নতুন আলো

 

পর্ব ২০

নিজের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে মুগ্ধ করেছেন বাংলার ছোটোলাট উডবার্নকে। প্যারিসে উড়িয়েছেন বিজয় বৈজয়ন্তী। তাহলেও জগদীশচন্দ্র স্বস্তি পাচ্ছেন না। রদ্যাঁর ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তারপর থেকে শরীর খারাপ চলছেপেটের ব্যথা লেগেই আছে। মাঝে মাঝেই বমির দমক ওঠে। কলিক পেনে জেগে বসে থাকেন সারা রাত। তখন আফিমের গুলি ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। আফিমের ঘোরে কিছুটা হলেও ব্যথার উপশম হয়। প্রথমে প্যারিসে ডাক্তার দেখেছিলেন। তারপর ডেপুটেশনের কাজে এসেছেন লন্ডন। সেখানে নিবেদিতা ও সারা বুলের সুপারিশ অনুযায়ী দেখিয়েছেন সুপ্রসিদ্ধ ড. ক্রম্বি কে। তাঁর কথা শুনেও মনমেজাজ খারাপ। ড. ক্রম্বি খুব একটা শ্রুতিমধুর সংবাদ দেননি। পিত্তথলির প্রদাহে ভুগছেন জগদীশ। তাড়াতাড়ি অপারেশন না করলে আশঙ্কার কারণ আছে।

তদিন শুয়ে থাকতে হবে?

তা প্রায় পাঁচ সপ্তাহ তো বটেই!

পাঁচ সপ্তাহ! জগদীশ আর অবলার চোখে আতঙ্ক।

এই বিজন বিভুঁইতে পাঁচ সপ্তাহ কোথায় থাকবেন তাঁরা? তাও তো সারা বুলের বদান্যতায় চিকিৎসার খরচ কিছু লাগছে না। এ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন নিবেদিতা স্বয়ং নতুবা সামান্য মাসমাইনের ভারতীয় অধ্যাপক জগদীশ বিলেতে মহার্ঘ্য চিকিৎসা চালাতে পারতেন না ।

নিবেদিতা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, পনি চিন্তা করবেন না, বেয়ার্ন। উইম্বল্ডনে আমার মায়ের ছোটো ফ্ল্যাট আছে। আপনারা যতদিন খুশি থাকুন সেখানে

জগদীশ ও অবলা কৃতজ্ঞ চোখে চেয়েছেন নিবেদিতার দিকে। এই মহিলা সত্যিই মহীয়সী নিবেদিতা জগদীশকে আদর করে বেয়ার্ন বলে ডাকেন।

এর মধ্যেই এক বৈজ্ঞানিক বন্ধু জগদীশের আশঙ্কা বাড়ালেন।

তুমি ড. ওয়ালারকে চেন?

নাম শুনেছি

খ্যাপাটে! তোমার লাইনেই  রিসার্চ করছে। ওকে একটু এড়িয়ে চোলো!

কে?

বলছে যে, জীবন আর মরণের রেখা মাটিতে পোঁতা বীজে চতুর্থ দিনে দেখা যায়

না, না, আরও আগে থেকে

সে তো তোমার ভক্তরা বলছেই। তাদের সঙ্গে ওয়ালারের হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেছে

টে? আমার ভক্ত আছে নাকি এখানে?

প্রচুর! প্রচুর! ক্রমেই তারা সংখ্যায় বাড়ছে তবে শত্রুর সংখ্যাও কিছু কম নয়

আসলে বিলেতে বৈজ্ঞানিকরা নানা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পরেছেন। কেউ কেমিস্ট, কেউ-বা ফিজিসিস্ট, কেউ ফিজিওলজিস্ট। কারও সাথে কারও মতের মিল নেই।

জগদীশের চোখের সামনেই এক ফিজিসিস্টের  সঙ্গে এক কেমিস্টের প্রায় হাতাহাতি বাধবার উপক্রম হল। দুজনেই কিঞ্চিত মদিরাসিক্ত। জড়িত কণ্ঠে, স্খলিতস্বরে কেমিস্টপ্রবর ফিজিসিস্টকে বলে চললেন, পনাদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই কিন্তু আপনাদের জে জে টমসন যে কথা বলেছেন, সে কথাটা কি ঠিক হল?

কী বলেছেন জে জে টমসন?

কে? উনি না বলে বেড়াচ্ছেন যে অ্যাটম অবিভাজ্য নয়? অ্যাটমের থেকেও ক্ষুদ্র অণু রয়েছে?

ফিজিসিস্ট ভদ্রলোক তেরিয়া হয়ে উঠলেন। হেঁচকি তুলে বললেন, ঠিকই তো বলেছেন উনি! আপনার তাতে কী?

তাতে কি? কেমিস্টের গোঁফের ডগা ক্রোধে লাল হয়ে উঠল। মাদের অ্যাটমের গায়ে হাত দেবেন না, মশাই! অ্যাটম আদি এবং অবিভাজ্য ! আপনারা ফিজিসিস্টরা আপনাদের নোংরা হাত অবিলম্বে আমাদের পবিত্র অ্যাটমের গা থেকে সরান!

জগদীশ মজা পেলেন ঠিকই, কিন্ত এও বুঝলেন যে এই পরিস্থিতিতে তাঁর সমাদর হওয়া সহজ নয়।

অবশ্য এর মধ্যেই নানা বৈজ্ঞানিক পত্রে জগদীশের কাজের সপ্রশংস উল্লেখ বেরোচ্ছে।

সৌভাগ্যক্রমে, ব্র্যাডফোর্ডের এক বক্তৃতায় জগদীশচন্দ্র সুবিখ্যাত পদার্থবিদ স্যার অলিভার লজের মন জয় করে নিলেন। তারপর সপারিষদ জগদীশের যন্ত্রপাতি দেখতে এলেন লজ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন তাঁর স্টিরিওস্কোপ যন্ত্র। দেখলেন আর্টিফিশিয়াল রেটিনা। দেখে তো তিনি তাজ্জব। জগদীশকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, দারুণ কাজ করছেন আপনি। কিছু মনে করবেন না। ভারতে আর্থিক সাহায্য কেমন পাচ্ছেন আপনি?

কিছুই না ! সামান্য কলেজে পড়াই আমি। কোনো রিসার্চ গ্রান্ট নেই। নিজের পকেটের পয়সা খরচা করে রিসার্চ করতে হয়

পনার বয়েস অল্প। আরও অনেকদিন ভালো কাজ করবেন আপনি। আপনার কাজের সূত্র ধরে বড়ো বড়ো গবেষণার রাস্তা খুলে যাবে

তো?

লজ চোখ টিপলেন, ভারতে থেকে সময় নষ্ট করছেন কেন? আমাদের এখানে আসুন। আপনার মতো প্রতিভাকে আমরা সবরকম সুযোগসুবিধা দেব

পরের দিন প্রোফেসর ব্যারেটের মুখেও একই সুর। ব্যারেট সম্ভবত লজের মুখে কিছু শুনেছেন ।

বো, তোমার জন্য দারুণ একটা কাজের খবর আছে

কোথায়?

কেম্ব্রিজে একটা ভালো প্রফেসরের পদ খালি হয়েছে। প্রচুর সুযোগসুবিধা । রিসার্চ গ্রান্ট। আমরা তোমার কথা ভাবছি

নিশ্চয়ই খুব প্রতিযোগিতা থাকবে?

ব্যারেট মুরুব্বির হাসি হাসলেন, সব ভেবো না। ও আমরা দেখে নেব। জান তো এ দেশে সব কিছুই রেকমেন্ডেশন আর রেফারেন্সে হয়

হাত বাড়ালেন ব্যারেট, তুমি রাজি? পাকা কথা বলি তাহলে?

কটু ভাবতে দিন, প্রোফেসর

ধীর পায়ে ঘরে ফিরলেন জগদীশ। মাথা ঘুরছে ঘটনার অভিঘাতে।

এক তো দেশে লাঞ্ছনার শেষ নেই। কলকাতার সাহেবরা সব সময় বাঁশ দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাছে। পয়সাকড়িরও নিদারুণ টানাটানি। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামান্য বেতনভুক শিক্ষক। কোনো রিসার্চ গ্রান্ট নেই। পকেটের পয়সা ঢেলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে রিসার্চ করছেন তিনি। আর এখন অসুস্থ শরীরে বিদেশে পড়ে আছেন। চিকিৎসার জন্যও পরের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল ।

কী করবেন? কী সিদ্ধান্ত নেবেন?

ঘরে ঢুকতেই অবলা এগিয়ে এলেন, বির চিঠি এসেছে

বি? উল্লসিত হয়ে উঠলেন জগদীশ। প্রবাসে এই বন্ধুর চিঠি তথা মানসিক সান্নিধ্যের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ বড়দাদার জিওমেট্রি সংক্রান্ত কাজ পাঠিয়েছেন। আর পাঠিয়েছেন সোফিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত ব্রহ্মবান্ধবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার কাটিং। গল্পগুচ্ছ-এর প্রথম খণ্ড এবং চিঠিও পাঠিয়েছেন সঙ্গে।

জগদীশচন্দ্র ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ বন্ধুকে প্রবল উৎসাহ দিয়ে লিখেছেন:

যুদ্ধ ঘোষণা করে দিন! কাউকে রেয়াত করবেন না! যে হতভাগ্য সারেন্ডার করবে না, লর্ড রবার্টস-এর মতো নির্মম চিত্তে তাদের পুরাতন ঘর দুয়ার তর্কানলে জ্বালিয়ে দেবেন। তারপর আপনি ফিরে এলে আপনার সে বিজয় গৌরব আমরা বাঙ্গালিরা ভাগ করে নেব !

রবি তাহলে বুয়র যুদ্ধে কী ঘটছে সব খবরই রাখে! স্মিত মুখে ভাবলেন জগদীশ।

বাঙালিদের অর্থহীন গৌরবপ্রিয়তা নিয়েও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করেছেন রবীন্দ্রনাথ:

আপনি কি করলেন তা বুঝবার কিছু দরকার হবে না, কেবল টাইমস পত্রে ইংরেজের মুখ থেকে বাহবা শোনবামাত্র সেই বাহবা আমরা লুফে নেব।– এদিকে আপনার জন্য সিকি পয়সার কার মাথাব্যথা নেই, কিন্তু যখন জগৎ থেকে আপনি যশের ফসল আনবেন তখন আপনি আমাদের!

আগের পত্রে জগদীশ বন্ধূকে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন তাঁর হতাশার কথা। লিখেছিলেন:

জীবনের কথা কেহ বলিতে পারে না। আমি দেশ হইতে আসিবার সময় ও জানিতাম না যে কি বিশাল ও অনন্ত বিষয়ে আমার হাত পড়িয়াছে। এখন সব কথার অর্থ করিতে যাইয়া দেখি যে ঘোর অন্ধকারে অকস্মাৎ জ্যোতির আবির্ভাব হইয়াছে। জন্মজন্মান্তরেও আমি ইহার শেষ করিতে পারিব না।

রবীন্দ্রনাথ সান্ত্বনা দিয়ে লিখেছেন:

সীজার যে নৌকায় চড়েন সে নৌকা কি কখনও ডুবিতে পারে ? মহৎ কর্ম আপনাকে আশ্রয় করিয়া আছে, আপনাকে অতি শীঘ্র সারিয়া উঠিতে হইবে।

রবীন্দ্রনাথের ভাইপো নিতীন্দ্রনাথ গুরুতর অসুস্থ। তার জন্য রাত জেগে রবীন্দ্রনাথ ক্লান্ত। প্রায় আট রাত ঘুমোতে পারেননি তিনিতবে তার মধ্যেই খবর দিয়েছেন যে গল্পগুচ্ছ-র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, সেটা তিনি পাঠাচ্ছেন। তর্জমা করা সম্ভব কিনা? পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, কঙ্কাল, নিশীথে প্রভৃতি গল্প রয়েছে।

জগদীশ সোফায় বসে একমনে পড়ছিলেন। অবলা চা এনে দিয়েছেন। সমধর্মা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের চিঠি জগদীশকে বরাবরই উদ্দীপ্ত করে তোলে। এবারও অন্যথা হল না।

অবলাকে বললেন, বির লেখা অনুবাদ কীভাবে করা যায় বলো তো?

তুমি তো পারবে নাএতো কাজ তোমার, তায় আবার অসুস্থ শরীর

হঠাৎ জগদীশের মাথায় আইডিয়া খেলে গেলো, উরেকা!

কী হল?

পেয়েছি! পেয়েছি!

কী পেয়েছ?

নিবেদিতা!

নিবেদিতা?

হ্যাঁ। নিবেদিতা তুমি বা আমি বলে যাব আর নিবেদিতা অনুবাদ করে যাবে। ঠিক যেভাবে ও আমার পেপারগুলো লিখতে সাহায্য করে

ঠিক। ওর কথা তো ভাবিনি?

বির কবিতাগুলো অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব

হ্যাঁভাষার ওই সৌন্দর্য ইংরেজিতে আসবে না

কিন্তু ছোটোগল্প? কাবুলিওয়ালা বা ছুটি-র মতো গল্প ক-টা সাহেব লিখতে পেরেছে?

বন্ধুর কথা বলতে বলতে জগদীশ এতই মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যে, অবলাকে আসল কথাই বলা হয়নি।

এবার চটকা ভেঙে প্রফেসর ব্যারেটের প্রস্তাবের কথা খুলে বললেন, কেমব্রিজে চাকরি পাকা। জগদীশ শুধু হ্যাঁ বললেই হয়

অবলা উল্লসিত হয়ে উঠলেন, নিয়ে নাও! নিয়ে নাও!

নিয়ে নেব?

বশ্যই! এত ভাবার কী আছে? দেশে থাকতে নিত্য সাহেবদের লাথিঝ্যাঁটা খাচ্ছওগুলো ছোটো ইংরেজ। এখানকার সাহেবগুলো বড়ো ইংরেজতোমায় মাথায় তুলে রাখবে

বলতে বলতে অবলা দেখলেন যে, জগদীশের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠেছে।

কী হল?

ব্যথাটা আবার উঠছে, অবলা। পারছি না! সহ্য করতে পারছি না!

টলতে টলতে জগদীশ শয়নকক্ষের দিকে চললেন।

ফিম দেব?

দা

মাঝে মাঝেই গলস্টোনের সুতীব্র বেদনায় অস্থির হয়ে ওঠেন জগদীশ। অবলার অনেক কষ্টে সংগৃহীত আফিমের গুলিই তখন একমাত্র বেদনানিবারক। অবলা আগে কিছুদিন ডাক্তারিও পড়েছিলেন। সে বিদ্যাটা এই পরিস্থিতিতে কাজে আসছে ।

আফিমের ঘোরে ব্যথার উপশম হল বটে, তবে অভুক্ত রইলেন জগদীশ। মাঝরাতে টলতে টলতে উঠলেন তিনি আফিমের ঘোর কাটেনি। ধোঁয়া ধোঁয়া দেখছেন চারদিক। প্রবল খিদে পেটে। অবলা ঘুমোচ্ছেন। তাঁকে জাগালেন না জগদীশ। রান্নাঘর থেকে শুকনো পাউরুটি নিয়ে চিবোতে লাগলেন কিছুক্ষণ। ম্যান্টলপিসের ওপর রাখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিটা নিয়ে আবার পড়তে শুরু করলেন

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

আপনার সফলতার পথে স্বদেশও যদি অন্তরায় হয় তবে তাহাকেও ক্ষুণ মনে বিদায় দিতে হইবে।

অবলা বলছেন বিলেতের কাজটা নিয়ে নিতে। রবিও একই কথা বলছে। সত্যিই তো। প্রফেসর ব্যারেটের প্রস্তাব মেনে নিলেই তো সব দিক থেকে ভালো

কী করবেন? জগদীশ কী করবেন?

আধো ঘুম, আধো জাগরণ এবং আফিমের স্বপ্নিল নেশায় হঠাৎ এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখলেন জগদীশ।

এক ছায়ামূর্তি জগদীশের সামনে ভেসে উঠেছেবিধবার বেশধারিণী। পরিধানে সাদা থান। কেবল এক পাশের মুখ দেখা যাচ্ছে। বলিরেখাঙ্কিত দুঃখ কাতর সে মুখ। সেই অতি শীর্ণ অতি দুঃখিনীর ছায়া জগদীশকে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল—বরণ করতে এসেছি। তারপর মুহূর্তের মধ্যে সে ছায়ামূর্তি মিলিয়ে গেল।

ঘোর কেটে চমকে চাইলেন জগদীশ। কেউ কোত্থাও নেই। পাশের ঘর থেকে নিদ্রিত অবলার মৃদু নাসিকাধ্বনির শব্দ ভেসে আসছেসামনের টেবিলে রবীন্দ্রনাথের পত্র খোলা পড়ে রয়েছে। কে এই ছায়ামূর্তি? ভারতমাতা? বাংলা মা?

জগদীশের মনে সহসা উত্তর ভেসে উঠল। তাঁর সংশয়ের, তাঁর প্রশ্নের জবাব তিনি পেয়ে গেছেন।

আফিমের নেশার ঘোর কেটে গেছে। রাত শুনশান। মাঝে মাঝে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি প্রহর ঘোষণা করছে। লেখার টেবিলে বসে কাগজ-কলম নিয়ে জগদীশচন্দ্র একমনে রবীন্দ্রনাথের চিঠির উত্তর লিখতে লাগলেন:

আমার হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষে। যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি তাহা হইলেই আমার জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যে সব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায় তাহাও সহ্য করিব।

 

জামশেদজি টাটা ভারতে একটা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সায়েন্স ইউনিভার্সিটি গড়তে চান। এ ব্যাপারে টাকা ঢালতে প্রস্তুত তিনি। কম নয়। প্রায় তিরিশ লাখ টাকা । নিবেদিতার এ ব্যাপারে উৎসাহ যথেষ্ট। একটা বড় কারণ অবশ্যই জগদীশচন্দ্র। এই মহৎ প্রতিভা প্রতিনিয়ত ব্রিটিশদের হাতে লাঞ্ছিত। তাঁকে তাঁর স্বদেশে যদি কাজের একটা উপযুক্ত ক্ষেত্র গড়ে দেওয়া যায়, তাহলে অর্থচিন্তা মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের সাধনায় ডুব দিতে পারবেন তিনি।

সেই সুবাদে লন্ডনে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতে এসেছেন নিবেদিতা টাটা এবং নিবেদিতা ছাড়াও আছেন সারা বুল, জর্জ বার্ডউড এবং অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবর্গ।

জর্জ বার্ডউড সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের চূড়ান্ত প্রতিভু। বয়স হয়েছে। মোটা সাদা গোঁফ। বলিরেখাঙ্কিত মুখ অহং পরিপূর্ণ। সারা বুলের পাশে বসেছেন তিনি। স্যার জর্জ আর্টের ব্যাপারে উৎসাহীপ্রথমে সারার সঙ্গে সে বিষয়েই কথা হতে লাগল। উলটো দিকে বসেছেন নিবেদিতাতাঁর পাশে এক লালমুখ, ঝোলা গোঁফ স্কচ ভদ্রলোকসুন্দরী তরুণী নিবেদিতাকে দেখে ভদ্রলোকের ভাবান্তর হল। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তিনি নিবেদিতার উরুতে হাত বোলাতে লাগলেন। টেবিলের নীচে এক ঝটকায় সে হাত সরিয়ে দিতে ভদ্রলোক ফিসফিসিয়ে জানালেন যে তিনি বিপত্নীক এবং সন্ধেবেলা একটু নিঃসঙ্গ বোধ করেন। নিবেদিতার রক্তচক্ষু দেখে অবশ্য ভদ্রলোকের উত্তেজনা কিঞ্চিৎ প্রশমিত হল ।

প্যারিসে শিল্প প্রদর্শনীর প্রসঙ্গে বার্ডউড খুব উচ্ছসিত ননফরাসিদের আর্টকে উঁচু দরের বলে মনেই করেন না তিনিআর ইম্প্রেশনিজম, পোস্ট- ইম্প্রেশনিজম তো একেবারেই অসহ্য। জোর গলায় বললেন, র্টের ব্যাপারে ফরাসিরা গোল্লায় যাচ্ছেঅবশ্য ফরাসিদের পুরো দেশটাই গোল্লায় যাচ্ছে, শুধু আর্ট কেন? জার্মানদের কাছে কম তো প্যাঁদানি খায়নি ব্যাটারা! কাপুরুষ, নিকম্মা, চরিত্রহীন সব!

ব্রিটিশদের ধকই আলাদা। ব্রিটিশরা হেরেছে কখনো? মহান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কি কখনো অস্ত যায়?

বার্ডউডের বাহ্বাস্ফোটে নিবেদিতার আইরিশ রক্ত রাগে টগবগ করে ফুটতে লাগল। ভাবলেন যে, একবার নেপোলিয়নের প্রসঙ্গ তোলেন। এই বুয়র যুদ্ধেও তো চোখের সামনে ব্রিটিশরা ল্যাজেগোবরে হচ্ছে। অনেক কষ্টে রাগ চেপে প্রসঙ্গান্তরে গেলেন তিনি ।

চ্ছা ভারত সম্বন্ধে কী ভাবছেন আপনারা?

ভারত? ওয়াইন এর গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ভুরু কুঁচকোলেন বার্ডউড।

মিস নোবল, ভারতবাসীদের ভালোর জন্যেই তো আমরা সেখানে পড়ে রয়েছি অসভ্য নেটিভদের সুসভ্য করাটাই তো আমাদের কর্তব্য—হোয়াইটট ম্যানস বার্ডেন!

সহসা স্যার বার্ডউডের খেয়াল হল যে, উলটো দিকে জামশেদজি টাটা বসে আছেন। তাঁর বদান্যতাতেই এই ভোজসভার আয়োজন। হাত তুলে তিনি বললেন, রি মি. টাটা! আপনারা পার্শিরা সুসভ্য! আপনাদের অসভ্য নেটিভ বলা যায় না!

নিবেদিতা ছাড়ার পাত্রী নন। বললেন, স্যার বার্ডউড, ঠিক করে বলুন তো? সত্যিই কি আপনি মনে মনে বিশ্বাস করেন যে, ভারতের ভালোর জন্যই আমরা সেখানে পড়ে আছি?

উৎকৃষ্ট ফরাসি মদিরা বেশ কয়েক গ্লাস পান হয়ে গেছে। ফুরফুরে, প্রসন্ন মেজাজে বার্ডউড সুন্দরী মিস নোবলের দিকে চাইলেন ।

মিস নোবল, আপনি বড়ো নাছোড়বান্দা। পেটের কথা টেনে বের করবেনই করবেন। হক কথা বলি তাহলে?

লুন?

চোখ টিপলেন বার্ডউড, মিস নোবল, ইন্ডিয়াতে আমাদের ব্রিটিশ রাজত্ব আমাদের ব্রিটিশদের ভালোর জন্যেই। ওই ব্যাটা নেটিভগুলোকে উদ্ধার করার জন্যে নয়। তবে এসব কথা চার দেয়ালের মধ্যে আমরা বলে থাকি। বাইরে ঢাক পেটাই না। আমাদের কর্তব্য আমাদের প্রতি। ওই গুখেকো নেটিভগুলোকে নিয়ে ভেবে কী হবে?

ভারতীয়দের কর্তব্য তাহলে কী?  জিজ্ঞেস করলেন টাটা।

নিজেদের প্রতি। তারা আমাদের সিকি পয়সা ধারে না, মশাইতবে

বে?

হেঁচকি তুলে বার্ডউড বললেন, গাধা আর রামছাগল ভারতীয়দের সে বোধ নেই, মিস্টার টাটা আর কোনদিন হবেও না। ওরা খুব প্রভুভক্ত জাত। তাছাড়া ভারতীয়রা নিরামিষ খায় । আমাদের পেছনে লাগার তাকত নেই ওদের তবে, মিস্টার টাটা, আমাকে ভুল বুঝবেন না। পার্শিদের আমি এই সব বিশেষণ দিচ্ছি না। পার্শিরা সুসভ্য। ইংরেজ আর পার্শিদের স্বার্থ এক

জামশেদজি টাটা মাথা নোয়ালেন।

নিবেদিতার দিকে ফিরলেন বার্ডউড, পনি কি জানেন, মিস নোবল, হিন্দুরা পর্যন্ত বিচারক হিসেবে ইউরোপিয়ানদেরই বিশ্বাস করে? নিজেদের জাতের ওপরে ব্যাটাদের নিজেদেরই কোনো ভরসা নেই? থাকবে কী করে? বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যেবাদীর জাত তো সব!

ইতিমধ্যে মধ্যাহ্নভোজ শেষ হতে চলেছে। পরিচারক একে একে মিষ্টান্নের ডিশ হাজির করছে। যে কারণে এই ভোজসভা আহূত অর্থাৎ ভারতে একটা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সায়েন্স ইউনিভার্সিটি তৈরি করা, সে বাবদ একটা বাক্যও খরচা হয়নি। বার্ডউড অবান্তর জাতিবিদ্বেষী এবং সাম্রাজ্যবাদী বাহ্বাস্ফোটেই সময় কাটিয়ে দিয়েছেন।

নিবেদিতা চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তিনি তো নিজের জন্য আসেননি। এসেছেন যাতে জগদীশ চন্দ্রের একটা হিল্লে হয়।

নিবেদিতা বললেন, স্যার জর্জ, টাটা ভারতে যে ইউনিভার্সিটির প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাতে ভারতীয়দের চাকরির ব্যাপারে আপনি কী ভাবছেন?

কিছুই ভাবছি না নির্বিকার মুখে বললেন বার্ডউড।

মানে?

মিস নোবল, সায়েন্স হল গে এক বিশাল ব্যাপার। এটা শুধু ভারতের সমস্যা নয়। সারা বিশ্বের সমস্যা। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সায়েন্স ইউনিভার্সিটিতে শুধু ভারতীয়দের নিলে সেটা সুইসাইডাল হবে। এই ইউনিভার্সিটি সারা বিশ্বের জন্য খুলে দিতে হবে

কীভাবে করবেন সেটা?

জামশেদজি টাটার দিকে তাকালেন জর্জ বার্ডউড, মিস্টার টাটা, মাত্র একটা উপায়েই ব্যাপারটা করা সম্ভব

কীভাবে?

পনার এই পুরো ব্যাপারটা আপনি সরকারের হাতে তুলে দিন

সে ক্ষেত্রে, সারা বিশ্ব থেকে কর্মী কীভাবে নির্বাচিত হবে?  জিজ্ঞেস করলেন নিবেদিতা।

পৃথিবীর সমস্ত ইউনিভার্সিটি থেকে আমরা অ্যাডভাইজার নিয়োগ করব

তাতে কলকাতা, বম্বে, ম্যাডরাস ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধিও থাকবে?

সারটেনলি নট! বার্ডউড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, ভারতীয় ইউনিভার্সিটিগুলো সবক-টাই গোল্লায় গেছে! কলকাতার অবস্থা তো তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ!

কিন্ত ভারতের সরকারই তো সেগুলো চালাচ্ছে?

তাতে কী? ভারতের ইউনিভার্সিটি থেকে উপদেষ্টা নেওয়া ঠিক হবে না

নিরুপায় নিবেদিতা টাটার দিকে চাইলেন। তাঁর চোখও রাগে জ্বলছে।

মি. টাটা, আপনি তো স্যার জর্জের কথা শুনলেন। উনিই তো বলছেন যে সরকার অপদার্থ। এই অপদার্থদের হাতে আপনার কষ্টার্জিত টাকা দেবেন কেন?

বার্ডউড বুঝলেন যে, তিনি নিবেদিতার কথার প্যাঁচে পড়েছেন। সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি বললেন, না, মিস নোবল, আমি একবারও বলছি না যে ভারতীয় ইউনিভার্সিটিগুলো থাকবে না। আসলে কী জানেন?

কী?

ই ভারতীয় ইউনিভার্সিটিগুলোর তো প্রায় বছর পঞ্চাশ হল?

তা হয়েছে 

ই পঞ্চাশ বছরে সায়েন্স, লিটারেচার, আর্ট কোনও কিছুতে এরা একটাও টপ ক্লাস লোক বের করতে পেরেছে? একটা? আমি টপ ক্লাস লোকের কথা বলছি মিস নোবল—মেন অফ রিয়াল এমিনেন্স। সেকেন্ড ক্লাস লোকদের নাম করবেন না

পনার টপ ক্লাস লোকের সংজ্ঞা কী? জিজ্ঞেস করলেন নিবেদিতা।

যেমন ধরুন রয়্যাল সোসাইটিতে যদি কাউকে পেপার পড়তে ডাকেউদ্ধত স্বরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন বার্ডউড।

নিবেদিতার মুখে জগদীশচন্দ্রের নাম এসে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সামলালেন নিজেকে ।

না! নিজের মুখে জগদীশের নাম করে তাঁকে এখানে ছোটো করবেন না!

শুধু শান্ত স্বরে বললেন, স্যার জর্জ, আমি এমন একজন লোকের কথা জানি, যাঁর সম্মানে ইতিহাসে এই প্রথম রয়্যাল সোসাইটি ক্রিসমাস পর্যন্ত সমস্ত সেশন বুক করে রেখেছে। ক্রিসমাস পর্যন্ত শুধু তাঁর কাজ নিয়েই সেখানে আলোচনা হবে

কে তিনি?

তিনি ব্রিটিশ নন, রাশিয়ান নন, জার্মান নন, ফ্রেঞ্চ নন, আমেরিকান নন

বে কে তিনি?

তিনি এক ভারতীয় হিন্দু

স্যার জর্জ বার্ডউড নিবেদিতার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন নিবেদিতা উন্মাদ হয়ে গেছেন, তারপর জামশেদজি টাটাকে বললেন, মি. টাটা বেশি ভাববেন না, পরের কথায় কানও বেশি দেবেন না। আপনার তিরিশ লাখ আপনি স্বচ্ছন্দে সরকারকে দিয়ে দিন। দেখবেন কাজ তাতেই হবে

টাটা বললেন, চ্ছা ধরুন এমন একটা ইউনিভার্সিটি তৈরি হল, তাতে ভারতীয়দের আর বিদেশিদের কি একই মাইনে হবে ? আপনার কী মত?

তারা তো এখন একই মাইনে পায়

নিবেদিতা এতক্ষণ রাগ চেপে ছিলেন, এবার সামলাতে না পেরে বললেন, মিথ্যে কথা!

কী বললেন, মিস নোবল?

লছি এটা মিথ্যে কথা! আপনি মিথ্যে কথা বলছেন!

মি মিথ্যে কথা বলছি, মিস নোবল? বার্ডউডের অভিজাত রক্ত গরম হয়ে উঠল।

পনি না জেনে ভুল তথ্য দেবেন না, স্যার জর্জ

মি ভুল তথ্য দিচ্ছি?

বশ্যই! ভারতে কোনও ইউনিভার্সিটিতে ইউরোপিয়ান আর নেটিভদের বেতন এক নয়। বিরাট বৈষম্য রয়েছে। নেটিভরা অনেক কম মাইনে পায়। এটা আপনিও জানেন, আমিও জানি!

নীল চোখের তারা রাগে জ্বলছে, ঝোলা সাদা গোঁফ খাড়া হয়ে উঠেছে রাগে, সক্রোধে নিঃশ্বাস নিয়ে স্যার জর্জ বার্ডউড হিসহিসিয়ে বললেন, হারামজাদা আইরিশ বেজন্মা!

নিবেদিতা অবশ্য ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছেন। স্যার জর্জের অন্তিম অভিসম্পাত তিনি শুনতে পেলেন না।

(ক্রমশ…)

 
 
top