আরএসএস, বিজেপি ও হিন্দুত্ব: ইতিহাস থেকে বর্তমানে

 

হেডগাওয়ারের পর সঙ্ঘচালকের দায়িত্বভার বর্তায় গোলওয়ালকরের ওপর এবং চল্লিশপঞ্চাশের দশক জুড়ে জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ বছরগুলিতে তিনি আরএসএস ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে দেশজুড়ে বিস্তৃত ও সংহত করেন। সঙ্ঘচালক হিসেবে দায়িত্ব নেবার দুবছর আগেই তিনি লিখেছিলেন উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড নামের আলোরড়ন সৃষ্টিকারী রচনা । এখানে এবং তার দেওয়া বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বক্তৃতার সংগ্রহ চিন্তাসমূহর সংকলন (বাঞ্চ অব থটস)-এ পাওয়া যাবে গোলওয়ালকারের হিন্দুত্ব ভাবনার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। আমরা দেখব গোলওয়ালকর সাভারকরের সেই পিতৃভূমি/ পুণ্যভূমি ও মাতৃভূমি সংক্রান্ত তত্ত্বায়নটিই গ্রহণ করেন এবং আরো উগ্রভাবে তাকে এগিয়ে নিয়ে যান। ভৌগলিক জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে গোলওয়ালকর শুধু পার্থক্যই করলেন না, হিটলারের উদাহরণ সামনে রেখে দেশকে বিশুদ্ধ রক্তের মানুষেরই আবাসভূমি রাখার জন্য সেমেটিক বিতাড়ণেপ্রয়োজনীয়তার কথা তুললেন। হিটলারের উদাহরণকে হিন্দুস্থানের জন্য শিক্ষণীয় বলেও মনে করলেন। বলাই বাহুল্য হিটলারের সেমেটিক তথা ইহুদি বিদ্বেষকে এখানে সেমেটিক অর্থাৎ মুসলিম বিদ্বেষে পরিবর্তিত করে নেওয়া হল। ভারতের অহিন্দুদের জন্য গোলওয়ালকর রাখলেন তার স্পষ্ট নিদান: সমস্ত অহিন্দুদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষা, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে, হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের জন্যই কেবল গৌরব করতে হবে, অন্য কোনও কিছুর (অর্থাৎ অন্য কোনও পুণ্যভূমির) জন্য নয়। এই দেশ এবং তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য সংস্কারগুলিকে অশ্রদ্ধা করা চলবে না বরং একে ভালোবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। এককথায় হয় তাদের দেশ ছাড়তে হবে অথবা কোনও দাবি না রেখে হিন্দুজাতির অনুগত হয়ে থাকতে হবে। কোনও বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাওয়া দূরে থাক, তাদের এমনকী নাগরিক অধিকারও থাকবে না(উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড, পৃ. ২৭)

খ্রিষ্টান এবং মুসলিম বিদ্বেষকে চরম সীমায় নিয়ে গেলেন গোলওয়ালকর। প্রশ্ন তুললেন: খ্রিষ্টান এবং মুসলিমরা এদেশে জন্মেছে ঠিকই, কিন্তু তারা কি দেশের নুন এর প্রতি সত্যকারের বিশ্বস্ত? তাদের বিশ্বাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই জাতির প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলিমদের তিনি এককথায় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যা দিলেন। বললেন: মুসলিমরা এখনো ভাবে তারা এদেশ দখল করতে এসেছে, এখানে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে। তাই এটা কেবল বিশ্বাসের পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটা হল জাতীয় পরিচয় পরিবর্তনের প্রশ্ন

সমকালীন ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও দেশাত্ববোধের প্রচলিত ধারণাটিকেই গোলওয়ালকর প্রশ্নায়িত করেন। তার মতে: ভৌগলিক জাতিয়তাবাদের সাধারণ শত্রু সম্বন্ধীয় তত্ত্বসমূহই হোল মূল সমস্যা, আর এগুলিই হিন্দু জাতিয়তাবাদের ইতিবাচক প্রণোদনা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে এবং আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেবল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পর্যবসিত করেছে। ব্রিটিশ বিরোধিতাকে দেশাত্ববোধ ও জাতিয়তাবাদের সঙ্গে একীভূত করে ফেলা হয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ আমাদের সমগ্র স্বাধীনতাযুদ্ধ, আমাদের নেতা এবং জনগণের ওপর ভয়ংকর খারাপ প্রভাব বিস্তার করেছে

এই যুক্তিজাল থেকেই গোটা চল্লিশের দশক জুড়ে গোলওয়ালকরের আরএসএস সরে থেকেছে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে। ৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজ এর লড়াই, আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সেনানিদের বিচারকে কেন্দ্র করে ১৯৪৫-৪৬ এর উত্তাল প্রতিরোধ বা নৌ বিদ্রোহকোনও কিছুতেই আরএসএস অংশগ্রহণ করেনি। বিপরীতে দাঙ্গার ঘটনাগুলিতে অতিসক্রিয় থেকেছে। এইসময় হিন্দু মৌলবাদ ও মুসলিম মৌলবাদ পরস্পর পরস্পরকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে চেয়েছে এবং স্বাভাবিক নিয়মেই একে অপরকে পুষ্ট করেছে। মুসলিম লিগের মতো আরএসএসও এই পর্বে ব্রিটিশ এর যুদ্ধকালীন নিপীড়ণের মুখোমুখি হয়নি এবং গোটা পর্বটিকে সংগঠন বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করেছে। ১৯৪৫- আরএসএস দশ হাজার স্বয়ংসেবকের এক শিক্ষাশিবিরের আয়োজন পর্যন্ত করেছে। এই সময় মুসলিম মৌলবাদেরও ভালোমাত্রায় বিকাশ হয়েছিল এবং মুসলিম লিগের পাকিস্থান দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল। অনেকের মনে হতে শুরু হয়েছিল এই পরিস্থিতিতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস- তাদের ত্রাতা হতে পারে। বেশি সংখ্যক মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলির হিন্দুদের একাংশের মধ্যে এই ভাবনা দানা বেঁধে উঠছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ। কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশও আরএসএ-এর প্রতি তাদের দুর্বলতা পোষণ করছিলেন। নেহরু আরএসএস-এর প্রতি আগাগোড়া বিদ্বিষ্ট থাকলেও বল্লভভাই প্যাটেল তাদের প্রতি অনেকটাই সহানুভূতি সম্পন্ন ছিলেন। বেনিয়া গোষ্ঠী আরএসএস-কে বিরাটভাবে মদত দিয়েছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী বামপ্রভাব থাকায় বাংলাতে আরএসএস-এর উত্থানকে প্রতিহত করা সম্ভবপর হয়েছিল।

১৯৪৬- জিন্না তথা মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ঘোষণা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে তীব্র করে তোলে। কলকাতায় শুরু হয় নারকীয় দাঙ্গা ও বিহারের নোয়াখালি, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়ে। আরএসএস এই পর্বে হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে মিশে দাঙ্গায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। দাঙ্গা বিধ্বস্ত মানুষের মধ্যে তাদের চালানো ত্রাণকার্য ও ব্যাপক সাম্প্রদায়িক প্রচার তাদের বিকাশকে ত্বরাণ্বিত করে।

আরএসএস-এর কার্যক্রম ও বৃদ্ধিবিকাশে একটি বড় যতিচিহ্ন পড়ে গান্ধীহত্যার পর। গোটা দেশজুড়ে এতে আরএসএস-এর যুক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন তৈরি হয়, আরএসএস-এর অফিস ও বাড়িগুলি গণক্রোধে ভাঙা হতে থাকে এবং ১৯৪৮-এর ৪ ফেব্রুয়ারি আরএসএস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। আরএসএস নিষিদ্ধ হবার পর গোলওয়ালকর প্রাথমিক প্রতিবাদ আন্দোলন বা সত্যাগ্রহের পথ দ্রুত পরিত্যাগ করেন এবং জাতীয় নেতৃত্বের কাছে নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে অনুরোধ করা শুরু করেন। নেহরু ও প্যাটেল উভয়কেই তিনি আর্জি জানিয়ে চিঠি লেখেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই সমস্ত চিঠিতে পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে তিনি কম্যুনিস্ট ভীতি জাগিয়ে তুলতে চান এবং জানান আরএসএস-এর মতো সংগঠনই কম্যুনিস্টদের প্রতিষেধক হতে পারে। কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে এবং আরএসএস সাংস্কৃতিকভাবে কম্যুনিস্টদের মোকাবিলা করলে তবেই ভালোভাবে এদেশে ক্রমবর্ধমান কমিউনিজমেরএর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে—এমনই ছিল তার অভিমত। কয়েকটি শর্ত পালনের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আরএসএস-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় ১২ জুলাই, ১৯৪৯। আরএসএস ও সরকারের মধ্যে এই পর্বের মধ্যস্ততাকারীদের অন্যতম ছিলেন জি ডি বিড়লার মতো শিল্পপতি। ১৯৬২ র চিন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আরএসএস জাতীয় রঙ্গমঞ্চে তার গুরূত্ব ফিরে পায় এবং ১৯৬৩- প্রজাতান্ত্রিক দিবসের শোভাযাত্রায় সে অংশগ্রহণও করে। ১৯৬৫- ভারত পাকিস্থান যুদ্ধ আরএসএস-এর বৃদ্ধি বিকাশের সহায়ক আবহাওয়া তৈরি করে।

এই সময়ে গোলওয়ালকর এর উদ্যোগে ১৯৬৪-তে তৈরি হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। এর মধ্য দিয়ে একদিকে গোটা দেশের সাধু সন্তদের সঙ্গে আরএসএস সংযোগ তীব্র হয়, অন্যদিকে গোটা বিশ্বের হিন্দুসমাজকে রক্ষা করতে ও মর্যাদা দিতে তাকে এক বিশ্বজনীন অবয়ব দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। উত্তেজনা তৈরির রসদ সম্পন্ন বিভিন্ন সংবেদনশীল বিষয়কে ভিএইচপি তার প্রচার আন্দোলনের বিষয় করে তুলতে থাকে এবং তীব্র সামাজিক মেরুকরণে সক্ষম হয়। ১৯৬৭-তে সে শুরু করে গোহত্যা বন্ধের দাবিতে এক জঙ্গী আন্দোলন। আশির দশক থেকে রামমন্দির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় রাজনীতিতে আগ্রাসী হিন্দুত্বের রাজনীতির এক নতুন বিস্তার ঘটে। ভিএইচপি অযোধ্যা, মথুরা ও কাশীতে মন্দির নির্মাণের জন্য ডাক দেয় এবং এই প্রশ্নটিকে ঘিরে দেশজোড়া ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টিতে সে সক্ষমও হয়। ১৯৯২-তে বাবড়ি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশজোড়া সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়েও নিবৃত্ত হবার কোনও ইচ্ছে না দেখিয়ে সে স্লোগান তোলে ইয়ে তো পহেলি ঝাঁকি হ্যায়/ আব তো কাশী মথুরা বাকী হ্যায়।

আরএসএস সর্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের জন্য ভিএইচপি সহ বিভিন্ন শাখা সংগঠনের ওপর আরো বেশি বেশি করে নির্ভর করতে থাকে। বিভিন্ন মাত্রার সচলতা সম্পন্ন অনেকগুলি সংগঠন সমৃদ্ধ একটি বৃহৎ সঙ্ঘপরিবারের সে জন্ম দেয়। সঙ্ঘ পরিবারের অংশ বা প্রত্যক্ষ প্রভাবাধীন এমন সংগঠন এর তালিকাটি বিরাট এবং আগ্রহোদ্দীপক। শিক্ষার ক্ষেত্রে আরএসএস-এর নিয়ন্ত্রণাধীন বিদ্যাভারতী বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা বিষয়ক সংগঠন। তেরো হাজার শাখা, পঁচাত্তর হাজার জন শিক্ষক ও সতেরো লক্ষ বিদ্যার্থীর এই বিশাল কর্মকাণ্ডর মাধ্যমে আরএসএস তার প্রভাবকে ভালোভাবেই ছড়াতে সক্ষম হয়। উপজাতিদের নিয়ে রয়েছে আরএসএস-এর বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, সাহিত্য সম্পর্কিত ভারতীয় সাহিত্য পরিষদ, বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করার জন্য প্রজ্ঞা ভারতী আর দীনদয়াল গবেষণা কেন্দ্র, ইতিহাস সম্পর্কিত ভারতীয় ইতিহাস সংকলন যোজনা, শিক্ষকদের নিয়ে ভারতীয় শিক্ষক মণ্ডল আর অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ, ভাষা বিষয়ে সংস্কৃতি ভারতী, সংস্কৃতি বিষয়ে সংস্কার ভারতী, বস্তি সম্পর্কিত ক্ষেত্রে সেবা ভারতী, হিন্দু সেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দ মেডিক্যাল মিশন, ন্যাশানাল মেডিকোস, সমবায় সম্পর্কিত সমবায় ভারতী, গ্রাহকদের সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত, মিডিয়া সংক্রান্ত ভারত প্রকাশন, সুরুচি প্রকাশন, জ্ঞানগঙ্গা প্রকাশন, লোকহিত প্রকাশন ইত্যাদি সহ আরো বেশ কিছু, বিজ্ঞান বিষয়ক বিজ্ঞান ভারতী, ধর্ম ও ধর্মান্তরীতকরণের জন্য বিবেকানন্দ কেন্দ্র, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, শিল্পপতিদের জন্য ভারত বিকাশ পরিষদ, যুবদের জন্য বজরং দল, ছাত্রদের জন্য অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, অনাবাসী ভারতীয়দের জন্য ভারতীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, ফ্রেন্ডস অব সোসাইটি ইন্টারন্যাশানাল, ট্রেড ইউনিয়ন ক্ষেত্রে ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ (বিএমএস), মহিলাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি, অর্থনীতি ক্ষেত্রে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। আরএসএস-এর এই সুবিস্তৃত জাল এর রাজনৈতিক মুখ হিসেবে আছে ভারতীয় জনতা পার্টি, যা তৈরি হয়েছে প্রথমে হিন্দু মহাসভা ও পরে ভারতীয় জনসঙ্ঘের উত্তরাধিকার বহন করে।

আরএসএস বা ভিএইচপি- আন্দোলন অবশ্যই শুধুমাত্র কোনও ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, তা ছিল তার রাজনৈতিক মুখকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য এক সুচিন্তিত পরিকল্পনা। বস্তুতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই আরএসএস রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন করে ভেবেছে, সময় অনুযায়ী রণকৌশল বদলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে। হিন্দু মহাসভার কমে আসা প্রভাবের প্রেক্ষিতে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন বিষয়ে সে চিন্তাভাবনা করেছে। এরই ফসল হিসেবে মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সঙ্ঘচালক গোলওয়ালকরের উদ্যোগে ১৯৫১ সালে জন্ম নেয় ভারতীয় জনসঙ্ঘ। ষাটের দশকে ভারত চিন যুদ্ধ ও ভারত পাক যুদ্ধের পর কংগ্রেস বিরোধী মানসিকতাকে উশকে দিতে সে নমনীয় রণকৌশল নেয় এবং বিভিন্ন অকংগ্রেসী দলের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের নীতি নেয়। জনসঙ্ঘের তৎকালীন নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায় সরাসরি এই নীতি ঘোষণাও করেন। এমনকী কম্যুনিস্টদের উপস্থিতি স্বত্ত্বেও বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে সে অকংগ্রেসী সরকারের শরিক হয়েছিল । বলরাজ মাধোকের মতো যারা এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তাদের জনসংঘের বাইরেই শেষপর্যন্ত চলে যেতে হয়। সংসদীয় রাজনীতির দিকে আরএসএস-এর নজর কতটা তীব্র হয়েছিল তা বোঝা যায় যখন সে ৭০ দশকের প্রথম দিকে তার শাখাগুলির বিন্যাস সংসদীয় আসনের ভৌগলিক চৌহদ্দি অনুসারে পুনর্গঠিত করে। শুধুমাত্র লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনেই নয় বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের নির্বাচনের দিকেও তার আগ্রহ প্রসারিত হয়।

আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক মুখ ভারতীয় জনসঙ্ঘের কার্যকলাপ ১৯৭৪-৭৫ এ ইন্দিরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণের দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় এক অন্য মাত্রায় পৌঁছয়। আশ্চর্যজনক ভাবেই তারা এবং জয়প্রকাশ কিছুসময়ের জন্য পরস্পরের ঘনিষ্ট মিত্রে পরিণত হন। আরএসএস-এর নেতৃত্বে সঙ্ঘচালক হিসেবে তখন গোলওয়ালকরের মৃত্যুর পর অভিষিক্ত হয়েছেন দেওরাস। ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে তিনি জয়প্রকাশকে একজন সন্ত বলে উল্লেখ করেন। ইমার্জেন্সি পর্ব শুরু হলে সঙ্ঘচালক দেওরাস গ্রেপ্তার হন, আরএসএস আবারো নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এই সময় জনতা দল নির্মাণের প্রস্তুতি চলতে থাকে এবং আরএসএস তাতে সক্রিয়ভাবে মদত দেয়। ১৯৭৭-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনতা দলের সরকার ক্ষমতায় আসে এবং প্রথমবারের জন্য কয়েকজন প্রথমসারির আরএসএস কর্মী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন, যাদের মধ্যে ছিলেন বাজপেয়ী এবং আদবাণী। জনসঙ্ঘ তার সমস্ত সদস্যদের জনতা দলে মিশিয়ে দেয় কিন্তু অচিরেই সঙ্ঘ-এর মধ্যে পূর্বতন জনসঙ্ঘীদের সদস্যপদ তথা যৌথ সদস্যপদের প্রশ্নটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। শেষপর্যন্ত এই বিতর্কের ফলেই ১৯৭৯-তে জনতা দল ভেঙে যায়। এই সময়ে জনতা দলে জনসঙ্ঘের ৯৩ জন এমপি ছিলেন। ১৯৮১-তে ভারতীয় জনসঙ্ঘকে পুনর্জীবিত না করে জনতা পার্টির সাফল্যকে মাথায় রেখে নতুন নামে দল খোলা হয় ও নাম দেওয়া হয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)

১৯৮৪- নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু এবং সহানুভূতি হাওয়ার বিজেপি মাত্র দুটি আসনে নেমে যায়। দেশজুড়ে এই সময় আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নিয়ে আসে রামমন্দির নির্মাণের ইস্যুটিকে এবং যথেষ্ট সফলও হয়। ১৯৮৯ এ প্রায় ৮৮টি সংসদ আসনে যেতে বিজেপি এবং ক্রমশ কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দিকে এগোতে থাকে।

রাম রাজনীতির ঢেউয়ে ভর করে বিজেপি অচিরেই সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে এবং নির্বাচনের আগে পরে জোট রাজনীতির নতুন সমীকরণ বিন্যাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বিজেপি তার নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার চালায় এবং এই সময় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আরএসএস-এর বিভিন্ন অ্যাজেন্ডা জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে সামনে আসে। ইতিহাসকে ইচ্ছামতো বিকৃত করা হয়, বিজ্ঞানের জগতে অধিবিদ্যা নানাভাবে প্রশ্রয় পায়, জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রকে পর্যন্ত মিলিয়ে মিশিয়ে নেওয়া হয়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশী শিক্ষার ব্যাপক গৈরিকীকরণের কাজ শুরু করেন। দশ বছর পর ২০১৪- লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের সূত্রে একক শক্তিতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করল বিজেপি আর আমরা দ্রুতই দেখলাম আরএসএস আরো জোরেশোরে গৈরিকীকরণের কাজ শুরু করেছে। এবারের কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানী ঘন ঘন বৈঠক করছেন আরএসএস নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। দীননাথ বাত্রা ইতিহাস সংসদের কর্ণধার হিসেবে ইতিহাস বিকৃতির খেলা শুরু করেছেন মারাত্মকভাবে। তাঁর লেখা বইতে কখনো বৈদিক যুগে মোটর গাড়ি আবিষ্কারের কথা বলা হচ্ছে তো কখনো গান্ধারীর সন্তান জন্মের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে স্টেম সেল রিসার্চ এর কথা, সঞ্জয় প্রসঙ্গে আসছে টেলিভিসন আবিস্কারের লোমহর্ষক সিদ্ধান্ত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদী গণেশের কাটা মুণ্ড জোড়ার পৌরাণিক কাহিনীতে প্লাস্টিক সার্জারির নিদর্শন খুঁজে পাচ্ছেন বৈদিক যুগে, আর বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ জানিয়ে দিচ্ছেন গীতাকে জাতীয় গ্রন্থ করার ভাবনা চিন্তা করছে সরকার। বলপূর্বক ধর্মান্তরের আয়োজন করছে হিন্দুত্ববাদীরা, নাম দেওয়া হচ্ছে ‘ঘরবাপসি’ বা ঘরে প্রত্যাবর্তন। সমস্ত ভারতীয়ই আবশ্যিকভাবে রামজাদা, রামের সন্তান—এমন নিদান দিচ্ছেন মন্ত্রী আর যারা তা মানতে রাজী নয় তাদের দেগে দিচ্ছেন হারামজাদা বলে। ছেলেমেয়েদের খোলামেলা মেলামেশাকে লাভ জেহাদ নাম দিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে, নির্বাচনী বৈতরনি পার হতে লাগানো হচ্ছে পরিকল্পনামূলক দাঙ্গা, যাকে আরএসএস বরাবরই সংগঠন বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে।

আজকের বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন অ্যাজেণ্ডাকে তার মতাদর্শগত নির্দেশক আর এস এস এর ইতিহাস-দর্শন থেকে বুঝে নেওয়াই আমাদের বর্তমান প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য। অবশ্যই সেইসঙ্গে এটাও মাথায় রাখার আজকের শাসকশ্রেণি তথা কর্পোরেট ক্যাপিটালের কাছে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি জনগণের বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য ও আন্দোলনকে ভেঙে দেবার অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেই এত মদত পেয়ে থাকে।

আজকের বিজেপি নিঃসন্দেহে তার পূর্বসরী জনসঙ্ঘের অবিকল অনুকৃতি নয়, এমনকী ৯০-এর দশকের শুরুতে জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার পর্বে তার যে চরিত্র ছিল তার থেকেও খানিকটা আলাদা। কংগ্রেসকে পেছনের আসনে ঠেলে দিয়ে সেই এখন কর্পোরেট পুঁজির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এবং দেশি বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে সবচেয়ে আগ্রাসী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। মিডিয়ার একাংশ বিজেপি ও মোদির কেবল উন্নয়ন সর্বস্ব মুখকেই আমাদের সামনে তুলে ধরতে চাইলেও ঘটনাধারা দেখিয়ে দিয়েছে বিজেপি বা তার সামনের সারির নেতারা তাদের হিন্দুত্বের রাজনীতিকে কখোনোই পেছনের সারিতে ঠেলে দেয়নি, বরং সর্বদাই তাকে অবলম্বন করে এগোতে চেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও লোকসভা নির্বাচনের আগে পরে ধর্মীয় মেরুকরণ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো বিভিন্ন মন্তব্য ও কার্যকলাপ, পরিকল্পিত দাঙ্গা ও সংখ্যাগুরুর মৌলবাদকে চাপিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর সমস্ত ঘটনা বারেবারেই সামনে এসেছে।

কর্পোরেট কমিউনাল শক্তি বিজেপির পুঁজির পক্ষে দাঁড়িয়ে চালানো আগ্রাসন আর তার মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্যকার পরস্পর সম্পর্ককে বুঝে নেওয়া কঠিন কিছু নয়। মেহনতি মানুষের ঐক্যকে বিভক্ত করার এবং তাদের লড়াই আন্দোলন দাবি দাওয়ার বিষয়গুলিকে উত্তেজনার ইন্ধন সমৃদ্ধ বিভিন্ন ইস্যু দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার সবচেয়ে সহায়ক কৌশল হিসেবেই বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ব্যবহার করে থাকে। সাম্প্রতিক বিজেপি সরকারের কার্যকলাপের একটি দিক যদি রামজাদা –হারামজাদা তত্ত্বায়নের মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ব-ভারতীয়ত্বের সমীকরণ কষা হয়, তবে অপর দিকটি অবশ্যই আদানি আম্বানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা, মেক ইন ইন্ডিয়ার নামে এফডিআইকে সাড়ম্বর আহ্বান আর শ্রম আইন, জমি অধিগ্রহণ নীতি, বিলগ্নীকরণ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তড়িৎ গতির সমস্ত সংস্কারের পরস্পর সংযুক্ত এক বহুবর্ণ ছবির কোলাজ। নয়া উদারনৈতিক রাজনীতি অর্থনীতির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের লড়াই আর উগ্র হিন্দুত্বের আধিপত্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে বহুস্বর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষার গণতান্ত্রিক লড়াই এখন একসঙ্গে মিলেছে। আসুন সেই লড়াইকে শক্তিশালী করি।

 
 
top