নতুন আলো

 

পর্ব ২২

বারোই ডিসেম্বর অপারেশন হয়েছে জগদীশচন্দ্রের। প্রিয় বন্ধু ব্রুটাস যখন সিজারের পেটে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিলেন, তখন সিজার অবিলম্বে পপাত চমমার চতাই ড. ক্রম্বি যখন প্রস্তাব করলেন যে, তাঁরা তিনজন ডাক্তার মিলে একঘণ্টা ধরে পেটে অস্ত্রোপচার করবেন, লাগবে ক্লোরোফর্ম, তখন আঁতকে উঠেছিলেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র। বাঁচবেন তো? নাকি প্রবাসে দৈবের বশে তাঁর দেহাকাশ থেকে জীবতারা অকালে খসে পড়বে?

. ক্রম্বির স্বস্তিবচনেও তেমন ভরসা পাননি দুজনে অবশেষে শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিন ঘনিয়ে এল। অপারেশন টেবিলে শায়িত জগদীশ সঙ্কটমুহূর্তেও রসবোধ হারাননি। ডাক্তারদের বললেন, ভদ্রমহোদয়গণএবার আপনারা ছুরি চালাতে পারেন! আমি প্রস্তুত!

সিজারের তরী ডোবেনি। জগদীশের ক্ষুদ্র ডিঙিও ডুবল না অপারেশনের পর ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি

কিন্তু থাকবেন কোথায়কোথায় থাকবেন অবলা? প্রায় মাসখানেক নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রামের প্রয়োজন।

এগিয়ে এলেন মুশকিলআসান নিবেদিতা উইম্বল্ডনে নিবেদিতার মায়ের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট আছে সেখানেই অপারেশনের পর অসুস্থ জগদীশকে নিয়ে যাওয়া হল

সারতে সময় লাগল। বিদেশি খাবার জগদীশের মুখে রোচে না নিরুপায় অবলা তাই স্থানীয় বাজারে যান রুই, কাতলা তো পাবেন না, অগতির গতি হিসেবে স্যামন, ট্রাউট প্রভৃতি কিনে আনেন। মশলাও সংগ্রহ হয়েছে কিছু সেই মশলাসহযোগে বিলিতি স্যামন বা ট্রাউটই এমন তরিবৎ করে রাঁধেন যে অসুস্থ জগদীশ ধরতেই পারেন না সেগুলো বাংলাদেশের মাছ নয় হাপুসহুপুস করে খেয়ে নেন।

নিবেদিতা এবং অবলা পালা করে রোগীর শয্যাপার্শ্বে তাঁকে সঙ্গ দেন। ডিটেকটিভ গল্প পড়ে শোনান নিবেদিতা। সম্প্রতি ইংল্যান্ডে এই ধরনের গল্পের জনপ্রিয়তা খুব বেড়েছে। স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে আর্থার কনান ডয়েল নামধারী এক লেখক শার্লক হোমসের ডিটেকটিভ কাহিনি লিখে পেয়েছেন বিপুল জনপ্রিয়তা।

নিবেদিতা এরমধ্যেই জগদীশের প্রণোদনায় রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প অনুবাদ শুরু করেছিলেন। জগদীশচন্দ্রের মতে কবিকে বিদেশে পরিচিত করতে তাঁর ছোটোগল্পগুলো অনুবাদ করা দরকার, কেননা কবিতাগুলো অনবদ্য হলেও অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব

নরওয়ে, সুইডেন বা ইতালির ছোটোগল্প বিলেতের লোক আগ্রহের সঙ্গে পড়ছে বাংলা গল্পই বা চলবে না কেনঅবশ্য সমস্যা আছে। নানা কারণে বিলেতের পাঠকদের আগের সেই উদারতা কমে গেছে। এখন হিংস্র সাম্রাজ্যবাদের যুগ বুয়র যুদ্ধের দানবীয় হিংসার যুগএই রক্তপিপাসু যুগের গুরু হচ্ছেন রাডিয়ার্ড কিপলিং

তাও জগদীশ বা নিবেদিতা আশা ছাড়েন না

কাবুলিওয়ালাছুটি অনূদিত হয়েছে রোগশয্যায় শায়িত জগদীশকে অনেকেই দেখতে আসেন তাঁদের সঙ্গে গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। পড়ে শোনানো হয় তাঁদের

লন্ডনে এখন বেশ শীত পড়েছে ডিসেম্বর মাস। বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে আছে চরাচর। নিষ্পত্র গাছে নেই পাখির কাকলি। সূর্যের মুখ দেখা ভার। কখন যে সূর্যদেব আসেন আর কখন যে চুপিসাড়ে টুপ করে পালান তিনি, তা কেউই খেয়াল করতে পারেন না। বিকেল তিনটের মধ্যেই নেমে আসে রাত্রির অন্ধকার সেই অকালসন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেসের আগুনের উত্তাপে ঘন হয়ে জমে ওঠে গল্পের আসর

এর মধ্যে একদিন জগদীশের সঙ্গে দেখা করতে এলেন এক বিশিষ্ট ব্যক্তি। নিবেদিতার বিশেষ পরিচিত তিনি। রোগশয্যায় শায়িত জগদীশের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন।

প্রিন্স পিটার আলেক্সিয়েভিচ ক্রপটকিননিবেদিতার মতে, তিনি ইউরোপের দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন টলস্টয়। লক্ষণীয় হল, নিবেদিতার হিসেবে বিলেতের কোনো মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে ধর্তব্যের মধ্যেই আসেন না।

প্রিন্স ক্রপটকিনের বিচিত্র জীবন-ইতিহাস। রাশিয়ার অভিজাত বংশের সন্তান তিনি কিন্তু জারের ওপর শ্রদ্ধা হারান। রাজসভা ছেড়ে চলে যান সুদূর সাইবেরিয়ায়। এইসময় বন্য জন্তুদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন চার্লস ডারউইনের দিকে

দ্য অরিজিন অব স্পিসিস লিখে সারা বিশ্বে তখন ডারউইনের অভ্রভেদী প্রতিপত্তি। সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্টবিবর্তনের এই নীতি সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিপতিরা মহানন্দে ব্যবহার করছে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে ডারউইনকে কাজে লাগাচ্ছে তারা

এর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন ক্রপটকিন। বললেন যে, শুধু হানাহানি বা প্রতিযোগিতাই নয়, জন্তুদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাও রয়েছে একে ক্রপটকিন বললেন মিউচুয়াল এইড এমনকী এই মিউচুয়াল এইড শ্বাপদদের মধ্যেও রয়েছে। এখান থেকে সিদ্ধান্ত টানলেন ক্রপটকিন যে, মানুষকে জীবজন্তুদের কাছ থেকে প্রাজ্ঞ আচরণের শিক্ষা নিতে হবে এরপর তিনি অ্যানার্কিস্ট চিন্তাবিদ বাকুনিনের সংস্পর্শে আসেন। সুইজারল্যান্ডে জুরা ফেডারেশনের ঘড়ি নির্মাতাদের সমবায় নীতি অনুপ্রাণিত করে তাঁকে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন কি? উৎপাদকদের স্বাধীন সমবায়ই তো সব কাজ চালাতে পারেব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ হোক বিলোপ হোক অত্যাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার।

বলা বাহুল্য, ক্রপটকিনের এ ধরনের মতবাদ রাশিয়ার সরকার সুনজরে দেখলেন না। ১৮৮১ সালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার খুন হলে গ্রেপ্তার হলেন ক্রপটকিন।

পরে তাঁকে দীর্ঘদিনের জন্য দেশান্তরি হতে হল। ইংল্যান্ডে প্রবাসী হলেন ক্রপটকিন। এলেন নিবেদিতার সংস্পর্শে।

নিবেদিতা তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ক্ষতিকারতা এবং অনৌচিত্য সম্পর্কে স্থিরনিশ্চয় হয়েছেন। দার্শনিক ক্রপটকিনের চিন্তাধারা দারুণ প্রভাব ফেলল তাঁর ওপর।

ক্রপটকিনের অ্যানার্কিস্ট দর্শন ভারতের পটভূমিকায় কাজে লাগানো যায় কীভাবেকীভাবে পরাধীন ভারতীয়রা আত্মশক্তির ওপর আস্থা রেখে ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়তে পারবেকীভাবেই বা স্বদেশের সামাজিক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করে অকেজো করে দিতে পারবে উপর থেকে চাপানো ব্রিটিশদের শাসনকাঠামো?

নিবেদিতা অবশ্য তাঁর এসব চিন্তাধারা স্বামী বিবেকানন্দ বা জগদীশচন্দ্রের কাছ থেকে সযত্নে গোপন রেখেছেন। স্বামীজি ভারতে ব্রিটিশশাসনের তীব্র বিরোধী হলেও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কোনো ইচ্ছে দেখাননি। তিনি চান না যে, বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীরা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ুন। জগদীশচন্দ্রও একান্তভাবে বিজ্ঞানেরই লোক সেই সাধনাতেই দিবারাত্র ডুবে আছেন তিনি

তবে শুধু তো রাজনৈতিক আলোচনা নয়। ক্রপটকিনের মতো প্রবল ধীশক্তিসম্পন্ন মনীষার সাথে পরিচয় হলে জগদীশের লাভ বই ক্ষতি নেই

অসুস্থ জগদীশকে দেখতে তাই নিবেদিতার আমন্ত্রণে এসেছেন সস্ত্রীক প্রিন্স ক্রপটকিন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও বিশেষ খাতির নিবেদিতার।

ক্রপটকিন সময়নিষ্ঠ মানুষ কাঁটায় কাঁটায় বেলা ছ-টায় তাঁর জুড়িগাড়ি নিবেদিতাদের উইম্বল্ডনের ছোট্ট ফ্ল্যাটটার সামনে এসে দাঁড়াল

দীর্ঘদেহ মানুষটি। ধপধপে ফরসা গায়ের রং মুখে মুনিঋষিদের মতো দাড়িগোঁফ। একটা কালো ওভারকোট পরে আছেন। ঘরে ঢুকে নিবেদিতার হাতে সে ওভারকোটটা খুলে দিলেন। নীচের পরিধেয় বস্ত্র সাদা। মাদাম ক্রপটকিন ছোটোখাটো মহিলা। রুচিসম্মত অথচ সাধারণ বেশভূষা বোঝাই যায় যে, বিলেতের প্রবাসী, নির্বাসিত রাজকুমারের জীবনে বিলাসিতার কোনো স্থান নেই।

বসবার ঘরে উঠে এসেছেন জগদীশ। একটা কম্বলে শরীর মুড়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে রয়েছেন তিনি। ক্রপটকিনকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন তিনি ফায়ারপ্লেসের আগুন উসকে দিলেন নিবেদিতা অবলাও বেরিয়ে এসেছেন। হাই টি-র নেমন্তন্ন নিবেদিতা তাই কিনে এনেছেন স্কোন, মাফিন এবং ক্লটেড ক্রিম। অবলা সেগুলো প্লেটে-প্লেটে সাজিয়ে তুলে দিলেন অভ্যাগতদের হাতে ধূমায়িত টি-পট  থেকে কাপে-কাপে সুবাসিত দার্জিলিংয়ের চা ঢেলে দিলেন নিবেদিতা

এরপর গল্পগুজব শুরু হল

ক্রপটকিন অসাধারণ সুবক্তা নিবেদিতার ছোট্ট ফ্ল্যাটে শীতের সন্ধ্যায় তাঁর কণ্ঠস্বর মন্দ্রিত হয়ে উঠল

রাশিয়ার যাঁরা চিন্তানায়ক, তাঁদের মধ্যে সবসময়ই অন্য অভাবী দেশগুলোর প্রয়োজনের স্বীকৃতি আছে ক্রপটকিন ব্যতিক্রম নন। তিনি আন্তরিকভাবেই চান যে, ভারত অচিরে স্বাধীন হোক। জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করুক তাঁর এই সহানুভুতিবাক্য জগদীশ ও অবলাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।

ক্রপটকিন বললেন, . বোস, যথার্থ সভ্যতা লুণ্ঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় না। শক্তি আর ন্যায় এক জিনিস নয় বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে সংঘর্ষ, তা আগ্রাসী দেশের পক্ষেও মঙ্গলজনক নয়

জগদীশ মৃদুস্বরে বললেন, ব্রিটিশদের দেখে তো মনে হয় না তারা এই সত্য উপলব্ধি করেছে। এরা তো শক্তির মদমত্ততায় ধরাকে সরা জ্ঞান করছে

ক্রপটকিন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন, ঠিক বলেছেন, . বোস। এই যে এরা বুয়র যুদ্ধ করছে, চিনে হামলা চালাচ্ছে, এতে এরা বুঝছে না যে, ওদের নৈতিক ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এম্পায়ার এম্পায়ার করে গোটা জাতটা গোল্লায় যেতে বসেছে

নিবেদিতা বললেন, কটা আশ্চর্য ব্যাপার হল ভারত কিন্তু কখনো তার সুমহান ইতিহাসে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি অন্যদেশকে লুঠ করে বড়লোক হতে চায়নি। ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা অশোক বলেছিলেন যে, তাঁর উদ্দেশ্য দিগ্বিজয় নয়, ধর্মবিজয়

জগদীশ বিষণ্ণ হাসলেনবললেন, বাই তো বলে যে আমরা দুর্বল বলেই ধর্মের কথা বলে বেড়াই। কাপুরুষ বলেই দিগ্বিজয়ে বেরোইনি খালি পড়ে পড়ে মার খেয়েছি

নসেন্স! গরজে উঠলেন নিবেদিতা। ম্রাট অশোকের পায়ের ধুলো চাটতে পারে এমন একটা ইউরোপের রাজা দেখান তো আপনি? সব তো ডাকাতদলের সর্দার!

ক্রপটকিন হাসতে লাগলেন বললেন, ঠিঠিকভারত সত্যিই একদিন সবাইকে পথ দেখিয়েছে। বুদ্ধ আর অশোক সত্যিই প্রণম্য তবে কী জানেন, . বোস?

কী?

ব্রিটিশদের তাঁবে থেকে আপনাদের শুধু আর্থিক সর্বনাশই নয়, সাংস্কৃতিক সর্বনাশও হয়েছে। আপনাদের এখন কালিদাসের মতো কবি কোথায়?

ক্রপটকিনের কথায় চমকে উঠলেন জগদীশ। বন্ধুবর রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে গেল তাঁর।

বললেন, পনার কথা সর্বাংশে সত্য নয় ভারতে আমার এক বন্ধু খুব ভাল লিখছে প্রিন্স। এখানে কেউ তার নাম জানে না

টে?

ওঁর কিছু ছোটোগল্প অনুবাদ করেছি। শুনবেন নাকি? আমি চাই সবাই ওঁর নাম জানুক, ওঁর লেখা পড়ুক

বশ্যইউইথ প্লেজার!

নিবেদিতা, রবির কাবুলিওয়ালাটা প্রিন্সকে পড়ে শোনাবে নাকি?

জগদীশের অনুরোধে অনুবাদের ডায়রিটা নিয়ে এলেন নিবেদিতা।

ফায়ারপ্লেসে গনগন করে আগুন জ্বলছে। বসবার ঘরে আরামদায়ক উষ্ণতা সেই ঘন আরামে বসে জগদীশচন্দ্র, অবলা, প্রিন্স ক্রপটকিন ও তাঁর স্ত্রী নিবেদিতার পাঠ শুনতে লাগলেন।

নিবেদিতা পড়েন ভালো এককালে শিক্ষয়িত্রী ছিলেন তিনি। ভাষার ওপর দখলও অসম্ভব।

চোখ বুজে শুনতে লাগলেন জগদীশ। রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলো প্রায় মুখস্থ তাঁর। কবির ভাষার সেই অনুপম সৌন্দর্য কি অনুবাদে ফোটানো সম্ভব?

এ সম্বন্ধে আমার মতামতের জন্য কিছুমাত্র অপেক্ষা না করিয়া হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, বাবা, মা তোমার কে হয়

মনে মনে বলিলাম, শ্যালিকা;

নিবেদিতার কণ্ঠস্বর বসবার ঘরে মন্দ্রিত হচ্ছে। জগদীশ চোখ বুজে স্মরণ করে চলেছেন রবীন্দ্রনাথের বাংলা গদ্য:

সংবাদ পাইলাম, কাবুলিওয়ালার সহিত মিনির যে এই দ্বিতীয় সাক্ষাৎ তাহা নহে, ইতিমধ্যে সে প্রায় প্রত্যহ আসিয়া পেস্তাবাদাম ঘুষ দিয়া মিনির ক্ষুদ্র লুব্ধ হৃদয়টুকু অনেকটা অধিকার করিয়া লইয়াছে

উহাদের মধ্যে আরোএকটা কথা প্রচলিত ছিল। রহমত মিনিকে বলিত, খোঁখী, তোমি সসুরবাড়ি কখুনু যাবে না! …

রহমত কাল্পনিক শ্বশুরের প্রতি প্রকান্ড মুষ্টি আস্ফালন করিয়া বলিত, হামি সসুরকে মারবে

এসব কি অনুবাদ করা যায়একটা জাতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি কি অবিকল পৌঁছে দেওয়া যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ভাষায়আচ্ছা, রবি তো মিনির এই চরিত্র এঁকেছে ওরই বড়ো মেয়ে বেলিকে দেখেআমায় তো তাই বলেছিল বেলিটারও তো বিয়ের বয়েস হয়ে গেল?

দেখিয়া আমার চোখ ছলছল করিয়া আসিল। তখন, সে যে একজন কাবুলি মেওয়াওয়ালা আর আমি একজন বাঙালি সম্ভ্রান্তবংশীয় তাহা ভুলিয়া গেলাম—তখন বুঝিতে পারিলাম, সেও যে, আমিও সে, সেও পিতা, আমিও পিতা। তাহার পর্বতগৃহবাসিনী ক্ষুদ্র পার্বতীর সেই হস্তচিহ্ন আমারই মিনিকে স্মরণ করাইয়া দিল।

জগদীশচন্দ্র এতটাই তন্ময় হয়ে গেছিলেন যে, খেয়ালই করেননি নিবেদিতার পাঠ শেষ হয়ে গেছে। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ, নির্বাক হয়ে তাঁর দিকেই চেয়ে আছেন। সবার চোখেই জল ছলছল করছে।

সেই স্তব্ধতা ভঙ্গ করে সলজ্জ কণ্ঠে জগদীশ বললেন, রি, আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। আমার বন্ধুর লেখা ভালো লাগল আপনার?

পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের জল মুছলেন প্রিন্স ক্রপটকিন, কী জানেন, . বোস? আমাদের মহান রুশ সাহিত্য এখন একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে। টলস্টয়ের বয়েস হয়ে গেছে। ডয়স্টয়েভস্কি এবং টুর্গেনিভ মৃত। চেকভ বলে একটি ছেলে অবশ্য খুব ভালো লিখছে।  এখন আপনার এই বন্ধুটির নাম কী?

বীন্দ্রনাথ ঠাকুর .

, রবীন্দ্রনাথ! সুন্দর নাম! আমি প্রচুর ইউরোপীয় সাহিত্য পড়ি, . বোস। আপনার বন্ধুটির মতো লেখার হাত বা শৈলী আর কারো দেখেছি বলে মনে হয় না। সত্যিই মহৎ প্রতিভা

জগদীশের বুক বন্ধুগর্বে স্ফীত হয়ে উঠল।

নিবেদিতা অল্প সময়ের জন্য উঠে গেছিলেন। ফিরলেন হাতে একটা কাগজ নিয়ে।

লুন তো কী এটা? ছেলেমানুষের মতো কাগজটা গাউনের পেছনে লুকিয়ে বললেন তিনি

সবাই মাথা নেড়ে স্মিতহাস্যে জানালেন যে, তাঁরা অনুমান করতে পারছেন না

কাগজটা অতঃপর বের করলেন নিবেদিতা। কাগজের ওপর ভুসোকালিতে তাঁরই ডানহাতের ছাপ হেসে বললেন, ‘‘ কাবুলিওয়ালাদ্বারা অনুপ্রাণিত!

জগদীশের মনে পড়ে গেল কাবুলিওয়ালার পঙক্তিগুলি :

দেখিলাম, কাগজের উপর একটি ছোটো হাতের ছাপ। ফোটোগ্রাফ নহে, তেলের ছবি নহে, হাতে খানিকটা ভুসা মাখাইয়া কাগজের উপর তাহার চিহ্ন ধরিয়া লইয়াছে। কন্যার এই স্মরণচিহ্নটুকু বুকের কাছে লইয়া রহমত প্রতিবৎসর কলিকাতার রাস্তায় মেওয়া বেচিতে আসে—যেন সেই সুকোমল ক্ষুদ্র শিশুহস্তটুকুর স্পর্শখানি তাহার বিরাট বিরহীবক্ষের মধ্যে সুধাসঞ্চার করিয়া রাখে

তাঁর চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল

হাই-টি শেষ হয়ে গেছে। অতিথিদের বিদায়ের পালা। শীতের সন্ধ্যায় পেঁজাপেঁজা বরফ পড়ছে। ক্রপটকিনদের এগিয়ে দিতে গেলেন নিবেদিতা

দ্বারপ্রান্তে প্রিন্স ফিরলেন তাঁর দিকে, . বোসকে খুব ভালো লাগল

হ্যাঁ, খুবই ভালো মানুষ এবং এক মহৎ প্রতিভা

তোমার গুরু?কেমন আছেন তিনি?

তিনি ভারতে ফিরে গেছেন

তোমার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মতামত সম্পর্কে তিনি কিছু জানেনতিনি কি জানেন যে তুমি অ্যানার্কিজমের দিকে ঝুঁকছ?

না, আর জানলেও তিনি সেটা পছন্দ করবেন না। তিনি সক্রিয় রাজনীতির সমর্থক নন

তাহলে তো খুব বিপদ, নিবেদিতা। ভবিষ্যতে তুমি একেবারে একলা হয়ে যাবে

লে গেলেন সস্ত্রীক প্রিন্স ক্রপটকিন

নিবেদিতার কানে বাজতে লাগল তাঁর অন্তিমবাক্য—

ভবিষ্যতে তুমি একেবারে একলা হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে তুমি একেবারে একলা হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে তুমি একেবারে একলা হয়ে যাবে।

 

চট্টগ্রাম মেল ছুটে চলেছে। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ। ট্রেনের জানালায় বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। একটা শতাব্দী শেষ হয়ে গেল। আসছে নতুন শতাব্দী। কেমন হবে সেই নতুন যুগট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে শীতের ঠান্ডা হাওয়া এসে রবীন্দ্রনাথের চুল, দাড়িতে প্রবল মাতামাতি করছেপ্রায় চল্লিশ বছর বয়েস হতে চলল কবির। আর কতদিন বাঁচবেন তিনিআর কতদিন অটুট থাকবে তাঁর কর্মক্ষমতাযে নতুন শতাব্দী আসছে তাকেই বা কতটা দেখে যেতে পারবেনবঙ্কিম মারা গেছেন ছাপ্পান্ন বছর বয়েসে। মধুসূদন ঊনপঞ্চাশে। অবশ্য বাবামশাই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আশি ছাড়িয়েছেন এবং এখনো অটুট কর্মশক্তি তাঁর।

কবির সঙ্গে চলেছেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ। বছর দশেকের ছেলেমানুষ।

কবি অনেকদিন শিলাইদহ ছাড়া। মাঝে এলাহাবাদ যেতে হয়েছিল সাহানাদেবীকে আনতে। তারপর কলকাতায় নীতীন্দ্রনাথের পীড়া এবং তাই নিয়ে রাত্রি জাগরণ। অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারেন রবীন্দ্রনাথ। এর মধ্যেই চালিয়ে গেছেন সাহিত্যচর্চা, ঘোরাঘুরি, গান বাজনা এমনকী অভিনয়!

ঘোরাঘুরির একটা বড়ো কারণ অবশ্য আর্থিক। ঘোরতর আর্থিক সঙ্কটে রয়েছেন কবি। বন্ধুবর প্রিয়নাথের সাহায্যে শতকরা নয় শতাংশ বার্ষিক সুদে আবার ধার করেছেন হাজার বিশেক টাকা। তার দালালি হিসেবে বারোশো টাকাও গুনে গুনে দিতে হয়েছে তাঁকে। অবশ্য শুধু যে নিজের জন্য ঘুরছেন রবীন্দ্রনাথ তা নয়। বন্ধু জগদীশচন্দ্র লন্ডনে। তিনিও অর্থচিন্তায় কাতর ও রোগশয্যায় শায়িতকী করা যায় তাঁর জন্য?

ত্রিপুরার মহারাজ রাধাকিশোর দেবমাণিক্য কলকাতায় এসেছেন। রাজা-মহারাজরা এ সময় ভারতের রাজধানীতে সমাগত হন। কলকাতার শীত বড়ো মনোরমরাজপুরুষেরা নেমে আসেন শিমলার শৈলশ্রেণি থেকে। বাতাসে হিমের স্পর্শ যেন ইংল্যান্ডের বসন্তকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বলনাচ, ঘোড়দৌড়, পানভোজনের মোচ্ছব চলতে থাকে। ত্রিপুরার মহারাজ রাধাকিশোর দেবমাণিক্য নিয়ম করে এ সময় কলকাতায় কাটিয়ে যান। রাজা রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমবয়সী। তাঁর পিতৃদেব স্বর্গত বীরচন্দ্র দেবমাণিক্যও কবির গুণগ্রাহী ছিলেন।

মহারাজের সংবর্ধনার জন্য ভারতীয় সঙ্গীত সমাজ কবির বিসর্জন নাটকের অভিনয় করেছিল। কবি স্বয়ং সেজেছিলেন রঘুপতি।

ছুটন্ত ট্রেনের জানলায় বসে কবি সেই অভিনয়ের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। অন্য অনেক গুণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ অভিনেতাও বটে। তবু তাঁর মনের সংশয় কাটে না। কেমন হয়েছিল সে দিন তাঁর অভিনয়?

পুত্র রথীন্দ্রনাথের দিকে ফিরলেন কবি।

থি?

কী বাবা?

সে দিন বিসর্জন তো দেখলি?কেমন লাগল রে তোর?

দারুণ বাবা, অসাধারণ!

টেআমার অ্যাকটিং কেমন লাগল তোর?

ভালো

শুধু ভালো?

তোমায় দারুণ মানিয়েছিল, বাবা। গায়ে লাল কাপড়, মাথায় চুড়ো করা চুল, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা। আমার সত্যি ভয় করছিল, বাবা

হুঁ

চ্ছা, বাবা, তুমি কি একটা কথা জানতে?

কী?

সে যে দৃশ্যটা যেখানে মন্দিরে রঘুপতি, নক্ষত্র রায় আর ওই ঘুমন্ত বাচ্চা ছেলেটা?

ধ্রু?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধ্রুবঅশ্বিনী তো করছিল ওই পার্টটা

রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করতে লাগলেন :

ঘুম হতে চকিতে মিলায়ে যাবে গাঢ়তর ঘুমে

ওই প্রাণরেখাটুকু—শ্রাবণনিশীথে

বিজুলিঝলক-সম, শুধু বজ্র তার

চিরদিন বিঁধে রবে রাজদম্ভ-মাঝে।

বাবা, তোমার পুরো পার্ট মুখস্ত!

দূ বোকানাটকটা তো আমিই লিখেছিমুখস্ত থাকবে না?

তারপর ধ্রুবকে মারতে তুমি জয় মাকালী বলে খড়্গ তুললেতুমি কি জানতে যে, ওটা আসল খড়্গ?

লিস কী রেআসল খড়্গ?

হ্যাঁ, আসল খড়্গের ধার! আর একটু হলেই ধ্রুবর মাথা কেটে ফেলছিলে তুমি!

তোকে কে বলল?

মরদা। ওই তো তাড়াতাড়ি ধ্রুবকে সরিয়ে নিয়ে গেল

রবীন্দ্রনাথ চুপ করে গেলেন। বাগবাজারের জমিদার পশুপতি বসুর ছেলে অমরনাথ সেজেছিল নক্ষত্র রায়। ভালোই অ্যাকটিং করেছে সে। খেয়াল করলেন যে, সত্যি সত্যিই অমরনাথ বালক ধ্রুবকে সেই অঙ্কে খুব দ্রুত তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছিল আর তারপর কেমন অদ্ভুত চোখে চেয়েছিল তাঁর দিকে। এই তাহলে কারণকিন্তু তাঁকে তো তারপর কিছু জানায়নি অমরনাথ?

থি, অমর আমায় তো কিছু বলল নাকী মারাত্মক কাণ্ড!ভাগ্যে বেচারা অশ্বিনীটার কিছু হয় নি! রবীন্দ্রনাথ অপ্রতিভ হয়ে হাসলেন, মি কি ভুলো দেখেছিসযদি কিছু হয়ে যেত?

তুমি বাবা যখনই কিছু কর, একেবারে তন্ময় হয়ে যাও। দিকবিদিক খেয়াল থাকে না

পিতাপুত্র কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।

চট্টগ্রাম মেল ছুটে চলেছে। পাশ দিয়ে দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে গাছপালা, হরিৎ শস্যক্ষেত্র, ছোটো খাল-বিল, নদী-পুকুর। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশ ঢেকে গেছে এক লোহিত আস্তরণে। সেই রক্ত মেঘের পেছনে আত্মগোপন করেছে দিনান্তের সূর্য।

বাবা, বাবা! চিৎকার করে উঠলেন রথীন্দ্রনাথ, দেখো, কী সুন্দর!

ত্যিই সুন্দর, অসাধারণ!

বাবা, আমরা এই শতাব্দীর শেষ সূর্যাস্ত দেখলাম। নতুন শতাব্দী কেমন হবে, বাবা?

তো কী মনে হয়কেমন হবে?

খু ভালো মনে হয়, বাবা। কত কিছু নতুন দেখব, শুনব, জানব। বিজ্ঞানের কত উন্নতি হবে, বাবা। আজ মানুষ মাটির ওপর দিয়ে চলছেনতুন শতাব্দীতে তারা আকাশে উড়বেসাগরের তলায় ডুববে

রবীন্দ্রনাথ ভাবলেন তার কিশোর পুত্রের উৎসাহে সায় দেন, নতুন শতাব্দীকে সোৎসাহে বরণ করেন, কিন্তু মন সায় দিল না। আজই সকালে কাগজ পড়েছেন তিনিবুয়র যুদ্ধে ভয়াবহ অত্যাচার চালাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা। চিনেও চলছে প্রবল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। পড়ে বিপুল বিবমিষা এসেছে তাঁর। ইংরেজের কাগজে কাগজে আজ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জয়ধ্বনি। ভাড়াটে কবিকুল ও সাহিত্যিকদের জাতিদম্ভ নিয়ে নগ্ন চাটুকারিতা। তার পুরোভাগে আছেন কবিকুলতিলক রাডিয়ার্ড কিপলিং!বিজ্ঞানের অগ্রগতি এ কোথায় টেনে নিয়ে চলেছে সভ্য মানুষকেশেষ কোথায় এরএত লোভ আর অন্যায়ের ফল কী ভালো হতে পারে?

থি, তোর কাছে কাগজ-পেন্সিল আছে?

হ্যাঁ, বাবা

লে, লিখে নে, আমার মাথায় একটা নতুন কবিতা আসছে। একটা সনেট। এখনই লিখে নে, নয়তো পরে ভুলে যাব। পরে শিলাইদহে গিয়ে ফেয়ার কপি করে নেব

রথীন্দ্রনাথ তার পিতৃদেবের এ হেন সহসা অনুপ্রেরণার সঙ্গে পরিচিত। তার খাতা-পেন্সিল আত্মপ্রকাশ করল।

দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে চট্টগ্রাম মেল। অস্তগামী সূর্যের আবছা আলোয়, শীতের হাওয়ার প্রবল মাতামাতির মধ্যে নির্জন ট্রেন-কক্ষে রবীন্দ্রকণ্ঠ মন্দ্রিত হয়ে উঠল।

শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে

অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে

অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিণী

ভয়ংকরী। দয়াহীন সভ্যতানাগিনী

তুলেছে কুটিল ফণা চক্ষের নিমেষে

গুপ্ত বিষদন্ত তার ভরি তীব্র বিষে।

স্বার্থে স্বার্থে বেধেছে সঙ্ঘাত, লোভে লোভে

ঘটেছে সংগ্রাম- প্রলয়মন্থনক্ষোভে

ভদ্রবেশী বর্বরতা উঠিয়াছে জাগি

পঙ্কশয্যা হতে। লজ্জা শরম তেয়াগি

জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রবল অন্যায়

ধর্মেরে ভাসাতে চায় বলের বন্যায়।

কবিদল চিৎকারিছে জাগাইয়া ভীতি

শ্মশানকুক্কুরদের কাড়াকাড়ি-গীতি।

বাবা, তাহলে কি আশা কিছু নেই? লিখতে লিখতে প্রশ্ন করলেন রথীন্দ্রনাথ।

থি, দ্যাখ, মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবেসে দিন অভিনয়ের পর মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যের কাছে গেলাম। নাটকের আর অভিনয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কী চমৎকার মানুষ! তারপর যখন জগদীশের সমস্যার কথা বললাম, এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন যে, জগদীশকে সাহায্য করতে পারলে ধন্য হয়ে যাবেন। এঁদের দেখেই ভরসা হয় যে, সব কিছু নষ্ট হয়ে যায় নি রে, রথী কিছু আশা এখনো আছে

রাত্রি নেমে এসেছে। পিতাপুত্র উভয়েই নীরব। রবীন্দ্রনাথ ছেলেকে বললেন না যে, জগদীশচন্দ্রের জন্য তদ্বির করলেও তিনি নিজে মারোয়াড়ি মহাজনের কাছে বিপুল ধার করেছেন। ঋণে ঋণে জর্জরিত তিনিও।

নীচের বাঙ্কে শুয়ে পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ ওপরের বাঙ্কে। লুচি, আলুর দম, সন্দেশ দিয়ে তাঁদের নৈশাহার সমাপ্ত হয়েছে। ট্রেন কুষ্ঠিয়া পৌঁছোবে ভোরে।

হঠাৎ ছেলেকে বললেন রবীন্দ্রনাথ, জানিস রথী?

কী, বাবা?

মি ভাবতাম যে আধুনিক ছেলেছোকরারা আমার লেখা পড়ে নাএবার আমার ভুল ভাঙল

তা নাকি, বাবা?

প্রেমতোষ আমাকে একটা বাইশ-তেইশ বছরের ছেলের সাথে আলাপ করিয়ে দিলসে তো আমায় আইডলাইজ করে বলতে গেলে। সুরেশ সমাজপতি আর পাঁচকড়িবাবুর গালাগাল খেয়ে ভাবতাম যে, আমার লেখা চলে না। আমি ব্যাকডেটেড। এ ছেলেটা তো চিত্রাঙ্গদা থেকে অনর্গল মুখস্ত বলতে লাগল। এত ভালো লাগল!

কী নাম, বাবা, ছেলেটার?

নামটা বোধ হয় যতীন্দ্রমোহন বাগচী। ভালো ছেলে, শার্প ছেলে এসব ছেলেরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ, রথি, আমাদের ফিউচাররবীন্দ্রনাথের কণ্ঠা তন্দ্রাবিজরিত হয়ে এল। ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি মৃদু নাসিকাধ্বনি শোনা যেতে লাগল

(ক্রমশ…)

 
 
top