বাঙালি মননের ইতিহাস, বাঙালি চিন্তনের কাহিনি: শুরুর কথা

 

Like every individual, every nation must be able to tell a coherent story of its own, one without too much presumption or despair…

বাঙালির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না।

ওপরের দুটো স্টেটমেন্টই ঠিক আক্ষরিক উদ্ধৃতি নয়, প্রথম বক্তব্যটা টেরি ইগলটন জনৈক পশ্চিমি তাত্ত্বিকের লেখায় পাই, পরেরটা অতি বিখ্যাত, এটা বঙ্কিমের কথা, আমরা সবাই জানি।

বাঙালির ইতিহাস চাই। বাঙালি যদি তার নিজের কাহিনী না জানতে পারে (ঘটনাক্রমে, ফরাসি ভাষায় ইতিহাস ও কাহিনি, দুটোই একটা শব্দ দ্বারা চিহ্নিত হয়: histoire) তাহলে বাঙালির অবস্থা মুণ্ডহীন ধড়, বা শেকড়হীন গাছ, বা মাস্তুলহীন জাহাজের মতো হবে। বর্তমান বাঙালির দিকে তাকিয়ে বোঝা যায়, কিছুটা হয়েছেও।

স্বদেশি যুগে তাই প্রতাপাদিত্য উৎসব চালু করেছিলেন সরলা দেবী, যাতে বাঙালি জানতে পারে, সে যুদ্ধ করতে জানত, সে বীর ছিল। আজকে আমাদের কাছে ইতিহাসের উপাদান অনেক বেশি।

আমরা প্রবলপরাক্রান্ত গঙ্গাহৃদি সাম্রাজ্যের কথা জানি (আজকে বারাসাতের কাছে যে চন্দ্রকেতুগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়, কেউ কেউ মনে করেন সেটাই ছিল গঙ্গাহৃদি বা গঙ্গারাঢ়ী সাম্রাজ্যের রাজধানী। বারাসাত ও এয়ারপোর্টের মাঝের গঙ্গানগরেও সেই গঙ্গাহৃদিদের স্মৃতি আছে বলে মনে করা হয়) আমরা সিংহলের মহাবংশ ও দীপবংশ পড়ে জানতে পেরেছি প্রবল পরাক্রান্ত বাঙালি রাজকুমার বিজয় সিংহের কথা, যিনি স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিলেন, এরপরে সিংহলে গিয়ে রাজ্যস্থাপন করেন। আজকের সিঙ্গুর অঞ্চলেই ছিল বিজয় সিংহের পৈতৃক রাজ্য সিংহপুর, এমনটা মনে করার কারণ আছে। তাম্রলিপ্ত অসামান্য সমুদ্রবন্দর ছিল সেই প্রাচীনকাল থেকেই। সম্রাট শশাঙ্কর আমলে গৌড়ের প্রভাব সমগ্র উত্তরভারতে বিস্তৃত, পালসাম্রাজ্য তো সম্রাট দেবপালের সময়ে আফগানিস্তান অবধি বিস্তৃত ছিল।

বাঙালি যদি তার ইতিহাস না জানে, বঙ্কিম মনে করেছিলেন, তবে বাঙালি মানুষ হবে না। বঙ্কিম এও চেয়েছিলেন, এই যে বঙ্গদেশ, এর গল্প শতকণ্ঠে বলুক, শুনুক বাঙালি। আজকের ইন্টারনেট জেনারেশনের জন্য এই কাজটি করার আরও বেশি প্রয়োজন। তাই আমি প্রথাগত অ্যাকাডেমিক ধারায় বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির কাহিনি বলার চেষ্টা করব। তবে সম্পূর্ণ ইতিহাস নয়, এই লেখা নিবদ্ধ থাকবে বাঙালির ইন্টেলেকচুয়্যাল ইতিহাসে। বাঙালি মননের বিবর্তন, বাঙালির চিন্তনের ট্র্যাজেক্টরি আমরা খোঁজার চেষ্টা করব এই লেখায়। সেই সঙ্গে অবশ্যই বাঙালির সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সবই প্রসঙ্গক্রমে আসতে পারে, আসবেও। এখানে চেষ্টা করব সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বা কালচারাল হিস্ট্রির জনপ্রিয় কথনের সময়সিদ্ধ ধারাটিকে অবলম্বনে বাঙালির ভাব আন্দোলনের কাহিনি নতুন করে জানাতে। ইতিহাসেররেখার যে পদ্ধতি বা মেথডকে অবলম্বন করে এই লেখা, তা হল লোকগ্রাহ্য, সহজবোধ্য আঙ্গিকে একটি ঘটনা, একটি যুগ, বা একটি জাতির যাপনচর্যার রূপরেখা আঁকার প্রয়াস। ফুটনোটে ভারাক্রান্ত নয়, ইতিহাসের চুলচেরা বিতর্কে ন্যুব্জ নয়। এ হল ইতিহাসের সহজিয়া, সাবলীল ধারা। বাঙালি মননে সহজিয়া বা সহজযানের কী গুরুত্ব, সে প্রসঙ্গে আমরা যথাসময়ে যাব।

মিথ ও মহাকাব্যে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সুহ্মএই পাঁচটি পূর্বদেশীয় ক্ল্যান, বা জনজাতির কথা জানা যায়। এই নামগুলো অস্ট্রিক, এমনটা নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদিপর্ব-এ অনুমান করেছেন। এই পাঁচজন হলেন পুরাণ (পুরাণ শব্দটির অর্থ পুরোনো ইতিহাসগাথার সঙ্কলন) অনুযায়ী মহারাজ বলির পাঁচ সন্তান। আসলে এদের জন্ম ঋষি দীর্ঘতামসের নিয়োগে, কিন্তু নিয়োগপ্রথায় উৎপন্ন সন্তান ঔরসজাত সন্তানের সমমর্য্যাদা পায়, তাই এরা বলিরই সন্তান।

ইঙ্গিতটি অর্থবহ। আসমুদ্র হিমাচলের অধিপতি, স্বর্গ্য মর্ত্য পাতালের মহারাজ বলি (তাঁকে মহাবলীও বলা হয়ে থাকে, মহামল্ল বা মামল্ল নামে তিনি তামিলনাড়ুতে পরিচিত, চেন্নাইয়ের অদূরে মহাবলীপুরম বা মামল্লপুরম সেই মহাবীরের নামের স্মৃতি বহন করছে, কেরালাতে তাঁর নাম মাভেলি, তাঁকে স্মরণ করেই কেরালার সবথেকে বড় উৎসব ওনাম) ছিলেন অসুরবংশীয়। বৌধায়নের সূত্রও বলছে বঙ্গ ও মগধের লোকেরা অসুরভাষী। এখানে অসুরভাষী মানে চট করে অনার্যভাষী কেউ যেন মনে করে না ফেলেন। সুরের সঙ্গে অসুরের, দেবের সঙ্গে দানবের, অদিতির সন্তান (আদিত্য)-দের সঙ্গে দিতির সন্তান (দৈত্য)-দের, মনুর সন্তান (মানব)-দের সঙ্গে দনুর সন্তান (দানব)-দের প্রাচীন শত্রুতা ছিল। এবং অনেকে এটা সরলীকরণ করে বলতে চান, এ হল আর্যদের দ্বারা অনার্যদের ওপরে দীর্ঘ আক্রমণের সাঙ্কেতিক ইতিহাস। না, বিষয়টা এত সরল নয়।

আর্য আক্রমণের তত্ত্বটি অত্যন্ত গোলমেলে, এবং আজকের দিনে মোটের ওপর পরিত্যক্ত বলা যায়। কেন, সে এক দীর্ঘ আলোচনা হয়ে যাবে। উৎসাহীজন আরিয়ান ইনভেশন থিওরি বা এআইটি দিয়ে গুগল করলে অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। আর্যজাতি বলে কিছু একটা ছিল, বা ভারতে বহিরাগত আর্যরা হামলা চালিয়েছিলেন, এগুলো আজ প্রবল বিতর্কের পরে মোটামুটিভাবে অপসৃত। কিন্তু কথা হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষাগোষ্টীর অস্তিত্ব আছে এবং ছিল। যদিও আর্য নামে কোনও একটা রেস বা নৃগোষ্ঠী ছিল না, কিন্তু আর্যভাষী অনেকেই ছিল। একটা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। সারা পৃথিবীতে প্রচুর লোক ইংরেজিভাষী, কিন্তু সবাই জাতে ইংরেজ নন। ওয়েলসের লোকে ইংরেজিতে কথা বললেও, তারা আসলে কেলটিক, একই কথা স্কট ও আইরিশদের সম্পর্কেও প্রযোজ্য। শিক্ষিত বাঙালি ইংরেজিতে কথা বললেও, সে রেসের হিসেবে ইংরেজ নয়।

এই আর্যভাষাভাষী লোকজন বিভিন্ন আলাদা আলাদা নৃগোষ্ঠীর ছিল, এবং এদের মধ্যে সংমিশ্রণ সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলেছে। অর্থাৎ, আর্য নামে কোনও একখানা বিশুদ্ধ রেস ছিল না। প্রাচীন ভারতে বা বাংলায় আর্যরা অনার্যদের ওপরে কষে অত্যাচার চালাত, এ জাতীয় কথাও ইতিহাসের নিক্তিতে অচল (প্রাচীন সংস্কৃতে তো আর্য শব্দটির অর্থ নোবল-বর্ন, বা উচ্চবংশীয়, তা কোনও জাতি চিহ্নিত করে না, এর মানে যে সুসভ্য ও সুসংস্কৃত, তাকেই আর্য বলা হত)

এই আর্য ব্যাপারটা আসলে একটা ভাষাগোষ্ঠী। এবং এই ভাষাগোষ্ঠীকে বর্তমানে আর আর্য নামে অভিহিতই করা হয় না ওই আর্য নামটা নিয়ে গোলমালের জন্য, ইন্দো-ইউরোপীয় বলা হয়ে থাকে। এই ভাষাগোষ্ঠী ইউরোপের স্পেন থেকে ভারতের আসাম পর্যন্ত প্রসারিত। এই ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে ভারতের উত্তরাংশে বিভিন্ন ভাষা পরিবার আছে। বাংলা, মৈথিলি, অসমিয়া ও ওড়িয়া এই চারটি ভাষা এক পরিবারভুক্ত। অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সুহ্ম, এই পাঁচ পরস্পর সম্পর্কিত মহাজাতির ভাষা ও সংস্কৃতির মন্থনের ফলে আজকের বাঙালি জাতির সৃষ্টি। পূর্ব ভারতে প্রাচীন কাল থেকেই মগধ এক মহাজাতি। দীনেশ সেন তাঁর বৃহৎ বঙ্গে বলছেন, বাঙালিই পূর্বভারতের সেই প্রাচীন সভ্যতার ধারক ও বাহক ও উত্তরাধিকারী। এটি সম্ভবত বাঙালির চিন্তন ইতিহাস পাঠ করার প্রথম সূত্র।

বলা দরকার, যাদের সঙ্গে বৈদিক আর্য(ভাষী)দের শত্রুতা ছিল, অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেরাও আর্য(ভাষী) ছিল। অর্থাৎ যাদেরকে অসুর, দানব, দৈত্য ইত্যাদি ভালো ভালো নামে অভিহিত করছেন বৈদিক আর্যভাষীরা, অনেক ক্ষেত্রেই তারা আসলে বৈদিক আর্যভাষীদেরই জ্ঞাতি, ফারাক এই যে তারা বেদ মানত না। পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের একাধিক নদীনামে -দনু এই শব্দমূল পাওয়া যায়। দন, দ্‌নীপার, দ্‌নীয়েস্টার, দানিউব। এই অঞ্চলে, হতেই পারে দনুর সন্তানেরা পরাস্ত হয়ে এসে বাসা বেঁধেছিল। এদের ভাষাও, বলা বাহুল্য, আর্যভাষা/ইন্দো-ইউরোপীয়। যাই হোক, সেটা আমাদের আলোচনার বাইরে। তবে এটুকু বলার যে, ওই আর্য বনাম অনার্যর যে অতিসরলীকরণ হয় (যার ফলে একদল বিপ্লবী ঘোষণা করেন যে তারা দুর্গার পুজো না করে মহিষাসুরের পুজো করবেন, কারণ এ হল আর্যদের হাতে অনার্যদের উৎপীড়নের কাহিনীর মুখের মতো জবাব), সে ব্যাপারটার বাইরে বেরোনো দরকার, নইলে বাঙালির ইতিহাসের সারমর্ম অনুধাবন করা অসম্ভব।

আবার বলি, যে কোনও রেসের ব্যক্তিই আর্যভাষী হতে পারেন। আর্যভাষী কালো হতে পারেন, ধলা হতে পারেন, বেঁটে হতে পারেন, লম্বা হতে পারেন, টিকোলো হতে পারেন, খ্যাঁদা হতে পারেন। আমাদের বাঙালিদের ভাষার মধ্যে প্রচুর দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক প্রভাব আছে। নিশ্চিত বলা যেতে পারে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে বিভিন্ন আলাদা আলাদা রেশিয়াল স্টক ছিল। কিন্তু তার মানে এই না যে একদল আর্য এসে অনার্যদের মেরেধরে সব কেড়েকুড়ে নিয়ে মৌরসীপাট্টা চালু করেছে। এটা বিপজ্জনক রকমের সরলীকরণ। এরকম বিপজ্জনক ইতিহাসের ফেরিওয়ালা যারা, তাদের দুরভিসন্ধি আসলে কি, সে আলোচনা পরে করব।

অনেকেই মনে করেন, বাংলায় যে আর্য/ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী প্রথম আসে, তারা ছিল অবৈদিক আর্য(ভাষী) তারা ছিল গোলমুণ্ড অ্যালপাইন নৃগোষ্ঠীর। তারা ছিল অবৈদিক আর্য। দীর্ঘমুণ্ড নর্ডিকদের বৈদিক ভাবা হয়। ঐতিহাসিক রমাপ্রসাদ চন্দ এরকমটাই মনে করেছেন।

যে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, সেটা হল, বাঙালির উৎসে আছেন অসুরভাষীরা। অবৈদিকেরা। বলি ছিলেন দৈত্যরাজ প্রহ্লাদের পৌত্র (প্রহ্লাদের পুত্র বিরোচন, বিরোচনের পুত্র বলি) আর প্রহ্লাদের আরেক পুত্র ছিলেন কপিল, মিথ এরকম বলছে (যদিও অন্যরকমও বলা আছে কপিলের অ্যানসেস্ট্রি সম্বন্ধে, সে প্রসঙ্গে আসছি) সেই অবৈদিক, অসুর ঐতিহ্যের নির্যাস রয়েছে বাঙালির মজ্জায় মজ্জায়।

এইবার সাংখ্য দর্শনের প্রসঙ্গে আসা যায়। সাংখ্যে বাঙালির শেকড়। সাংখ্য দিয়ে বাঙালির রক্তমজ্জা তৈরি হয়েছে। বাঙালি মননের প্রাচীনতম ধারা সাংখ্যের বিবর্তনে ধরা আছে। সে প্রসঙ্গে আসব এখুনি। তার আগে, আরেকবার বঙ্কিমের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে:

সাংখ্যের প্রকৃতি পুরুষ লইয়া তন্ত্রের সৃষ্টি। সেই তান্ত্রিককাণ্ডে দেশ ব্যাপ্ত হইয়াছে। সেই তন্ত্রের প্রসাদে আমরা দুর্গোৎসব করিয়া এই বাঙ্গালা দেশের ছয় কোটি লোক জীবন সার্থক করিতেছি। যখন গ্রামে গ্রামে, নগরে মাঠে জঙ্গলে শিবালয়, কালীর মন্দির দেখি, আমাদের সাংখ্য মনে পড়ে; যখন দুর্গা কালী জগদ্ধাত্রী পূজার বাদ্য শুনি, আমাদের সাংখ্যদর্শন মনে পড়ে।

সহস্র বৎসর কাল বৌদ্ধধর্ম্ম ভারতবর্ষের প্রধান ধর্ম্ম ছিল। ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত মধ্যে যে সময়টি সর্ব্বাপেক্ষা বিচিত্র এবং সৌষ্ঠব-লক্ষণযুক্ত, সেই সময়টিতেই বৌদ্ধধর্ম্ম এই ভারতভূমির প্রধান ধর্ম্ম ছিল।ভারতবর্ষ থেকে দূরীকৃত হইয়া সিংহলে, নেপালে, তিব্বতে, চীনে, ব্রহ্মে, শ্যামে এই ধর্ম্ম অদ্যাপি ব্যাপিয়া রহিয়াছে। সেই বৌদ্ধধর্ম্মের আদি এই সাংখ্যদর্শনে। বেদে অবজ্ঞা, নির্ব্বাণ, এবং নিরীশ্বরতা, বৌদ্ধধর্ম্মে এই তিনটি নূতন; এই তিনটিই ঐ ধর্ম্মের কলেবর। উপস্থিত লেখক কর্ত্তৃক ১০৬ সংখ্যক কলিকাতা রিবিউতে ‘বৌদ্ধধর্ম্ম এবং সাংখ্যদর্শন’ ইতি প্রবন্ধে প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, এই তিনটিরই মূল সাংখ্যদর্শনে। নির্ব্বাণ, সাংখ্যের মুক্তির পরিমাণ মাত্র। বেদের অবজ্ঞা সাংখ্যে প্রকাশ্যে কোথাও নাই, বরং বৈদিকতার আড়ম্বর অনেক। কিন্তু সাংখ্যপ্রবচনকার বেদের দোহাই দিয়া শেষে বেদের মূলোচ্ছেদ করিয়াছেন। (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সাংখ্য দর্শন)

সাংখ্য অতি প্রাচীন দর্শন। আদি সাংখ্য কালগ্রাসে পতিত হয়েছে, দার্শনিক ও সাংখ্যভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু জানাচ্ছেন। আদি সাংখ্য আমার মতে ঋগবেদ-এর থেকেও প্রাচীন। আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে সাংখ্যকার কপিলমুনি হচ্ছেন খাঁটি বঙ্গসন্তান, কিন্তু এমন বিশাল প্রাচীনত্বের ফলে ইতিহাসের দিকটি ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে (এর সুযোগ নিয়ে কপিলকে ভারতের অন্যান্য জায়গার লোকেও মাঝেমধ্যে দাবি করে বসে) লর্ড অব দ্য রিংস এর ফেলোশিপ অব দ্য রিং ছবিতে একটা ভয়েস ওভার ছিল: হিস্ট্রি বিকামস মিথ, মিথ বিকামস লিজেন্ড কপিলমুনি বাঙালির প্রথম লিজেন্ড।

খুলনায় তিনি জন্মেছিলেন, সেখানে তার জন্মস্থান আজও আছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গঙ্গাসাগর আশ্রম তাঁর কর্মস্থল। তিনি এমনই প্রভূত প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন যে তাঁর নামে নগরীর নামকরণ হত। হ্যাঁ, তাঁর দর্শন থেকেই বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি, আমরা জানি। কিন্তু বুদ্ধের জন্মস্থান, নেপালের শাক্যরাজধানী কপিলাবস্তুও ওই কপিলমুনির নামেই, কপিলের শিষ্যগণ দ্বারা স্থাপিত মহর্ষি কপিলের নামাঙ্কিত এই নগরী কপিলাবস্তু, এ শব্দের মানে কপিলের সারপদার্থ, বা সাবস্ট্যান্স অভ কপিল। সুদূর নেপালে বাঙালি কপিলের এই প্রভাব আমাদের চমৎকৃত করে। যেমন অনেকটা ধর্মতলায় অবস্থিত লেনিন সরণির মত, যা থেকে বিংশ শতকের পরানুকরণপ্রিয় বাঙালির ওপরে রুশ প্রভাবটা বোঝা যায়যাই হোক।

কপিল বুদ্ধের অনেক শতাব্দী পূর্ববর্তী। যদিও পুরোনো সাংখ্য আর পাওয়া যায় না, কিন্তু বর্তমানে যে সাংখ্য দর্শনকে আমরা জানি, তা বেদ মানে কপিল রচিত পুরোনো, আদি সাংখ্য সম্ভবত সেটাও মানত না। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত তাঁর ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে তাই বলছেন। সাংখ্য আদিকাল থেকেই নিরীশ্বর, যখন সে কায়ক্লেশে বেদ মেনেছে, তখনও নিরীশ্বর থেকেছে।

পূর্বভারতে সাংখ্যের মারাত্মক প্রভাব। বৌদ্ধধর্ম সাংখ্যপ্রসূত তো বটেই। আর বৌদ্ধধর্মের এপিসেন্টার ছিল মগধ, যাকে দীনেশ চন্দ্র সেন বৃহৎ বঙ্গেরই অন্তর্গত ধরছেন। এদিকে আমাদের বাঙালিদের তান্ত্রিক উপাসনা, শাক্ত ও বৈষ্ণব, বাউল থেকে সহজিয়া সমস্ত কাল্টেই সাংখ্যের পুরুষ প্রকৃতি দ্বৈতবাদের নানা ভ্যারিয়ান্ট দেখতে পাই। কিন্তু ওই পুরুষ প্রকৃতি দ্বৈতবাদ-এর কিছু একটা ভার্শন বোধহয় হরপ্পা মহেঞ্জোদাড়োর সময় থেকেই আছে, তারাও শিব ও শক্তির পুজো করতেন এই হিসেবে উপমহাদেশের সবথেকে পুরোনো দর্শন হল সাংখ্য, বাঙালিকে তাই রীতিমতো লগনচাঁদা বলা যায়, সে উপমহাদেশের প্রাচীনতম, ঋদ্ধতম দার্শনিক উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মেছে। এক হিসেবে দেখতে গেলে বেদ তো আর কেউ মানে না উত্তরভারতে, মুখে যাই বলুক, কিন্তু আমরা বাঙালিরা সাংখ্য মানি এখনও। না জেনেই হয়তো, কিন্তু মানি। এই সত্য আধুনিককালে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য বঙ্কিম বাঙালি জাতির ধন্যবাদার্হ। তো যাই হোক, এভাবে ভাবলে বাঙালিরা বোধহয় উপমহাদেশের সবথেকে প্রাচীন সভ্যতার কন্টিনিউয়েশন আমরাই একটানা এই পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈতবাদের সংস্কৃতি ধরে রেখেছি, উত্তর ভারতীয়রা তো নয়ই, দক্ষিণ ভারতীয়রাও নয়

এখানে একটা ধাঁধা চলে আসে। সাংখ্য নিরীশ্বর। ঈশ্বর মানে না, আধুনিক ভাষায় যাকে আমরা নাস্তিক বলি। যদিও প্রাচীন ভারতে বা বাংলায় নাস্তিক অর্থে বোঝাত বেদ-বিরোধী বা বেদ-এ অমান্যকারী: যথা বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাক ইত্যাদি দর্শন। তো এই নিরীশ্বর দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈতবাদ থেকে থেকে শিব কালী, রাধা কৃষ্ণ ইত্যাদি ঈশ্বরোপাসনা এলো কী করে?

একটি বইতে (উনবিংশ শতকের কোনও একটি স্মৃতিকথা) পড়েছিলাম যে, একটা কথা চালু ছিল সেকালের বাঙালিদের মধ্যে, ছজন বিখ্যাত প্রাচীন দার্শনিকের নাম দিয়ে, কপিল ও বুদ্ধসহ, যে এই ছজন হলেন ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। মোট ছ-জনের নাম ছিল সেখানে, কপিল তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য (নামগুলো ষড়দর্শনের সঙ্গে করেসপন্ড করে না সেভাবে, কারণ বুদ্ধ প্রচলিত দর্শন তো বেদ-কে মান্য করা ছ-টি প্রাচীন হিন্দু দার্শনিক স্কুল বা ষড়দর্শনের মধ্যে পড়ে না) সেকালে, মধ্যযুগের শিক্ষিত বাঙালি মাত্রেই নাকি এই শ্লোকটি জানতেন, সে তার ওই দর্শনগুলি পড়া থাকুক আর না থাকুক। এর ফলে প্রাচীন বাংলায় এথিজম সম্পর্কে সবারই একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল। (দুঃখের বিষয় আমি এখন আর সেই রেফারেন্সটা খুঁজে পাচ্ছি না। যোগেন চাটুয্যের স্মৃতিতে সেকাল ঘাঁটলাম, চারুচন্দ্র দত্তের পুরোনো কথা দেখলাম, কিন্তু ওই জায়গাটা খুঁজে পেলাম না।)

যাই হোক, সাংখ্যের গুরুত্ব সম্বন্ধে আধুনিক বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ প্রথম করেন বঙ্কিম। বঙ্কিম বৌদ্ধধর্ম ও সাংখ্য দর্শ (বুদ্ধিজম অ্যান্ড সাংখ্য ফিলোসফি) নামে একটি ইংরেজি প্রবন্ধ লেখেন দ্য ক্যালকাটা রিভিউ নামের ম্যাগাজিনে, সালটা ১৮৭১।

এরপর সাংখ্য দর্শন নামে একটি বাংলা প্রবন্ধ লেখেন বঙ্কিম, বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত হয়, উপরে সেখান থেকেই কিছুটা উদ্ধৃত হয়েছে বঙ্কিম বলেন যে বাংলার হিন্দুধর্মও সাংখ্যময়, দুর্গাপুজো কালিপুজো দেখলে আমাদের সাংখ্য মনে পড়ে। আমি মনে করি বঙ্কিম সে যুগের বেদান্তপন্থী ব্রাহ্মদের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছিলেন এই কথা বলে, যে বাঙালির শেকড় বেদ-এ নয়, অদ্বৈতবাদে নয়, একমেবাদ্বিতীয়ম পরমব্রহ্মে নয়, তার শেকড় সাংখ্যে। নিরীশ্বর সাংখ্যের পুরুষ প্রকৃতি দ্বৈতবাদে। বাঙালির দুর্গাপুজোর মূলে নিরীশ্বর সাংখ্য, এ কথা বলে বঙ্কিম পশ্চিমি ধাঁচে শিক্ষিত নাস্তিক অবিশ্বাসী হিন্দুদের কাছেও আবেদন রাখলেন, এ এক মাস্টারস্ট্রোক।

সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈতবাদ থেকেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান ও সহজযান নামক দুটি শাখা এসেছিল। বজ্রযান ছিল তান্ত্রিক উপাসনা, তা থেকে বর্তমানকালের শাক্ত ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। আর সহজযান ছিল প্রেমময়, সহজ, সঙ্ঘবদ্ধ আরাধনা, তা থেকে আমাদের বাউল-বোষ্টম সহ অসংখ্য লোকধর্ম এসেছে।

বলা দরকার যে সাংখ্যের কাছে আদি বৌদ্ধধর্মের থেরবাদী (হীনযানী) দর্শনও ঋণী। বেদে অবিশ্বাস, নিরীশ্বরবাদ, মানবজীবন যে দুঃখময়, এবং তা থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বাণ বা মোক্ষের ধারণা সাংখ্য থেকে নেওয়া। অশ্বঘোষ তার বুদ্ধচরিত-এ বিস্তারিত বলছেন বুদ্ধের ওপরে সাংখ্যের প্রভাবের কথা।

হীনযানের পরে মহাযান এসেছিল। মহাযানী বৌদ্ধধর্মের শূন্য ও করুণার যে কল্পনা, তা অবশ্যই পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈতবাদ। শূন্য (বুদ্ধের শূন্যমূর্তি হল মহাযানের ও হীনযানের পারস্পরিক মিলন ও বিভাজনবিন্দুর দ্যোতক) হল পুরুষ, আর করুণা হল প্রকৃতি। বোধিসত্ত্ব ও প্রজ্ঞাপারমিতা সহ অসংখ্য দেবদেবী কল্পনার মূলেও পুরুষ প্রকৃতি দ্বৈতবাদের প্রভাব আছে। এর পরে বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে যে শক্তিপুজো শুরু হল, আমাদের দুর্গাপুজো ও কালীপুজো সেই ঐতিহ্যকেই আজও ধরে রেখেছে। শক্তি অর্থাৎ মা দুর্গা বা মা কালী হলেন সাংখ্যের প্রকৃতির মূর্ত চেহারা। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত বলেন যে, মা কালীর পায়ের তলায় শুয়ে থাকা শিব হলেন সাংখ্যের বিমূর্ত পুরুষ প্রকৃতি দ্বৈতবাদের মূর্ত রূপ

এরও পরে সহজযান এসেছিল সেখানেও এই দ্বৈতবাদ। বাংলায় বাউল ও বোষ্টমরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, তাঁরা সহজিয়া বা সহজযানী।

খুব সংক্ষেপে এই হল বাংলার নিজস্ব, বাঙালির আবহমানকালের হিন্দুধর্মে মহর্ষি কপিলের সাংখ্যদর্শনের অবদান।

খুলনায় তাঁর জন্মস্থান ছিল, গঙ্গাসাগরে তাঁর আশ্রম। একটি সূত্র বলছে তাঁর পিতার নাম কর্দম (নাম শুনেই বোঝা যায়, আমাদের এই জলকাদাময় দেশের উপযুক্ত নাম এটি), মার নাম দেবহুতি। আবার, আগেই বলেছি, কোনও কোনও শাস্ত্রে বলছে যে তিনি প্রহ্লাদের ছেলে। বাংলা অসুরভাষী ছিল, সেটা তো বৌধায়নও বলেছেন। প্রহ্লাদের রাজবংশের এই অঞ্চলে রাজত্ব করা অস্বাভাবিক নয়, যখন এমনিতেই অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সুহ্ম এই নামগুলি অসুররাজ বলির পাঁচ ছেলের নাম থেকে এসেছে। বলি যখন প্রহ্লাদের নাতি ছিলেন, তখন কে জানে, কপিল তাহলে মহারাজ বলির কোনও কাকু বা জেঠু হতেন কি না।

পশ্চিমবঙ্গে বহমান গঙ্গার বর্তমান প্রবাহের অন্তত কিছুটার খাত ভগীরথ খনন করেছিলেন, পুরাণের মধ্যে এটুকু সার পাওয়া যায়। এইজন্য খনার বচন-এও ভগার খাতের কথা বলা আছে। এই গঙ্গা আনয়নের সঙ্গে কপিলের নাম যুক্ত। এটি পৌরাণিক গল্পকথা। ওই ওরকম একটা ব্যাপার হয়েছে, এর মূলে কিছুটা বাস্তব সত্য আছে। যা মনে হয়, কপিলের উপদেশ (নদীবিজ্ঞানের খুঁটিনাটি) অনুযায়ী কাজ করে ভগীরথ সেই প্রাচীন যুগে গঙ্গার জলপ্রবাহের কিছুটা সংস্কার করেছিলেন, তাই আমাদের বাঙালিদের গঙ্গাকে, বাংলার গঙ্গাকে আমরা আজও ভাগিরথী বলে থাকি। উত্তর ভারতে গঙ্গাকে কিন্তু ভাগিরথী বলে না।

সাংখ্য নিয়ে আরও জানতে আমার সাংখ্য, দস্তুরমত দর্শন করলাম লেখাটা পড়তে পারেন (www.shoptodina.com)।

আজ যখন আমরা বাঙালি জাতির ইতিহাস ফিরে দেখার চেষ্টা করি, সাংখ্যের ক্রমবিবর্তনের ফসল দেখি বাংলার আদিগন্ত সবুজ মাঠে, বাংলার কাশফুলেও সেই সাংখ্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।

পরের সংখ্যায় দেখবো সাংখ্যের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাঙালির ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও দর্শনের টানাপোড়েন কীভাবে অগ্রসর হয়েছে, সম্রাট শশাঙ্কের সময় পর্যন্ত।

(ক্রমশ…)

 
 
top