সুখ পাখি

 

লেখক হওয়া যে মুখের কথা নয় এটা বিশাখা হাড়ে হাড়ে টের পেল। প্রথমে মনে হয়েছিল গল্প লেখা, সে এমন আর কী, কোনো ঘটনা সাজিয়ে গুছিয়ে শব্দের সম্ভার দিয়ে লিখলেই গল্প দাঁড়িয়ে যাবে দিব্যি। কিন্তু তার সে ধারণা যে কত বড়ো ভুল তা লেখার সময়ই খুব বুঝতে পারল। কলম কাগজ নিয়ে বসলেই মাথাটা তার ফাঁকা হয়ে যায়, কী নিয়ে লিখবে সে? তার চারপাশকে নিয়ে? এমন কী আছে চারপাশে? তার পরিচিত মানুষদের নিয়ে? কী লিখবে? কারও জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা? না, সেরকম তো কিছু জানা নেই, যা নিয়ে গল্প লেখা যায়। খুব সুন্দর একটা গল্প, যা মনকে ছুঁয়ে যাবে, একবার শুরু করলে শেষ না-করে ছাড়া যাবে না, বার বার, বার বার পড়তে ইচ্ছে করবে। কিন্তু কীভাবে

এই ইচ্ছেটা বিশাখার বহুদিনেরএ আশা আর এমন বিশেষ কী, কতজনই তো গল্প কবিতা লেখে, কিন্তু বিশাখা অশেষ এক আশা নিয়ে বসে আছেএকটা অন্তত আস্ত নিরবচ্ছিন্ন বিশেষ সংবেদনশীল গল্প লিখতেই হবে। যেমন তেমন মোটেই নয়। এমনিতে বিশাখার গল্পের বই পড়াটা ইদানীং একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আগে তো ছিলই, কিন্তু এখন আরো বেশি।গল্প, উপন্যাস, তাদের অজস্র চরিত্র, নানা চরিত্রের নানা রূপ, নানা ঘটনার বিবর্তন বিশাখাকে যেন অন্য দুনিয়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু লেখা! শব্দের উৎস থেকে কীভাবে আহরণ করবে সে শব্দ?

বিশাখা মজুমদার সংবেদনশীল লেখক। আর তার অনবদ্য গল্প মানুষের অত্মরাত্মাকে ছুঁয়ে যাবে। উফ, ভাবতেও কী যে ভালো লাগে! রনু, সবুরা কলেজ-ইউনিভারসিটিতে চলে গেলে কী নিয়ে কাটবে সময় বিশাখার? তার ক্ষেত্রে গল্প লেখা একমাত্র উপায়। টাইম পাস, দারুণ জমে যাবে কিন্তু ব্যপারাটা। এরপর সে ঠিক করেছে একটা ছদ্মনাম রাখবে।

বিশাখা কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে? এখন থেকেই ভাবছে বুড়ো বয়সের কী সঙ্গী হবে? মেগা সিরিয়াল না গল্প? ধুস্!

কিন্তু শুরুটা হবে কী করে? কীভাবে? ডায়েরিতে প্রতিদিনের দিনলিপি সে লিপিবদ্ধ করে রাখেতার মতো ক-টা লোক ডায়েরি লেখেতবু কেন গল্পের শব্দরা তার মনের মধ্যে জেগে উঠছে না? কেন? কেন?

একদিন অনু এল

অনিমা, তার ননদ। জীবনে সবচেয়ে কাছের বলতে যদি কেউ হয় তো সে অনু।

নু, আমি গল্প লিখতে পারি না বল্

অনু জিগ্যেস করল, কী হল রে, গল্প লিখবি বলে খেপে উঠলি যে! বিশাখার কানের চারপাশের চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে বলল, তার চেয়ে অনেকদিন হয়ে গেল, ছেলেরাও বড় হয়ে এল, এবার নতুন করে নিজের জীবনের গল্প আঁক দেখি! আমরাও নিশ্চিন্ত হই

না, না কখনও না,  কোনোদিনও না। ওই গল্প আমার গলার ফাঁস হবে রে অনুবন্ধন চাই না, এই তো বেশ আছি রে বলে খুব একটা হেসে নিল বিশাখা অনুর গলা জড়িয়ে। 

চেষ্টার ত্রুটি নেই, তবু একটা, অন্তত একটা নিরবচ্ছিন্ন গল্প আর লেখা হয়ে ওঠে না। পাতার পর পাতা ছেঁড়া হয়, কিন্তু গল্প আর হয় না। কোথা থেকে যেন রাজ্যের জড়তা এসে তার মনে ভর করে। লেখকেরা গল্পের উপাদান কোথা থেকে যে যোগাড় করেন! সামান্য অতি তুচ্ছ জিনিস দিয়ে অনন্য সৃষ্টি কী করে তাঁরা তৈরি করেন! কী করে?

মি জানি গল্প লেখার এলেম আমার মধ্যে আছে। একদিন দেখে নিস, অনু

এমন গল্প লিখতে চায় বিশাখা মজুমদার যা শব্দের মুর্ছনায় থরথর করে কাঁপবে, প্রতিটি অক্ষর যেন তাদের জীবন সত্ত্বা নিয়ে বলে উঠবে, আমি জীবন্ত, এই তো, এই তো আমার শুরু। একদিন আমার শেষও হবে, পাঠকেরা তোমরা শুধু পড়ে যাও। জীবনের গল্প অথবা কান্না, অথবা গান, অথবা কী? শুধুই কথা। একটা জীবনের না-শেষ হওয়া কথা।

 

বিশাখা মজুমদার, অনির্বাণ মজুমদারের স্ত্রী । আর রণজয় আর সর্বজয়ের মা।

আজ অফিসে যেতে শিওর দেরি, যা বৃষ্টি। কলকাতার বৃষ্টি মানেই একহাঁটু জল। বেশ লাগে বিশাখার সেই হাঁটুজলে ছপছপ করে হাঁটতে, এরকম আরও বেশ-লাগার মতো বহু জিনিস আছে বিশাখার...সেগুলো এই বয়সে বলার মতো না সত্যি

যদিও ভালো লাগার আবার বয়স আছে নাকি

আজ অফিসে লেট মার্ক পড়ছেইসুরম্যর সঙ্গে দেখা হওয়ারও কোনো চান্স নেইকিন্তু আশ্চর্য, দেখা হল, তখন দৌড়ে বিশাখা এস ৮-এ উঠে গেছে।

এইরকম আকাশভাঙা বৃষ্টিতে একদিন সুরম্যকে সে বলেছিল সে গল্পকার হতে চায়, প্লট খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ল্প? খুব হেসেছিল সুরম্য। তা তোমার গল্পে আমি থাকব তো, নাকি

তা তো জানি না, তবে একদিন আমি লিখব, লিখবই

অফিস থেকে ফেরার বাস আসছিল, বাড়িতে তাড়া ছিল। সবুর নতুন টিউট্যর কথা বলতে আসবে।

বিশাখা উঠে পড়ল।

ই যে গল্পের রানি, চললে কোথায়? সুরম্যর আওয়াজ আর বিশাখার কানে পৌঁছল না।

বাস এগিয়ে চলল।

বিশাখা দেখল দূরে ক্রমশ সুরম্য মিলিয়ে যেতে লাগল। 

সুরম্যরা এভাবেই আসে, আবার একদিন হঠাৎ মিলিয়েও যায়।

চেষ্টা চলতেই থাকে। সব কিছুর মধ্যে যেমন একটা কিছু থাকে, তেমনি সব গল্পর মধ্যে একটা গল্প থাকে। তার ভেতর আরও, আরও ভেতরে আরও গল্পর সূত্র। সেই সূত্রগুলো মাকড়সার জালের মতো সারা ঘাড়ে-মাথায় যেন ছড়িয়ে পড়ে বিশাখারবিশাখার মাথা টেবিলের ওপর ঢলে পড়েকই, গল্পর শুরুও হল না তো!

বিশাখা মজুমদার, অনির্বাণ মজুমদারের সোহাগিনী স্ত্রী, বয়সের ও দু-জনের তারতম্য বেশি,  তাকে নিয়ে আর রনু, সবু দুই ছেলেকে নিয়ে বিশাখার জীবন কি কম সুখের ছিল? কিন্তু মানুষটা দ্যাখো কী অবিবেচক আর স্বার্থপর, সকালে দিব্যি হেসেখেলে অফিসে গেল আর বিকেলে কাচের গাড়িতে ফুলের সাজে। নাহ, বিশাখা ভাবতে পারে না।

এ এক ধরণের চাপা শূন্যতা, চাপা একাকিত্ব।  

সারাজীবনের সঙ্গীর বিকল্প কি আর কেউ হতে পারে? বিশাখা ভেবে দেখেছে প্রশ্নটা আপেক্ষিক।

না হওয়ার কিছু নেই।

সেই সময় বিশাখার শোক করারও যেন সময় নেই। শুধু খুব অবাক হয়েছিল সে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে চলে-ফিরে  বেড়ানো জলজ্যান্ত লোক এভাবে চলে যায়!

কাজের দিন সে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। তবু অনু ছিল তাই সব সামলে গিয়েছিল। 

সে সময় বিশাখার ভীষণ অবস্থা। জীবনবিমা, বাকি পলিসিগুলোর কিচ্ছু জানে না –  কোথায় কী আছে

পরে জানা গেল তাদেরই ব্যাঙ্কের অফিসের নাইন্থ ফ্লোরে জীবনবিমা করা আছে। এ ব্যাপারে সত্যি সুরম্য দারুণ সাহায্য করেছিল। ওই অফিসেই কাজ করত সুরম্য। 

আজকাল বুকের ভেতর একটা পাখির অস্তিত্ব অনুভব করে সে। কীরকম যেন ভার ভার লাগে, কে যেন নড়ে চড়ে, সে বুঝতে পারে এ এক পাখি, তাকে স্মৃতির অতল থেকে জাগাতে এসেছে। স্মৃতিরা এরকমই হয়, বার বার ফিরে আসতে চায়, সুখের স্মৃতি কি চিরকাল সুখের হয়ে থাকে, না একদিন কখনও দুর্দান্ত বানের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে যায়সুরম্য হঠাৎ বিশাখার জীবন থেকে না বলে কয়ে চলে গেল একদিন । কী যে হল বোঝা গেল না। মোবাইল অফ। পাখিটা কুরে কুরে বুকে ব্যাথা করে দিল, সেদিন বিশাখার হৃদয় থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরেছিল, ব্যাস ওই কয়েকটা দিন, বিশাখা মজুমদার চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই মহিলা। সামলে নিতে কোনো অসুবিধেই হল নাকেবল কারণটা জানলে সুবিধে হত। শুধু অপমানের জ্বালায় ক-দিন ঘুম হল নাভাগ্যিস সে সুরম্যর কাছে নিজেকে পুরো উজাড় করে দেয়নি। সুরম্যর দিক থেকে এর পরিপূর্ণ আমন্ত্রণ ছিল, সে তো বিশাখা বুঝতই

শুধু একটা কারণে বিশাখার একটু কেমন কেমন লাগত, অফিসের কেউ কেউ দেখেছিলঅনু তো একদিন ভেসে যাওয়া বরষায় এক ছাতার নীচে দুজনকে দেখে ফেলেছিল। সেজন্যই বলেনি তো  নতুন করে জীবনের গল্প আঁকতে ?

যাক গে, ওগুলো আজকাল কোনো ব্যাপার নয়।

সুরম্যর সঙ্গে মাত্র একবারই সে বেড়াতে গিয়েছিল। তাও সন্ধ্যায় দক্ষিণেশ্বর থেকে বেলুড় মঠেগঙ্গার বুকে নৌকায় করে। কী যে ভালো লাগছিল তার, দূরে মন্দিরের আরতির আওয়াজ। জলে ঝিলমিল করছে সহস্র আলোর কণা, আশ্চর্য ভালো লেগেছিল তার। একবার মনে হয়েছিল রনু-সবু থাকলে কত আনন্দ করত। সুরম্য আর সে নৌকোয় গা-ঘেঁষে বসেছিল । হাঠাৎ সুরম্য তার ডান হাতের কড়ে আঙুলে আলতো চাপ দিয়েছিল, ব্যস ওইটুকুই। বিশাখার মনে হল জীবনে সে যেন কোনো পুরুষের স্পর্শ পায়নি। দুই ছেলের মা সে।। স্বামীর সঙ্গে সহবাসে অভ্যস্ত রমণীর সারা শরীরে বৈদ্যুতিক শিহরণ খেলে গেল যেন। ভেতরের পাখিটা সুখে যেন আপ্লুত হয়ে মৃদুভাবে ডানা ঝাপ্টায় একবার। একেই কি বলে প্রেম? অনির্বাণ দায়িত্ববান স্বামী ছিল, শুধু স্বামী, বিশাখা কি জীবনে এই প্রথম প্রেমে পড়ল?

মাঝে মাঝে বিশাখার ভেতরটা ধূ-ধূ প্রান্তরের মতো মনে হয়, কোথাও কিছু নেই, পাখিটা উড়তে থাকে বৃত্তাকারে, চিল যেভাবে ওড়ে। হঠাৎ উড়তে উড়তে ঠোক্কর মারে বুকে, বিশাখা প্রবল স্মৃতির ঝাঁকুনি খায়, এই ঝাঁকুনি থেকেও তো জন্ম নিতে পারে একটা গল্পের অবয়ব! কই, নেয় না তো!

যে রাতে তার ঘুম আসতে চায় না, সে রনু-সবুর ঘরে ঢোকে চুপিচুপি। কৃতি ছেলেরা তার, অনির্বাণের রক্ত তাদের শরীরেবিশাখা কখনও আলতো চুমু খায় তাদের কপালে, তাদের শরীরে যেন হাজার হাজার অক্ষর খেলে বেড়ায়, ইচ্ছে হয় আদরে আদরে তাদের শরীরের অজস্র সেই অক্ষরগুলো শুষে নেয়, ওরা যে অনির্বাণের, পারে না সেই অসংখ্য অক্ষর দিয়ে জীবনের ছবি আঁকতে? পাখিটা সাড়া দেয় নিঃশব্দে, আর সুরম্যর জীবনের রংহীন অক্ষরগুলো পড়ে থাকে স্মৃতির গভীরে, অবহেলায় 

 

সেদিন ময়দানে গিয়েছিল বিশাখা সবুর একটা দরকারে, মেট্রো সিনেমার সামনে দেখা হয়ে গেল কলেজের বন্ধু বীথির সঙ্গে। বিশাখা কি চইছিল ওকে এড়িয়ে যেতে? আজকাল আসলে অনির্বাণের ব্যাপারটার পর বন্ধুবান্ধবদের সমবেদনা তাকে অস্বোয়াস্তিতে ফেলে, সে লক্ষ্য করেছে।

বীথি কিন্তু ছাড়ল না। কার্জন পার্কের কাছে ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল বিশাখাকে। বীথির স্বামী বিরাট কাজ করেন, কিন্তু ঈশ্বরের হাত সবদিকে সমানভাবে পড়ে না, ওদের একমাত্র মেয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে বয়স অনুপাতে বাড়েনিশুধু হাসে, মুখ দিয়ে লাল গড়িয়ে পড়ে। এর থেকে বিশাখার যন্ত্রণা অনেক কম। বিশাখা যা হারিয়েছে হারিয়েছে, এমন থেকে যাওয়া থেকে তাকে কষ্টভোগ করতে হয় না। বীথি বার বার অনির্বাণের কথা তুলছিল। বিশাখা কত একা ইত্যাদি। আসলে ও বিশাখার আড়ালে নিজের যন্ত্রণা লুকোচ্ছিল। 

মেয়েটার নাম এমিলিআচ্ছা এমিলির জীবন নিয়ে কি কোনো গল্প…না এত যন্ত্রণাবিধুর লেখা সে লিখতে পারবে না। 

আজকাল বাড়ি ফিরে নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে। তবু পাখিটা নিঃশব্দে কথা বলে তার সঙ্গে। না, সুরম্য অতীত। হারিয়ে গেছে, ভাববে না সে কিছুতেই। ছেলেদের নিজেদের জগতে তারা ব্যাস্ত। আজ অফিস থেকে ফিরে একরাশ কাগজ নিয়ে বসল সে, গল্প শুরু করে ছাড়বে সে, প্রতিজ্ঞা।

খুঁজতে লাগল মানুষের জীবন ঘেঁটে সুখ অথবা দুঃখ। কিছুই লেখা হল না। আবার ছেঁড়া পাতার রাশি জমল।

এই যে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, খাওয়া, রান্না, ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা, হেঁটে-চলে বেড়ানো, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, এইসব তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ ঘটনাবলির মধ্যেও শ-য়ে শ-য়ে গল্প লুকিয়ে আছে,  বিশাখা জানেশুধু সে হাতড়ে বেড়াচ্ছে, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। কুচি কুচি ছেঁড়া পাতা আবার বাড়িময় ঘুরছে।

খুব সুখে পাখিটা কুঁইকুঁই করে যেন ডাকে। এই তো সেদিন প্যারেন্ট-টিচার মিটিং-এ যখন টিচাররা রণজয় আর সর্বজয়ের ভীষণ প্রশংসা করলেন, পাখিটা কুঁইকুঁই করছিল। ওকে কি সুখপাখি বলা যায়? যায় বোধহয়! খুব আসতে আসতে ডানা ঝাপ্টাচ্ছিলঅনেকে বলল আপনি রনজয়ের মা? কী ভালো ছেলেরা আপনার! কে বলেছে বিশাখার জীবনে শুধুই দুঃখ? এই তো কত সুখ! এইটুকু সুখের জন্য সে গর্ব অনুভব করতেই পারে। রণু-সবুর মা সে। সে মোটেই দুঃখবিলাসী নয়। আবেগপ্রবণ সে, একফোঁটা সুখের জন্য সে যোজন পাড়ি দিতে পারে

এমিলি মারা গেছে। একবার দেখা করতে যেতে হবে। সেদিন রাতে আধোঘুমে দেখল এমিলি ঘাড় কাত করে খিলখিল করে হাসছে, মুখ দিয়ে নিঃসৃত লালার মধ্যে দিয়ে বেরোচ্ছে প, , , , , , ভ শব্দরা। দু-হাত বাড়িয়ে যেন বলছে, আন্টি আমায় শব্দের দুনিয়ায় নিয়ে যাও। শব্দেরও কি স্বর্গ আছে? সেই দুনিয়া আর সেই স্বর্গের খবর কোনোদিন এমিলি জানতে পারল না। বিশাখার ভেতরের পাখিটা ডানা ঝাপটে ঝাপটে গলা পর্যন্ত ব্যাথা করে দিল।

আজকাল পাখিটা অশান্ত হয়ে উঠেছে ক্রমশ। রাতের অন্ধকারে ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফেলে বিশাখা। কবে থেকে ভেবে চলেছে একটা গল্প লিখবে সে, কোনোভাবেই হচ্ছেনা। শুধু পাতার পর পাতা ছেঁড়া হচ্ছেসে জানে সে পারেমধ্যরাত্রে ডায়েরির পাতা সে ঘাঁটতে থেকে। কিন্তু কী যেন তাকে আটকে দেয়। পাখিটা সুর করে করে তাকে ভ্যাঙাতে থাকে। বিশাখা রাগে টান মেরে সব কাগজপত্র মাটিতে ছড়িয়ে দেয়।

গভীর রাত্রে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে, যেখানে একা, শুধু একাকিত্বর উন্মাদনা জাগে বিশাখার, সেই একার দুনিয়ায় বোধহয় রনু-সবুও নেই, আধো ঘুমে শব্দর মালারা সারা শরীরে খেলা করে বেড়ায় বিশাখার। সেখানে অনির্বাণের বুকে হাজার হাজার শব্দের মধ্যে মুখ ঘষে আদর করে বিশাখা, কিংবা সুরম্যর কড়ে আঙুলের স্পর্শ থেকে আশ্চর্য এক বিদ্যুৎ-এর শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে তার সারা শরীরে আগুনের মতো। মিলনার্ত এক রমণীর শরীরে তখন হাজার হাজার শব্দ পোড়ে, পাগল হয়ে ওঠে সে। কিন্তু না, সে অপমান ভোলেনি, মুহূর্তে শব্দের মালা সাপের ফনার মতো সুরম্যর ছায়াকে  দংশায়। চোখের জলে বিছানা ভিজে যায় বিশাখার।

তবু তার গল্প লেখা হয় না।

ভোর হয়ে এল বুঝি, তার ন-তলার ফ্ল্যাটের জানলাটা খুলে দিল বিশাখা।

হঠাৎ খোলা জানালা দিয়ে একরাশ দমকা হাওয়া ঢোকে, এলোমেলোভাবে খুলে যায় ডায়েরির পাতাগুলো। সহসা বিশাখার চোখ যায় লেখাগুলোর ওপর, এই তো এতবছর ধরে তার দিনলিপি আবদ্ধ হয়ে আছে সেখানে। তার নিজের হাতের লেখা হাজার হাজার শব্দরা তৈরি করেছে কত শত ঘটনা। কে বলেছে গল্প লেখার প্লট তার কাছে নেই? ডায়েরির পাতা থেকে সহস্র হাজার অক্ষরগুলো সুখ আর দুঃখ হয়ে ঘরময় উড়ে বেড়াতে থাকে। 

বুকের মধ্যে সুখ-পাখিটা আছাড়-পিছাড় খাচ্ছে, ক্রমাগত ডানা ঝাপ্টে মরছে। ভোরের আকাশে একটু একটু করে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছে। পেছনে সুরম্য আর অনির্বাণের ছায়ারা ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। বিশাখা তার মনের সব অর্গল খুলে দেয়। পাখিটা ডানা ঝটফট করে উড়তে শুরু করে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। বিশাখা দেখতে পায় নীচে অতল জলরাশি। পাখিটা আস্তে আস্তে আলোর দিকে উড়তে উড়তে একসময় বিন্দুতে পরিণত হয়। নীচে হাজার হাজার ঢেউ তৈরি হয় আবার ভাঙে, একসময় বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়, বিশাখার কলম খসখস করে কাগজে লিখতে থাকে, কে বলে দুঃখ মানে সমুদ্রের মতো অন্তহীন জলরাশি, আর সুখ মানে বুদবুদ, একবার এসেই মিলিয়ে যেতে চায়? সুখ হল মহাকাল পেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা, আর দুঃখের সাগরে অবগাহন করলেই তো সুখ মেলেনয়? আর সেই সুখেই তো নিহিত চিরবন্ধন থেকে মুক্তি!

 
 
top