নতুন আলো

 

পর্ব ২১

ভাইপো নীতীন্দ্রনাথ গুরুতর অসুস্থ। ঘন ঘন জ্বর আসছে তার। অন্যদিকে পেটে দারুণ যন্ত্রণা। সন্দেহ যে যকৃতের প্রদাহ ঘটেছে। চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।

বস্তুত উৎসাহের আধিক্যে কিঞ্চিৎ চিকিৎসা-সঙ্কটই দেখা দিয়েছে। ঠাকুরবাড়ির এ এক অদ্ভুত নিয়ম। কেউ অসুস্থ হলে অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কোবরেজি সব একসঙ্গে চলতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে শখের হোমিওপ্যাথি করেন। রাত জেগে সেবা করার ব্যাপারেও তাঁর পটুতা রয়েছে। এ সময় তিনি জোড়াসাঁকোতে অবস্থান করছেন। পুত্র-কন্যাসহ পত্নী মৃণালিনী রয়েছেন শিলাইদহে।

কবি দ্বিজেন্দ্রলালের শ্বশুর ধন্বন্তরি হোমিওপ্যাথ প্রতাপ মজুমদার মশাই স্বয়ং দেখছেন নীতীন্দ্রনাথকে। জোড়াসাঁকোতে মাঝে মাঝেই ভিজিট দিতে আসতে হচ্ছে তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নানা আলোচনাও চলছে। স্থির হয়েছে যে আর একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য নীতুকে মধুপুরে পাঠানো হবে।

শুধু নীতীন্দ্রনাথের জন্য রাত জাগাই নয়; রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত নানাবিধ কর্মকাণ্ডে। মাঝে এলাহাবাদ গেছিলেন বলেন্দ্রনাথ পত্নী সাহানা দেবীকে নিয়ে আসার জন্য। পিতা দেবেন্দ্রনাথের আদেশ অমান্য করতে পারেননি। সে কাজ নির্বিঘ্নে চুকেছে। এলাহাবাদ থেকে প্রদীপ বলে একটি বাংলা সাহিত্যপত্র বেরোয়। বিস্ময়কর তার মানরামানন্দ চট্টোপাধ্যায় নামধারী এক তরুণ প্রবাসী বাঙালি বের করছে সেটা। তার সাথেও দেখা করে এসেছেন। কলকাতাতে যখন থাকেন তখনও ডুবে থাকেন নানা কাজে। ভারতীতে লিখছেন নষ্টনীড় এবং চিরকুমার সভা এবার ঠিক করেছেন একটা উপন্যাসেও হাত দেবেন। অনেকদিন উপন্যাস লেখা হয়নি। একজন লেখক কি একসঙ্গে তিনটে ধারাবাহিক লিখতে পারেন? সম্ভব সেটা? বিচিত্রকর্মা রবীন্দ্রনাথের কাছে বোধহয় অসম্ভব নয় কিছুই। লিখবেন কখন? রবীন্দ্রনাথ বেছে নেন গভীর রাত্রি যখন রোগাক্রান্ত নিতুর পাশে জেগে রয়েছেন তিনি।

লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয় টেবিলে বসে তিনি লিখছেন। পাশের শয্যায় শায়িত রোগাক্রান্ত নিতু।

মাঝে মাঝে কাতর স্বরে সে বলছে, ! জল! রবিকা একটু জল!

উঠে গিয়ে কুঁজো থেকে পাথরের গেলাসে জল ঢেলে এগিয়ে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর আবার ডুবে যাচ্ছেন সাহিত্যসাধনায়।

মনে মনে বঙ্কিমকেই গুরু মানেন রবীন্দ্রনাথ। তবে সে শ্রদ্ধার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাবও লুকিয়ে রয়েছে। বঙ্কিম অসামান্য প্রতিভা—কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর পশ্চাৎপক্ক ভক্তরা যে চেঁচাচ্ছে বাংলা সাহিত্যে শেষ কথা বঙ্কিমই লিখে গেছেন সেটা স্বীকার করেন না রবীন্দ্রনাথ।

বঙ্কিমকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়। সম্ভব সেটা। আর সেটাকে সম্ভব করার মতো প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মজুদ। বিষবৃক্ষ উপন্যাসটাই ধরা যাক। বিধবার প্রেম দেখালেন বঙ্কিম। ভালো কথা। কিন্তু শেষটা কী করলেন? নিরপরাধা কুন্দনন্দিনীকে বিষ খাইয়ে মারলেন। এটা কোনো কাজের কথা হল?

আচ্ছা এই প্লটটাকেই একটু বদলে দেওয়া যায় না? বিধবারই প্রেম দেখাবেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সে বিধবা মোটেই ধোয়া তুলসীপাতা নয়। তার মধ্যেও দাউ দাউ করে জ্বলছে কামনার বহ্নি। স্বৈরিনী সে নারীর প্রেমে দগ্ধ হবে পুরুষপতঙ্গরা। আনবেন জটিল,আধুনিক, ইউরোপীয় লেখকসুলভ নারী মনস্ত্বত্ব। সেই জটিল মানসিকতা মূর্ত করে তুলবেন ভাষার লেলিহ শক্তিতে। ভাবতে ভাবতে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ—হ্যাঁ, তিনি দেখিয়ে দেবেন যে, বঙ্কিমকেও ছাড়িয়ে যাওয়া যায়, পেরিয়ে যাওয়া যায়।

সামনে পড়ে রয়েছে একটা ইংরেজি প্রবন্ধ ভার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল এক মুসলমান জমিদারের লেখা উর্দু প্রবন্ধের অনুবাদ। ভারতী-তে এর সমালোচনা লিখতে হবে।

ভদ্রলোকের বক্তব্য: হাল আমলের বাংলা পাঠ্যপুস্তকগুলো হিন্দু ছাত্রদের জন্য লেখা। মুসলমান ছাত্রদের উপযোগী করে তাদের স্বধর্মের সদুপদেশ এবং স্বজাতীয়ের সাধু দৃষ্টান্ত অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ভদ্রলোকের কথায় যুক্তি আছে—ভাবলেন রবীন্দ্রনাথ। সত্যিই তো! বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমান ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। পরস্পরের সুখদুঃখ নানাসূত্রে জড়িত। একজনের ঘরে আগুন লাগলে অন্যকে দৌড়োদৌড়ি করতে হয়। রক্তের সম্পর্কে তারা জড়িয়ে আছে। অথচ তারা পরস্পরের শাস্ত্র ও ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞ ও উদাসীন। হিন্দু ছেলেরা ইংরেজি বই মুখস্থ করে বহুদূরদেশি ইংরেজের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, আচারবিচার সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন করছে। প্রতিবেশী মুসলিমদের সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে তারা অনীহ। এই বাস্তব সত্য শিলাইদহে প্রতিনিয়ত দেখছেন রবীন্দ্রনাথ।

তবে লেখক শুধু পাঠ্যপুস্তকে থেমে থাকেননি। তাঁর অভিযোগ আরো ব্যাপক। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস থেকে মুসলমান বিদ্বেষ তুলে তুলে দেখিয়েছেন। এখন এটা সত্যি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের শেষের উপন্যাসগুলো, বিশেষ করে আনন্দমঠ, রাজসিংহ বা সীতারাম-এ মুসলমান-বিদ্বেষ সত্যিই বেশ প্রকট।

চোখ বুজে রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করতে লাগলেন আনন্দমঠ-এর সেই বর্ণনা :

অতএব দিনে দিনে সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। দিনে দিনে শত শত, মাসে মাসে সহস্র সহস্র সন্তান আসিয়া ভবানন্দ, জীবানন্দর পাদপদ্মে প্রণাম করিয়া, দলবদ্ধ হইয়া দিগদিগন্তরে মুসলমানকে শাসন করিতে বাহির হইতে লাগিল। যেখানে রাজপুরুষ পায়,ধরিয়া মারপিট করে, কখন কখন প্রাণবধ করে, যেখানে সরকারি টাকা পায়, লুঠিয়া লইয়া ঘরে আনে, যেখানে মুসলমানের গ্রাম পায়, দগ্ধ করিয়া ভস্মাবশেষ করে

বঙ্কিম বছর ছয়েক হল মারা গেছেন। কিন্তু যুবসমাজে তাঁর প্রবল, অপ্রতিহত প্রভাব। আনন্দমঠ লেখা এবং অনুশীলনধর্ম প্রচারের সুবাদে কেউ কেউ তাঁকে ঋষি বঙ্কিম আখ্যায়ও অভিহিত করছেন। বঙ্কিমের সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বহুবার বাড়ি গেছেন তাঁর। মুনিঋষিসুলভ কোনো ভাবই এই ঘোরতর সংসারী মানুষটির ছিল না।

কিন্তু আনন্দমঠ-এ এটা কী প্রচার করছেন বঙ্কিম? সত্যানন্দের মুখ দিয়ে তিনি বলাচ্ছেন:

আমরা রাজ্য চাহি না। কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই।

কোন সময়ের কথা বলছেন?

এই সময়ে প্রথিতনামা, ভারতীয় ইংরেজকুলের প্রাতঃসূর্য্য ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেব ভারতবর্ষের গবর্নর জেনরল!

ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় সত্যিই কি এরকম হিন্দু-মুসলমান বিরোধ ঘটেছিল? ইতিহাস কি তাই বলে? নাকি বঙ্কিম সজ্ঞানে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন? সন্তান বিদ্রোহ কি সত্যি সত্যিই ঘটেছিল নাকি সেটাও বঙ্কিমের উর্বর কল্পনার ফসল?

অথচ লেখক হিসেবে বঙ্কিমের মাহাত্ম্য অস্বীকার করার জো নেই। বাংলা গদ্যের এখনো পর্যন্ত মহত্তম শিল্পী তিনিই।

সাহিত্য থেকে কি ব্যক্তিগত সংস্কার দূর করা যায়? ইংরেজ ঔপন্যাসিক থ্যাকারের বইতে তো পদে পদে ফরাসি বিদ্বেষ। তাতে কি ফরাসি পাঠকরা থ্যাকারেকে বর্জন করেছেন?

রবীন্দ্রনাথ দুঃখের সঙ্গে ভাবলেন যে, অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষদেরও দুর্বলতা থাকে। থাকে অযৌক্তিক এবং সময়ে সময়ে ক্ষতিকর ধ্যানধারনাসঙ্গীতস্রষ্টা রিচার্ড ভাগনার? অপরিসীম তাঁর ইহুদি বিদ্বেষ। ধর্মবীর মার্টিন লুথার? তাঁরই বা ইহুদি বিদ্বেষ কম কীসের? অথচ, এতে কি তাঁদের জীবনের কৃতি ব্যর্থ হয়ে গেছে?

একইভাবে বঙ্কিমবাবুর গ্রন্থে যা নিন্দার্হ তা সমালোচকদের হাতে লাঞ্ছিত হোক, কিন্তু তাতে কপালকুণ্ডলা বা কৃষ্ণকান্তের উইল-এর স্রষ্টার মহত্ত ম্লান হয় না।

ভাবতে ভাবতে রবীন্দ্রনাথের মাথা গরম হয়ে গেল।

বিকা জল! ভাঙা স্বরে বলে উঠল আধঘুমন্ত নিতু।

ভাইপোকে জল দিতে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। ভোর হয়ে আসছে। উদীয়মান সূর্যের আলো জানালা দিয়ে নিতুর নিদ্রিত মুখে এসে পড়েছে। কী শীণ, জীর্ণ, করুণ, রোগার্ত, অসহায় দেখাচ্ছে তাকে!

বলু চলে গেছে। নিতুও কি চলে যাবে? এবার কি তার পালা?

বিকা, বড়ো ভুল হয়ে গেছে আমার আধঘুমন্ত নিতু জড়িয়ে জড়িয়ে বলছে।

কী ভুল হয়ে গেছে তোর? কীসের কথা বলছিস?

ভুল হয়ে গেছে, রবিকা, আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি ক্ষমা করে দিয়ো আমায়

কীসের ভুল?

তোমার লাল বাড়ির প্ল্যানে

রবীন্দ্রনাথ চমকে উঠলেন। জোড়াসাঁকোতে দেবেন্দ্রনাথের অর্থ সাহচর্যে তিনি সম্প্রতি একটি বাড়ি বানাচ্ছেন। নাম দিয়েছেন লাল বাড়ি বৈচিত্র্যসন্ধানী রবীন্দ্রনাথ বাড়ির প্ল্যান করিয়েছেন শখের স্থপতি নীতীন্দ্রনাথকে দিয়ে। অভিনব সে পরিকল্পনা। দোতলা বাড়ির ওপরে আর নীচে থাকবে দুটো বিশাল বিশাল হল ঘর। আলাদা আলাদা ঘরের কোনো ব্যবস্থা নেই। কাঠের পার্টিশনের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো ভাগ করে ঘর করে নেওয়া যাবে। কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে

লাল বাড়ির প্ল্যানে কি ভুল আছে?

ড়ো ভুল, বিশাল ভুলআজই হঠাৎ খেয়াল হল একতলা আর দোতলার মধ্যে সিঁড়ির প্ল্যান করতেই ভুলে গেছি! তোমরা উঠবে কী করে?

ঠিক আছে, এত চিন্তা করছিস কেন? সে হবে খন। আগে সেরে ওঠ

মায় ক্ষমা করে দাও, রবিকা! আমি বাঁচব না। আমায় ক্ষমা করে দাও তুমি

নীতীন্দ্রনাথ ঘুমিয়ে পড়লেন।

চোখ ফেটে জল এল রবীন্দ্রনাথের। নিতুর মুখে স্পষ্ট মৃত্যুর ছায়া। ও কি তাহলে বাঁচবে না? চলে যাবে অকালে বলুর মতো?

রবীন্দ্রনাথ সহসা অনুভব করলেন যে তাঁর শ্রবণে, মননে গুঞ্জরিত হচ্ছে সুর, কথা। ভেসে উঠছে নতুন গানের একটি কলি। এটাই হয়। সহসাই অমোঘ সৃষ্টির আবেগে তাঁর মধ্যে সৃজিত হয়ে ওঠে হিরণ্যদ্যুতিসম্পন্ন এক একটি সংগীত। রাজসমারোহে যখন সে আসে তখন তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

জানালা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে, কিন্তু ভৈরবী নয়, রবীন্দ্রনাথের প্রাণে বাজছে ছায়ানটের সুর। কথা আর সুর গলাগলি করে যুগলমূর্তিতে এসে উপস্থিত হচ্ছে তাঁর সম্মুখে

বিধবার অবৈধ প্রেম নিয়ে উপন্যাস নয়, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যসত্তা নিয়ে মননশীল প্রবন্ধ নয়, রবীন্দ্রনাথ মশগুল হয়ে খাতা-কলম নিয়ে লিখে চললেন নতুন একটি বাংলা গান:

অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়।

কণাটুকু যদি হারাই তা লয়ে প্রাণ করে হায় হায়।

নদিতটসম কেবলই বৃথাই প্রবাহ আঁকড়ি রাখিবারে চাই,

একে একে বুকে আঘাত করিয়া ঢেউগুলি কোথা ধায়।

নিতু ঘুমের মধ্যে ফিরে শুল। জড়িত কণ্ঠে কিছু বলল। রবীন্দ্রনাথ শুনতে পেলেন না। একমনে লিখে চললেন :

যাহা যায় আর যাহা-কিছু থাকে সব যদি দিই সঁপিয়া তোমাকে

তবে নাহি ক্ষয়, সবই জেগে রয় তব মহা মহিমায়।

তোমাতে রয়েছে কত শশী ভানু, হারায় না কভু অণু পরমাণু,

আমারই ক্ষুদ্র হারাধনগুলি রবে নাকি তব পায়।

রবীন্দ্রনাথ অনুপ্রানিত হলেও টানা লিখতে পারেন না। বিস্তর কাটাকুটি করতে হয়। ভাস্কর যেমন খুদে খুদে পাথরের মধ্য থেকে ধীরে ধীরে মূর্তির অবয়ব উন্মোচন করে, তেমনভাবেই জন্ম নেয় তাঁর এক একটি গান।

টেবিলের উপরে খাতার ওপর ঝুঁকে রবীন্দ্রনাথ এতটাই তন্ময় হয়ে সংগীত রচনা করছিলেন যে, টেরই পাননি ঘরের মধ্যে আর কেউ প্রবেশ করেছে। চটকা ভাঙল যখন অনুপ্রবেশকারিনী একেবারে পাশে চলে এসেছে।

বাবামশাই, সারা রাত জেগেছেন আপনি, একটু চা করে আনি?

চমকে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ। সাদা ঘোমটা টানা এক তরুণী বিধবা। মুখ গাঢ় বিষণ্ণতায় শুষ্ক। একেই সদ্য এলাহাবাদ থেকে নিয়ে এসেছেন তিনি। আবার বিয়ের কথা চলছিল, কিন্তু তা ভেস্তে গেছে। বলেন্দ্র-পত্নী সাহানা।

রবীন্দ্রনাথকে দেখে বিষণ্ণ হাসল সাহানা, বাবামশাই, একটু চা করে আনি?

 

প্যারিস থেকে নিবেদিতা, অবলা এবং জগদীশচন্দ্র গেলেন লন্ডনে। স্বামী বিবেকানন্দ ধরলেন অন্য পথ। মিস্টার লেগেটের বাড়িতে থাকাকালীনই কিংবদন্তি অপেরা গায়িকা এমা কালভের সঙ্গে বার বার মোলাকাত হত স্বামীজির। এমা কালভে তাঁর অনুরাগিণী এবং প্রবল ভক্ত। এক সন্ধ্যায়, কালভের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় বিবেকানন্দ, জোসেফিন ম্যাকলাউড ও মাদাম কালভে বসে আছেন কালভে বললেন, জোসেফিন, আমি তো ঠিক করেছি ইজিপ্ট যাব। ও দেশটা দেখা হয়নি। তুমি যাবে নাকি?

খন তো বড্ড গরম ওখানে

না! না! অক্টোবরের শেষ এর দিকে প্ল্যান করছি। তাও তো ঘুরে যাব

কী রকম?

মি ভাবছি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস করে প্যারিস থেকে যাব ইস্তাম্বুল। সেখান থেকে গ্রিস। তারপর জাহাজে করে ইজিপ্ট। পৌঁছতে পৌঁছতে ওখানে নভেম্বরের মাঝামাঝি হয়ে যাবে। তখন আবহাওয়া খুব ভালো ওখানে

যেতে পারি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন জোসেফিন ম্যাকলাউডপ্রস্তাবটা মনে ধরেছে তাঁর।

র স্বামীজি, আপনি? আপনিও চলুন আমাদের সাথে? কালভে ফিরলেন বিবেকানন্দর দিকে।

মি? পাগল নাকি? হা হা করে হেসে উঠলেন বিবেকানন্দ।

কে?

মি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। পথের ভিক্ষুক। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে তো রাজা মহারাজারা চড়ে। পয়সা কোথায় আমার?

ছিঃ! ছিঃ! কী যে বলেন স্বামীজি! সব খরচা আমার। আপনি তো জানেন যে আপনার জন্য সব করতে পারি আমি

সত্যিই তাই। এমা কালভে বুকের ভেতরে স্বামীজির জন্য এক গভীর কৃতজ্ঞতা পোষণ করেন। একসময় গভীরতম নৈরাশ্য ও মানসিক অবসাদে আত্মঘাতিনী হতে চেয়েছিলেন এমা। আমেরিকায় গিয়ে বিবেকানন্দর সান্নিধ্যে নবজীবন লাভ করেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত বিবেকানন্দ সম্মতি দিলে প্যারিস থেকে যাত্রা শুরু হল।

২৪ অক্টোবর ১৯০০ সালে প্যারিসের রেল স্টেশন থেকে সপার্ষদ ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের আরোহী হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিলাসবহুল ট্রেন। আরাম-স্বাচ্ছন্দ্যের সবরকম আয়োজন মজুদ। বিবেকানন্দ যেমন কৃচ্ছসাধন করতে পারেন, তেমন ভোগবিলাসেও স্বচ্ছন্দ। সারারাত দক্ষিণ ফ্রান্স দিয়ে ট্রেন চলল। পরের দিন ট্রেন ধাবিত হল দক্ষিণ জার্মানির মধ্যে দিয়ে। ত্বরিতগতিতে ট্রেন ছুটছে। দক্ষিণ জার্মানির অপূর্ব নিসর্গশোভা মুগ্ধ করছে যাত্রীদের। বিবেকানন্দ খোশমেজাজে আছেন। আমোদে, আহ্লাদে, হাসি, ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখছেন সঙ্গীদের। ঘণ্টায় ঘণ্টায় উর্দি পরিহিত ভৃত্য যোগান দিচ্ছে মহার্ঘ্য খাদ্যপানীয়ের।

ভিয়েনা পৌঁছলেন স্বামীজি। অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবুর্গ রাজত্বের রাজধানী ভিয়েনা। শিল্পকলা এবং বিশেষত সংগীতের মহাপীঠস্থান। মোজার্ট, শুবারট, স্ট্রাউস এবং বিটোভেনের লীলাক্ষেত্র

এখানে বিবেকানন্দ ঘুরে দেখলেন সানব্রান প্রাসাদ। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের একমাত্র ছেলেকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সে প্রাসাদে। ফরাসিরা বলে যে, অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিক চক্রান্ত করে সেই তরুণ রাজকুমারকে মেরে ফেলেন যাতে ফ্রান্সে বোনাপার্টের বংশ কোনোদিন রাজ্যপাটে ফিরতে না পারে।

কিন্তু ভিয়েনা দর্শনে কেন জানি না মন ভরল না স্বামীজির। প্যারিসের পর বাকি ইউরোপ! বিবেকানন্দর মতে সে যেন মহাভোজের পর তেঁতুলের চাটনি চাখা! সেই কাপড়চোপড়, সেই খাওয়া দাওয়া, সেই কিম্ভুত কালো জামা, সেই বিকট টুপি!

এরপর বলকান দেশের মধ্যে দিয়ে ইস্তাম্বুলের দিকে যাত্রা। লঙ্কাপ্রেমী বিবেকানন্দ আনন্দে সময় কাটালেন। আনন্দের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বলকান লঙ্কার ঝাঁঝ মাদ্রাজিদের পক্ষেও দুঃসহ!

অবশেষে অন্তিম স্টেশন ইস্তাম্বুল বা কনস্টান্টিনোপলে ৩০ অক্টোবর পৌঁছলেন তাঁরা। মাদাম কালভে এমনভাবে ভ্রমণ পরিকল্পনা ছকেছেন যাতে যাত্রাপথে বেশ কিছুটা সময় থাকে হাতে। ধীরে,সুস্থে বেরিয়ে নেওয়া যায়। ইস্তাম্বুলে তাই প্রায় দিন নয়েক থাকার পরিকল্পনা তাঁর

এখানে বাজার দেখতে বেরোলেন স্বামীজি। বহুদিন পর শিশুর আনন্দে ছোলাভাজা কিনে খেলেন। নৌকোতে চেপে ঘুরে এলেন বস্ফরাস প্রণালী। দেখলেন মিউজিয়াম। তোপখানার উপর থেকে মনোহর ইস্তাম্বুল দেখে মুগ্ধ হলেন তিনি। পথে সুফি ফকিরের তাকিয়া। রোগ ভালো করছে তারা। প্রথমে কলমা পড়ছে, তারপর নাচ, তারপর ভাব, তারপর রোগীর শরীর মাড়িয়ে মাড়িয়ে রোগের আরাম। ভাবাবিষ্ট রামকৃষ্ণর কথা মনে পড়ে গেল স্বামীজির।

বক্তৃতার বিরাম নেই এখানেও। ইস্তাম্বুলে বেশ কিছু ভারতীয় আছে। সেরকম ছোটোখাটো সভায় বেদান্তর ওপর বক্তব্য রেখে শ্রোতাদের চিত্তাকর্ষণ করলেন স্বামীজি।

এরপর যাত্রা গ্রিসের উদ্দেশে। বেলা দশটায় কনস্টান্টিনোপল ত্যাগ করলেন অভিযাত্রীরা। স্থির সমুদ্রের মধ্যে একদিন, একরাত্রির ভ্রমণ। পেরিয়ে গেলেন গোল্ডেন হর্ন এবং মারমোরা দ্বীপপুঞ্জ। স্বামীজির একদিকে এশিয়া, আরেক দিকে ইউরোপ। জাহাজ পৌঁছোল পাইরিউস বন্দরে। সেই বিখ্যাত, ইতিহাসপ্রসিদ্ধ পাইরিউস তথা এথেন্স। এখানেই মুখর হতেন পেরিক্লিস। দার্শনিক চিন্তায় সময় অতিবাহিত করতেন সক্রেটিস ও প্লেটো। নাটক রচনা করতেন এসকাইলাস, সোফোক্লিস এবং অ্যারিসটোফিনিস। মূর্তি গড়তেন ফিডিয়াস। দু-চোখ ভরে এথেন্স দেখলেন বিবেকানন্দ। দেখলেন আক্রোপলিস, পার্থেনন ও জুপিটারের মন্দির।

স্বামীজির সঙ্গে ভ্রমণ এক অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞান, দর্শন বা ইতিহাসের সুদূর গভীরে ডুবসাঁতার কেটে অহরহ মণিমুক্তো তুলে আনেন তিনি। সঙ্গীদের নিয়ে চলে যান কোনো অলৌকিক, অতীন্দ্রিয় লোকে।

যেমন হল এলুসিস দেখতে গিয়ে। এটাই গ্রিকদের প্রধান ধর্মস্থান। ইতিহাসপ্রসিদ্ধ এলুসিয়ান রহস্যের অভিনয় হত এখানেই। সেই রহস্যতত্ত্ব সঙ্গীদের ভাবাবিষ্ট হয়ে বোঝাতে শুরু করলেন বিবেকানন্দ।

মাদাম কালভে এসব ব্যাপারে মুখ খোলেন না। তাঁর কাজ গান গেয়ে সঙ্গীদের আনন্দ দেওয়া। বিবেকানন্দর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন একমাত্র ভ্রমণসঙ্গী ফরাসি পণ্ডিত লয়জন। দেখা গেল লয়জনও ফেল মেরে যাচ্ছেন! এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে যাবার পথে সেসব জায়গার প্রাচীন প্রার্থনামন্ত্র অনর্গল আবৃত্তি করে চললেন স্বামীজি। ব্যাখ্যা করতে লাগলেন যাজককুলের ক্রিয়াকলাপ সবিস্ময়ে ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে চললেন লয়জন।

এতই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সকলে যে, মধ্যাহ্নভোজের কথা ভুলেই গেছিলেন। সম্বিত প্রথম ফিরল প্রখর বাস্তববাদিনী মিস ম্যাকলাউডের।

স্বামীজি! লাঞ্চ? আমাদের কি না খাইয়ে রাখার মতলব আপনার?

হো হো! কথা কইতে কইতে ভুলেই গেছিলাম! অপ্রস্তুত হাসলেন বিবেকানন্দ।

চারদিনের গ্রিস সফর শেষ করে মিশরযাত্রার পালা। রুশ জাহাজ জার-এর ফার্স্ট ক্লাসে চলেছেন স্বামীজিরা। নীচের ডেকে বোঝাই হয়ে চলেছে গোরু-ভেড়া। এবার গন্তব্য কায়রো।

কায়রোর মিউজিয়াম দেখে, মধ্যাহ্নভোজ সেরে মিশরের মনোরম আবহাওয়ায় গেরুয়াধারী স্বামীজি চললেন রাজার মতো। সদ্য মিউজিয়াম দেখে মশগুল তিনি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফারাওদের নানান কীর্তিকলাপের চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে মন তাঁর ডুবে আছে ইতিহাসে। সঙ্গীরাও আপ্লুত।

কায়রোর গলিঘুঁজির মধ্যে সহসা পথ হারালেন তাঁরা। হঠাৎ দেখলেন এসে পড়েছেন নোংরা, ভাঙাচোরা এক পল্লীতে। পথে পড়ে আছে স্তুপীকৃত আবর্জনা। প্রবল দুর্গন্ধশোভিত সরু পথের দু-পাশে সারিবদ্ধ মলিন দোতলা, তিনতলা বাড়ি। জানলায় নির্লজ্জ,অনাবৃত দেহে দাঁড়িয়ে রয়েছে যুবতী নারীরা। নীচের খোলা দরজাতেও তাদের উচ্চকিত উপস্থিতি। প্রমাদ গণলেন জোসেফিন ম্যাকলাউড, স্বামীজি, আমরা বোধ হয় উল্টোপাল্টা জায়গায় চলে এসেছি। চলুন শিগগিরি এখান থেকে চলে যাই স্বামীজির হাত ধরে টানলেন তিনি।

বিবেকানন্দ কর্ণপাত করলেন না।

একটা ভাঙা বাড়ির সামনের বেঞ্চে বসে আছে অতি প্রগলভা কয়েকটি মেয়ে। বসন উন্মুক্ত। স্তনবৃন্ত ও নাভিহ্রদ দৃশ্যমান। কায়রোর বেশ্যারা সহাস্যে, সলাস্যে স্বামী বিবেকানন্দর দিকে এগিয়ে এল। তাদের দেহবল্লরীকে উপভোগ করার সাদর আমন্ত্রণ জানাতে লাগল তারা।

হাত ধরে পিছু টানছেন মিস ম্যাকলাউড। স্বামীজি অবিচলিত। তাঁর গভীর, উজ্জ্বল চোখ বি্ষাদাচ্ছন্ন।

বলছেন, হা বাছারা! আহা অভাগিনীরা! নিজেদের দেবীত্বকে বলি দিয়েছ তোমরা!

তাঁর দু-চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।

মেয়েগুলো লজ্জা পেয়ে গেল। একজন ভয়ে, লজ্জায় ঢেকে ফেলল তার মুখ। আর একজন সামনে ঝুঁকে স্বামীজির পোশাক চুম্বন করে ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে বলতে লাগল, ম্ব্রে দি দিওস ! হম্ব্রে দি দিওস! ইনি ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ! ইনি ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ!

সেইদিনই রাত্রে চাঁদের জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত গিজার পিরামিড ও স্ফিংক্স-এর পাশে হাজির হলেন বিবেকানন্দ ও তাঁর সঙ্গীরা। কায়রোয় ঠাসা প্রোগ্রাম তাঁদের। নষ্ট করার মতো সময় কোথায়? নয়তো সারা দিনের নানা অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার অভিঘাতে হয়তো বিশ্রাম নেওয়াটাই সঠিক হত।

মরুভূমির ঠান্ডা হাওয়ায় সবার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ধু ধু মরুভুমির বালির ওপর জ্যোৎস্নার আলো পড়ে চিকচিক করছে। দূরে অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছে উটের সারি। তাদের কালো কালো ছায়া দিগন্তের মসীকৃষ্ণ অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

সেই নিস্তব্ধ চরাচরে, বিবেকানন্দর কণ্ঠ উদাত্ত হয়ে উঠল:

ফরোয়ার্ড! রিমেম্বার ফ্রম দিস মনুমেন্ট অনওয়ার্ডস, ফর্টি সেঞ্চুরিস লুক ডাউন আপন ইউ!

মাদাম কালভের দিকে ফিরলেন তিনি, কার কথা বলছি জানেন, মাদাম?

কার কথা স্বামীজি?

পনারই এক স্বদেশবাসী—নেপোলিয়ন। আজ থেকে একশো বছর আগে তাঁর সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করতে ঠিক এইখান থেকেই একথা বলেছিলেন তিনি

র আপনি কী বলবেন, স্বামীজিজিজ্ঞেস করলেন কালভে।

ক্ষণেক চুপ করে রইলেন বিবেকানন্দ। চোখ বন্ধ। ধ্যানস্থ। তারপর তাঁর ভায়োলিন চেলো যন্ত্রের মতো কণ্ঠস্বর মন্দ্রিত হয়ে উঠল

আই মেট অ্যা ট্রাভেলার ফ্রম অ্যান অ্যানন্টিক ল্যান্ড

হু সাইড টু ভাস্ট অ্যান্ড ট্রাঙ্কলেস

লেগস অব স্টোন

স্ট্যান্ড ইন দ্য ডেসার্ট. নিয়ার দেম, অন

দ্য স্যান্ড,

হাফ সাঙ্ক, অ্যা শ্যাটার্ড ভিসেজ লাইজ,

হুজ ফ্রাউন,

অ্যান্ড রিংকেল্ড লিপ, অ্যান্ড স্নিয়ার অভ কোল্ড কোমান্ড,

টেল দ্যাট ইটস স্কাল্পটর অয়েল দোজ প্যাশান্স রেড

হুইচ ইয়েট সারভাইব, স্টাম্পড অন দোজ লাইফলেস থিংস.

দ্য হ্যান্ড দ্যাট মকড দেম অ্যান্ড দ্য

হার্ট দ্যাট ফেড;

অ্যান্ড অন দ্য পেডেস্টলদিজ ওয়ার্ডস অ্যাপিয়ার:

মাই নেম ইজ ওজিম্যানডিয়াস, কিং অব

কিংস:

লুক অন মাই ওয়ার্ক্স, ইয়ে মাইটি, অ্যান্ড

ডেস্পেয়ার!’

নাথিং বিসাইড রিমেইনস. রাউন্ড দ্য

ডিকে

অব দ্যাট কোলোস্যাল রেক, বাউন্ডলেস অ্যান্ড

বেয়ার,

দ্য লোন অ্যান্ড লেভেল স্যান্ড স্ট্রেচ ফার

অ্যাওয়ে.

কিছুই থাকেনা মাদাম কালভে! কিচ্ছু না! কিচ্ছু না! কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন, যৌবন, ধন, মান! বিবেকানন্দর কণ্ঠ হতাশায় আর আক্ষেপে দীর্ণ হয়ে উঠল।

সেই কণ্ঠ মরুভূমির বাতাসে, গিজার পিরামিডের দেয়ালে, স্ফিংক্সের দেহে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল—থাকে না! কিছুই থাকে না! কিচ্ছু না! কিচ্ছু না! কিচ্ছু না!

সঙ্গীরা পিরামিডের সামনে শতরঞ্চিতে বসে আছেন। বসে আছেন বিবেকাননদ। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললেন না। পরিবেশের মহিমায় সবাই আপ্লুত, নিস্তব্ধ।

তারপর হঠাৎ খেয়াল করলেন মিস ম্যাকলাউড যে, স্বামীজি নিথর, নিস্তব্ধ। তাঁর মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকের ওপর।

কী হল স্বামীজি! কী হলসবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

অত্যন্ত ধীর লয়ে শ্বাস নিচ্ছেন স্বামীজি। সাড়া দিচ্ছেন না কোনো প্রণোদনায়।

সৌভাগ্যক্রমে হোটেল কাছেই। ধরাধরি করে বিবেকানন্দকে নিয়ে যাওয়া হল। কায়রোতে সাহেব ডাক্তার সুলভ নয়। প্রত্যুৎপন্নমতি জোসেফিন ম্যাকলাউড সে বন্দোবস্তও করলেন।

বিবেকানন্দকে পরীক্ষা করে এবং তাঁর ডায়াবিটিসের কথা জেনে ডাক্তারের মুখ গম্ভীর হল।

মাদাম কালভের আকুল প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, টা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে

বাঁচবেন তো?

ম্ভবত। তবে আবার হলে আর রক্ষে নেই। খারাপ লাগছে। এত অল্প বয়েস

নাকে কি হাসপাতালে নিয়ে যাব?

জ্ঞান না ফিরলে অবশ্যই

গভীর রাতে রক্তাভ চোখ মেললেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর শিয়রে বসে আছেন মাদাম কালভে ও জোসেফিন ম্যাকলাউড।

মাদাম? ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলেন স্বামীজী।

লুন, স্বামীজি

মি ফিরে যাব

কোথায় যাবেন?

দেশে ফিরে যাব

কে? আমাদের সাথে থাকবেন না?

না। আমাকে দেশে ফিরতে হবে। জোসেফিন?

লুন, স্বামীজি

জানোএক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখলাম আমি

কী স্বপ্ন, স্বামীজি?

সেভিয়ার, ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ডুবে যাচ্ছে এক অতল গহ্বরে আর দূর থেকে আমায় বার বার ডাকছে। বলছে—রক্ষা করুন স্বামীজি, আমায় রক্ষা করুন! আপনি ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই। আমায় যেতেই হবে। আমি ফিরে যাব। দেশে ফিরে যাব আমি। ভারতে ফিরে যাব আমি

পাশ ফিরে আবার নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়লেন বিবেকানন্দ। ঘুমের মধ্যেই বিড় বিড় করে বলে চললেন, ফিরে যাব। আমি দেশে ফিরে যাব

(ক্রমশ…)

 
 
top