আ স্পেকটার ইজ হন্টিং ইউরোপ...অ্যাগেইন

 

কৃচ্ছসাধন নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বামেদের জয় এবার পর্তুগালেও

ইউরোপ দীর্ঘদিন পর এক অভূতপূর্ব বাঁক বদলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে আর্থিক সঙ্কটের প্রেক্ষিতে ট্রোইকার (ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক এবং আইএমএফ) চাপিয়ে দেওয়া কৃচ্ছসাধন নীতিমালার বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে একের পর এক বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছে, ধর্মঘট হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। সেই গণ আন্দোলনের ঢেউ এবার শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক সঙ্কটের রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে শাসক দক্ষিণপন্থী দলগুলিকে পরাজিত করে কৃচ্ছসাধন নীতিমালার বিরুদ্ধে সোচ্চার বামপন্থীরা সামনে আসছেন, নির্বাচনে জয়লাভ করছেন। গ্রিসে সিরিজার উল্লেখযোগ্য বিজয় ছাড়াও কিছুদিন আগেই ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন কৃচ্ছসাধন নীতিমালার কট্টর বিরোধী করবিন এবং সেই বিজয় লেবার পার্টির দক্ষিণমুখী অভিযাত্রাকেই শুধু বামমার্গী করবে না বরং ব্রিটেন জুড়েই বামপন্থার নয়া বিকাশকে সূচিত করবে বলেও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

স্পেনে নতুন বামপন্থী শক্তি পোডেমস এর উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের নির্বাচনে তারা বেশ কয়েকটি আসনে বিজয়ী হবার পর কিছুদিন আগেই তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা স্পেনের পুরসভা নির্বাচনে দেশজুড়ে বিপুল বিজয় পেয়েছেন। এই বছরের শেষে স্পেনের আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পোডেমস স্পেনে ক্ষমতায় আসবে এবং গোটা ইউরোপ জুড়েই অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ পালটে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই নির্বাচনের আগে পর্তুগালেও সংসদীয় নির্বাচনে বামেদের বিজয় একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

গত ৪ঠা অক্টোবর পর্তুগালে ২৩০ টি আসন বিশিষ্ট সংসদের নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে শাসন ক্ষমতায় থাকা দক্ষিণপন্থী জোট এর দুই দল, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও পিপলস পার্টি মোট ১০৭ টি আসন পায়। বিপরীতে বিরোধী বামপন্থী জোট; যার শরিক হল সোশ্যালিস্ট পার্টি, ডেমোক্রেটিক ইউনিটি কোয়ালিশন (পর্তুগালের কমিউনিস্ট পার্টি ও গ্রিন পার্টির মিলিত চেহারা) ও লেফট ব্লক; মিলিতভাবে ১২২ টি আসন পায়।

বস্তুতপক্ষে বিভিন্ন দেশের জাতীয় ঋণ লাগামছাড়া মাত্রায় পৌঁছনোর পর কীভাবে তার মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে বিতর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই ইউরোপের সমাজ জীবনকে উথাল পাথাল করে দিচ্ছে। জার্মানীর চান্সেলর মার্কেল এর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী শিবির আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য কড়া ব্যয়সঙ্কোচ নীতি গ্রহণের দাওয়াই দিচ্ছেন, সরকারগুলিকে বেল আউটের (ঋণ মুক্তির) শর্ত হিসেবে ব্যয়সঙ্কোচ নীতি গ্রহণে বাধ্য করছেন। বামপন্থী শিবির এই ব্যয়সঙ্কোচ নীতি, অর্থাৎ স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক খাতের অর্থবরাদ্দ হ্রাসের তীব্র বিরোধী। অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে ব্যয়সঙ্কোচের এই বোঝা সাধারণের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠবে এবং বাজার সঙ্কুচিত হয়ে সঙ্কটকে আরো তীব্র করবে, এই তাদের মত। উচ্চ আয়ের মানুষের করহার বাড়িয়ে সেই অর্থে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে তারা এই সঙ্কটের মোকাবিলা করার কথা বলছেন। দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী শিবিরের এই মত বিভাজন স্পষ্ট চেহারা নিয়েছে এবং গণ আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটছে।

পর্তুগাল এর দক্ষিণপন্থী জোটের শাসক সরকার ২০১২ সাল থেকেই তাদের কৃচ্ছসাধন নীতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদী আঁচ ভালোরকম টের পেতে শুরু করে। ওই বছরেই রাজধানী লিসবনে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়ে জানিয়ে দেন ব্যয়সংকোচ করা চলবে না। বস্তুতপক্ষে গত তিন দশকের মধ্যে এটিই ছিল পর্তুগালে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ সমাবেশ। সমাবেশে অংশগ্রহণকারী বয়ন শ্রমিক সুশানা লিল জার্মানী নির্দেশিত ব্যয়সঙ্কোচ নীতির বিরোধিতা করে বলেন, আর্থিক সঙ্কট কেবল জার্মানীকেই লাভবান করছে। ওই বছরের মে মাসে পর্তুগালের সংসদ শ্রম আইনে যে সব পরিবর্তন এনেছিল, পর্তুগালের প্রধান শ্রমিক ইউনিয়ন তার তীব্র বিরোধিতা করে।

তিরিশ বছর ধরে চলা স্বাস্থ্যনীতিতেও আসে পরিবর্তন। বস্তুতপক্ষে ব্যয়বরাদ্দর তীব্রতম প্রকোপ পড়ে স্বাস্থ্যখাতেই। চিকিৎসক, নার্সদের বেতনে কাটছাঁট করা হয়, বাড়ে ওষুধের দাম। অনেক সরকারী হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসার সুযোগ পেতে রোগীদের অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ হ্রাসের প্রতিবাদে চিকিৎসকেরা শুরু করেন ধর্মঘট। লিসবনের কেন্দ্রীয় হাসপাতাল সাও হোসের চিকিৎসক ড. পিলার এবং ড. কার্লোস মার্টিং জানান দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেসরকারীকরণ সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে। মানুষ স্বল্পব্যয়ে উন্নত চিকিৎসার যে সুযোগ পেতেন তা থেকে বঞ্চিত হবেন। বেসরকারীকরণের তাগিদে অনেক সরকারী হাসপাতাল বন্ধও করে দেওয়া হয়। চিকিৎসা লাভজনক পণ্যে পরিণত হবার ফলে জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত হতে থাকে। এসবের প্রতিবাদেই হয় এক ব্যাপক ধর্মঘট। সাধারণ মানুষ এই ধর্মঘটকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেন। এদেরই একজন দক্ষিণ লিসবনের আলমাদার এক ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য আসা জনৈক জোয়াল পালমা ক্ষোভের সুরে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য একটা ভালো ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকা আছে তো ঠিক আছে, না হলেই মরণ।

বামপন্থীদের এই বিজয় গত কয়েক বছরে পর্তুগাল জুড়ে শাসক জোট ও তার নেওয়া কৃচ্ছসাধন নীতিমালার বিরুদ্ধে আছড়ে পড়া গণ আন্দোলন থেকেই উদ্ভূত। অবশ্য গণ আন্দোলনের থেকে উঠে আসা বামপন্থীদের এই বিজয়কে শাসক শ্রেণি এখনো সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। সমস্ত পক্ষকে হতবাক করে নির্বাচনী গণ রায়কে অস্বীকার করে পর্তুগালের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি অ্যানিবাল কাভাকো সিলভা বাম জোটের নেতা আন্তোনিও কোস্তাকে সরকার গঠনের জন্য না ডেকে দক্ষিণপন্থী জোটের প্রধান ও বর্তমান শাসক পেদ্রো কোয়েলহোকেই সরকার গঠনের জন্য ডেকেছেন। বামপন্থীদের স্পষ্ট বিজয় সত্ত্বেও কেন এই সিদ্ধান্ত তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি যে বক্তব্য রেখেছেন তা শুধু পর্তুগাল নয় গোটা ইউরোপ জুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছে। রাষ্ট্রপতি সিলভা বলেছেন লেফট ব্লক বা কমিউনিস্টরা সরকারে এলে তা ব্রাসেলস এর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর দপ্তরে বা লগ্নী (ফিনান্স) পুঁজির কর্তাব্যক্তিদের কাছে খারাপ বার্তা পাঠাবে। তার চেয়ে জাতীয় স্বার্থে দক্ষিণপন্থী শক্তির সংখ্যালঘু সরকারও শ্রেয়। গত চল্লিশ বছরে পর্তুগালে কখোনোই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসেনি এবং এবারও তাদের সে সুযোগ পাওয়া উচিৎ নয়। যারা লিসবন চুক্তি, বিকাশ এবং স্থায়ীত্ব চুক্তি ভেঙে দেবার জন্য প্রচার করেছে, ইউরো মুদ্রার বাইরে পর্তুগালের বেরিয়ে আসার কথা বলেছে, ন্যাটোর বাইরে বেরিয়ে আসার কথা বলেছে—তাদের সরকারে স্থান দিতে না চেয়েই এই সিদ্ধান্ত বলে রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতার বলে সংখ্যালঘু জোটের প্রধান পেদ্রো কোয়েলহো সরকার গঠনের জন্য ডেকেও গণ রায়কে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবেন না বলেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নতুন সংসদ গঠনের পরেই পেদ্রো কোয়েলহোর সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আসবে এবং স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণপন্থী সরকারের পতন হবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাম জোটের নেতা অ্যান্টোনিওনি কোস্তা রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তকে চরম ভুল মনে করে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন এর ফলে দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতার ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়বে। সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই অনাস্থা প্রস্তাব আনার কথাও তিনি বলে রেখেছেন। আগামী দিনে পর্তুগালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় সেদিকে সবার চোখ থাকবে কিন্তু এটা এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে ইউরোপ জুড়ে শাসক শ্রেণি আবার বামপন্থার ভূত দেখতে শুরু করেছে এবং যেন তেন প্রকারেণ তাকে আটকাতে চাইছে। একসময় যে গণতন্ত্র সংক্রান্ত প্রশ্ন সে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে নিয়ম করে তুলত আজ বামপন্থীদের আটকাতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে প্রকাশ্যে ভয়াবহভাবে দলন করতেও সে যে পিছ পা নয়, পর্তুগালের নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। তবে এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইউরোপ জুড়ে গণ জাগরণ ও বাম উত্থানের গতিকে উল্টোদিকে ঘোরানোর জন্য শাসক শ্রেণির নিরন্তর প্রচেষ্টা সফল হবে না এবং আরো নতুন নতুন সঙ্কটে তাকে নিকট ভবিষ্যতে নিমজ্জিত হতে হবে।

 

 
 
top