সুড়ঙ্গনগরী

 

. গুপ্তসমিতি

মফসসল সেই কলেজে গত শতাব্দীর নয়ের দশকে উত্তরাধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের গলিখুঁজি প্রায় অচেনাই ছিলতাই আলোছায়াময় সেই প্রহেলিকার মায়াবী ধারাবিবরণী যে ছেলেটির অন্তহীন বকবকানিতে উপভোগ্য হয়ে উঠত, সে যদি নিজেকে নয়া সার্ত্র ঠাউরে বসেতাতে আর দোষ কী!

চোখে চুল এসে পরা, রোগা, লম্বা সে ছেলেটিবিশ শতকের প্রথমার্ধে অস্তিত্ববাদী ফরাসি দার্শনিকের সঙ্গে একটা অমোঘ মিল তো তার ছিলই: মহান সবকিছুকেই যুগপৎ অবিশ্বাস আর শ্লেষের সঙ্গে দেখা। তাই প্রবহমান যে-কোনো বিতর্কের রঙ্গমঞ্চে (তা সে কলেজ ক্যান্টিনই হোক কিংবা কমন রুম) তার প্রবেশটা বরাবরই হত রীতিমতো নাটকীয়। শেষ রাউন্ডে ভুঁইফোড়ের মতো এন্ট্রি নিয়ে বাদী-বিবাদী নির্বিশেষে উভয় পক্ষকেই সে বসত চ্যালেঞ্জ করে স্রোতের মুখ যেত ঘুরেসোক্রাতেস থেকে প্লাতো হয়ে আরিস্ততল তো কোন্ ছাড়, স্বয়ং ফুকো-দেরিদাও তার হাতে পড়ে নিত্যই অবিনির্মিত হতে থাকত!

ইংরেজি সাহিত্যের মান্ধাতার আমলের পাঠ্যসূচিকে সে গ্রাহ্যের মধ্যেও আনত না (সাম্রাজ্যবাদীদের চাপিয়ে দেওয়া সাহিত্য নিয়েই বা কেন তাকে স্নাতকস্তরে ভরতি হয়েছিল, সে রহস্য আজও অনুদ্ঘাটিত। তবে হ্যাঁ, দক্ষিণের মাধবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়তে না পারার ট্র্যাজিডির মধ্যে কোনো একটা সূত্র পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে)শেক্সপিয়র তার কাছে ছিল হাস্যকর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার (মুম্বই-টকি মার্কা আল্ট্রাপ্রেডিক্টেবল চিত্রকাহিনি), ওয়র্ডসওয়র্থসহ রোম্যান্টিক কবিকুল অপাঠ্য, এলিয়ট ঠিকঠাককিন্তু ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের দুর্বল অনুকারক।

আমাদের বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তার অভিমত জানা যায়নি, যেহেতু সে বস্তুটি খায় না মাথায় দেয়, এ নিয়ে তার নিজেরও কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না; যদিও (কী আশ্চর্য!) তার নিজের টুকটাক ইতস্তত বিক্ষিপ্ত লেখালেখির ভাষা কিন্তু ছিল বাংলাই!

না, এম্পায়ার রাইটস ব্যাক নামক কোনো মহা-আখ্যানেও কদাপি তার প্রতীতি জন্মায়নি, ফলে ইংরেজিতে সাহিত্যসাধনা করতেও তার আত্মসম্মানে বাধত। যে রুশসাহিত্য, বিশেষত দস্তয়েভস্কি নিয়ে, তার কিঞ্চিদধিক উৎসাহ ছিল, তলেতলে সন্দেহ করত, -ও তার বাখতিন পড়ার হ্যাং-ওভার!

এমন তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি আর অর্জিত বোধের উত্তরাধিকার পরীক্ষার খাতাতেও নির্ঘাত সঞ্চারিত হয়েছিল। নইলে প্রথম পত্রে (কবিতা) মাত্র আশি নম্বরের উত্তর দিয়ে যে বিস্ময়-তরুণ পায় ষাট, সাহিত্যের ইতিহাসের চতুর্থ পত্রে তাকেই কীভাবে পেতে হয় মাত্র একচল্লিশ!

নিশ্চয়ই ডেভিড ডেশাস (ডেইচেস নয়, ডেশাস, পই পই করে জিডি বলেছিলেন, গুড অ্যান্ড গ্রেশাস, ডেভিড ডেশাস) মুখস্থ করে পরীক্ষার বৈতরণী পেরোনো পক্ককেশ অধ্যাপকেরা (তাঁরা তো আর স্লেট-নেট দেননি) প্রান্ত থেকে উঠে আসা তার সেই সার্বভার্সিভ উত্তরের মহিমা বুঝতে পারেননি!

অতএব তা-ই হল, এ ক্ষেত্রে যা হওয়ার ছিল। পঞ্চান্ন শতাংশ দূরে থাক, পঞ্চাশের আশেপাশে কোনোমতে হল স্থান। মাধবপুর তো নৈব নৈব চ, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ কোথাও সুযোগ মিলল না। অগত্যা ভর্তি হতে হল রাজধানী শহরেইঅগতির গতি হিসেবে অভিহিত এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে পড়াশোনা বাদ দিয়ে আর সবকিছুই দিব্য হয়, বিশেষত পারফর্মিং আর্টস

হ্যাঁ, কবীন্দ্রনামাঙ্কিত এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রদর্শকলায় সত্যিই আর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এগিয়েতা সে স্বদেশেই হোক কিংবা বিদেশে।

কিন্তু পারফর্মিং আর্টস-এ আর যেই হোক, সে চৌখস ছিল না। প্রবল পরাক্রান্ত বাম জমানার সেই প্রাক-উপসংহার পর্বে সে না পারল পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে, না প্রদীপের তলার অন্ধকারে যে সুড়ঙ্গ উন্মুক্ত থাকে, তাতে সিঁধোতে।

ফলে ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে থাকতে থাকতে দু-বছর টানা ক্লাস করেও সে জানতে পারেনি গুপ্ত সেই সমিতির কথা, যার সদস্য হতে পারলেই স্নাতকোত্তরে অভীষ্ট পঞ্চান্ন শতাংশ থেকে শুরু করে এমফিল-এ দুর্লভ সুযোগ, পিএইচডি-র ছাড়পত্র, কালক্রমে রেজিস্ট্রারি থেকে অধ্যাপনাসুড়ঙ্গ সব দ্বারই উন্মুক্ত!

তাই যে রাতে সালোয়ারের দড়ি বাঁধতে বাঁধতে তার উদ্দেশে বর্ষিত হয়েছিল এক নারীর (না, না, সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ এক অষ্টাদশীরটু বি স্পেসিফিক) অভিশম্পাত: পারলি না,সাল্লা!, সে রাতেই বাঁই বাঁই করে প্রথম ঘুরপাক খেতে থাকে তার পৃথিবী, ছিটকে পড়তে থাকে একের পর এক ইনট্রোডিউসিং সিরিজের রিডারেরা (লিওতার, বদ্রিলাকে মূলে পড়তে অপারগ বাঙালি সাধারণত শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের গলিতে ইন্ডিয়ানার সৌজন্যে পাওয়া এই পাল্প (নন) ফিকশনগুলোকেই ঢাল-তরোয়াল করে থাকে: অতএব সে-, শেষ বিচারে,—আর সব মধ্যমেধা বাঙালির মতোই— ব্যতিক্রমী ছিল না।)

ব্লিচিং পাউডার, ফিনাইলের গন্ধ ছাপিয়ে নাকের ছ্যাঁদা দিয়ে সে রাতে তার মগজে ঢুকে পড়ছিল অ্যামোনিয়ার চোখে জল এনে দেওয়া ঝাঁঝালো গন্ধ।

অবশ হয়ে আসছিল স্নায়ু, যেন শেষ বিকেলের রোদ যা পড়ে আসছে, যেন শীতের আরেকটি বিষণ্ণ দিন যা মরে যাচ্ছে, সব পাতা ঝরিয়ে নগ্ন সন্ন্যাসীর মতো দাঁড়িয়ে আছে মূঢ় ইউক্যালিপটাস, যার পাতায় খুব ছোটোবেলায় একবার সে পেয়েছিল ভিক্সের গন্ধ, গন্ধ শুঁকতে গিয়ে দলছুট হয়ে পড়েছিল সে, মায়ের পক্ষে খেয়াল রাখা সম্ভব ছিল না, হোমের পঁচিশটা মেয়ের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে, ইসুজু করে ঠিক আটটায় পৌঁছতে হবে বিএসএফ ময়দানে, প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ এই শুরু হল বলে।

শুধু দাদা বুঝতে পেরেছিল, ভাই বাংলো থেকে বেরিয়ে আসেনি, সে রয়ে গেছে দীর্ঘ, নগ্ন সন্ন্যাসীসম এক ইউক্যালিপটাসের তলায়, জীবনে প্রথম ঝরে পড়া কোনো পাতার গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

এসডিও বাংলোর বাইরে বন্ধ হয়ে যাওয়া গেটের ওপার থেকে থেকে দাদা ডাকছিল তাকে, ভা-! ভা-, কোথায় তুই? তুই কোথায়?

নোংরা কমোডের ওপর ব্যোম মেরে জড়ভরত হয়ে সে বসেট্রাউজারসটা নামানো গোড়ালি অবধি, ব্রিফটা হাঁটুর নীচে মুখ লুকিয়েছে, নাকের ছ্যাঁদা দিয়ে ভস ভস করে মগজে ঢুকে পড়ছে অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ। চোখে জল। মাথার (নাকি মনের?) ভেতর ভাঙা রেকর্ডের মতো খালি বেজে যাচ্ছে, পারলি না! পারলি না! পারলি না, সাল্লা!

(ক্রমশ…)

 
 
top