নতুন আলো

 

বোম্বাই মেলে চড়ে এক স্ত্রীলোক হাওড়া স্টেশনে অবতীর্ণ হলেন। স্টেশনে নেমে ঠিকে গাড়ি ভাড়া করলেন তিনি। হ্যারিসন রোডে এসে গাড়োয়ান জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন ?

শুনে সেই অবগুণ্ঠনবতী রহস্যময়ী মৃদু হাস্য করলেন, মায় চিনতে পারছিস না? আমি যে প্লেগদেবী!

রোমাঞ্চিত গাড়োয়ান দেখল ঘোমটা খসে গেছে। বহুমূল্য আভরণশোভিত এক নরকঙ্কালের মুখ প্রখর দিনের আলোয় তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ভয়ে সে আর্ত চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। জ্ঞান যখন ফিরল তখন সে দ্যাখে যে, তার ঠিকে গাড়ি যেমন ছিল তেমনই আছে। শুধু প্লেগদেবী বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন। 

ব্যস্, আর যাবে কোথায়! শহর কলকাতা নানা গুজবে পল্লবিত হয়ে উঠল। প্লেগ আসছে! প্লেগ আসছে! বোম্বাই থেকে বনবন করে দৌড়ে এসে এই ভয়ংকর মারণরোগ কলকাতার ভেতর সেঁধিয়ে গেছে। 

শহরময় রব উঠল, পেলে গো! পালা গো! পেলে গো! পালা গো!

সেই গুজব আর শোরগোলের ধাক্কায় শহরসুদ্ধু লোক পড়িমরি করে পালাতে লাগল। দু-দিনে শহর খালি। স্টেশনে যাওয়ার জন্য ঠিকে গাড়ির গাড়োয়ানরা অসম্ভব দড় হাঁকছে। যাদের একখানাও ভাড়াটে গাড়ি আছে, তারাও বেশ দু-পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। 

এমন সময় একদিন বুড়ো, বাবুদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন এক অসাধারণ মহিলা। ভারত মহাসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় তেজস্বী পুরুষ। বছর দুয়েক হল প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তাঁরই স্ত্রী দেশের প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। কাদম্বিনীর ছেলে প্রভাত, বুড়ো ওরফে প্রেমাঙ্কুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ হেন কাদম্বিনী নিজে এসেছেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী। বয়েস আন্দাজ চল্লিশ। অতি সাধারণ বেশভূষা। তাঁতের শাড়ি পরনে। হাতে দু-গাছি চুড়ি। তবে বোঝা যায় যে, যৌবনে অসামান্য রূপসী ছিলেন। 

মহেশচন্দ্র মহাব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

কাদম্বিনী অবশ্য বসতে আসেননি। প্রচণ্ড তাড়ায় আছেন তিনি। চেম্বারে রোগী অপেক্ষা করছে।

না, না। বসব না, মহেশবাবু। বিশেষ দরকারে এলাম

কী দরকার

শুনছেন তো শহরে কী রকম প্লেগ ছড়াচ্ছে? মানুষ মরছেও পটাপট

হুঁ। লোক তো সব শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। নেহাৎ আমাদের যাবার জায়গা নেই তাই পড়ে আছি

র্পোরেশন থেকে প্লেগের টিকের ব্যবস্থা করেছে, জানেন তো, মহেশবাবু

মহেশচন্দ্রের স্ত্রী, বুড়ো, বাবুর মা, ততক্ষণে বৈঠকখানায় এসে উপস্থিত। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে পর্দার চল নেই। তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, সব টিকে-ঠিকে নিতে হবে না। দুখিয়া বলছিল যে সে এক মারাত্মক কাণ্ড

দুখিয়া বাড়ির কাজের লোক।

মহেশচন্দ্র স্ত্রীর দিকে তাকালেন, কী বলছিল দুখিয়া?

র বোলো না গো। টিকে দেবার নাম করে নাকি পেট থেকে এক পয়সা মাপের মাংসের বড়া তুলে নিচ্ছে। তার মধ্যে সাহেবগুলো পুরে দিচ্ছে প্লেগের বীজ। টিকে নেবার দশ ঘণ্টার মধ্যে লোক কাবার হয়ে যাচ্ছে। 

মহেশচন্দ্র হো হো করে হেসে উঠলেন। মুচকি হাসলেন কাদম্বিনী। কিছুক্ষণ পরে হাসি চেপে মহেশচন্দ্র বললেন, তুমি দুখিয়ার এইসব আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস কর?

সমবেত হাসিতে মহেশপত্নী লজ্জা পেয়েছেন। তিনি নীরব রইলেন।

কাদম্বিনী বললেন, হাসির কথা নয়। এ গুজবটা আমিও শুনেছি। লোকে শুনছি কুক সাহেবকে পেটাবে

কুক সাহেব এক আধাট্যাঁশ ফিরিঙ্গি যিনি শহরের স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্বে আছেন। 

মহেশচন্দ্র বললেন, কুকটা বেশ কাজের। ও তো এর মধ্যে মেছোবাজারে প্লেগের হাসপাতাল খুলে ফেলেছে

সেই কুকই তো গতকাল আমার বাসায় এসেছিল

পনার ওখানে?

হ্যাঁ। আমার পরিচিত। কাল আমায় খুব অনুনয় বিনয় করে গেল

কী বলল?

লে, . গাঙ্গুলি, শহরে টোমরা ব্রাহ্মরাই অ্যাডভান্সড আছ। অগ্রণী আছ। খবর কী শুনিটেছ? এই টিকার ব্যাপারে, ভ্যাক্সিনের বিষয়ে লোকে আমায় মারিটে চায়। মারুক। ফিজিক্যাল অ্যজল্টের ভয় আমি করি না। কিন্তু টিকা যদি না চলে টাহলে শহরে প্লেগ চলিবে। কেহ ঠ্যাকাইতে পারিবে না। 

পনি কী বললেন?

কী আর বলব! চুপ করে আছি। কুক সাহেব আমায় বলল, . গাঙ্গুলি, টোমরা ব্রাহ্মরা একজাম্পল সেট কর। টোমরা টোমাদিগের পরিবারের সবাইকে একমট করাইয়া টিকা দাও। টোমরা আগাইয়া আসিলে টিকা চলিবেই চলিবে। কেহ গোল করিটে সাহস পাইবে না। 

মহেশচন্দ্র উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। এসব সমাজ সংস্কারের ব্যাপারে তাঁর অদম্য উৎসাহ। স্ত্রী ও পুত্ররা স্পষ্টতই নারাজ। তাদের দিকে রক্তচক্ষু হেনে তিনি বললেন, বশ্যই, অবশ্যই, . গাঙ্গুলি। আপনি এগিয়ে যান। আমি সঙ্গে আছি। আমার পরিবারও সঙ্গে আছে। আমরাই হব প্রথম ভলানটিয়ার

মহেশচন্দ্রের স্ত্রী মৃদু আপত্তির চেষ্টা করছিলেন। স্বামীর রক্তচক্ষুর সামনে মিইয়ে গেলেন। বাবু ঘাড় দুলিয়ে কী বলতে যাচ্ছিল, তাকে অবরুদ্ধ গলায় মহেশচন্দ্র বললেন, বাবু! মনে রেখো, একেবারে খুন করে ফেলব!

কাদম্বিনী মুচকি হাসলেন, না, না। এর জন্য কাউকে খুনটুন করতে হবে না, মহেশবাবু। আপনারা ভলান্টিয়ার করছেন, এতেই আমি খুশি। তারপর বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাচ্চারা কিচ্ছু ভয় পেয়ো না। বাজে গুজবে কানও দিয়ো না। প্লেগের টিকা দিলে বড় জোর এক দু-দিন জ্বর আসবে। এর বেশি কিছুই হবে না। 

প্রেমাঙ্কুর এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আদর করে তার গাল টিপে দিয়ে বললেনবুড়ো, তোকে দেখছি না কয়েকদিন। প্রভাত বলছিল। চলে আয়। লাইব্রেরিতে বেশ কয়েকটা ভালো বই এসেছে তার পর একপ্রস্থ চা পান করে বিদায় নিয়ে রোগী দেখতে চলে গেলেন কাদম্বিনী। 

 

যখন মহেশচন্দ্র ও কাদম্বিনীর মধ্যে এবম্বিধ বাক্যবিনিময় হচ্ছে তখন বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসুও অত্যন্ত ব্যাকুল চিত্তে এক ডাক্তারের চেম্বারে ধর্ণা দিয়েছেন। 

. সরকার

না, মহেন্দ্রলাল সরকার নন। বৃদ্ধ ড. মহেন্দ্রলাল সরকার প্র্যাকটিস প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। তাঁর জায়গায় আর এক তরুণ ধন্বন্তরির আবির্ভাব ঘটেছে। ড. নীলরতন সরকার। 

প্রচণ্ড ভিড়। দুজন কম্পাউন্ডার প্রাণপণে রোগী সামলাবার চেষ্টা করে চলেছে। শহরে সহসা প্লেগের অভ্যুদয়ে নীলরতনবাবুর ব্যস্ততা বেড়ে গেছে চতুর্গুণ।

জগদীশচন্দ্রকে অবশ্য বেশিক্ষণ বসতে হল না। ড. সরকার নিজেই বেরিয়ে এলেন। সুপুরুষ, সুদর্শন ড. সরকারের বয়স বছর চল্লিশের মত। মুখে তারুণ্যের দীপ্তি।

এসেই সাদরে করমর্দন করলেন, . বোস, বেশিক্ষণ বসতে হয়নি তো?

না, না। আর আমরা বোসেরা একটু বসলে ক্ষতিই বা কি!

ই প্লেগের ব্যাপারে খুব ফেঁসে গেছি, ডক্টর বোস। আর লোকজনও হয়েছে! অপদার্থ! ওয়ার্থলেস

কে?

রে আমার বাড়ির মালি ঝগড়ু গত পরশু প্লেগে মারা গেছে। নিমতলা ঘাটে দাহ করতে পাঠালাম। সবরকম প্রিকশ্যান নিয়েছি। যারা শ্মশানযাত্রী ছিল তাদেরকে বাড়িতে ঢোকার আগে করোসিব সাব্লিমেট জলে আগাপাশতলা ধুইয়েছি। গায়ের জামা, পায়ের জুতো সব রাস্তায় কেরোসিন তেলে পোড়াবার ব্যবস্থা করেছি। তারপর যা শুনলাম তাতে মেজাজ ধাঁ করে চড়ে গেল মশাই

কে? কী শুনলেন?

রে ঝগড়ু মালির গায়ের বাসি জামা কাপড়গুলো ব্যাটারা নিমতলা ঘাটের অন্ধ আতুরদের মধ্যে হাতে হাতে বিলি করেছে! শুনে মনে হল ঠাস ঠাস করে চড়াই। কী আন্দাজের আহাম্মকি বলুন দেখি! এ দেশে প্লেগ ছড়াবে না তো কোন দেশে ছড়াবে

. নীলরতন সরকারের আক্ষেপ শুনে এতো দুঃখের মধ্যেও জগদীশচন্দ্রের হাসি পেল। এই উদ্ভট বিশ্বসংসারে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য রয়েছে। একদিকে এত সাবধানতা, অন্যদিকে বেপরোয়া নির্দেশ লঙ্ঘন। এই দুই নিয়েই মানব প্রকৃতি। 

নীলরতন সরকার জিজ্ঞেস করলেন, তা আপনি সাতসকালে কী মনে করে?

মার বাড়ির পুরাতন ভৃত্যর অবস্থাটাও ভাল নয়, নীলরতনবাবু। ও ছুটি নিয়ে বড়োবাজার গেছিল। ফিরেই একদিন পরে ধুম জ্বর। উঠতে পারছে না। গোঁ গোঁ করছে। 

. নীলরতন সরকারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, নে হয় প্লেগ। আমি রাত নাগাদ আপনার বাড়ি গিয়ে দেখে আসব। তবে অবিলম্বে ও বাড়ি ছাড়ুন, ডাক্তার বোস। ও বাড়ি আপনাদের কাছে মৃত্যুপুরী

পনি তো আপনাদের মালি মারা গেলেও বাড়ি ছাড়েননি!

ও তো পাশে বস্তিতে থাকত, ডাক্তার বোস, আমার বাড়িতে নয়। ভালো কথা, প্রেসিডেন্সিতে আপনার রঞ্জন রশ্মির যন্তরটা ঠিক আছে

ছে। কেন?

মার এক রোগীকে সাহেব ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পিঠের ওপর বুট-পায়ে লাঠি মেরেছে। মনে হচ্ছে ভার্টিব্রাল ফ্র্যাকচার। ভাবছি আপনার ওখান থেকে একটু এক্স রে করিয়ে নেব। 

জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী কনরাড রোয়েন্টজেন এক্স রে আবিষ্কারের পরে পরেই কলকাতায়  জগদীশচন্দ্র তাঁর প্রেসিডেন্সির ল্যাবরেটরিতে অনুরূপ একটি যন্ত্র বানিয়ে ফেলেন। সেই স্বনির্মিত এক্স রে যন্ত্র কলকাতার অনেক ডাক্তার নিয়মিত ব্যবহার করেন। লব্ধপ্রতিষ্ঠ নীলরতন সরকার তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

জগদীশচন্দ্রের চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। ইংরেজ প্রভুরা যা খুশি তাই করছে। ভারতীয়দের মানুষ বলেই মনে করে না তারা। সাহেবদের বুটের আঘাতে মাঝে মাঝেই পিলে ফেটে ভারতীয়রা মারা যাচ্ছে। এ নিয়ে সাহেবি পত্র-পত্রিকাগুলো বিদ্রুপ করতেও ছাড়ছে না। তারা সাহেবদের সাবধানে লাথি মারতে বলছে! আহা ম্যালেরিয়ায় ভোগা পিলে! অল্প আঘাতেই ফট করে ফেটে যায়!

নীলরতনের চোয়ালও কঠিনচাপা হিস হিস কণ্ঠে বললেন, মাদের কতদিন যে এই অন্যায় জুলুমবাজি সহ্য করতে হবে তাই ভাবি, জগদীশবাবু। যাই হোক, রাতে আপনার বাড়ি যাব আমি। 

(ক্রমশ…)

 

 
 
top