নতুন আলো

 

পর্ব ২৪

ভুগছিলেন অনেকদিন। বাতের ব্যথায় পঙ্গু। ছানির জন্য দেখতে পান না চোখে। বয়েস আশি পেরিয়েছে। বাইশে জানুয়ারি, ১৯০১ মঙ্গলবার সন্ধে সাড়ে ছ-টায় তাঁর আইল অব ওয়াইটের প্রাসাদ অসবোর্ন হাউসে মারা গেলেন মহারানি ভিক্টোরিয়া। মৃত্যুশয্যায় তাঁর পাশে ছিলেন ছেলে, ভাবি সম্রাট এডওয়ার্ড এবং নাতি, জার্মানির সম্রাট কাইজার উইলহেলম।

পঁচিশে জানুয়ারি এঁরাই ধরাধরি করে মরদেহ কফিনে তুলে দিলেন। কনের সাদা সাজে সাজানো হয়েছিল ভিক্টোরিয়াকে। পাশে রাখা হয়েছিল প্রয়াত স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্টের ড্রেসিং গাউন ও তাঁর হাতের একটা প্লাস্টারের ছাঁচ। শেষ বয়েসে রানির ছায়াসঙ্গী ছিলেন এক স্কটিশ ভৃত্য, জন ব্রাউন। দুজনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে কুজনে অনেক কথা বলত। ব্রাউন মারা গেছেন আগেই। তাঁর একগাছি চুল এবং একটা ছবি এমনভাবে লুকিয়ে ফুলের তোড়ার মধ্যে রেখে দেওয়া হল যাতে কেউ দেখতে না পায়। এ ব্যাপারে রানি আগেই নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন। শেষকৃত্য হল উইন্ডসর প্রাসাদের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে। তারপর অতি যত্নে উইন্ডসর প্রাসাদেরই ফ্রগমোর মসোলিয়ামে প্রয়াত স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্টের পাশে সমাধিস্থ করা হল মহারানিকেযখন মরদেহ কবরে রাখা হচ্ছে, তখনই আকাশ থেকে ঝরতে লাগল পেঁজা তুলোর মতো বরফ।

ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটা যুগ শেষ হয়ে গেল, যা ইতিহাসে ভিক্টোরীয় যুগ হিসেবে খ্যাত হয়েছে। সুদীর্ঘ এই পর্বে ইংরেজ জাতি জ্ঞানে, গরিমায়, বৈভবে এবং সাম্রাজ্যের বিস্তারে জগতে শীর্ষ আসন লাভ করে।

বলা হত যে, ইংরেজের সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। এত পৃথিবীব্যাপী তার বিস্তৃতি যে, কোনো জায়গায় যখন সূর্যাস্ত হচ্ছে, তখনই দুনিয়ার অন্য কোনো প্রান্তে ঘটছে সূর্যোদয়।

ভিক্টোরিয়া সুন্দরী ছিলেন না। উচ্চতায় মাত্র পাঁচ ফুট। তবু কুরূপা, খর্বাকৃতি এই নারীকে আপামর ভারতবাসী মাতৃবৎ জ্ঞান করত। সেই স্নেহময়ী জননীমূর্তি ঢেকে দিত ইংরেজ রাজত্বের ক্রূরতা, নীচতা, জাতিবিদ্বেষ এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণকেঅবশ্য ভিক্টোরিয়া ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয়দের স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। শেষ বয়সে প্রয়াসী হয়েছিলেন উর্দু শিখতে। সে জন্য নিয়োগ করেছিলেন আব্দুল করিম নামধারী এক ভারতীয়কে। ভিক্টোরিয়ার রাজসভায় করিমের সমাদর চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল মহারানির পার্শ্বচরদেরতাঁরা রানির প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে করিমকে ঘাড়ধাক্কা দিলেন। পৃথিবীজোড়া শোকোচ্ছ্বাসে সে অপকীর্তি ঢাকা পড়ে গেল।

জগদীশচন্দ্র ও নিবেদিতা এ সময় লন্ডনে আছেন। নিবেদিতা ঘোরতর ব্রিটিশবিরোধী। ভিক্টোরিয়া সম্বন্ধে কিছুমাত্র মোহ নেই তাঁর। অবশ্য ভারত থেকে শোকোচ্ছাসের যে খবর আসছে, তাতে সবাই স্তম্ভিত। রানির অন্ত্যেষ্টির দিন অসংখ্য মানুষ মাতৃবিয়োগের শোকচিহ্ন ধারণ করে, অর্থাৎ সাদা ধুতি পরে এবং গলায় সাদা উত্তরীয় দিয়ে, খালি পায়ে গড়ের মাঠে ভিক্টোরিয়ার আত্মার শান্তির জন্য মঙ্গলকামনা করে সংকীর্তন করেছেন। মা, মা বলে চোখের জলে ভিজিয়েছেন তাঁদের বক্ষ। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে কাতারে কাতারে কাঙালিভোজন করানো হয়েছে। নিবেদিতার মায়ের উইম্বল্ডনের ফ্ল্যাটে সান্ধ্য আসরে সে আলোচনাই হচ্ছিল।

সে আসরে আছেন রমেশচন্দ্র দত্ত। প্রাক্তন সিভিলিয়ান এই বাঙালি ভদ্রলোক এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়ে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ইতিহাসের ওপর অধ্যাপনা করছেন। অবসর সময়ে ইংরেজ ভারতের ইকনমিক হিস্ট্রি নিয়ে করছেন গবেষণা। অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান ও বহুপাঠী মানুষটি আজকাল মাঝে মাঝে আসছেন জগদীশ, নিবেদিতা ও অবলাকে সঙ্গ দিতে। মাথাজোড়া সুবিশাল টাক রমেশবাবুর। পরিষ্কার কামানো মুখ। গোল চশমার ফাঁক দিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ উঁকি মারছে। নিবেদিতার ড্রয়িংরুমে বসে আছেন সকলে। হাতে হাতে ঘুরছে চায়ের কাপ, কেক আর স্কোনের প্লেট।

নীরবতা ভঙ্গ করলেন নিবেদিতা, বেয়ার্ন, তোমাদের ভারতীয়দের নিয়ে আর পারা গেল না!

কে?

হারানির মৃত্যুতে সবার শোক যে উথলে উঠেছে! ভারতের লোক কি জানে যে, ব্রিটিশরা কীভাবে তাদের চুষছে?

রমেশবাবু বললেন, ঠিকই বলেছেন আপনিআমরা রাজভক্ত, মাতৃভক্ত জাত আমি তো এ নিয়ে রিসার্চ করছি। আমি তো জানি যে ব্রিটিশরা ঝেড়ে ফাঁক করে দিচ্ছে আমাদের। চুষে চুষে আর কোনো পদার্থ ফেলে রাখছে না। বাংলার তাঁত ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। সেই তাঁতিদের আঙুল ওরা কেটে দিল যাতে ম্যানচেস্টারের কাপড়ের কল চলতে পারে। জমির ওপর এমন ট্যাক্স ব্যাটারা বসিয়েছে যে, বছর বছর দুর্ভিক্ষ

নিবেদিতা বললেন, ডিজরেইলিকে কি ঘেন্নাটাই যে করি! ওটাই তো আদি শয়তান!

প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলিই ভিক্টোরিয়াকে ভারত সম্রাজ্ঞী ঘোষণা করেছিলেন।

ডিজরেইলিকে পছন্দ করেন না আপনি?

রমেশচন্দ্রের প্রশ্নে ক্ষেপে গিয়ে গর্জে উঠলেন নিবেদিতা, কোনো দিন না নাথিং বাট এ ক্লেভার বাস্টার্ড। কোন প্রিন্সিপল নেইব্রিটিশ রাজনীতিতে একমাত্র ভদ্রলোক হলেন গ্ল্যাডস্টোন। উনি অন্তত আইরিশদের জন্য ভাবতেন। আর আমাদের মহারানি তাঁকেই পছন্দ করতেন না

গ্ল্যাডস্টোনের সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার সত্যিই বনত না। দু-চক্ষে রানি দেখতে পারতেন না এই উদারনীতিবাদী রাজনীতিককে। অন্যদিকে ঘোর সাম্রাজ্যবাদী ডিজরেইলিকে খুব পছন্দ করতেন তিনি আর ডিজরেইলি ভিক্টোরিয়াকে ভারত সম্রাজ্ঞী করেইছিলেন যাতে মাতৃভক্ত ভারতীয়দের আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে যে, এ ব্যাপারে ব্রিটিশদের চতুর চাল সফল। ভিক্টোরিয়ার প্রয়াণে ভারতীয়রা সত্যিই মা, মা করে কেঁদে ভাসাচ্ছে।

নিবেদিতা বলে চললেন, মাতৃমূর্তি! মাই ফুট! দ্য ওয়ার্ল্ড কান্ট বি ফুল্ড বাই বুলশিট অ্যালোন। মহান ব্রিটিশরা বুয়র যুদ্ধ আর চিনে কী করছে? দুনিয়াটাকে ধর্ষণ করছে ওরা আর আমাদের মহারানি টুঁ শব্দটি করেননি

ব্রিটেনে বাকস্বাধীনতা থাকলেও রানীর মৃত্যুর পরপরই এতটা স্পষ্টবাদিতা শোভন নয় এবং সম্ভবত নিরাপদও নয়। নিবেদিতার অতিথিরা প্রমাদ গুনলেন। কথা ঘোরাতে রমেশচন্দ্র বললেন, গদীশবাবু, চুপচাপ দেখছি? শরীর ঠিক আছে তো? কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে আপনাকে?

জগদীশচন্দ্র ম্লান হাসলেন। অস্ত্রোপচার থেকে সেরে উঠলেও তাঁর মনমেজাজ ভালো নেই। বললেন, মেশবাবু ভাল আর থাকি কী করে?

কে? কী হয়েছে?

সে দিন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ড. ওয়ালারের ল্যাবরেটরি দেখতে গিয়েছিলাম। দেখে মশাই চোখ ছানাবড়া

নিবেদিতা অল্পস্বল্প বাংলা বোঝেন, বললেন বেয়ার্ন হোয়াট ইজ ছানাবড়া?

অবলা বললেন, সিস্টার আমি আপনাকে পরে বুঝিয়ে দিচ্ছি

জগদীশ বলে চললেন, কী ল্যাব, মশাই! উনি রয়েছেন, সঙ্গে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, তাদের মধ্যে আবার একজন ডি এসসি! এ ছাড়া রয়েছেন ওনার স্ত্রী! এই চারজন ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত খাটছেনল্যাবের মধ্যেই এককোণে খাবার আয়োজন যাতে কিছুমাত্র সময় নষ্ট না হয় !

র ল্যাবটা কী রকম?

সে মশাই বলে কাজ নেই, দেখলে মাথা ঘুরে যায়। কীসব ইন্সট্রুমেন্ট! স্বপ্নের মতো সব কিছু! যে এক্সপেরিমেন্টই করছেন সাথে সাথে ফোটো তুলে রেকর্ড করে ফেলছেন। দেখে নিজেকে কীরকম ফেকলু মনে হচ্ছিল। কলকাতায় তো জানেন কী অসম্ভব কষ্টের মধ্যে রিসার্চ করে চলেছি। পয়সা নেই, গ্রান্ট নেই, অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই, তার ওপর আবার পড়ানোর চাপ। প্রেসিডেন্সি কলেজের হোমরাচোমরারা তো চায় না আমি রিসার্চ করি। ব্যাটা ওয়ালার কী বলল জানেন?

কী?

বলে বো, আমি প্রোফেসরের চাকরি ছেড়ে দিতে চাই। সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টা লেকচার দিতে হয়। আমি সামলাতে পারছি না। মাই রিসার্চ ইজ সাফারিং। বুঝে দেখুন মশাই, সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টা লেকচার দিয়েই কাহিল হয়ে পড়ছে আর আমি? আমাকে তো সপ্তাহে কুড়ি-বাইশ ঘণ্টা লেকচারেই নষ্ট করতে হয়

তা আপনি এ দেশে কাজ পেতে পারেন না?

অবলা বললেন, মেশবাবু ও তো ইচ্ছে করলেই এখানে কাজ পেতে পারে। কেম্ব্রিজে প্রোফেসরের পোস্ট তো ওকে অফার করা হয়েছিল। ওই তো জেদ করে নিল না

কেন জগদীশবাবু?

জগদীশচন্দ্র বিষণ্ণ হাসলেন। উত্তর দিলেন না।

অবলা বললেন, জানেন তো কীরকম একগুঁয়ে লোক। বলে আমি বিলেতে থেকে গেলে ভারতের সায়েন্সের কী হবে? সেখানে যে নিত্য লাথিঝ্যাঁটা খাচ্ছে, সে খেয়াল নেই

বোঝাই যায় যে বিলেতে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে বসু দম্পতির মধ্যে দ্বিমত আছে।

জগদীশ কথা ঘোরাতে বললেন, তা ছাড়া রমেশবাবু আরেকটা ব্যাপারেও আমি ভীষণ মানসিক অশান্তিতে আছি

কী রকম?

. ম্যুরহেডের নাম শুনেছেন আপনি?

সেই ম্যুরহেড যে একটা ইলেকট্রিকাল কোম্পানি খুলেছে? সে তো খুব বিখ্যাত আর ধনী লোক মশাই!

হ্যাঁ, কোটিপতি। টাকার কুমির বললেও চলে। সেই ম্যুরহেড মাঝে একটা বিপদে পড়ে আমার কাছে এসেছিল। কোহেরার আর টেলিগ্রাফ রিসিভার সংক্রান্ত সমস্যা। তা আমি তো সেটা সলভ করে দিয়েছি। সাহেব খুব খুশি। একেবারে গদগদ। বলে, বো, তোমার এসব রিসার্চ বাইরে পাবলিশ কোরো না। এতে টাকা আছে বোস, অনেক অনেক টাকা। পেটেন্ট নাও বোস, পেটেন্ট নাও। আমি পুরো ব্যাপারটা ফিনান্স করবো, আধাআধি বখরা

ভালোই তো, টাকা রোজগার করা তো খারাপ কিছু নয়, জগদীশবাবু

মেশবাবু, আপনি ঠিক বুঝবেন না। আমি পিওর সায়েন্সের লোক। আমি এখন জ্ঞানের একটা সম্পূর্ণ নতুন জগতে এসে পৌঁছেছি। আশ্চর্য নতুন সব তত্ত্ব আমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। কিন্তু তার জন্য একাগ্র হয়ে ধ্যান করতে হবে, রমেশবাবু। করতে হবে সাধনা। সেই একাগ্রতা কোনোভাবে যদি ভঙ্গ হয়, রমেশবাবু, তাহলেই সর্বনাশ। খেই হারিয়ে ফেলব, সুত্র ছিঁড়ে যাবে। একবার অর্থকরী দিকে দৃষ্টি গেলে আমার সেই সত্য দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে

এ কথা সাধারণ মানুষের নয়। সত্যি সত্যি অসাধারণ কোনো ব্যক্তিই এভাবে কথা বলতে পারেন। রমেশচন্দ্র, অবলা এবং নিবেদিতা অবাক বিস্ময়ে জগদীশচন্দ্রের কথা শুনতে লাগলেন।

জগদীশ বললেন, মি ফিজিক্স আর বায়োলজির এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, রমেশবাবু। একের পর এক সত্য বিদ্যুতের মতো আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি দেশ থেকে এখানে আসার সময় জানতামও না কী বিশাল, অনন্ত বিষয়ে আমি হাত দিয়েছি। যে দিকে চাই, সেদিকেই দেখি অনন্ত আলোকরেখা। জন্মজন্মান্তরেও এ আমি শেষ করতে পারব না, রমেশবাবু। কোনটা ছেড়ে যে কোনটা ধরি! এ দিকে সময় ফুরিয়ে আসছে। মাঝে শরীর হয়ে গেল খারাপ

কিছু পাবলিশ করতে পেরেছেন?

সেখানেও তো মুশকিল, মশায়। এক বৈজ্ঞানিক বন্ধু বললেন, ই অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারের সামনে আপনি মাথা ঠান্ডা রাখছেন কীভাবে? জীবনের কথা কে বলতে পারে? আমরা আজ আছি কাল নেই। দিন রাত পেপার লিখুন, পাবলিশ করুন সত্যিই তো! জীবনের কথা কে বলতে পারে! আজ আছি, কাল নেই। সদ্য অসুখ থেকে সেরে উঠে সেই ভয়ই তো ধরে গেছে, মশাই!

তো তাই করুন না?

সেখানেও ত ব্যাগড়া, মশাই। অনেক ভালো ভালো লোক যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি যেমন লর্ড র‍্যালে, প্রোফেসর অলিভার লজ, এঁরা বলছেন উল্টো কথা

কী বলছেন তাঁরা?

বলছেন, প্রোফেসর বোস, আপনার থিওরি এতই নতুন, এতই চমকপ্রদ যে লোকে এত সারপ্রাইজ একসাথে নিতে পারবে না। এটাই হিউম্যান নেচার। ধীরে চলুন, . বোস, ধীরে। ফিজিসিস্টরা এ দেশে ফিজিওলজি বোঝেন না। ফিজিওলজিস্টরা বোঝেন না ফিজিক্স। সবাই নিজের নিজের মত নিয়ে আছেন। এর মধ্যে যদি আবার আপনি সাইকোলজি, মেমরি এ সব আমদানি করেন তাহলে তো সব আরো ঘেঁটে যাবে। লোকে আপনাকে ড্রিমি বলবে ড. বোস। বলবে স্বপ্ন দেখছেন আপনিপ্রথমে শুধু ফিজিক্যাল বিষয় পাবলিশ করুন

নিবেদিতা অত্যন্ত আগ্রহভরে দুজনের কথোপকথন শুনছিলেন। জগদীশকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন নিবেদিতা কিন্তু একটা কথা তাঁর বার বার মনে হচ্ছে। সেটাই বলে ফেললেন তিনি, বেয়ার্ন, আপনাকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়েও জিগ্যেস করছি যে, পেটেন্ট নেবার অসুবিধাটা কোথায়?

জগদীশ বললেন, সিস্টার, আমি বিশ্বাস করি যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সারা মানব জাতির উপকারের জন্য, সারা দুনিয়ার জন্য। এ থেকে ব্যক্তিগত মুনাফা করাটা ঠিক নয়

নিবেদিতা শুনে মুখ ভার করে বসে রইলেন। বললেন, হ্যাঁ, খুবই আদর্শবাদী কথাবার্তা, বেয়ার্ন তবে খুব প্র্যাক্টিকাল নয়

বোঝাই গেল যে, জগদীশের বক্তব্য নিবেদিতার পছন্দ হয়নি।

রমেশচন্দ্র সহাস্যে বললেন, ই সি আ প্যারাডক্স হিয়ার!

কে?

পনি সিস্টার, হিন্দু সন্ন্যাসিনী হয়ে পেটেন্টের পক্ষে ওকালতি করছেন!

রমেশচন্দ্রের বক্তব্যে মুচকি হাসলেন নিবেদিতা, মি হিন্দু সন্ন্যাসিনী হতে পারি, মিস্টার ডাট কিন্তু ভুলবেন না যে, আমার দেহে বইছে পশ্চিমের রক্ত!

জগদীশ বললেন, মেশবাবু এ দেশে লোকে টাকা টাকা করে একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছে। টাকার ওপর কী মায়া! কী সর্বগ্রাসী লোভ! ম্যুরহেড লোকটা কোটিপতি, টাকার কুমির। তবু আরো কিছু লাভ করার জন্য ভিক্ষুকের মতো আমার কাছে আসছে। দেখে ঘেন্না ধরে যায়, মশাই। অথচ টাকার দরকার যে আমার নেই, তাও নয়। এই বিদেশে পড়ে আছি। চিকিৎসার খরচা যোগাচ্ছেন এক দয়াবতী। তাঁর কাছে অসীম ঋণে আমি ঋণী। এই উইম্বলডনের বাড়িতে যে পড়ে আছি তাও তো সিস্টারের সৌজন্যে। কিন্তু পেটেন্ট নেওয়ার প্রশ্নে আমার মনপ্রাণ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। যাতে সর্বসাধারণের মঙ্গল তাকে আমি ব্যক্তিগত লাভের কাজে লাগাব?

রমেশচন্দ্র বললেন, গদীশবাবু, আপনি বয়েসে আমার থেকে অনেক ছোটো, তবু আপনার কথা শুনে আপনাকে প্রণাম করতে ইচ্ছে হচ্ছেএ তো সাধারণ কোনো মানুষের কথা নয়। আমাদের উপনিষদের মুনিঋষিরা এ কথা বলতেন। তারই প্রতিধ্বনি শুনছি আপনার কণ্ঠে

এই কথোপকথনের পর সবাই নীরব রইলেন। সবাই বুঝতে পারছিলেন খুব বড়ো কিছু কথা অত্যন্ত মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জগদীশচন্দ্রের মুখ থেকে উৎসারিত হয়েছে। নিবেদিতা এমনিতে দুর্মুখ ও স্পষ্টভাষী। পেটেন্টের ব্যাপারে জগদীশের সঙ্গে একমত নন তিনিতবুও অসীম শ্রদ্ধায় তিনি চুপ করে রইলেন।

নীরবতা ভঙ্গ করলেন রমেশচন্দ্র। বললেন, সিস্টার, আপনি জগদীশবাবুকে বেয়ার্ন বলে ডাকেন কেন?

মি. ডাট, বেয়ার্ন মানে স্কটিশ ভাষায় হল বাচ্চা ছেলেদুধের শিশু। আমার কাছে প্রোফেসর বোস বাচ্চা ছেলে ছাড়া আর কিছু নন

অবলা বললেন, ঠিক বলেছেন, সিস্টার! ও একটা শিশু ছাড়া কিছু নয়। ওর বাড়ির ডাক নাম কী জানেন? জানেন কী নামে ওর বোনরা ওকে ডাকে?

জগদীশচন্দ্র লজ্জা পেয়ে বললেন, বলা, বেমক্কা কিছু ফাঁস করে দিয়ো না!

কে, ফাঁস করব না কেন? তোমাকে ভয় করি নাকি? সিস্টার, বাড়িতে ওকে ডাকে খোকাসেটার মানেও হল বাচ্চা ছেলে

নিবেদিতা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন, হাউ লাভলি! হাউ সুইট! খোকা! খোকা! খোকা! বেয়ার্ন এবার থেকে আপনাকে আমি খোকা বলে ডাকব!

দুই নারীর যুগপৎ আক্রমণে লজ্জিত জগদীশচন্দ্র ঘর ছেড়ে পালালেন। অট্টহাস্য করে উঠলেন রমেশচন্দ্র, কেন ফালতু ফালতু এত ভালো মানুষটার পেছনে লাগছেন?

এবার বিদায়ের পালা। ঘর ছেড়ে বেরনোর আগে রমেশচন্দ্র বললেন, সিস্টার, হাউ ইজ স্বামীজি?

নি কলকাতায় ফিরে গেছেন ভালোই আছেন শুনেছি

পনি কী জানেন আমরা আত্মীয়?

রিয়েলি?

চোখ কপালে তুললেন নিবেদিতা। স্বামী বিবেকানন্দের যে কোনো জ্ঞাতি-গুষ্ঠির ওপরই অসম্ভব শ্রদ্ধা আর মমতা তাঁর।

মি রমেশ চন্দ্র ডাট, উনি নরেন্দ্র নাথ ডাট। আমরা জ্ঞাতি! আমার সাথে ওরু ডাট, তরু ডাট এবং এমনকী মাইকেল মধুসূদন ডাটের সঙ্গেও সম্বন্ধ রয়েছে! অল ডাটস আর রিলেটেড টু ইচ আদার!

বংশগরিমা নিয়ে কিঞ্চিৎ বাগাড়ম্বর করার পর রমেশচন্দ্র দত্ত চলে গেলেন।

শীতের সন্ধ্যা। বাইরে ঘন অন্ধকার। কনকনে ঠান্ডা। ফ্ল্যাটের ভেতর অবশ্য গনগনে ফায়ারপ্লেসের জন্য বিরাজ করছে আরামদায়ক উষ্ণতা। জগদীশচন্দ্র নিজের ঘরে বসে গবেষণাপত্রে ডুবে আছেন। রান্নাঘরে অবলা নিবেদিতাকে ছানাবড়া তত্ত্ব বোঝাতে লাগলেন।

 

 

বালিগঞ্জ জায়গাটা আদত কলকাতার মধ্যে পড়ে না। বেশি ঘরবসতও নেই সেখানে। আছে শুধু বড়ো বড়ো বাগান, জমি আর জলা জায়গা সন্ধেবেলা শিয়াল ডাকে। অর্ধেক জমির মালিক লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যারিস্টার তারকনাথ পালিত। ইনিই রবীন্দ্রবান্ধব লোকেন পালিতের পিতৃদেব। তারকবাবু বালিগঞ্জে লোকবসতি করাতে লাগলেন। নিজের বাগান আর জমিজায়গা টুকরো টুকরো করে বেচতে লাগলেন বন্ধুদের মধ্যে।

সরলাদেবীর বাবা জানকীনাথ ঘোষাল আগে থাকতেন কাশিয়াবাগানে। পরে তিনি সরে এলেন ৩ নং সানি পার্কে। বাড়ি বানালেন নিজের। পাশেই ৬ নং সানি পার্কে আশুতোষ চৌধুরী বাড়ি করলেন। ৬নং স্টোর রোডে বাড়ি করলেন দুঁদে আইসিএস কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত তিনি আবার সম্পর্কে গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেনের মামা তথা শ্বশুর১৯নং স্টোর রোডে পুরোনো বাড়ি কিনলেন সরলার মেজোমামা আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইন্দিরা দেবী ও প্রমথ চৌধুরীর বিয়ে হলে প্রথমে তাঁরা ১৪ নং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে থাকলেও পরে উঠে গেলেন ব্রাইট স্ট্রিটে নিজেদের বাড়িতে। সরলার দিদি হিরণ্ময়ী এলেন হাজরা রোডে। এভাবে দেখতে দেখতে বালিগঞ্জের আশপাশে বেশ একটা কলোনি গড়ে উঠল। এঁরা প্রায় সবাই ইঙ্গবঙ্গ, অভিজাত, উচ্চশিক্ষিত, ধনবান। মজার ব্যাপার হল এঁদের অনেকেরই আদি বাড়ি পূর্ববঙ্গে।

এঁরা অনেকেই হ্যাট, কোট পরেন। ইংরেজি বুকনি ঝাড়েন। তবে মাছ-ভাতের অভ্যেসটা এখনো ছাড়তে পারেননি।

সরলার বয়েস এখন আঠাশ। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের এর অনেক আগেই বিয়ে হয়ে যায়। বাচ্চাকাচ্চাও হয়ে যায় তাদের। কিন্তু সরলা অন্য ধাতুর। ভারতী সম্পাদনার কাজে সে মশগুল। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেম ও সম্ভাব্য বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল। সুসাহিত্যিক এবং সুরসিক প্রভাতকুমার ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য জানুয়ারি মাসের শুরুতে বিলেত চলে গেছেন। অদ্ভুত ব্যাপার হল যাওয়ার আগে কাউকে কিছু জানাননি। এমনকী সরলাকেও নয়। কোনো চিঠিও এখনো পর্যন্ত আসেনি তাঁর কাছ থেকে ।

কলকাতায় স্বল্পস্থায়ী শীতের মরশুম কেটে গিয়ে বসন্তের আভাস দেখা যাচ্ছে। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে কোকিলের কুহু রব।

সরলার মাথায় নানা চিন্তা সব সময় ঘুরছে।

চ্ছা, শ্রীপঞ্চমীর দিন বসন্ত উত্সব করলে কেমন হয়? এই ইঙ্গবঙ্গ আধা সাহেবগুলোর মধ্যে কিঞ্চিৎ বাঙালিয়ানা ঢোকানো যাকবেশ একটু গানবাজনা হবে। অতুলপ্রসাদ সেন আছেন কলকাতায়। তাঁর সঙ্গে সম্প্রতি আলাপ হয়েছে সরলার। বছর তিরিশেকের অতুলপ্রসাদও বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে এসেছেন। প্র্যাকটিস অবশ্য সেভাবে জমেনি এখনো। গানবাজনায় মশগুল হয়ে আছেন তিনি। এই উপলক্ষ্যে ডাকা যাক তাঁকেও।

অতুলপ্রসাদ তরুণ ব্রাহ্মদের মধ্যে পড়েন। বাবা রামপ্রসাদ সেন যখন মারা যান, তখন তিনি নিতান্তই শিশু। ওপরে আরও তিন দিদি। অকূল পাথারে পড়ে যান বিধবা মা হেমন্তশশী। চারটি নাবালক পুত্র কন্যা নিয়ে ভাইদের সংসারে তখন তিনি গলগ্রহ। এমতাবস্থায় হেমন্তশশী এমন একটা সিদ্ধান্ত নেন যা উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা, তথা বাংলা, তথা ভারতের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ও দুঃসাহসিক। ব্রাহ্ম সমাজের একজন তেজস্বী আইনজীবী ও সমাজ সংস্কারক হলেন দুর্গামোহন দাশস্ত্রী ব্রহ্মময়ীর মৃত্যুর পর তিনি বিগতদার। তাঁরও অনেকগুলি ছেলেমেয়ে। সেই দুর্গামোহনকে বিয়ে করতে সম্মতি দিলেন হেমন্তশশীশর্ত একটাই। তাঁর নাবালক পুত্রকন্যার দায়িত্ব নিতে হবে দুর্গামোহনকেবিপত্নীকের সঙ্গে বিধবার এই বৈপ্লবিক বিবাহবন্ধনে বাংলাদেশে সেদিন যে ঝড় উঠেছিল, তা অকল্পনীয়। অনেকেই সামাজিক বয়কট করেছিলেন দম্পতিকে। অবশ্য একরোখা, তেজস্বী দুর্গামোহন ও হেমন্তশশী এ সব গ্রাহ্যের মধ্যে আনেননি।

অতুলপ্রসাদ তার পর বড়ো হয়েছেন। কৃতিত্বের সঙ্গে ব্যারিস্টারি পাশ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও মায়ের মতই কণ্টকাকীর্ণ। কারণ প্রেমে পড়ে যে নারীকে বিয়ে করেছেন অতুলপ্রসাদ তিনি তাঁর নিজের মামাতো বোন। নামেও মায়ের সঙ্গে মিল। হেমকুসুম। হেমকুসুম-অতুলপ্রসাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে গ্রেটনা গ্রিনে। বিলেতের একমাত্র ওখানেই এ ধরনের অসামাজিক মিলনকে সামাজিক শিলমোহর দেওয়া হয়।

বিলেতফেরত অতুলপ্রসাদ এখন কলকাতায় সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের জুনিয়র। প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। খুব একটা যে জমছে তা নয়। পায়ের নীচে মাটি খুঁজছেন অতুলপ্রসাদ। মাঝে মাঝে রংপুরে গিয়েও প্র্যাকটিস করেন।

তবে ব্যারিস্টারি ছাড়াও অতুলের একটা বড়ো পরিচয় আছে। অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন গীতিকার ও সুরকার তিনি। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলালদের খামখেয়ালি সভার উৎসাহী সক্রিয় সভ্য। বস্তুত, মাঝে মাঝে অতুলপ্রসাদ বুঝেই উঠতে পারেন না যে, তাঁর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র কোথায়। বার লাইব্রেরির ভূভার বৃদ্ধি করা, নাকি বাংলা গানের জগতে তাঁর নিজের স্বকীয়তা ফুটিয়ে তোলা। তবে সেটা যে খুব সহজ কাজ নয়, তাও মানেন অতুলপ্রসাদ। বাংলা গান এখন একটা জোয়ারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একঝাঁক প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন স্রষ্টা ঝলমল করছেন। আছেন রবিবাবু, দ্বিজুবাবু। রবিবাবুর নাম শুনলেই তো হৃৎকম্প হয় অতুলপ্রসাদের। কী প্রতিভা ভদ্রলোকের! গানের কথা, সুর, ভাব সবই কেমন অদ্ভুত নতুন ধরনের। ওঁদের জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা ভীষণ ট্যালেন্টেড। যেমন সরলা। মেয়েটা যেন সবসময় ফুটছে! লিখছে, সুর দিচ্ছে, পিয়ানো বাজাচ্ছে, স্বরলিপি করছে, পত্রিকা চালাচ্ছে!

তাই সরলার কাছ থেকে যখন বসন্ত উৎসবের আমন্ত্রণ এল, তখন তা সাদরে গ্রহণ করলেন অতুলপ্রসাদ। যাবেন তিনি সস্ত্রীক। সঙ্গে নেবেন বিধবা মাকেও। হ্যাঁ, আবার বিধবা হয়েছেন হেমন্তশশী। বছর দুয়েক হল মারা গেছেন স্বামী দুর্গামোহন দাশ।

সরলার আমন্ত্রণপত্রে অভিনবত্ব রয়েছেওপরের পৃষ্ঠায় লেখা বসন্তোৎসবভেতরের পাতায় নেমন্তন্নের সঙ্গে ফুটনোটে এক লাইন লেখা : মেয়েদের বাসন্তী রঙের শাড়ী বা ব্লাউজ পুরুষদের পরিচ্ছদের কোথাও না কোথাও একটুখানি বাসন্তী রঙের আভাস ধারণ বাঞ্ছনীয়

সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে মেয়েরা বাসন্তী রঙের সুন্দর সব শাড়ি পরে এসেছেন পুরুষেরা কেউ এসেছেন ধুতি- চাদরের সঙ্গে বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি পরে । কোনো কোনো প্রবল ইঙ্গবঙ্গ এসেছেন কোট-প্যান্ট পরেই তবে কণ্ঠে ধারণ করেছেন বাসন্তী রঙের টাই। তাদের বুকপকেট থেকে উঁকি মারছে বাসন্তী রুমাল।

বড়ো হলঘর সুদৃশ্য সোফাসেট দিয়ে সাজানো। মাঝখানে নিচু, গোল কাশ্মীরি টেবিল। দেওয়ালে ঝোলান অবনীন্দ্রনাথের ছবি। ঠাকুর পরিবারের এই তরুণ প্রতিভা ইতিমধ্যেই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অন্যদিকে একটা পিয়ানো। এ বাড়িতে টানাপাখার ব্যবস্থা নেই। অতিথিদের জন্য লেস দিয়ে মোড়া হাতপাখা আছে বেশ কয়েকটা।

প্রত্যেক সোফার সামনে পাতা ছোটো ছোটো টুল। তার ওপর রয়েছে জলের গেলাস, চুরুটের বাক্স এবং দেশলাই।

এ ধরনের সমাবেশে প্রথমে যা হয়, তাই হল। পুরুষ ও মহিলারা আলাদা হয়ে গল্পগুজব করতে লাগলেন। মহিলামহল থেকে মাঝে মাঝেই উচ্চকিত হাসির মূর্ছনা শোনা যেতে লাগল।  অতুলপ্রসাদের পাশে বসেছেন আর এক তরুণ সমবয়েসি ব্যারিস্টার। ইনি দুর্গামোহন দাশের ভাইপো। নাম চিত্তরঞ্জন দাশচিত্তরঞ্জনও অতুলপ্রসাদের মতোই বিলেতফেরত। প্র্যাকটিস জমছে না তাঁরও। দুই ব্রিফলেস ব্যারিস্টারের মধ্যে কাজ সংক্রান্ত আলাপ চলতে লাগল

চিত্তরঞ্জন বললেন, তুল, সত্যেন্দ্রবাবুর কাছে সুবিধে কিছু হচ্চে?

না, দাদা। বড়ো কঠিন ঠাঁই। আপনার কী অবস্থা?

চিত্তরঞ্জন হাত উল্টোলেন, তোমারি মতোতৃষিত চাতকের মতো মক্কেলের জন্য বসে থাকি। এখনো তেমন জমেনি

মি তো দাদা ভাবছি কলকাতার বাইরে যদি কিছু করা যায়। মাঝে মাঝে রংপুরের কোর্টে প্র্যাকটিস করি বটে, কিন্তু কোথাও জমিয়ে বসতে হবে

কোনো সন্ধান আছে তোমার?

মার ইংল্যান্ডের দুই বন্ধু আছে লখনউতে, মমতাজ হোসেন আর আলি আওসাদ। খুব ভালো ছেলে। বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় আলাপ হয়েছিল। ওরা খুব ধরেছে, ওদের লখনউয়ের বারে যোগ দেবার জন্য

লে যাবে তাহলে?

ভাবছি দাদা। কলকাতা ছেড়ে যাওয়াটা কি চাট্টিখানি কথা! তাছাড়া

তাছাড়া?

পনি তো জানেন যে, গান আমার প্রাণের কতটা জুড়ে রয়েছে। কলকাতা ছেড়ে বিদেশবিভূঁইতে গেলে তার খোরাক কতটা জোটাতে পারব?

খনউয়ের সংস্কৃতি কিন্তু খুব সমৃদ্ধ, অতুল। ওদের খেয়াল আর ঠুমরি তো অনবদ্য!

তা ঠিক অবশ্য

ভৃত্যরা এর মধ্যে হাতে হাতে মিষ্টি, শরবত আর কুলপি মালাই দিয়ে গেছে। 

কিছুক্ষণ বাদেই সরলার আবির্ভাব। সরলা এই উপলক্ষে খুব সুন্দর বাসন্তী রঙের ঢাকাই শাড়ি পরেছে। মহার্ঘ ফরাসি সুগন্ধির সৌরভ ছড়াচ্ছে তার অঙ্গ থেকে। পিয়ানোয় বসে সে ঝংকার তুলল :

হে সুন্দর বসন্ত বারেক ফিরাও

আজি মধুর অতীত কাল

সুন্দর গলা সরলারগায়ও দরদ দিয়েপিয়ানোর ঠুং ঠাং এর সঙ্গে তার সাবলীল সুরেলা গলা মিশে সভায় মোহাবেশ ছড়িয়ে দিল। গান শেষ হলে করতালির ঝড় বয়ে গেল। সরলার গর্বিত পিতা জানকীনাথ ঘোষাল বললেন, পনারা জানেন, সরলা এবার একটা দুর্লভ সম্মান পাচ্ছে

কী সম্মান?

বার কংগ্রেসের অধিবেশন কলকাতায়সেখানে সরলা মা আমার উদ্বোধনী সংগীত পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পেয়েছে

সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে সরলাকে অভিনন্দিত করলেন। একজন নারীর পক্ষে সত্যিই দুর্লভ সম্মান। অতুলপ্রসাদ অভিভূত কণ্ঠে বললেন, বা! সরলা দেবী, গানটা কার লেখা?

মার অতুলবাবু। আমিই কম্পোজ করেছি এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে। কেমন হয়েছে?

দারুণ! অসাধারণ! আরেকটা গান!

সবে ভুলছি না অতুলবাবু। এবার আপনাকে গাইতে হবে!

বে! হবে!

তুলপ্রসাদ সলজ্জ হাসলেন

সবার অনুরোধে এবার সরলা এবার একটা খাতা বের করল। ইউরোপীয় সংগীত লেখার পাণ্ডুলিপি খাতা। ওপরে সুন্দর করে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা আছে: Socatore—Composed by Sorola

সরলা জিগ্যেস করল, টা কার হাতের লেখা জানেন?

কা? সমবেত কণ্ঠে প্রশ্ন এল

বিমামার আমার বারো বছরের জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন

ঠাৎ?

বিমামার একটা ব্রহ্মসঙ্গীত আছে—সকাতরে কাঁদিছে সকলে ওটাকে আমি ওয়েস্টার্ন একটা বাজনায় কনভার্ট করেছিলাম রবিমামা শুনে এই খাতাটা দিয়ে বললেন, রলা, এইতে লিখে রাখ, নইলে ভুলে যাবি

অতুলপ্রসাদ বললেন, কী সাংঘাতিক ট্যালেন্ট আপনার! বাজান! বাজান!

সকলের অনুরোধে সরলা এবার সেই ওয়েস্টার্ন মিউজিক পিসটা বাজাল শুনে বোঝার উপায় নেই যে এটা দেশি গানের থেকে নেওয়া। উদারা, মুদারা, তারায় বিস্তৃত কর্ডের বহুস্বরের বৈচিত্র্যের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে আসল সুরটা উঁকিঝুঁকি মারছে।

অভিভুত অতুলপ্রসাদ বললেন, পূর্ব ! খাতাটা যত্ন করে রেখে দিন, সরলা দেবী। হারায় না যেন! বাংলা গানে কর্ড প্রয়োগে আপনার পথিকৃতের অবদান একদিন সবাই মানবে তাহলে

এবার অতুলপ্রসাদের পালা। ভরাট মধুর কণ্ঠে তিনি শুরু করলেন :

আজি স্বরগ আবাস তুমি এস ছাড়ি।

আজি বরষে বরষা বিরহ বারি !

আজি ফুলে নাহিক মধুগন্ধ,

মলয়ে নাহিক মৃদু মন্দ,

জীবনে নাহিক গীত ছন্দ

তোমারে ছাড়ি।

সরলা পিয়ানোয় সঙ্গত করছিল গান শেষ হলে মুচকি হেসে বলল, সন্তের দিনে বর্ষার গান, অতুলবাবু!

অতুলপ্রসাদ লাজুক হেসে বললেন, বর্ষার গান ঠিক নয়, সরলাদেবী এ বিরহের গান, প্রেমের গান

সরলা বলল, বুঝেছি! তা বিরহের পাত্রী তো কাছেই মজুদ!

হেমকুসুমের মুখটা অল্প রাঙা হয়ে উঠল। সরলাটা যেন কী! মুখের আগল নেই!

এবার অবশ্য সভায় কিঞ্চিৎ রসভঙ্গ হল

বাঙালিদের মধ্যে আজকাল একদল উঠে এসেছেন যাঁরা প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে গান বা কবিতা লেখাটা ন্যাকান্যাকা এবং পৌরুষহীন বলে মনে করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ তেমনই একজন ইনি উর্দুনবিশ কুস্তিলড়েন বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা দু-একবার বম্বে অঞ্চল থেকে ঘুরে এসেছেন

সরলার সেই অরুদাদা হঠাৎ বলে উঠলেন, কী এসব আরম্ভ করেছিস, সরলা? সেই ন্যাকা ন্যাকা প্রেম, বিরহ, বসন্তের গান ! সকাতরে কাঁদিছে সকলে! আরে চৈতন্যদেবের আমল থেকেই তো বাঙালি কেঁদে চলেছে, লাভের লাভ কিছু হয়েছে সে মরাকান্নায়?

সরলার তেজস্বী পিতৃদেব জানকীনাথ ঘোষাল সায় দিয়ে বললেন, ঠি! ঠিক! ঠিক বলেছেন, অরুবাবু!

অরুণেন্দ্রনাথ উৎসাহ পেয়ে গেলেন। বললেন, জানকীবাবু, বম্বে থেকে ফিরছি। পশ্চিমে কুলিরা কী রকম হাঁকে জানেন? জব্বল- পো-! ইলাহা- বা- ! বক্ --! পট- না - ! গলায় কী জোর তাদের! কী গম্ভীর আওয়াজ ! মনে হয় যেন গাড়িতে ডাকাত পড়েছে!

জানকীনাথ মজা পেয়ে বললেন, র এখানে? বাংলায়?

অরুণেন্দ্রনাথ গলাটাকে মিহি করে বললেন, খানকার কুলিরা ডাকে কনুজংশন! বদ্ধোমান!

সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন

অরুণেন্দ্রনাথ নিজের বাইসেপ ফোলাতে ফোলাতে বলে চললেন, ব্যাটারা এত রোগাপাতলা যে টোকা মারলেই মনে হয় পড়ে যাবে! মেয়ে! মেয়ে! মেয়ের দল সব! কোনো পৌরুষ নেই!

বাগবাজারের শিশিরকুমার ঘোষের ছোটোভাই মতিলাল বিখ্যাত সাংবাদিক অমৃতবাজার পত্রিকাটা তিনিই চালান ইনি কংগ্রেসেরও একজন উৎসাহী সংগঠক

সেই মতিলালও আমন্ত্রিত এবং সভায় উপস্থিত বললেন, কিপলিং পড়েন আপনারা?

কে? কী লিখেছে কিপলিং?

সরলার প্রশ্নে বিষণ্ণ হাসলেন মতিলাল, ওঁ একটা গল্প পড়ছিলাম, বাঙালিদের গালাগালি দিয়ে বাঙালিরা কত কাপুরুষ তাই বর্ণনা করে! পাঠানমুলুকে এক বাঙালি আইসিএস ডেপুটি কমিশনার নিযুক্তহয়েছে গোটা ডিস্ট্রিক্টের ভার তার ওপর হঠাৎ পাঠানরা বিদ্রোহী হয়ে লুঠতরাজ শুরু করেছে। তা সে বাঙালি তো ভয়ে ভেগেছেকেউ খুঁজে পাচ্ছে না। তা পাঠানরা ভদ্রলোককে তো অনেক খুঁজে শেষে বের করেছে তারপর এককোপে তার মুণ্ডু কেটে শূলের ওপর গেঁথে সারা শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছেদ্যাখ, শালা বাঙালি গিদ্ধর!

সরলার মুখ রাগে, লজ্জায় লাল হয়ে উঠল অবরুদ্ধ স্বরে সে বলল, তিলালবাবু, গল্পটা আপনি শুধু পড়ে গেলেন, কিছু করলেন না!

কী করব? সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন মতিলাল ঘোষ

মি হলে ওই ব্যাটা কিপলিংকে ডুয়েলে চ্যালেঞ্জ করতাম! জাত তুলে এত বড়ো অপমান! আমি হলে ছেড়ে দিতাম না!

সরলার মা স্বর্ণকুমারী দেবীএতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন এবার বললেন, থা,পাগলি! কোথায় কী কথা বলিস কোনো ঠিক নেই!

পাগল আমি নই, মা! আমি যা বলি, তাই করি! ওই কিপঅলিংকে আমিই চ্যালেঞ্জ করব, তুমি দেখে নিয়ো!

রিস! করিস! অনেক কিছুই তো জীবনে করলি!

অতুলপ্রসাদ বললেন, লোচনা বড্ড গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে আসুন, বরং একটা দেশপ্রেমের গান গাইএই গানটা সদ্যসদ্য লিখেছি বলেই শুরু করলেন :

উঠ গো ভারতলক্ষ্মী, উঠ আদি জগতজনপূজ্জা

দুঃখদৈন্য সব নাশী, কর দূরিত ভারতলজ্জা ।

ছাড় গো ছাড় শোকসজ্জা

পর সজ্জা

পুনঃ কমলকনকধনধান্যে

গানটা বেশ বড়োঅতুলপ্রসাদ গাইছেনও চোখ বুজে দরদ দিয়ে।

সরলা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া ভুলে পিয়ানোয় সঙ্গত করে চলেছেঅপরিচিত সুর, অপরিচিত গানের তালে তালে বাজাতে পোক্ত সেগান শেষ হওয়ার পর মুগ্ধ হয়ে সে বলল, বাঃ, অপূর্ব! সুরটা কোথায় পেলেন, অতুলবাবু?

লুন তো কোথায়? চোখ নাচিয়ে জবাব দিলেন অতুলপ্রসাদ।

টা দেশি সুর নয়। সুর আমি বুঝি, অতুলবাবু। দেশি সুরের চলনই এরকম নয়। আপনি যখন গাইছেন—জননী গো লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন বাস দেহ তুলে চক্ষে তখন হঠাৎ সুরটা দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। এ কোনো বিদেশি, ওয়েস্টার্ন সুর

ঠিক বলেছেন সরলাদেবী, কী কান আপনার! এটা একটা ইটালিয়ান সুর। গেল শীতে ময়দানে একটা সার্কাস এসেছিল সেখানে প্রথম বাজনাটা শুনেছিলামতারপর তাতে কথা বসিয়েছি। বিদেশি সুরে স্বদেশি গান!

পনার এই গানগুলোর স্বরলিপি করা আছে তো অতুলবাবু?

না সরলাদেবী। আমি এসব ব্যাপারে একেবারে অগোছালো

সরলা হাসল, ঠিক রবিমামার মতো! ঠিক আছে আমায় দিন, আমি স্বরলিপি করে দেব। শতগান বলে বাংলা গানের একটা সংকলন করছি। তাতে ঢুকিয়ে দেব। আর এই গানটা যদি কংগ্রেসের অধিবেশনে গাওয়াই? আপনার আপত্তি নেই তো?

মি কৃতার্থ বোধ করব, সরলা দেবী। সম্মানিত বোধ করব

গানের আসরের পর পানভোজন। পানভোজনের সময় বাঙালিদের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী রাজনীতির আলোচনা শুরু হল। মতিলাল ঘোষ বললেন, জানকী তুমি এবার কংগ্রেসে কী করছ?

মি সেক্রেটারি, মতিদা। ভূপেন বোসও সেক্রেটারি হয়েছে

ভালোপ্রেসিডেন্ট কি বাংলা থেকে? সুরেন হচ্ছে?

না, এবার বম্বে লবি থেকে প্রেসিডেন্ট হবে। দীনশ ওয়াচার নাম ঠিক হয়েছে

সব ওয়াচা টোয়াচা কোনো ফ্যাক্টর নয়, জানকী। বম্বের আসল লোক হল ফিরোজ শাহ মেহতা। ওই হল কিং মেকার

তা ঠিক

 

গভীর রাতে অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। জুড়িগাড়িতে বসেছেন অতুলপ্রসাদ, পাশে স্ত্রী হেমকুসুম। উল্টোদিকে বসেছেন মা হেমন্তশশী।

গাড়িতে চড়েই রাগে ফেটে পড়লেন হেমকুসুম, সারাটা সন্ধ্যে ওই ঢলানি মাগীটার সঙ্গে আমোদ-ফুর্তি করে কাটিয়ে দিলে ? আমার দিকে নজরই পড়ল না! ঢ্যামনা কোথাকার!

কী বলছ, হেম!

ন্যাকা সেজো না! ওই মাগীটার বয়েসের গাছপাথর নেই! ছেলে চড়িয়ে খায়! বাবা-মারও বলিহারি যাই! এত বয়েস পর্যন্ত ধিঙ্গি করে রেখে দিয়েছে! আর তার সঙ্গে সবার সামনে তোমাকে ঢলাতে হবে? নির্লজ্জ, বেহায়া কোথাকার! খবর্দার ওকে দিয়ে তোমার গানের স্বরলিপি করাবে না! ডাইনি! বিদ্যাধরী! কংগ্রেসেও তোমার গান গাওয়াতে হবে না। ভারি তো গায়িকা ! বাবা কংগ্রেসের সেক্রেটারি হলে ওরকম অনেক সুযোগ পাওয়া যায়!

মায়ের সামনে অতুলপ্রসাদ মহা বিপন্ন বোধ করলেন। সবার অমতেই মামাতো বোন হেমকুসুমকে বিয়ে করেছেন তিনি। পরে বুঝেছেন যে, মহা ভুল হয়ে গেছে। এক তীব্র চণ্ডালে রাগ আছে হেমকুসুমের। বাপ-মায়ের আদুরে মেয়ে হওয়ার কারণে কখনই সেভাবে শাসনও করা হয়নি তাঁকে ছোটোবেলায়। এখন নানা সংঘাতে অতুল-হেমকুসুমের দাম্পত্য জীবন বিষিয়ে যেতে বসেছে।

হেমন্তশশী মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেন, রকম করে কেন বলছ, বউমা ? আমার অতুল তো ওরকম ছেলে নয়!

বরদার মা! আমার আর আপনার গুণধর ছেলের সম্পর্কের মধ্যে ফোঁপরদালালি করতে আসবেন নাতাহলে আপনার সম্মান রাখতে পারব না আমি! আপনিও কিছু কম ঢলানি নন!

মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ঘোড়ার ঠক ঠক পদশব্দের মধ্যে দিয়ে হেমকুসুমের ক্রোধান্ধ কণ্ঠ ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হল : আপনিও কিছু কম ঢলানি নন! আপনিও কিছু কম ঢলানি নন! আপনিও কিছু কম ঢলানি নন!

অতিথি-অভ্যাগতরা চলে গেছেন। ৩নং সানি পার্কে জানকীনাথ ঘোষালের প্রাসাদপম বাড়িও শান্ত। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও সরলার চোখে ঘুম নেই। শয়নকক্ষের নিভৃতে সে শয্যায় এপাশ-ওপাশ করছে। এক সময় বালিশের তলা থেকে একটা ছবি সে বের করল। সুপুরুষ, সুদর্শন এক মানুষ। ফোটোগ্রাফে সরলার দিকে চেয়ে হাসছেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। কাউকে কোনো খবর না দিয়ে এই জানুয়ারি মাসের শুরুতে বিলেত চলে গেছেন তিনি।

তুমি কেন আমায় জানিয়ে গেলে না! কেন জানিয়ে গেলে না! কেন! কেন! কেন!

সারা রাত সরলার ঘুম হল না। নানা বিপ্রতীপ চিন্তায় মনের মধ্যে ঝড় বইছে তাঁর। সে চিন্তার অনেকখানি জুড়ে আছে প্রভাতকুমারের বিশ্বাসঘাতকতা। রয়েছে রাডিয়ার্ড কিপলিং-এর বাঙালিবিদ্বেষ এবং সে ব্যাপারে কী প্রতিশোধ নেওয়া যায়, সেই জল্পনা। এবং অবশ্যই গান। অতুলবাবু চমৎকার কম্পোজার, কিন্তু রবিমামার মতো নয়। রবিমামা অন্য স্তরের জিনিয়াস । তবে অতুলবাবু বড্ড ভালো মানুষ। বউটা অবশ্য সুবিধের হয়নি। স্বল্প আলাপেই হেমকুসু্মকে পছন্দ হয়নি সরলার।।

(ক্রমশ…) 

 
 
top