নির্বাণ পর্ব

 

নে করুন আমি দাঁড়িয়ছি, হাঁটতে ইচ্ছে হচ্ছে, পা তুলবার ইচ্ছে হচ্ছে, পা তুলেছি, পা এবার বসিয়ে দিলাম। এ দাঁরানোর সংকল্প হতে আটটি মাত্র কার্য লিখিত হল। এ সম অন্য কিছু মনে হলে, যেমন ধরুন নবম এসে, জল যদি মনে হয়, জল পাই না। এই নদীকে দেহ প্রদান করে নির্বা লাভ করব ভেবেছিলাম, এসে দেখি শুকিয়ে গেছে জল। পড়ে আছে কেবল ধূ ধূ বালি। আর চারিদিকে কেবল বালি মাফিয়ার দল। তারা বালি তুলে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ি গাড়ি। বাইরে নিয়ে গিয়ে বেচে দিচ্ছে। এরা যেমন গরিব, জোতদারও গরিব। ভগবান বুদ্ধ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সর্ব দুঃখ ও দুঃখের কারণকে সমূলে বিধ্বংস করে কিভাবে নির্বাণ লাভ করা যায়

শ্রমণের কথা শুনে নির্বাণ জিনিসটার প্রতি আমার আকর্ষণ বাড়ছিল। একটা গাছের নিচে মাথায় হাত রেখে তিনি বসে আছেন। কদিন আগে বালি মাফিয়ারা এসে তাকে শাসিয়ে গেছে, তিনি কিছুই দেখেননি বলে। যদি রাজার লোকের কাছে এই অবৈধভাবে বালি তোলার খবর করে, তবে সোজা মুন্ডু নামিয়ে দেবে। ইতিমধ্যে ওরা তিনজন বালি তোলার লোককে খুন করেছে। খুন করে দেহ পুঁতে দিয়েছে বালিতেই। তখন ওদের হাত কাঁপেনি। শ্রমণকে মারতেও কাঁপবে না।

এই জ্ঞান শ্রমণের আগে হয়নি। তিনি জেনেছেন সর্পের ত্রিবক্রাকৃতি লক্ষণ দর্শন তুল্য যোগীর অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম লক্ষণে জ্ঞান লাভ। কিন্তু বালি মাফিয়া দর্শনে কিরূপ জ্ঞান হয়, সেটা তার জানা নেই। তবে কি সে এক অসম্পূর্ণ বৌদ্ধ? তবে কী সে চারিসত্যকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করেনি? সে ভেবেছিল তার শতবার জন্ম হয়ে গেছে। গোত্রভূজ্ঞানের পরই প্রোতাপত্তি মার্গ আসে। তখনই জন্মের প্রবাহ স্থির হয়। কিন্তু বালি মাফিয়াদের নিয়ে সে যা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করল, তা জীবনে প্রথম। দেব ও মনুষ্য সকলের জন্যই বুদ্ধ দুঃখ মুক্তি কামনা করে নির্বাণের মার্গ খুলে দিয়েছেন। নির্বাণ লাভ কোন জাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ সার্বজনীন মানব ধর্ম।

শ্রবণ বলতে লাগলেন, ই নদীতে ডুবে অনেক শ্রমণ আমার আগে নির্বাণ লাভ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি কুশির মাটির সঙ্গে এই নদীর এক যোগ আছে। আমি তাই মনের মধ্যে প্রবল নির্বাণের টান অনুভব করায় একাই এ পথ নিয়েছিলাম। আমাকে অনেকে তখন বারণ করেছিল। যে সংঘে আছি ছিলাম, সেখানের আরও অনেকেই আসত। কিন্তু তাদের সময় হয়নি। নির্বাণের ডাক এমনই যে, এলে আর বসে থাকা যাবে না। তাই একাই আবাস স্থল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। পথ চিনে নিয়ে ঠিক যেতে পারব। এই সময় আমার সঙ্গে সাক্ষাত হত এক বারবণিতার। সে চলেছে দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে হত্যে দিতে। এটা নিশ্চয় আপনি জানেন যে প্রতিটি বারবণিতাকে বছরে একবার সৌন্দর্য, উর্বরতা ও যৌনতার দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে গিয়ে পুজো দিতে হয়। সে তেমনি যাচ্ছিল।

বারবণিতাটি একাই ছিল। সেও আমারই মত দেবী আফ্রোদিতির স্বপ্নাদেশ পেয়েছে, তাই সঙ্গীদের পরোয়া না করে একাই বেরিয়ে এসেছে। অনেক পথ হেঁটে সে ক্লান্ত। আমিও সারাদিন হেঁটেছি। একটু বিশ্রাম চাইছিলাম। পথের মধ্যে তেমন কোন আহার্য জোটেনি। যত তাড়াতাড়ি সেই নদীকে আমি খুঁজে নিতে নির্বাণ লাভ করতে পারি, এই ছিল মনের ইচ্ছে। পথশ্রমে আমি তখন এতই ক্লান্ত যে বারবণিতাটিকে দেখে আমি সেখানেই বসে পড়লাম। সে পায়ে পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। মৃদু স্বরে বলল, ন্তে, আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?

মি তখন আর কথা বলার মত অবস্থায় নেই। সে কী বুঝল কে জানে ঝোলা থেকে বার করে আনল জলের বোতল। আমার মুখে দিলে আমি কিঞ্চিত সুস্থ বোধ করলাম। তখন আমি নারীটির দিকে তাকাই। কী অপূর্ব গায়ের রঙ, পাকা গমের মত, কী কোমলদর্শন তার স্তনাগ্রভাগ, ফুল্ল অধর, মেদুর আঁখি পল্লব। পথশ্রমে তার সারা মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত। তাতেই সে অপরূপা হয়ে উঠেছে। গা থেকে এক মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে

ই অবধি শুনে আপনি হয়ত ভাবছেন সাধু মানেই এমন। তা কিন্তু নয়। বুদ্ধের আমলে বারাঙ্গনারা সমাজে উচ্চ স্থান পেতেন। বুদ্ধ স্বয়ং আম্রপালীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। জাতকের কাহিনিতে বেশ কিছু বারবণিতার কথা পাবেন যারা চারু কলাতে দক্ষ। বসন্তসেনাও একজন গণিকা। আম্রপালীর গৃহে তথাগত ছিলেন টানা একটি বছর। আম্রপালী বৌদ্ধ হয়েছিলেন। আমিও তেমন ভেবে ফেললাম। যে রাজগৃহে আমি ছিলাম, সেখানে মোট পনেরশো বৌদ্ধ শ্রমণ বাস করে। সেখান থেকে যখন নিষ্ক্রান্ত হয়েছি, তখন এক সামান্য নারী কী করে আটকাবে আমায়? আমি যেমন চলছিলাম, তেমনই চলব, মাঝে থেকে এই বেশ্যা রমণিকে উদ্ধার করব।

কিন্তু, হে আর্য, ঘটল তার বিপরীত। আম্রপালীর গৃহে যখন আসেন বুদ্ধ, আমার জানা নেই তাঁদের পথম সম্ভাষ্ণণ কেমন হয়েছিল। এই রমণী যা করল, তা কিন্তু হিতে বিপরীত। আমরা অঙ্গুলিমালের কাহিনি শুনেছি, নানা ধরণের দুর্দান্ত ব্যাক্তি ও বেশ্যা রমণীরা বৌদ্ধের স্মরণ নিচ্ছেন, এও আমরা দেখেছি, পড়েছি। কিন্তু এখানেই আমার ভুল হয়ে গেল। সকলেই বুদ্ধ নন। তাঁর ছায়াও নন। আর তাই আমরা নানা উপাচারে ভুল করে ফেলি।

যাইহোক, সেই বারবনিতা আমায় এমন মোহাবিষ্ট করে ফেলল যে, আমি হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নারী শরীরের গন্ধ যে এত সুন্দর হয়, সেই নিয়ে আমাদের কোন ধারণাই ছিল না! মনে মনে তখন ভাবতাম, তথাগত নিজে দেবতা, তাই তাঁর মন উতলা হয় না। কিন্তু কখনও কী কোন সুন্দরী দেখে তাঁর মন উতলা হয়নি?

মার ভেতর কি যেন হয়ে গেল। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সেই রক্তিম আভায় কী যে অপূর্ব লাগছে সেই নারীকে তা বলে বোঝান যাবে না! মৃদুমন্দ বাতাস ছিলই। এবার তার সঙ্গে যোগ হল মাটির গন্ধ। আসলে মাটি তখন তাপ ছাড়তে শুরু করেছে। আলগা ধূলো উড়তে শুরু করেছে। মনে হল, এই নারীকে কোলে নিয়ে আমি বসে আছি, আর দূর দিয়ে গৌতম বুদ্ধ হেঁটে যাচ্ছেন চৈত্যের দিকে। দেখি সারি সারি উট চলেছে, মনে হল এটাই সেই রেশমপথ, যেখান দিয়ে হিউয়েনসাঙের আসার কথা। মনে হল, কারা যেন বুদ্ধের গায়ে আঘাত করছে।

কিন্তু বুদ্ধ তো চলমান, তাঁকে কে আঘাত করতে পারে? যারা পারে, তারা কী মনুষ্য শ্রেণির মধ্যে পড়ে? যারা যুদ্ধ চায়, তারাই হানতে পারে আঘাত। যারা চায়, এক মানুষ আর এক মানুষকে সন্মান না দিক, তারা পারে। আমি তো কত কী দেখেছি। সেই যে সিরিয়া নদীর পারে ভেসে এল তিন বছরের শিশু আয়লানের দেহ, বালির উপর মুখ গুঁজে পড়ে আছে যে, তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে গোটা পৃথিবীর বাকি মানুষজল, পিছনে একদল তখনও যুদ্ধ করে যায়। সে সময় নৌকা থেকে বুদ্ধ উঠে এলেন পাড়ে। ফকির লাদেন কোলে তুলে নিলেন শিশু আয়লানের দেহ।

য়লান কুর্দি একটা নৌকা চায়। তাতে করে সে ভেসে যেতে চায় স্বর্গ নামক এক দেশের প্রতি। কিন্তু সে যে বালিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, পথের হদিস পাচ্ছে না, কেউ থাকে পথ দেখাতে পারছে না; কেমনা একদল মানুষ যারা যুদ্ধ করে আর একদল মানুষ কেবল তর্ক করে, তাদের কারও সঙ্গে তার মেলে না। বুদ্ধ এলেন। বললেন, ঠো আয়লান। চলো আমার সাথে

ছোট্ট সে, হাসি মুখে লাদেনের কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, যাব বলেই তো এসেছি। কিন্তু কতদূরে সেই স্বর্গ?

বুদ্ধ বলেন, স্বর্গ নিকটেই। সেই জায়গার নাম বামিয়ান। সেখানের নদীর নাম বামিয়ান

সেখানে যুদ্ধ হয় না?

না। মাটির নিচে কোন যুদ্ধ নেই

সেখানে খেলনা আছে?

ত আছে! তুমি যা চাও তাই নিয়ে খেলবে

হে আর্য, হয়ত আমার কথা তুমি বিশ্বাস করছ না, কিন্তু কেন জানি না মনে হয়, সেই নারীকে সামনে রেখেই আমি এমন সব দেখতে শুরু করি। আমার ভেতর গুলিয়ে যায়। আমি আয়লান নামক কোন বালককে চিনি না। সমুদ্র দেখিনি। শুনেছি সেই হিরণ্যবতী নদী আর শালবন নেই। তাই বলে কী সেই নদী আর প্রবাহিতই হয় না? হন তো। আয়লানই তো সমুদ্রতীর থেকে আমাকে বলে, চলে এসে। নিকটেই বোধী। কিন্তু তবু আমার মন প্রশ্নাতুর হয়ে ওঠে। নিকটেই যদি বোধি তবে সে বারংবার পিছিয়ে চলে কেন?

বুঝলেন আর্য, আমি ওই অবস্থাতেই সেই নারীর মুখ চুম্বন করলাম। দেখি সেও সাড়া দিল। এরপর আমরা সেখানেই পর্ণ কুটির নির্মা করে বাস করতে আরম্ভ করলাম। সে আমার প্রথম নারী। আমার পিতা সমাজে একজন ঋণী ব্যাক্তি ছিলেন। ঋণ শোধ দিতে না পারার কারণে তিনি ভিক্ষু হয়ে যান। আমি তখন এতটুকু। আমি ও আমার মাতা চিরবেশ ধারণ করি। আমাদের পুরো পরিবার ভিক্ষু হয়ে বিভিন্ন সংঘে বাস করতে থাকে। তাই নারী কী জিনিস আমি তা জানতাম না। সংঘে নারীদেহ নিয়ে আমরা লুকিয়ে কথা বলতাম। অনেকেই স্বমেহন করত। এই নারীকে হাতে পেয়ে আমি যেন চাঁদ পেলাম। মনে হল, এই নারীই স্বয়ং নির্বাণ! এই নারীই নদী। তা যখন পেয়েই গেছি, আর মিথ্যে ছুটোছুটি করে লাভ কি?

কিন্তু এমন চিরকাল যে চলতে পারে না তা নিয়ে আমার কোন ধারণা ছিল না। একদিন হল কী মিলন শেষে নারীটি আমার কাছে বিদায় চাইল। শুনে তো আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সারা জীবন থাকার কথা ছিল আমাদের, কত অঙ্গীকার, কত চোখের জল, কত অনুনয়, সব গেল কোথায়? অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে আমরা কী একত্র থাকার সংকল্প করিনি?

সে বলে, মন করতে হয়, আবার ফিরেও যেতে হয়

আমি অবাক হয়ে বলি, মানে?

সে তখন বলে, তাহলে তোমাকে খুলে বলি ব্যাপারটা। তুমি যেহেতু কখনও বেশ্যা সঙ্গে করনি, তাই বুঝতে পারছ না। দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে আমরা যেমন নিজেদের অনন্ত যৌবনের জন্য প্রার্থনা করতেই যাই না কেবল; সেখানে একজন না একজন বিদেশির সঙ্গে আমাদের মিলন করতে হয়। এটাই নিয়ম। আবার পূজারই এক অঙ্গ বলতে পার। একাধিক হলেও অসুবিধা নেই, বরং সেটা আরও ভালো। এর কারণ একটাই। আমাদের তো নানাবিধ মানুষকে খুশি করতে হয়। তাতে চোর ডাকাত যেমন থাকে, তেমনি মন্ত্রী-সান্ত্রী এবং তাদের চামচেরাও থাকে। এই বিবিধ ধরণের মানুষদের সঙ্গে রতিক্রিয়া করতে করতে, তাদের চাহিদা পূরণ করতে করতে আমরা যৌনতার যে সূক্ষ কাজ, সেগুলি অনেক সময় বিস্মৃত হই। তা আমরা পুনরায় শিখি বিদেশিদের সঙ্গে অবাধ যৌন সংসর্গে।

মি যখন তোমাকে দেখলাম, বিদেশি বলেই ভেবেছিলাম। তুমি নেড়া মাথা, গৌর বর্ণ, কৃশ শরীর। এমন রূপ দেবতাদেরই হয়। আমি জানি এদের লিঙ্গ খুব দৃঢ ও সবল হয়। তার প্রমাণ এই তিনমাস ধরে প্রত্যহ রাতে আমি পেয়েছি। এটা ঠিক, তুমি সত্যিই একজন বিদেশি। তবে দেবীর মন্দির থেকে অনেক দূরে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হল। কিন্তু হলে কী হবে, সেখান থেকেই তূমি আসছ। কেন আসছ? না আমাকে নতুন করে যৌনতার সাতকাহন শিখিয়ে পড়িয়ে আমি যাতে আমার পেশায় আরও উন্নীত হতে পারি তারই ছলাকলা শেখাতে। তাতে কিন্তু তুমি সফল। এমন যৌনতার কথা আমি কোনদিন শুনিনি, জানিনি। এবার তোমার কাছে যা শিখলাম, মন্ত্রী-সান্ত্রীদের সঙ্গে তার কিছুও যদি করতে পারি, তাহলে যে অর্থ তারা খুশি হয়ে আমাকে দেবেন, তার তুলনায় আমার এতদিনের আয় কিছুই নয়

ই বলে সেই গণিকা চলে যায়। বিষন্ন আমি নদী তীরে এসে দেখি, জল গেছে শুকিয়ে আর হানাদারের দল বালি কেটে পাচার করছে। শুনেছি, প্রসাশনেরও মদত আছে। ওরা আমাকে ধমক দিল। আমি কোন প্রতি উত্তর করিনি। কারণ আমি জানি আমি এই হল আমার পাপ। অবাধ যৌনচারের ফল। নদীর জল উবে গেছে। নির্বেদজ্ঞান লাভে অনাসক্ত যোগী বহির্জগতের কোন কাম্য বস্তুতে শান্তিলাভ করেন না। আমিও করিনি। নিজের প্রতি আমার এক অহঙ্গাকার ছিল যে আমি নির্বেদ ঞ্জান লাভ করেছি, তা চুরমার হয়ে গেল।

খানে বলে রাখা ভাল, সেই সময় আমি কিছু স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সেই সব মানে নিয়ে আমি কোন কিছু চিন্তা করিনি। যেমন একটি স্বপ্ন ছিল এই রকম: আমার ঘরের বাইরে যে খুঁটি পোঁতা, তা দাউদাউ আগুনে জ্বলছে। অনেকেই এসে এসে সেই আগুনকে প্রণাম করে যাচ্ছে আর বলছে, হে চির প্রণম্য অগ্নি, আমাকে পোড়াও। কিন্তু কেউই সেই আগুন নেভানোর কোন চেষ্টা করছে না। আজ সেই স্বপ্নের মানে আমি বুঝি। আমার জীবনে এমন সময় আসতে চলেছে, তা অগ্নির মত শুভ ফলদায়ক।

তাই জলহীন নদী দেখে আমি কাউকে জিজ্ঞাসা করিনি। আগে ওরা আমকে আগে প্রায় ধমকাত। কিন্তু বোধ হয় এখন বুঝেছে, এর দ্বারা কোন ক্ষতি সাধিত হবার নয়। কারণ ওরা কখনই আমাকে রা কারতে দেখেনি। সংঘ আমাকে শিখিয়েছে অহিংসা কেবলমাত্র পরমধর্ম নয়, মৌনতাও পরমধর্ম। তাই আমি আমি এই বটবৃক্ষের নিচে বসে শূণ্য দৃষ্টিতে বালিখাদ দেখতে দেখতে নিজেকেই প্রশ্ন করি, অতীতে আমি কী ছিলাম? এখন আমি আছি কি? আমি জানি বর্তমান নাম রূপ অতীত হেতুর ফল। ষড় ইন্দ্রিয়দ্বারে প্রতিটিক্ষণে যে বিষয়াবলী উতপন্ন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে। স্থায়ী বলতে কিছু নেই। সবই অনিত্য। যা অনিত্য তা দুখময়। এ দুঃখ আমার ইচ্ছাধীন নয়। আমার ইচ্ছায় উতপন্ন নয়। ধ্বংসও নয়। সবাই অনাত্ম। অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম্রুওএ দর্শনই হচ্ছে বিশেষভাবে দর্শন। অর্থাৎ সত্য দর্শন।

তাই আমি ধ্যানে বসি। এই নদীচরের পুরোটা নির্জন। বালি মাফিয়ারা সবসময় থাকে না। পদ্মাসনে বসে মেরুদন্ড সোজা রেখে বাম হাতের উপর ডানহাত সামনে কোলে রেখে চক্ষুমুদে ধ্যানে বসি। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক। অতীত ভবিষ্যত সম্পর্কে কোনরূপ চিন্তা করতে নেই। এই বিদর্শন ভাবনার মাধ্যমে নির্বাণ লাভ সম্ভব। বুদ্ধ ও তাঁর অসখ্য অনুগামী এই পথেই নির্বাণ পেয়েছেন। কিন্তু আমি পারিনি। প্রত্যেক যোগীর পক্ষে শীল পালন অবশ্য কর্তব্য। শীলবান ব্যাক্তি দ্রুত নির্বাণ লাভ করেন। আমি পারিনি। এমনকি ধ্যান ফল লাভ করতেও পারিনি

এই বলে সেই শ্রমণ চুপ করে রইল। সে যে ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়ছে বুঝতে পারি। কাঁধে হাত রেখে বলি, তুমি কখনও নদীতে নেমেছ?

না। জল নেই, নেমে কী হবে? যা আছে তা হল কেবল উত্তপ্ত বালুরাশি

ভু! নদীতে জল আছে

কী বলছ!

ত্যি বলছি। নদী বইছে

তাহলে বালি তোলা? সেটা সম্ভব হচ্ছে কী করে?

বালি তারাই তুলছে, যারা নদীর চরে বালি তুলছে। নদী গর্ভে এতটাই জল যে তাদের দল নামতে পারছে না

শ্চর্য!

ল আছে ভন্তে

বে আমার তা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না কেন?

তদিন এখানে জলের জন্য অপেক্ষা করছেন?

বে কয়েক মাস বা কয়েকটা বছর

কবার নেমে দেখুন না কেন?

দেখব?

দেখুন!

শ্রমণ জলে নেমে যান। কিছু জল তার বস্ত্র ভেজায় না। কিন্তু অবাক হয়ে উঠে আসেন। আমার সামনে দাঁরিয়ে প্রশ্ন করেন, লুন তো আপনার আসল পরিচয় কী?

মি একজন পরিব্রাজক ভন্তে

সে তো হিউইয়েন সাঙও একজন পরিব্রাজক ছিলেন। কিন্তু তার বাইরেই তাঁর একটা পরিচয় ছিল

মি তেমন কেউ কেউকেটা নই। এক সাধারণ মানুষ। আপনাকে তো বলেছি, এক সাধারণ নারীর মোহে আবিষ্ট হয়ে এই অজানা দেশে আমি প্রবেশ করি। তারপর একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যায়

নারী! তার মোহ! সে যে কী দারুণ মোহ, তা যদি আপনাকে বোঝাতে পারতাম। একবার বোধিসত্ত্ব সংসার ছেড়ে হিমালয়ের গুহায় বাস করছেন। সঙ্গে যুবক পুত্র। এক নারী তাকে প্রলুব্ধ করল। যুবক মোহগ্রস্থ হল। সে নগরীতে ফিরতে চাইল। এই কাহিনি এখন আমার মনে পড়ছে। আমি পথভ্রষ্ট হয়েছি। বলে সেই শ্রমণ কাঁদতে বসল

তার কাঁধে হাত রেখে বললাম, ত্যিই কী নারী এতটা খারাপ?

শ্রমণের কান্না থেমে গেল।

লুন, সত্যি বলুন

শ্রমণ চুপ।

এসময় হৈ হৈ শুনে আমরা সামনের দিকে তাকালাম। একদল লোক নদীর ওপাড় থেকে এদিকে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে ওদের খুব তাড়া আছে। একজন বয়স্ক বলিষ্ঠ মানুষ তাদের দলের সর্বগ্রে। দেখে মনে হয় সেই দলের প্রধান। মাথায় পাগড়ি। গায়ে সবুজ জোব্বা। তার পিছনে দশ বারোজন জোয়ান লোক। তাদের কারও হাতে মোটা বালা। মাথায় কোন পাগড়ি নেই।

লোকগুলো নদীতে নেমে পড়ল। কোমর অবধি নদীজল। কোথাও বুক সমান। ওরা টলে টলে সেই জল পার হল। ওরা ভাবল বাতাসের সঙ্গে লড়ে নদীখাদ পেরুল বুঝি।

বয়স্ক লোকটা শুমণের সামনে এসে দাঁড়াল। বাকিরা এদিক ওদিক আঁতিপাতি করে কী যেন খুঁজতে লাগল। শ্রমণ ভয়ে বা নির্বিবাদী স্বভাবের জন্য চুপ করে রইল। আমি বললাম, পনারা কী খুঁজছেন?

বুড়োটা বলল, নারী

আমি অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু আমাদের সঙ্গে তো কোন নারী নেই

পনার সঙ্গে নেই। কিন্তু এই ন্যাড়টার সঙ্গে এক সুন্দরী নারী ছিল। আমরা পক্ষী শ্রেণির মানুষ। আকাশ পথে আমাদের দলের একজন দেখেছে ওর রূপসী নারীর কন্ঠলগ্না হয়ে ওকে থাকতে। এখন ও আমাদের দেখে সর্তক হয়ে গেছে। নারীকে লুকিয়ে ফেলেছে। তাতে কোন অসুবিধা নেই। সেই নারীটিকে আমরা খুঁজে বের করব। আর নেড়াটা যদি না দেয় তাকে, ওকে আমরা হত্যা করব

কিন্তু সেই নারীকে নিয়ে তোমরা কী করবে?

নারী কোন উপাচারে লাগে পুরুষের? ভোগে

কিন্তু তোমরা এমন করবে কেন?

তার কারণ আমাদের গ্রামে কোন নারী নেই। আমাদের দেশে কন্যা জন্মায় না। ভ্রূণ অবস্থাতেই আমরা সেই সব কন্যাদের হত্যা করি। তারপর নদীর চরে বালিতে পুঁতে দিই। দীর্ঘ দিল এমন অবস্থা চলার পর বাইরের গ্রামের লোকেরাও আর আমাদের গ্রামে তাদের মেয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিল। ফলে আমাদের ছেলেদের আর বিয়ে হয় না। তাই আমরা নারী লুঠ করতে বেরিয়েছি। এই বৌদ্ধ, নারীকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না কেন?

সে চলে গেছে

ললেই হোল। মিথ্যে বলছিস তুই

সে চলে গেছে তার রাজ্যে

সেই বৃদ্ধ এগিয়ে এসে শ্রমণকে প্রকান্ড এক থাপ্পড় কষাল। শ্রমণ বালি পড়ে গেল। তার কষ ফেটে রক্ত গড়াতে লাগল। আমি বললাম, তুমি মার আটকালে না কেন? পালটা দিলেই বা না কেন?

মরা শান্তির পূজারী। আমরা হিংসা করতে পারি না

ই জন্য গান্ধার থেকে, গোবি থেকে, মেসোপটেমিয়া থেকে মুছে গেছ তোমরা

যে জায়গার নাম তুমি করলে সেখানে ইতিহাস সর্বদা চলমান। বুদ্ধ ও সব দেশের মানুষদের নিয়ে একটা চেষ্টা করেছিলেন। বেশিদিনের জন্য শান্তি রাখতে পারেননি। আর তাই তিনি লাদেনকে নিয়ে আবার বেরিয়েছেন

কিন্তু তার নিদর্শনই বা কোথায়? ওই দেশের দখল এখন আইএসের হাতে। তারা প্রকাশ্য হাটে নারীকে বিক্রি করছে। নারীকে নগ্ন করে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের যৌন দাসী বানাবার জন্য। নারী বিক্রির টাকায় তারা অস্ত্র কিনছে আর নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। এইভাবে নারী বিক্রি মধ্যযুগে হোত

টা তো মধ্যযুগই

র্থা?

ন্ধকার যুগও বলা যায়

মানে?

লতে পারেন সুদূর অতীতের প্রথম যুগ

পনি বলতে চাইছেন বর্তমান মানুষ যাই হোক, তারা অতীতের মধ্যে বাস করতে ভালোবাসে?

না। আমি তা বলিনি। মানুষ আসলে অতীত নয়, সময়কে বিক্রি করে। যেমন এখনকার সময়কে বিক্রি করা হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ নাম দিয়ে। এটাকে যে পুরান যুগের সঙ্গে তফাত করা হচ্ছে তা বিক্রির জন্যই। আর এটাই হল শূন্যতা। আমি আপনার সঙ্গে যতটা সময় আছি, তাতে বুঝেছি আপনি নারীর আদলে শূন্যতাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। আপনি কোন নারীকে খুঁজতে বেরননি, আসলে আপনি বেরিয়েছেন শূন্যতাকে খুঁজতে। তার স্বরূপ উপলব্ধি করতে চাইছেন। তাকে জানতে চাইছেন, বুঝতে চাইছেন। নিজেকেই শূন্যতায় উন্নীত করতে চাইছেন। আপনি শূন্যতার প্রেমিক

পনার মত অনেকেই এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাকে বলছেন। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বিষয়টি আমার এখনও নিয়ন্ত্রনের বাইরে। কিন্তু এটা আমি বুঝতে পারছি, আমি কোন কিছু দ্বারা নিয়িন্ত্রিত হচ্ছি

র এই কারণেই আপনার ফেরা হচ্ছে না

পনি তাহলে বলতে চাইছেন নারী মানে শূন্যতা?

কেবল নারী কেন, এ জগতই শূন্য। হিসেব করে দেখুন, সেই সুদূর মানব সভ্যতা থেকে মেসোপটেমিয়া, গান্ধার কখনও শান্তি পায়নি। ওই জায়গার মাটিই অমন। নিরন্তর যুদ্ধ। আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিইনি। সত্যি কথা বলতে কী আমাদের অনেক শ্রমণ মনে করেন, এটা বুদ্ধের একটা ভুল দর্শন। কিন্তু প্রকাশ্যে এ কথা বলা যায় না। এক সময় ভারতেই মন্ত্র ছিল, বৌদ্ধ মানেই বদ্ধ। আমরা তারও বিরোধিতা করিনি। তাই এখন আমরা ভারত থেকেও প্রায় বিলুপ্ত। কৃষ্ণসার হরিণের মত

অকারণে প্রাণ হত্যার চেয়ে প্রাণ রক্ষার জন্য মিথ্যে বলা যাতেই পারে। শ্রমণের মত আমি সৎ লোক নই। দশটি সৎ শীল নিয়ে আমি বাঁচি না। সৎ ভাবে বাঁচতে গেলে, সমাজে থাকতে গেলে মিথ্যার আশ্রয় নিতেই হবে। এখন নিজের ও শ্রমণের প্রাণ বাঁচানো আমার আশু কর্তব্য বলে মনে হল। তাকে ঠেলে আমি এগিয়ে গেলাম সামনে। বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে আমি বলি, মি জানি সে নারী কোথায় আছে

মুহূর্তে দলটা টানটান হয়ে উঠল। বলল, কোথায়?

আমি বললাম, খানেই

খানেই! এখানে কোথায়?

ই বালির চরে। আমরা তাকে বালিতে পুঁতে দিয়েছি

সে কী জীবিত?

বশ্যি। সে নারী বালির ভেতর বাঁচার কৌশল জানে। কিন্তু একটা কথা বল তো, তোমরা সব মিলিয়ে বারোজন তাজা পুরুষ, একজন মাত্র নারী। একে নিয়ে তোমরা কী করবে। আমি বলি কি, তোমরা ফিরে যাও। আমি বারোজন নারী নিয়ে তোমাদের গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হব

মাদের একজন হলেই চলবে যুবক। কারণ বাকি যাদের দেখছ, তারা সকলে নির্বাণ লাভ করেছে

নির্বাণনুয়ে পড়া শ্রমণ এবার উঠে দাঁড়াল। বলল, কোথায় নির্বাণ লাভ করেছ তোমরা? এই নদীতে তো জলই নেই!

র সব জল শুকিয়ে গেছে আমাদের পাপে। কন্যাভ্রূণ হত্যা করে আমরা যত নদীর চরে পুঁতে দিতে থাকি, তত নদীর জল কমে আসতে থাকে। এখন নদী শুষ্ক

বে নির্বাণ হল কোথায়?

এই শুনে সমস্ত যুবকেরা নিজেদের পরিধান বস্ত্র খুলে দিল। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, তাদের কারোই পুরুষাঙ্গ নেই! সকলেরই তা ছেদন করা হয়েছে। আর এই হল নির্বাণ!

দলপতি বলল, ই রমণিকে খুঁজছি আমার জন্য। আমি এখনও নির্বাণ নিইনি। আমি যা শুনেছি, বুঝেছি সে হল এক কামনাময়ী নারী। তাকে আমার চাই। তুমি খুব চতুর যুবক। মিথ্যে কথায় আমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইছ

না। আমি মিথ্যে বলছি না। এই নদীতে জল সত্যি আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তোমাদের কেউ তা দেখতে পাচ্ছ না। আর যেহেতু তোমাদের দৃষ্টির বাইরে জলের প্রবাহ, তাই নদী পেরুবার সময় পরিধেয় বস্ত্র ভিজছে না। আর সেই একই কারণে তোমরা নারীকেও দেখছ না

এই কথাটা আমাকে মিথ্যে বলতে হল।

শোনো যুবক, তুমি খুবই এক যুক্তিবাদী তা বুঝেছি। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি, যদি বালির ভেতর থেকে কোন সুন্দরী নারীকে আমি না পাই, তাহলে তোমাদের দুজনকেই বালির ভেতর চালান করে দেব। আমার ছেলেদের বলছি, ওরা নদীর পুরো পার ধরে খুঁজে দেখছে। ততক্ষণ তোমরা বট গাছের নিচে বিশ্রাম কর

ধ্যানের মাধ্যমে কী নির্বাণ লাভ সম্ভব? আমারে জানা নেই। তবে কী শ্রমণ বালির নিচে কম্পন অনুভব করে এমন ধ্যান করছেন? সেই দিক থেকে আমি দৃষ্টি ঘোরালাম। সেই কোথায় এক দল মানুষ। তারা তখন পক্ষীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর সেই বৃহচঞ্চু দিয়ে আকাশ থেকে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ে বালি খুঁড়ে ফেলতে লাগল। আর এভাবেই বেরিয়ে এল তিন বালি মানুষের দেহ। তাদের গলায় খুর চালানোর দাগ। সেখানে রক্তর দাগ।

প্রথম বালিমানুষ: সত্যপথ যাত্রী আমাদের নিকট বায়ু মধুর হোক, তটীনি করুক মধুক্ষরণ, ওষধিসমূহ হোক মধুময়।

দ্বিতীয় বালিমানুষ: রাত্রি ও দিবস শান্তি ও মধুময় হোক। বিশ্বচরাচরে বিরাজ করুক শান্তি। পিতৃ স্বরূপ দুলোক আমাদের নিকট শান্তি পূর্ণ হোক।

তৃতীয় বালি মানুষ: বনানী আমাদেরকে মিষ্ট ফল দিক, সূর্য হোক আনন্দবর্ষী। গাভীরাও আমাদের নিকট সুখপ্রদ হোক। মধুময় হোক ত্রিভুবন।

শ্রমণ বলতে থাকলেন,হে ভগবান, তুমি আমাতে প্রবেশ কর। হে ভগবান, তুমি বহুধারা নদীরূপী, তোমাকে আমার পাপ কর্ম রাশি বিশোধিত করছি। স্বাহা! হে বিধাতা, জলরাশি যেমন ক্রমান্ব্যে দেশ বেয়ে ধাবিত হয়, সেইরূপ সমস্ত কন্যাভ্রূণ সর্বদিক থেকে আমার কাছে আসুক। তুমি সকল বিশ্রামালয় স্বরূপ, অতএব তুমি শরণাগত আমার নিকট সর্বতোভাবে প্রতিভাত হও। তুমি আমাকে তোমার সঙ্গে অভিন্ন করে নাও। শান্ত স্নিগ্ধ করো আমার জীবন। হে কন্যাভ্রূণ সমূহ, তোমরা সম্মিলিত হও, একবিধ বাক্য প্রয়োগ কর, তোমাদের মন সমূহ সমানরূপে জ্ঞাত হোক। তোমাদের সংকল্প সমান হোক, তোমাদের হদয় সমূহ সমান হোক এবং অন্তঃকরণসমূহ সমান হোক। যাতে তোমাদের পরম ক্য হয়, তাই হোক

আমার মন কেন জানি এক অনিবর্চনীয় আনন্দে ভরের গেল। আমি শ্রমণকে বললাম, মি বুঝেছি তোমার বাণী। তুমি বলেছ, শূন্যতা সমস্ত শব্দে ব্যাপ্ত। আমি বুঝেছি, আমার এ দেহকে শূন্যতাজ্ঞানের আধার করে তুলতে হবে। তার জন্য জ্বিহা যেন মধুর ভাষিণী হয়, কর্ণদ্ব্যে যেন ব্রহ্মকথা শুনতে পাই। তুমি ব্রহ্মের আবরণ স্বরূপ, আমার শ্রম্বণলব্ধ জ্ঞান তুমি রক্ষা কর হে শ্রম। আমি যেন তোমার স্বরূপে প্রবেশ করি। স্বাহা!

আর তখনি একটা ঘটনা ঘটল। খুঁড়ে ফেলা বালির ভেতর থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসতে থাকল কন্যাভ্রূণ! সংখ্যায় তারা এতটাই যে সেই পক্ষী শ্রেণির মানুষরা ভয় পেলে গেল। তারা মনুষ্যরূপে ফিরে না এসে পক্ষী হয়েই উড়তে লাগল। আর চিৎকার করে বলতে লাগল, ত পাপ আমাদের নয়, আমাদের নয়! সেই সকল কন্যাভ্রূণের দল বালি বেয়ে এসে গোল হয়ে ঘিরে ফেলতে থাকল ধ্যানরত শ্রমণকে।

প্রথম কন্যাভ্রূণ: ঈশ্বর আমাদের সমভাবে রক্ষা করুণ। আমাদের পালন করুন, আমরা যেন সামর্থবান হই। আমরা পরস্পরকে যেন বিদ্বেষ না করি। আমাদের আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক শান্তি হোক।

দ্বিতীয় কন্যাভ্রূণব্রহ্মকে নমস্কার। বায়ুকে নমস্কার। হে বায়ু, তুমি প্রত্যক্ষ ব্রহ্ম। সেই ব্রহ্ম আমাকে রক্ষা করুণ। আমার আচার্যকে রক্ষা করুণ। ত্রিবিধ শান্তি হোক আমাদের জীবনে।

তৃতীয় কন্যাভ্রূণ: হে দেবগন! আমরা কর্ণদ্বরা যেন কল্যাণময়ী বাণী শ্রবণ করি, তেমনি সুস্থ হস্ত পদাদি অবয়ব বিশিষ্ট হয়ে যেন তোমাদের স্তুতুগানে করতে পারি এবং প্রজাপতিদ্বারা নির্দিষ্ট জীবনকাল প্রাপ্ত হই।

একজনের উপর আর একজনকন্যাভ্রূণের সেই আবর্তে ঢাকা পড়ে যেতে থাকলেন শ্রমণ। হয়ে উঠলেন একটি স্তূপ! আমি বুঝলাম, এই হল নির্বাণ!

আর তখনি সমস্ত পক্ষী শ্রেণির মানুষ, মৃত মানুষের দল সকলেই সেই স্তূপে একাত্মীভূত হয়ে গেল। আমি গালে হাত রেখে বসে রইলাম। নদীতে এত স্রোত এল যে, বালি মাফিয়ার দল ভেসে গেল। তখন নদী বেয়ে গান আসতে লাগল। লালনের গান। এক মাঝি তার একখানা নাও নিয়ে আসছে।

আমি নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

 
 
top