ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

শ্মশ্রুবান চতুষ্পদীদের প্রতি কাঙালের বরাবরের আকর্ষণ। সুপক্ব নিরেট মাংসখণ্ড উবু হয়ে আছে জিরে-লঙ্কা জারিত নিরামিষি রক্তবর্ণ শুরুয়ায়, ভগ্ন অস্থি বিঁধে আছে মাংসের মাঝবরাবর, মজ্জা সিঁটিয়ে আছে অস্থিগহ্বরে—সেটি ফুঁকে দিতে আর দেরি নেই, আশেপাশে সুসিদ্ধ আলুর ফালি আকণ্ঠ তেল-ঝোল-মশলা টেনে চিত হয়ে আছেএ কাঙালের অতিপ্রিয় দৃশ্যকল্প সুরাবর্দির আমলে ইয়ার ভুটুং সেনের পাল্লায় পড়ে চাচার হোটেলে এক-দু-বার রামপাখির টেংরি কড়মড়িয়েছেন তিনি, তবে সেরকম জুত হয়নি, পর্ণভোজী ছাগবৎস্যের তুলনায় ও জিনিস ফাঁকি বলে বোধ হয়েছে। সেকালে রাজা রামমোহন আস্ত চতুষ্পদ সাবাড় করে দিতে পারতেন একক কৃতিত্বেকাঙালচরণ অতটা না-পেরে উঠলেও বারো আনা তো হতই হত। অবিশ্যি নিজগৃহে সে মওকা পাননি কখনও, মুখুটি বাড়িতে চারপেয়ে রান্না হত তিথিনক্ষত্র-দিনক্ষণ দেখে একমাত্র দেবীমায়ের কাছে উৎসর্গ করা পাঁঠার মাংসের প্রসাদ ছাড়া ওদের বাড়িতে রেয়াজি ইত্যাদির রেওয়াজ ছিল না। আর সেই প্রসাদে ভাগ বসাত অনেকে, জ্ঞাতিগুষ্টি ছিল, কাঙালচরণের পিতৃদেব বাউলচরণও ছিলেন খানেওয়ালা পুরুষ। পিতৃদেবের সঙ্গে মাংসের পুরুষ্টু খণ্ডটির দখল নেওয়া নিয়ে মন কষাকষি ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। বাপ-ব্যাটাতে পাল্লা দিয়েই খাওয়া চলত। বাউলচরণের দাঁতের সেরকম সমাহার ছিল না, বাল্যকালের বদঅভ্যাসের কারণে যুবা বয়সেই ওসব খুইয়েছিলেন, মাংসের দফারফা করার মতো অবস্থা ছিল না। তা সত্ত্বেও সেরেফ মনের জোরে তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যেতেন। বলা বাহুল্য এতে শহিদ হতেন কাঙালের মা, ঘোলা ক্বাথ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না ওঁর পাতে।

হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইচ্ছেপূর্তির সঙ্গতি ছিল না, তবে মাংসাদিসেবনের একটি জায়গা ছিল সামাজিক অনুষ্ঠানাদি—বিবাহবাসর, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন। একনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ,ওসব অনুষ্ঠানে কখনও মাংস ভক্ষণ করতেন না বাউলচরণ। আর ওসবই ছিল কাঙালের আক্ষেপ-নিবৃত্তির জায়গা। ভুটুং সেনের বোনের বিয়েতে কনেযাত্রী গিয়ে এক কাণ্ড বাধিয়েছিলেন জয়নগরে, মাংস-মিষ্টি তলানি করে ছেড়েছিলেন, শেষে পাত্রপক্ষকে নতুন করে রান্নার আয়োজন করতে হয়। খাবার ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিতান্তই অপরিণামদর্শী, সময়াসময়ে ক্ষুদ্রান্ত্র-বৃহদন্ত্রের বিক্ষোভ বিদ্রোহেও তিনি অনুতাপদগ্ধ হতেন না।

এখন তো আরোই ওসব নিয়ে ভাবেন না। ক্ষুধার মতো জৈবিক চাদিহা তাঁর এখনও আছে, সেবন করতে পারেন মর্জিমাফিক কিন্তু সেই খাদ্য সংশ্লেষ করার কোনো দায় তাঁর আজ নেই, জীবত্কালের সেই গুরুদায়িত্ব থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। আজ ময়দানের এক কোণে একটি ছাগশিশুর দিকে তাকিয়ে সেই ক্ষুধা নামক জৈবিক চাহিদাটি চাগাড় দিয়ে উঠল। ময়দানের চতুর্পাশে চক্কর কেটে পশ্চিম কোণের পাকুড়গাছে বসেছিলেন কাঙালচরণ। সন্ধে হয়েছে, আঁধার এখনো কাঁচা, ময়দানের লতাগুল্মে অ্যাতোক্ষণ লজ্জানিবারণ করে থাকা কপোত-কপোতীরা এখন ঘরে ফিরছে। পংখিরাও ফিরেছে নিজেদের আস্তানায় কিন্তু ছাগলছানাটি বোধহয় দিক ভুল করেছে। খয়েরি-কালোর সংমিশ্রন, মাথায় পুঁটুলি পাকানো উঠতি শিঙ, চালচলনে তিড়িংবিড়িং ভাব, অনবরত সে কলরব করে চলেছে। কাঙালচরণ মনে মনে সেই প্রিয় দৃশ্যকল্পের অবতারণা করছিলেন, কতকাল যে সেসব চাখা হয়নি! পিতৃদেব গত হবার পর তো আমিষের পাট উঠেই গিয়েছিল বাড়িতে, অনুষ্ঠানবাড়িতে নেমন্তন্নও আর জুটত না। ফৌত হয়ে যাবার দিনকয়েক আগে শ্যামবাজারে কষা মাংস আর পরোটা সাঁটিয়েছিলেন, সেই ঢেঁকুর এখনো রাখা আছে। কাঙালচরণ আর কালবিলম্ব না-করে সড়সড় করে নেমে এলেন গাছ থেকে, শিকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘাড়টা চেপে ধরলেন, তারপর বেছে বেছে কিছু পোক্ত দাঁত সোজা বসিয়ে দিলেন ছাগলের গর্দানে। একটা দাঁত একটু বেকায়দায় ছেতরে গেলেও ওই অভিঘাতেই কাজ হল। খানিকক্ষণ ছটফট করার পর বাছার পঞ্চত্ব-প্রাপ্তি হল।

 

দিনক্ষণ যে একটু গণ্ডগোল হয়েছে, গাবগাছে ঝুলন্ত সেই পুশকরার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলেন ত্রৈলঙ্গ রায়। গেঁড়েগিরিধারীর পুকুড়পাড়ে স্বয়ংবর সভার নামগন্ধ না পেয়ে সটান ময়দানে হাজির হয়েছিলেন। ময়দানেও একটা সভার তোড়জোড় হচ্ছে, পশ্চিম কোণের পাকুড় গাছটার কাছে একটা পেল্লাই ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে, সামনে পাকা বাঁশের ব্যারিকেড, দিকবিদিক ঝান্ডা লাগানো। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে আগামীকালই জনসভা, ত্রৈলঙ্গের খুব ইচ্ছে হল কালকের সভায় থাকবেন। কোথায় কোন্ দীঘলগাঁ থেকে মেও বাঁড়ুজ্জ্যে, নিশান চাটুজ্জ্যে, এঙ্গেল মিশ্ররা ঝান্ডা কাঁধে কত প্রকাশ্য জনসভা জমিয়ে দিয়ে গিয়েছে, আর তিনি মহানগরীতে ঝাড়া হাত-পা হয়ে কাটিয়েছেন অ্যাতোদিনঅথচ কখনও কোনও জনসভায় পা দেননি, ইডেনে টেস্ট ম্যাচ দেখেননি, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের দ্বৈরথ দেখেননিত্রৈলঙ্গের বেশ আফশোস হল আজ। দু-একটা ঝান্ডা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, ত্রৈলঙ্গ সেগুলো যথাস্থানে গুঁজে দিলেন। ত্রৈলঙ্গ কান্ট-হেগেল-ফয়েরবাখ-মার্ক্স পড়েছেন কিঞ্চিৎ, ছাত্র-রাজনীতি করেছেন অল্পবিস্তর, ছোটোবেলায় বাবা-কাকাদের ঝান্ডা হাতে দেখেছেন আর তিনি নিজে এই সেদিন মেও বাঁড়ুজ্জ্যের খপ্পরে পড়ে জোতদারদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করার প্রয়াস করেছেনবামপন্থার প্রতি তাঁর আলাদা অনুভূতি আছে। ওঁর মতো আরো অনেক অশরীরীই আছে, এখানে সংগঠন আগের মতোই দুর্ধর্ষ এখনওকরিত্কর্মা নেতা আর ভ্যানগার্ডের দল সব তো এখানেই, একটু হাঁকডাক করলেই হাজার হাজার প্রেত হাজির করানো যায় যে-কোনো জনসভায়। এসব সাত-সতেরো ভাবনার মধ্যেই সেই আওয়াজটা পেলেন ত্রৈলঙ্গ, ধস্তাধ্বস্তি না বলে ছটফটানি বলা ভালোসঙ্গে ম্যাঁ ম্যাঁ বলে আর্তচিৎকারনির্ঘাত পাকুড়গাছটার পাশের ঝোপ থেকে আসছে। ত্রৈলঙ্গ আগুয়ান হলেন।

এক বৃদ্ধ প্রেত, প্রখর ক্যানাইন দন্তদুটিতে টাটকা রক্ত, ওষ্ঠ অধর স্কারলেট রেড-এ রঞ্জিত। একখানা কচি ছাগল ছিন্নমুণ্ড হয়ে পড়ে আছেত্রৈলঙ্গ রায় একটু হকচকিয়ে গেলেন।

নিজের কীর্তির কথা লোকসমক্ষে ফাঁস হয়ে যেতে কাঙালচরণও যেন ব্রীড়াবনত হয়ে গেলেন। বললেন, সলে অ্যাতো লোভ হলোওই জীবনে পাঁটা খেতে ভালোবাসতাম খুব। বেশি জোগাড় হত নাকালীপুজো, দুর্গাপুজো আর কপাল ভালো থাকলে কটা অনুষ্ঠান বাড়িতে। চাকরিজীবনেও সেরকম পাইনি! তুমি কিছু মনে করো না, বাছা, রোজ রোজ আমি এই রকম করি নে কাঙালচরণ ত্রৈলঙ্গের নির্বাক অবস্থা দেখে কাঁচুমাচু হয়ে বললেন।

ত্রৈলঙ্গের অবিশ্যি কাঙালচরণের উপর রাগ হয়নি মোটেই, জলজ্যান্ত ছাগশিশুর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছে বলে দুঃখও হয়নি। তিনি বেজায় অবাক হয়েছেন। গতজীবনে ভূতেদের ঘাড় মটকে রক্ত খাবার গল্প অনেক শুনেছিলেনপরজীবনে যাদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশেছেন তাঁদের কখনো এই রকম পৈশাচিক কাণ্ড করতে দেখেননি, অবাক হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া অকালমৃত সেই ছাগবৎসটিকে দেখে তাঁর কীরিটীশ্বরের কথা মনে পড়ে গিয়েছে।

না আসলে, ইয়ে—কাঁচা খেয়ে পোষাল? মুখ দিয়ে এই কথাটাই বেরিয়ে গিয়েছে ত্রৈলঙ্গের।

খুব কাঁচাকাঁচা লাগে, সেরকম সোয়াদ কই? তারপর এটাকে মনে হলো গুচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলঅ্যাজিথ্রোমাইসিনের সোয়াদ পেলাম মনে হল। তুমি খাবে বাবা? এটা এঁটো হয়ে গিয়েচে, আনকোরা ধরে দেব দু-একখানি? ছাগল পাওয়া মুশকিল, সব খেদিয়ে খোঁয়াড়ে ঢুকিয়েচে। পাখি, পাখি চলবে? বললেন কাঙালচরণ, ত্রৈলঙ্গের সহজ আচরণ দেখে একটু যেন সোয়াস্তি বোধ করলেন।

না থাক কাঙালচরণের উৎসাহে জল ঢেলে বললেন ত্রৈলঙ্গ রায়। বেশ কিছু বছর আগের নবমীর সেই রাতটার কথা মনে পড়ে গেল ওঁর।

সেদিন দুপুরে ইতিহাস হয়ে যাওয়া শ্রীমান কীরিটীশ্বরের তৈলভৃষ্ট রাং পিস-টি কচক করতে করতে ত্রৈলঙ্গ রায় দুর্গাদালানে এসে বসলেন। নবমীর কালসন্ধেয় দুর্গাদালানের দাওয়ায় মেলা ভিড়, পেল্লাই শতরঞ্চিটা মন খুলে ফুটিয়ে পাতা হয়েছে। দীঘলগাঁয়ে ফিবছর ফাগুনমাসে যে যাত্রাপালা হয়, তারই পার্ট ভাগাভাগি চলছে, আদিম রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে রামবন্ধু রায়ের উপর, নায়কের পার্টখানা তাঁর চাই-ই চাই। ওদিকে সিতিকণ্ঠ রায় খলনায়কের পার্টখানা বাগানোর চেষ্টায় অনেকক্ষণ থেকেই রামবন্ধুর কানে ফিসফিস করে চলেছেন। রামবন্ধু রায় যথাসম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখে ভাগ-বাঁটোয়ারা করছেন, প্রতিবছরই এই কাজটি করে থাকেন তিনি, তিনিই সব যাত্রাপালার সর্বসম্মত কাস্টিং ডিরেক্টর।

কচকচ। কচকচ। ত্রৈলঙ্গের অকালজরায় জর্জরিত দাঁত ঠিক জুত করে উঠতে পারছে না কীরিটীশ্বরকে। দুর্গাদালানের একটা কোণে বসে কীরিটীশ্বরের উপর বেজায় অভিমান হচ্ছে ত্রৈলঙ্গের। আজ নবমীর দুপুরে সিতিকণ্ঠ রায়ের খাঁড়ার এক কোপে নিকেশ হয়েছে ব্যাটা, তারপর ভ্যাঁচা বাউরির কাটারির কোপে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ত্রৈলঙ্গদের সাবেকি কড়াইতে গিয়ে জমা হয়েছে। সন্ধে থেকেই নিরন্তর খুন্তির খোঁচা দিয়ে কীরিটীশ্বরকে বাগ মানানোর চেষ্টা করছেন ত্রৈলঙ্গের মা ইচ্ছাময়ী, পিঁড়িটিঁড়ি ছেড়ে প্রায় হাঁটু গেড়ে গনগনে আঁচের সামনে বসে পড়েছেন। ত্রৈলঙ্গ কোন ফাঁকে কীরিটীশ্বরের একখণ্ড ম্যানেজ করে দুর্গাদালানে এসে বসেছেন। কিন্তু তখন থেকে পিণ্ডটি ত্রৈলঙ্গের দু-গালের আনাচেকানাচেই খালি চরকিপাক খাচ্ছেসুবিধে করা যাচ্ছে না কিছুতেই। কীরিটীশ্বরটা এভাবে ডোবাবে স্বপ্নেও ভাবা যায়নি! গতবছর ফাগুন মাস থেকে নিরন্তর পরিচর্যা চলছে, ত্রৈলঙ্গের মা-ঠাকুমা কীরিটীশ্বরের খিদমতে জান লড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকী কোনো কোনো সপ্তান্তে ত্রৈলঙ্গ নিজে ব্যাটাচ্ছেলেকে দিগম্বরীর মাঠে চরিয়ে এনেছেন, মহানগরীর একটি বনেদি দোকান থেকে মার্কিন পশু-খাদ্য অব্দি কিনে খাইয়েছেন। অ্যাতো তোয়াজের ফলও পাচ্ছিলেন হাতে হাতে, বেশ তাগড়াই চেহারাখানা হচ্ছিল কীরিটীশ্বরেরঘোর কজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, কপালে একফালি শ্বেততিলক, আষাঢ় মাসের জলগর্ভ মেঘের মতো আঁখি, ঘণ্টাকর্ণ গাছের পাতার মতো সুদৃশ্য কর্ণলতিকা, ঈষ বঙ্কিম নিকষিত শিং।

কিন্তু অ্যাতো আদরযত্ন সত্ত্বেও কোথা থেকে যে বিতিকিচ্ছিরি এক ব্যাধি জোটাল কীরিটীশ্বরটা! জীবনের শেষ কয়েকটা দিন এমন ভয়ানক দাস্তে পীড়িত হল, অনবরত পায়ুস্খলন করে করে এমন কাহিল হয়ে পড়ল। আর তারই জেরে হাড়মাস এমন ছিবড়েপানা হয়ে গেল!

খবরটা এখখুনি বাবাকে দেওয়া উচিত কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না ত্রৈলঙ্গ রায়।

বাবা, তোমার বাক্যিই সত্য, কীরিটীশ্বরটা পথে বসিয়েছে ত্রৈলঙ্গের ইচ্ছে করল বাবার কানের কাছে গিয়ে দুম করে ব্রেকিং নিউজটা দেওয়ার। বাবা নিশ্চয় শুনেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠবেন!

নিশ্চয় চেঁচিয়ে বলে উঠবেন,ল তো শান্তি, শান্তি হল তো! তখনই আমি পই পই করে বলেছিলাম, ওই মুক্তগুহ্যটাকে রেহাই দে, রেহাই দে। আরেকখানা নাদাপেটা দেখে নিয়ে আয় দোমহানির হাট থেকে! শুনলি না তো আমার কথা! সত্যি, ত্রৈলঙ্গের বাবা পই পই করে বলেছিলেন। ভদ্রলোক চাকরি করতেন স্বাস্থ্যদপ্তরে, দাস্ত যে কী বিষম বস্তু তাঁর চেয়ে ভালো আর কারো জানার কথা নয়। দাস্ত একটা আস্ত ব্লটিং কাগজ, রসকষ সব চুষে ছিবড়ে করে দেয়। ত্রৈলঙ্গের বাবা বারবার বলেছিলেন। নতুন একখানা পাঁঠা কিনে আনাবার কথা বলেছিলেন বারবার। কিন্তু বাধ সেধেছিলেন স্বয়ং ত্রৈলঙ্গের মা।

মায়ের চরণে অর্পণ করব বলে ওকে সেই কচি বয়স থেকে মানুষ করেছি আমি, মায়ের খাঁড়ার কোপে গর্দান গেলে তবেই ওর মোক্ষ। তোমার রসনাতৃপ্তির জন্য তো ওকে সেই মোক্ষ থেকে বঞ্চিত করা যায় না! ইচ্ছাময়ী দেবী খেঁকিয়ে উঠেছিলেন।

তোমাদের তো একটা পাঁটা-ছাগল হলেই চলে, শয্যাশায়ীটাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া কেনরামবন্ধু রায় বলতে গিয়েও বলেননি। কীরিটীশ্বরের উপর হক তাঁর চেয়ে তাঁর সহধর্মিনী ইচ্ছাময়ীর অনেক বেশি, কীরিটীশ্বরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফয়সালা করার হকও ইচ্ছাময়ীর একচ্ছত্র। ছানাবেলা থেকে কীরিটীশ্বরকে পরমযত্ন সহকারে মানুষ করেছেন ইচ্ছাময়ী, এন্তার অশ্বত্থপাতা-কাঁঠালপাতা খাইয়েছেন, শীতের হাত থেকে বাঁচাতে বস্তা দিয়ে র‍্যাপার বানিয়ে দিয়েছেন।

কচকচ। উফ। কীরিটীশ্বরকে দাঁতে ঘায়েল না করতে পেরে ত্রৈলঙ্গ শেষমেশ গিলেই ফেললেন। আপাতত খবরটাও চেপে গেলেন তাঁর বাবার কাছে। আদিম রায়কে মন দিয়ে পার্ট বোঝাচ্ছেন তাঁর বাবা, কৃষ্ণকান্তের উইল পালায় গোবিন্দলাল আর কৃষ্ণকান্তের কঠিন দৃশ্য।

ত্রৈলঙ্গ এককোণে বসে আগ্রহভরে এসব দেখছিলেন। এদিকে আটটা বাজতে চলল, আসর ইতিমধ্যেই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। মহড়া সেরকম জমছে না। সিতিকণ্ঠের ছেলে দশমিক এসেছে মাংসের ঝোলের বার্তা নিয়ে, কালীশংকরকে তো আগেই ডেকে নিয়ে গিয়েছেন ওঁর মা। ভবভূতি, আদিম রায়রা অনেকক্ষণ থেকেই উসখুস করছে ঝোল বোধহয় জুড়িয়ে গেল। নবমীর নিশি বড়ো মহার্ঘ গাঁয়ের মানুষের কাছে, বড়ো আয়েশের দিন, মহাফিস্টির দিন। আজকের রাতটা কাটলে আবার সেই মাঘমাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, সেই কোন পয়লা মাঘ মা জয়চণ্ডীর পুজো, আবার সেই ঘুঁটগাছের তলায় কতগুলো ছাগবত্স্যকে জয়চণ্ডী মায়ের নামে উচ্ছুগ্‌গু করা হবে। সমবছরে এই দুটো মাত্তর তো হাড়মাস নিয়ে কারিকুরি করার দিন। রামপাখি বামুন-গেরস্ত বাড়িতে ঢোকে না, কদাচি ঢুকলেও বাড়ির জেনানারা সে সোয়াদে বঞ্চিত। হাঁসটা সর্বলিঙ্গভোজ্য, কিন্তু শৃঙ্গবান ইঞ্চিপুচ্ছ চারপেয়ের ফ্লেভারের কাছে কোথায় লাগে! আগে কাছিম পাওয়া যেত বিস্তর, নরম মেদিনীর আঁচলের তলায় ঘাপটি মেরে থাকত। ত্রৈলঙ্গের ছেলেবেলা অব্দি তাদের হদিশ মিলত, এখন আর টিকিটি মেলে না।

ত্রৈলঙ্গ আর রামবন্ধু উঠলেন সবার শেষে। নবমীর এই সন্ধেয় ভালোই জমায়েত হয় দুর্গাদালানে, মায়ের প্রসাদী গলাঃধকরণ করার প্রতীক্ষাটা যাত্রাথিয়েটারের আলোচনা করতে করতে করলে সময়টা তাড়াতাড়ি কেটে যায়, ততক্ষণে হাড়মাস সেদ্ধও হয় ভালো। পুজো সমাপ্তির পর থেকে অবিশ্যি সেরকম কারো আর টিকিও দেখা যাবে না দুর্গাদালানে, মহড়া টহড়া সব মাথায় উঠে যাবে। আবার যাত্রার কয়েকদিন আগে সব জড়ো হবে, রমরমিয়ে রিহার্সাল চলবে। এইভাবেই চলছে।

হ্যাঁরে ত্রৈলঙ্গ, সবার বাড়ি থেকে নৈশভোজের তাড়া এল, আমাদের তো কেউ ডাক দিল না একবারও রামবন্ধু রায় বলে উঠলেন। ত্রৈলঙ্গ আর থাকতে না-পেরে বলেই দিলেন কীরিটীশ্বরের কেরামতির কথা। মহড়া অর্ধসমাপ্ত রয়ে গেল বলে মেজাজটা এমনিতেই খিঁচড়ে ছিল রামবন্ধুর, তার ওপর কীরিটীশ্বরের ছিবড়ে মাংসের কাহিনি শুনে তিনি ভয়ানক চটে গেলেন।

তারপর যা হল, ভাবলে এখন কৌতুক হয় ত্রৈলঙ্গের। ওফ্, ক্রান্তিকাল ছিল সেসব।

রামবন্ধু সপাটে ইচ্ছাময়ীকে বলে দিলেন, ই ডায়রিয়ায় ভোগা পাঁটার ছিবড়ে মাংসও আমাদের রুচবে না!

ইচ্ছাময়ী হতভম্ব হয়ে গেলেন।

কথা তুমি বলতে পারলে? ও কি সেরেফ মাংস তোমার কাছে?

মাংসই তো, মাংসকে মাংস বললাম বাবাকে অ্যাতোটা মরিয়া কখনও দেখেননি ত্রৈলঙ্গ।

ছিঃ ছিঃ! এই বয়েসেও অ্যাতো ভোগবিলাস তোমার!

ভোগবিলাস! বলি ভোগবিলাসটা দেখলে কোথায়? জীবনে সুরা-গঞ্জিকা-খৈনি-গুড়াকু কোনোদিন স্পর্শ করিনিদিনে একখানা সিগ্রেট খেতাম, লুঙ্গু বড়ো হবার পর তাও ছেড়ে দিয়েছি! আর বলির পাঁটার মাংস ছাড়া তো কোনোদিন কিছু দাঁতে কেটেছি বলে মনে পড়ে না। তাও তো বছরে মাত্তর দু-বারএকবার দুর্গাপুজোর নবমীতে আর একবার জয়চণ্ডী মায়ের পুজোয় মাঘমাসে

তা বারোমাসই যদি তোমার রামপাখি গেলবার অ্যাতো ইচ্ছে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে গিলে এলেই পারো!

বার থেকে তাই গিলতে হবে দেখছিগঞ্জে নতুন একখানা রেস্টুরেন্ট খুলেছেবাপব্যাটাতে মিলে সেখেনেই চলে যাব একদিন। কীরে লুঙ্গু? নিয়ে যাবি তো আমায়?

হ্যাঁ, তাই যাও,সেখানেই যাও। কিন্তু দয়া করে মায়ের প্রসাদীকে মাংস বোলো না কখনোওতে পাপ হয়

য় হোক! চিঁড়ে-কলা-বাতাসাকে চিঁড়ে-কলা-বাতাসা বললে যদি পাপ না-হয়, মাংসকে মাংস বললেও কোনো পাপ হবে না! অ্যাই লুঙ্গু,তোর বড়োমামাকে একটা ফোন কর!

মার দাদাকে ফোন করে কী হবেলুঙ্গুর মায়ের জিজ্ঞাসা।

কটু আগেই তোমার দাদা আমায় ফোন করেছিল,বলছিল তোমার বাপের বাড়িতে নাকি জম্পেশ একটা পাঁটা বলিদান হয়েছে এইবার! খুব করে বলছিল যাবার জন্যআমি বলেছিলাম এদিককার পরিস্থিতি দেখে জানাচ্ছি। পার্ট ভাগ করার চক্করে ভুলেই গিয়েছিলাম কথাটা! লুঙ্গু, ব্যাটা, চলসাইকেলটা বের কর। এই তো দু-মিনিটের পথতার আগে অবিশ্যি ফোন করে তোর বড়োমামিকে আমাদের আগমনবার্তাটা দিয়ে দে!

ব্যস, বাপ ব্যাটাতে এরপর বেরিয়ে পড়েছিলেন ত্রৈলঙ্গের মামার বাড়ি। সে যাত্রায় আর ছিবড়ে মাংস নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া করতে হয়নি!

কী হে, হাসচ কেন? আমার কাণ্ড দেখে হাসচ নাকি বাছা? স্বীকার করচি, এই বয়েসে এসে কাজটি বেজায় ছেলেমানুষি হয়েচেত্রৈলঙ্গকে আপন মনে হাসতে দেখে জিগ্যেস করলেন কাঙালচরণ। এরই ফাঁকে সামনের একটা খাল থেকে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে এসেছেন তিনি, প্রম্লোচ্চাকুমারীর নামে শপথ করেছেন কাঁচা আর খাবেন না।

ত্রৈলঙ্গ মুখচোরা ভাবুক লোক, সহজে প্রাণ খুলতে পারেন না। ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগে তাঁর। কিন্তু এই বৃদ্ধ প্রেতটির সঙ্গে বাক্যালাপ করে ভালো লাগছে বেশ। উচ্চারণে আলাদাই একটা কেতা আছে বুড়োর, মজলিশি মেজাজ আছে একটা, খাঁটি উত্তর-কলকাতার মানুষজনের মতো।

না না সেরকম নয়। আসলেইয়েগতজন্মের একটা কথা মনে পড়ে গেল। এইরকমই একটি ছাগল ছিল আমাদের লাজুক মুখে বললেন ত্রৈলঙ্গ।

হে হে, দেখ দিকি, তুমি হলে গিয়ে জীবপ্রেমিক মানুষ, তোমার সামনে বেমালুম জীবহত্যা করে ফেললুমকী অন্যায় বল দিকিকাঙাল কাঁচুমাচু হয়ে গেলেন।

অগত্যা ত্রৈলঙ্গ আগাগোড়া কীরিটীশ্বরের বৃতান্তটি খুলে বললেনশুনে হ্যা হ্যা করে বৃদ্ধের সে কী অট্টহাসি!

আর সেই অট্টরোলের চোটেই ঘুমটা চুরমার হয়ে গেল অষ্টমঙ্গল চাটুজ্জ্যের। এই একটু আগেই চটকা লেগেছিল। চারদিক সব নিমেষে পিছনের দিকে পিছলে যাচ্ছিল, পাশে বসে মা আলতো হাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল মাথায়, আর বাবা সেই গানটা চালিয়েছিলযেটা মাতৃগর্ভে থাকাকালীন খুব তারিয়ে তারিয়ে সে শুনত আর সঙ্গে দুলুনিও ছিলঅষ্টমঙ্গল কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছিল। বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পূর্বকৃতকর্মের স্মৃতি ফিরে এসেছিলমার্কিন নাগরিক অষ্টমঙ্গল চাটুজ্জ্যে তখন দীঘলগাঁয়ের ত্রৈলঙ্গ রায়, ভবলীলা গুটিয়ে যাওয়ার পর তিনি ঘাঁটি গেড়েছেন ভারতবর্ষের পুবপ্রান্তের এক প্রাচীন মহানগরীতে। সেদিন বাউন্ডুলের মতো ঘুরতে ঘুরতে হাজির হয়েছেন ময়দানে, সেখানে মোলাকাত হয়েছে দশাসই চেহারার ভেটারেন এক প্রেতের সঙ্গে। দুজনের খোশ গপপো চলছে আর তারই মাঝেভ্যাঁ

চোখ খুলেই অষ্টমঙ্গল জোরসে কেঁদে উঠেছে। বোষ্টুম স্টিয়ারিংচক্রটি আঁকড়ে বসে ছিলেন সামনে, অষ্টমঙ্গলের আচমকা চিৎকারে কেঁপে গেলেন। একটু আনমনা ছিলেন, সামনের ট্র্যাফিক সংকেতটি সবুজ থেকে হলুদ হবার দিকে এগুচ্ছেগণণা বলছে গ্যাস-পেডল-এ একটু চাপ দিলেই অনায়েসে আসন্ন লাল আলোকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন। আবার দোনোমোনা করছেনহলুদ-এ কুলিয়ে যাবে নাকি শেষে লাল মাড়িয়ে যেতে হবেআশেপাশে পুলিশ ঘাপটি মেরে থাকলে নির্ঘাত জরিমানা। কয়েক মুহূর্তের ভাবনা এসবচালকের আসনে বসে এসব নানাবিধ চিন্তাভাবনা অনবরত খেলে মাথায়রাস্তা-লেন-সিগনাল-গতিনির্দেশিকা-পুলিশ-ব্রেক-গ্যাস-পেড্‌লতাও রক্ষে এ-মুলুকে ক্লাচ-গিয়ারের কেরামতি দেখাতে হয় না! এসবের ওপর আবার ওইরকম একটা মোক্ষম ভ্যাঁ…বোষ্টুমের তাল কেটে গেল।

কী করছ, খোকন কাঁদছে! আরেকটু হলেই সিগনালটা ভাঙছিলাম! বিরক্ত সুরে বললেন বোষ্টুম।

মি কী করব! স্বপ্ন দেখেছে মনে হয়। কোলে নেবো? বললেন সর্বমঙ্গলা।

অষ্টমঙ্গলের পাশের আসনটিতেই বসে ছিলেন, গাড়িতে চড়লে তিনি পিছনের আসনেই বসেনঅষ্টমঙ্গলের কার সিট-এর পাশে।

খেপেছ! কোলে নিলেই পুলিশ পাকড়াও করবে। এখানের নিয়মকানুন জান না তো! বললেন বোষ্টুম। কিন্তু অষ্টমঙ্গলের কান্না থামতেই চায় না।

কী যে অ্যাতো স্বপ্ন দেখে খোকন! কাল রাতে ঘুম ভেঙে দেখি ঘুমের ঘোরেই দুটো হাত দু-পাশে নাড়াচ্ছে—যেন ওড়ার চেষ্টা করছে—তোমাকে বলতেই ভুলে গিয়েছি কথাটা! বোষ্টুম বললেন।

তবার তোমাকে বললাম একটা কালো সুতো আর একটা মাদুলি কিনে এনে দাও কোমরে পরাবআর হাতে পরার একটা লোহার বালা। তাহলেই ওর ওইসব আজেবাজে স্বপ্ন দেখা বন্ধ হবে

খানে ওসব পাবে না, তোমাকে তো বলেছি। তার চেয়ে বাবাকে বলো ওগুলো কুরিয়ার করে দিতে

কথার মাঝে বোষ্টুম ভাবলেন গাড়িটাকে কোথাও একটা শান্টিং করে ফেলাই ভালো। খোকন যা একগুঁয়ে হয়েছে, মায়ের কোলে চড়ে দুদু না পান করলে ওর কান্না থামবে না। বোষ্টুম জুতসই একটা জায়গা খুঁজতে লাগলেন। আশেপাশে এন্তার দোকানপাট, -দেশে লোকজনের চেয়ে বেশি দোকানতারচেয়ে বেশি পার্কিং চত্বরওরই একটাতে গাড়িটাকে ভিড়িয়ে দেবেন বলে গাড়িটাকে বাঁদিকের লেন থেকে একেবারে ডানদিকের লেনে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন বোষ্টুম, রিয়ারভিউ মিরর-এর দিকে আড়চোখে চেয়ে চেয়ে একটার পর একটা লেন আর প্রংহর্ন হরিণীর মতো ধেয়ে আসা গাড়িগুলোকে ডিঙোতে লাগলেন। কড়কড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সটা হাতে পাওয়ার পর থেকে আত্মবিশ্বাসের বুড়বুড়ি কাটছে মনেযে কেতায় গাড়িগুলোকে গোল দিয়ে দিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলছেন। মাঝে মাঝে নিজেরই ভ্রম হচ্ছেএ তিনি তিনদিন আগের সেই তিনি যিনি স্টিয়ারিং চেপে ধরে সবচেয়ে ধীরগতির ডান-লেনটি ধরে শম্বুকগতিতে এগিয়ে যেতেন- আর পিছনের গাড়িগুলো পঁক পঁক করে ভেঁপু বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে যেত!

ড্রাইভিং লাইসেন্সটায় কাজ হয়েছে বটে। হ্যাঁ, বিস্তর কসরত করে শেষমেশ ড্রাইভিং পরীক্ষায় উতরে গিয়েছেন বোঁটা মুচকুন্দপুরের বোষ্টুম চাটুজ্জ্যে। জয়চণ্ডী মায়ের থানে ওঁর মায়ের মানতের গুণেই হোক বা সন্তোষী মায়ের পায়ে সর্বমঙ্গলার নিঃশর্ত সমর্পণের জোরেই হোক বা চতুশ্চক্রযান চালনায় বোষ্টুমের মুনশিয়ানায়ই হোক, বোষ্টুম ভিনদেশে এসে তাঁর প্রাপ্য আদায় করেই ছেড়েছেন। আর কতকটা সেই খুশিতেই আজ সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন হাওয়া-খেতে। নির্ভেজাল হাওয়া নয় অবিশ্যি, সর্বমঙ্গলার প্রিয় চৈনিক খাদ্য খাবেনতার আগে একবার ঢুঁ মারবেন চিড়িয়াখানায়। সর্বক্ষণ দুটো দু-পেয়েকে আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখার একঘেয়েমি থেকে অষ্টমঙ্গলকে মুক্তি দিতেই চিড়িয়াখানার পরিকল্পনা।

কী হল গাড়ি থামালে যে, যাবে না? জিগ্যেস করলেন সর্বমঙ্গলা। অষ্টমঙ্গল নাগাড়ে কেঁদে চলেছে।

গে খোকনের খাওয়া, তারপর আমাদের হাওয়া বার্ধক্যজীর্ণ শেভরলে গাড়িটি অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ নামক দোকানের সামনে পার্ক করতে করতে বললেন বোষ্টুম। হঠা ওঁর চোখ সামনের কাচ বেয়ে দোকানের অন্দরমহলের দিকে চলে গেলএক ঝলক তাকিয়েই বুঝলেন মস্ত ভুল হয়েছে!

(ক্রমশ…)

 

 
 
top