রুশ বিপ্লবের কথা

 

অষ্টাদশ শতকের শেষের দুই দশক ফরাসি বিপ্লবের দশক। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক রুশ বিপ্লবের দশক। এই দুই বিপ্লবের মধ্যে রক্তের আত্মীয়তাও গাঢ়। ক্রুপস্কায়া স্মরণ করেছেন উত্তরাঞ্চলের সোভিয়েত কংগ্রেসে বলশেভিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ফিনল্যান্ড থেকে লেখা লেনিনের শেষ চিঠির কথা। সে চিঠির পঞ্চম দফার দ্বিতীয়াংশে ছিলেন কার্ল মার্কস। সব বিপ্লবে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যে শিক্ষা প্রয়োজন হয় তার শেষ কথা উচ্চারণ করেছেন মার্কস দাঁতোঁর রণধ্বণি থেকে: দে লুদাস, আঁকোর দে লুদাস, তুজু লুদাস। লেনিনের বিশ্বাস দাঁতোঁই সেই সময়াবধি বৈপ্লবিক কর্মপদ্ধতির মহত্তম রণগুরু। সুতরাং লেনিন পুনর্বার উচ্চারণ করেছেন, যদি কর্মসূচি নির্দিষ্ট হয়ে যায়, নেতৃত্ব সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন দাঁতোঁ এবং মার্কসের মহান শিক্ষা, দে লুদাস, আঁকোর দে লুদাস, তুজু লুদাস (যদি জয় করতে হয়, দুঃসাহসী হও, পুনর্বার দুঃসাহসী হও, সর্বদা দুঃসাহসী হও)

পাঠকের সহসা মনে পড়ে যাবে ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে ২ সেপটেম্বরের সেই ইতিহাসের কথা। বিল্পবের ফ্রান্সে হানা দিয়েছে প্রুশীয়-অস্ট্রীয় সেনাবাহিনী। একের পর এক জয় হাসিল করে নিচ্ছে হানাদার বাহিনী। কোনটা পথ? দৃঢ় প্রতিরোধ নাকি মেরুদণ্ড নুইয়ে দেওয়া ভয়? বিমূঢ়ের মত দুলছে প্যারিস। ফরাসি বিপ্লবের সিংহহৃদয় নেতা গেওর্গে জাক দাঁতোঁ (১৭৫৯-১৭৯৪) ছুটে যাচ্ছেন সমাবেশে, বজ্রের মতো মেঘের ভাঁজে ভাঁজে বেজে উঠছে তাঁর গর্জন: যদি জয় চাও তবে দুঃসাহসী হও, পুনর্বার দুঃসাহসী হও, সর্বদা দুঃসাহসী হও, তবে রক্ষা পাবে ফ্রান্স। এ লা ফ্রাঁসে এ সেভ

দাঁতোঁর এ বজ্র নির্ঘোষ ফরাসি বিপ্লবকে বাঁচাতে, বিপ্লবের ফ্রান্সকে বাঁচাতে। দাঁতোঁর এই নির্ঘোষ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন মার্কস, দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষের অন্দোলনকে বাঁচাতে। মার্কস থেকে লেনিন রাশিয়ার বিপ্লবকে সফল করে তুলতে, বিপ্লবকে প্রসারিত করতে দুনিয়া জুড়ে মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াই।

ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে সংযোগ, সম্পর্ক ও তুলনার প্রসঙ্গটি পেরেছিলেন এরিক হবসবাম। হয়তো আরও অনেকেই। কিন্তু তুলনার এই প্রসঙ্গ পর্যালোচনায় হবসবাম স্পষ্ট করেই উচ্চারণ করেছেন প্রায়গিক ক্ষেত্রের বিবেচনায় পূর্বজ ফরাসি বিপ্লবের তুলনায় উত্তরসূরি রুশ বিপ্লবের দুনিয়াজোড়া প্রভাব অনেক বেশি। আধুনিক কালের ইতিহাসে রুশ বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বার অথচ সংগঠিত বৈপ্লবিক আন্দোলনের জন্ম দিতে পেরেছে। দুনিয়াজোড়া প্রসারের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিপ্লব অতুলনীয়। স্মরণে আসতে পারে কেবলমাত্র ইসলামের জন্মের পর প্রথম শতকে তার বিস্তারের প্রসঙ্গ। ১৯১৭র সেই হেমন্তের পর ইতিহাস দেখল দেশে দেশে রক্তপতাকার উড়ান, লাল নিশানে নিশানে ক্ষুধা অবসানের নিশানা, মুক্তির ঠিকানা, মেহনতি মানুষের মর্যাদা আর হিম্মতের ভাষা। দুনিয়াজোড়া লাল নিশানের উড়ানে ১৯১৭র সুপবন। দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন দেশে দেশে সঞ্চার করে দিল শ্রমিক-কৃষকের পার্টির জন্মস্পন্দন। সাম্যবাদী পার্টি গঠনের যে আদর্শ স্থাপন করলেন মহামতি লেনিন, সেই আদর্শই মান্য হল দেশে দেশে।

ফরাসি বিপ্লব স্মরণে শ্রীরঙ্গপত্তমে বৃক্ষ রপন করেছিলেন টিপু সুলতান, জ্যাকোবাঁ ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। রুশ বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্ট্রা ও সংগঠকরা লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭র আগে থেকে এবং বিপ্লব সাফল্যের পরে শুধু নিজেদের দেশে নয়, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছেন দেশে দেশে। সুতরাং শুধু রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, মানবমুক্তি প্রসারিত করাই লক্ষ্য নয়, রুশ বিপ্লবকে সফল করা ছিল তাঁদের কাছে একটি ধাপ মাত্র, পরবর্তী ধাপগুলিতে সমগ্র দুনিয়ায় সর্বহারার বিপ্লবকে বাস্তব করে তোলো। রুশ বিপ্লবের সাফল্য একটি মাত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, সেই সাফল্যকে হাতিয়ার করে ভুবনজোড়া বৃহত্তর পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করো।

রুশ বিপ্লবকে প্রতিপালন করা, ধনবাদী শিবিরের নিয়ত, সম্মিলিত ষড়যন্ত্র আর হিংস্রতা থেকে বুকের পাঁজরের দেওয়াল তুলে তাকে রক্ষা করা—এই সংগ্রামের পাশাপাশি নভেম্বর বিপ্লবের সংগঠকরা ভুবনমাত্রায় বিপ্লব প্রসারের স্বপ্ন দেখেছেন, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের স্বপ্নকে প্রাণিত করেছেন। ইতিহাসের নানা সর্বনাশা দশায় রুশ বিপ্লবের সংগঠকরা বিপ্লবকে রক্ষা করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। সে উত্তরণের প্রাণভ্রমর ছিল মার্কসীয় বিপ্লবের দর্শনের গভীরেই। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের সেই দিনক্ষণগুলিতে ইতালির এক পার্টিজান বলেছেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপে এসেছে আর এক বিপ্লব—রুশ বিপ্লব আর এই বিপ্লব আর একবার পৃথিবীকে শিখিয়েছে যে সবথেকে শক্তিমত্ত দুর্ধর্ষ হানাদারকেও হটিয়ে দেওয়া যায় যদি পিতৃভূমির ভার যথাযথ অর্থে তুমি তুলে দিতে পার দরিদ্র, বিনীত, সর্বহারা এবং শ্রমজীবী মানুষের হাতে।’

এ কথাও ঠিক শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নকে সফল করার সংগ্রামে নানা রণাঙ্গনে পরাজয়ও ঘটেছে অনেকবার। কিন্তু সেই পরাজয়ের সাময়িক ক্লান্তি ও বিষাদে নভেম্বর বিপ্লবের নির্মাতাদের দধিচিপ্রতিম স্বপ্নকে মিথ্যা হতে দেওয়া যায় না। নভেম্বর বিপ্লবের সেই দিনক্ষণ সংগ্রামকে, তার নানা মুহূর্তকে পুনর্বার চোখের সামনে মেলে ধরতে চাওয়া হচ্ছে। শতবর্ষ হয়তো একটি উপলক্ষমাত্র। উপলক্ষ, কিন্তু তুচ্ছ উপলক্ষ নয়। কারণ শতবর্ষের কালসীমা ছুঁয়েও, সে শুধু প্রাসঙ্গিক নয়, নিশ্চয় তার প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে শতগুণ। মারের সাগর যখন পার হতে হবে, মারের সাগর যখন পাড়ি দেওয়া হচ্ছে, তখনই নক্ষত্রের ইঙ্গিতে চোখ রাখতে হয় শান্ত, একাগ্র দৃঢ়তায়।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে নিয়ে সেই মহাগাথায় (রুশ কম্যুনিস্ট পার্টিকে উৎসর্গীকৃত সেই মহাকবিতার নামও ‘ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন’) লিখেছেন: ‘যখন আমি আমার জীবনের মহত্তম দিনটিকে খুঁজি, যা দেখেছি যা শুনেছি সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে সব দ্বিধা সব সন্দেহ সরিয়ে রেখে আমি বলব অক্টোবর ২৫, ১৯১৭।’ মায়াকোভস্কি দুর্দমনীয়, অনন্য কবিভাষায় হাত ছোঁয়ায় এমন সাধ্য কার! শুধু ২৫ অক্টোবরের জায়গায় অক্ষর বদল (অক্ষর বদল মাত্র, সত্তা বদল নয়) করে বসিয়ে নিতে হবে ৭ নভেম্বর এইটুকুমাত্র মনে রেখে যে বিপ্লব পূর্ববর্তী রাশিয়ায় ব্যবহৃত হত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার যা অধিকাংশ দুনিয়ায় প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তুলনায় তেরো দিন পিছিয়ে চলে। বিপ্লবের পর থেকেই রাশিয়ায় শুরু হয় ক্যালেন্ডার সংস্কার। বিপ্লবের ভূকম্পন আমাদের প্রাত্যহিক নানা তুচ্ছতায় যখন তুচ্ছতর পরিবর্তন আনে তখনই বুঝতে হবে সর্বজনীন চেতনায়, জীবনবোধে সঞ্চারিত হয়ে গেল বিপ্লবের পদধ্বনি, যথার্থ বৈপ্লবিক পরিবর্তন আকীর্ণ হয়ে গেল যাবতীয় জনজীবন মুদ্রায়। হবসবমই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ফরাসি বিপ্লবের সর্বাপেক্ষা বিশ্বজনীন এবং অক্ষয় ফলাফল হল মেট্রিক পদ্ধতির প্রচলন।

কেন ৭ নভেম্বর জীবনের মহত্তম দিন? কেন সকল বিবেচনা, সকল অনুসন্ধানের পর নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়—৭ নভেম্বর, হ্যাঁ, ৭ নভেম্বরই। ওই কবিতাপঙক্তিগুলোর কয়েকটা পঙক্তি আগে মায়াকোভক্সি তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন মহামতী লেনিনের সেই স্বর: ‘আমরাই উচ্চারণ করেছি দুনিয়ার শ্রমজীবী-কৃষিজীবীর আকাঙ্ক্ষা’। এই পঙক্তিগুলোর ইংরেজি অনুবাদ আশ্চর্য সুন্দর: ‘উই ভয়েজ/ দ্য উইল/ অব দ্য টয়লার্স/ অ্যান্ড দ্য টিলার্স/ অব দ্য হোল অয়ার্ল্ড…’ বৈপ্লবিক লড়াইয়ের মরণ-বাচন মুহূর্তে নভেম্বরের ঋত্বিকরা আবিশ্ব শ্রমজীবী মানুষের কথাই বুকের গভীরে আগলে রেখেছেন। নেহাত দেশের কথা নয়, খেটে খাওয়া মানুষের দুনিয়ার কথা! নেহাত জাতীয়তা নয়, সর্বহারার আন্তর্জাতিকতা!

৭ নভেম্বর তাই শুধু বিপ্লবের জয়গাথা লিখে রাখা, বিপ্লবের বিশ্বনেতার জীবনকাব্য লিখে রাখা একজন রুশ কবির জীবনেরই শ্রেষ্ঠতম দিন নয়, যারা শ্রমজীবী মানুষের জন্য, গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের জন্য লাল দিনের স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্নের চিরাগ অনুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে চান, তাঁদের সকলের মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা জীবনেও মহত্তম দিন। কম্যিউনের সেই মহত্তম হেমন্ত ধনবাদী বিশ্বায়নের ফাঁদে পড়া পৃথিবীকে মুক্ত করুক। আবার মায়াকোভস্কির কবিতা থেকে ঋণ: নভেম্বরের রক্তপুষ্প দল থেকে ফুটে উঠুক শস্য ফলনের হাসি, দুনিয়ার নিরন্ন, নিপীড়িত মানুষের জন্য, মোসুল থেকে আলেপ্পো দুনিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আর্তজনের জন্য।

৭ নভেম্বরের দীর্ঘ পূর্ব প্রস্তুতির কিয়দংশে এবং ৭ নভেম্বরকে রক্ষা করার জন্য পরবর্তী তিন বছরের বেশি অবিরাম সংগ্রামের কিয়দংশে আমরা চোখ রাখতে চাইব ক্রমান্বয়ে। ইতিহাসবেত্তাদের অনেকেই মনে করেন ১৯০৫র রক্তস্নাত প্রথম বিপ্লবই জার সাম্রাজ্যের পতন ইতিহাস নির্দিষ্ট করে তুলেছিল। ইতিহাসকে তাঁর কাম্য পরিণতিতে, প্রগতির পরিণতিতে পৌঁছে দিতে যে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, মার্কসবাদের বিজ্ঞানসম্মত রণনীতি ও কৌশলে আস্থা রেখে সংগ্রাম ও পার্টি পরিচালনা প্রয়োজন হয়, তা ভুলে গেলে চলে না। সেই নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও মার্কসবাদের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে প্রয়োগ ও পরিচালনার একটি অম্লান আদর্শ স্থাপন করে লেনিনের পরিচালনাধীন বলশেভিক পার্টি। ফলত আমাদের চোখ রাখতে হবে ১৮৯৫র ডিসেম্বরে লিগ অব স্ট্রাগল ফর দি ইমান্সিপেশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস প্রতিষ্ঠা কিংবা ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ান সোস্যাল ডিমোক্রেটিক পার্টি (রোসসিসকায়া সোৎসিয়াল ডেমোক্রাতিচেস রাবোচায়া পার্তিয়া)-র প্রথম কংগ্রেসের মুহূর্তেও। আমরা সচেতনভাবেই মনোনিবেশ করতে চাইব না ১৯০৫র বিপ্লবের প্রবল মুহূর্তগুলিতে। এই বিপ্লব ও তার পূর্বপট নিয়ে অসামান্য গ্রন্থমালা রচনা করে রেখে গেছেন অধ্যাপক জ্যোতি ভট্টাচার্য। এই গ্রন্থমালারই তৃতীয় খণ্ডের প্রথম পরিচ্ছেদের ঊনসমাপ্তি বাক্যে অধ্যাপক ভট্টাচার্য ১৯০৫-’০৬র বিপ্লব থেকে ১৯১৭র রক্তপুষ্পল অধ্যায়কে মহাভারত-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর সমাপ্তি বাক্য টেনেছেন এমনভাবে: ‘এই মহাভারত আমাদের আজকের রাজনীতির জ্ঞানের ভিত্তি, চেতনা ও বোধের ভিত্তি।’ সেই মহাভারতের মহত্তম অধ্যায়ের সামনে আর একবার দাঁড়ানো যাতে আজকের রাজনীতির জ্ঞানের ভিত্তি, ভাষার ভিত্তি, চেতনা ও বোধের ভিত্তি অটুট, অকম্প্র থাকে।  ক্রমশ দৃঢ় হয়।     

(ক্রমশ…)

 
 
top