ঘটশ্রাদ্ধ

 

ঘটশ্রাদ্ধ (১৯৭৭)

নির্দেশক: গিরিশ কাসারাভাল্লি

১০৮ মিনিট

 

বাংলা ভাষার মেনস্ট্রিম কাগজের, এমনকী লিট্ল ম্যাগাজিনেরও, ভারতীয় ফিল্ম চর্চা বলতে বোঝায় শুধু বলিউড এবং বাংলা সিনেমা। দক্ষিণ ভারতের ছবি বলতে আমরা বুঝি অ্যাকশননির্ভর কিছু ছবি বা আর্ট হাউজ সিনেমায় কেরলের দু-একটা নাম যেমন আদুর গোপালকৃষ্ণণ। অদ্ভুত লাগে যখন দেখি কলকাতার অন্য ছবি-দেখা দর্শক অনায়াসে গদার কিংবা সাম্প্রতিককালের চেইলানের নাম উচ্চারণ করে ফেলেন, অথচ ভারতীয় সিনেমায় অবাক বিস্ময়ে উচ্চারিত হওয়া জি অরবিন্দন কিংবা গিরিশ কাসারাভাল্লির নাম পর্যন্ত জানেন না!

চোদ্দোটা ছবি বানিয়ে তেরোটা জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া কাসারাভাল্লির প্রথম ছবি ঘটশ্রাদ্ধ। পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটের গ্র্যাজুয়েশনের সময় জমা দেওয়া এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট বাতিল করেন গিরিশ কারনাড আর নবেন্দু রায়। আসলে কাসারাভাল্লি সেই সময় ইংরেজি জানতেন না। তাই তিনি সেই স্ক্রিপ্টটা আবার মাতৃভাষা কন্নড়ে লিখতে চান। সেই সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি। কাসারাভাল্লি পরে এই সিনেমাটা করেই স্বর্ণকমল পান। এই ছবির সংগী ত পরিচালক ছিলেন ভারতীয় থিয়েটার এবং সিনেমার আর এক দিকপাল বি ভি কারান্থ।

কন্নড় সাহিত্য তথা ভারতীয় সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ ইউ আর অনন্তমূর্তির ছোটোগল্পের চলচ্চিত্রায়িত রূপ ঘটশ্রাদ্ধ। ২০০২ সালে, সিনেমার শতবর্ষ উদযাপনের জন্য প্যারিসের ন্যাশনাল আর্কাইভের বাছাই করা একশোটা সিনেমার মধ্যে একমাত্র ভারতীয় ছবি ঘটশ্রাদ্ধ

ছবির টাইটেল কার্ড আমরা দেখি একটা গাছের ছালের ব্যাকগ্রাউন্ডে। এবড়ো খেবড়ো, প্রাচীন অথচ এখনও জীবন্ত এক গাছের ক্লোজ আপে ছবির টাইটেল কার্ড। এর পিছনে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক জঙ্গম। অথচ তাতে যেন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিশে আছে। ছবির প্রথম দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই হিন্দুধর্মের পবিত্র আগুন একটা থালার উপর রাখা। অনেকগুলো হাত একে একে আগুনটাকে ছুঁয়ে প্রণাম করছে। অথচ প্রণাম করার আগেই থালার উপর প্রণামীর টাকা রাখছে তারা। একই শটে ধর্মের পবিত্র আগুন এবং টাকার ব্যবহার আসলে বুঝিয়ে দেয় ধর্মের প্রতীকি অবস্থান। পরপর দৃশ্য, সবকটাতেই ধর্মের অদৃশ্য অবস্থান। এর মধ্যেই গ্রাম্য মহিলাদের প্রশ্নে আমরা জানতে পারি যমুনার কথা। গ্রামের এক মহিলা প্রশ্ন করেন, যমুনা কেন আসে না মন্দিরে। এইখানে একটা দৃশ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই কথোপকথনের মধ্যে সিনেমার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিশুয়াল তৈরি হয়, যখন আমরা দেখি গ্রামের মহিলারা গ্রামের বেদজ্ঞ গুরু উডুপির দিকে তাকিয়ে আছে। সামান্য অফ-ফোকাসে, ফ্রেমের এক দিকে উডুপি নিশ্চুপ। পরিচালক যেন চুপি চুপি ছবির মূল বক্তব্য বলে দেন। যেখানে কৌম বা সমাজের কাছে গুরু যেন আসলে গৌনই। তাদের প্রশ্নই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এরপরের দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। একদিকে ক্রমশ বাড়তে থাকে ধর্মের অনুষ্ঠানকেন্দ্রিকতা। অন্যদিকে ধর্মের আবরণের নীচে মানুষের লোভ ও হিংস্রতা। প্রথমেই দেখানো পবিত্র আগুনের থালা থেকে প্রণামী তুলে নেয় শিষ্য শাস্ত্রী। দেবতার সামনেই সে কোঁচড়ে গুঁজে নেয় সেইগুলো। কিংবা অন্য শিষ্যকে সেই আগুনের ছেঁকা দেওয়া, কিংবা অসুস্থ যমুনাকে খাবার জল দেওয়ার বদলে গরম জল দিয়ে তাকে ছ্যাঁকা খাওয়ানো। এর পাশাপাশিই আমরা দেখতে থাকি গ্রামের বেদ পাঠশালার কাঠ খোদাই করা সুন্দর বাড়িটা। আবার একটু হাই অ্যাঙ্গেল থেকে দেখি শিষ্য পরিবেষ্টিত গুরুকে একজন শিষ্য প্রণাম করছে। এই একই শটকে লো অ্যাঙ্গেল থেকে নিয়ে গুরুকে মহিমান্বিত করা যেত। কিন্তু গুরু যে আসলে আচার-অনুষ্ঠানে ঢাকা পড়ে গিয়েছেন। তাঁর জ্ঞান কিংবা ধর্মবোধ আসলে সেই অনুষ্ঠানকেন্দ্রিকতার মোড়কে আবদ্ধ।

কিংবা সদ্য বেদ পাঠশালায় ভর্তি হওয়া শিশু নানি, ঠান্ডা জলে স্নান করতে ভয় পায় বলে যখন তার থেকে বয়সে বড়ো অন্য দুই শিষ্য প্রায় জোর করে তাকে জলে ডুবিয়ে নাকানি চোবানি খাওয়ায়, তখনও যেন মনে হয় ব্রহ্মচর্যের বেশধারী এই দুই শিষ্যও আসলে ব্রহ্মচর্যের আবরণে দুটো দুষ্টু বাচ্চা। সাধারণ মানুষের মতো জৈবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন। আবার পালটা মনে হয় যেন পরিচালক এখানেও ধর্মের আড়ালে এক হিংস্র পৃথিবীর কথাই বলতে চাইছেন।

কাসারাভাল্লির ছবি আসলে সমাজের বৈধকরণ-অবৈধকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলে। ভিন্নমতকে দেখার, ভিন্নমতকে অবরুদ্ধ করার সামাজিক প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলে। নিজে ব্রাহ্মণ কাসারাভাল্লি এই ছবিতে তাই কুড়ির দশকের এক ব্রাহ্মণ গ্রামের কথা বলেন। যেখানে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ এবং পুরুষ বাচ্চাদের শিক্ষার অধিকার আছে। সেই শিক্ষাও আচার-আচরণে ভারাক্রান্ত। তার মধ্যে নতুনকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিমা দিয়ে দেখার চেয়ে অনেক বেশি করে আছে সংস্কার। কাসারাভাল্লি এই বোধটাকে গোটা ছবিতে ধরার জন্য বার বার ব্যবহার করেন ধর্মীয় আচরণ তথা সংস্কারের নানান দৃশ্য। উডুপি ব্রাহ্মণকে তাই বার বার দেখা যায় নিজের উপবীত পাকাতে। আসলে জীবন এবং ধর্মাচরণ কোথাও মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

আবার, অনন্তমূর্তির লেখা যেমন বহুস্তর, বহুস্বরের সমাহার, তেমনই কাসারাভাল্লির এই ছবিটাও। পরবর্তী অংশেই আমরা দেখতে পাই নানি এবং যমুনার মধ্যে একটা স্নেহের সম্পর্ক গড়ে উঠতে। বাবা নানিকে গুরুগৃহে ছেড়ে যাওয়ার পর, আমরা নানিকে দেখি পাঠশালার একটা ঘরের মধ্যে ঘাড় গুঁজে কাঁদতে। এই সময় পিছনে নন-ডায়েজেটিক সাউন্ডে আমরা শুনতে পাই মন্দিরের মন্ত্র উচ্চারণ। যা কোথাও ছাপিয়ে যায় নানির কান্নাকে। আবার সেই মানুষের ব্যক্তিজীবনের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ধর্মের বাধানিষেধ। যমুনা আর নানির মধ্যে একটা স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিশু নানি তার কোমরের ধুতি বাঁধতে জানে না। বেঁধে দেয় যমুনা। আমরা এই পর্যায়ে দেখি উডুপি ব্রাহ্মণের অন্য একটা রূপ। যেখানে তিনি বাড়ি থেকে দূরে চলে আসা নানির প্রতি যত্ন নিতে বলেন যমুনাকে। কিংবা তার অন্য শিষ্যরা নানিকে উত্যক্ত করছে জানতে পেরে কঠিন হন। বলেন, অনাথ শাস্ত্রীর প্রতি অপত্য স্নেহই তাকে নষ্ট করেছে। উডুপি চলে যান দূরে কোনো এক স্বামীজির কাছে। তাঁর বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে।

এই সিনেমায় কাসারাভাল্লি একটা অদ্ভুত ছকে এগোন। প্রতিটা চরিত্র কিংবা ঘটনাকে আগেই পরিচিত করিয়ে দেন দর্শকের সঙ্গে। তারপর তার পরিচয় কিংবা কারণের দিকে এগোন। যমুনা এবং নানির এই সম্পর্কের মধ্যেই আমরা টের পাই যমুনা কেন মন্দিরে যায় না। রাত্রে চুপি চুপি অভিসারে যাওয়া যমুনা ও তার প্রেমিকের কথোপকথনে আমরা টের পাই যমুনা অন্তস্বত্ত্বা। অথচ সে বিধবা। এই অবৈধ সম্পর্ক-জনিত সন্তানকে মেরে ফেলার ব্যাপারেও তার অনীহা আছে। আবার এই অবৈধ সম্পর্ককে সমাজ কীভাবে দেখবে তা নিয়েও সে ভীত। এর পরেই আমরা ক্যামেরাকে ট্র্যাক করতে দেখি, জানলার গরাদের বাইরে দিয়ে, ভিতরে দেখা যায় সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে মগ্ন ছাত্ররা। যমুনার অন্তস্বত্ত্বা হওয়ার ঘটনা জানার পরপরই এই দৃশ্য যেন আবার সেই ধর্মের বাধানিষেধকে মূর্ত করে।

কিংবা গ্রামের মহিলা গোদাক্কার বাড়িতে নানির বেলপাতা জোগাড় করতে যাওয়া। ছোট্ট নানি, আঁকশি নিয়েও ছুঁতে পারছে না সেই বেলপাতাগুলোকে। এটাও যেন আবার অনেকগুলো মানের দিকে নিয়ে যায়। যেন ধর্মের বাধানিষেধ, নিয়মতান্ত্রিকতাকে ছুঁয়ে ফেলা বোঝা যায় না সাধারণ লৌকিক জীবনে। তা যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আবার একই সঙ্গে যমুনাকে নিয়ে গ্রামের আলোচনাও যেন শিশু নানির বোধগম্যতার অনেক বাইরে। তাই যমুনার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, নানি হাঁ করে শোনে। পরে যমুনাকে সামনে পেলে সে অবাক দৃষ্টিতে তাকে দেখতে থাকে। বুঝতে চায় যেন।

ফ্রেম উইদিন ফ্রেমের অসংখ্য ব্যবহার করেন পরিচালক। অনেক সময়েই জানলার গরাদের বাইরে থেকে নানির দেখা। নানির ইনোসেন্স বা নির্মলতা বুঝতে পারে না অনেক কিছুই। এই সমাজের অন্ধকার কিংবা আলো সবই তার অজ্ঞাত। যেমন জানলার ভিতর দিয়ে ধরা নানির শট, হেঁটে আসছে সে, তার সঙ্গী অন্য দুই শিষ্যকে ডাকতে যারা সেই সময় বন্ধ দরজার আড়ালে তাসের জুয়া খেলতে ব্যস্ত। কিংবা একইভাবে জানলার গরাদের মধ্যে দিয়ে সে দেখতে পায় গ্রামের স্কুলমাস্টার তথা যমুনার প্রেমিককে স্কুলে পড়াতে।

আবার রাত্রে ঘুমোনোর সময়  নানির গায়ে শাস্ত্রীর হাত বোলানো—অদ্ভুত শরীরসর্বস্বতা সম্পন্ন হাত বোলানো। ব্রাহ্মণ গুরুগৃহে এক শিষ্যের সমকামিতা এই সময়ে দাঁড়িয়েও খুব সাহসী। আবার এই ধরনের দৃশ্য আসলে সমকাম-ভীতি বা হোমোফোবিয়া থেকে উদ্ভুত—এই নিয়েও আলোচনা চলতে পারে।

পরিচালক ক্রমশ তাঁর ইমেজারি দিয়ে এরপর বাঁধতে থাকেন গল্পটাকে। ফ্রেমে ফ্রেমে নানান লেয়ার্ড ইন্টারপ্রিটেশন। বেশির ভাগ শটই ভীষণ টাইট কম্পোজিশনে বাঁধা। পরিচালক যেন স্থির নিশ্চিত, তিনি কী দেখাতে চান। শাস্ত্রীর অত্যাচারে ঘুম ভেঙে ওঠা নানি ভয় পেয়ে যমুনার কাছে চলে যায়। রাত্রে যমুনা অপেক্ষা করছিল তার প্রেমিকের জন্য। বিধবা যমুনার সঙ্গে রাত্রে দেখা করতে আসছে একজন পুরুষ, এ কথা জেনে যায় নানি ও অন্য শিষ্যেরা।

পরের দিন বিল্বপত্র আনতে গোদাক্কার বাড়িতে যাওয়ার আগে নানি লাফ দিয়ে দিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করে ছাদে টাঙানো সাজি। ক্লোজ শটে দেখা যায় নানির হাত, বারবার উঠছে নামছে সাজির সামনে দিয়ে। মানুষের অতিক্রমের বাইরের জিনিসকে ছুঁতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও বলে দেওয়া হল এইভাবে। কিংবা এ যেন বাচ্চা নানির সরলতায় জীবনের জটিলতা না বুঝতে পারা, কিন্তু বার বার আবিষ্কার করতে চাওয়া।

আবার একইভাবে গোদাক্কার বাড়িতে যমুনার গোপন অভিসারের কথা বলে দেওয়ার পর শাস্ত্রীর জঙ্গলের ভিতর নানিকে ভয় দেখানো। প্রথমে জঙ্গলের মধ্যে রাখা নাগ দেবতাকে ছুঁতে বাধ্য করা জোর করে। নাগ দেবতাকে ছুঁলে পাপ হয়, সর্পদংষ্ট হতে হয় এটা যে আসলে কুসংস্কার সেই কথা নানিকে বলে শাস্ত্রী। বলে যে অন্য লোকের দোষ ঢাকতে আসলে এমন গল্প বানানো হয়। তারপর জোর করে সেই দেবতাকে ছুঁতে বাধ্য করে। এই দেবতাকে জোর করে স্পর্শ করানো নানির হাত, তার চিৎকার—এটাই যেন নানির লস অব ইনোসেন্স বা সরলতা হারানোকে প্রতিভাত করে। আবার শিশু নানির ভয় ভেঙে যাওয়ার পর সে যখন সব কটা দেবতার মূর্তি স্পর্শ করে তখন আবার শাস্ত্রীর অন্যরূপ দেখতে পাই আমরা। সে বলে তার হাতে গরুড়ের মুদ্রা আছে। সেই মুদ্রার জন্যই সাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু নানির তা নেই। সে গর্হিত অন্যায় করেছে নাগ-দেবতাকে স্পর্শ করে। নানি ভয় পেয়ে যায়। শাস্ত্রী তাকে বলে একমাত্র সেই তাকে রক্ষা করতে পারে। নানিকে শাস্ত্রীর আজ্ঞাবাহী হতে হবে। ঠিক যেন ব্রাহ্মণ্যবাদ। কিংবা শুধু ব্রাহ্মণ্যবাদ নয়। ক্ষমতার নিজস্ব লজিক। পরিচালক শুধু মেটাফরের ব্যবহার করেন। নানিকে ভয় দেখিয়ে, শাস্ত্রী তার গোদাক্কাকে সব বলে দেওয়ার কথা যমুনাকে বলতে নিষেধ করে। নানি ভয় পেয়ে রাজি হয়। তার লস অফ ইনোসেন্সের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়। আমরা শাস্ত্রীকে দেখি নানিকে যত্ন করে জঙ্গলের মধ্যে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে। নানি এখন ক্ষমতার পক্ষে, সমাজের পক্ষে। তাই সে রক্ষিত।

এই মেটাফরিক রিপ্রেজেন্টেশনের পুনরাবৃত্তি হয় গোদাক্কার সঙ্গে যমুনার কথোপকথনে। যমুনা অন্তস্বত্ত্বা জেনে গোদাক্কা তার সঙ্গে দেখা করতে চায়, হয়তো সাহায্যও করতে চায়। অথবা মজা দেখতে আসে। পরিচালক আবার একটা মেটাফরিক শট ব্যবহার করেন। বন্ধ ঘরের মধ্যে যমুনা আর জানলা দিয়ে দেখা যায় গোদাক্কার মুখ। যমুনা যা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে চাইছে, তার মধ্যে বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করছে সমাজ। উঁকি দিচ্ছে। গোদাক্কার সাহায্যের আহ্বান ফিরিয়ে দেয় যমুনা। গোদাক্কা তাকে বেশ্যা বলে গালিগালাজ করে। এটাও যেন শাস্ত্রীর নানিকে ভয় দেখানোর ঘটনার ঠিক পালটা। যমুনা সমাজের অনুশাসনের বাইরে তার নিজের স্পেস তৈরি করে নিতে চায়। তাই সমাজ তাকে কলুষিত করতে চায়। সমাজের বৃত্তের বাইরে ঠেলে দিতে চায়। যমুনার এই কলঙ্কের কথা এর পর শোনা যায় গোদাক্কার ভয়েজওভারে। দৃশ্যে তখন গ্রাম এবং মন্দিরের নানান রূপ। পরিচালক আবার একটা অসাধারণ সিনেম্যাটিক উপমা ব্যবহার করেন। টপ শটে দেখা যায় গ্রামের রাস্তা। তার অর্ধেকটা ছায়ায় ঢাকা, বাকি অর্ধেকটায় রোদ। ছায়ার উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে লোকেরা। এটাও যেন সমাজের এঁকে দেওয়া সহজ সাদা-কালোর রেখা। আর সমাজের ছায়ার তলাতেই থাকতে চান বেশিরভাগ মানুষ। নইলে ছায়ার বাইরে রোদের আক্রমণ বড়ো তীব্র।

সিনেমা আবার গুরুর গৃহের মধ্যে ঢুকে যায়। আমরা দেখি নানিকে উত্যক্ত করছে অন্য দুই শিষ্য - শাস্ত্রী এবং গনেশ। যদিও নানি তাদের শাসন মেনে নিয়েছে। তবু সে ক্ষমতাহীন। তাই ক্ষমতার আঘাত তাকে সহ্য করতেই হবে। বাড়িতে আসেন গনেশের বাবা। তিনি তাঁর ছেলেকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চান। পিছনের ব্যাকগ্রাউন্ড শটে আমরা আবার শুনতে পাই মন্দিরের মন্ত্র উচ্চারণ। আবার সেই ধর্মের অদৃশ্য উপস্থিতি। পরিচালক আবার একটা ‘ফ্রেম উইদিন ফ্রেম’ ব্যবহার করেন। একটা দরজার ভিতর দিয়ে আমরা দেখি পার্স্পেক্টিভে অন্য দরজা। সেই দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে যমুনা। এর মধ্যে ফ্রেমের এক প্রান্ত থেকে ছুটে এসে নানি খবর দেয় যে, গনেশের বাবা এসেছে। যমুনার গোপনীয়তার ইঙ্গিত যেন ভিতরের দরজার পেছনের ঘর। যমুনা সেই গোপনীয়তার বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

আতিথেয়তা করতে গনেশের বাবাকে দুধ খেতে দেয় যমুনা। নানি সেই দুধ নিয়ে গিয়ে রাখে গণেশের বাবার দোলনায়। তিনি ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেন না। গনেশকে নিয়ে জোর করেই বেরিয়ে যান। ছবিতে দোলনার আওয়াজের অভিঘাত বাড়তে থাকে। কর্কশ আওয়াজ তুলে দুলতে থাকে দোলনা। ক্লোজ শটে আবার দেখা যায় সেই দুধের পাত্রটিকে দোলনায়। নানিকে আমরা দেখি সেই পাত্রটা তুলে নিয়ে যেতে। দরমার জানলার মধ্যে দিয়ে দেখা যায় বাইরের উঠোন। আরেকটা দরমার জানলা। আউটকাস্ট করা বা সমাজের বৃত্তের বাইরে ঢেলে দেওয়ার সরল উপমা। নানিকে সেই জানলার ভিতর দিয়ে দেখা যায় দুধটা ফেলে দিতে। ক্লোজ শটে আমরা দেখতে পাই মাটি ভিজে গিয়েছে। যমুনার সামাজিক নির্বাসন অন্য একটা মাত্রা পায়। শাস্ত্রীও চলে যেতে চায়। সে নানিকেও নিয়ে যেতে চায় তার সঙ্গে। নানি বুঝতে পারে না কী করবে। শাস্ত্রী এখন বাড়ির মধ্যেই প্রকাশ্যে বিড়ি ধরায়। যমুনাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নানিকে তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার লোভ দেখায়। বিড়ি ঘষে নেভায় বাড়ির ভিতরের দেওয়ালে। তারপর বাড়ির মধ্যেই ফেলে দেয় বিড়িটা। প্রকাশ্যে গুরুগৃহের মধ্যে শাস্ত্রীর বিড়ি ধরানো ইঙ্গিত করে গুরুগৃহের শুচিতার পতনের। আবার একই সঙ্গে শাস্ত্রীর সম্পূর্ণ পুরুষ হয়ে ওঠার—পুরুষতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠার। শাস্ত্রী চলে যাওয়ার পর অস্থির হয়ে ওঠে নানি। সেও উঠে যেতে চায়। যমুনা তার হাত আটকে ধরে রাখতে চায়। হাত ছাড়াতে গিয়ে অন্তস্বত্ত্বা যমুনার পেটে লাথি মারে নানি। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় যমুনা। এটা যেন ছবির মোটিফ হয়ে ওঠে। অন্তস্বত্ত্বা এক মহিলার পেটে এই লাথিটাই। আবার ফ্রেম উইদিন ফ্রেম। ঘরের দরজার ভিতর দিয়ে দেখা যায় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া যমুনাকে। নানি দরজায় পিঠ ঘষে ঘষে ক্রমশ সরে যাচ্ছে ঘরের বাইরে। পরিচালক এর মাঝে মাঝেই গুঁজে দেন যমুনার সাবজেক্টিভ শটে নানির এই দূরে সরে যাওয়া। যমুনার আউটকাস্ট হয়ে যাওয়ার পুনরুচ্চারণ। নানির পায়ে লেগে উলটে যায় কলসি। সমাজের চোখে যমুনার মরে যাওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।

রাতের দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই নানিকে। ফ্রেমের একদম সামনে আউট অফ ফোকাসে যমুনা। দুজনের মাঝে একটা আলোর শিখা। তাও আউট অফ ফোকাসে। যমুনা আর নানির মাঝে যেন ধর্মের পবিত্র আগুনের উপস্থিতি। এই পুরো সিকোয়েন্সটাতেই ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার হয়ে ঘুঙুরের আওয়াজ। ক্রমশ দ্রুত তালে কোন একটা পারকাশন ইনস্ট্রুমেন্টে নাচের বোল। যেন ছবির মূল মোটিফটাকেই মনে করাতে থাকে বারবার। যমুনা এখনও ঘরের ভিতর। কিন্তু যেন দ্রুত তালে সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে একটু পরেই। নানি যমুনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ঘরের ভিতর বাসনপত্রে আওয়াজ করতে থাকে। তারপর একটা গোল পাথরের বাসন গড়িয়ে দেয় মাটির উপর দিয়ে। নানির খিদে পেয়েছে। সে কোথাও যমুনার সঙ্গে তার মায়ের প্রতিতুলনা করছে। নানি আবার সমাজের কেন্দ্রের বাইরে চলে আসে। সে শিশু, অপাপবিদ্ধ। মায়ের কলংক হয় না তার কাছে। কিন্তু ঘুঙুরের ধ্বনি ক্রমশ জোরালো হতেই থাকে।

সকালবেলা নানি খুঁজে পায় না যমুনাকে। এদিক ওদিক খুঁজে সে দেখতে পায় যমুনা ও তার প্রেমিককে। জঙ্গলের ভিতর নাগ দেবতার স্থানেশাস্ত্রী, গোপাল এবং গ্রামের আরো কিছু মানুষ লুকিয়ে দেখছে তাদের। যমুনার গোপন প্রেম আর গোপন নেই। নানিকে দেখে তাকে চুপ করতে বলে তারা। দেখা যায় একটা সাপ ঘুরছে যমুনা ও তার প্রেমিকের আসে পাশে। শাস্ত্রী ভয় পেয়ে যায়। বোঝা যায় যে কুসংস্কারের ভয় সে নানিকে পাইয়েছিল, সে নিজেও তার বাইরে নয়। যমুনা নাগ দেবতার পবিত্রতা নষ্ট করেছে, তাই সাপ এসেছে তাকে মারার জন্য। গ্রামের মানুষের এটাই মত। নানি চুপ করে থাকতে পারে না। চিৎকার করে সে সতর্ক করে যমুনাকে। যমুনার প্রেমিক দৌড়ে পালায়। যমুনা কেঁদে ওঠে। সে ধরা পড়ে গিয়েছে। নানি সাপটাকে তাড়ায়। শিশুর সরলতাই শুধু তাকে এই ধর্মের বাধানিষেধ এবং কুসংস্কারে বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

নানিকে যমুনার থেকে নিয়ে যেতে আসে গ্রামের লোকজন। যমুনা আর নানি ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকে। নানি যেতে চায় না তাদের সঙ্গে। সে বাইরে বার হয় না। পরিচালক আবার অসামান্য কিছু দৃশ্যের বুনোট তৈরি করেন। ক্লোজ আপে দেখা যায় জানলা-দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা মারা। দরজা কেঁপে ওঠে জানলাও। ঘরের ভিতর দেখা যায় নানির হাত ধরে বসে রয়েছে যমুনা। এখন সে সম্পূর্ণভাবে সমাজের বাইরে। অথচ সমাজ তার ঘরের দরজা-জানলা ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে তার ব্যক্তিগত স্পেস/জায়গায় অনুপ্রবেশ করতে চাইছে। এই সিকোয়েন্সেই জানা যায় গ্রামের বয়স্করা মন্দিরে আলোচনায় বসেছে, উডুপিকে খবর পাঠানো হয়েছে। তারা যমুনাকে সমাজের বাইরে বার করে দেবে। তার ঘটশ্রাদ্ধ করা হবে। ঘটশ্রাদ্ধ কোনো জীবিত মানুষের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। সে সমাজের চোখে মৃত।

নানিকে আবার দেখা যায় প্রকৃতির মধ্যে। তার হাতে বেলপাতা নেওয়ার সাজি। সাজিটাকে সে উলটো করে দোল খাওয়াচ্ছে। এই দোল খাওয়ানো একটা শিশুর আনন্দের স্ফূর্তির বহিঃপ্রকাশ। গ্রামের লোকেরা নানিকে ধরতে আসে। তাকে বলে যমুনাকে ছেড়ে চলে আসতে । নানির বাবা এবং উডুপি চলে আসবে পরের দিন। এখন যমুনার কাছে থাকা উচিত নয় নানির। নানি দৌড়ে পালায়। সে যমুনাকে ছেড়ে যেতে রাজি নয়। নানিকে আবার দেখা যায় নদীর মধ্যে। তার ভঙ্গিমায় উচ্ছাস। সে সবাইকে হারিয়ে পালিয়ে এসেছে। নদীর মধ্যে পড়ে যায় নানি। তার হাতের সাজি জলের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে দূরে। আমরা বুঝতে পারি নানির এই উচ্ছাস আসলে ক্ষণস্থায়ী। যমুনার ভাগ্য স্থির হয়ে গিয়েছে।

বাড়ি ফিরে নানি আবিষ্কার করে অজ্ঞান যমুনাকে। যমুনা যেন মৃতই। নানি জল দিয়ে জাগিয়ে তোলে তাকে। রাত নামে। যমুনা নানিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। পিছনে মন্দিরের কাঁসর বাজছে। ঠিক যেন ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো তার আওয়াজ। ছবির সাউন্ড বারবার বলে দিচ্ছে যমুনার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। যমুনা নানিকে শুইয়ে উঠে যায় বাইরে। আমরা যমুনাকে দেখি সাপের গর্তের ভিতর হাত ঢোকাতে। অসম্ভব পরিশীলিত একটা শট। সাপের গর্তটাকে রাখা হয়েছে ফ্রেমের মাঝখানে ডাল পয়েন্টে। ডাল পয়েন্ট আসলে মৃত্যুকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। যমুনার হাত ফ্রেমের বাম দিক থেকে ডায়াগনালি নেমে যায় গর্তের মধ্যে। যমুনা আত্মহত্যা করতে চাইছে। অথচ তার হাত সাপের গর্তে সে অনেক আগেই ঢুকিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন ফ্রেমে আমরা দেখতে পাই যমুনাকে। সে সাপের গর্তে হাত ঢুকিয়ে শুয়ে আছে।

একই সময় শুদ্র ভৃত্য কাটারা এসে পৌঁছায় গুরুগৃহে। সে খাবার চায়। নানি ঘুম ভেঙে উঠে তাকে নিয়ে যমুনাকে খুঁজতে বার হয়। জঙ্গলের মধ্যে আগুন হাতে শুদ্র ভৃত্য এবং নানি যমুনাকে খুঁজতে চায়। জঙ্গলের আলো-আঁধারির মধ্যে ভয়াবহতা বোঝাতে পরিচালক ব্যবহার করেন ট্র্যাক শট। আর এই জঙ্গলের বিভিন্ন দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডে আমরা শুনতে পাই অস্পষ্ট সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ। যেন ধর্মের ভয়াবহতা জঙ্গলের ভয়াবহতার মধ্যে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। আলো-আঁধারি, পায়ের ছায়া, কাটারার কোমরে বাঁধা দা-এর দুলুনি, নানির ভয়কে অসম্ভব পটুতায় সাতাশ বছরের কাসারাভাল্লি চারিত করে দেন আমাদের মধ্যেও। নানি ভয় পায়। কাটারা সত্যিই কাটারা কিনা ছুঁয়ে দেখতে চায়। কিন্তু কাটারা অস্পৃশ্য। সে নানিকে ছুঁতে দেবে না। সে বরং হাতের আগুনটাকে মাটিতে ফেলে দেয়। নানি আগুনটা হাতে তুলে নেয়। সমাজ থেকে নির্বাসিত অন্তস্বত্ত্বা এক নারীকে খুঁজতে জঙ্গলের ভিতর এক ব্রাহ্মণ শিশুর হাতে শুদ্রের দেওয়া আগুন। এই আগুন আসলে মানবতা, যা ক্রমশ ধর্মকেও ছাপিয়ে উঠতে পারে।

যমুনাকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে নানি। যমুনা আবার বার হতে চায়। গ্রামের বাইরে প্রভুর বাড়িতে যায় তারা। প্রভু টোড়ি বা দেশজ মদ বিক্রি করে। মিসো সিনের (Mise en scene) ব্যবহারে পরিচালক বুঝিয়ে দেন প্রভু ক্রিশ্চান। লণ্ঠনের আলোয় তার ঘরের দেওয়ালে দেখা যায় ক্রস, জেসাসের বিভিন্ন ছবি। প্রভুর বাড়িতে অপেক্ষা করে যমুনার প্রেমিক। সে যমুনার গর্ভপাত ঘটানোর ব্যবস্থা করেছে। পরিচালক এইখানে লেয়ার্ড ইমেজারি ব্যবহার করতে থাকেন। একটা উদাহরণ—যমুনার গর্ভপাত করতে আসা প্রভুর স্ত্রীকে দেখা যায় দোলনায় একটা ঘুমন্ত বাচ্চাকে দোলাতে। অর্থাৎ একজন মা আরেক মায়ের ভ্রুণ হত্যা করছেন। যমুনার প্রেমিক প্রভুকে টাকা দেয়। সে চায় না তার কথা কেউ জানতে পারুক। সে পালিয়ে যাবে পরের দিন সকালেই।

যমুনার গর্ভপাতের শুরুতে পরিচালক আবার ব্যবহার করেন অসামান্য ইমেজারি। যমুনার প্রেমিকের মুখ থেকে প্যান করে ক্যামেরা ধরে যমুনার পা। তারপর ট্র্যাক করতে করতে এগোয়, প্রভুর স্ত্রীর শরীরে ঢাকা যমুনার দেহ। আমরা আবার যমুনার মুখ দেখতে পাই। কালো কিছু দিয়ে যেন ঢেকে দেওয়া হয় যমুনার পেটের অংশ। তার উপর একটা প্রদীপ রাখা হয়। তারপর পাত্র দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় সেই প্রদীপটাকে। আবার চমৎকার ইমেজারি। ভ্রুণ অর্থাৎ প্রাণ যেন প্রদীপ। সেটা ঢাকা পড়ে গেল। কিংবা হয়তো প্রদীপের আলোটাই ঢাকা দিয়ে দেওয়া হল ধর্ম তথা সমাজের অন্ধকারে।

নানি বুঝতে পারে না কী হচ্ছে। সে যমুনার কাছে যেতে চায়। কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় অনাবৃত যমুনার দেহ। নানিকে জোর করে বার করে আনে প্রভু। আটকে রাখে একটা ঘরে। সেই ঘরের দেওয়ালেও অসংখ্য ক্রিশ্চান মোটিফ। পরিচালক এই ক্রিশ্চান মোটিফগুলোকে ব্যবহার করলেন ঠিক কী জন্য—কুমারী মায়ের সন্তান যিশুকে একটা পালটা সাবটেক্সট হিসাবে আসল ন্যারেটিভে বুনে দেওয়ার জন্য, নাকি অন্য কোনো কারণে – তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

যমুনার গর্ভপাতের দৃশ্যায়নও অসাধারণ। নানি তার ঘরের জানলা খুলে দেখতে পায় যন্ত্রণায় ছটফট করা যমুনাকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে আমরা শুনতে পাই ঢাকের আওয়াজ। যমুনার যন্ত্রণায় ছটফট করা মুখের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ক্লোজ-আপের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখতে পাই টোডি খেয়ে উদ্দাম নৃত্যরত শুদ্রদের নাচ। কালো অন্ধকারের ব্যাকগ্রাউন্ডে অসম্ভব হার্শ আলোয়। যমুনার মুখের ক্লোজ আপের সাথে সাথে জাক্সটাপোজড হয় কখনো একজন ঢোল বাজানো নাচতে থাকা শুদ্র, কখনো বিছানার কাপড় আঁকড়ে ধরা যমুনার হাত, কখনো মুখ ফিরিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করা নানি, কখনো-বা শুদ্রদের সমবেত নাচ জানলার গরাদের মধ্যে দিয়ে। সব শেষে আমরা যমুনার মুখ দেখতে পাই তার মাথার কাছ থেকে। খাটের থেকে ক্রমে নেমে আসে তার মাথাটা। ঝোলে। আমরা যমুনাকে চিৎকার করতে করতে মুখ হাঁ করতে দেখতে পাই। এইখানেই ফ্রিজ হয়ে যায় ফ্রেমটা। পরের শটে আমরা দেখতে পাই জানলার বাইরে নানিকে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে মেঝেতে হেলান দিয়ে। প্রভুর বউ কলাপাতায় মুড়ে কিছু একটা নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। মাথা নাড়ে প্রভুর দিকে তারপর বারান্দা থেকে নেমে যায় অন্ধকারে। ভারতীয় সিনেমায় এমন ওভারটোনাল মন্তাজের ব্যবহার আর কোথায় আছে, আমার জানা নেই।

এরপরেই আমরা ক্লোজ আপে দেখতে পাই উডুপিকে। তারপর ক্যামেরা আলাদা আলাদা করে ধরে অসংখ্য ব্রাহ্মণের মুখ। ক্রস রেফারেন্সে আমরা দেখতে পাই  বাড়ির সেই দরমার জানলার সামনে বসে আছে উডুপি আর অন্য ব্রাহ্মণেরা। এই সেই জানলা যেখান থেকে আগে আমরা নানিকে দুধ ফেলতে দেখেছিলাম।

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ফিরছে যমুনা আর নানি। তাদের খুঁজতে বেরিয়েছে ব্রাহ্মণেরা। যমুনা আর নানি লুকিয়ে থাকে। ব্রাহ্মণরা এগিয়ে গেলে যমুনা নানিকে ডাকে। তার সংলাপ খুব করুণ এই জায়গায়। সে নানিকে বলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা। আমরা বুঝতে পারি আসলে ফেরার কোনো জায়গা তার নেই। নানি যমুনার শাড়িতে লেগে থাকা রক্তের কথা বলে। দুজনে ধরা পড়ে যায়। যমুনা আর পালাতে পারে না, তার চলার শক্তি নেই। ব্রাহ্মণরা নানিকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। নানি তার যমুনাকে ডাকে। যমুনা একটা গাছকে আঁকড়ে ধরে থাকে। সে খুব ক্লান্ত। ভেঙে পড়েছে। ক্যামেরা প্যান করে গাছ আর যমুনাকে। তারপর যমুনাকে ধরে ক্লোজ আপে। যমুনাকে কাঁদতে দেখি আমরা। কাঁদতে কাঁদতে সে গাছের দিকে ফিরে যায়। আমরা দেখতে পাই যমুনার চুল। ক্যামেরা নেমে আসে যমুনার চুল বেয়ে সামান্য, আবার ওঠে। তার মাথার উপরে গাছের গায়ে রাখা যমুনার দুটো হাত। হাতগুলো গাছের গা বেয়ে নেমে আসে। গাছের গায়ে লেগে থাকা যমুনার হাতের রক্তের ছাপ ধরে থাকে ক্যামেরা। এইখানে ভিশুয়াল কোনো অ্যানালিসিসের দাবি করে না। শুধু তার নিজস্ব কনটেন্টে বুঝিয়ে দেয় পরিচালকের মুনশিয়ানা।

পরের দৃশ্যে উডুপি ব্রাহ্মণকে দেখতে পাই। ঘটশ্রাদ্ধ করছেন তিনি। তার চারপাশে হাঁড়ি রাখা। হাঁড়ির মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে বন্ধ করছেন তিনি। ব্যাকগ্রাউন্ডে মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ আর যমুনার কান্না। যমুনাকে একবারও দেখান না পরিচালক এই সিকোয়েন্সে। শুধু মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে তার কান্না মিশে যায়। কলসিটা পিছন থেকে ফেলে দেন উডুপি। তিনি আর ফিরে তাকাবেন না সেইদিকে। স্নান করে নদীর জলে ডুব দেন তিনি।

এর পরের শটে আমরা দেখতে পাই গুরুগৃহের ছাদের অসামান্য ভাস্কর্য। ধর্মের মতোই অসংখ্য কারুকার্য সম্পন্ন অথচ জড়। ক্যামেরা নেমে এসে ধরে নানিকে। সে কাঁদছে। এদিকে ওদিকে ছড়ানো বাসনপত্র। নানির বাবা নানিকে নিতে আসেন। দুজনে প্রণাম করেন শোকাবিষ্ট উডুপিকে। ক্যামেরা জুম আউট করতে করতে উডুপিকে ধরে আবার দরমার জানলার গরাদের মধ্যে দিয়ে। তিনি ধর্মের গরাদে আবদ্ধ। নিজের জীবিত মেয়ের শ্রাদ্ধ করে তাকে সমাজের বাইরে বার করে দিয়েছেন তিনি মূঢ় কুসংস্কারে।

নানি আর তার বাবা ফিরে আসার পথে দেখতে পায় যমুনাকে। গাছের তলায় বসে থাকা যমুনা নানিকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। তার কোল থেকে পড়ে যায় পুটুলি। যমুনার মাথা মোড়ানো। মুখের কাছে কাপড় টেনে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। নানির বাবা মুখ নামিয়ে নেন। মুখ ঢাকে নানিও। আমরা যমুনাকে দেখতে পাই গাছের তলায় বসে কাঁদতে। ক্যামেরা বার জুম আউট করতে করতে ধরে পুরো গাছটাকেই। গাছের ছায়ায় যমুনা মিশে গিয়েছে, তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। ক্যামেরা পিছনে ট্র্যাক করতে করতে ধরে গাছটাকেই। যমুনার কান্না হারিয়ে গিয়েছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে। নানি একবার পিছনে ফিরে তাকায়। তার বাবা নানিকে নিয়ে হাঁটতে থাকেন। আমরা শুধু গাছটাকেই দেখতে পাই।

গিরিশ কাসারাভাল্লি এমন এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যাঁর ছবির সিন্ট্যাক্স কিংবা সিম্বলিজম ভারতবর্ষের গভীরে প্রোথিত। হয়তো সেইজন্যই বিদেশের দর্শক কাসারাভাল্লিকে বুঝতে পারবেন না সহজভাবে। অথচ এমন সাঙ্ঘাতিক শক্তিশালী একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা জানবই না আমরা বাঙালিরা। বরং চতুর্থ সারির সিনেমা নিয়ে উত্তাল হয়ে থাকবে আমাদের মিডিয়া। আমরা সেই জয়ঢাকই শুনব। 

 
 
top