সুড়ঙ্গনগরী

 

. ক্লাস

অভিমন্যু দেখল এসকেডি ক্লাস নিচ্ছেন। সূর্যেন্দুকুমার দত্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দমবন্ধ দু-বছরে নামমাত্র যে ক-জন অধ্যাপককে সে মনে মনে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, এসকেডি তাঁদের অন্যতম। শান্ত, সৌম্য, বয়স বেশি না, কিন্তু বেশিরভাগ চুলেই পাক ধরে গেছে। ছোটোখাটো চেহারা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। সূর্যেন্দুবাবুর চলনে-বলনে-কণ্ঠস্বরে এমন একটা নিপাট আন্তরিকতা আছে, যা তাঁকে ছাত্রছাত্রীদের কাছের মানুষ করে তুলেছে। স্যারের লেকচারের ভগ্নাংশ ভেসে এল অভির কানে, ‘দ্য ডার্কনেস অব হেল ইজ নট মিয়ারলি এক্সক্লুশন ফ্রম গ্লোরি অ্যান্ড হ্যাপিনেস, বাট দ্য ডার্কনেস অব আনসার্টেইনটি অ্যান্ড এরর ইন হুইচ সেটান মাস্ট প্লট টু ডিফিট দ্য ডিজাইনস অব গড

চমৎকার বলেন স্যার। আচ্ছা, ইভনিং-এ তাহলে উনি মিলটন পড়ান। ডে-তে উনি টেগোর স্টাডিজ পড়াতেন অভিদেরহোম অ্যান্ড দ্য ওয়র্ল্ড। ঘরে বাইরে উপন্যাসটা অভির পছন্দের না। ড্রয়িংরুম ফিকশন। কবির ন্যারেটিভ এমনিতেই কাঁচা, তার ওপর অ্যাকশনের অভাব, শুধুই শূন্যগর্ভ আইডিয়া। দুর্বল, ইমপোটেন্ট নিখিলকে কথার পর কথা সাজিয়ে মহীয়ান করে তোলার নিদারুণ প্রচেষ্টা। তাতে সন্দীপ, প্রবল, যে আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে সেদিকে কবির খেয়াল নেই। মহত্ত্ব যে আসলে একধরণের গ্লোরিফায়েড কাওয়ারডাইস, সুড়ঙ্গপথে সাপ ঢোকানোর ব্যবস্থাসে কথা কবিকে কে বোঝাবে! তিনি শুধু ন্যাশনালিজমকে গাল পেড়েই গেলেন। পিরালী ব্রাহ্মণ, তার ওপর জমিদার বলেই কি? নিজের শ্রেণি অবস্থানের ঊরধে শেষ অবধি ক-জন উঠতে পারে?

কিন্তু এসকেডি পড়াতেন চমৎকার। তার ধ্বংসাত্মক সমালোচনা মন দিয়ে শুনতেন, তারিফ করতেন।

বলতেন, ‘দ্যাখো, অভি। সাহিত্যে ঠিক-ভুল বলে কিছু হয় না। যা হয় তা হল সৃজন আর আস্বাদন। ক্রিয়েশন অ্যান্ড অ্যাপ্রিসিয়েশন। তোমার এই ক্রিটিসিজমও আসলে এক ধরণের অ্যাপ্রিসিয়েশন। তা আমাদের নিশ্চিতভাবে কিছু ইনসাইটস দেয় - ইনটু দ্য টেক্সট, বিটউইন দ্য লাইনস। কিন্তু ওয়র্ক, একবার ভেবে দ্যাখো, যদি সৃজিতই না হত, তাহলে তো তা কখনই টেক্সট অর্থাৎ পাঠ হয়ে উঠত না, আর তোমার এই অন্যধরণের রিডিংটাও মিস করতাম আমরা। এখানেই মূল লেখাটার তাৎপর্য।’

তূণীর, মেঘা, ত্রিয়াণের ভ্রূকুটিকুটিল চাহনিকে উপেক্ষা করে অভি বসে পড়ত। তমোঘ্ন মনে মনে প্রমাদ গুণত। অভি বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। শত্রুসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। যুদ্ধে জিততে গেলে, কৌটিল্য লিখে গেছেন, অনেক ছায়াযুদ্ধে আগে জিততে হয়। ছদ্মবেশ ধারণ করে কিংবা চর পাঠিয়ে শত্রুর হাঁড়ির খবর রাখতে হয়। অভি সে সব বোঝে না। সবসময় উদ্ধত বর্শার মতো ঝলক দিয়ে উঠতে চায়। কখনো এআর-এর ক্লাসে, কখনো-বা এসকেডি-র ক্লাসে। বালক, নিতান্তই দুগ্ধপোষ্য শিশু এখনও!

অভিদা, কাম অন!’

অভি দ্যাখে, ক্লাস পেরিয়ে বন্ধ ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরির কাছে থেকে তিস্তা ডাকছে তাকে। মতলব কি মেয়েটার? তাকে দিয়ে গাঁজাটাঁজা টানাবে নাকি? যাই হোক, টিকেসিকে সালটে নেবে বলেছে মেয়েটা। অন্তত তমোঘ্ন তো সেরকমই দাবি করছে। দেখাই যাক না, কী বলে। মেয়েটা নিজেকে রেখা মনে করেহা: হা:! মনে মনে একটু হেসেই ফেলে অভি, কতরকমের পাগলি যে থাকে!

ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরি চারটের পরেই বন্ধ হয়ে যায়। ইভনিং-এর ছেলেমেয়েরা একমাত্র ডে-তেই এটা অ্যাকসেস করতে পারে তবে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি সাতটা অবধি খোলাসেটাই বাঁচোয়া। অভির অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো লাইব্রেরিতেই যাওয়া-আসা বিশেষ নেই। সে নিজে অ্যাকসেস করে থিয়েটার রোডে বিসিএল, জওহরলাল নেহরু রোডে অ্যামেরিকান সেন্টার আর আলিপুরে ন্যাশনাল লাইব্রেরি। তা ছাড়া কলেজের স্যারদের সঙ্গে এখনও তার যোগাযোগ রয়েছে। সেখানকার লাইব্রেরিও খুব ভালো। যে-কোনো বইয়ের কথা বললে জিডি কিংবা এএনবি ঠিক আনিয়ে দেবেন।

গভর্নমেন্ট কলেজ। মফসসলের সেই সরকারি কলেজটাতেই কেটেছে অভির ছাত্রজীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। হ্যাঁ, কলেজ তাকে নম্বর দেয়নি বটে, কিন্তু বন্ধু দিয়েছে। মৌর্য, হাতে হ্যান্ডিক্যাম আর ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে তার বক্তব্য শুনে চুপ করে থাকা মৌর্য রায়চৌধুরী

অনার্সে তাদের কলেজ থেকে মৌর্যই টপ করেছিল। শুধু মাধবপুর কেন, দিল্লিজেএনইউ, বিএইচইউযে-কোনো জায়গাতেই মৌর্য অ্যাডমিশন পেয়ে যেত। এমনই মেধা তার। কিন্তু সে এমএ-ই পড়ল না। জিআরই দিয়ে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি দিল লস এঞ্জেলসনিউ ইয়র্ক ফিল্ম অ্যাকাডেমি। কোর্সটা সিনেমাটোগ্রাফির হলেও ওখানকার পড়াশোনার ধাঁচটাই এমন যে, কেউ তার যা ইচ্ছে তা নিয়েই মশগুল থাকতে পারে দিনরাততাই কেভিন স্পেসির কাছে অ্যাক্টিং ওয়র্কশপ করার পরেই হয়তো বার্গার খেতে খেতে মৌর্য স্পিলবার্গের লেকচার শুনছে। তারপরেই অ্যাভিডে কাটছে সারা দিনের তোলা রাশ। গতকালই বিসিএল-এর নিউলি ইনট্রোডিউস্ড সাইবার ক্যাফেতে নিজের মেল আইডি-তে লগ ইন করে অভি দ্যাখে, মৌর্যর একটা ই-মেল এসেছে তার কাছেরোমান হরফে বাংলায় মৌর্য লিখেছে:

হাই অভি,

খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছিস, না? করে যা কাল তোকে খুব মিস করছিলাম। টম স্টপার্ড এসেছিলেন। না লেকচার দিতে নয়, এমনিইআমাদের সঙ্গে  আলাপ করতে। আমি বোকার মতো একটা প্রশ্ন করে ফেললাম ওঁকে, শেকসপিয়র ইন লাভ-এর চিত্রনাট্যটা লিখলেন কী করে?’ উনি হেসে বললেন, ‘ফল ইন লাভ, মাই ফ্রেন্ড, অ্যান্ড য়্যু উইল কাম টু নো।’ আমি তো প্রেমে পড়তে পারলাম না এখনো। তুই?

মৌর্য

স্বপ্নের জীবন কাটাচ্ছে মৌর্য। আর এখানে সে? একটা মেয়ের ইশারায় লাইব্রেরি থেকে মাঠ, মাঠ থেকে ক্লাস, ক্লাস থেকে ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরির বন্ধ দরজাকী না করে বেড়াচ্ছে! প্রেম? ছো:! নিজের প্রতি তাচ্ছিল্য আর সমবেদনার ভাবটা বেশি করে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল, তখনই তিস্তা হাত ধরে টানল, ‘এসো!’

কোথায়?

আরে, বাবা! এসোই না!

লাইব্রেরির সামনে দিয়ে প্যাসেজটা সোজা পূর্বমুখী গিয়ে একটা টি-তে গিয়ে মিশেছে। মানে, এর পর তুমি উত্তরে যেতে পার যেদিকে কমনরুম, আবার দক্ষিণেও যেদিকে স্টাফরুম। তিস্তা তার হাত ধরে স্টাফরুমের দিকে এগোতে লাগল। প্যাসেজের টিউবগুলো জ্বলছে ম্রিয়মান হয়ে। গোটা বিল্ডিংটাকে মনে হচ্ছে একটা ডুবোজাহাজ, অন্ধকার সমুদ্রের হাঁয়ের ভেতর ডুবে আছে।

স্টাফরুমে দু-জন গেস্ট লেকচারার গল্প করছিলেন। ওদের খেয়ালও করলেন না। ওরা স্টাফরুমও পেরিয়ে গেল। এসকেডি-র গলার স্বর আর ভেসে আসছে না। অভি এখন শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পাচ্ছে। এই বার কল থেকে জল পড়ার শব্দও।

এইখানে আরও একটা টয়লেট। স্টাফদের জন্য। যদিও ওঁরা এটা ব্যবহার করেন না। স্টাফরুমের সঙ্গে অ্যাটাচড টয়লেট আছে। দু-দুটোপুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা আলাদা। এটা অতিরিক্ত। অভিরাও এটা ব্যবহার করে না। তাহলে কারা করে? উত্তরটা অভির জানা নেই। তিস্তা হয়তো জানে। ওর দৃঢ়তাব্যঞ্জক পদক্ষেপে মালুম হচ্ছে ও এখানে আগেও এসেছে।

টয়লেটের কাছেপিঠে কোনো টিউবলাইট নেই। ভেতরে একটা বিশ পাওয়ারের বাল্ব নোনামাখা দেয়ালে হলুদ আলো ছড়িয়ে জ্বলছে টিমটিম করে। এই প্রথম অভিমন্যুর শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল একটা স্রোত বয়ে গেল

বাইরে কেন,’ ফিসফিস করে তিস্তা বলে, ‘ভেতরে এসো!’

অভি ইতস্তত করারও সময় পায় না, তার আগেই হ্যাঁচকা টানে তিস্তা ওকে ভেতরে নিয়ে আসে। টিপটিপ করে বেসিনে জল পড়ছিল। তিস্তা কলটা ফুলস্পিডে চালিয়ে দেয়

ব্যস্, এবার আর ভেতরের শব্দ বাইরে যাবে না, কী বল?’ তিস্তাকে উৎফুল্ল দেখায়, ‘দাঁড়াও, ছিটকিনিটাও দিয়ে দিই। কেউ জল পড়ার শব্দ শুনে কল বন্ধ করে দিতে আসতে পারে। হি: হি: হি: হি:!’

তিস্তা ফুলে ফুলে হাসতে লাগে। মেয়েটা শুধু তারকাটা নয়, দু-কানকাটাও। ডাবলি ডেঞ্জারাস! অভি বুঝতে পারে জীবনে প্রথমবার সে সত্যিকারের একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছে।

নাও, এবার বোঝাও তোমার অবজেকটিভ কো-রিলেটিভ…হাতব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে এনে একটা ফ্লেক তিস্তা দু ঠোঁটের মাঝে রাখে। ‘আসলে ঠিকঠাক অ্যামিবিয়েন্স না হলে আমি আবার সবকিছু বুঝে উঠতে পারি না।’

(ক্রমশ…) 

 
 
top