আরএসএস, বিজেপি ও হিন্দুত্ব: ইতিহাস থেকে বর্তমানে

 

যে বছর ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির জন্ম হয়, সেই ১৯২৫ এই (মতান্তরে ১৯২০ সনে ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির জন্ম বিদেশের মাটিতে) বিজয়া দশমীর দিনে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জন্ম নিয়েছিল আর একটি সংগঠন। ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে, সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর আদর্শ নিয়ে। সংগঠনটির নামকরণ হয় পরের বছর, রামনবমীর দিনে। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জন্ম নেওয়া সংগঠনটির নাম রাখা হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)। জন্ম মুহূর্তেই এই সংগঠনের তৎকালীন মূল কর্ণধার ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতি থেকে দূরে থেকে মূলত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করাই এর লক্ষ্য হবে। বস্তুতপক্ষে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ রাজনীতি সংক্রান্ত বিতর্ককে কেন্দ্র করেই হিন্দু মহাসভার মত প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগঠন ছেড়ে এসে হেডগেওয়ার আর এস এস এর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন। যদিও আরএসএস-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য বরাবরই থেকেছে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মত চরম রাজনৈতিক এক বিষয়, তবুও সে সেই লক্ষ্য অর্জনের দীর্ঘ পথে এক সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত শক্তি হিসেবে কিছুটা পেছন থেকে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেছে। নিজস্ব লক্ষ্য পূরণে তৈরি করতে চেয়েছে অজস্র কর্মীবাহিনী সমৃদ্ধ দেশজোড়া এক শক্তিশালী সংগঠন। রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে সামনে আনার জন্য সে প্রথম দিকে হিন্দু মহাসভা, পরবর্তীকালে জনসঙ্ঘ ও অধুনা বিজেপির ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু এখন আড়ালের আবরণ অনেকটা সরে গেছে এবং বিজেপি কেন্দ্রে প্রথমবার একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় তারা অনেক সরাসরি সামনে আসছে। আরএসএস-এর হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণের অ্যাজেন্ডা সরকারের বিভিন্ন বৈঠক (যেমন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানীর সঙ্গে আরএসএস-এর পর্যায়ক্রমিক কথাবার্তা), কার্যকলাপ (ঘর বাপসির নামে জোর করে ধর্মান্তরকরণ বা হিন্দুত্ববাদীকে ইতিহাস সংসদে শীর্ষ আসন দেওয়া, পাঠ্য ইতিহাস বইয়ে বিকৃতি) ও গুরূত্বপূর্ণ নেতা মন্ত্রীদের কথাবার্তা (হিন্দুত্বের অতীত গরিমার অনৈতিহাসিক ও স্বকপোলকল্পিত নানা প্রচার বা গীতা-কে জাতীয় গ্রন্থ করার ভাবনা) থেকে বারবার স্পষ্ট হচ্ছে। আরএসএস-এর এই সামনে আসার একটি ইঙ্গিৎবাহী ছবি আমরা দেখেছিলাম নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার অনতি পরেই, গত বিজয়া দশমীর দিন, ৩ অক্টোবর ২০১৪-তে। সেদিন বেতারে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর দূরদর্শনের মতো সরকারী প্রচারমাধ্যমে জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার জন্য সসম্মানে জায়গা করে দেওয়া হল বর্তমান সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতকে। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্র দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সেই চিরাচরিত প্রথার সঙ্গে বিজয়া দশমীর দিনটাকে কেন জুড়ে নেওয়া হল নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তর তো জানা। বিজয়া দশমীর দিনটি আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা দিবস, যে আরএসএস-কে বিজেপি তার মতাদর্শগত দিশারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনকে বোঝার জন্য আরএসএস ও তার নেতৃত্বাধীন সঙ্ঘ পরিবারকে বোঝা দরকার বিশেষভাবেই। বোঝা দরকার বিজেপির পূর্বসূরী রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভাকে বা জনসঙ্ঘকেও। ভারতে হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মতাদর্শ ও সাংগঠনিক বিস্তারের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের নির্দিষ্টভাবে শুরু করতে হবে বিশ শতকের প্রথম ও তৃতীয় দশকে জন্ম নেওয়া দুটি সংগঠনের কথা দিয়ে। প্রথমটি হিন্দু মহাসভা ও দ্বিতীয়টি আরএসএস। প্রদীপ জ্বালার আগে সলতে পাকানোর সচেতনে অচেতনে মেশা এক পর্ব অবশ্য শুরু হয়েছিল হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠারও কয়েক দশক আগে। হিন্দুত্বের রাজনীতির কারবারিরা বিভিন্ন সময়ে নিজেরাই সেই নবজাগরণ পর্বের কয়েকজন চিন্তাবিদের থেকে নানা ধরণের প্রেরণা নেবার কথা বলেছেন যাদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ বা দয়ানন্দ সরস্বতী প্রমুখ।

মর্লে মিন্টো সংস্কারের মধ্য দিয়ে আসা পৃথক ধর্মভিত্তিক নির্বাচন এর সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে হিন্দু মহাসভার জন্ম হয়েছিল ১৯০৯ সালে। এর আগেই ১৯০৬-এ মুসলিম লিগের জন্ম হয় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে সদ্য জন্ম নেওয়া মুসলিম লিগ সমর্থন করতে পারেনি এবং মুসলিম অধ্যুষিত এক পৃথক প্রদেশের ধারণার সূত্রে বঙ্গভঙ্গকেই তারা স্বাগত জানিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজের ভেতর থেকে নানা উগ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিল এবং মর্লে মিন্টো সংস্কারে ধর্মভিত্তিক নির্বাচনের প্রস্তাব এলে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। হিন্দুদের পালটা একটি রাজনৈতিক সংগঠন দরকার এবং কংগ্রেস তা হতে পারে না, এই ভাবনা থেকেই হিন্দু মহাসভা জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু হিন্দু মহাসভা সে সময়ে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়নি। ধর্মীয় উন্মাদনার মুখে দাঁড়িয়েও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি সংক্রান্ত সঙ্কটের বাস্তব দিকগুলিকে বোঝবার ও তার ভিত্তিতে আন্তরিকভাবে কাছাকাছি আসার একটা আগ্রহ লক্ষ্য করা গিয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের মধ্য, আর এই এই গোটা প্রক্রিয়ার পুরোভাগে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গোরা, ঘরে বাইরে- মত উপন্যাসে বা অসংখ্য কবিতায় প্রবন্ধে হিন্দু সমাজের মধ্যেকার জরুরী আত্মসমালোচনার কাজটা শুরু করেছিলেন তিনি। মহাত্মা গান্ধীর জাতীয় রাজনীতিতে আবির্ভাবের পর, বিশেষত গণ আন্দোলনের পর্ব শুরু হলে ধর্মীয় উগ্রতার পরিবেশ অনেকটা কমে আসে। লক্ষ্ণৌ  চুক্তি (১৯১৬)-র সূত্রে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের সামনের সারির নেতারা প্রথমবারের জন্য কাছাকাছি আসেন এবং সম্প্রীতি ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়। সম্প্রীতির পরিবেশ আরো জোরালো হয় ১৯১৯- অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফৎ আন্দোলন একযোগে হাত মিলিয়ে চলতে শুরু করলে। সম্প্রীতির পরিবেশ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জমিকে অনেকটাই কেড়ে নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং ১৯২২ সালে চৌরিচৌরার একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন গান্ধীজী। অচিরেই ব্রিটিশ বিরোধী গণ আন্দোলনে শুরু হয় ভাঁটার পর্ব, হিন্দু মুসলিম ঐক্য ভেঙে পড়ে এবং এই পর্বেই ১৯২৫- জন্ম নেয় আরএসএস, নতুন করে বিকশিত হয় হিন্দু মহাসভা। এই সময়েই সাভারকর হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে সামনে আসেন। ততদিনে তার বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী অতীতকে ঝেড়ে ফেলে তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন এক হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী রাজনীতিবিদে। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রভাব সঞ্চারী বই, হিন্দু কে?, পরবর্তী দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতিতে এই বই মতাদর্শগত দিকনির্দেশিকা হয়ে থেকেছে।

অবশ্য হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি শুধু মতাদর্শগত বিচার বিশ্লেষণের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকেনি, তাকে সাংগঠনিক দৃঢ়তা দেওয়ার প্রয়োজনও অনুভূত হয়েছিল। সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে তাকে আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপ্ত করার সংকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই কাজে বিশেষ ভুমিকা গ্রহণের জন্যই তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)

হেডগাওয়ার তার অনুগামীদের নিয়ে ১৯২৫- আরএসএস তৈরি করেন আর ১৯২৭ সালেই এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রে তার প্রভাব বাড়তে শুরু করে। সাভারকর যে জন্মভূমি ও পিতৃভূমির যুক্তিকাঠামো তৈরি করে দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে হেডগাওয়ারের মতাদর্শগত সামীপ্য ছিল প্রকট। তারা মনে করেছিলেন খ্রিষ্টান বা মুসলিমরা এদেশে বাস করলেও আরব বা প্যালেস্টাইনকে তাদের পিতৃভূমি (পবিত্রভূমি) ভাবে। জন্মভূমির জন্য এদেশের মুসলিম বা খ্রিষ্টানরা তাই কখনো নিবেদিত প্রাণ হতে পারে না। সেটা পারে একমাত্র হিন্দুরাই, যাদের জন্মভূমি আর পিতৃভূমি এক, এই আসমুদ্র হিমাচল। হেডগাওয়ার এর মতে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে দেশময় তৈরি হয় এক দূষিত আবহাওয়া, নগ্নভাবে প্রকট হয়ে পড়ে ব্রাক্ষ্মণ-অব্রাক্ষ্মণ বিরোধ, দাঙ্গা উসকে তোলে অসহযোগের দুধে প্রতিপালিত যবন সাপেরা। যবন সাপেদের প্রতি বিবমিষার মতোই লক্ষ্য করার বিষয় তার ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী অবস্থানটি। বস্তুতপক্ষে আরএসএস-কে শুধু হিন্দুত্ববাদী বললে সেটি খণ্ডিত অভিধা হতে পারে, হিন্দু ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী হিসেবে আখ্যাত করলেই পাঁচ ব্রাক্ষ্মণকে নিয়ে প্রথম তৈরি এই সংগঠনটির স্বরূপ আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারব।

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর সাম্প্রদায়িক ঐক্য সঙ্কটগ্রস্থ হয়েছিল। আরএসএস নাগপুরে স্থানীয়ভাবে প্রথম তার কাজ শুরু করে। দীর্ঘদিন কাজ করতে পারবে আর আনুগত্য থাকবে প্রশ্নাতীত—এই বিচারে আরএসএস এই সময়ে অল্প বয়েসী ছেলেদের হিন্দুত্বের আদর্শে দীক্ষা দিতে শুরু করে। এখন যেখানে বিশাল হেডগাওয়ার ভবন, তখন সেখানে খোলা মাঠ আর এই মাঠেই প্রথম সঙ্ঘচালক হেডগাওয়ার বালকদের কর্মশালা শুরু করেন। তাদের শোনানো হতে থাকে হিন্দু বীর যোদ্ধাদের সংগ্রাম কাহিনী, শিবাজী বা রাণা প্রতাপের মতোই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের আমরণ রত থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। মতাদর্শগত শিক্ষার পাশাপাশি চলতে থাকে ব্যায়াম, কবাডি বা খো খো খেলা, লাঠিখেলা, তলোয়ার খেলা, ছুরি চালানো, বর্শা ছোঁড়ার মতো রাস্তার লড়াইয়ে সাফল্যের লক্ষ্যে নানা কৃৎকৌশলগত শিক্ষা। পরের বছর ১৯২৬- রামনবমীর দিন সংগঠনটি তার নামের সঙ্গে নির্দিষ্ট করে নেয় নিজের পতাকাও, যে গৈরিক পতাকা শিবাজী এবং স্বয়ং রামচন্দ্রও নাকি ব্যবহার করতেন। আদ্যন্ত হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের নাম হিসেবে রাষ্ট্রীয় অভিধাটি ব্যবহার লক্ষ্যনীয়, যা বুঝিয়ে দেয় হিন্দুত্ব ভারতীয়ত্বের কোন সমীকরণ তৈরি করা তাদের লক্ষ্য। সেপ্টেম্বর ১৯২৭- নাগপুরে একটি দাঙ্গার ঘটনা ঘটে এবং সেখানে রাস্তার লড়াইয়ের কৃৎকৌশলে দক্ষ হয়ে ওঠা আরএসএস কর্মীরা ভালো পরিমাণ সাফল্য লাভ করে। এই সাফল্য লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে এবং অচিরেই আরএসএস-এর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়। দক্ষ সংগঠক হিসেবে হেডগাওয়ার এই সাফল্যকে সংগঠন বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করেন। কয়েকগুণ প্রসারিত এবং উদ্দীপ্ত সংগঠনকে দৃঢ়তর করার প্রয়োজনে ৩১ মার্চ ১৯২৮- একটি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানে হেডগেওয়ার তার ভাষণে তুলসীদাসের বিখ্যাত পঙতি প্রাণ যায়ে পর বচন না যায়ে মন্ত্রে কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেন। স্পিকার বিটলভাই প্যাটেল সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আরএসএস কর্মশালা পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানান হেডগাওয়ার। মহারাষ্ট্রের বাইরে সংগঠনকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। কয়েকজন স্বয়ংসেবককে ছাত্র হিসেবে পাঠানো হয় উত্তরপ্রদেশের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তারা অধ্যক্ষ মদনমোহন মালব্যের অনুগ্রহ লাভ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই খোলা হয় আরএসএস-এর কার্যালয়। সংগঠনকে কেন্দ্রিকতার দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে নেওয়ার ভাবনা তৈরি হয়। এই লক্ষ্যে ১৯২৯ এর ৯ ও ১০ নভেম্বর নাগপুরে একটি বিশেষ অধিবেশন বসে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পরিবর্তে এক সঙ্ঘচালকের সর্বময় নিয়ন্ত্রণ ও হিন্দু যৌথ পরিবারের আদর্শে সঙ্ঘ পরিবার চালানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আরএসএস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেভাবে কোনওদিনই অংশগ্রহণ করেনি এবং ব্রিটিশ নয়, মুসলিমদেরই মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস প্রথমবার প্রতীকী স্বাধীনতা দিবস পালন করার কথা বলে এবং অতঃপর প্রতি বছর দিনটি এভাবে পালিত হতে থাকে পুলিশি জুলুমের মোকাবিলা করেই। আরএসএস কেবল প্রথম বছর প্রতীকী স্বাধীনতা দিবস পালন করেছিল, পরে আর কখোনওই নয় আর এই প্রথম বছরেও সে তেরঙ্গা ঝান্ডাকে বর্জন করে গৈরিক পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে। আইন অমান্য আন্দোলনেও আরএসএস সেভাবে অংশগ্রহণ করেনি এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ১৯৩৩ সালে জামনালাল বাজাজ হেডগাওয়ারের কাছে সরাসরি জাতীয় আন্দোলন বিষয়ে আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গী কী তা জানতে চান। বাজাজের সঙ্গে হেডগাওয়ারের ব্যক্তিগত বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস এক নির্দেশিকায় মুসলিম লিগের পাশাপাশি তার সদস্যদের হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএস-এর সদস্য হওয়া বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। আরএসএস অবশ্য এই পর্বে জাতীয় আন্দোলন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা চায়নি এবং হেডগাওয়ার ১৯৩৪ এই গান্ধীকে তাদের ওয়ার্ধায় এক কর্মশালা পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গান্ধী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণও করেন।

আরএসএস-এর সঙ্গে হিন্দু মহাসভার সম্পর্ক ১৯৩০ এর দশক জুড়ে মাঝেমাঝে ওঠাপড়া করলেও এই দুই প্রধান হিন্দুত্ববাদি সংগঠনের মিলিত প্রভাব অনেকটাই পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। সমধর্মী দুই সংগঠনের কিছু স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক কার্যকলাপ সংক্রান্ত ঘোষিত অবস্থানের কিছু পার্থক্য ব্যতিরেকে তাদের মধ্যে মৈত্রি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৯৩১ এই বাবুরাও সাভারকরের হিন্দু মহাসভার যুব শাখাটি আরএসএস- মিশে যায়। হিন্দু মহাসভার কর্মী সংস্থানগত কিছু অসুবিধা ছিলই এবং তারা সাগ্রহে আরএসএস-এর মতো সাংগঠনিকভাবে মজবুত দলকে নিজেদের রাজনীতির সম্প্রসারিত গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করতে আগ্রহান্বিত হয়। ১৯৩২ সালে দিল্লিতে আহূত হিন্দু মহাসভার সম্মেলন দেশজুড়ে আরএসএস-এর প্রসারের প্রয়োজনিয়তার কথা বলে। ওই বছরেই করাচিতে হিন্দু যুবক পরিষদের সম্মেলনে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয় সঙ্ঘচালক হেডগাওয়ারকে। সিন্ধ এবং পাঞ্জাবে হিন্দু মহাসভার সাহায্যে আরএসএস তাদের সংগঠন বিস্তার করে। পশ্চিম মহারাষ্ট্রে সাভারকর পরিবারের খ্যাতিকে আরএসএস তাদের সাংগঠনিক বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। নাগপুরের পর পুণে হয়ে ওঠে আরএসএস-এর দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয়। ১৯৩৭ সালে জেল থেকে বেরোনোর পর হিন্দু মহাসভার বিশিষ্ট নেতা সাভারকর আরএসএস-এর শাখা বৈঠকগুলিতে একের পর এক বক্তৃতা করেন। ১৯৪০ এ লাহোর আরএসএস-এর এক শাখায় গিয়ে হিন্দু মহাসভার আর এক বিশিষ্ট নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেশের মেঘাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে আরএসএস-কেই একমাত্র আলোর রুপোলি রেখা বলে বর্ণনা করেন। হিন্দু মহাসভার সূত্র ধরেই হিন্দি বলয়ে আর এস এস তাদের কাজের সূত্রপাত ঘটাতে সক্ষম হয়। ১৯৩৭ থেকে ৪০ সালের মধ্যবর্তী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার তীব্র পর্বটিকে আরএসএস দেশজোড়া সংগঠন বৃদ্ধির কাজে সফলভাবে ব্যবহার করে। পশ্চিম ভারতে তারা আগেই ভালোরকম শক্তিশালী ছিল। উত্তর ভারত, হিন্দি বলয়ের পাশাপাশি এই সময়ে হেডগাওয়ার মাদ্রাজ শহর এবং তামিলনাড়ু কর্ণাটকের বিভিন্ন অঞ্চলে সঙ্ঘসেবকদের পাঠান।

উত্তর ভারতে আরএসএস-এর বিস্তারে অবশ্য দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজের প্রভাব সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়েছিল। উত্তরভারত জুড়ে আর্যসমাজের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এই দয়ানন্দ অ্যাংলো বৈদিক বিদ্যালয় এবং গুরুকুল কাংড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহর মতাদর্শগত প্রভাবকে আরএসএস ভালোভাবেই ব্যবহার করে নিতে পেরেছিল। ১৯৪০- নাগপুরে দেওয়া তার শেষ ভাষণে প্রথম সঙ্ঘচালক হেডগাওয়ার গোটা দেশ এর প্রায় সমস্ত অঞ্চল থেকে আগত বিরাট সংখ্যক স্বয়ংসেবকদেরকে সম্বোধিত করে আবেগদৃপ্ত গলায় জানিয়েছিলেন এতদিনে তিনি তার চোখের সামনে স্বপ্নের হিন্দুরাষ্ট্রের এক ছোট সংস্করণকে দেখতে পাচ্ছেন।।

(ক্রমশ…)

 
 
top