গল্প-কবিতার আন্দোলন: বাংলা সাহিত্যের অন্তঃস্রোত

 

স্বাধীন ভারতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রথম সবচেয়ে বড় স্বপ্নভঙ্গ ১৯৫৯ সালের খাদ্যসংকট। খোলা বাজার থেকে চাল এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যক দ্রব্য উধাও হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষের অবস্থা তৈরি হয়। খাদ্যের দাবীতে লাগাতার সোচ্চার হয়ে গণআন্দোলন, গণবিপ্লবে অংশগ্রহণ করে সাধারণ মানুষ। এই ঐতিহাসিক অন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর পুলিশ নির্বচারে গুলি চালায়। বেঁচে থাকার প্রাথমিক প্রয়োজন খাদ্যের দাবিতে যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনে সশস্ত্র পুলিশি আক্রমণে প্রাণ হারান প্রায় আশি জন সাধারণ নাগরিক। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে এর থেকে বড় লজ্জা আর কি হতে পারে? ১৯৫৯ সালের এই খাদ্যসংকট চলেছিল ছয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশে ভয়ংকর উদ্বাস্তু সমস্যা এবং খাদ্যসংকট তার গণতান্ত্রিক কাঠামোটিকে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

ছয়ের দশক বেশ কয়েকটি যুদ্ধ পরিস্থিতির সাক্ষী থেকেছে। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধ ভয়ংকর আকার ধারণ করলে ২৬ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. এস রাধাকৃষ্ণন জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স জারি করেন। চিনের মতন শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণাম ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে আশঙ্কিত করেছিল। এই যুদ্ধের তিন বছর পর, আয়ুব খান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৬৫ সালে পাকিস্থান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে সেই যুদ্ধ খুব বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কড়া হুঁশিয়ারি ভারতবর্ষকে সন্দেহাতীতভাবেই কঠিন অভিজ্ঞতার সামনে ফেলে দিয়েছিল।

ছয়ের দশক ভারতবর্ষের রাজনীতিতে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, একটি ক্রান্তিকাল। স্বাধীনতার পর জাতীয় কংগ্রেসের টানা দুদশকের একছত্র আধিপত্যে আঘাত আসে ছয়ের দশকের মঝামাঝি সময়ে। ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরুর মৃত্যু, কিছুদিনের মধ্যে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর অকালমৃত্যু, ইন্দিরা গান্ধির বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীত্ব, মুরারজি দেশাইকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ইত্যাদি নানান উত্থান-পতনে সেদিন সরগরম ছিল দিল্লির রাজনীতি। ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেসের মন্ত্রীসভার পতন ঘটে। অভুতপুর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৬২ সালে ড. বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর থেকেই দলীয় শৃঙ্খলার অভাব স্পষ্ট হচ্ছিল। সেই বিশৃঙ্খলা কার্যত বিরোধের চেহারা নেয় যখন কামরাজ পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে অতুল্য ঘোষ এবং প্রফুল্ল সেন অজয় মুখোপাধ্যায়কে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। অন্যদিকে ১৯৬৪ সালে কম্যুনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে যাওয়ার পর খানিকটা সিপিআই ও সিপিআই (এম)-এর পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে বামফ্রন্টের সংগঠন। আর এই সমস্ত কিছুর ফলস্বরূপ ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে পরিবর্তন আসে পশ্চিমবঙ্গেও। বিধানসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয় কংগ্রেস। গঠিত হয় বাম সমর্থিত যুক্তফ্রন্ট সরকার। এই সময়ই, অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল থেকে নকশালবাড়ি এলাকা থেকে নকশাল আন্দোলনের সূচনা হলে মধ্যবিত্ত মন ও মননে প্রবল ধাক্কা লাগে। এর রেশ ছড়িয়ে যায় সাতের দশকের সূচনার বছরগুলিতে। ১৯৬৮তে রাষ্ট্রপতি শাসন, ১৯৬৯এ পুনরায় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, ১৯৭১এ কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফিরে আসা, ১৯৭৫এ জরুরী অবস্থা ঘোষণা ও ১৯৭৭এ তা প্রত্যাহার, ১৯৭৭ থেকে বামফ্রন্ট শাসনের সূচনা ইত্যাদি রাজনৈতিক তথা ঐতিহাসিক সমস্যা সংকটে নির্মিত হয়ে যায় দেশ তথা রাজ্যের টোল খাওয়া আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোটি।

আন্দোলনকারী কবি-গল্পকারদের চিন্তা-চর্চার ক্ষেত্র যেহেতু বিশ্বব্যাপ্ত তাই বিশ্বপরিস্থিতি এবং ইয়োরোপ, আমেরিকায় সংগঠিত শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলির আলোচনাও এই প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয়। বহির্বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহচর দেশগুলির সভ্যতার বর্বর রূপটি ক্রমেই অনাবৃত হয়ে পড়ছিল। পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে সামনে রেখে দুই আদর্শের গোলার্ধে ভাগ হয়ে যেতে চাইছিল পৃথিবী। জোট নিরপেক্ষতার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন নেহরু। একটু একটু করে পরমানু শক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিল সচ্ছল রাষ্ট্রগুলি। পৃথিবীর বাইরে শুরু হয়ে গিয়েছিল অন্তরীক্ষ দখলের লড়াই। গোটা বিশ্ব জুড়েই মূল্যবোধের অবনমন লক্ষ করা যচ্ছিল। পালটে যাচ্ছিল বিশ্বাস, নির্ভরতার সংজ্ঞা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রবল ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল ছয়ের দশকে। তরুন যুবকদের সচেতন মন অধিকার রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টায় পথে নেমেছিল। যা কিছু পুরাতন তাকেই মহান বলে মেনে নেওয়া কিম্বা ঐতিহ্যকে অকারণ আঁকড়ে ধরে থাকার প্রথা ছেড়ে সেদিনের যুব সমাজ বেড়িয়ে এসেছিল। খুব সহজেই বিশ্বের এই প্রথা ভাঙার গান পৌঁছে গিয়েছিল ষাট-সত্তর-আশির দশকের আন্দোলনকারী কবি-গল্পকারদের মনন বিশ্বে।

 
 
top