প্রতিশোধ কিংবা একটা অন্য গল্প

 

বদলাপুর

নির্দেশক শ্রীরাম রাঘভন

১৩৫ মিনিট

Badlapur_Posterশ্রীরাম রাঘভন এফটিআইআই এর ছাত্র। তাঁর ডিপ্লোমা ফিল্ম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। আর সেই ফিল্মের এডিটর ছিলেন, তাঁর ব্যাচমেট, এখন বলিউডের নামী চলচিত্র নির্মাতা রাজকুমার হিরানী। এইটা হয়ত শুধুই একটা ট্রিভিয়া। কোন সিনেমার আলোচনায় এর তেমন কোন দাম নেই। ১৯৬৩ সালে জন্মানো শ্রীরাম রাঘভনের খুব ছোট্ট একটা ফিল্মোগ্রাফি। এক হাসিনা থি, জনি গদ্দার, এজেন্ট ভিনোদ, এবং সর্বশেষ বদলাপুরএজেন্ট ভিনোদ-এর মত পুরো দস্তুর মাসালা এবং ফ্লপ ছবি করার পর জনি গদ্দার সমালোচকদের নজর কাড়ে। যদিও বক্স অফিস ছুঁতে পারেনি সেই ছবি।

শ্রীরাম রাঘভনের ছবির একটা স্টাইল হল তিনি ভীষণ ভাবে বলিউডি। জনি গদ্দার-এর ছত্রে ছত্রে লেখা ছিল সেভেন্টিজের বলিউড ফিল্মের স্টাইল। তিনি সেটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই করেন।

বদলাপুর নামে সত্যিই একটা জায়গা আছে। মহারাষ্ট্রের থানে জেলায়। কিন্তু এই সিনেমায় বদলাপুর একটা ধারণা। ছবির শুরুতে টাইটেল কার্ড চলতে চলতেই আমরা টের পাই পথ চলতি কিছু শব্দের। সাউন্ডস্কেপ বলে দেয় শব্দগুলো একটা রাস্তার। এরপর দৃশ্য শুরু হয়। পুনের কোন এক রাস্তার দৃশ্য। দুটো গাড়ির মাঝ থেকে নেওয়া। আমরা শব্দেই শুনতে পাই সবজিওলার সাথে দরাদরি করছেন এক ভদ্রমহিলা। রাস্তায় কখনো মারাঠি ভাষার আওয়াজ, কখনো গাড়ির আওয়াজ। একটা দুটো গাড়ি চলে যেতে দেখি আমরা। মাঝে কখন যেন এক বেলুনওয়ালা হেঁটে যায়। অন্য পারের একটা গাড়িকে টো করে নিয়ে যেতে আসে কিছু লোক। এর মধ্যেই আমরা দেখি দুজন লোককে একটা ব্যাঙ্কের মধ্যে ঢুকে যেতে। শাটার নামিয়ে দিতে। সবজি কিনে ছেলেকে নিয়ে রাস্তা পার হন ভদ্রমহিলা। গাড়ির দরজা খোলেন। আমরা পিছনে আবার শাটার খুলতে দেখি। সেই দুজন ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হয়ে আসে ছুটে। পিছনে আমরা ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি গার্ডকে বেরিয়ে আসতে দেখি। একজন ট্রাফিক পুলিশকে। গান পয়েন্টে ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এই দুজন গাড়িটাকে ছিনতাই করে। আমরা হঠাৎ পার্কিং থেকে বেরিয়ে আসা একটা গাড়িতে ধাক্কা খেতে দেখি পথচলতি একটা মোটরবাইকে। কী স্বাভাবিক কিছু দৃশ্য। ঠিক যেমন হওয়া উচিত। অথচ পুরোটাই একটা লং টেক। ক্যামেরা আশ্চর্য স্ট্যাটিক। অথচ পুরো ঘটনাটাই ফুটে উঠল চোখের সামনে। নিখুঁত ভাবে। এটাই আসলে একজন পরিচালকের মুন্সিয়ানা। শুধু শটটা সাজানোর মধ্যে দিয়ে অনেক কথা বলে দেওয়া। এবং তার অসামান্য কল্পনা শক্তির পরিচয় দেওয়া। প্রায় কিছুই না। অথচ কাজটা করা খুব কঠিন।

এর একটু পরেই আমরা ছবিতে একটা বিজ্ঞাপন দেখি। বিজ্ঞাপনটা পুশ আপ ব্রায়ের। এবং বিজ্ঞাপনের চমক এটাই যে সেইটা পরলে একজন পুরুষকেও নারী মনে হয়। এই বিজ্ঞাপনটাও আসলে ছুতো। আসলে ছবির মূল চরিত্র, রঘুকে চিনিয়ে দেওয়া। ক্যারেক্টার এস্ট্যাব্লিশমেন্ট। আমরা বুঝতে পারি যে সে আসলে একজন অ্যাড ফিল্মমেকার। কিন্তু এটা তো প্রত্যক্ষ। ছবির মূল থিম কি ওই ছোট্ট বিজ্ঞাপনে লুকিয়ে রইল না? যাকে দেখে যা মনে হয়, সে আসলে সম্পূর্ণ অন্য আরেকজন। সম্পূর্ণ অন্য একটা ব্যক্তিত্ত্ব।

এরপরেই রঘুর হাসপাতালে ছুটে যাওয়া। খুব সহজে রঘুকে যুক্ত করে দেয় আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সাথে। কিংবা রঘুর ছেলের মৃত্যুটা রঘুর কাছে উদ্ঘাটিত হওয়ার দৃশ্যটা। ফ্রেমের নিচের দিকে রঘুর ছেলের দুটো পা। আর অফ ফোকাসে রঘুর মুখ। কিংবা শুধু ছেলের হাতটা রঘুর হাত দিয়ে তুলতে চাওয়া। এবং হাতটা টুপ করে খসে পড়া। কী চমৎকার ভিজ্যুয়ালি অনুভূতিটাকে ধরে ফেলা। একটা অসাধারণ মুহূর্ত তৈরী করা। অথবা রঘুর খাওয়ার টেবিলে খাবারের সামনে বসে তার মৃত পরিবারের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলের ফ্ল্যাশব্যাক। সেইখান থেকে রঘুর ভেঙে পড়া। আবার পরের দৃশ্যেই লায়েকের জেলে বসে খাওয়ার দৃশ্য। তার পার্টনারের নাম ঠিকানা ঠিক মত পুলিশকে না বলার জন্য মার খাওয়া। আবার পরের দৃশ্যেই খাবার টেবিলে বসে রঘুর স্ত্রী মিশার বাবার মায়ের কান্নার দৃশ্য। একটা খাবারকে মোটিফ করে কী চমৎকার গল্পের এগিয়ে যাওয়া। একই সাথে আলাদা আলাদা দুটো চরিত্রের বিস্তার ঘটানো। কাহিনীটাকে খোলা।

এর মধ্যে টুকরো টুকরো মুহূর্ত ছড়ানো যা বলিউডের মসালা সিনেমার মতই ছবিটার মধ্যে কিছু কমিকাল রিলিফ তৈরী করে। এই ছবিটার মূল উদ্দেশ্য যখন বাজার তখন এই রিলিফটা দর্শকের জন্য খুব জরুরি। যেমন থানার মধ্যে টিভিতে বড় কর্তাকে দেখতে পেয়ে অধস্তন পুলিশ কর্মচারীর হাত তালি দিয়ে ওঠা। কিংবা লায়েকের মার জেলে দেখা করতে এসে নালায়েক বলার পরই সাউন্ড মিউট হয়ে যাওয়া এটা বোঝাতে যে ভদ্রমহিলা ছেলেকে দেখে এতটাই উত্তেজিত যে ভিজিটিং রুমের রিসিভারটা পর্যন্ত তুলতে ভুলে গিয়েছেন। কিংবা ঘর মুছতে থাকা প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাজের লোকের মত ঘরে ঢুকে অন্য ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নমস্কার করা। এইগুলো সবই আপাতভাবে খুব ক্লিশে। কিন্তু অভিনয় গুনে, চলচ্চিত্রায়ণের মুন্সিয়ানায় চমৎকার সাবলীল। আবার একটু বুদ্ধিমান দর্শক খুব সহজেই এর মধ্যে বুঝে যাবেন সমাজের ক্লিশে চিন্তাভাবনাগুলোর দিকে পরিচালকের কটাক্ষ।

ছবির সব থেকে লেয়ার্ড জায়গা হল ট্রেণ থেকে হঠাৎ রঘুর একটা অচেনা স্টেশনে নেমে পড়া। যে স্টেশনের নাম বদলাপুর। প্রায় চেতনাশূণ্য রঘুর ট্রাক ড্রাইভারদের হাতে মার খাওয়া। এবং একই সময় বেজে ওঠা অদ্ভুত মনখারাপ করা সুরের গান জুদাই। এবং শেষে পুলিশের কাছে রঘুর বলা যে সে বদলাপুরে কুড়ি বছর থাকতে চায়। ঠিক যে কুড়ি বছরের সাজা পেয়েছে লায়েক। এও যেন রঘুর নিজের ভিতরের প্রতিশোধ নেওয়ারই যন্ত্রণা। যে কুড়ি বছর সে বদলাপুরে থাকতে চায়।

পরিচালকের আবার একটা মোটিফ ধরে বেশ কয়েকটা সিকোয়েন্সে এগিয়ে যাওয়ার চমৎকার উদাহরণ দেখা যায় এরপর। রঘুর বিশ সাল বলার পরেই দেখা যায় জেলে লায়েককে টিভির সামনে। সাউন্ডে শোনা যায় গব্বরের ডায়লগ যে তাকে দুনিয়ার কোন জেল বিশ সাল আটকে রাখতে পারবে না। এরপরেই লায়েকের মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় যে সে জেল থেকে পালানোর কথা ভাবছে।

এমনই আরেকটা অসাধারণ সিকোয়েন্স যখন ক্যানসারে অসুস্থ লায়েককে ছাড়ানোর কথা বলতে রঘুর সাথে দেখা করতে আসে সমাজসেবী শোভা। এই সময় দেখা যায় বাইরের বৃষ্টির হাওয়ায় রঘুর ঘরের একটা জানলা খুলছে বন্ধ হচ্ছে। লায়েককে ক্ষমা করতে অস্বীকার করে রঘু গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দেয়। আমরা বুঝতে পারি প্রতিশোধ নিতে চাওয়া রঘুর বদ্ধ একমুখী জীবনে যেটুকু খোলা বাতাস আসার সম্ভাবনা ছিল সেইটুকুও বন্ধ করে দিল রঘু।

সিনেমা ইন্টারমিশনের পরে অনেকটাই একমুখী। সিনেমার ভাষায় কথা বলার চাইতে পরিচালক বেশী আগ্রহী গল্পটা গুটিয়ে আনতে। তবে এ সত্ত্বেও টান টান স্ক্রিপ্ট আর এডিটিং-এর জন্য কখনও একঘেয়ে হয়না দ্বিতীয়ার্ধ। বরং এইসময় আমরা সবকটা চরিত্রের অলটার ইগো বা পাল্টা সত্বাটিকে দেখতে পাই। রঘু হয়ে ওঠে এক ভয়ানক খুনি। আর এতক্ষণ ধরে যাকে ভয়াবহ খুনি মনে হচ্ছিল সেই লায়েক ক্রমশ ভালো মানুষ হয়ে উঠতে থাকে। কর্মঠ পুলিশ অফিসার গোভিন্দ মিশ্রা রিটায়ারমেন্টের আগে ব্যাঙ্ক লুঠ করা টাকা দখল করতে চায়। প্রথমার্ধে তৈরী করা চরিত্রগুলো সম্পর্কে দর্শকের ধারণা ভেঙে দিতে দিতে এগোয় স্ক্রিপ্ট। আসলে এই ছবি বলিউডি রীতি মেনেও ক্রমশ বলিউডের একটা পালটা অ্যান্টিথিসিস হয়ে ওঠে। যেখানে বলিউডের সিনেমার মূল বিষয় বদলা বা প্রতিশোধের একটা পালটা বয়ান তৈরী করে ফেলেন পরিচালক।

ঠিক একইভাবে তিনি তার সব কটা চরিত্রের একটা চোরাকুঠুরী দেখাতে থাকেন। সেই চোরাকুঠুরির চাবি খোলার পর চরিত্রগুলোই সম্পূর্ণ অন্য একটা মাত্রা পায়। কিন্তু এত কিছু সত্বেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। যে যৌনকর্মীকে খুব সহজেই ধর্ষণ করে রঘু, সেই একই লোক কেন সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দেয় উচ্চবিত্ত কাঞ্চনকে। এটা কী সত্যিই পরিচালকের নিজস্ব অভিরুচি নাকি এটাও রঘুর চরিত্রের অন্য একটা মাত্রা? হয়ত কাঞ্চনের বিশ্বাস উৎপাদন করতে চেয়েই সে তাকে ছেড়ে দিয়েছিল।

প্রত্যেকটা চরিত্রের অভিনয় অসাধারণ। লায়েকের চরিত্রে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি যথারীতি অসাধারণ। ইন্সপেক্টর গোবিন্দ মিশ্রার চরিত্রে কুমুদ মিশ্রা অবিশ্বাস্য। কিন্তু সব থেকে অবাক করে দেওয়া অভিনয়টা করলেন বরুণ ধাওয়ান। বুঝিয়ে দিলেন চাইলে তিনি বলিউডের প্রথমসারীর অভিনেতা হয়ে উঠতে পারেন। পূজা লাধা সুর্তির এডিটিং এই ছবির জান।

বলিউডের বড় বাজারে, মাসালা ছবির অসংখ্য উপাদান নিয়েও এত অন্যরকম একটা ছবি হচ্ছে এবং সেই ছবি খুব ভালো ব্যবসা করছে এটাই বোধহয় সব থেকে আশার কথা।

 
 
top