ইডা

 

ইডা (২০১৩)

নির্দেশক: পাভেল পাভলিকস্কি

৮২ মিনিট

একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম ছবি যার বাজেট ২ মিলিয়ন ডলার, ব্যাবসা করেছে  ১০ মিলিয়ন ডলারের উপর। অর্থাৎ সিনেমার পরিভাষায় বলতে গেলে সুপার ডুপার হিটঅবশ্য ছবিটা ২০১৫তে অস্কার পেয়েছে। তার প্রভাব ব্যাবসায় অনস্বীকার্য। ছবিটা অবশ্যই আভাগার্দ নয়। অথচ ছবিটার ছত্রে ছত্রে অন্যরকম হওয়ার প্রচেষ্টা আছে। যেমন ছবিটার আসপেক্ট রেশিও। অর্থাৎ ছবির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থের মাপ। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ১.৩৭ (প্রায় ৪:)

এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ   হল ছবিটার বিষয় এবং ট্রিটমেন্ট যা অসম্ভব পোলিশ। অথচ তা  সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক। মুশকিল হল এমন ছবি দেখার পর আমাদের মাতৃভাষায় তৈরি হওয়া ছবি নিয়ে প্রশ্ন জাগে।  আমরা কি  আমাদের শিকড়ে প্রোথিত অথচ আন্তর্জাতিক বাজার ছুঁতে পারা ছবি করতে ভুলে গেলাম? বিশেষ করে এই বিশ্বায়নের দুনিয়ায় যেখানে চাইলেই নতুন নতুন বাজার ছুঁতে পারা যায়। 

শুধু অাসপেক্ট  রেশিওই নয়, ছবিটি সাদাকালোয় শুট করা। এবং ভিজুয়্যাল কম্পোজিশন ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যরকম। কারণ ছবিটার গল্প তাই দাবি করে। হলোকাস্ট বিষয়ক ছবি বাঙালি দর্শকের কাছে খুব অপরিচিত নয়। নিদেনপক্ষে শিন্ডলারস লিস্ট অথবা দ্য পিয়ানিস্ট অনেকেরই দেখা। এই ছবির বিষয়ও হলোকাস্ট। কিন্তু হলোকাস্টের বীভৎসতা সরাসরি নয়, বরং ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রকাশ করা হয়।  হলোকাস্ট পেরিয়ে যাওয়ার এত বছর পরেও। 

পাভেলস্কি ক্যাথলিক। তিনি নিজে বিশ্বাস করেন ক্যাথলিসিজমে। হয়তো তাই এই সিনেমার দৃশ্যের পরত জুড়ে থাকে ক্যাথলিসিজমের অসংখ্য মূর্ত প্রতীক। আবার একই সঙ্গে এ যেন এক আস্তিক চলচ্চিত্র-নির্মাতার ধর্মকে প্রশ্ন করে করে প্রকৃত ধর্মের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ।  

আগেই বলেছি ছবিটা সাদা-কালোয়। এই ছবির শুটিং করা হয়েছে রঙিনে, তারপর ডিজিট্যালি সাদা-কালো করা হয়েছে। এই সাদা-কালোর একটা কারণ নিঃসন্দেহে ছবিটার বিষয়। এত ভয়াবহ, বিষাদাক্রান্ত বিষয়ের জন্য সাদা-কালো চমৎকার। একইসঙ্গে ছবিটা একটা পিরিয়ড। ছবির গল্পের প্রেক্ষাপট ৬০-এর দশকের পোল্যান্ড। সময়ের সেই ছাপও মনোক্রমে চমৎকার ফুটে উঠেছে। এবং কম্পোজিশন। ছবির শুরুর দিকে কম্পোজিশন অস্বস্তিকর। কখনো কখনো মিড শটে মাথার একটা নীচ থেকে ধরা হয়েছেমাথার উপর সাধারণ চোখে দেখলে অনাবশ্যক ফাঁকা জায়গা। কিংবা হয়তো অনেক মানুষকে নিয়ে করা দৃশ্যগুলোতেও কারুর মাথা কেটে গিয়েছেবা হয়তো খানিকটা দেখা যাচ্ছে। এই অদ্ভুত কম্পোজিশন এবং ছবির গতি প্রথম থেকে দর্শককে অস্বস্তিতে রাখে। কিছু যেন ঠিক নেই।

ছবির ওপেনিং শট নান হতে চাওয়া ইডার। যিশু খ্রিস্টের মূর্তি খোদাই করছে সে। আমরা বুঝতে পারি ইডার জীবন আসলে যিশুকে কেন্দ্র করেই। সে যেন নিজেকেই তৈরি করছে যিশু মূর্তির আদলে। আমরা ক্রমে দেখতে পাই ইডা এবং তার সঙ্গী অন্য হবু-নানদের সেই যিশুমূর্তিটাকে মঠের সামনের এক ফাঁকা জমিতে স্থাপন করা। মূর্তি রাখা হয় একটা মাঠ খুঁড়ে তৈরি করা এক বৃত্তের মধ্যে। আর ফ্রেমের অনেকটা জুড়ে আমরা শুধু দেখতে পাই সাদা বরফ। সাদা অর্থাৎ ফাঁকা। শূন্যতা। 

মনাস্ট্রি বা মঠের ভিতরকার সমস্ত দৃশ্যর সেটই ভীষণভাবে বাহুল্যবর্জিত। প্রায় ফাঁকা সাদা দেওয়াল। মধ্যে মধ্যে দু-একটি যিশুর ছবি বা দেওয়ালে ঝোলানো ক্রস। এই সেটগুলো বার্গম্যানের শেষ ছবি ফ্যানি অ্যান্ড অ্যালেকজান্ডার-এর ক্যাথলিক বিশপের বাড়ির দৃশ্যগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। হয়তো বাহুল্যহীনতাই ক্যাথলিক মঠের স্বাভাবিক ছবি। কিংবা হয়তো এটা আসলে ইডার জীবনের অসীম শূন্যতার ইঙ্গিতবাহী। মঠের মধ্যে নানদের খাওয়ার দৃশ্যতেও পরিচালকের মুনশিয়ানার ছাপ। কোনো কথা নেই, চুপচাপ সবাই মিলে শুধু প্লেট থেকে খেয়ে যায়। পিছনে শুধু চামচের প্লেটে ঠোকা খাওয়ার শব্দ। ভীষণ হিম, ভীষণ নিঃসঙ্গ। কোনো কথার ব্যবহার নেই। কোনো বিশেষ এক্সপ্রেশন নেই। একটা খাওয়ার দৃশ্য শুধু নির্দেশকের মুনশিয়ানায় অসম্ভব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিংবা ইডার বাক্স গুছানোর দৃশ্যটা। অসম্ভব সাদা একটা ব্যাকগ্রাউন্ডে আমরা দেখি ইডার বাক্সটাকে। এখানেও সঙ্গী নানদের সঙ্গে ইডার কোনো কথা নেই। চুপচাপ। বাক্সটা প্রায় ভাঙা। একটা বেল্ট দিয়ে বাঁধা। এবং এই বাক্স গোছানোর সময় ইডা ক্যামেরার দিকে মুখ করে থাকে। তার পিছনে অন্য ঘরের ভিতর দেখা যায় ধর্মীয় মূর্তিগুলোকে। আবার ধর্মের আশ্চর্য উপস্থিতি। এবং ইডার তার আন্ট ওয়ান্ডার কাছে যাওয়া যেন সাময়িক ধর্মকে সরিয়ে রেখেই। বরফের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায় ইডা। চুপচাপ বরফ পড়তে থাকে। পিছনে মনাস্ট্রির বিরাট বাড়িটা দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ডে ভীষণ ভারী হয়ে জেগে থাকে। যেন ইডার জীবনে ধর্মের ভার বোঝাতেই।

এই ইমেজারি থেকে রিলিফ আসে প্রথম ইডার শহর দেখার দৃশ্যগুলোতে। স্বাভাবিক কম্পোজিশন। মানুষের স্বাভাবিকতা। ইডার বাসের জানলা দিয়ে দেখা এবং একই সাথে ইডার মুখের সামনে থাকা বাসের কাচে তার ছায়া পড়া। কী আশ্চর্য সাবলীলতায় ইডার জীবনের স্বাভাবিকত্ব ধরা পড়ে। ইডার মাসি ওয়ান্ডার চরিত্র চিত্রায়ণের শুরুতে পরিচালক সম্পূর্ণভাবে বিপথে চালিত করেন দর্শককে। ওয়ান্ডা-র  ইডাকে জিজ্ঞাসা করা যে চার্চের নানেরা তার সম্পর্কে তাকে কিছু বলেছে কিনা। ঘরের ভিতর জামাকাপড় পরতে থাকা একজন পুরুষমানুষ, ওয়ান্ডার আশ্চর্য নিরাসক্ততা দেখে প্রথমে দর্শক ভেবে বসেন যে ওয়ান্ডা বুঝি একজন যৌনকর্মী। এই ভুল জায়গায় দাঁড়িয়েই শুরু হয় এই ফিল্মের ইনসিসিভ মোমেন্ট। যখন আমরা ইডার সঙ্গেই প্রথম জানতে পারি যে ইডা একজন জিউ, যার বাবা-মা হলোকাস্টের সময় মারা গিয়েছে। ফলে এতক্ষণ ধরে তৈরি করা নান হতে চাওয়া ইডার চরিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা হঠাৎ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায় । এই সময়টায় পরিচালক ক্যামেরায় শুধু ধরে রাখেন ইডার মুখ। অদ্ভুত অতি এক্সপ্রেশনহীন খুব সাটল একটা অভিনয়। প্রায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো যে আসলে একটা খুব শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সেটাই যেন প্রতিভাত হয়।  

এরপরেই এই সিনেমার সব থেকে শক্তিশালী শটটা ব্যবহার করেন পরিচালক। আমরা ক্লোজ আপে দেখতে পাই ইডার মুখ। ফ্রেমের বাঁ দিক থেকে ডান দিকে সরে যায় মুখটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেতে খেতে। আমরা দেখতে পাই বাসের অন্য জানলায়। বাসের হঠাৎ করে স্টার্ট নিয়ে ইডার মুখের ছবি সরিয়ে ফেলার মধ্যেই যেন এতক্ষণের পুরো ঘটনার মূল প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ে যায়। 

আন্ট ওয়ান্ডা-র ক্যারেকটারটার পেশার ব্যাপারটা খুলে ধরার জায়গাটাও চমৎকার। কোর্টের ভিতর জাজের জায়গায় বসা আন্ট ওয়ান্ডা। আর বিচার চলছে একটা লোকের যে তার তরোয়াল দিয়ে কমিউনিস্টদের শহিদবেদীর ফুল নষ্ট করেছে। ওয়ান্ডার মুখের অভিব্যক্তি, মামলার বিষয়, এক পাশে রাখা লেনিনের ছবি। কী অসাধারণ দক্ষতায় একটা সময়কে, ওয়ান্ডাকে, কম্যুনিস্ট শাসনের পোল্যান্ডকে ধরে ফেলা হল।

ফিল্মের কম্পোজিশন আবার অন্যরকম হতে থাকে যখন ওয়ান্ডা এবং ইডা তাদের পরিবারের কবর খুঁজতে যায়। আবার ক্রমশ ক্রিশ্চান মোটিফ। জিউয়িশ ওয়ান্ডার প্রতি লোকের অবজ্ঞা এবং একইসঙ্গে তার সঙ্গী নানের পোশাক পরা ইডার প্রতি ব্যবহারের তারতম্য। পরিচালক কম্যুনিস্ট পোল্যান্ডে ধর্ম এবং জিউবিদ্বেষের ছবি আঁকছেন কী নিখুঁত দক্ষতায়। গল্পের মধ্যেই। শুধু আবহ তৈরি করে। অসম্ভব নন-টল্যারেন্ট একটা সমাজ। যেখানে পাবেও কেউ জিউদের বিষয়ে কথা বলতে রাজি নয়। পরিচালকের কৃতিত্ব  হল সব সময় ইডা বা ওয়ান্ডার রিঅ্যাকশনগুলো দেখিয়ে তাদের মনের অবস্থাটা ফুটিয়ে তোলা। অর্থাৎ দর্শক ফোকাস হারাচ্ছেন না। আবার আশেপাশের সব কিছুই ঘটছে খুব সাবলীলভাবে। একজন নির্দেশকের মূল কাজ তো এটাই। শটের ডিজাইন এবং অভিনেতাদের ব্যবহার করে সাবলীলভাবে তাঁর কথা বলে যাওয়া। এবং এই শটের ডিজাইনগুলো অসম্ভব স্মার্ট এবং বলিষ্ঠ। 

সিনেমার পরবর্তী পর্যায় শুরু হয় ইডা আর ওয়ান্ডার নিজস্ব সংঘাতে। কম্যুনিস্ট নাস্তিক ওয়ান্ডা আর আস্তিক নান হতে চাওয়া ইডার সংঘাত।  যখন একইভাবে প্রেম আসে ইডার জীবনে। মাতাল ওয়ান্ডা আর ইডার সংঘাত ঘরের ভিতর। ক্যামেরা এমন একটা জায়গায় বসানো যেখান থেকে দেওয়ালের নীচের রঙিন বর্ডার দুটো লিডিং লাইন তৈরি করছে, যেগুলো ইঙ্গিত করছে একটা বন্ধ দরজার দিকে। দরজাটা বন্ধ। যে মূল কারণের জন্য তারা এসেছে সে কবরের কোনো সন্ধান পায়নি তারা। এবং এই নৈরাশ্যে আরো বেড়েছে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। কিংবা ইডা এবং তার মিউজিশিয়ান হবু প্রেমিকের প্রথম আলাপ। তাদের পিছনে একটা গ্রিল দেওয়া বিরাট দরজা। দরজার ওপারে ঘষা কাচ। আসলে ইডা তার ধর্মের গারদে আটকা পড়ে রয়েছে। সাধারণ জীবনে প্রবেশ করার সুযোগ নেই তার। ইডা আর তার প্রেমিকের এইরকম অনেকগুলো শট দেখতে পাই আমরা। যখন তাদের বন্ধুত্ব বাড়ছে তখন পিছনে গারদ নেই। কিন্তু একটা প্রায় ঘষা কাচ আছে যার ওপারে পার্টি চলছে। অর্থাৎ ইডা এখনও স্বাভাবিক জীবনের থেকে বাইরে। নিষেধের গরাদ সরিয়ে এসেছে সে। কিন্তু তার এই প্রেম জীবনের স্বাভাবিক প্রেম নয়। কিংবা কবর খুঁজতে যাওয়ার আগে যখন সে তার প্রেমিকের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। ইডা একটা কাচের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। কাচের ওপারে রেখে আসে তার প্রেমিককে।

ইডা আর ওয়ান্ডা অবশেষে জানতে পারে তাদের পরিবারের কথা। তাদের মৃত্যুর কথা। ওয়ান্ডা ইডার কাছে বলে তার সদ্যোজাত ছেলের কথা, যাকে রেখে সে গিয়েছিল যুদ্ধে। স্ক্রিপ্টে এই ঘটনার একটা ইঙ্গিত অনেক আগেই রাখা আছে। যখন ইডা আর তার মাসির প্রথম আলাপে ছবি দেখতে দেখতে ইডা জিজ্ঞাসা করে তার কোনো ভাই ছিল কিনা। ওয়ান্ডার মুখচোখে সামান্য অস্বস্তির ভাব ফুটে ওঠে, সোফা থেকে উঠে মিউজিক বন্ধ করে দেয় সে। তারপরেই কথা ঘুরে যায়। আবার মিউজিক চলতে থাকে। কতটা অসামান্য পরিমিতিবোধ থাকলে একজন পরিচালক এমন করতে পারেন। সমকালীন বাংলা ছবির প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে যেখানে এই জায়গাতেই হয়তো দীর্ঘ একটা সংলাপ থাকত। কিংবা একটা ফ্ল্যাশব্যাক। এইখানে কিছুই বলা হল না। শুধু ইঙ্গিত করা হল। দর্শকের আগ্রহ বাড়ানো হল সামান্য। এমন একটা কিছু রেখে দেওয়া হল গল্পের বুননে যাতে দর্শক পরে গিয়ে সেইটার সঙ্গে সম্বন্ধস্থাপন করতে পারে। খুব স্বাভাবিকভাবে।

এই ছবির ইমেজারি তুলনাহীন। ইডা, ওয়ান্ডা তাদের পথপ্রদর্শকের সঙ্গে যখন কবরের মূল জায়গার দিকে এগিয়ে যায়, ফ্রেমের একদম ডানদিকে উঁচু একটা গাছ। আর দূর থেকে তোলা দৃশ্যে তুলনায় খুব ছোট্ট এই তিনজন মানুষ। এমন একটা কোনো কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এরা যার অভিঘাত তাদের জীবনের থেকে অনেক বড়ো। হয়তো সেইটা সহ্য করার ক্ষমতাও নেই তাদের। কিংবা কবর খোঁড়া হচ্ছে যখন। ইডা আর ওয়ান্ডার পিছনের গাছগুলো কী ভীষণ থর্নি। কাঁটা কাঁটা উঠে আছে যেন, পাতাবিহীন। চরিত্রের মানসিক অবস্থা কী সহজে বুঝিয়ে দেওয়া! 

পরিবারের পরিণতি জানার পর আবার মনাস্ট্রিতে ফিরে যাওয়া ইডা। এইবার প্রথম আমরা নানদের মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিকত্ব লক্ষ করি। জীবনের এই অভিঘাত যেন ইডাকে ম্যাচিওরড করে তুলেছে। আবার একইসঙ্গে বিরাট যিশুর মূর্তির সামনে নানদের শুয়ে থাকা। ধর্মের কী প্রবল মহিমা! যে ধর্ম মানুষকে মানুষ মারায় মুহূর্তে প্রলুদ্ধ করে তোলে, আবার সে ধর্মই মানুষের সহায় হয়। একটা গোটা ভীষণ অ্যান্টি-সেমেটিক ক্রিশ্চান রক্ষণশীল সমাজের ছবিও যেন। আবার এর মধ্যেই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে যেন ফিরে যাচ্ছে ইডা। মাঠের মধ্যে গোলাকার গর্তের মধ্যে রাখা সেই যিশুমূর্তিকে আবার দেখতে পাই আমরা। ইডা তার কাছে ক্ষমা চায়। সে নান হওয়ার জন্য তৈরি নয়। আমরা পিছনে দেখতে পাই মাঠের মধ্যে বরফ নেই। মাঠটা যেন কর্ষিত। ইডার কথার ব্যাকগ্রাউন্ডে শুনতে পাই পাখিদের ডাক। ইডার জীবনেও যেন শীতলতা থেকে বসন্তের আগমন ঘটেছে। 

একই ঘটনার সম্পূর্ণ অন্য এক পরিণতি দেখতে পাই ওয়ান্ডার মধ্যে। কম্যুনিস্ট, নাৎসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, হলোকাস্টের সমর্থন দেওয়া মানুষদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া ওয়ান্ডা যেন কুঁকড়ে যায় তার ছেলের পরিণতি দেখে। আমরা ওয়ান্ডার ঘর দেখতে পাই। ঠিক ফ্রেমের মাঝখানে একটা খোলা জানলা দিয়ে একটুকরো আকাশ। যেন ওইটুকুই মুক্তি। ওয়ান্ডা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ভিতর দিয়ে। পিছনে তখন বেজে চলে মোৎসার্টের শেষ সিম্ফনি (নং ৪১) জুপিটার। এর পরের দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই তিনটে খোলা জানলা। ইডা তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে যেন তখনও খুঁজছে তার জীবনের পরিণতি। ইডা মৃত্যু বেছে নেয় না। সে বরং নানের পোশাক খুলে ফেলে। হিল দেওয়া জুতো পরে হাঁটা প্র্যাকটিস করে একা একা। মদ খায়, সিগারেটও। ইডা জীবনকে বুঝতে চায়। সে ফিরে যায় তার প্রেমিকের কাছে। মিলিত হয় তার সঙ্গে। তারপর সঙ্গমের পর যখন তার প্রেমিক তাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চায় তখন ইডা শুধু জিজ্ঞাসা করে, তারপর? ঘুমন্ত প্রেমিককে ছেড়ে আসে ইডা। আবার পরে নেয় নানের পোশাক। ছবির কম্পোজিশন যেন ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ইডার জীবন যেন তার পরিণতি খুঁজে পাচ্ছে। ছবির শেষ দৃশ্যে আমরা হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরায় ইডাকে দেখতে পাই গ্রামের রাস্তা ধরে হেঁটে আসতে। পিছনে বাখের কম্পোজিশন বাজতে থাকে, Ich ruf zu dir, Herr Jesu ChristI call to You, Lord Jesus Christ.

 ছবির সিনেমাটোগ্রাফির বেশিরভাগটাই ন্যাচারাল লাইটে শুট করা। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট অথচ তবুও যেন ডাচ বারোক পেন্টার ভার্মিয়েরকে মনে করায় বার বার। এই ছবির অভিনয় অসাধারণ পরিমিত এবং পরিশীলিত। কোথাও কোনো মেলোড্রামা নেই, অতি অভিনয় নেই। অভিনয় মানেই যে অতিমাত্রায় বডি মুভমেন্ট বা অতি-অভিব্যক্তি, তা নয়। বরং তার সম্পূর্ণ উলটোদিকে দাঁড়িয়ে কোথাও যেন রবার্ট ব্রেসর অভিনয় ধারার মতো। প্রায় প্রতিক্রিয়া না দেওয়াও যে কী অসামান্য অভিনয় হয়ে উঠতে পারে তার একটা উদাহরণ। ওয়ান্ডার চরিত্রে Agata Kulesza দুর্ধর্ষ। ইডার চরিত্রে অভিনয় করা আনকোরা নতুন, অভিনয় না শেখা Agata Trzebuchowska অসামান্য! বারবার তিনি হ্যারিয়েট অ্যান্ডার্সনকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। অথচ শোনা যাচ্ছে তিনি অভিনয় করতে উৎসাহী নন। হয়তো ছেড়েও দেবেন। 

বহুকাল পরে ইয়োরোপের খুব শক্তিশালী একটা ছবি হলিউডের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেল।

 
 
top