বার্মার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচন: গণতন্ত্রের নয়া অধ্যায়ে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা সমূহ

 

মায়ান্মার তথা বার্মার সাম্প্রতিক নির্বাচন সে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি গুণগত পরিবর্তন সূচিত করার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি অবশ্য সেনা নিয়ন্ত্রণ থেকে কতটা মুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা যাবে—সংশয় রয়েছে তা নিয়েও। বার্মায় গত কয়েক দশক ধরেই মিলিটারি জুন্টা দেশের রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। কয়েক বছর আগে নামমাত্র সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন হলেও তা ছিল সম্পূর্ণভাবে সামরিক শাসকও তাদের পেটোয়া রাজনৈতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন। ২০০৮ সালে সেনার মুসাবিদা করা নতুন সংবিধান অনুসারে ২০১০ সালে সেখানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু মিলিটারি শাসনের কড়া সমালোচক ও জনপ্রিয় সূ-চীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশানাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সেই নির্বাচন বয়কট করে। ক্ষমতায় আসে সেনাবাহিনীর ধামাধরা ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি।

অবস্থা বদলাতে শুরু করে ২০১২ সালের উপনির্বাচনের পর্ব থেকে। বয়কটের সিদ্ধান্ত পাল্টে সূ চীর নেতৃত্বাধীন এলডিএই উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ও ব্যাপক সাফল্য পায়। অতঃপর সাম্প্রতিক ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ এবং বিপুল বিজয় সেনা শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রসরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে এ নিয়ে সংশয় এর অবকাশ আছে কারণ সেনাবাহিনীর তৈরি সংবিধানের বেশ কিছু ধারা সংসদ কাঠামোয় তথা রাজনৈতিক মানচিত্রে সেনাবাহিনীর গুরূত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ এর সুযোগ বহাল রেখেছে। গোটা বিষয়টিকে ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস এর দিকে ফিরে তাকাতে হবে আর বুঝে নিতে হবে ২০০৮ সালে প্রবর্তিত সংবিধান এর কয়েকটি গুরূত্বপূর্ণ ধারার তাৎপর্য।

১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বার্মা ব্রিটিশ শাসিত ভারতেরই অঙ্গীভূত ছিল, এরপর তা ব্রিটিশ বার্মা হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে তা ব্রিটিশ এর হাত থেকে স্বাধীনতা পায়। স্বাধীনতার সময় থেকেই বার্মার বৃহত্তম গোষ্ঠী বামারদের সাথে বিভিন্ন এথনিক গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিল। মোট নাগরিকদের ৬৮ শতাংশ বামাররা স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিপতি হিসেবে সামনে আসে, এথনিক গোষ্ঠীগুলি অনেকটাই নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করতে থাকে। ১৯৪৮ সালের বার্মা সংবিধান এথনিক গোষ্ঠীগুলিকে তাদের ব্যবহৃত জমিগুলির ওপর অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সরকারে তাদের অংশগ্রহণ এর অধিকারও থাকে না। বিভিন্ন এথনিক গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও পরিলক্ষিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সাথে হিন্দু খ্রিষ্টান এবং বিশেষত মুসলিমদের কিছু সংঘর্ষও সামনে আসে।

সেনাশাসন তথা স্টেট পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এসপিডিসি) এর জমানা কয়েক লক্ষ উদ্বাস্তুর জন্ম দেয়। কারেন, কারেন্নি এবং মোন জনজাতির মানুষেরা উদ্বাস্তু হয়ে বার্মা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ওয়া এবং শান জনজাতির মানুষেরা মিলিটারি জুন্টার দ্বারা নিজেদের বাসভূমি থেকে উৎখাত হয়ে দেশের মধ্যেই এদিক ওদিক ছড়িয়ে যান। উদ্বাস্তু মানুষের ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় কারেন ন্যাশানাল ইউনিয়ন বা মোং তাই আর্মির মতো সশস্ত্র প্রতিবাদী সংগঠন। পাশাপাশি সেনা শাসন বিরোধী দেশের মধ্যে সবচেয়ে বলিষ্ঠ গণতান্ত্রিক কন্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসেন সূ চী। সূ চী একসময় জাতিসঙ্ঘে কর্মরত ছিলেন, যে সময় জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন বার্মারই ইউ থান। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জগতের সঙ্গে পরিচয়কে সূ চী বার্মার ভেতরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যান। সূ চী ও তার অনুগামীরা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে দাবি জানান বার্মার অভ্যন্তরের সেনা শাসন ও গণতন্ত্র অপহরণের প্রতিবাদে তারা যেন বার্মার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করে এই সরকারকে চাপে ফেলেন।

১৯৮৮ সালে বার্মার ভেতরে এক তীব্র প্রতিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়। রেঙ্গুনের ছাত্ররা এই আন্দোলনের জন্ম দেন দেশের ভেতরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও আর্থিক সঙ্কটের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক পালাবদলের দাবিতে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ এর সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হন, আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র দমননীতি প্রয়োগ করে আন্দোলনের কন্ঠরোধ করা হয়, প্রায় ৩৫০ মানুষ নিহত হন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সূ চী জাতীয় আইকন এ রূপান্তরিত হন।

ঘরে বাইরে বিভিন্ন মহলের চাপে ১৯৬০ সালের দীর্ঘ তিন দশক পরে ১৯৯০ তে বার্মায় প্রথম বারের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সূ চীর নেতৃত্বাধীন এনএলডি এই নির্বাচনে ৪৯২টি আসনের মধ্যে ৩৯২টি আসন পেয়ে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়। কিন্তু সামরিক জুন্টা এই নির্বাচনী ফলাফলকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। সূ চী সহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। অনেক রাজনৈতিক নেতা দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যান এবং সেখানে ন্যাশানাল কোয়ালিশন গভর্মেন্ট অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা তৈরি করে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিতে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রচারে সামিল হন।

২০০৮ সালে সামরিক সরকার সংশোধিত নতুন সংবিধান প্রবর্তন করে। এই সংশোধিত সংবিধানের ধারাগুলির প্রতি তীব্র আপত্তি জানিয়েই ২০১০ এর নির্বাচনে সূ চী ও তার এনএলডি নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের উপনির্বাচনে এবং ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে এরপর সিদ্ধান্ত বদলে অংশগ্রহণ করে এনএলডি। ২০১৫-র নির্বাচনে বিপুল জয় পেলেও দেশের গণতান্ত্রিক পরিসরকে তা কি মাত্রায় উন্মুক্ত হবার সুযোগ করে দেবে, তার সংশয়ের বীজগুলি সংবিধানের বিভিন্ন ধারার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।

এই সংবিধান বিদেশের কোনও নাগরিকের সঙ্গে বিবাহ হয়েছে এমন কাউকে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পদ থেকে দূরে রাখার কথা বলে। মনে করা হয় সূ চীকে রোখার জন্যই এই ধারার প্রবর্তনা, যদিও সূ চী র ব্রিটিশ স্বামী ১৯৯৯ সালেই প্রয়াত হয়েছেন। দ্বিতীয়ত এই সংবিধান স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত দফতরকে সম্পূর্ণভাবে সেনা নিয়ন্ত্রনে রাখার কথা বলে। তৃতীয়ত এই সংবিধানে কেন্দ্রীয় সংসদে এবং আঞ্চলিক বিধানসভাগুলিতে এক চতুর্থাংশ আসন অ-নির্বাচিত সেনা প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। একইসঙ্গে কোনওরকম সংবিধান সংশোধনের জন্য তিন চতুর্থাংশের বেশি সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজনিয়তার কথা বলা হয়, যা কার্যত এরকম যে কোনও পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে ভেটো দেবার ক্ষমতা দিয়ে দেয়।

সীমাবদ্ধ সাংবিধানিক গণতন্ত্রর মধ্যে থেকেই ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চী ও তার এনএলডি অংশ নেন ও ব্যাপক বিজয় হাসিল করেন। হাউস অব ন্যাশানালাইটস এর ২২৪টি আসনের মধ্যে এক চতুর্থাংশ আসনে নির্বাচন হয়নি, সেই ৫৬টি আসন সেনা প্রতিনিধিদের জন্য সংবিধান অনুসারে বরাদ্দ হয়ে আছে। বাকি ১৬৮টি আসনের মধ্যে এন এল ডি ১৩৫টি আসন পেয়েছে। সেনা মদতপুষ্ট ও ক্ষমতাসীন ইউ এসডিপি পেয়েছে ১২টি আসন। আরাকান অঞ্চলভিত্তিক আরাকান ন্যাশানাল পার্টি পেয়েছে ১০টি আসন। অন্যদিকে হাউস অব রিপ্রেসেন্টেটিভ-এর ৪৪০টি আসনের মধ্যে এক চতুর্থাংশ আসনে নির্বাচন হয় নি, সেই ১১০টি আসন সেনা প্রতিনিধিদের জন্য সংবিধান অনুসারে বরাদ্দ হয়ে আছে। বাকি ৩৩০টি আসনের মধ্যে এন এল ডি ২৫৫টি , সেনা মদতপুষ্ট ও ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি ৩০টি আসন পেয়েছে। আরাকান অঞ্চলভিত্তিক আরাকান ন্যাশানাল পার্টি পেয়েছে ১২টি আসন।

আঞ্চলিক বিধানসভাগুলির মোট মিলিত ৮৬০টি আসনের মধ্যে এক চতুর্থাংশ আসনে নির্বাচন হয়নি, সেই ২১৬টি আসন সেনা প্রতিনিধিদের জন্য সংবিধান অনুসারে বরাদ্দ হয়ে আছে। বাকি ৬৪৪টি আসনের মধ্যে এনএলডি ৪৭৬টি আসন পেয়েছে। সেনা মদতপুষ্ট ও ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি পেয়েছে ৭৩টি আসন।

এথনিক অ্যাফেয়ার বা জনগোষ্ঠী বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রকের জন্য আলাদা নির্বাচন হয়। এখানে সেনা প্রতিনিধিত্ব নেই। ২৯টি আসনের মধ্যে ২১টিতে এনএলডি এবং ২টি আসনে ইউএসডিপি জয়ী হয়।

১৯৯০ এর নির্বাচন গণতন্ত্রের সম্প্রসারণ সম্ভাবনার অপমৃত্যু ও তীব্রতর স্বৈরশাসন প্রত্যক্ষ করেছিল। আড়াই দশক পর পরিস্থিতি কোন দিকে বইবে সেদিকে এশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল নজর রাখবেন। এর মধ্যেই অবশ্য সেনাবাহিনীর তরফে আশা প্রকাশ করা করা হয়েছে সূ চীর নেতৃত্বে ক্ষমতা বিন্যাসের শান্তিপূর্ণ রূপান্তর ঘটবে। তাদের প্রকাশিত ফেসবুক বার্তায় বলা হয়েছে সরকার জনগণের পছন্দকে মর্যাদা দেবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুসারেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে।

শাসনতন্ত্রে সেনা উপস্থিতিকে ২৫ শতাংশতে রেখে শাসন সংস্কারে অবশেষে কেন মিলিটারি সম্মত হল তার কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকেই মনে করেছেন আশেপাশের দেশের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হাসিল করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। সেনা শাসনের কারণে বিশ্বের অনেক দেশই বার্মার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে রেখেছিল এবং তা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছিল। নতুন বার্মায় অর্থনৈতিক বিকাশ দ্রুততর হবে, এরকম ভরসা করাই যায়।

অন্যদিকে এনএলডি- শাসন নীতি কি হবে সেটাও এক গুরূত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুতপক্ষে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ছাড়া নির্দিষ্ট কোনও কর্মসুচীভিত্তিক প্রোগ্রাম সূ চী বা এনএলডি প্রাক নির্বাচনী প্রচার পর্বে সেভাবে হাজির করেননি। বিভিন্ন এথনিক গ্রুপের দীর্ঘলালিত সমস্যা বা রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসা আঘাত এবং সংখ্যাগুরুর রাজনৈতিক আশা আকাঙ্ক্ষার মধ্যেকার দ্বন্দ্বের সমাধান কীভাবে হবে সেটা আগামী দিনে লক্ষ্য করার বিষয়। মাবাথা- মতো বৌদ্ধ উগ্রবাদী আন্দোলনের মোকাবিলা করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় স্থাপণ সূ চীর আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। গরীব দেশের আর্থিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক বর্গের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষা ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার সাফল্যর পরিমাপই সেনার ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সুযোগকে অনেকাংশে নির্ধারণ করবে। বার্মা সার্বিক সেনা স্বৈরতন্ত্রের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে গণতন্ত্রের নানা জটিল সমীকরণের নয়া অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। তার নতুন পথচলার দিকে আমাদের সাগ্রহ দৃষ্টি থাকবে।

 
 
top