ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

অষ্টমঙ্গল চট্টোপাধ্যায়ফিসফিস করে বারদুয়েক উচ্চারণ করলেন বোষ্টুম চাটুজ্জ্যে। নামটা কখনওই বিশেষ সুবিধের বলে মনে হয়নি বোষ্টুম চাটুজ্জ্যের। যে কোনো দরখাস্তে, সে ইস্কুল-কলেজে ভর্তিই হোক বা চাকরির, এ নাম আঁটবে না, এর জন্য বাড়তি খোপের বরাত দিতে হবে নিশ্চিত। এই সৃষ্টিছাড়া নাম নিয়ে ঘরে-বাইরে ইয়ারবক্সীদের হাতে বেইজ্জত হতে হবে, আর ফিরিঙ্গি সায়েবরা তো অষ্টমঙ্গলউচ্চারণ করতে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হয়ে যাবে! তার ওপর বোষ্টুমের নামের সেরেফ ‘ষ্ট’-টুকুমাত্র একপঞ্চমাংশ বোষ্টুম! আর সর্বমঙ্গলার জন্য বরাদ্দ গো-টা তি--টে অক্ষর। ব্যবস্থাটা একদমই পছন্দ হয়নি বোষ্টুমের, মনে হয়েছিল ছেলেটার উপর থেকে নিজের কপিরাইটই যেন হারিয়ে গিয়েছে! তখন মনে হয়েছিল দক্ষিণনারায়ণনামটাই দিব্যি ভালো ছিলকারো কোনো দাবী নেই, ভাগাভাগি নেই, দিব্যি মধ্যবর্তী একটি ব্যবস্থা। তখন যদি তাঁর মা রাজি হয়ে যেতেন! আসলে বিস্তর চিন্তন করে দক্ষিণনারায়ণনামটির সন্ধান পেয়েছিলেন বোষ্টুমের পিতৃদেব সর্বেশ্বর চট্টোপাধ্যায়উত্তর আমেরিকার দক্ষিণপ্রদেশে নাতিসাহেবের জন্ম, পিতৃপুরুষের ভিটেমাটিও দক্ষিণবঙ্গেদক্ষিণনারায়ণ’-এর চেয়ে ভালো কিছু হয় নাকি! কিন্তু বাধ সেধেছিলেন বোষ্টুমের মা।

বোষ্টুমের দিব্যি যদি তুমি এরকম অলুক্ষুণে কাণ্ড করেছ। ওই একরত্তি নাতি আমার, ওই নাম নিয়ে ও আর বড়ো হতে পারবে? ’, ‘’, ‘ক্ষনিয়ে পণ্ডিতি না দেখালেই নয় তোমার!খেঁকিয়েছিলেন বোষ্টুমের মা ঈশ্বরী।

রূপকটুপক যে তোমার ধাতে সয় না, তা আমি আমার জীবন দিয়ে জানি।নির্লিপ্ত গলায় বলেছিলেন সর্বেশ্বর। গলায় নির্লিপ্তি থাকলেও শ্লেষ ছিল বিলক্ষণ।

রাম শ্যাম যদু মধু-নাম একটা রাখলেই হল! একটা পরম্পরা থাকবে না!

সারাক্ষণ তো শব্দকোষ নিয়ে বসে আছ। ও-ছাড়া একটা নাম পাওয়া যাচ্ছে না!

আরে পাওয়া যাবে না কেন, মেলা নাম চতুর্দিকেএকশ আট-টা আউড়ে দিতে পারি এখখুনি, কিন্তু একটা তো কার্যকারণ সম্পর্ক থাকা চাই। দক্ষিণনারায়ণ-এর দ্যোতনা তুমি দেখবে না! হ্যাঁ একটু বড়ো এই যা, তবে দক্ষিণপদ করে নেওয়া যায়তাতে রসভঙ্গ হয় না!

সর্বেশ্বরের দরাদরিতে কাজ হয়নি, টলানো যায়নি ঈশ্বরীকে। ঈশ্বরী কোনো মতেই রাজি হলেন না দেখে শেষে এই নামটি ফাঁদলেন সর্বেশ্বর, অষ্টমঙ্গল চট্টোপাধ্যায়। ঈশ্বরী আর ওজর-আপত্তি করলেন না, বোষ্টুমও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলেন না, বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু বলা তাঁর চরিত্রবহির্ভূত। কিন্তু ক্ষুণ্ণ হয়ে রইলেন সেদিন থেকেই, যদিও তিনি যে এই নামকরণে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন সর্বমঙ্গলাকেও তার আঁচ পেতে দেননি, বোষ্টুম নিজের গহিন মনের সুলুকসন্ধান নিজেই পাননা কখনো কখনো! তবু যদি খোকার দুচারখানা প্রত্যঙ্গও তাঁর আদলটা পেত, মনের দুঃখ কিছুটা হলেও গলাধঃকরণ করে ফেলতেন বোষ্টুম! আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছেন আপাদমস্তকবাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে ডান হাতের কড়ে আঙুল পর্যন্ত মিলিয়ে দেখেছেন, বাদ দেননি কিছু! অবিশ্যি চক্ষু-কর্ণ-নাসিকার হিসেব করেননি- ওই তিনটে জিনিস নিয়ে আর মগজ ঘামাননি বোষ্টুমশত চেষ্টা করলেও ও তাঁর হবার নয়। সে না হয় না-হলো, নতমস্তকে মেনে নিলেন তিনি এই বিচার, কিন্তু তা বলে সূচাগ্র জমিও কী ছাড়বেন না সর্বমঙ্গলা! খোকনের সর্বাঙ্গে শুধু সর্বমঙ্গলার ছাঁচ!

অবিশ্যি অ্যাতো সবের পরেও আশায় আশায় ছিলেন বোষ্টুম, ভেবেছিলেন কিছু যদি চোখ এড়িয়ে গিয়েছে তাঁর, দুটো চোখ আর কত দিকে পেরে উঠবে! আশায় ছিলেন হয়তো তিনশচব্বিশ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের মিত্তিরবৌদি, একশদশ নম্বরের বিকুলদারা বলবে:

ওহে বোষ্টুম, খোকার ভুরুর বাঁকগুলো অবিকল তোমার মতোই হে।

গ্রীবা দেখেচ ছোকরার, বোষ্টুমের মতো লম্বিত গ্রীবা।

বোষ্টুমের কর্ণলতিটি যেন চেঁছে এনে বসিয়েছেন খোকার মাথার দুপাশে!

নাহ্‌ কেউ টুঁ রবটুকু করেনি।

আইনি বাপ-মা-রা কন্যার পক্ষ নেবেন জানা কথা, কিন্তু বায়োলজিকালবাপ মা! তাঁরা তো বিলক্ষণ জানেন বোষ্টুম হদ্দ-অভিমানী ছেলেএকটু উনিশ-বিশ হলেই অভিমানের বাষ্পে সেদ্ধ হয়ে যায় মানুষটা, বোষ্টুমের মন রাখার জন্যেও কী- ! না, সেসব কিছু আর আশা করেননা বোষ্টুম, বাবা যেদিন থেকে ওই নামটা সংশ্লেষ করেছেন সেদিন থেকেই বিষম হতাশ তিনি।

সর্বেশ্বর বোধহয় বোষ্টুমের মানসিক অবস্থাটা আঁচ করেছিলেন খানিকটা।

তোমার নামটা অ্যাতো বেয়াড়া, ও থেকে এর চেয়ে সুশ্রাব্য কিছু বের করা হ্যাঙ্গামের ব্যাপার। এর দায় অবিশ্যি আমার নেইআমার ঠাকুর্দা আর ঠাকুমা মিলে করেছিল কীর্তিটাসারাজীবন বিস্তর ছাগমাস সাঁটিয়ে শেষজীবনে বাতপিত্ত আক্ষেপ রোগে ভুগে দুজনেই কন্ঠি ধরেছিল, মত্‌স্য-মাংস দূর মুসুরির ডাল পর্যন্ত ত্যাগ করেছিল। বোষ্টুমনামটা জোগাড় করতে বেগ পেতে হয়নি ওদের- আমার বাবাও সম্মতি দিয়েছিলেনআমি নিঃশব্দে ওয়াক-আউট করেছিলাম।বলেছিলেন সর্বেশ্বর। সাফাই গেয়েছিলেন।

বোষ্টুমের নামকরণের পিছনে যে তাঁর পিতৃদেবের কোনো ভূমিকা নেই এ তিনি ছোটোবেলা থেকেই শুনে আসছেন। ভূমিকা থাক বা না থাকতাতে বোষ্টুমের আত্মদহন কিছু কম হয় না। জ্ঞান হবার পর থেকেই নিদারুণ মনঃপীড়ায় ভুগেছেনবভ্রুবাহন, সাত্যকি, কীরিটী, নবারুণ নামের ভিড়ে দোমড়ানো মোচড়ানো আপন নামটির দিকে চেয়ে হীনমন্যতায় ভুগেছেন নিরন্তর। পুণ্য অর্জনের অ্যাতোই যদি অভীপ্সাবৈষ্ণববৈষ্ণব চট্টোপাধ্যায় রাখা যেত। অন্ততপক্ষে তাঁর পিতৃদেব এই প্রস্তাবটি দিতে পারতেন।

‘‘বৈষ্ণব’ নামটা রাখলেও তো ওঁদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হত। তুমি একটু বললেই ওঁরা রাজি হয়ে যেতেন।’ সর্বেশ্বরকে অনুযোগের সুরে কথাটা বলেছিলেন বোষ্টুম।

সেটা সম্ভব ছিল না। আমাদের পুকুরে একটা কাছিম ছিল, তোমার জন্মেরও আগে। আমার ঠাকুর্দার খুব পোষা ছিল কাছিমটা, ওই নামটাই রেখেছিলেন ওর।’ আফশোষের সুরে বলেছিলেন সর্বেশ্বর।

একটা কাছিমের নামও নান্দনিকতায় মনুষ্যনামকে ছাড়িয়ে যায়! কোথাকার কোন ভীমরতিগ্রস্ত প্রপিতামহরা এসে এমন লোকসানটি করে দিয়ে গেলেন আর বোষ্টুমের আপন বাপ-ঠাকুর্দারা সেটা মেনে নিলেন! আঠারো থেকে আঠাশবেবাক একটা যুগ এই আপশোষ নিয়ে কাটিয়েছেন বোষ্টুম। বোষ্টুমশুনে ইস্কুল-কলেজে মাস্টারমশাইরা ভুরু কুঁচকেছেন, সহপাঠীরা কুম্ভীরাশ্রু বিয়োগ করেছে, উঁচু ক্লাসের ছেলেরা যাচ্ছেতাই র‍্যাগিংকরেছে, দু-চারটে কোম্পানি ইন্টারভিউতে ডাকেনি পর্যন্ত! এসব নাম নিয়ে কারিগরিবিদ্যে হয় না বাছা, তুমি বরং পালি-মৈথিলি পড়াশোনা করলে বিশেষ খ্যাতি পেতেবিষুবস্যার বলেছিলেন। অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স-এর ক্লাসসেদিনই প্রথম কলেজের দিন। লজ্জায় বোষ্টুমের হাওয়া হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল সেদিন। আর তার ওপর কলেজে স্যাঙাতদের নিরন্তর সহানুভূতি- বোষ্টুম যেন আজন্ম এক মারণ ব্যাধিতে আক্রান্ত! আহারে বেচারা বোষ্টুমটার কী কষ্ট! নামটা এমন বেজুত ছেলেটারকাঁচা জখমের উপর নুন-বৃষ্টি! আর এই কারণে রসতরঙ্গিনীদের হৃদয় শিকারেও শুধুই ব্যর্থতা। এসব নামের ছোকরাদের কেউ পাত্তা দেয় নাকি! দু-একটি খেউড়-কবিতাও যা লিখেছেন কম বয়েসে, কেউ ছাপেনি। বিয়ের বাজারে খুব একটা ঝঞ্ঝাট পোয়াতে হয়নি এই যা রক্ষে, গাঁয়ে-গঞ্জে এখনো এসব নামের কদর আছেরামগোবিন্দ নামধারী পুরুষেরও কনের অভাব হয় না বোষ্টুমদের গাঁয়ে। সর্বমঙ্গলাও কখনও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। স্বামীর নাম তিনি মুখে আনেন না, কাজেই ও নিয়ে কোনো রোমান্টিসিজমও তাঁর নেই। তাই সংসারী হবার পর নাম-সংক্রান্ত আপশোষ উপে গিয়েছিল অনেকটাই।

পুরোটাই যেত যদি নিজের পছন্দ করা নামটি বোষ্টুম খাপিয়ে দিতে পারতেন নিজের খোকার উপরে। চার-অক্ষরের নামসেরকম জোরালো কোনো যুক্তাক্ষর নেইএকটি সাবেকি এবং একটি উত্তর-আধুনিক ডাকনামও বের করা যাবে অনায়াসে। সমাজ-সংস্কার-আইন-কানুন না-থাকলে নিজেই নিয়ে নিতেন এই নামকবে ভেবে রেখেছিলেন। জগদ্রাম চট্টোপাধ্যায়খুব পছন্দের নাম বোষ্টুমের। দেশের লোক হাঁক দেবে জগু, আর সায়েবরা বলবে জ্যাগ। যেদিন ফিরিঙ্গি ডাক্তার সর্বমঙ্গলার গর্ভস্থভ্রূনের লিঙ্গ ঘোষণা করেছেসেদিন থেকেই নামটা খাপিয়ে রেখেছিলেন বোষ্টুম। যে-ছদ্মনাম দিয়ে নিজের খেয়ালেই দুচারটি কার্টুন আঁকেন সেই নাম, জগদ্রাম চাটুজ্জ্যে। হায় রে, সেও কী হবার জো আছে!

শুনছ, আর বেলা করো না। নাহলে ওদিকে আবার লম্বা লাইন পড়বে।রসুই থেকে হাঁকলেন সর্বমঙ্গলা।

খোকার গোরা বদনটির দিকে চেয়ে বোষ্টুম অভিভূত হয়ে পড়েন মাঝেমাঝে, নিজের সৃজনশীলতার প্রতি নিজেই শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়েন, আর তখন নামকরণ-সংক্রান্ত অভিমানও সব ভাপ হয়ে উপে যায়। ওফ্‌, সর্বমঙ্গলা একটু শ্যামলা হলে বলতেন ছোকরা বাপের গাত্রবর্ণ পেয়েছে! ওষ্ঠ-অধর হয়েছে টিয়াপাখির চঞ্চুর মতো লাল, আঁখিপল্লবগুলি আংটার মতো বক্র, দন্তমূলবিকাশ করলে আবছা টোলও পড়ছে দুগালে। চোখের নিমেষে খোকা ডাগর হয়েছে অনেকটাই, খুব ডানপিটেও হয়েছে। উপুড় হয়ে শুতে পারে নিজে নিজেই, গঞ্জিকাসেবনের মুদ্রায় আঙুল চোষে, রেগে গেলে নাবালকদের মতো কাঁদে না বরং চেহারায় গাম্ভীর্য এনে ফেলেসেদিন রাতে তো খোকাকে ঘুমের ঘোরে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে অব্দি শুনেছেন বোষ্টুম। অথচ খোকার জন্মদিনটা মনে হচ্ছে যেন গত পরশুর ঘটনা! ওফ্‌, সে একটা দিন ছিল বটে, দিন ছিল দেশেএদেশে তখন মধ্যরাত। ঘন্টাখানেকের চেষ্টার পর সুড়ুত্‌ করে খোকাকে টেনে বের করলেন ফিরিঙ্গি ডাক্তার, কাঁচিটি তুলে দিলেন বোষ্টুমের হাতে, আর বোষ্টুম আনন্দে-বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে নাড়িটি কর্তন করে ফেললেন, ডাক্তার কর্তিত নাড়িতে এঁটে দিলেন ক্লিপ! তার আগে বেবাক সন্ধেটা লেবার রুমে কেটেছে বোষ্টুমের, সেই ভরদুপুরে সর্বমঙ্গলাকে ভর্তি করেছেন নিকটবর্তী ম্যাটারনিটি হাসপাতালে। জরায়ুর সঙ্কোচন-প্রসারণ বাড়াতে দুপুর থেকেই অক্সিটোসিন চলছে, প্রসবযন্ত্রণা নিবারণ করতে এপিডিউরালনামের মোক্ষম ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে রাতের দিকে। আর তার জেরেই আধ-ঘুম আধ-জাগা হয়ে গিয়েছেন সর্বমঙ্গলা। মাহেন্দ্রক্ষণটির অপেক্ষা করতে করতে বোষ্টুম কখনও লেবাররুমের অতিকায় সোফায় ঢুলে পড়েছেন, কখনও প্রায় অচৈতন্য সর্বমঙ্গলার মুখটির দিকে চেয়ে কাঁদ কাঁদ হয়ে পড়েছেন। কখনো গত হেমন্তের সেই বিকেলটার কথা মনে পড়ছে। সেদিনই প্রথম খোকনকে দেখলেন বোষ্টুম, গর্ভস্থ খোকনের আবছায়া আলট্রাসাউন্ড ছবিচব্বিশ সপ্তার পুরুষ্টু ভ্রুণের পষ্ট ওষ্ঠ অধর নাসিকা লিঙ্গ! লেবাররুমের সেই সোফাটিতে নিমজ্জিত হয়ে সেসব দিনের কথা ভাবতে ভাবতে একসময় চরমমুহুর্তটিতে পৌঁছে গিয়েছেন বোষ্টুম, ডাক্তারের হাতযশে অনায়াসে খোকার মর্ত্যে আগমন হয়েছে, ছুরিকাঁচির কারিকুরি ছাড়াই। পিছলে বেরিয়ে আসতেই নার্সের জিম্মায় চলে গিয়েছে, অনর্থক টানা-হ্যাঁচড়ায় বিরক্ত হয়ে বিষম কান্না জুড়েছে। বন্য-নোড়ার মতো বেঢপ মাথা খোকনের, প্রদর্শনী করার মতো অণ্ডকোষ! দেখেই তো ঘাবড়ে গিয়েছিলেন বোষ্টুম, ভেবেছিলেন অনর্থ হল একটা! চিন্তা কোরো না হে, সব সমানুপাতিক হয়ে যাবেগোরা ডাক্তারের আশ্বাসবাণী বুকে বল জুগিয়েছিল তখন।

কই শুনছ, আর বেলা করো না। নাহলে ওদিকে আবার লম্বা লাইন পড়বে।আবার হাঁকলেন সর্বমঙ্গলা। অ্যাতোক্ষণে বোধহয় সম্বিত ফিরে পেলেন বোষ্টুম।

আরে যাচ্ছি। যাচ্ছি। খোকা ঘুমের ঘোরেই কী রকম হাসচে দেখেছ?বললেন বোষ্টুম।

ঘুমের ঘোরেই খোকা তাঁর একটি আঙুল চেপে ধরে রয়েছে। একটু আগেই বোষ্টুমের তর্জনীটি নিয়ে খেলা করছিল, খেলতে খেলতে বেমালুম ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠোঁটে মুচকি হাসি।

মা ষষ্ঠীর সঙ্গে হেল্লু খেলছে। ওকি করছঘুমোবার সময় আদর করতে নেই গো, বড়ো হয়ে ছেলে বেবাগা হয়ে যায়।বললেন সর্বমঙ্গলা।

খোকার কপালে আলতো করে একটি স্নেহচুম্বন দিচ্ছিলেন বোষ্টুম, স্ত্রীর কথায় ক্ষান্ত দিলেন। খোকাকে আদর একটু বেশীই করে ফেলছেন তিনি, স্নেহের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কোনো কোনো সময়, দিশে ঠিক রাখতে পারছেন না। খোকা এখন নেহাত ছোট তাই রক্ষেবড়োবেলায় এরকম আদর পেলে বিগড়ে যাবে নির্ঘাত! তখন একটু সাবধান হতে হবে বোষ্টুমকেখোকা বায়না করলে আমল দেওয়া চলবে না বিশেষ, মুখমণ্ডলে নীলকরসাহেবদের মত দার্ঢ্য রাখতেহবে, অন্যায্য কাজ করলে চপেটাঘাত নিশ্চিত করতে হবে। সেসবের অবিশ্যি এখন ঢের দেরী আছেসময় নিয়ে স্থির করা যাবে সেসবকিন্তু বর্তমানে যে ভয়ানক গাড্ডায় পড়েছেন সেখান থেকে উদ্ধার পাবেন কী করে! কথাটা ভাবতেই মনটা বিস্বাদ হয়ে গেল বোষ্টুম চাটুজ্জ্যের, কল্প-জগত থেকে সোজা দক্ষিণ-টেক্সাসের রুক্ষ শহরটিতে এসে পড়লেন। আবার সেই সাউথ গেসনার রোডের ড্রাইভিং আপিসের সামনের সর্পিল লাইনপ্যারারাল পার্কিং অভ্যেস করার জন্য গুঁতোগুঁতি- বোষ্টুমের মনটা হতাশায় ভরে গেল! -দেশের আইন-কানুনের আঁটোয়ারি দেখলেই নিজের দেশটাকে বড্ড মনে পড়ে যায় বোষ্টুম চাটুজ্জ্যের। কত অনায়াসে ড্রাইভিং লাইসেন্সটি পেয়েছিলেন দেশেড্রাইভিং ইস্কুলে নাম লেখালেনকিঞ্চিত্‌ কড়ি গুণলেনআপিস কামাই করে এক দুপুরে গেলেন বেলতলাকরুণমুখে ইন্সপেক্টর সাহেবের চেম্বারে লাইন দিয়ে দাঁড়াতেই লাইসেন্স মঞ্জুর। আর এখানে! লিখিত পরীক্ষাটা উতরেছেন কোনো রকমেএকটা শিক্ষার্থী লাইসেন্সও পেয়েছেনকিন্তু ও-তো দুদু-ভাতু, ও দিয়ে আইনত রাস্তায় গাড়ি নিয়ে কেরদানি মারা যায় না। অগত্যা আসল লাইসেন্স পাবার লড়াই শুরু করতে হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ট্রাফিক সিগনাল চিনতে হবে, গাড়ি ব্যাক গিয়ারে রেখে পিছিয়ে যেতে হবে, মেপে মেপে বাম-ডানে বাঁক নিতে হবে আর যেটি করতে হবে সেটি প্যারালাল পার্কিং। দেশে কিছুদিন ড্রাইভিং শিক্ষা করেছিলেন বোষ্টুম, -দেশে এসে এক সহকর্মীর কাছে কোচিংও পেয়েছেন এবং তার দৌলতে গাড়ি চালানোর আদব-কায়দাও রপ্ত হয়েছে খানিকটাকিন্তু তা বলে প্যারালাল পার্কিং! -তো আনাড়ি তিরন্দাজকে সোজা ভাসপক্ষীর চক্ষুতে শর মারতে বলা! তাঁর মতো শিক্ষানবিশের পক্ষে রাস্তায় ছড়িয়েছিটিয়ে গাড়ি চালানো এক কথা আর কারোর ফরমায়েশে আস্ত একটা গাড়িকে দুটো খুঁটির মাঝে মেপেজুকে বিছিয়ে দেওয়া আরেক! হ্যাঁ, ওই হলদে দুটো খুঁটি ড্রাইভিং আপিসের চত্বরে পোঁতা, ওরই মাঝে গাড়িটিকে পার্ক করে ফেলতে হবে, প্যারালাল পার্কিং আর কিসফল হলেই কেল্লাফতে- এই ধাপটা উতরাতে পারলে বাকিগুলো অনায়াসে উতরানো যাবে। তা, প্রথমবার বোষ্টুম গিয়েছেন পরীক্ষা দিতে, সঙ্গে পুঁজি বলতে বৃদ্ধ শেভরলে গাড়িটি, বিগত মাসখানেকের গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আর ইউটিউবে দেখা প্যারালাল পার্কিংসম্পর্কে কিঞ্চিত্‌ জ্ঞান। গেসনার রোডের সেই অতিকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স আপিস, পরীক্ষার্থীরা সব যে যার গাড়ি নিয়ে একে অন্যের পিছনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর বোষ্টুম ডাক পেলেন। সামনে মোক্ষম হলদে দুটি খুঁটিপাশের সিটে স্ফীতবপু কৃষ্ণাঙ্গী ড্রাইভিং ইন্সপেক্টর, দুশ্চিন্তায় বোষ্টুমের রক্ত জল হয়ে গেল। ইন্সেপেক্টরসাহেবা আগে বঢ়োবললেন এমন হেলাফেলা করে যে প্রথমটায় ঠাহরই করতে পারলেন না বোষ্টুম। ভাষাটা ইংরিজি হলে কী হবে উচ্চারণের গুণে তা তখন হিব্রু বোষ্টুমের কাছে। যাই হোক, গাড়ি নিয়ে বিস্তর হ্যাঁচোড়-প্যাচোড় করলেন, সামনে-পিছনে-ডাইনে-বাঁয়ে-কোনাকুনি-লম্বালম্বি সবরকম চেষ্টা করলেন, ইউটিউব আর দু-একটা খুচরো ওয়েবসাইট থেকে যেটুকু জ্ঞানার্জন করেছিলেন সব উজাড় করে দিলেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, গাড়ি আর খুঁটির ত্রিকোণমিতি মিলল না, মনে হল এ-যেন তেল-জল ঘোলঘাট করে শরবত বানাবার চেষ্টা! ভরা শীতে ঘেমেনেয়ে একশা হলেন বোষ্টুম, খালি মনে হতে লাগল এই দূর বিদেশে এসে সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাচ্ছেবোঁটা-মুচকুন্দপুরের চাটুজ্জ্যেদের সম্মান। বোঁটা-মুচকুন্দপুরের চাটুজ্জ্যেরা বেশ মান্যগন্যজমিদারি ছিল, শিকারী হিসেবেও নাম ছিল চাটুজ্জ্যদের। এখন জমিদারী গেলেও বীরত্ব যায়নি, এখনও বিহারীনাথ পাহাড়সংলগ্ন বনাঞ্চলে আধ-বাগাদের উত্‌পাত হলে বোষ্টুমের ছোটোখুড়োর ডাক পড়ে। বোষ্টুমের ছোটোখুড়ো ভর্গোনাথ চাটুজ্জ্যে তো হুঁড়োল-বেড়াল-হাড়হাঁজা-বনবরা শিকার করে করে প্রজাতিগুলোকেই লুপ্ত করে দিয়েছেন! আর সেই বাড়ির ছেলে হয়ে বোষ্টুম চাটুজ্জ্যে কিনা কতগুলো কলকব্জাকে পোষ মানাতে হিমশিম খাচ্ছেন! গাঁয়ে এই খবর গেলে কী ছিছিক্কারটাই না হবে! আপন দেশ হলে কখনো এ রকমটা হত না জানেন বোষ্টুমঠিক সামলে নেওয়া যেতকাঞ্চন মূল্যের কদর এখনও আছে দেশে। এসব আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে বেতালা গাড়ি খুঁটিতে ঠুকে গেলএবং তা লক্ষ করা মাত্র ইন্সপেক্টর নিখাদ ফেল করিয়ে দিলেন। তোমার শিক্ষের আরো বাকি আছে বাপু, ভালো করে অভ্যেস করে আবার অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিও।ঠান্ডা গলায় বলল সেই ইন্সপেক্টর। বোঁটা-মুচকুন্দপুরের বোষ্টুম চাটুজ্জ্যেযিনি জীবনে কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হননিইস্কুলে অ্যাতো বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছেন, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, এঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় আট-আটখানা সেমেস্টারএকটাতেও সাপ্লিখাননি অব্দিতিনি উত্তর আমেরিকার দক্ষিণপ্রান্তের একটি প্রদেশের বিহাইন্ড দ্য হুইলপরীক্ষায় সেরেফ গাড্ডু মারলেন। অসাফল্যের তিতকুটে সোয়াদ জীবনে প্রথমবার পেলেন বোষ্টুম, মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। রাগে অভিমানে সেই সপ্তাহান্তটা কুঁকড়ে পড়ে রইলেন বিছানায়, ঠিক করলেন আর পরীক্ষাই দেবেন না, নিয়ম-কানুনের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে খাওয়া-দাওয়াও কমিয়ে দিলেন। সর্বমঙ্গলার তখন ন’মাস চলছে, লেহেদেহে অবস্থা। প্রথম পোয়াতি, বেশ ঘাবড়ে আছেন। তবু তাঁকেই হাল ধরতে হল।

অনেক বোঝালেন সর্বমঙ্গলা, বুঝিয়েসুজিয়ে খাড়া করলেন বোষ্টুমকে। এরই মাঝে একদিন খোকা হল। বোষ্টুমও আবার ড্রাইভিং পরীক্ষার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন। এখন ছুটির দিনগুলোতে সাউথ গেসনার রোডের ড্রাইভিং আপিসে ধর্ণা দেন বোষ্টুম। ড্রাইভিং আপিসের চত্বরটা ছুটির দিনেও খোলা, ভালোই জমায়েত হয় শিক্ষার্থীদের। আজ শনিবার, বোষ্টুম এবার ওদিকের জন্য তৈরি হবেন। আগামী ঘণ্টাখানেক চলবে খুঁটির মাঝে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন সাধনা। এর পাশাপাশি মাতৃশক্তির আরাধনাও চলবেবোষ্টুমের মা বোষ্টুমের সাফল্যে কামনায় জয়চণ্ডী মায়ের থানে শাড়ি-আলতা মানত করেছেন, সর্বমঙ্গলাও তাঁর আরাধ্যা দেবী সন্তোষী মায়ের কাছে সাফল্যের প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছেন। আগামী শুক্কুরবার পরীক্ষার অ্যাপোয়েন্টমেন্টটি নিয়েছেন বোষ্টুম। সর্বমঙ্গলার পরামর্শে শুক্কুরবারটাই বাছলেন। শুক্কুরবার সন্তোষীবার, ওইদিন নাকি সর্বমঙ্গলার কোনো বাসনাই ব্যর্থ যায়না। এমনিতে বোঁটা-মুচকুন্দপুরের বোষ্টুম চাটুজ্জ্যে সংস্কারগ্রস্ত নন, মন্দিরে মাথা ঠুকতে তাঁকে কস্মিনকালেও দেখা গিয়েছে কিনা সন্দেহ, বরং কলেজজীবনে তিনি মার্ক্সীয়তত্ত্বে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলেই শোনা যায়। তা সত্ত্বেও শালগ্রাম শিলা নিয়ে তাঁকে কোনোদিন কটুবাক্য উদ্‌গার করতে শোনেনি কেউ, নিয়মিত আহ্নিক না করলেও যজ্ঞোপবীত তিনি ত্যাগ করেননি। তিনি নিজে ধর্মাচরণ না-করলেও অন্যের পুজা-আচ্চায় বাধা দেন না, বরং তাঁর নামে কেউ মানত-মানসিক করলে তাঁর পক্ষীবক্ষে কিঞ্চিত্‌ বলের সঞ্চার হয়এটি বিলক্ষণ উপলব্ধি করেন তিনি।

ওদিকে অষ্টমঙ্গল ওরফে ত্রৈলঙ্গ রায় এখন ঘুমে বিভোর। পেট এখন ওর টইটম্বুর, মা সর্বমঙ্গলা একটু আগেই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন ওকে। বেঁচে থাকতে অজীর্ণ রোগে বেশ কাহিল হয়ে পড়তেন ত্রৈলঙ্গ, পুনর্জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেসব নিরাময় হয়েছে, ভরপেট খেতে আর দ্বিধা হয় না। আর ভরা পেটে স্বপ্ন-স্মৃতিগুলো ভালো ধরা দেয় ত্রৈলঙ্গের, অক্কাপ্রাপ্তি আর পুনর্জন্মের মধ্যবর্তী সময়ে যে কীর্তিগুলো করে গেলেন তারই স্মৃতি।

দীঘলগাঁয়ের ত্রৈলঙ্গ রায় বোঁটা-মুচকুন্দপুরের বোষ্টুম চাটুজ্জ্যের খোকা সেজে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রদেশে ঘুমন্ত। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি পৌঁছে যান স্ট্র্যান্ড ব্যাঙ্ক রোডের উপর অতিপ্রাচীন হতশ্রী একটি বাড়ির ছাদে। বাড়িটির ছাদ ফুঁড়ে উঠেছে একটি বয়োবৃদ্ধ পিপুল গাছ। এই গাছের শাখায় বসে একটি লুম্পেনদর্শী সিড়িঙ্গে প্রেত ঢ্যাড়া পেটাতে লেগেছে– ‘স্বয়ংবর সভা স্বয়ংবর সভা স্বয়ংবর সভা! বয়সের কোনো নিম্নসীমা নাই, আজই আসেনগেঁড়েগিরিধারীর পুকুরপাড়ের বটগাছ, সন্ধে সাত ঘটিকা….’

ত্রৈলঙ্গ কার্নিশে কাটাকুটি-পায়ে বসে আকাশের দু’চারটে তারাকে কল্পিত রেখার সাহায্যে সংযুক্ত করার চেষ্টায় রত ছিলেন। ঢ্যাড়া শুনে কৌতুহলি হয়ে এগিয়ে গেলেন।

কার স্বয়ংবর সভা হে?’ দু-চারটে প্রেতের জটলা ঠেলে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ত্রৈলঙ্গ।

গেলেই জানতে পারবেন। এ যুগের সেরা সোঁদরীযাত্রা আটিস্ট।’ বেশ দেমাকের সঙ্গে বলল সেই বামন প্রেত।

আরে ভাই নামটা বলো!’, আশেপাশের দু’একজন এলেবেলে বলে উঠল।

ও নাম আমার উশ্চারণ হবে নিখুব কঠিন নাম গো বাবুরা। তবে নাম করা আটিস্ট।’

ত্রৈলঙ্গ ভাবলেন একবার ঘুরে এলে কেমন হয়! স্বয়ংবর সভার কাহিনী মহাভারতে পড়েছেন বিস্তর, একবার চাক্ষুষ করতে পারলে মন্দ হয় না। প্রতিযোগীতায় তিনি নামবেন না, তাঁর মতো অন্তর্মুখী দু-পেয়ের পক্ষে ওসব সম্ভব নয়। শুধু দর্শক হিসেবেই যাবেন। গেঁড়েগিরিধারী পুকুড়পাড়ের অবস্থানটা ওদেরই একজনের কাছে ত্রৈলঙ্গ ভালো করে বুঝে নিলেন। সন্ধেটা বেড়ে কাটবে বলেই মনে হল ত্রৈলঙ্গের।

(ক্রমশ…)

 
 
top