দ্য নেকেড চাইল্ড

 

when you can’t any longer choose

even the death you wanted as your own-

hearing a cry,

even the wolf’s cry,

your due:

let your hands go traveling if you can

free yourself from unfaithful time

and sink-

So sinks whoever raises the great stones.

Santorini—The Naked Child, Giorgos Seferis

ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেটা। গুটিশুটি, উপুড় হয়ে। ঠিক যেমনভাবে ঘুমোয় প্রতিরাতে। খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে খাটের উপর। ঠিক তেমনই। আলগোছে শুয়ে আছে আমার ছেলে। শুধু চারটে দেওয়াল আর ছাদ মুছে গিয়েছে কখন যেন। বদলে আকাশ ওর গায়ের উপর বিছিয়ে দিয়েছে গরম চাদর। আর সমুদ্র ঢেউয়ের তালে তালে মাথার নিচে গুঁজে দিয়েছে বালিশ। আমার ছেলে শুয়ে আছে বালির উপর।

অথচ কি আশ্চর্য জানেন, আমাদের দুজনের কোনদিন কথাই হয়নি। কোনদিন ও কোন আবদার করেনি আমার কাছে। ওকে ঘাড়ে নিয়ে আমরা দুজন কোনদিন হেঁটে পৌঁছাইনি দিগন্ত অবধি। চিত হয়ে থাকা আকাশের নিচে উপুড় হয়ে আমরা দুজন কোনদিন আকাশের তারাদের সাথে কথা বলিনি। আসলে আমরা পরস্পরকে চিনতামই না। আমাদের দেখাই হয়নি।

 

আমি ওকে চিনলাম ছবি দেখে। হ্যাঁ, ওর ছবি ছাপা হয়েছিল পৃথিবীর প্রায় সমস্ত খবরের কাগজে।Alan Kurdi দেখানো হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত নিউজ চ্যানেলে। ইন্টার্নেটে। ফেসবুকে। কত সব স্ট্যাটাস ওকে নিয়ে। অথচ কি আশ্চর্য! বিখ্যাত আমার ছেলের জন্য একফোঁটাও গর্ব করতে পারিনি আমি। আসলে ওর এই বিখ্যাত হওয়ার পিছনে বিরাট কোন কীর্তি ছিল না। বিরাট কিছু করতেই পারেনি ছেলেটা। তিনবছর মাত্র বয়স। গোটা জীবন পড়েছিল বিরাট কিছু করার জন্য। পারত হয়ত। হয়ত পারত না। পারত কী পারত না সেটা প্রমাণের কোন সুযোগই পেল না।

আমার ছেলেটা পড়ে ছিল ভূমধ্য সাগরের তীরে। বালির উপর শুয়ে। সমুদ্রে মাথা দিয়ে। আমার ছেলের নাম ছিল আলান কুর্দি।

ফ্রেম ওপেন হয় সমুদ্রের দৃশ্য দিয়ে। দুটো জাহাজ জলের মধ্যে দাঁড়িয়েআর দুটো হেলিকপ্টার পাক খাচ্ছে একটু উপরে। তাদের ডানার ঝাপটা আলোড়ন ফেলছে জলের গায়ে। জলের উপর ভাসছে কালো পোষাক পরা অনেকগুলো মৃতদেহ। ক্যামেরা খুব আস্তে আস্তে জুম করতে থাকে তাদের উপর। ক্রমশ টাইট হতে থাকে শট। জাহাজগুলো আরো কাছে এগিয়ে এসেছে। হেলিকপ্টারগুলো ঠিক যেন মাথার উপর। জলের আলোড়ন খুব স্পষ্ট। শুধু অস্পষ্ট মৃতদেহগুলো, একত্রিত হয়ে, দুলছে জলের ধাক্কায়। একটা বিরাট লাইফবোটের মত নৌকা এগিয়ে আসে তাদের দিকে। একদম পাশে এসে দাঁড়ায়। একজন মানুষ ঝুঁকে পড়ে তাদের উপর। ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসে কথাগুলো। যেন কেউ নিজের ডায়েরি খুলে লিখছে। কথা বলছে নিজের সাথে।সীমান্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর, যেতে যেতে, আমার খালি মনে পড়ছিল পিরেস-এর ঘটনাটার কথা। সমুদ্রে ভেসে যাওয়া এশিয়ান রিফিউজিদের দেহ। গ্রীসের সরকার তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছিল। তাঁদের জেদের কথা মনে পড়ছিল। তাঁদের জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়া, প্রশান্ত মহাসাগরে, যেখানে তারা ধরা পড়ে যায়। মানুষ কী ভাবে চলে যায়? কেন? কোথায় যায়? (দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অফ দ্য স্টর্ক১৯৯১থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস)

আলানের দুর্ভাগ্য ওর অমরত্বকে চিরস্থায়ী করার জন্য কোন অ্যাঞ্জেলোপুলোস আর গ্রীসে নেই। শুধু নিলোফার ডেমির নামের তুরস্কের এক মহিলা ফটোগ্রাফার আলানকে সমুদ্রতীরে পড়ে থাকতে দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। আলানের ছবিটা নিলোফারই তুলেছিলেন। এই অদ্ভুত উৎপাদিত সম্মতি (ম্যানুফ্যাকচার্ড কনসেন্ট)-এর যুগে আলান আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। বোধহয় ক্ষমতা (পাওয়ার)-এর সম্মতি ছাড়াই। মানবতা নামের দুষ্প্রাপ্য বোধ কীভাবে যেন সবাইকে অবাক করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সামান্য বাচিক হয়ে উঠেছিল।

আলান একা মরে যায়নি। আলানের মত আরো অনেকেই মারা গিয়েছিলেন সেই রাত্রেতাঁদের মধ্যে ছিলেন আলানের মা রেহানা, দাদা ঘালিব এবং আরো অনেকে। তাঁদের প্রত্যেকেই পালাচ্ছিলেন ডায়িশ বা আইএসআইএস-এর ভয়ংকর অপশাসনের থেকে। আলানের পরিবার যেতে চেয়েছিলেন ক্যানাডায়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের খোঁজে। তুরস্কের বরদুম শহর থেকে সমুদ্রে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে গ্রিসের কোস আইল্যান্ডে পৌছানো ছিল তাঁদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। তাই মাত্র পাঁচ মিটার লম্বা রবারের ফোলানো একটা নৌকায় পাঁচ হাজার আটশো ষাট ডলার খরচ করে চারজনের জন্য জায়গা কিনে ছিলেন তাঁরা। নৌকাটায় আসলে কষ্টেসৃষ্টে উঠতে পারতেন আট জন। উঠেছিলেন ষোল জন। সিরিয়ার সরকারী মতে বারো জন।

আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল ফেসবুকে। আমার বাল্যবন্ধু। এখন গনিতজ্ঞ। ও নিজেও একজন অভিবাসী। এখন থাকে ফিনল্যান্ডে। শুধু ওর তফাৎ হল ওর অংকের পান্ডিত্য ওকে একটা অন্য তকমা দিয়েছে। যে তকমা সবার ভাগ্যে জোটে না—সেই তকমাটা হল হাইলি স্কিলড মাইগ্র্যান্ট বা অতিদক্ষ অভিবাসীর। ওর জন্য পাশ্চাত্যের কোন দেশের ভিসা পাওয়া তাই অপেক্ষাকৃত সহজ। আমার সাথে কথা বলতে বলতেই ও সিগারেট খেতে গেল। ফিনল্যান্ডে বাড়ির ভিতর সিগারেট খাওয়া যায় না। স্মোক অ্যালার্মে সমস্যা করে। ফিনল্যান্ডের ছোট্ট দিনের পর বরফ পড়া অন্ধকারে বিশ্বরূপ গিয়েছিল বাইরের পোর্টিকোয়। ফিরে এল অনেক পরে। একটা ছোট্ট ঘটনা বলল। বাইরের সিগারেট খাওয়ার সময় জনা চারেকের একটি দল ওর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের প্রত্যেকেই পুরুষ। একজন প্রৌঢ়, একজন তরুণ ও দুই কিশোর। ভাঙা ইংরাজিতে তারা ওকে জিজ্ঞাসা করেছিল ও আরবি জানে কিনা। বাদামী চামড়ার রঙ বোধহয় ওদের ভরসা দিয়েছিল। আমার বন্ধু ওদের নিয়ে গিয়েছিল কাছের তুর্কি খাবারের দোকানে। দোকানের মালিক আরবিতে কথা বলার পর বিশ্বরূপকে জানায় ওরা শরণার্থী। সিরিয়ার। আপাত গন্তব্য ফিনল্যান্ডের ছোট্ট শহর আউলুর একটা শরণার্থী ক্যাম্প। আমার বন্ধুকে ভদ্রলোক অনুরোধ করেন ওঁদের জন্য একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দিতে।

চারজন। এক পরিবার? নাকি আলাদা আলাদা পরিবারের চারজন একক সম্মিলিত হয়েছেন আশ্রয়ের খোঁজে। চারজনই পুরুষ। কোন নারী বা শিশু নেই। এরা কী অ্যাডভান্স পার্টি? নাকি নারী এবং শিশুরা আলাদা কোন এক শরণার্থী ক্যাম্পে? নাকি তাঁরাও আলান কুর্দি আর তাঁর মা রেহানা হয়ে গিয়েছেন? অথবা হয়ত পড়েই আছেন সিরিয়ায়। লেবাননে। ইরাকে। যৌনদাসী। বা হয়ত মৃত।

সেই রাত্রে এইসব কথা অনেকবার ভেবেছিলাম আমি। এই প্রশ্নের আমি কোন উত্তর পাইনি। আমার শুধু মনে পড়েছিল রিফিউজিরা অনেকসময়েই মেয়েদের ফেলে আসেন। মেয়েদের নিয়ে পথচলা বিপদসঙ্কুল। কিংবা মেয়েদের ধর্ষণের জন্য ফেলে এলে হয়ত পালানোর অনুমতি পাওয়া যায়। আরো একটা কথা মনে পড়েছিল বেশ কয়েকটা দশক আগে এই পশ্চিম বাংলারই একটা ঘটনা। পূর্ব বাংলা থেকে আসা রিফিউজিদের নিজেদের তৈরী করা একটা আশ্রয়স্থল গুঁড়িয়ে দিয়েছিল গনতান্ত্রিক দেশের পুলিশ। অর্ধমৃতদের তারা জন্তুর মত ট্রাকে চাপিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল দূর দণ্ডকে

আলান হই চই ফেলেছিল। তারপর হারিয়ে যায় ঘন কুয়াশায়। যে কুয়াশা আর ঘন অন্ধকার ঢেকে দেয় কাঁটাতার, আসল্ট রাইফেল, উর্দি। যেন কুয়াশা এবং ঘন অন্ধকার কখন যেন চলকে পড়ে রাষ্ট্রের নৈতিকতার উঠোনে। সাজানো শহর, কোর্ট, পার্লামেন্ট, ইউনাইটেড নেশানস, পাশপোর্ট, ভিসা কিংবা এইসব কিছুই নেই; শুধু আছে তাঁবু, কয়েকটা কিংবা একটা ডিঙি নৌকা, গাদাগাদি করে লুকিয়ে থাকা জিনিসপত্রের প্যাকিং বাক্সে। জীবন্ত মানুষের মুখ আর মৃতদেহের নিভে যাওয়া চোখ

আলানকে এই অন্ধকার থেকে বার করে নিয়ে এলো শার্লি এবদো। হ্যাঁ সেই শার্লি এবদো, যার অফিস আক্রমণ করেছিল ইসলামী মৌলবাদীরা২০১১ আর ২০১৫ সালে। যে শার্লি এবদো নিয়ে অনেকেই ফেসবুক সাজিয়েছিলেন জে স্যুই শার্লি লিখে। ইসলামী মৌলবাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। বাকস্বাধীনতার স্বপক্ষে।

একটা কার্টুন আঁকল শার্লি এবদো যেমন অনেক আঁকে। ভয়ংকর ব্যাঙ্গাত্মক। ভয়ংকর অস্বস্তিকর। কার্টুনটার এককোণে আঁকা নিথর আলানের সেই পড়ে থাকা সমুদ্রতীরে। আর বাকিটায় দেখা যাচ্ছে আলান বড় হয়ে গিয়েছে। জার্মানিতে সে এখন মহিলাদের তাড়া করে বেড়ায় তাদের নিতম্বস্পর্শ করবে বলে। বাকরুদ্ধ করে দেওয়া কার্টুন। রাগিয়ে দেওয়া কার্টুন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো শার্লি এবদো কিন্তু এক ধর্মনিরপেক্ষ, নিরীশ্বরবাদী, অতিবামপন্থী এবং আন্যার্কিস্ট পত্রিকা। যাঁরা বর্ণবিদ্বেষের বিপক্ষে। শার্লি এবদো আসলে আক্রমণ করেছিল ইয়োরোপের দক্ষিণপন্থীদের। যাঁদের অনেকের বক্তব্য এমনটাই। এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিলে তারা দেশটাকে ধ্বংস করে দেবে। এদের মধ্যে অনেকেই লুকোনো জঙ্গি। কিংবা এরাই বড় হয়ে ক্রিমিনাল হবে। কারণ ইসলাম ক্রিমিনালদের ধর্ম।Hebdo

আলান স্তব্ধ পড়ে থাকা হয়ে উঠল একটা অদ্ভুত প্রতি-আক্রমণের পদ্ধতি। একটা ব্যাঙ্গ। সামান্য একটা ব্যাঙ্গ। সেটা যতই চাবুকের মত হোক না কেন। কার্টুনটা আরো ভালো করে দেখলে দেখা যাবে এটা যে কোন ইয়োরোপিয়ানের ভিউপয়েন্টের মত করে কিন্তু আঁকা নয়। আঁকা সোজাসুজি। অবজেক্টিভ প্রেজেন্টেশন। অনেকে বলবেন শার্লি এবদো-র রাজনীতি বুঝলে বোঝা যাবে যে এটা আসলে ভীষণ সাবজেক্টিভ। এটা যেন আসলে একটা আয়না। যে আয়নায় পাঠক দেখবেন নিজের কদর্যতাকে।

নো গ্রেট মুভমেন্ট ডিজাইন্ড টু চেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড ক্যান বিয়ার টু বি লাফড অ্যাট অর বিলিটিলড। মকারি ইজ আ রাস্ট দ্যাট করোডোস অল ইটস টাচেস। লিখেছিলেন মিলান কুন্দেরা। শার্লি এবদো-র অবস্থানটা আরো অদ্ভুত। অবস্থানের দিক থেকে ঠিক, অথচ ব্যাঙ্গ করতে গিয়ে নিজেই যেন নিজের অবস্থানকে ধ্বংস করে ফেলল। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আরো বেশি বর্ণবিদ্বেষ ব্যবহার করে করে ব্যাপারটাকে এত লঘু করে ফেলা যাতে বিষয়টা তুচ্ছ হয়ে ওঠে। কিন্তু শার্লি এবদো-র এই বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী বর্ণবিদ্বেষ ইয়োরোপীয় রাজনীতির বর্তমান আবর্তে আসলে হাত শক্ত করল অতি-দক্ষিণপন্থীদেরকেই। কারণ অতি-দক্ষিণপন্থা আসলে এতই নিরেট যে কোন সূক্ষ্ম জিনিস বোঝা সম্ভব নয়। অথবা হয়ত নিরেট, অসংবেদনশীল এবং মূর্খনা হলে অতি-দক্ষিণপন্থী হওয়া যায় না। শার্লি এবদো আসলে আঘাত করে বসল মানবতাবাদীদের, সংবেদনশীলদের। যাঁদের লড়াই এই মুহূর্তে প্রায় পরাজিত।

ইয়োরোপের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটাকে একটু তুলে ধরা যাক। হাঙ্গেরি, যা সিরিয়ান রিফিউজিদের ইয়োরোপে ঢোকার মূল পথ, সেখানকার দক্ষিণ-মধ্যপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিকটর ওরবান শরণার্থীদের আটকাতে সীমান্তে ক্ষুরধার বেড়া দেওয়ার কথা বলছেন। ডেনমার্ক, গোটা পৃথিবীতে ওয়েলফেয়ার স্টেটের অন্যতম প্রতিভূ সেই দেশে শরণার্থীদের আসা বন্ধ করতে ভয়াবহ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন ডেনমার্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে শরণার্থীদের কাছ থেকে মোট চোদ্দোশো পঞ্চাশ ডলার অর্থমূল্যের বেশি যে কোন দামি জিনিস কেড়ে নেওয়া হবে। তাঁদের থাকার খরচ হিসাবে। এই হিসাবের বাইরে অবশ্য শরণার্থীদের খুব ব্যক্তিগত কিছু সামগ্রী যেমন তাঁদের বিয়ের আংটি। কিন্তু এই অমানবিক আইন সম্ভবত জানুয়ারির ২৬ তারিখে পাশ হতে চলেছে। প্রসঙ্গত বলা চলে যে হিটলারের নাজি জার্মানিতে ঠিক একইভাবে জিউদের থেকে সমস্ত দামী জিনিস কেড়ে নেওয়া হত। তাদের থাকার খরচ হিসাবেইডেনমার্ক শরণার্থীদের ভয় দেখাতে বিজ্ঞাপনও শুরু করেছে—যেখানে দেখানো হচ্ছে যে ডেনমার্ক শরণার্থীদের জন্য আসলে কতটা খারাপ একটা দেশএমনকী রিফিউজিদের আসা ঠেকাতে জার্মানির সঙ্গে ট্রে যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছেইয়োরোপের আরো নানা দেশও এই ধরণের নানা পদক্ষেপ শুরু করেছে। এমনকী জার্মানি যার চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এখনও অবধি শরণার্থীদের জন্য একমাত্র আশার আলো, সেখানেও দক্ষিণের কিছু রাজ্যে এইভাবে রিফিউজিদের জিনিস আত্মসাৎ করছে সরকার। যেমন বাভেরিয়ায় পুলিশ মোট সাড়ে সাতশো ইউরো (আটশো দশ মার্কিন ডলার)-এর অর্থমূল্যের জিনিস বাজেয়াপ্ত করছে। বাডেন-হুর্তেমবার্গে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির হিসাবটা আরো দৃষ্টিকটু রকমভাবে কম—সাড়ে তিনশো ইউরো (তিনশো আটাত্তর মার্কিন ডলার)

আর, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের মূল প্রবক্তা, মুসলমানদের মেসিহা সৌদি আরব, ইউনাইটেড আরব এমিরেটস, কাতার, বাহারিন, কুয়েত। তারা এখন অবধি একজন শরণার্থীকেও দেশে ঢুকতে দেয়নি। আর এদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, তথা গণতন্ত্র রফতানির মূল স্তম্ভ আমেরিকা? তার সিদ্ধান্তও একই রকম। অনেক রাজনৈতিক চাপের পর আমেরিকা ২০১৬ সালে দশ হাজার মানুষকে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। আর ব্রিটেন? সেও অনেক ওজর আপত্তি করে শেষ পর্যন্ত মোটে এক হাজার জনকে আশ্রয় দিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধার করে দিচ্ছে।

অথচ এই দুটো দেশই ইরাকে, লিবিয়ায়, সিরিয়ায় গণতন্ত্র রফতানির নামে, মানবাধিকার ও ভুয়ো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের জিকির তুলে ধর্মনিরপেক্ষ এবং অনেক দিক থেকেই সমাজতান্ত্রিক ওয়েলফেলার স্টেটের প্রবক্তা সরকারদের যুদ্ধ করে উৎখাত করেছিল। একই যুক্তি দিয়ে যুদ্ধহীন কৌশলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকায় মৌলবাদী ইসলামী শক্তিদের শক্তি জোগাচ্ছিল। এদের ভয়াবহ যুদ্ধকৌশল এবং ভ্রান্তনীতিরই ফল দায়িশ বা আইএসআইএস। এমনকী কারুর কারুর মতে আইএসআইএস এদের এবং ইজরায়েলের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেরই অঙ্গ। আইএসআইএস-এর মূল উদ্দেশ্য আল-কায়দার পালটা একটা ইসলামী মৌলবাদ তৈরী করে তাকে প্রতিহত করা। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পালটা একটি ইসলামী শক্তি তৈরী করা—তা ভয়াবহ হলেও অনেকদিন থেকেই নাকি ইজরায়েলের অভীষ্ট। এমনকি ইজরায়েলই যে আইএসআইএস অধিকৃত অঞ্চলে আহৃত তেলের মূল ক্রেতা—এই খবরও প্রধান সারির মিডিয়ার বাইরে খুব সন্তর্পণে আলোচিত হয়েছে। অস্ত্রের কারবারীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। দায়িশ-এর এত অস্ত্রের সরবরাহকারী কারা সেই আলোচনা কোথাও নেই। থাকে না কখনই।

শুধু মাঝে এই অজস্র মানুষের ঢল। যাঁরা প্রাণের ভয়ে দেশ ছাড়ছেন। অথচ তাদের কোথাও যাওয়ার নেই। একমাত্র পথ আবার নিজের দেশে ফিরে গিয়ে মৃত্যু ও ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন হওয়া। মানবাধিকার নামক একটা বস্তু যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিল আবর্তে কোথাও যেন আবার কুয়াশায়, অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে। এত মানুষ কেন এল? কোথায় যাবে? কীভাবে যাবে? খাবে কী? শেষ পর্যন্ত থাকবে কোথায়!

মা খুব ভয় পাচ্ছিল। মা চায়নি সমুদ্র দিয়ে যেতে। আমি মাকে আঁকড়ে ধরে বসেছিলাম প্লাস্টিকের ভেলায়। গাদাগাদি আমরা অনেকজন। ভেলাটা ডুবে যাচ্ছিল। মা, আমি ডুবে যাচ্ছি মা। জলটা ভীষণ ঠান্ডা। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। নাক দিয়ে জল ঢুকে যাচ্ছে মা। মুখ দিয়ে। জ্বালা করছে সব কিছু। বুকে প্রচন্ড চাপ। মা। আমাকে বাঁচাও মা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা। শীত করছে। মা আমি একটু শোব। একটা গরম বিছানায়। মা আমার একটা গরম চাদর খুব দরকার। মাসব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে মা। সব কিছুই কুয়াশা।

তারপর আকাশ তাকে উষ্ণ একটা চাদর দিয়েছিল। বালি দিয়েছিল নরম বিছানা। আর সমুদ্র বিলি কেটে দিয়েছিল চুলে। ছেলেটা ডুবে গিয়েছিল।

আমার ছেলের নাম আলান কুর্দি নয়। ওটা রাজনীতি। ওটা শিল্পকৌশলশুধুই শিল্প। নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যমমাত্র। ঢ্যামনামো।

 
 
top