সাম্প্রতিক বাংলা আখ্যান: নয়া উদার অর্থনীতির নানা প্রতিক্রিয়া

 

নয়া উদারবাদের ছেলেমেয়েরা: স্মরনজিৎের পাল্টা হাওয়া

ওয়াইটুকে জমানার কলেজ পড়ুয়া বা সদ্য পাশ করা কসমোপলিটন ছেলেমেয়েদের চালচলন, ভাবনা চিন্তার রকম সকমকে সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা উপন্যাসের একটি ধারা বারবার ধরতে চেয়েছে। বাণী বসুর একুশে পা এদের নিয়ে লিখে একসময়ে আলোড়ন তুলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে গত এক দশকে এই ধারায় লেখালেখি করে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল হয়েছেন স্মরণজিৎ চক্রবর্তী। ১৯৭৬ এ জন্ম নেওয়া স্মরণজিৎ এর লেখালেখিগুলি ২০০৩ থেকে পত্রিকার পাতায় ও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে শুরু করে এবং এক দশকের মধ্যেই তার প্রায় ডজনখানেক উপন্যাস ও গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। কসমোপলিটন টিন টোয়েন্টি কিশোর কিশোরিদের লক্ষ্যবস্তু করে প্রকাশিত আনন্দবাজার গোষ্ঠীর ফ্ল্যাগশিপ প্রোজেক্ট উনিশ কুড়ি পত্রিকার নিয়মিত লেখক হিসেবে তিনি প্রথম পরিচিতি পান। এই পত্রিকাটি বাজারী সাফল্যে এবং প্রভাবে আবির্ভাবের পরেই যথেষ্ট সাড়া ফেলে। নয়া উদারবাদের সাংস্কৃতিক মুখ হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখোমুখিও হতে হয় একে।

এই ধারার লেখালেখিগুলিকে বিশ্লেষণ করতে আমরা শুরু করতে পারি স্মরণজিৎ এর পাল্টা হাওয়া উপন্যাসটি দিয়ে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে রীপ ও তার বন্ধুগোষ্ঠীটি, সদ্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরনো বয়স পঁচিশের আশেপাশে। এর সঙ্গেই আছে সদ্য কলেজে ঢোকা রীপের ভাই পুলুর আঠারো উনিশের আরেকটি বন্ধুগোষ্ঠী।

রীপ ব্যবসায়িক পরিবারের ছেলে। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর নিজেদের পারিবারিক ব্যবসার শেয়ার কাকাদের কাছে বেচে দিয়ে সে বেছে নেয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র এর জীবন। আছে তার বন্ধু আয়ান। তার বাবা অধ্যাপক কিন্তু সে পরিচিত পেশাগুলির পরিবর্তে ওয়াইল্ড লাইফ কনসারভেশন এর মতো কাজ বেছে নেয়, কারণ সেখানেই তার প্রাণের আরাম। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শাক্যকে তার বাবা যেভাবে হোক মার্কিন দেশে পড়তে পাঠাতে ব্যগ্র, কারণ এখানে কোনও ফিউচার আছে বলে তিনি বিশ্বাসই করেন না। আর আছে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পুষ্পল। একটি খুঁড়িয়ে চলা বইয়ের দোকানের টানাটানির আয় থেকে উঁকি দেয় তার অ্যাথলিট হবার স্বপ্ন।

রীপের দুই বান্ধবী তিথি আর মৌনিকা। তিথি রীপের সঙ্গে একই সফটওয়্যার ফার্মে কর্মরত। মৌনিকা বেছেছে পরিবেশ নিয়ে সক্রিয় একটি এনজিওর চাকরী।

এই আখ্যানে আমরা সফটওয়্যার ফার্ম, এনজিও কার্যকলাপ, কর্পোরেট ব্যবসার জগৎ আর ছবি আঁকিয়েদের জগতের কয়েক টুকরো ছবিকে বেশ স্পষ্টভাবে পাই। সফটওয়্যার ফার্ম এর ডেটলাইন মেইনটেম করার কড়া চাপ, বিদেশি কোম্পানির জন্য প্রস্তুত রপ্তানীমুখী ব্যবসার ধরণ ধারণ, কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অন্যকে দুমড়ে দেওয়ার হরেক অপকৌশল এর নানা কীর্তিকাহিনী আমরা দেখতে থাকি। অবশ্য অসুস্থ পারস্পরিক সম্পর্কের চেহারাটা চাকরী জগতের চেয়ে তথাকথিত সৃজনশীল জগতে কম কিছু নয়। রাই এর সূত্রে আমরা ছবি আঁকিয়েদের জগৎটির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হই। ক্রিয়েটিভ জগতের লোকেদের মধ্যে বিশ্রী পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, বিদেশযাত্রা থেকে প্রদর্শনীতে সুযোগ পাওয়া নিয়ে খেয়োখেয়ি বেশ বেআব্রুভাবেই এখানে উঠে আসে।

কর্পোরেট ব্যবসার ধরণ ও এনজিও কার্যকলাপের পারস্পরিক সম্পর্ক এই আখ্যানের কেন্দ্রে থাকা প্রেম সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলির মধ্যে একটা অন্য স্বাদ নিয়ে আসে। এই আখ্যানে ফ্রেশ ওয়াটার বলে একটি এনজিওকে আমরা পাই যারা একটি কর্পোরেট সংস্থার ঘটানো দূষণ নিয়ে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা তাদেরই কোনও কোনও কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কর্পোরেট এর অশুভ আঁতাত বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানি পাওয়ার থেকে মাসল পাওয়ার—সমস্ত কিছুকেই ব্যবহার করে দূষণের অভিযোগটি আড়াল করতে চায় কর্পোরেট সংস্থাটি। কারণ ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট খাতায় কলমে থাকলেও তা কার্যত বন্ধই থাকে খরচ কমানো বা মুনাফা বাড়ানোর আছিলায়। এর মূল্য দিতে হয় সংশ্লিষ্ট গ্রামের প্রায় হাজার খানেক মানুষকে। এনজিওর চেষ্টায় খানিকটা মিডিয়া দাক্ষিণ্য প্রথম দিকে পাওয়াও যায়, যদিও চাপের মুখে মিডিয়া পরে কভারেজ দিতে অস্বীকার করে। তবে শেষপর্যন্ত এনজিও কর্ত্রী মোটা টাকা আর বিদেশ ভ্রমণের লোভে কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে আপোষ করে লড়াই থেকে সরে আসেন। শ্রেণি সংগ্রামের গ্রান্ড ন্যারেটিভ এর ধারণাটির পরিবর্তে নিও লিবারাল জমানায় প্রতিবাদের যে এনজিও নির্ভর প্রেশার গ্রুপের ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার ভেতরের ফাঁকি সমেত এই নয়া প্রতিবাদী ইনস্টিটিউশনএর একদিকের ছবিটা স্মরণজিৎ স্পষ্ট করে দেন।

কিন্তু স্মরণজিৎ এর আখ্যান এই নতুন সময়ের যে ছবিটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে সেটা হল উনিশ-কুড়িদের মনোজগৎ। অবশ্য শুধু উনিশ কুড়িরাই নয়, তাদের মা বাবা কীভাবে ভাবছেন তার ছবিও এখানে পাই। শাক্যের বাবার কাছে ছেলেকে যেন তেন প্রকারেণ বিদেশে পাঠানোটাই যেমন একমাত্র লক্ষ্য, তেমনি মৌনিকার মারও তীব্র আকাঙ্ক্ষা মেয়েকে প্রবাসী ধনী চিকিৎসকের কাছে পাত্রস্থ করার। এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছেকে মূল্য দিতে তারা একেবারেই প্রস্তুত নন। এর বিপরীতে অবশ্য আছেন তিথি এবং অহনার বাবা, যিনি মেয়েদের স্বাধিকারকেই আগাগোড়া লালন করে এসেছেন। আবার নবীন প্রজন্মের চিত্রশিল্পী হিসেবে রাই স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন দেশে যাবার সুযোগ পেতে সবকিছু করতে প্রস্তুত, যদিও তার মা চেয়েছিলেন দেশেই থাকুক তার বড় মেয়ে, অসুস্থ বাবার নির্ভরতা হিসেবে।

নবীন প্রজন্মকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ছকে ঢেলে সাজাতে চাননি স্মরণজিৎ এবং তাদের আপন আপন মনোজগৎকে আলাদা করে সামনে রাখতে চেয়েছেন। অবশ্য জীবিকাগত ও পরিবারগত স্বাভাবিক ভিন্নতার বাইরে তাদের চিন্তাভাবনার একটি স্বাভাবিক, হয়ত বা বয়সোচিত প্যাটার্ন আমাদের চোখে পড়ে। প্রেম সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েন তাদের প্রায় সবার মানসজগতের প্রধান অংশ। কিন্তু ছেলেদের প্রেমজীবন এখানে খানিকটা বৈচিত্র্যহীন। প্রায় সবাই ফেলে আসা নস্টালজিয়াগুলোকে নিয়ে কাতর বা সম্ভাব্যতা অসম্ভাব্যতার দোলাচলে দ্বিধান্বিত। বিপরীতে মেয়েদের প্রেমজীবন অনেকটাই বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে হাজির। তিথি, মৌনিকা, রাই, মুন—সবাই নিজের নিজের কেরিয়ার নিয়ে সচেতন। তিথি প্রেমাস্পদকে পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে নানা মিথ্যা বলে দূরে সরিয়ে দিতে পারে দ্বিধাহীনভাবে। রাই পেইন্টিং কেরিয়ারকে সফল করতে যেমন মানুষকে অক্লেশে ব্যবহার করে নিতে পারে, তেমনি দাম্পত্য বা পরকিয়া সম্পর্কে কোনও সংস্কার রাখে না। মুন পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে নিজের লেসবিয়ান আইডেনটিটি নিয়ে দ্বিধান্বিত তো নয়ই, বরং একেই মুক্তির পথ বলে মনে করে। মৌনিকা নিজের জীবন জীবিকার স্বাধীনতার জন্য পরিবার ও সমৃদ্ধিময় বৈবাহিক জীবনের হাতছানির বিরুদ্ধে লড়াই করে। পুরুষতান্ত্রিক হাবভাব সমৃদ্ধ মার্কিন প্রবাসী ডাক্তার হবু বরকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে।

উল্টোদিকে শাক্যর দিদির মতো মেয়েরাও আছে। যে একমাত্র পাইলট হবু বরের প্রেয়সী পরিচয়টুকু নিয়েই বেঁচে থাকে। তবে এটা সাধারণ ছবি নয়। বস্তুতপক্ষে নয়া উদার অর্থনীতি কাজের জগতে শৃঙ্খলের নতুন নতুন বেড়ি নিয়ে হাজির হলেও তা যে নতুন সময়ের মেয়েদের পুরুষতান্ত্রিক নিগঢ় থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে, তার ছবি বারবার ফুটে উঠেছে স্মরণজিৎ এর এই আখ্যানে। বিশেষত আগের প্রজন্মের মায়েদের সংসারে লাঞ্ছিত কুন্ঠিত অবস্থানের বিপ্রতীপে এই জাগৃতি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু নতুন সময় মেয়েদের জগৎকে প্রসারিত করলেও মহানগরীর এলিট সোসাইটির সঙ্গে গ্রাম মফস্বলের দূরত্বকে তা কতটা দুস্তর করে তুলেছে, সে সম্পর্কেও আমরা অবহিত হই। একদিকে তিথি মুনেরা যখন আমেরিকান লোকাল টাইম মেনে নাইট শিফটে কাজ করছে, অন্যদিকে গ্রামীণ ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করা মৌনিকার পর্যন্ত মধ্যমগ্রাম থেকে লোকাল ট্রেনে চাপার অভিজ্ঞতাকে বিভীষিকা মনে হয়। আমরা দক্ষিণ কোলকাতাবাসী এই আখ্যানের সমস্ত এলিট পরিবারের টিন এজারদের প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে ব্যক্তিগত যান ব্যবহার করতে দেখি। গণপরিবহনের জায়গায় ব্যক্তিগত যানরতি নয়া উদার আর্থিক নীতিমালারই অন্যতম অভিজ্ঞান।

প্রতিবাদ সম্পর্কে এই প্রজন্ম সাধারণভাবে কী মনে করে? ষাট সত্তরের তোমার নাম আমার না ভিয়েতনামবা নকশালবাড়ি লাল সেলামথেকে কতদূরে আজকের এই প্রজন্মের অবস্থান? অবস্থানগত কারণেই প্রতিবাদী বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কথা যাদের, সেই নিম্নবর্গীয়দের প্রতিনিধিত্ব এ আখ্যানে করে যে বাটু সে স্মরণ করে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মেন্টর নাপিত যুগলের কথা, ‘প্রতিবাদ হল এ যুগের শ্রেষ্ঠ ঢ্যামনামো। কাজ হয় না, কিন্তু টিভিতে ছবি দেখা যায়।’

বস্তুতপক্ষে সাব অল্টার্ন চরিত্রগুলির রূপায়ণ এর মধ্যে দিয়েও নিও লিবারাল জমানাকে দেখা বোঝার একটা বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে এই আখ্যান। এখানকার সাব-অল্টার্নরা কেউই অর্গানাইজড ওয়ার্কিং ক্লাসের অংশ নয়। তারা—বাটু, যুগল, মুন্না, লাটিম—সকলেই স্বভাবে বা অভাবে শেষপর্যন্ত ডেসপট হয়ে যায়, প্রতিবাদী প্রলেতারিয়েত তাদের থেকে আর জন্ম নিতে পারে না, সামনে আসে তাদের লুম্পেনসিই। প্রতিতুলনায় মনে পড়ার মতো ব্যাপার এই অংশের মানুষেরাই কিন্তু চোক্তার আর ফ্যাতারু হিসেবে সাবভার্ট করতে চায়, সিস্টেম ভাঙতে চায় নবারুণ ভট্টাচার্যের আখ্যানগুলিতে। স্মরনজিৎ এর দেখার চোখ, ভাবার প্যাটার্ন ভিন্ন। এই ভিন্নতা কতটা তার ব্যক্তিগত প্রবণতা, আর কতটা সময়ের চিহ্ন তা পাঠককে নিশ্চয় ভাবাবে।।

(ক্রমশ…)

 
 
top