গল্প-কবিতার আন্দোলন: বাংলা সাহিত্যের অন্তঃস্রোত

 

কলকাতার কফি হাউসের সেই আড্ডাটারও ভূমিকা ছিল আন্দোলনকারী সাহিত্যিকদের জীবনে। পাঁচের দশকের শেষে কফি হাউস তোলপাড় হয়েছিল নতুন রীতির গল্প ভাবনায়। কামু, সার্ত্র কিম্বা জয়েসের ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বিমল করের নেতৃত্বে কয়েকজন কথাসাহিত্যিক প্রচলিত ধারার বাংলা সাহিত্যে অনাস্থা প্রকাশ করে গড়ে তুলেছিলেন ছোটোগল্প: নূতনরীতি (১৮৫৮-১৮৫৯)। সমসাময়িক সাহিত্য এবং পত্র-পত্রিকার ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বিদ্রুপ করে তাঁরা লিখেছিলেন: নাবালক স্কুলের ছাত্র থেকে কর্ম-অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ় এবং নাবালিকা কার্পেট বোনা মেয়ে থেকে দিবানিদ্রা আয়েসী গৃহিণী—এই বিচিত্র স্তরের ও রুচির একটি পাঠক সমাজকে প্রায় একটি অদৃশ্য ভগবানের মতনই অনুভব করতে হয়। না করে উপায় নেই, পথ নেই। ফলে আমাদের পাঠকের কাছে যা সুবোধ্য-সুগম্য-অপীড়াদায়ক এবং মনোমত হতে পারে—এমন গল্পই প্রকাশ করতে হয়। অসংখ্য এই ফরমায়েশি (প্রায় কি তাই নয়) গল্পের ভুরিভোজ দিতে দিতে মাঝে মাঝে সম্পাদকদেরও ক্লান্তি আসে, বিরক্তি আসে, হয়ত বিবেকেও লাগে, কিম্বা বোধে, আর তাই মাঝে মাঝে তাঁরা এমন দু-একটি গল্প প্রকাশ করেন যা প্রচলিত গল্পের স্রোত থেকে আলাদা, জাতে এবং গুণে। আর বলা বাহুল্য, কদাচিৎ কোনো পাঠকের প্রশংসা অথবা উৎসাহ এক্ষেত্রে পাওয়া গেলেও প্রায়শ সম্পাদককে ধিক্কারের পাত্রও হতে হয়। তথাপি তাঁরা সাধ্য মত উৎসাহ দেন।

ছোটোগল্প: নূতনরীতি‘-র সঙ্গে যারা যারা সংশ্লিষ্ট তাঁরা সবিনয়ে শুধু এইটুকু বলবেন: আমরা আমাদের মনোমত করে গল্প লিখতে চাই, যে লেখা সাধারণত চলতি পত্রিকাগুলির পক্ষে ছাপা সর্বদা সম্ভব নয়। বস্তুত এই কারণেই আমাদের এই গ্রন্থমালা, যার পাঠক স্বল্প, সহানুভূতিশীল এবং পরীক্ষামূলক রচনার প্রতি শ্রদ্ধাবান। নূতনরীতির লেখকগণ বাঙালি পাঠকের রুচি পূরণ করতে চাননি, লিখতে চেয়েছিলেন নিজেদের মর্জি মতন। গল্প-ঘটনা-চরিত্র-ভাষা-কলাগত ঐক্য-নাটকীয়তা ইত্যাদির পূর্ব ধারণা তাঁরা মানেননি, পুরাতন ভাবনাকে নতুন রূপে সাজিয়ে তুলতে চাননি তাঁদের সাহিত্যে। তাঁরা লিখেছিলেন, “আধুনিক জীবন আমরা সকলেই যাপন করি—যেহেতু এ যুগে আমরা জন্মেছি। কিন্তু সব লেখকই আধুনিক ননএ যুগে জন্মানো সত্ত্বেও। আধুনিক লেখক তিনি যিনি তাঁর যুগের সম্পর্কে সচেতন, তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেন। নতুন ধারণা বা ভাবনা, নতুনভাবে জানা অভিজ্ঞতা পুরনো রীতির বোতলে ঢোকানো যায় না। আধুনিক কবিরা যেমন তাঁদের নতুন অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কাব্যের পূর্বরীতি ভেঙেছেন, তেমনি ঔপন্যাসিকরাও প্রচলিত রীতি না ভেঙে পারেননি, এবং ছোটোগল্পের লেখকরাও নতুন সুরা পুরনো বোতলে ভরতে রাজী নন। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মিহির গুপ্ত এবং বিমল করের এই ভাবনা আর নতুন রীতির গল্প রচনা কফি হাউসের টেবিলে টেবিলে উত্তাল তরঙ্গ তুলেছিল এবং এর কম্পনে আলোড়িত হয়েছিল ষাট-সত্তরের গল্প আন্দোলনকারীদের অন্দর ভুবন।

কেবল নতুন রীতির সাহিত্য নয়, সম্পূর্ন নতুন এক মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিল ষাটের দশকের আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ। পাজামা পাঞ্জাবি পরা মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ তাঁর কবি বন্ধু পিটার অরলভস্কিকে সঙ্গে নিয়ে হামেশাই আসতেন কফি হাউসে। জ্যাক ক্যারুয়াকের শিষ্য বিট জেনারেশন আন্দোলনের পুরোধা গিনসবার্গ দারুণ প্রভাবিত করেছিলেন পঞ্চাশের দশকের লেখকদের। সেই প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না ষাটের দশকের কবি সাহিত্যিকরা। বিট সম্প্রদায়ের জীবন ও সৃষ্টিকে অনুকরণ করে কেউ কেউ লাগাম ছাড়া জীবন যাপন এবং শৃঙ্খলাহীন সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। যদিও ষাটের দশকের বাংলা গল্প-কবিতা আন্দোলনকারীদের সকলেই বিট জেনারেশন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না, তবুও কারো কারোর মধ্যে পরোক্ষ একটা প্রভাব পড়েই ছিল।

(ক্রমশ…)

 
 
top