঠুরিটিতে হাজির হয়েছিলেন। হস্টেলজীবনের প্রথম দিন থেকেই শুনে আসছেন এঞ্জিনিয়ারিং পাঠে মগজস্থ বিদ্যের চেয়ে পকেটস্থ বিদ্যের কার্যকারিতা অনেক বেশী। পকেটের সুড়ঙ্গ দিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পন্থা অবলম্বন করা নৈতিকতা না অনৈতিকতা– এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতেই তাঁরা বর্গীনারায়ণের আস্তানায় হাজির হয়েছিলেন, প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষা দোরগোড়ায় তখন, চারপাশের অধিকাংশ সহপাঠীই ততদিনে সুড়ঙ্গ কাটার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ওদের জনাকয়েকের মনে তখনো এই ব্যাপারে দারুণ আড়ষ্টতা, ঔচিত্য-অনৌচিত্যের বিষয়গুলিও দারুণ ভাবে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই স্যার বর্গীনারায়ণের শরণে আসা, কলেজের প্রাচীন ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। পার্থিব-জগত থেকে মহাজগত, অদ্বৈতবাদ থেকে ব্রহ্মবাদ, কান্ট-হেগেল থেকে কার্ল মার্কস, উডি গাথরি থেকে জন লেনন, আইনস্টাইন থেকে অ্যালান ট্যুরিং, গীনসবার্গ-সুনীল-শক্তি থেকে বিনয় মজুমদার, কুরোসাওয়া থেকে রোসেলিনি, পামুক থেকে মার্কেস– সব বিষয়েই বর্গীনারায়ণের অগাধ পাণ্ডিত্য, ‘স্যার’ উপাধিটা তাই তার সহপাঠীদেরই দেওয়া। ‘মাং নমস্কুরু’ নামের সেই বিখ্যাত কুঠুরিটিতে ত্রৈলঙ্গরা তাই কড়া নেড়েছিলেন এক প্রাক-সেমেস্টার বিকেলে, বর্গীচনারায়ণের সেই বিখ্যাত আস্তানায়। সদর হাসপাতালে জলদোষ অস্তর করিয়ে বর্গীনারায়ণ তখন শয্যাশায়ী, তা সত্ত্বেও সেদিন পরম যত্নে চোত্‌-দর্শনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছিল ও। ‘চুরিবিদ্যেসহ আরো নানান ক্রিমিনাল অফেন্সকে ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের নানান ধারায় এনলিস্ট করা হয়েছে। চোতা করা যদি গর্হিত কর্মই হতো, তাহলে অনেক দিন আগেই চোত-নিবারণ আইন হত, কোমরে দড়ি দিয়ে ধরে নিয়ে যেত পুলিশে। তা কী হয়েছে কখনো? হয়নি তো? তাহলে?’ বলত বর্গীনারায়ণ!সেদিন থেকেই ত্রৈলঙ্গরা তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সেদিন থেকেই তাত্ত্বিক চোত-বিদ্যার পাশাপাশি ফলিত-চোতবিদ্যায় হাতেখড়ি হয়েছিল ওঁদের। পরীক্ষা-হলের বেঞ্চি দেওয়াল ব্ল্যাকবোর্ড, ক্যালকুলেটারের আগাপাশতলা, স্কেল-সেটস্কোয়ার-জ্যামিতি বাক্স, দেহের নির্বাচিত কিছু উন্মুক্ত অঞ্চল আর সর্বোপরি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র চোত-কাগজের প্রতিটি সেন্টিমিটার-মিলিমিটারের সদ্বব্যবহার শিখেছিলেন ত্রৈলঙ্গরা। পরীক্ষার সময় একাধিক-পকেটওয়ালা জামাকাপড় পরার গুরুত্ব, পরীক্ষাচলাকালীন চোত্‌কাগজগুলির প্রতিটির সঠিক এবং দ্রুত সুলুকসন্ধান প্রদানকারী চোত-ইন্ডেক্সের উপকারিতা, ক্যালকুলেটারের গায়ের পেন্সিলে লেখা চোত্‌-পাঠোদ্ধার করার সঠিক অ্যাঙ্গেল, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সাংকেতিক চোত তৈরির প্রয়োজনীয়তা– এই সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলিও শিখেছিলেন স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। ‘চোতবৃত্তি স্বীকৃতি পাওয়া উচিত কিনা- এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ নামক একটা রচনা লিখে ফেলেছিল বর্গীনারায়ণ, ‘সান্ধ্য খিঙ্খির’ হইহই করে সেটা ছেপেছিল- ওর কত কীর্তিই না লেপ্টালেপ্টি হয়ে আছে হস্টেলের আনাচে কানাচে! ‘লেলেলা উত্‌সব’ মানে লেলন-লেলিন-লালনকে নিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উত্‌সব ওর আরেকটি বিখ্যাত উদ্ভাবন। কিন্তু তারপর কোথায় যে গাপ হয়ে গেল মানুষটা, অন্তিম সেমেস্টার উত্‌রে যাবার পর থেকেই আর কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। ই-মেইল-ফেসবুক তো দূর- টেলিফোনের তার, মোবাইল ফোনের তরঙ্গ- কোনো কিছুইস্যার বর্গীনারায়ণের পিছু ধাওয়া করতে পারল না।

এরপর ত্রৈলঙ্গদের কলেজজীবনেরও ইতি হল একদিন। অষ্টম সেমেস্টার শেষ হয়ে যাবার পর সন্ন্যেসি আর ত্রৈলঙ্গ জুটলেন মহানগরীর এই মেসবাড়িতে। একবিংশশতাব্দীর সূচনালগ্নে ‘তারাশংকর’ হস্টেলে যে সখ্যের সূত্রপাত, ত্রৈলঙ্গের জীবনের শেষদিন অব্দি তা অমলিন রইল।

সন্ন্যেসি ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছিল ত্রৈলঙ্গ আর ধরাধামে নেই। ‘তেলেঙ্গা সেই কোন শুক্কুরবার গাঁয়ে গেল- বলল সোমবার একেবারে আপিস করে মেসে ফিরবে। এদিকে সোম গেল, মঙ্গল গেল, বুধ যায় যায়– ছেলেটা এখনো ফিরল না!’ এই ভেবেই সন্ন্যেসি ফোন করেছিল ত্রৈলঙ্গকে। ফোনটা বাজতেই অভ্যাসবশত তা ধরতে গিয়ে বিফল হয়েছিলেন ত্রৈলঙ্গ, ত্রৈলঙ্গের বাবাই ধরেছিলেন ফোনটা, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। ওপাশ থেকে সন্ন্যেসির গলাও যে রুদ্ধ হয়ে আসছে টের পেয়েছিলেন ত্রৈলঙ্গ। সেও হয়ে গেল আজ পাঁচ-সাতদিন। তারপর সবাই যে যার নিজের স্বাভাবিক জীবনচর্যায় ফিরে গিয়েছে, ত্রৈলঙ্গ এখন সেরেফ অতীত। কারোর জন্যেই কিছু আটকায় না, কথাটা আগে অনেকবার ভেবেছেন ত্রৈলঙ্গ, এন্তেকাল হবার পরে সারবত্তাটা আরো ভালো বুঝতে পারলেন।

ভূতের মতন মেসবাড়িতে সেঁধিয়ে গেলেন ত্রৈলঙ্গ। তাঁর কুঠুরির বিছানাটা টানটান করে পাতা এখনো। দিন দশেক আগে কিনেছিলেন জাফরানি চাদরটা, সস্তার চোতমাসে শখ করে কিনেছিলেন। বই-এর তাকে পাবলো নেরুদা,‘ফিরে এসো চাকা’, হোসে মার্তি, ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’–ওতে গোঁজা স্থাণু বুকমার্কটা আর হতদম টেবিল-ঘড়িটা। ভেবেছিলেন ফিরে এসে নতুন ব্যাটারি লাগাবেন। জাদুঘরের সামনের ফুটপাথে অনেক তল্লাশ করে কিনেছিলেন লেননসাহেবের পোস্টারটা, তারপর ‘মা-তারা’র ক্যালেন্ডারে যত্ন করে সাঁটিয়ে দিয়েছিলেন। ‘মা-তারা’ আছে কিন্তু পোস্টারটা আর চোখে পড়ল না, ধার্মিক সন্ন্যেসি বোধহয় সরিয়ে ফেলেছে ওটা। চানাচুরের একটা গাবদা প্যাকেট রাখা কুলুঙ্গিতে। চানাচুর নিয়ে খুব খুঁতখুঁতানি ত্রৈলঙ্গের, মোলায়েম মসৃন মসলিন চানাচুর তাঁর পছন্দ নয়। বড়বাজার তোলপাড় করে এইরকম একটা চানাচুর হাসিল করেছিলেন ত্রৈলঙ্গ, কুড়ুংকুড়ুং করে চর্বন করতে করতে রোম খাড়া হয়ে যায় এমনই এর মহিমা! এই চানাচুরের টানেই আপিস থেকে সন্ধে-সন্ধে বাড়ি ফিরতেন তিনি। এই তো দিন দশেক আগের কথা– ত্রৈলঙ্গের প্রেতচোখ ছলছল করে উঠল। কুণ্ডলী পাকিয়ে নিশ্চুপে বিছানাটায় পড়ে রইলেন খানিক্ষণ।

আঁটকুঁড়ওয়ালা এসেছে বাঁশি ফুঁকতে ফুঁকতে একচক্রযান ঠেলে ঠেলে। পাশের বাড়ির খুড়োমশাই বাজার করে ফিরলেন, রিকশওয়ালার সঙ্গে ভাড়া নিয়ে আকচাআকচি হচ্ছে। খুড়োমশাই লোকটা একই রকম রয়ে গেলেন। অকৃতদার, সংসার বলতে নবতিপর মা তবু দু-আনা চার-আনা নিয়ে এখনো ভাবিত হন– যেমনটা হয়তো ভাবিত হতেন ছয়ের দশকে। তবে বাজারপাট করতে পারেন বটে- কমসেকম পাঁচটা দোকানে কামরাঙ্গার দরদাম করে ঠিক ছ’নম্বর ঝাঁকাওয়ালার কাছে বাজারের সবচেয়ে সস্তা আর সেরা মালটা তুলে নেন ভদ্রলোক। মৌজে তাম্রকূট সেবন করতে করতে অনায়াসে ছেঁকে তোলেন ডোরা কাটা তাজা পটোল, বিম্বৌষ্ঠ কুমড়ো, নিষ্কলুশ চিচিঙ্গে- সঙ্গে ফাউটাও জরুর চাই। ত্রৈলঙ্গ শিক্ষানবিশী করেছিলেন একসময়, শিখেছিলেন হাইব্রিড আর দিশি মূলোর তফাত, বেগনী বার্তাকু ভালো পুড়িয়ে খাওয়া যায় না সবুজ, সেরেফ ফুলকপির ছায়া দেখে কী ভাবে আন্দাজ করে নিতে হয় ওটার আঁতুড়- ধাপারমাঠ নাকিমজিলপুর।

রিকশাওয়ালার রক্ত বেশ গরম মনে হচ্ছে– সহজে ছাড়ছে না। বড্ড চিত্‌কার চেঁচামেচি করছে। ত্রৈলঙ্গ উঠে পড়েন।

একবার ইচ্ছে হল আপিসে ঢুঁ মেরে আসেন। আপিসের কথা ভাবতেই ম্যানেজারের কথা মাথায় এল, ইচ্ছে হল এই অবেলাতেই ঘাড়টাড় মটকে দিতে। বিষম জ্বালা জ্বালিয়েছে লোকটা, ত্রৈলঙ্গের পদোন্নতি, বেতনবৃদ্ধি সব কিছুতেই ব্যাগড়া দিয়েছে।বিস্তর আশ নিয়ে বসেছিলেন যে এইবছর হয়তো ওঁর ম্যানেজার কার্পণ্যঘোষ পদন্নোতির সুপারিশ মেইলটি তার ওপরওয়ালার কাছে এগিয়ে দেবে। কিন্তু এবারও বেমতলব সে বঞ্চিত করলত্রৈলঙ্গকে।কারণ হিসেবে বলল–‘তুমি বেজায় খেটেচ, কিন্তু ওইটিই তোমার কাল হয়েচে হে। প্রজেক্টটায় আরো চারটে ছোঁড়া ঢুকিয়ে যেখানে আরো কিঞ্চিত্‌ ডলার রোজগার করত কোম্পানি– সেখানে তুমি একাই চারটে জোয়ানের কাজ সাবাড় করে দিয়েচ– তাতে কোম্পানির রেভেন্যু লবডঙ্কা হয়ে গ্যাচে। এবার আর তাই তোমাকে প্রোমোশন দেওয়া গেল না হে ত্রৈলঙ্গ।’ এসব কর্ণগোচর করে ত্রৈলঙ্গের খুন টগবগ করে ফুটতে লাগল, সারা বছর মুখে রক্ত উঠিয়ে খেটে এই ইনাম! তারপর একদিন দুপুরের দিকে আপিসে সেরকম কাজ ছিলনা, একটা কবিতা আউড়ে ফেলেছিলেন মনে মনে– তারপর টোকা মেরে মেরে লিখে ফেলছিলেন- হঠাত্‌ পিছনে হাজির হাড়হাঁজাটা। যাচ্ছেতাই অপমান জুটল! সেইদিনই ত্রৈলঙ্গ আত্মহত্যা করবেন ভেবেছিলেন, আরো কিছুদিন এরকম অত্যাচার চললে হয়তো আত্মহত্যাই করতে হত ত্রৈলঙ্গকে, হাতির পদাঘাতের জন্য অপেক্ষা করতে হত না। আজ একটা মওকা এসেছে বদলা নেবার, কিন্তু ত্রৈলঙ্গ ভেতর থেকে তেমন সাড়া পেলেন না। ‘ভূত হয়েচি বলেই কী ভূতোমি করতে হবে নাকি! পেত্নী-শাঁকচুন্নি-মামদোর সঙ্গে আমার আর কী তফাত্‌!’ মনে মনে ভাবলেন ত্রৈলঙ্গ। ঠিক এই ভঙ্গিতেই ছোটোবেলায় মা শাসন করতেন ত্রৈলঙ্গকে–‘তা বলে তুইও বিট্‌লেকে মারবি– ওর সঙ্গে তাহলে তোর কী তফাত!’- বেশ মনে পড়ে গেল ত্রৈলঙ্গের। ছোটোবেলায় মা-বাপের উচ্চারণ করা শাসনবাক্যগুলি মানুষের চরিত্তির গঠন করে ফেলে– মরার পরও সেটার প্রভাব থেকে যায়- জগতের কী নিয়ম! আপিসে যাওয়ার পরিকল্পনা বানচাল করে দিয়েছিলেন, আর কখনো ও মুখো হবেন না, ঠিক করে নিয়েছিলেন মনে মনে।

বরং ত্রৈলঙ্গের ইচ্ছে হল একটু গঙ্গার ধারে বসার। চিরটাকাল দক্ষিণ আর পূর্বের কক্ষপথে ঘঁষটিয়ে বড্ড একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল জীবনটা, কলকাতার পশ্চিমটা অধরাই রয়ে গিয়েছিল। ত্রৈলঙ্গ হুশশ্‌শ্‌ করে উড়ে গিয়ে বাগবাজার ঘাটের একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ছাদে বসে পড়লেন। সকাল দশটা এখন, পিলপিল করে মানুষ আসছে ঘাটে চান করতে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা-মাঝবয়সী-তরুণ-তরুণী! স্নানরত একটি সরেস তরুণীর দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল ত্রৈলঙ্গের। দিনের বেলা চোখে মন্দ দেখেন, তবে যতটুকু দেখলেন তাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। গুরুমধ্যমা-নিবিড়নিতম্বা-কৃশকটি-ক্ষীণোদরী- ত্রৈলঙ্গের মনোজগতে বিশেষণের যেন শোভাযাত্রা বেরুল! হঠাত্‌ ত্রৈলঙ্গের নারীসংসর্গ করার ইচ্ছে হল। লাজুক ত্রৈলঙ্গ আজীবন নারীসঙ্গসুখ বঞ্চিত, ইহজীবনে নিপাট ব্রহ্মচর্য পালন করেছেন। বিস্তর হাতছানি ছিল চারপাশে, তবু নিখাদ লজ্জাশরমবশত নারীসংক্রান্ত ব্যাপারটি বরাবর এড়িয়েই চলেছেন। যদিও কলেজে পড়াকালীন একবার একজুনিয়ার যুবতীকে মনে ধরেছিল,জুনিয়ার ছাত্রছাত্রীদের নবীনবরণের দিনে আবিষ্কার করেছিলেন অগ্নিবর্ণা মুকুজ্জ্যেকে। কিন্তু ততদিনে স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের দীক্ষা নিয়ে ফেলেছেন তিনি। ‘নারীণৌ শত হস্তেন’–চাণক্যশ্লোকের একটি অংশবিশেষকে ভেঙ্গেচুরে দিয়ে তার শিষ্যদের কর্ণেজপন করছে স্যার বর্গীনারায়ণ। শুধু কর্ণেজপন নয়- শিষ্যদের উদ্বুদ্ধ করতে নিজে সন্ধের পর ক্লাসরুমে থাকছে না, আঁধারে লতাগুল্মের ভিড়ে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না, সতীঘাটের ছায়াঘন বটতলাটার নীচে তার সিদ্ধিলাভ হচ্ছে না। ভর্তির মরশুমে নবাগত ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে ‘শ্রোণীভারাদলসগমনা’দের শতকরা হার নিয়ে তার কৌতুহল নেই, র‍্যাগিং-এর অছিলায় ‘তণ্বী শ্যামা শিখরদশনা’দের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতেও সে যাচ্ছে না কখনো। বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সর্বদা নারীসংসর্গ থেকে শতহস্ত দূরে। এরপর আর অগ্নিবর্ণার হৃদয়ের খবর রাখা সম্ভব নাকি! এতো নিতান্তই ব্যভিচারের সমান–বর্গীনারায়ণের শিষ্যত্ব অটুট রাখার পথে তা ভয়ানক বাধা! ত্রৈলঙ্গ তাই সাহস করে আর ও-পথ মাড়াতে পারলেন না। কালক্রমে অগ্নিবর্ণাকে জয় করল তাদের ক্লাসেরই এক শ্রেণীশত্রু।

 

কিন্তু আজ ত্রৈলঙ্গের খুব ইচ্ছে হল ওই জলসিক্ত নধরকান্তি স্ত্রীমূর্তিটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গনকরার। ইচ্ছে হল আলিঙ্গন করে কিঞ্চিত খাতিরযত্ন করার, ক্রোড়ে ধারণ করে গভীর স্পর্শসুখ নেওয়ার। কথাটা ভাবতেই বেশ লজ্জিত হয়ে পড়লেন তিনি। সারাজীবনে কোনোদিন তিনি কোনো অশ্লীল কাজ কম্মে যুক্ত ছিলেন না। পাড়ায় ফুলকলি, দুঃশলা, কাগজিদের দিকে চোখ তুলে তাকাননি ভালো করে, পুকুরে গেলে মেয়েদের ঘাটের ছায়া মাড়াননি, কী সকালে কী বিকেলে। ছোটোবেলা থেকেই ইমেজ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন ত্রৈলঙ্গ, ‘ডেঁপো ছোকরা’র খেতাব যাতে জুটে না-যায় এব্যাপারে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। আর কলেজে পড়াকালীন তো বর্গীনারায়ণের দীক্ষা ছিলই। চলার পথে ‘মৃত্যু’ একটা ‘মাইল-ফলক’।‘মাইল-ফলক’ অতিক্রম করলে চরিত্তিরের বদল হয় নাকি! অবিশ্যি নতুন জন্মেই এই পথের শেষ, তখন যাত্রাটা আবার নতুন করে শুরু হয়। তবে আমৃত্যুলালিত ‘ভদ্রবালক’ ইমেজটিকে কোনো মতেই তুবড়ে যেতে দিলেন না ত্রৈলঙ্গ। বাগবাজার ঘাটের সেই উদ্ভিন্নযৌবনার দিকে সলজ্জে সেরেফ তাকিয়ে রইলেন, বেল্লেলাপনার রাস্তায় হাঁটলেন না ভুল করেও।

কিন্তু কাজের কাজ কিছু একটা না করলে সময় কাটানো দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল। কাঁহাতক আর গঙ্গারঘাট, নলবন, বনবিতান, ভিক্টোরিয়ায় হাঁ করে বসে থাকা যায়! আপিসের কেরানিবৃত্তি একঘেয়ে ছিল বরাবরই, কবিতাচর্চার দিকেই ঝোঁকটা ছিল বেশী। কাজের ফাঁকে দু-এক পংক্তি লিখে ফেলতে লালায়িত হতেন, স্বপ্ন দেখতেন একদিন চাকরির পাঠ উঠিয়ে পূর্ণ-সময় কবিতা চর্চায় মনোনিবেশ করবেন। আজ তাঁর অখণ্ড অবসর, কিন্তু কালি-কলম পাকড়ানোর ইচ্ছেটাই যেন ফুড়ুত্‌ হয়ে গিয়েছে এই ক-দিন। অশরীরীর পুঁজি শুধু মনটুকু, সেই মনটুকু থেকে কবিতা লেখার আগ্রহটাই যেন বিধাতা খুঁটে নিয়েছেন, কাব্যি আর হবে কোথ্‌থেকে! এই প্রেতদুনিয়ায় আর কীই বা করার আছে তাঁর! বেল্লেলাপনা ডাঙালেপনা তাঁর দ্বারা হবে না, ঘাড়মটকানো, রাতদুপুরে হুজ্জুত করাও না। কবিতাও উধাও। এই পরকালে আর কী কর্তব্য রইল তাঁর! ত্রৈলঙ্গ বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন।

(ক্রমশ…)

 
 
top