যে দরজার কোনো দেওয়াল নেই

 

স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং (২০০৩)

১০৩ মিনিট

নির্দেশক: কিম কি দুক

 

আমি এই সিনেমাটা শুরু করেছিলাম একটা প্রশ্ন থেকে ‘জীবনের মানে কী?’ প্রতিটা মানুষের নিজস্ব একটা সুযোগ দরকার যখন তাঁরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারবেন তাঁদের কাছে জীবনের অর্থ কী, বিশেষ করে যখন একজন মানুষ একটা যন্ত্রণাদায়ক সময়ের মধ্যে দিয়ে যান।

কিম কি দুক

00128837চলচ্চিত্রের সমালোচনা করার সময় বেশিরভাগ সমালোচক সেই চলচ্চিত্রের আখ্যানের আলোচনা করেন। কিন্তু সিনেমা শুধু আখ্যান নয়। সিনেমা মানুষের আবিষ্কার করা শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে সব থেকে আধুনিক। আমাদের ভাষায় সেভেন্থ আর্ট। ফলে সিনেমার বয়ানে আখ্যান ছাড়াও লুকিয়ে থাকে আরো অনেক বয়ান। আর তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য তার ভিশ্যুয়াল বা তার দৃশ্য। অতএব চলচ্চিত্র সমালোচকের দায় থেকে যায় সিনেমার দৃশ্য আলোচনার। কিন্তু দৃশ্য চাক্ষিক মাত্র, শাব্দিক নয়। যদি শব্দ বা ভাষায় দৃশ্যের সমস্ত গুণাগুণ প্রকাশ করে দেওয়া যেত, তাহলে আলাদা করে দৃশ্যের প্রয়োজন হত না।

দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম সেরা পরিচালক কিম কি দুকের স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং দেখতে দেখতে বার বার এই কথাগুলো মনে পড়ে। কিম কি দুক সিনেমা-বিশ্বে অন্যতম পরিচিত এক নির্দেশক। তথাকথিত আর্ট হাউজ পরিচালকের মতোই তাঁর ছবি দক্ষিণ কোরিয়ায় তেমন চলে না। অথচ দৃশ্যের বুননে এবং বয়ানে তিনি অবিস্মরণীয়।

কিম কি দুকের এই ছবিটায় গল্পের প্রয়োজনীয়তা কম। বরং তার থেকে বেশি প্রয়োজনীয় বোধ। এবং আরো প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিকতা। এই আধ্যাত্মিকতা বৌদ্ধধর্মের। আর আধুনিক, উত্তর আধুনিক মন্তব্যে এই আধ্যাত্মিকতাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার সুযোগ কম। কারণ এই আধ্যাত্মিকতা প্রতীচ্যের নন্দনতত্ত্বের আঁচড়ে আঁচড়ে লেখা আছে। এই ফিল্মের কম্পোজিশন, দৃশ্যের বুনোট, এমনকী বিষয়ও অসম্ভব প্রতীচ্যের।

স্প্রিংসন্ত

রাইস পেপারের ওপর কোরীয় ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ছবির টাইটেল। তারপর টাইটেল কার্ডে লেখা থাকে প্রথম পর্বের নাম। স্প্রিং। বসন্ত।

একটা বন্ধ দরজার শরীরে আঁকা দু-জন মানুষের ছবি। ছবির ধরণ দূরপ্রাচ্যের চিত্রকলার নিয়ম মেনে। আমরা ভারতীয়রা এমন ছবি দেখতে অভ্যস্ত বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রির দেওয়ালে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে ধীরে ধীরে খুলে যায় দরজা। পিছনে জল। একটা ছবির মতো সুন্দর জলাভূমি। তার ওপর ভাসছে একটা প্যাগোডা আকৃতির বাড়ি। তার পিছনে পাহাড়। জলের মধ্যে অর্ধেক ডুবে থাকা কিছু গাছ। গাছের কালো ছায়া জলের গায়ে দুলছে। ক্যামেরা টিল্ট আপ করতে থাকে—আমরা আবার দেখতে পাই জলের মধ্যে প্যাগোডা আকৃতির সেই ভাসমান বাড়িটি। দুটো গাছের ডালের ভিতরে বাড়িটা ধরে স্থির হয় ক্যামেরা। যেন পরম যত্নে গাছ দুটো ধরে রেখেছে বাড়িটাকে। দৃশ্যের বুনোটে একটা হারমনির আভাস। যেন প্রকৃতি আর প্যাগোডাটা ভীষণ সাবলীল এক সাদৃশ্যে ভেসে আছে। পরের দৃশ্যেই আবার সেই দরজা, প্যাগোডাকে পিছনে রেখে। আমরা দেখতে পাই দরজার কোনো দেওয়াল নেই। দরজাটা আসলে আপাতভাবে নিষ্প্রয়োজনআমরা বুঝতে পারি না কেন এই দরজাটা।

জল বা অপ ধাতু আসলে আপেক্ষিকতার ইঙ্গিত। দেওয়ালহীন এই দরজা আসলে অন্য ইঙ্গিত দেয় যেন। আসলে এর সবটাই যেন রূপকমায়া। মৈত্রেয় যেন তাঁর স্বপ্নের মধ্যে নির্মাণ করছেন মায়ার বাস্তব।

বুদ্ধের পায়ের কাছে জল। সেই জলে সাঁতার কাটছে লাল মাছ। এই জীবনের সবটুকুই যেন বুদ্ধের পায়ের কাছে। জলের মতোই আপেক্ষিক। বুদ্ধমূর্তির পয়েন্ট অব ভিউতে আমরা দেখতে পাই উপাসনারত গুরুকে। সবটুকুই যেন মৈত্রেয়র স্বপ্নে। মায়ায়। তথাগতের চোখ দিয়ে দেখা। এর পরেই আমরা দেখতে পাই বৌদ্ধ শ্রমণের মতো মুণ্ডিতমস্তক শিশু ভিক্ষুকে। ঘুমন্ত অবস্থায়। তার শরীরের পাশ দিয়ে আবার একটা দরজা। দেওয়ালহীন এই দরজাটাও। এই দরজাটা ঠেলে খুলে গুরু তাঁর শিষ্য শিশু ভিক্ষুকে বলেন জেগে উঠতে। অথচ দরজার বাইরে থেকেও বলা যেত। কারণ কোনো দেওয়াল নেই। কিন্তু গুরু সেটা না করে যেন অদৃশ্য দেওয়ালের উপস্থিতি মেনে নিলেন। শিশু শিষ্যও ঘুম থেকে উঠে আবার সেই দরজার ভিতর দিয়েই বেরিয়ে এল। হাত জোড় করে উপাসনায় বসল বুদ্ধমূর্তির সামনে। সেই বুদ্ধমূর্তি জলের পাত্রের মধ্যে রাখা। সেই জলের মধ্যে লাল মাছ ঘোরাফেরা করে। বাইরে দেখা যায় বৃদ্ধ গুরুকে। জলে ভাসমান প্যাগোডাসদৃশ মঠের পাশের জলে তিনি ঘোরাফেরা করতে দেখেন লাল মাছ। লং টপ শটে এর পরই প্রায় পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা প্রায় গোলাকার সেই জলাভূমির মাঝে ভাসমান একটা মঠ। এই ক্রস রেফারেন্সটা চমৎকার। জল আর পাহাড়ের ছোট্ট গোলাকার ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু যেন ওই মঠ যেন প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধেরই ইঙ্গিত। পরিচালক শুধু দৃশ্যের ভাষায় আসলে ইঙ্গিত দিয়ে দেন ছবির প্রতিপাদ্য বিষয়ের, কাহিনীর আখ্যানে যার কথা আসবে অনেক পরেওই বৃদ্ধ যেন আসলে বোধিসত্ত্বই। এই কয়েকটা শট দেখার পর মনে প্রশ্ন জাগে, এটা আইজেনস্টাইনের টোনাল মন্তাজ হল কি-না। বিখ্যাত রুশ নির্দেশক এবং ফিল্মতাত্ত্বিক আইজেনস্টাইনের মতে, টোনাল মন্তাজ হল কয়েকটা আপাতউদ্দেশ্যহীন শটের সমাহার যার টোন বা মূল সুর এক।

00128844

লং শটে এরপর দেখা যায় জলের মাঝে ভাসমান মঠ। তার ছায়া পড়েছে জলে। অদ্ভুত সিমেট্রি কম্পোজিশনে। আবার সেই হারমনির ইঙ্গিত। বৃদ্ধ গুরু ঝাঁট দিচ্ছেন। আর শিষ্য শিশুটি একটা ছোট্ট কুকুর নিয়ে বসে আছে। এরপরেই গুরু নৌকায় উঠে বসেন। আর ছবির তৃতীয় দরজা, মঠের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে শিষ্য। এই দরজাটাই একমাত্র প্রকৃত দেওয়ালসর্বস্ব দরজা। বৃদ্ধের নৌকায় উঠে বসে শিশুটি। সে ওষুধের গাছ খুঁজতে যাবে। পিছন দিকে নৌকা বাইতে থাকেন গুরু। ঈষৎ হাস্যময় তাঁর ভঙ্গিমা। আর রিভার্স অ্যাঙ্গেলে শিশু-শিষ্যের হাস্যময় মুখ। পিছনে জলের স্রোত। অসামান্য সিনট্যাক্স। শিশুটির পবিত্রতার ইঙ্গিত করে। আবার একই সাথে বলে দেয় এইটাও আপেক্ষিক, একটা পর্যায় মাত্র। দেখা যায় নৌকার গায়ে মহাযান বৌদ্ধধর্মের দেবী গুয়ানইন-এর ছবি আঁকা। এই গুয়ানইন হলেন ভারতের অবলোকিতেশ্বর। ক্ষমার প্রতিমূর্তি। নৌকার গায়ে আঁকা গুয়ানইনের হাতে পদ্ম, তার মধ্যে বসে আছেন শিশু বোধিসত্ত্ব। এবার সিম্বল (প্রতীক)। নৌকা-বাওয়া গুরু যেন শিশু বোধিসত্ত্বকে বয়ে নিয়ে যাওয়া অবলোকিতেশ্বরের প্রতীক।

শিশুটি ভেষজ উদ্ভিদ তুলতে তুলতে তুলতে দেখতে পায় বিষধর সাপ। সাপটাকে হাত দিয়ে তুলে দূরে ছুড়ে দেয় সে। বৌদ্ধধর্মের মতে সে অপাপবিদ্ধ, তার ক্ষতি কেউ করতে পারে না।

শিশুটি পাহাড়ের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে উঠে দাঁড়ায় এক চোখ মুদিত বুদ্ধমূর্তির পিঠে। দূরে তাকিয়ে দেখতে পায় জলের মধ্যে ভাসমান তাদের মঠ। যেন বুদ্ধের মতোই সমাধিস্থ। শিশুটিও যেন অপাপবিদ্ধ মুদিতচক্ষু বুদ্ধ মূর্তির মতোই।

শিষ্যের ভেষজের মধ্যে গুরু খুঁজে পান বিষাক্ত উদ্ভিদ। শিষ্যকে তিনি চেনাতে থাকেন ভেষজ ঔষধি-গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ আর বিষাক্ত উদ্ভিদের তফাৎ। আসলে যেন বুঝিয়ে দেন ভালো ও খারাপের ভেদাভেদ, দয়া ও হিংসার ভেদাভেদ।

এর কিছু পরেই শিশুটিকে দেখা যায় ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠতে। একবার দেখা যায় গুলতি ছুড়তে, পাথর ছুড়তে জলের দিকে। তারপর দেখা যায় একা নৌকা বেয়ে পারের দিকে যেতে। শিশুটি প্রথমে একটা মাছ ধরে তার গায়ে একটা পাথর বেঁধে সেটাকে জলে ছেড়ে দেয়। একই কাজ সে করে একটা ব্যাং এবং একটা সাপ ধরেও। আর শিশুটির এই নির্দয় আচরণ আড়াল থেকে প্রত্যক্ষ করেন গুরু। এইখানে দর্শকের মনে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে। গুরু কী করে এই পারে এলেন? কারণ এতক্ষণ অবধি গোটা ছবিতে একটিমাত্র নৌকাই দেখা গিয়েছে। এর উত্তর আরো পরে দেবেন পরিচালক।

এই অপকর্মটি করে মঠে ফিরে আসে শিশুটি। ঘুমিয়ে পড়ে। গুরুকে দেখা যায় একটা ভারী পাথর নিয়ে আসতে। পাথরটা তিনি বেঁধে দেন শিষ্যের পিঠে। সকাল হলে শিশুটি কাঁদতে থাকে, ভারী পাথরটা খুলে দিতে বলে গুরুকে। গুরু বলেন ঠিক একই কাজ সে করেছে মাছ, ব্যাং  আর সাপের সাথে। তাই যতক্ষণ না সে তাদের পাথর খুলে দিচ্ছে, ততক্ষণ তিনিও খুলবেন না তার পাথরটা। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে কেউ এই অত্যাচারে মরে গিয়ে থাকে, তাহলে এই পাথর সে বয়ে নিয়ে যাবে সারা জীবন ধরে, তার মনের ভিতর।

শিশুটি খুঁজে পায় মাছটাকে। মাছটা মরে গিয়েছে। ব্যাংটা জীবিত। আর সাপটাও মরে গিয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কিন্তু আর অপাপবিদ্ধ নয় সে। সে পাপ করে ফেলেছে। ফলে পতন ঘটেছে তার। বাইরের পৃথিবীর মানুষের মতোই সে এখন সাধারণ। খুব জোরে বয়ে যাওয়া ঝরনার জল, এতক্ষণের স্থির জলের পাশাপাশি যেন তার এই পতনেরই ইঙ্গিত করে। এইখানেই শেষ হয় স্প্রিং। বসন্ত, যখন অঙ্কুরের উদ্গম হয়।

সব্‌বে তসন্তি দন্ডস্‌স সব্বে ভায়ন্তি মচ্চুনো।

অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয্য ন ঘাতয়ে।।

সবাই দণ্ড থেকে ভয় পায়, সবারই মৃত্যুভয় হয়। সবাইকে নিজের মতো ভাবো, কাউকে মেরো না আর মারতে দিয়ো না। (ধম্মপদ)

সামার:  গ্রীষ্ম

গ্রীষ্মে শিষ্য ভিক্ষু যুবা হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের কারণেই ছবিতে আলো অনেক বেশি তেজি। ভিশ্যুয়ালে প্রকৃতির রূপ বদল হয়। এই পর্যায়ের শুরুতে দেখা যায় যুবা শিষ্য নৌকা বেয়ে মঠের থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছে। এটাও যেন এই পর্যায়ের আখ্যানের চলনের ইঙ্গিত করে। দরজার বাইরে বেরিয়ে সে দেখতে পায় মৈথুনরত দুটি সাপকে। তার মুখের অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির রহস্য সে জেনে ফেলেছেযুবা শিষ্য পাহাড়ের মাথায় বুদ্ধমূর্তির পিছনে তাকিয়ে দেখে দূরে। এইবার তার দৃষ্টি অন্য দিকে, মঠের থেকে দূরে। এক্সট্রিম লং শটে দেখা যায় পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে আসছেন দুই নারী। এক কিশোরী ও তার মা। মেয়েটি অসুস্থ। তারা মঠে এসেছে মেয়েটির সুস্থতার জন্য। এই পর্যায়ে যুবা শিষ্যটির পোষ্য একটি মোরগ। এই মোরগটা ছেলেটির পুরুষত্ব বা ভিরিলিটির ঈঙ্গিত। সে এই মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। মঠে প্রার্থনারত এই মেয়েটির দিকে সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে চতুর্থ একটা দরজা খুলে। এই দরজাটা মূল দরজা নয়, বরং এক পাশ থেকে। পরিচালক যেন ঈঙ্গিত করেন এই তাকানো আসলে বয়ঃসন্ধি-উত্তর পাপবোধের পরিচয়। এর কিছু পরের দৃশ্যে মঠটাকে আবার দেখা যায় দরজার পাশ থেকে। স্প্রিং পর্যায়ে যে দুটি গাছের ডালের মাঝখান দিয়ে পরম মমতায় মঠটিকে ধরা হয়েছিল, এইবার দেখা যায় মঠটা সামান্য পাশে। অর্থাৎ সিমেট্রি ভেঙে গিয়েছে। যে নিখুঁত হারমনি স্প্রিং-এ ধরা পড়েছিল, সেই নিখুঁত হারমনি এইবার আর নেই। মেয়েটির মা মেয়েটির সুস্থতার জন্য তাকে মঠে রেখে যায়।

যুবা শিষ্য মেয়েটিকে পোশাক পরিবর্তন করার সময় দেখে ফেলে। কাম ক্রমশ দানা বাঁধে দুজনের সম্পর্কে। এরপর মেয়েটিকে দেখা যায় সাদা পোশাক পরা অবস্থায়। সাদা অর্থাৎ পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা। বোধহয় এই সাদা পোশাক মেয়েটির কৌমার্যের প্রতীক। কাম তাকে স্পর্শ করেনি, অর্থাৎ সে বিশুদ্ধ। ছেলেটি মেয়েটিকে মঠের বাইরে রাখা মূর্তির উপর বসতে নিষেধ করে। ছেলেটি পরম মমতায় মূর্তিটার উপরের ধুলো ঝাড়ে। মূর্তিটাকে ঘুরিয়ে ঠিক করে রাখে। মেয়েটি উঠে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মঠের ভিতর। ছেলেটা একটা কম্বল চাপা দেয় মেয়েটার গায়ে। তারপর হঠাৎ যেন নিজের কামবোধ চাপতে না পেরে হাত দেয় মেয়েটির স্তনে। মেয়েটি উঠে পড়ে, চড় মারে ছেলেটিকে। ছেলেটি ভয় পায়। প্রার্থনা করতে থাকে বুদ্ধমূর্তির উদ্দেশে। মেয়েটি ছেলেটির দিকে ফিরে তাকায়, হাত রাখে ছেলেটির কাঁধে। এমন সময় গুরু এসে যানছেলেটা আরো জোরে প্রার্থনা করতে থাকে। গুরু তাকে জিজ্ঞাসা করেন সে কেন অসময়ে প্রার্থনা করছে। ছেলেটা উত্তর না দিয়ে খুব জোরে প্রার্থনা করতে থাকে। এই সিকোয়েন্সটা খানিকটা কমিক। কিন্তু ছেলেটার বুদ্ধের প্রতি সমর্পণ যেন আর সত্যি নয়। এই পর্যায়ে প্রত্যেকেরই প্রার্থনা আসলে জাগতিক স্বার্থে। ছেলেটার প্রার্থনার শব্দে কন্টিনিউড শটে দেখা যায় মোরগটা খাবার খুঁটে খাচ্ছে। আবার সেই ভিরিলিটির ইঙ্গিত। একই সঙ্গে ইঙ্গিত জাগতিক বাসনা মেটানোর।

ছেলেটি মেয়েটিকে নিয়ে নৌকায় করে নিয়ে আসে পারে। এক্সট্রিম লং শটে মঠের ব্যাকগ্রাউণ্ডে তাদের দুজনকে নৌকায় উঠতে দেখা যায়। দেখা যায় আবার সেই গাছের ডাল দুটিকে। এইবারও মঠটা গাছের ডাল দুটির মধ্যে ধরা নেই। বরং তাদের একটু নীচে। পরিচালক এক একটা শটে মেটিকুলাসলি তাঁর সিনগুলো অ্যারেঞ্জ করেছেনএই সিনেমার মিসো সিন (Mise en sceneসিনে কী কী আছে) বার বার দেখার মতো। যত বার বার দেখা হয়, তত যেন দৃশ্যের নিজস্ব বয়ান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জলের মধ্যে মেয়েটির কাছে ছেলেটা একটা পাথর বেয়ে নীচে নেমে আসে। আবার যেন অ্যাধাত্মিক জগৎ থেকে মায়ার দুনিয়ায় নেমে আসার ইঙ্গিত।

ভেষজ পিষে ওষুধ তৈরি করতে থাকে ছেলেটি। গুরু বলে ওঠেন এটা হৃদয় দিয়ে করার বিষয়। এইবার সংলাপের মাধ্যমে সোজাসুজি বলে দেওয়া।

একা বসে থাকা মেয়েটির সামনে ছেলেটা নৌকা বাইতে বাইতে হঠাৎ চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে নৌকাটা। এই চক্র হল বুদ্ধধর্মের একটা খুব পরিচিত প্রতীক। বৌদ্ধধর্মে চক্র হল আধ্যাত্মিক সচেতনতার ইঙ্গিত। এইখানে এই ইঙ্গিত ব্যবহার হয় যেন যৌনবোধের জাগুরুক হয়ে ওঠার প্রতীক হিসাবে। এই সময় দেখা যায় মেয়েটির পিছনে একটা নৌকা আঁকা দেখা যায়। বৌদ্ধধর্মে নৌকা হল আধ্যাত্মিক সচেতনতা পাওয়ার একটা পদ্ধতি মাত্র। এই নৌকা আসলে প্রতীক একজন নারী ও পুরুষের পূর্ণমাত্রায় নারী এবং পুরুষ হয়ে ওঠার পদ্ধতির। একটা ট্র্যাঞ্জিশনের প্রতীক।

এরপরেই দুজনে অন্য পারে গিয়ে ওঠে। দুটি হাঁসকে দেখা যায় জলে। তারপরেই এই দুজনকে দেখা যায় মৈথুনরত অবস্থায়। ছেলেটা মেয়েটিকে পিঠে করে নিয়ে আসতে থাকে। আবার ক্রস রেফারেন্সে স্প্রিং-এর সেই পিঠে পাথর বাঁধাকে মনে করিয়ে দেওয়া। এইখানে একটা কন্টিনিউটির সমস্যা চোখে পড়ে। নৌকায় ওঠার সময় মেয়েটা ছিল খালি পায়ে। এখন দেখা যায় তার পায়ে জুতো। এটা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত বোঝা যায় না। তবে জুতো আসলে ফেমিনিটির প্রতীক। ফলে একটা অন্য আভাস থাকতে পারে। দুজনে ফিরে আসে এইপারে। গুরুকে দেখা যায় একটা কাঠের ওপর জল দিয়ে মন্ত্র লিখতে। লেখা শেষ হওয়ার আগেই উবে যাচ্ছে জলের দাগ। যেন আসলে নারী ও পুরুষের এই মিলন সাময়িক। খুব সামান্য, জলের উবে যাওয়ার মতোই এর রেশ থাকবে না। গুরুকে দেখে ছেলেটি খানিকটা কুণ্ঠিত। গুরু তাকে বলেন যে, নৌকাটা সে বাঁধেনি, নৌকাটা ভেসে যাচ্ছে। আসলে যে নৌকা তার ব্যবহার করা উচিত ছিল জ্ঞানের আলোয় পৌঁছানোর জন্য, সেই নৌকা সে ব্যবহার করেছে যৌনতার জন্য, জাগতিক কাজে।

রাত্রে ছেলেটি মেয়েটির সঙ্গে মিলিত হতে আসে। সে প্রথমে মঠের ভিতরের দরজা খুলতে যায়। কিন্তু গুরুর শরীরে আটকে গিয়েছে দরজাটা। ছেলেটা তাই দরজা দিয়ে না বার হয়ে, অদৃশ্য দেওয়াল উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসে। যেন সে আসলে অলঙ্ঘ্য সব নিয়ম ভেঙে ফেলছে। মঠের ভিতরেই মিলিত হয় দুইজন।

এর পর দেখা যায় বৃষ্টিমুখর এক দিনে ছেলেটা মেয়েটিকে আদর করে বসায় মঠের বাইরে রাখা মূর্তির উপর। যে মূর্তির উপর আগে সে মেয়েটিকে বসতে নিষেধ করেছিল।

পরের সকালে দুজনে খেলতে থাকে মঠের বাইরে। গুরু দেখেন তাদের খুনসুটি। মোরগটা খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে মেঝে থেকে। রাত্রে মেয়েটি নিজেই দরজা খুলে চলে যায় ছেলেটির কাছে। দুজনে বেরিয়ে পড়ে। মিলিত হয় নৌকার মধ্যে। সকালে গুরু উঠে দেখেন দুজনকে এক সাথে ঘুমিয়ে থাকতে। মোরগটার পায়ে দড়ি বেঁধে তিনি ছুড়ে দেন নৌকার মধ্যে। তারপর দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসেন মঠের কাছে। যেন ভিরিলিটি জীবনের এই পর্যায়ে জ্ঞানের মাধ্যম নৌকাটিকে চালনা করছে। গুরু নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। তবু ভিরিলিটি জরুরি। গুরু খুলে দেন নৌকার মধ্যে রাখা প্লাগ। নৌকাটি ডুবতে থাকে। ঠান্ডা জলের স্পর্শে জেগে ওঠে দুজন।

দুজনে কুণ্ঠিতভাবে এসে দাঁড়ায় গুরুর পিছনে। মুরগিটি মাটি থেকে খুঁটে খেতে থাকে। গুরু বলেন এটা শুধু প্রকৃতির কাজ। মেয়েটিকে চলে যেতে বলেন তিনি। মেয়েটির চলে যাওয়া মেনে নিতে পারে না ছেলেটি। সে এখন প্রেমে পাগল। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বুদ্ধমূর্তিটাকে ঝোলায় বেঁধে ফেলে সে এবং পিঠে নেয়। বুদ্ধ এখন তার কাছে ভারী পাথর মাত্র। মোরগটাকেও সাথে নেয় সে। গুরু চোখ খোলেন। তিনি টের পেয়েছেন শিষ্যের চলে যাওয়া। কিন্তু তিনি তাকে বাধা দেবেন না। তিনি উপাসনা করতে বসেন। তাঁর সামনে বুদ্ধমূর্তি নেই। বরং ঝাপসা, রং ওঠা দেওয়ালে আঁকা অন্য এক বুদ্ধের সামনে তিনি উপাসনারত। সেই বুদ্ধের মুখ দেখা যায় না। মোরগটাকে দেখা যায় জঙ্গলের পথে একা হাঁটতে। এইখানেই শেষ হয় সামার। অঙ্কুর এখন চারা গাছ। কিন্তু পথভ্রষ্ট।

পমাদমনুযুঞ্জন্তি বালা দুম্মোধিনো জনা।

অপ্পমাদঞ্চ মেধাবী ধনং সেট্‌ঠং’ব রক্‌খতি।।

মূর্খ (দুর্বুদ্ধি) ব্যক্তিগণ প্রমাদে যুক্ত থাকে। জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ ধনের মতো অপ্রমাদকে রক্ষা করেন। (ধম্মপদ)

 

. কিম কি দুকের সাক্ষাৎকার, লিন্ডা লিন, movieinsider.com 

. ধম্মপদ, ওয়াংচুক দোরজি নেগি, রামকৃষ্ণ দাস, পরশপাথর প্রকাশনী

(স্প্রিংসামারফলউইন্টার … অ্যান্ড স্প্রিং আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 

…)

 
 
top