মার্কিন নির্বাচন, বার্নি স্যান্ডার্স এবং সমাজবাদ

 

ফুটবলপ্রিয় বাঙালি এখন একইসঙ্গে মজে আছে কোপা আমেরিকা আর ইউরো কাপে। কিন্তু বাম মনস্করা কী সেভাবে খবর পাচ্ছেন ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে বামপন্থার নতুন উত্থানের? মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ হয়ত পাচ্ছেন। কিন্তু বাকীরা সেভাবে নয়। কারণ ই এস পি এন যেভাবে ইউরো কাপ বা কোপার লাইভ সম্প্রচার করছে, এমনকী ধারা বিবরণী আসছে বাংলা ভাষাতেও, পশ্চিমের রাজনীতির দুনিয়ায় বাম প্রভাবের খবর সেভাবে এখানকার জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল বা খবরের কাগজগুলিতে আসে না। গ্রীক সঙ্কটের সময় হয়ত সিরিজার দু এক চিলতে খবর এসেছে কিন্তু স্পেনের পোডোমস বা পর্তুগালের বামপন্থী জোট বা ব্রিটেনের করবিনের খবর সেভাবে আসেই নি। তেমনভাবে খবরে আসেননি মার্কিন নির্বাচনে সাড়া ফেলে দেওয়া বার্নি স্যান্ডার্সও।

এখানে তাই আমরা চেষ্টা করব আমাদের মিডিয়া কাব্যে উপেক্ষিত বার্নি স্যান্ডার্স ও মার্কিন নির্বাচনে তার নিয়ে আসা সমাজবাদ প্রসঙ্গটিকে খানিকটা তুলে ধরার।

মার্কিন নির্বাচন সাধারণভাবে একটি দ্বি দলীয় ব্যবস্থা, যাতে রিপাকলিকান আর ডেমোক্রাটরাই মূলত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথমে এই দুই দল তাদের প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেট ঠিক করে, তারপর সেই প্রার্থীরা জনগণের মুখোমুখি হন। আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রার্থী হিসেবে থাকছেন ট্রাম্প, যিনি তার চরম দক্ষিণপন্থী চিন্তা ও কথাবার্তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বহুল আলোচিত। মুসলিম ও তৃতীয় দুনিয়া বিদ্বেষী ট্রাম্প এর জন্য এমনকী এদেশের হনুমানভক্তরা পুজোপাঠ পর্যন্ত করে ফেলেছে, তা সংবাদের শিরোনামেও এসেছে। অন্যদিকে ডেমোক্রাট প্রার্থী হবার জন্য লড়ছেন হিলারী ক্লিন্টন ও বার্নি স্যান্ডার্স। এই লড়াই এর যে প্রাথমিক চেহারাটুকু সামনে এসেছে তাতে হিলারিই হয়ত শেষপর্যন্ত ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী মনোনীত হবেন, কিন্তু তাতে বার্নি স্যান্ডার্স পরিঘটনাটির গুরূত্ব এতটুকু কমে না এবং তা আমাদের এই দেশের বামপন্থীদেরও ভালোভাবে বোঝার দরকার আছে।

কিছুদিন আগে বিখ্যাত ফরাসী অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি একটি লেখায় বলেছেন স্যান্ডার্স হয়ত এই নির্বাচনে জিতবেন না কিন্তু আগামী দিনে আরো কমবয়সী কোনও এক স্যান্ডার্স এর জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে এই লড়াই। সেই অনাগত ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা স্যান্ডার্সের লড়াইটা ঠিক কী ?

১৯৮০ র দশকে রোনাল্ড রেগনের জমানার মধ্যে দিয়ে মার্কিন রাজনীতি অর্থনীতিতে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের অর্থনৈতিক দর্শনকে পালটে দেবার রাজনৈতিক অর্থনীতিই স্যান্ডার্স সামনে আনছেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ এর দশকের সময়কাল পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতি সামাজিক অসাম্য দূর করার বেশ কিছু প্রকল্প নিয়েছিল। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী দশকগুলিতে আমেরিকায় চালু হয়েছিল এক প্রগতিশীল আয় ও সম্পত্তিকর। ১৯৩০ থেকে পরবর্তী তিরিশ বছরে বার্ষিক দশ লক্ষ ডলার আয় করেন এমন মানুষ ছিলেন গড়ে ৮২ শতাংশ। এটা ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ এই সময়কালের বছরগুলিতে গড়ে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই সময়কালে বৃহৎ সম্পত্তির ক্ষেত্রে কর ছিল ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। যা সেই সময়ের ফ্রান্স বা জার্মানীর তুলনায় ছিল অনেক বেশি। ফ্রান্স বা জার্মানীতে সমকালে বৃহৎ সম্পত্তি ক্ষেত্রে কর কখনোই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি হয় নি।

১৯৩০ সালেই আমেরিকায় চালু হয়ে গিয়েছিল ন্যূনতম মজুরী আইন। ২০১৬ র মূল্যমান অনুযায়ী ১৯৬০ এর দশকে এটা ছিল ঘন্টায় ১০ ডলার। আর এই সমস্ত কিছুর পাশাপাশিই ছিল প্রায় শূন্য বেকারীত্ব।

১৯৭০ এর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার নাস্তানাবুদ হওয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানী জাপানের অর্থনৈতিক মঞ্চে শক্তিশালী চেহারায় উঠে আসা, তেল সঙ্কট সেখানকার সামাজিক পরিস্থিতিকে বদলে দেয়। একে সামনে রেখে এক কল্প পুঁজিবাদের স্বপ্ন দেখিয়ে রেগান ক্ষমতায় আসেন। ১৯৮৬ র কর ব্যবস্থার পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে রেগান জমানার নব্য উদার অর্থনীতি তার জায়গা দখল করতে শুরু করে। সর্বোচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে করে উর্ধ্বসীমা ২৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। আর এর মধ্যে দিয়েই আর্থিক অসাম্যের বিস্ফোরণ ঘটে।

রেগান ন্যূনতম মজুরীকে স্থিতিশীল করে দেন। মূল্যবৃদ্ধির ফলে তা প্রকৃত পক্ষে কমে আসে। ২০১৬ র মূল্যমানে হিসেব করলে যা ১৯৬৯ এ ছিল ঘন্টায় ১১ ডলার তা এই সময়ে নেমে আসে ঘন্টায় ৭ ডলারে।

রিপাবলিকানদের এই সব নীতিমালা তাদের শাসনামলে (বাবা ও ছেলে বুশ) তো বটেই ক্লিন্টন বা ওবামার মত ডেমোক্র্যাটদের শাসনামলে বর্তমান থাকে। স্যান্ডার্স এই সমস্ত ক্ষেত্রেই তার নতুন দাবি সনদ পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন প্রগতিশীল কর কাঠামী ফিরিয়ে আনার কথা। ঘন্টাপ্রতি ন্যূনতম মজুরী ১৫ ডলার করার কথা। গোটা আমেরিকা জুড়ে উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা যখন প্রচণ্ড ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে তখন স্যান্ডার্স দাবি তুলেছেন বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিসেবা ও উচ্চশিক্ষা প্রদানের। আমেরিকার মধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া বিরাট আর্থিক বৈষম্যর সূত্রে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন সামনে এসেছিল যে সব দাবিমালা, সেই আমরা ৯৯ শতাংশের আকাঙ্ক্ষাকে স্যান্ডার্স তুলে ধরেছেন জোরালোভাবে

স্যান্ডার্স কতখানি সমাজবাদী তা নিয়ে বিতর্কে আমরা এখানে যেতে চাই নি। কিন্তু তার দাবিমালা সমাজবাদের মৌলিক কিছু দিককে অবশ্যই ধারণ করেছে। আর আশার কথা হলো এই সমস্ত দাবিমালা গোটা আমেরিকা জুড়েই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে। অনেকে মনে করেছেন স্যান্ডার্স ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে থেকে ভুল করছেন। তার উচিত এই বিপুল জনসমর্থনকে ব্যবহার করে একটি সত্যকারের শ্রমিক শ্রেণির দল গড়ে তোলা।

স্যান্ডার্স নিজেকে সোশ্যালিস্ট বলেছেন। এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে অ্যালান উড বলেছেন মার্কসবাদী সোশ্যালিস্ট স্যান্ডার্সকে না বলে স্ক্যান্ডিনেভিয় ঘরানার সোশালিস্ট তাকে বলা হবে কিনা বা তাকে রুজভেল্টীয় পথের পথিক বলা হবে কিনা, তার বিশ্লেষণের চেয়েও জরুরী মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচনে সাধারণভাবে সোশালিজম বিরোধী কথাবার্তার পরিমণ্ডলে তিনি সোশালিস্ট ঘরানার প্রচার করছেন এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। সোশালিস্ট হওয়া স্বত্ত্বেও স্যান্ডার্স এর এই জনপ্রিয়তা নয়, সোশালিস্ট হওয়ার কারণেই বার্নি স্যান্ডার্স এর এই জনপ্রিয়তা, যাকে ১২ মাস আগেও আমেরিকায় তার নির্বাচনী ক্ষেত্রের বাইরে সেভাবে কেউ চিনত না। একথা মাথায় রাখলে মার্কিন নির্বাচন ও রাজনীতিতে বার্নি স্যান্ডার্স পরিঘটনাটি সারা বিশ্বের বামপন্থীদের কাছেই গভীরভাবে আশাপ্রদ ও বিশ্লেষণযোগ্য।

আমাদের কী এ থেকে কোনও শিক্ষা নেওয়ার আছে? নির্দিষ্ট আর্থিক ও রাজনৈতিক দাবিমালাকে সুগ্রন্থিত করা ও তাকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আকর্ষণীয় ভাষায় ব্যাপক সংখ্যক জনগণের কাছে তুলে ধরাও যে একটা আন্দোলন, যা জন্ম দিতে পারে শক্তির এক নতুন ভারসাম্য, তাতে বাম শিবিরের অনেকেরই নতুন করে বিশ্বাস করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। গতানুগতিক অভ্যাসবাদ ভেঙে সাহসী উচ্চারণের পরিবর্তে বাস্তবানুগ মাত্রায়রাজনীতি করার নামে যারা নিজেদের রাজনীতিকে খর্ব করে আনেন নিজেরাই, তাদের জন্যও কিছু শিক্ষা লুকিয়ে থাকতে পারে স্যান্ডার্স পরিঘটনাটির মধ্যে।

 
 
top