কেমন আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা?

 

মুসলিমদের কাজকর্মের চালচিত্র

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের অবস্থা শীর্ষক যে খসড়া রিপোর্টটি ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে আমরা দেখেছি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে গরিষ্ঠ অংশটি, গোটা জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক দিন মজুর হিসেবে জীবিকা অর্জন করতে বাধ্য হন। ৪৭.০৪ শতাংশ মানুষ দিনমজুর। এর পরে রয়েছে নিজের জমিতে চাষের কাজ। ১৫.৪২ শতাংশ মুসলমান নিজের জমিতে চাষাবাদ করেন। এছাড়া ক্ষেতমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে চাষের কাজ করেন আরো ১০.১১ শতাংশ মানুষ। ছোট বড় ব্যবসার কাজে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ২.৫৯ শতাংশ মাত্র আর বেতনভোগী হিসেবে পরিসেবা ক্ষেত্রে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্ত আছেন ৫.৪৯ শতাংশ মানুষ।

সারণি– এর দিকে লক্ষ্য করা যাক।

সারণি–

পেশা

শতাংশ

ক্ষেতমজুর

১০.১১

দিনমজুর (কৃষি ও অন্যান্য)

৪৭.০৪

ক্ষুদ্র স্বনিযুক্ত মজুর

.৪৭

পরিবহন শ্রমিক

.৮৮

চাষী

১৫.৪২

হস্তশিল্পী এবং অর্ধদক্ষ শ্রমিক

.০০

ব্যবসা

.৫৯

বেতনভোগী/পরিসেবা ক্ষেত্র

.৪৯

সর্বমোট

১০০

 

এই সারণী থেকে বোঝা যায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর বেশীরভাগ মানুষই অত্যন্ত নিম্ন আয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমরা এর আগের এক পরিসংখ্যানে লক্ষ্য করেছিলাম উচ্চবর্ণের হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের মধ্যে স্বাক্ষর শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিতদের হার অনেকটাই কম। ফলে সমীক্ষাকৃত পরিবারগুলির মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ রয়েছেন, যেগুলিকে সুরক্ষিত এবং সামাজিকভাবে কাম্য বলা যেতে পারে। ছোট ও বড় ব্যবসা মিলিয়ে মাত্র ৬.৭ শতাংশ মানুষ ব্যবসায় নিয়োজিত। অন্যদিকে নিয়মিত পরিসেবা ক্ষেত্র বা বেতনভোগী পরিবার মাত্র ৪ শতাংশ। উচ্চ আয়ের পেশা, যেমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার উকিল ইত্যাদিতে নিযুক্ত রয়েছেন মাত্র ০.৪ শতাংশ মানুষ, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর এক অতি ক্ষুদ্র অংশ।

পেশার বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে জেলাওয়ারি পার্থক্য খুব ব্যাপক। কৃষি মজুরির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির সংখ্যা উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় এবং নদীয়ায় খুব বেশি। এক্ষেত্রে রাজ্যের গড় হচ্ছে ৮.৭ শতাংশ। বিভিন্ন জেলার পরিসংখ্যান এরকম। নদীয়া – ১৯.৯ শতাংশ, কোচবিহার ১৯.২ শতাংশ, জলপাইগুড়ি ১৭.৩ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুর ১৩.৫ শতাংশ, দক্ষিণ দিনাজপুর ১২.৩ শতাংশ, বাঁকুড়া ১১.৬ শতাংশ, মালদা ১১ শতাংশ, মুর্শিদাবাদ ১০.১ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুর ১০.৩ শতাংশ

যারা পেশাগতভাবে চাষের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রেও জেলাওয়ারি পার্থক্য দেখা যায়। বর্ধমানে চাষের ওপর নির্ভরশীল ২৪.৪ শতাংশ পরিবার। এটা রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বনিম্ন পুরুলিয়ায়—৮.৪ শতাংশ। বিভিন্ন জেলায় এই গড় হল—উত্তর দিনাজপুর ১৭.৯ শতাংশ, মালদা ১৭.৮ শতাংশ, দক্ষিণ দিনাজপুর ১৭.৫ শতাংশ, মুর্শিদাবাদ ১৭.৪ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুর ১৬.১ শতাংশ, বীরভূম ১৪.৫ শতাংশ, জলপাইগুড়ি ১৪ শতাংশ এবং বাঁকুড়া ১৩.৫ শতাংশএক্ষেত্রে রাজ্যের গড় ১৩.৫ শতাংশ

কৃষক ও ক্ষেতমজুর পেশায় বিভিন্ন জেলার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায় তার থেকে কতগুলো চোখে পড়ার মত বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। যেমন বর্ধমান জেলায় কৃষকদের শতাংশ রাজ্যগত গড়ের চেয়ে অনেকটা বেশী কিন্তু ক্ষেতমজুরের শতাংশমাত্রা কম। এ থেকে বোঝা যায় বর্ধমান জেলায় মুসলমানদের মধ্যে ভূমিহীনতার মাত্রা অন্যান্য জেলা অপেক্ষা কম।

এছাড়াও ঠিকা শ্রমিক ও কৃষি বহির্ভূত বিভিন্ন কাজ যেমন নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শ্রমিক, কুলি, ঝাড়ুদার, কাগজ কুড়ানি ইত্যাদিতে যুক্ত লোকের শতাংশ রাজ্যগতভাবে ৪২.৬। তবে এক্ষেত্রেও জেলাগত বিভিন্নতা খুব স্পষ্ট। যেমন দক্ষিণ দিনাজপুরে এটি ৫৭.৩ শতাংশ, কোলকাতায় ১৭ শতাংশ

ছোটখাট ধরনের কাজে স্বনিযুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে আছেন দোকানদার, হকার, ভেন্ডার, সিকিউরিটি গার্ড, বিড়ি শ্রমিক ও অন্যান্যরা। এই ধরণের কাজে নিযুক্ত লোকেদের সর্বোচ্চ সংখ্যা পুরুলিয়ায় (২২.%) ও সর্বনিম্ন দক্ষিণ দিনাজপুরে (.%)। রাজ্যগতভাবে এক্ষেত্রে গড় হল ৮.৩৪ শতাংশ

রাজ্যের মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যে ৫.১২ শতাংশ নানা ধরণের পরিবহন শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এঁদের মধ্যে পড়েন ড্রাইভার, কনডাক্টার, খালাসি, রিক্সাচালক, ভ্যানচালক প্রভৃতি। এই কাজে দার্জিলিং এ লিপ্ত ১২.৯ শতাংশ, কোচবিহারে ৯.৪ শতাংশ, কোলকাতা ৮.৭ শতাংশ মুসলিম মানুষ।

ব্যবসা বাণিজ্যে নিযুক্ত পরিবারের সংখ্যা কোলকাতায় সবচেয়ে বেশি (১৭.%), তারপর উত্তর ২৪ পরগণা (.%), দক্ষিণ ২৪ পরগণাতে (.%)। নদিয়ায় এটা সবচেয়ে কম—১.৭ শতাংশ। সমীক্ষাকৃত পরিবারগুলির মধ্যে বেতনভোগী পেশা, সরকারী কাজকর্মে মাত্র ০.৩৬ শতাংশ মানুষ যুক্ত, এদের বেশীরভাগটাও কোলকাতায়।

মুসলিম জীবনযাত্রা সম্পর্কিত পরিসংখ্যানগুলি থেকে এটাই বেরিয়ে আসে যে জীবনধারণের জন্য এ রাজ্যের মুসলিমদের কঠোর দৈহিক শ্রমের ওপরেই মূলত নির্ভর করতে হয়। বৌদ্ধিক শ্রমে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে বিভিন্ন জেলায় পেশাগত বৈচিত্র্য আছে। মুসলিমদের জীবন যাপনের মানোন্নয়নের জন্য এই পার্থক্যের দিকগুলিকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনিয়তা আছে।

এই রাজ্যের মুসলমানদের সঙ্গে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুসলিমদের দুটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। সর্বভারতীয় চিত্রের বিপরীতে এই রাজ্যে গ্রামে বাস করা মুসলমানদের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। দ্বিতীয়ত সর্বভারতীয় মানের তুলনায় এ রাজ্যে কর্মনিযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই দুটি ক্ষেত্র মিলিয়ে সামাজিক কর্মনীতি এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোয় তাদের ভূমিকাও তুলনামূলকভাবে ন্যূন হয়। এই অবস্থার কোনও মৌলিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়ার পরিবর্তে বর্তমান শাসকদের লক্ষ্য মুসলিম সমাজের ধর্মীয় শিরোমণিদের কিছু সুযোগ সুবিধে পাইয়ে দিয়ে সংখ্যালঘু ভোট করায়ত্ত করা এবং সাধারণ সমাজ কাঠামোয় যথাস্থিতি বজায় রাখা। মুসলিম সমাজের ব্যাপক মানুষ অবশ্যই শাসকের এই কৌশলের আসল ছবিকে উপলব্ধি করবেন এবং সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে উপযুক্ত রাজনৈতিক সামাজিক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করবেন। সেই বিকাশের প্রধানতম রাস্তাটি নিঃসন্দেহে শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন। মুসলিম সমাজের সাক্ষরতা শিক্ষার তথ্যগুলোর দিকে নজর দেওয়া এজন্যই জরুরী।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।)

 
 
top