রক্তক্ষরণের দিনগুলি

 

আর আমি কুত্তার মতো তার ফাঁদে পা দিলাম। সে জানতো হাত-ফাত ধুয়ে নিলে, দোষের বলতে পড়ে থাকে নীরবতা। দড়জায় টোকা দিলে তাও ভেঙে যায়।

দীর্ঘ একটা গরম হাওয়া মুখচোখ লাল করে ছাড়লো। সে বললো, নিজের শোয়ার জায়গা হলে আমি সবকিছু ভুলে যাই

আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মানে আমাদের কথাবার্তা একরকম শেষ। চতুর্দিকে তখন নতুন বছরের শুরুটা উপভোগ করছে প্রত্যেকে। বুড়োগুলো শীতটা কোনও রকম দু:স্বপ্ন ছাড়াই কাটিয়ে দিতে চায়। সে বললতোর মতো শীতকাতুরে শহরে দুটো নেই, শালা! যতো সব আ্যজমাটিক রুগী!

আমার যে কন্সটিপেশনও আছে, ব্যাটা জানতো না। গ্রীষ্মকালগুলো যে রক্ত পড়ে, আমাশায় জর্জরিত, পাইলস ফিসচুলা অবধি, তার না জানাই ভালো। হয়তো তাই তুলে গাল দিতো!

শালা ফিসচুলো! ভারতীয় হিসাবে এটা আমাদের সৌভাগ্য, যে আমরা হার্ট আ্যটাকের মতো দিলদরিয়া একটা ধড়ফড় ব্যাপার গিফট হিসাবে পেয়েছি, যা আমাদের পেছন ছাড়বে না। না ছাড়ুক। প্রেশার, সুগার, থাইরয়েড, ওবেসিটি আসুক। শালা,যা হয় হোক। নিজেকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দাও, নাহলে বেঁচে থাকো বেশ্যার মতো

প্রেম নিয়ে তোমার কিছু বলার আছে?

ফ্যাব্রিজিও যা ভেবেছিলো এই মুহূর্তে সেটাই রগড়াতে পারি হোয়াট দে কল লাভ, ক্যান দ্যাট বি জাস্ট অ্যানাদার লাই? আই ফিল মাইসেলফ ইন লাভ, নো ডাউট, অ্যাজ আই ফিল গুড অ্যাপেটাইট অ্যাট সিক্স ও’ক্লক! ক্যান ইট বি আউট অব দিস স্লাইটলি ভালগার প্রপেনসিটি দ্যাট দোজ লায়ার্স হ্যাভ ফ্যাসানড দ্য লাভ অব ওথেলো, দ্য লাভ অব ট্যানসার্ড?

মাদের বিপ্লবটা, আমরা জানি, গোটা বিশ্ব জানে, এবং পোঁদে খোঁচায়

বুড়ো শুকোলবিপ্লব শব্দটা আর তেমন চোখে দেখেনা। হাতের লোমের ভিতর চষম উকুনের মতো হামাগুড়ি দেয়, হাসে, কাঁদে, যখন তার পেছনে গুঁজে দেওয়া হয় করমচার জালি কিম্বা ধানি ঘুরুল।

ভাবতে ভালো লাগছে এটা ভেবে, যে তুমি শালা সেই একই মানুষ, যে কিনা কৃষিজাত নবীন মানবের কল্পনা নিয়েযাক তুমিও ভাবোকিন্তু পাশাপাশি আমার এটাও মনে হয় হোরেসের উক্তিটি, ইউ মে থ্রো নেচার আউট উইথ অ্যা পিচফর্ক, বাট সি উইল  কিপ কামিং ব্যাকওহ্! তুমিও

ন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যতোই গলা ফাটাই না কেন, আসলে আমরা শুয়োরের বাচ্চা এক একটাবুড়ো শুকোল এসব তেতে গেলে বেশী বলতো।

আবাতুলে, গোঁয়ার, তার আর মুখ চলছিল না। মিসেস শুকোল এলে তার সব কথা উড়ে যায়, যেন মেজরের কোপে পড়বে। মুখ লুকিয়ে আবার বিড়বিড় করে, তার মাথাটা গেছে।মনে মনে সেনাবাহিনীতে সে যোগ দেয়, গাল দেয় তার এক দাদাকে, যে কিনা গত দশকের গোড়ায় হার্ট আ্যাটাকে মারা যায়।

ব্যাটা মরেছে, বেশ হয়েছে। আরও মরে যা, শালা চুদমারানি! ব্যা.. ব্যা 

আমি তখন খুব ছোটো, শুকোলের দিদি সম্পত্তির লোভে তড়িঘড়ি দেশে ফিরে আসে। এটা আমার কাছে ডগমগ একটা ব্যাপারআমার মনের ভিতর ফুরফুরে হাওয়া, যেন শিশুর মতো লাফাতে লাগলো শোকের ভানে। শালি মাঝেমাঝে কিটস্, শেক্সপিয়ার আওড়াচ্ছে। নিজেকে অভিনেত্রী ভাবতে শুরু করেছে।তবে কাঁচামাপের, ওই যেমন কিছু একটা পাওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে, কেউ কেউ ওই রকম ভনিতাকে ক্রমাগত আঘাত করে। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে, খেলো টেক্সট আউড়ে যায়, যেন অভিনয়টা তার বাপদাদুর ঘেঁটে খাওয়া মাল । আর সেটা সবাই বুঝতে পারে, কিন্তু সে বুঝতে পারেনা, যে এটা ধরা পড়ে গেছে। মাগীর এদিকে নাই, ওদিকে খুব। মনে হয় মারি একটা পাছায়

দেখো! শেখো, মিস শুকোল তার দাদার সম্পত্তি কেমন বাগিয়ে নিচ্ছে!

সব ব্যাটা একই মাপের। এক হাতে লাঠি, আর অন্য হাতে ল্যাজ। আশেপাশের মহিলারা সেই ঈশ্বরের আলোচনায় ডুবে যায়। সেই মাধবীলতার নাটকে, এই শেষ সময়ে একটা ব-দ্বীপে গান গাওয়ার মতো ন্যাকামোপনা। মিসেস শুকোলের নাকের জল, মুখের জল, বুকের জল, পেটের জল এমনকি রগড় জল। ততক্ষণে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেছে । আমি দেখছিলাম, মিস শুকোলের চকচকে গাল, তাতে টোল, তিল; তার গোল গোল, মোটা মোটা পা, তাতে কিছু লোম। আহ্! কি যে লাগছিলো! প্রেম নেই। ঘুণপোকার বাড়বাড়ন্ত নেই। তলপেটের শীতলতা নেই, তবু ভালো লাগছিলো।

ঠিক সেই সময় আমার এবং অন্যদেরও একই ভাবে একটা স্বপ্ন এলো, যেটা একটা সজারুর  লুকিয়ে থাকার গল্প। সে তার স্বপ্নগুলো লুকোতে চায়, কিন্তু সে পারেনা। কেউ না কেউ তা দেখে ফেলে। আর তাকে আবার একটা স্বপ্নের জন্ম নিয়ে ভাবতে হয়।

তার দাদাই নাকি কী একটা ওষুধ দিয়ে তার ব্রেনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। মানে সে ওইটুকু বুঝতে পারে। ওইটুকু মানে ঘোরে কবিতা আওড়ানো। তাকে কেউ প্রশ্ন করলেও আর উত্তর পাওয়া যায়না।সে চিৎকার করে দৌড়াতে থাকে সবুজ মাঠে।লাফাতে থাকে, গাল দেয়, গান করে। হো হো করে হেসে ওঠে। কাদায় শুয়ে সে কাঁদতে থাকে। মিসেস শুকোল এসব দেখে দেখে হেদে গেছে। জিদের লেখাগুলো নিয়ে তার বকে যাওয়া অনেকের প্রায় মুখস্ত: আই হ্যাভ ফুলফিল্ড মাই ডেস্টিনি। বিহাইন্ড মি, আই হ্যাভ দ্য সিটি অব আথেন্স। ইট হ্যাস বিন ডিয়ারার টু মি ইভন দ্যান মাই ওয়াইফ অ্যান্ড সন। মাই সিটি স্ট্যান্ডস। আফটার আই অ্যাম গন, মাই থটস উইল লিভ অন দেয়ার ফর এভার। লোনলি অ্যান্ড কনসেনটিং, আই ড্র নিয়ার টু ডেথ। আই হ্যাভ এঞ্জয়েড দ্য গুড থিংগস অব দ্য আর্থ, অ্যান্ড আই অ্যাম হ্যাপি টু থিঙ্ক দ্যাট আফটার মি, অ্যান্ড থ্যাঙ্কস টু মি, মেন উইল রেকগনাইজ দেমসেলভস অ্যাজ বিয়িং হ্যাপিয়ার, বেটার অ্যান্ড মোর ফ্রি। আই হ্যাভ ওয়ার্কড অলয়েজ ফর দ্য গুড অব দোজ হু আর টু কাম। আই হ্যাভ লিভড। 

সে খচানো শুরু করে, আর মিসেস শুকোল জানলা দিয়ে গালিগালাজ করে, ঢ্যামনাগুলো মরেও না! 

এই গালটা আমার কাছে প্রায় বেদবাক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাহজম হয়না। দিনটা ভালো যায় না। মনে হয়, হালকা একটা ভয় ঘিরে ধরে যেন পাগুলো ভারী হয়ে খসে যাচ্ছে। নিঃস্তেজ হয়ে পড়ে সত্ত্বার প্রকাশ ভাবনা, যেমন গুল গুল করলে চুলকায়!

আনফরচুনেটলি, আমার ঘরটা ফাঁকাই থাকে। তাই, এসব ফাঁস হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য কিছু ফোটো ফ্রেম থেকে বেরিয়ে আসে। পূর্বপুরুষ ওৎ পেতে আছে, হ্যাঁ আছে। মনে হয়,আমাকেই দেখে, আর ভয় দেখায়কী পেয়েছো হে! নাম ডোবাবে! বেশী করবে তো পোঙ্গা বাজিয়ে ছাড়বো। শালা, বিচিতে বিছুটি পাতা ঘষে দেবো

আমার শরীর যখন অস্থির হতো, মিসেস শুকোলকে দেখতাম। দেখতাম আর জ্বলতাম। কি সময় জ্ঞান! ঠিক রাত দশটা তো দশটা, বাথরুমে আলো জলে উঠতো। এই বয়সেও তার এমন পরিশ্রম,সারাদিন ম্যাসাজ করা! বড় পার্টি হলে কিছু একস্ট্রা টাকা আসে। সে কারণে সকাল থেকে সে শুভেচ্ছ বার্তা পাঠায়। কাউকে বুকে, তো কাউকে উত্তেজক ফটোগ্রাফ। যার যেমন ভাব আর কি!

তার ডিপার্টমেন্টটা ছিলো পুরুষদের জন্যে। তার বাড়িতে এমন অনেক উপকরণ বিতিকিচ্ছিরি ভাবে ছড়ানো। কয়েকটা পাম্প, ডিলডোও তার বালিশের পাশে সর্বদা উঁকি দেয়, যেন মায়াবী স্বপ্নের মতো বলিষ্ঠ। উইক এন্ডে সে বুড়ো শুকোলকে নিয়ে শিসল চলে যেতো, সেখানে তার কিছু জমি আছে, যা থেকে কিছু টাকা আসে। বুড়ো শুকোল ফেলে দেওয়া বিড়ি কুড়িয়ে নেয়, কেউ কিছু তাকে দিক, মিসেস শুকোলের পছন্দ নয়। তাকে কিছু খুচরো দিলে শিশুর মতো হাসে।

রাস্তাঘাট, গাড়িতে- গাড়িতে শহরটার ব্যস্ততা তার সুবিধা অসুবিধা বুকের উপর চেপে বসে কী যেন একটা বলতে চাইছে,হাঁসফাঁস হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। দেখলাম, কেউ কেউ উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের ভেতরের স্বপ্নগুলো, যা ওরা কোনওদিন দেখেনি পর্যন্ত, সেসব টলটল করছে। মৃত আত্মার ছায়াগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়িগুলোর সাথে মনে হচ্ছে, এগুলো সব ধ্বংসগস্তূপ। তারা আর্তনাদ করছে ভেসে থাকার জন্য। তাদের ক্যাপ্টেন যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। প্রেমিক প্রেমিকারা হাত ধরে, গলা ধরে, একে অপরের শরীরে সেঁটে, মুখে মুখ লাগিয়ে, চিটে গুড়ের মতো যৌন আস্বাদন করছে, থুতু ফেলছে, মদ গিলছে, গাল দিচ্ছে, বমি করছে, নিজের বেঁচে থাকা নিয়ে বড়াই করছে। তারা ভাবে, তাদের গাঁড়পাকামোটা একটা শিল্পকৌশল, যে কোনও উপায়ে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আসলে তাদের মূর্খামিটা কর্মহীন ভেবে, বেঁচে থাকাটা একটা আইডিয়া, আত্মঘাত, সেটা জানলেও, তারা সকালে উঠে মদ আনবে, কাগজ পড়ার নামে ভাট বকবে, খিস্তি দেবে নিজের বেঁচে থাকাকে।

হাঁটছিলাম আর তোমাকে মনে করছিলাম,মনে করছিলাম মানে তোমার না বেঁচে থাকার মধ্যে যে বেঁচে থাকা, যা আমার গতি শ্লথ করে দিচ্ছে,যা আমি চাইনা। একটা মানুষ, যে কিনা পোষাকহীন হয়ে ঘুরছে ,মুন্ডহীন। যে কিনা হাত দুটো হারিয়ে ফেলেছে গত বছর। এক গভীর রাত্রে যখন সে একটা আইডিয়াকে আত্মঘাতী হতে দেখেছিলো, স্বপ্নে যার পা দুটো আর পা নেই, কারা যেন কেটে নিয়ে গেছে, তার শরীর বলতে তার স্মৃতি, জলের স্মৃতি।

গাঁজার ধোঁওয়া আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ভাবনার জন্ম দিচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো, একটা পুরনো স্বপ্ন আমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে, আর আমি জনমানুষহীন একটা শহরে ছুটছি। বড়ো রাস্তা, গলিপথ, সব রাস্তা চেনা।

কেননা, আমি আইডেন্টিফাই করতে পারছি আমার পেছনে আমার পূর্বপুরুষ, মানে আমার বাবা, দাদু স্বপ্নটাকে আটকাবার চেষ্টা করছে। তার ধারালো করাত হাতে তারা ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বাবার একটা হাত এসে পড়ে আমার সামনে। সেটা কুড়াতে গিয়ে দেখি স্বপ্নটা আমার ঘাড়ের কাছে এসে পড়ে। আমি ছুটছি, আর শোকে ভেঙে পড়ছি। ছুটছি আর আমার গতি কমে আসছে। ছুটছি আর আমার শরীর জুড়ে একটা মাদি অবসাদ গড়ে উঠছে। নিজেকে ছুঁড়ে দিই শূন্যে।
কয়েকটা ডাইমেনশনে ঘুরতে থাকে আমার স্মৃতি,আজ মনে হচ্ছে ষ্টেন্ঢলের স্মৃতিগুলো আমার শহরেও ঘুরছে ফিরছে, আর আত্মীয়তা গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। নাকি আমরাই তার কাছে ঘুরঘুর করছি, যেভাবে ভাবছিলো আমার পূর্ব পুরুষ! যখন দেখলাম আমার শরীরটা একটা ধারালো করাত হয়ে উঠছে, একটা গোঁ গোঁ শব্দে ফেটে পড়ছে আমার পরিচয়, যৌনতা, প্রকান্ড একটা কুয়োর মধ্যে আটকে আছি, এখানেই বেড়ে উঠছে আমার যুদ্ধ পরবর্তী এই শহর। পোঁদপাকা যুবক, যুবতীরা ক্রমাগত হারিয়ে ফেলছে অস্তিত্ব, জড়িয়ে যাচ্ছে, ভেসে উঠছে, কেঁদে ফেলছে, শেষমেশ মরে যাচ্ছে। এদেরই মধ্যে কেউ কেউ কি আমার পূর্বপুরুষদের আত্মীয়, নাকি তারা আর্তনাদটুকু শুনতে পেয়েছে মাত্র?

তেমন চেনা কেউ আছে কিনা দেখতে বেরিয়ে পড়লাম, সারা দুপুর ঘুরে একটিও চেনা মানুষের দেখা পেলাম না।

(ক্রমশ…)

 

 

 
 
top