মহাশ্বেতার প্রয়াণ কিন্তু ‘বীরসার মরণ নাই, উলগুলানের শেষ নাই’

 

চলে গেলেন মহাশ্বেতা দেবী। নব্বই বছর বয়েসে বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম লেখিকার জীবনাবসান হল। শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, নিম্নবর্গের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা এক অবিস্মরণীয় সমাজকর্মী এবং প্রতিবাদী রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবেও উত্তরকাল তাঁকে মনে রাখবে।

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম হয়েছিল ১৪ জানুয়ারী, ১৯২৬ এবাড়িতে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাবা মণীশ ঘটক ছিলেন সেকালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, যিনি লিখতেন যুবনাশ্ব ছদ্মনামে আর আলোড়ন ফেলেছিলেন পটলডাঙার পাঁচালি নামক কালজয়ী রচনার মধ্যে দিয়ে। সম্পাদনা করতেন বর্তিকা নামে এক মননশীল পত্রিকা, অনেক পরে ১৯৮০ থেকে যার সম্পাদনাভার তুলে নেবেন মহাশ্বেতা। মহাশ্বেতার কাকা ছিলেন নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। এক মামা শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন বিখ্যাত ভাষ্কর। মহাশ্বেতা কিছুদিন পড়াশুনো করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। ১৯৪৬ সালে ইংরাজী অনার্স সহ গ্রাজুয়েট হন শান্তিনিকেতন কলেজ থেকে। একুশ বছর বয়েসে বিবাহ হয় বিখ্যাত নাট্যকার তথা গণনাট্য সঙ্ঘ ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশিষ্ট চরিত্র বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে, ১৯৪৭ সালে। একমাত্র সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্ম হয় পরের বছর, ১৯৪৮ এ। ১৯৬২ সালে বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে মহাশ্বেতার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় বিবাহ অসিত গুপ্তের সঙ্গে ১৯৬৫ সালে। তাঁরা ১৯৭৬ পর্যন্ত একসাথে ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে। ১৯৬৩ তে ইংরাজী সাহিত্যে এমএ পাশ করার পর ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরাজীর অধ্যাপিকা হিসেবে যুক্ত হন। কুড়ি বছর পর ১৯৮৪ তে চাকরী জীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন।

এসমস্ত শুকনো জীবন তথ্যের মধ্যে অবশ্য মহাশ্বেতা দেবীর বিশিষ্টতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকী পাওয়া যাবে না তাঁর লেখক জীবনের প্রথম পর্বের উপন্যাসগুলির মধ্যে দিয়েও। তিরিশ বছর বয়সে ঝাঁসির রাণীর জীবনকথা দিয়ে তিনি তাঁর লেখক জীবন শুরু করেন। পরের বছর ১৯৫৭ সালে প্রকাশ পেল একই প্রেক্ষাপটের ওপরেই নির্মিত তাঁর প্রথম উপন্যাস নটীতার পরের বছর বেরোল নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে লেখা উপন্যস মধুরে মধুরে (১৯৫৮) । ১৯৫৯ এ সার্কাসের শিল্পীদের নিয়ে লিখলেন প্রেম তারা। তারপর পরপর প্রকাশিত হয় এতটুকু আশা (১৯৫৯), তিমির লগন (১৯৫৯), তারার আঁধার (১৯৬০), লায়লী আশমানের আয়না (১৯৬১), মৃত সঞ্চয় (১৯৬২) ইত্যাদি উপন্যাস। নিয়মিত লিখছিলেন তিনি, কিন্তু তখনো শিল্পী সত্তার সেই অমোঘ বিন্দুটিতে পোঁছন নি মহাশ্বেতা

সেই পর্বের শুরু হল ১৯৬৭ থেকে। বস্তুতপক্ষে সেই সময়টাই ছিল বিরাট ভাঙাগড়ার সময়। দেশ সমাজ তখন র‍্যাডিক্যাল বাম আন্দোলনের ঝোড়ো হাওয়ায় উত্তপ্ত। কোনও কিছুই আর আগের মতো থাকছে না। একদিকে মধ্যপন্থাকে চূর্ণ করার আহ্বান, কৃষক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন, অন্যদিকে সমাজ ও ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন। আগের মতো থাকল না মহাশ্বেতা দেবীর কলমও। সময়ের ভাঙাগড়ার সঙ্গে মহাশ্বেতার লেখক জীবনের ভাঙাগড়া মিশে গেল। পরপর প্রকাশিত হল শুধু মহাশ্বেতা দেবীরই নয়, বাংলা সাহিত্যের কিছু চিরায়ত ক্লাসিক। ১৯৬৭ তে কবি বন্দ্যঘটী গাঞীর জীবন ও মৃত্যু। ১৯৭৪ এ বেরোল হাজার চুরাশীর মা। ১৯৭৭ এ অরণ্যের অধিকার। ১৯৮০ সালে অগ্নিগর্ভ এবং চেট্টি মুণ্ডা ও তার তীর। মধ্য ষাট থেকে পরবর্তী পনেরো বছরের মধ্যে প্রকাশিত এই রচনাগুলি মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য গরিমাকে আন্তর্জাতিক স্তরেই বিশিষ্ট করে তুলল। আর এই কাজে সহায়ক হয়ে থাকল শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকদের স্বাদু অনুবাদকর্মগুলিও।

ষাট এর দশকের সেই মধ্যপর্বে যখন নতুন এক স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করতে চাইছে কোলকাতার ছাত্র যুবরা তখন কবি বন্দ্যঘটী গাঞীর জীবন ও মৃত্যু প্রসঙ্গে মহাশ্বেতা লেখেন, হয়ত আমি এমন এক যুবকের কথা লিখতে চেয়েছি যে তার জন্ম ও জীবনকে অতিক্রম করে নিজের জন্য একটি দ্বিতীয় জগৎ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, … চেয়েছিল নতুন জন্ম নিতে। সমসাময়িক সমাজ তার প্রত্যেকটি চেষ্টাকেই পরাভূত করেছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর সবচেয়ে আলোড়ন ফেলা লেখা হাজার চুরাশির মা লেখা হয় নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। এই উপন্যাসের সময়সীমা একদিন। সকাল, বিকেল এবং রাত এর তিনটি পর্বে দিনটি বিন্যস্ত। সকালের এক টেলিফোন সুজাতাকে সেই দিনটির কথা মনে করিয়ে দেয় যেদিন এমনই এক টেলিফোনে এসেছিল ছোট ছেলে ব্রতীর মৃত্যুসংবাদ। কিন্তু উচ্চবিত্ত ও সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারের দুই কর্তা ব্রতীর বাবা ও দাদা নকশাল ব্রতীকে দেখতে যেতে চাননি পরিবারের ওপর সন্দেহ নেমে আসার দুঃশ্চিন্তায়। এমনকী সুজাতাকে বাড়ির গাড়ি করে মর্গে যেতে দেওয়া হয়নি। সুজাতা ছেলেকে খুঁজে পেয়েছিল রক্তাক্ত অবস্থায় একটি নম্বর সহ। আরো অসংখ্য মৃতের সারির পাশে ব্রতী তখন একটি সংখ্যা—১০৮৪। কিন্তু হাজার চুরাশীর মা শুধু ছেলে হারা এক মায়ের মনস্তাপের কাহিনী নয়। সেরকম হলে আরো অনেক লেখার ভীড়ে এই লেখাটি হারিয়ে যেত। কিন্তু হাজার চুরাশীর মা হয়ে উঠল নিছক পুত্রহারা মায়ের শোক বর্ণনা ছাপিয়ে মৃত ছেলের প্রকৃত সত্তা আবিষ্কারের অভিযানের কাহিনী। এই আবিষ্কারের সূত্রেই সুজাতার চোখে ব্রতী এবং সেই অশান্ত সময়কে দেখি আমরা। ব্রতীদের স্বপ্ন, লড়াই এবং সেই স্বপ্নকে খুন করার রাষ্ট্রীয় নৃশংসতাকে দেখি।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যিক দ্রোহের সঙ্গে ক্রমেই মিশে যেতে থাকে ব্যক্তিগত জীবন চর্যাও। লোধা, শবর, মুণ্ডাদের মতো আদিবাসীদের জন্য কাজ করতে তাদের মাঝে চলে যান তিনি। তাদের অধিকার আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকেন। এই সূত্রেই আসে মুণ্ডা বিদ্রোহের ইতিহাস নিয়ে, তার নায়ক বীরসা মুণ্ডাকে নিয়ে লেখা অরণ্যের অধিকারবীরসার মরণ নাই, উলগুলানের শেষ নাই—এই কথাটি নকশালবাড়ি আন্দোলনের দশ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আর এক ভিন্ন তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়ে যায়। কৃষকের লড়াই, নয়া ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর উপনিবেশের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাজ আর দিকুদের বিরুদ্ধে বীরসা মুণ্ডাদের লড়াই কোথাও একজায়গায় মিশে যায়।

১৯৮০ সালে অগ্নিগর্ভ প্রকাশিত হয় একটি অপেক্ষাকৃত বড় গল্প অপারেশন বসাই টুডু? এবং তিনটি ছোটগল্পর সংকলন নিয়ে যার অন্যতম দ্রৌপদী।  এগুলি সবই নকশালবাড়ি আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ এর মধ্যে বসাই এর মৃত্যু এবং বেঁচে ফেরা নিয়ে নানা মিথ গড়ে ওঠে। তার চার চারটে মৃত্যু পর্বে ক্ষেতমজদুর আন্দোলনের সহযোদ্ধা কালী সাঁতরাকে শণাক্তকরণের জন্য ডাকা হয়েছিল। তারপর বসাই ও কালীর মত ও পথ ভিন্ন হয়ে যায়। তবুও বসাই সম্বন্ধে কালীর মনে ভিন্ন এক অনুভূতি সক্রিয় থাকে। কালী জানে একের পর এক এনকাউন্টারে বসাই মরে, আবার বসাই বাঁচে। প্রতিটি নতুন আন্দোলনের সঙ্গে বসাই জেগে ওঠে। কালী বাঁচে সেই অমোঘ ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বসাই টুডু ইন অ্যাকশান এগেইন

দ্রৌপদী গল্পের কয়েকটি পাতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই গল্পের দোপদির সাতাশ বছর বয়েস। বাঁকড়াঝাড় থানার চেরাথানবাসী দোপদীর স্বামী দুলন মাঝির কাঁধে গুলির ক্ষতচিহ্ন। ১৯৭১ এ অপারেশন বাকুলিতে যখন তিনটে গ্রাম কর্ডন করে মেশিনগানের গুলি বর্ষন করা হয়, দুলন ও দোপদী নিহতের ভান করে পড়ে থাকে। সরকারের চোখে এরাই মেইন ক্রিমিনাল। জোতদার সূর্য সাহু ও তার ছেলেকে খুন, খরার সময়ে উঁচু জাতের ইঁদারা ও টিউবয়েলের জল দখল—সবেতেই এরা প্রধান। অপারেশন বাকুলি এদের শাস্তি দিতেই। কিন্তু লাশ গণনা করতে গিয়ে দেখা যায় স্বামী স্ত্রী নিরুদ্দেশ। পরে দুলনকে সেনাবাহিনী গুলি করে মারে। কিন্তু দোপদীর সন্ধান মেলে না। পরে এক ফেউ ধরিয়ে দেয় দোপদীকে। তাকে সারারাত ধর্ষণ করে সান্ত্রীরা। মহাশ্বেতা খোলাখুলি দেখিয়ে দেন জন প্রতিরোধের মুখে রাষ্ট্র ও তার সান্ত্রীদল অস্ত্রের নল এবং শরীরের নলকে কেমন যুগপৎ ব্যবহার করে। সকালে উলঙ্গ দোপদী এসে দাঁড়ায় সেনানায়কের সামনে। দুই মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে সে এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।

সাহিত্য ও সমাজকর্মের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অনেক পুরস্কারই মহাশ্বেতা পেয়েছেন। ১৯৭৯ তে সাহিত্য আকাদেমি, ১৯৮৬ তে পদ্মশ্রী, ১৯৯৬ তে জ্ঞানপীঠ, ১৯৯৭ তে ম্যাগসাইসাই, ১৯৯৯ এ বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম তার কয়েকটি। জীবনের শেষ দশকেও বাংলার জমি আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থেকেছেন। জমি আন্দোলনের সূত্রে পরিবর্তনের পর নতুন ক্ষমতাও তাকে নিজের জনভিত্তি ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু অশীতিপর মহাশ্বেতার শরীরী অবয়ব যে মঞ্চে যার পাশেই থাকুক না কেন, পাঁচ দশকের দীর্ঘ সৃজনপর্বে নির্মিত মহাশ্বেতার লেখক সত্তা রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সঙ্গে কখনো অঙ্গীভূত হতে পারে না। সেই মহাশ্বেতা রাষ্ট্র ও ক্ষমতার আস্ফালনের বিরুদ্ধে বরাবরের দ্রোহী। সেই মহাশ্বেতা জল জমি অরণ্যের অধিকার কার—সেই প্রশ্ন নিয়ে নিয়ে সদা তৎপর। সেই মহাশ্বেতার শেষ বার্তা বীরসার মরণ নাই, উলগুলানের শেষ নাই

 

 
 
top