গল্প-কবিতার আন্দোলন: বাংলা সাহিত্যের অন্তঃস্রোত

 

সাহিত্যের প্রবাহমানতায় বাঁক বদলের ইতিহাস নতুন নয়। সাহিত্য যখন গতানুগতিকতাকে গায়ে মেখে বইতে থাকে, তখনই শুরু হয় প্রথা ভাঙার খেলা। অন্তত সাহিত্যের ইতিহাস তাই বলছে। সব দেশে, সব সাহিত্যে এই একই ধরণ। স্বাধীনতার দেড় দু-দশক বাদে, বিশ শতকের ছয়ের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যও মেতে উঠেছিল প্রথা ভাঙার খেলায়। বাংলা সাহিত্যের বহমান বিষয়-বিন্যাসের ঘূর্ণাবর্তে শ্রদ্ধা হারিয়ে একদল তরুণ লেখকের সাধ হয়েছিল সাহিত্যের স্বাদ বদল করার। তাঁরা ছয় এবং পরবর্তী দশকগুলিতে বার বার গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন বিভিন্ন সাহিত্য আন্দোলন—হাংরি জেনারেশন, শ্রুতি, শাস্ত্র বিরোধী, প্রকল্পনা, ধ্বংসকালীন, নিম সাহিত্য, নিওলিট মুভমেন্ট, ঘটনাপ্রধান পদ্য, নতুন নিয়ম, গল্পতন্ত্র ও চাকর বিরোধী গল্প আন্দোলন, সমন্বয় ধর্মী গল্প, হার্ড লিটেরেচার, মালভি আন্দোলন—এই সব নাম দিয়ে। প্রায় প্রতিটি আন্দোলনের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক বা একাধিক লিটল ম্যাগাজিন। গল্প এবং কবিতা, মূলত সাহিত্যের এই দুটি জনপ্রিয় প্রকরণের গোড়াতেই আঘাত আনতে চেয়েছিল আন্দোলনকারী সাহিত্যিকগণ।

বিশ শতকের প্রথম-দ্বিতীয় দশক থেকেই বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে বারে বারে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন অনেক কবি-সাহিত্যিক। প্রমথ চৌধুরীর সবুজ পত্র (১৯১৪), দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগের কল্লোল (১৯২৩), মুরলীধর বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের কালি কলম (১৯২৬), বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্তের প্রগতি (১৯২৭), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় (১৯৩১), বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা (১৯৩৫), প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সঞ্চয় ভট্টাচার্যের নিরুক্ত (১৯৪০), কিংবা আর একটু পরের দিকের বিমল করের ছোটগল্পনূতনরীতি (১৯৫৮-১৯৫৯) বাংলা গল্প-কবিতাকে বদলে দিতে চেয়েছিল বিষয়-বিন্যাসে; বদলে দিতে চেয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত চিন্তা-চেতনা। পাশাপাশি পূর্বাশা (১৯৩২), শতভিষা, (১৯৫১), কৃত্তিবাস (১৯৫৩), ইত্যাদি পত্র পত্রিকা প্রকাশের মহৎ উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেও বলা যায় ১৯৬০ থেকে যে সাহিত্য আন্দোলনগুলির সূচনা তাদের সঙ্গে পূর্ববর্তীদের মূলগত পার্থক্য ছিল। আন্দোলনকারী সাহিত্যিকরা কোথাও ম্যানিফেস্টো রচনা করে সরাসরি ঘোষণা করেছেন তাঁদের বক্তব্য, কোথাও আবার ঘোষণা ছাড়াই গড়ে উঠেছে একজোট হওয়ার মূল সূত্রগুলো। মোটকথা বাংলা গল্প-কবিতার বাঁক বদলের ইতিহাসে উপযুক্ত সাহিত্য আন্দোলনগুলি স্বাতন্ত্র্য দাবী করে।

প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের হাতে বাংলা গল্প-কবিতার যে অলিখিত নিয়ম কানুন তৈরি হয়েছিল, মূলত তার বিরোধীতা করার উদ্দেশ্য নিয়েই বিশ শতকে ছয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আন্দোলনগুলি সংগঠিত হয়েছিল। ওই আন্দোলনগুলিতে অংশগ্রহণকারী সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেকেই সাহিত্য রচনা করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেওয়া নয়ম নীতির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। আবার অনেকের সাহিত্য রচনার হাতেখড়ি আন্দোলনের উত্তাপ গায়ে মেখে। রাজানুগ্রহের ধার না ধেরে প্রতিষ্ঠানে অধিক কদর লাভের চেষ্টায় মেকি প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা নয়, তাঁরা অনেকে সর্বাংশেই প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা করায় আন্দোলনকারী কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য জীবনে, এমনকী ব্যক্তি জীবনেও এসে পড়েছিল প্রতিষ্ঠানের চাপ। প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা করে এবং প্রতিষ্ঠানের বিরোধীতা সহ্য করে আন্দোলনকারী কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের সম্ভবনাকে খুব যে সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পেরেছিলেন, এমন নয়। তবে তাঁদের সাফল্য ব্যর্থতার নিরিখে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার সামগ্রিক পরিণাম সম্পর্কে এই সময়ের সংবেদনশীল পাঠকের কিছু ধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।

আন্দোলনগুলি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা শুরু করার আগে তাদের সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি একবার ফিরে দেখা প্রয়োজন। সাহিত্যের প্রেক্ষাপট আলোচনাকে যেহেতু সাহিত্যিকের অভিজ্ঞতা থেকে পৃথক করা যায় না, তাই বিগত শতাব্দীর ষাট থেকে যে গল্প-কবিতা আন্দোলনগুলির সূচনা, তার প্রেক্ষাপট আলোচনা অনিবার্যভাবে শুরু করতে হয় উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে। আন্দোলনকারীরা অনেকেই পরাধীনতা ও স্বাধীনতা নামক দুই বিপরীত শব্দ ও অভিজ্ঞতাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। বস্তুতপক্ষে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড়ো হওয়া, স্বাধীনতা অর্জন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নভংগ—এই তিন অভিজ্ঞতার বিরল সাক্ষী এই সময়ের লেখকরা। স্বাধীনতা, দেশভাগ, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্রমপরিবর্তিত আদর্শ—এই লেখকদের মানসিক মানচিত্রকে সুরেখ করেছে। পাঁচের দশকের শিশুরাষ্ট্র ভারতবর্ষের ইতিহাস কিছুটা স্থিতিশীল। আবার গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রাথমিক আচ্ছন্নতা কাটিয়ে ষাট-সত্তর যথারীতি ঘটনাপ্রবণ। স্বাধীনতার স্বাদহীনতা প্রথম টের পাওয়া গেল ১৯৫৯-এর খাদ্য আন্দোলনে। ১৯৬২-র ভারত-চিন যুদ্ধ বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতা শুধু অর্জন সাপেক্ষ নয়, রক্ষণ সাপেক্ষও বটে। যুদ্ধ, যুদ্ধের ফলশ্রুত মূল্যবৃদ্ধি, অর্থ এবং খাদ্য সংকট, গণআন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলতে থেকেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারত-চিন যুদ্ধের পরে পশ্চিমবঙ্গে কম্যুনিস্ট নেতাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৬৪-তে কম্যুনিস্ট পার্টির ভাঙন ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৬১ এবং ১৯৬৭-র দুটি সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল, কামরাজ পরিকল্পনার দূরপ্রসারী ব্যর্থতা, যুক্তরাষ্ট্র গঠন ও সর্বোপরি ১৯৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়া—প্রভৃতি বিষয়গুলি ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিচ্ছিন্ন বিবৃতি মাত্র নয়, বরং শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। নকশাল আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—আলোচনার পরিসরকে দীর্ঘায়িত না করেও বুঝতে অসুবিধা হয় না সুস্থির সুস্থিতির স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে সত্তরও।

১৯৪৭ নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি নির্ণায়ক মুহুর্ত। ভারতবাসীর মন আর ভারতবর্ষের মানচিত্রকে রক্তাক্ত করে পাওয়া স্বাধীনতা অনেকের অভিজ্ঞতাকেই স্বাদহীনতায় বদল করেছে। ক্ষমাহীন ঘৃণা আর নৃশংস হিংসার আগুনে ১৯৪৭-এর আগে-পরের ইতিহাসকে যতখানি দহন সহ্য করতে হয়েছে, ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন ইতিহাসে তার কোনো দ্বিতীয় দোসর নেই। আবহমানকাল ধরে বসবাস করার পর নিজের শিকড় ছিঁড়ে নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণার যথার্থ উপশম এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। লক্ষ লক্ষ শিকড় ছেঁড়া মানুষের অনিশ্চয়তা আর সব হারানোর হৃদয় বিদারক শোক সেই সময়ের মানবিক সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দিয়েছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগকে গান্ধিজি জীবন্ত প্রাণির শব ব্যবচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যে যন্ত্রণা ভারতবর্ষের চার প্রজন্মের মানুষের মনস্তত্ত্বকে অসাড় করে দিয়েছে। সেই যন্ত্রণাদগ্ধ পরিবেশে আন্দোলনকারী কবি-সাহিত্যিকদের কারো শৈশব, কারো কৈশোর লালিত হয়েছে।

 
 
top