আ স্পেকট্রা ইজ হন্টিং ইউরোপ ... অ্যাগেইন

 

বাঁকবদল ব্রিটেনেও

ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির দলনেতা নির্বাচিত হলেন জেরেমি কববিন এবং তাঁর নির্বাচন লেবার নীতির এক বামপন্থী ঝোঁকের দিকে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিৎ দিচ্ছে। বস্তুতপক্ষে শুধু লেবার পার্টি বা ব্রিটেনের ক্ষেত্রেই নয়, ইউরোপের এক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়েই আমরা নতুন চেহারায়, নতুন ভাষা ও আঙ্গিকে এক নতুন ধরণের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ লক্ষ্য করছি। নির্বাচনের আঙিনায় এবং গণ আন্দোলনের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষিতে এই নয়া জাগরণ গোটা বিশ্বের বাম গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে অবশ্যই গভীর আশা ও প্রত্যয়ের ব্যাপার।

রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ধাঁচের সমাজবাদের পতনের পর গোটা বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র গঠনের কাজটি এক বড়ো ধাক্কার মুখে পড়েছিল। চিনও দ্রুত চিনা ধাঁচের সমাজবাদের সঙ্গে বাজার অর্থনীতি ও বড়ো পুঁজির সংযোগ তৈরি করছিল। ভারতের বুকে আমরা দেখছিলাম সবচেয়ে বেশি গণভিত সম্পন্ন বাম দল সিপিআই (এম) ও তাদের পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি আন্দোলনের হাতিয়ার হওয়ার থেকে ক্রমশ উন্নয়নের হাতিয়ার ও (বুর্জোয়া) শিল্পায়নের রূপায়ণের দিকে সরে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ধ্বনিত হচ্ছিল ইতিহাসের অবসান (এন্ড অব হিস্ট্রি) ও পুঁজিবাদের বিকল্পহীনতার (দেয়ার ইজ নো অলটারনেটিভ বা টিনা) তত্ত্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিহত প্রভাব একমেরু বিশ্বের বাতাবরণ ক্রমশ জোরদার করছিল।

অবশ্যই এই একমেরু একনীতি বিশ্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চাইছিল স্যাভেজের ভেনেজুয়েলা, কাস্ত্রোর কিউবা এবং লাতিন আমেরিকার নানা দেশের গণ আন্দোলন ও বাম ঝোঁক সম্পন্ন সরকারগুলির গঠন ও কার্যক্রম। কিন্তু পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পীঠ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিক থেকে শুরু হওয়া বিরাট মন্দা গোটা পরিস্থিতির মাত্রাগত ও গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। আর্থিক মন্দা মার্কিন রাজনৈতিক মানচিত্রের উপরিস্তরে রিপাবলিক্যান বা ডেমোক্র্যাট আধিপত্যের কোনও পরিবর্তন সেভাবে সূচিত করতে না পারলেও শাসকশ্রেণির নীতির বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন বা অকুপাই মুভমেন্ট এক বিকল্প নীতির আকাঙ্ক্ষা হিসেবে ভালোভাবেই সামনে আসে।

এই আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক কাঠামোর রূপ নিয়ে নেয় ইউরোপে এবং তা শক্তির ভারসাম্যেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত করতে থাকে। শ্রমিকশ্রেণি নতুনভাবে আত্মঘোষণা শুরু করে। মিছিল, সমাবেশ এবং ধর্মঘটগুলি বিভিন্ন দেশে সফলভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতে সামিল হন। গণ আন্দোলন নিও লিবারাল অর্থনীতির নীতিমালা পরিবর্তনের জোরালো দাবিসনদ পেশ করে এবং নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে ক্রমশ বেশি বেশি করে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। গ্রিসের নির্বাচনে বামপন্থী দলগুলির জোট সিরিজা ইতোমধ্যেই বিজয়ী হয়েছে এবং মন্দা আক্রান্ত দেশে বন্ধুর পরিস্থিতিতে ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে চলেছে। (গ্রিসের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি আমরা স্বতন্ত্র পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি এবং পরিস্থিতি সেখানে নিয়ত পরিবর্তনশীল।স্পেনেও স্থানীয় নির্বাচনে বামপন্থীরা উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছেন এবং পোডোমস দেশের উল্লেখযোগ্য বাম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ক্রমশই বেশি বেশি করে জনপ্রিয় হচ্ছে। (স্পেনের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা স্বতন্ত্র ও বিস্তারিত আলোচনা পরে করব।)

এই পরিপ্রেক্ষিতেই ব্রিটেনের লেবার পার্টির নেতৃত্বের নির্বাচনে দীর্ঘদিনের সমাজতন্ত্রী নেতা জেরেমি করবিনের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যের। এই জয়কে করবিন নিজে বিজয়ের অব্যবহিত পরে অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে জনগণের রায় বলে অভিহিত করেন। ব্রিটেন ও বিশ্বের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা করবিনের এই জয়ের মধ্যে লেবার পার্টির সমাজ গণতান্ত্রিক অভিমুখ থেকে পালাবদলের ইঙ্গিৎ খুঁজে পাচ্ছেন এবং তার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। উত্তর লন্ডনের তিন দশকের পার্লামেন্ট সদস্য করবিন বরাবরই সমাজবাদী অর্থনীতির কথা সোচ্চারে বলে এসেছেন। যুদ্ধবিরোধী নীতিমালার সোচ্চার প্রচারক, ব্যক্তি পুঁজির বিকাশের সহায়ক নীতিমালার কড়া সমালোচক এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি উদ্যোগের এক সংগঠক হিসেবেই মানুষ বরাবর তাঁকে চিনেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক সঙ্কটের মোকাবিলায় কৃচ্ছসাধন নীতির এক কড়া সমালোচক হিসেবে তিনি দেশজুড়ে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। করবিন জনকল্যাণমুলক অর্থনৈতিক কাজে সরকারী ব্যয়বরাদ্দ কাঁটছাটের যেমন তীব্র সমালোচনা করেছেন, তেমনি বিজয়ের পরেই ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকার জন্য বিশ্বের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। এসবের পাশাপাশি শরণার্থীদের তীব্র সঙ্কটের মুখে ব্রিটেনে তাদের স্বাগত জানিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অভিমুখটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

কৃচ্ছসাধন নীতিমালার বিরুদ্ধে এবং তারই অঙ্গ হিসেবে শ্রমিকের মজুরি ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা করবিন বলেছেন। তাঁর নির্বাচন ও রাজনৈতিক অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে লেবার পার্টির দক্ষিণ ঘেঁষা সমাজ গণতন্ত্রী নেতৃত্ব রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়েছেন এটা যেমন ব্রিটেনের বিকাশমান ঘটনাবলির একটা দিক, তেমনি অন্যদিকে এই নয়া নীতিমালার মধ্য দিয়ে দেশের বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়নগুলি আবার নতুন করে লেবার পার্টির সঙ্গে সমন্বিত হতে চাইছে – এটাও বিকাশমান রাজনৈতিক চালচিত্রের অন্য একটা দিক। ফ্রায়ার ব্রিগেড ইউনিয়ন বা আরএমটি রেল ইউনিয়ন করবিনের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়েই লেবার পার্টির সঙ্গে তাদের পুনঃসংযোগ স্থাপন করছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ব্রিটেনের অন্যতম শক্তিশালী ফ্রায়ার ব্রিগেড ইউনিয়ন ২০০৪ সালেই ব্লেয়ার নীতিমালার প্রতি ক্ষোভবশত লেবার পার্টির সঙ্গে সংযোগ পরিত্যাগ করেছিল।

বস্তুতপক্ষে লেবার পার্টির নেতা হিসেবে করবিনের নির্বাচিত হওয়া একটি বিরাট সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে ব্রিটেন এবং ইউরোপের বুকে। একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম এবং সৃজনশীল রাজনীতির প্রয়োজন হবে, তা বলাই বাহুল্য। কারণ পলিটিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট এবং শাসকশ্রেণির তরফে, লেবার পার্টির ভেতর ও বাইরে থেকে করবিন এবং বাম আন্দোলনের নয়া গতিকে রুদ্ধ করার সংগঠিত ও ব্যাপ্ত প্রয়াস থাকবে। এই চ্যালেঞ্জ এবং তাকে মোকাবিলায় এতাবৎ গৃহীত করবিন ও সঙ্গীদের উদ্যোগের পথরেখাটা বুঝে নেওয়া এই প্রসঙ্গে বিশেষ গুরূত্বপূর্ণ।

নির্বাচনের আগেই করবিনকে লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের তরফে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল। টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন নিউ লেবার জমানায় মূলত সমাজ গণতান্ত্রিক একটি দলে পরিণত হয়ে যাওয়া লেবার পার্টিতে করবিনকে দেখা হচ্ছিল পলিটিক্যাল মিসফিট হিসেবেই এবং তাঁর জয়ের সম্ভাবনাকে প্রথম দিকে তেমন গুরূত্বও দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু করবিন তাঁর প্রচারপর্বে যখন শ্রমিকশ্রেণির মজুরি ও অন্যান্য দাবিদাওয়ার পক্ষে এবং কৃচ্ছসাধন নীতিমালার বিপক্ষে লাগাতার প্রচার চালিয়ে যান, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। অনেক প্রতিষ্ঠিত লেবার নেতৃত্ব যেমন করবিনের বিরুদ্ধে চলে যান, তেমনি করবিন পাশে পেয়ে যান জন ম্যাকডোনেল, অ্যাঞ্জেলা ইগেল, সাদিক খান, কেন লিভিংস্টোন-এর মতো একসারি প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন নেতৃত্বকে। জন ম্যাকডোনেল ট্রেড ইউনিয়নগুলির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপনের কাজে বিশেষ ভূমিকা নেন এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলি তথা শ্রমিকশ্রেণির বিপুল সমর্থনই করবিনের লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসার পথ সুগম করে। ইউনাইট এবং ইউনিশন–এই দুটি বড়ো শ্রমিক ইউনিয়নের সমর্থন করবিনের জয়ের রাস্তাকে অনেকটাই সুগম করে দেয়। শাসক কনসার্ভেটিভ পার্টির ওয়েলফেয়ার বিল-এর বিরুদ্ধে তাঁর ভোটদান তাঁকে ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব হিসেবে সামনে আনে, কারণ অন্যরা ভোটদানে বিরত থাকার পন্থাই অবলম্বন করেছিলেন। যারা লেবার পার্টির দক্ষিণপন্থী ঝোঁকে হতাশ হয়ে পার্টি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন করবিন তাঁদের দলে ফেরার ডাক দেন এবং নীতির মোড় ঘোরানোর আন্দোলনে সামিল হওয়ার কথা বলেন। করবিন তাঁর প্রচারাভিযানের অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যাপক জনসংযোগ নীতি নেন। ৫ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ তিন ডলার করে অর্থ সাহায্য করেন এবং করবিনের নীতিমালার প্রতি তাদের সমর্থন জানান। মানুষকে সমন্বিত করেই তাঁর নির্বাচনী সাফল্য এসেছে যার মূল ভিত্তি শ্রমিকশ্রেণি। সাধারণ মানুষ এবং বিশেষভাবে শ্রমিকশ্রেণির দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই যে তিনি এরপর এগোতে চাইবেন সেখানে কোনও অস্পষ্টতা নেই। লেবার পার্টি তথা ব্রিটেনের রাজনীতিতে বাম ও শ্রমিক আন্দোলনের নয়া অধ্যায় করবিনকে কেন্দ্র করেই দানা বাঁধতে চাইছে এবং নিশ্চিতভাবেই তা ইউরোপজোড়া নয়া বাম রাজনৈতিক উন্মেষের এক সম্ভাবনাময় অংশ। ব্রিটেনের ফায়ার ব্রিগেড ইউনিয়নের নেতা ম্যাট র‍্যাক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, গত তিরিশ বছর ধরে এই দেশে এবং গোটা ইউরোপে বামেরা হামলার মুখে ছিল। এখন বিদ্রোহের অনেক স্ফুলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে। আমরা (ট্রেড ইউনিয়নগুলি) যদি করবিনের প্রচারের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সমন্বিত হতে পারি, তবে আমরা এক বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে পারব। করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এবং ব্রিটেনের শ্রমিক আন্দোলন কোন রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করতে সক্ষম হয়, সেদিকে অবশ্যই আমাদের আগ্রহী চোখ থাকবে।

 
 
top