ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

লরসিং আসছে হাঁফতিধুফতি

হেঁটাল মাটি চুর করিতে

রক্ত পড়ে গায়ের, বাপ

মড়া খাচ্ছে কড়মড়িয়ে

ভূত আসছে দপদপিয়ে

এইসব দেখে ব্যাটার অঙ্গে

কেউ যদি করে ঘা

তার শির পাত্র বজ্রাঘাত

আজকার চৌপহর

কালকের দু-পহর

ফাটেফুটে

বান মারে, কেউ ঘা করে

ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর

তিন দেবতার মাথা ফাটে

কার আজ্ঞা

বাপ বিল

বড় বিল

লরসিং মহামুনির আজ্ঞা।

কার আজ্ঞা—মহাযোগী মহাদেবের আজ্ঞা

ফনড্রেন রোডের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে বোষ্টুমের বৃদ্ধ শেভ্রলে গাড়িটি নিদাঘক্লিষ্ট নেড়ির মতো হ্যা হ্যা করছিল। ডান-লেনের ক্যাডিলাক থেকে ভোঁ ভোঁ করে ভেসে আসা র‍্যাপ দুরমুশ করে দিচ্ছিল চারপাশটা। উল্টোদিকের রাস্তায় পোঁ পোঁ করে তারস্বরে ভেঁপু বাজিয়ে চলে যাচ্ছিল একটা দমকলের গাড়ি। পিছনে বসে অষ্টমঙ্গ নাগাড়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে চলেছিল এমন সময় এলোপাথাড়ি এই ভজকট পদ্যটা আউড়ে উঠলেন বোষ্টুম। বাবার আকস্মিক এই নির্ঘোষে অষ্টমঙ্গলটা একেবারে চুপসে গেল, ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি সোজা ওর মুখের ভিতর সেঁধিয়ে গেল। গাড়ির বাঁপাশের জানলাটা খোলা ছিল, পাশের বুলেভার্ডে দাঁড়িয়ে ছিল জিন-পরা এক কাঙাল-ফিরিঙ্গি, হাতে সাহায্যের প্ল্যাকার্ড। বোষ্টুমের জানালাটা খোলা দেখে ওঁর দিকেই এগিয়ে আসছিল, হররা শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়ে পিছিয়ে গেল।

কী হল? কী বলছ এসব? সর্বমঙ্গলা স্বামীর এই আচরণ দেখে আঁতকে উঠলেন।

গা-বাঁধার মন্তর

সেটা আবার কী! কখনও শুনিনি তো

তোমরা আজকালকার যুগের ছেলেমেয়ে—উঠতি যৌবন। তোমরা এসব কোত্থেকে শুনবে জানলার কাচগুলো তুলে দিতে দিতে কপট গলায় বললেন বোষ্টুম।

কী আমার বুড়োঠাকুর এলেন রে! আট বছরের তো মাত্র এদিক ওদিক — এতেই এমন বুড়োটেপনা করো না! রাগের ভান করে বললেন সর্বমঙ্গলা।

ট বছর বললে তো সত্যিটা বলা হল না, খুকি—আমরা যে ভিন্ন দশকের মানুষ। আমি আটের দশক আর তুমি নয়! কোথায় ইন্টেলের ছ-মেগাহার্জের টুএইটসিক্স মেশিন আর কোথায় নব্বুইয়ের পেন্টিয়াম!

কী যে হেঁয়ালি কর, বুঝতে পারি না। অ্যাই বলো না গো, ওটা কীসের মন্ত্র!

মোক্ষম মন্তরভূত-পেরেত-দত্যি-দানো-জন্ত-জানোয়ারের আগেন্সটে নিশ্চিত প্রোটেকশন এক্কেবারে বোঁটা-মুচকুন্দপুরের নিজস্ব প্রডাক্ট

বাব্বা! আগে বলনি তো!

খেয়াল ছিল না। ঠাকুমার কাছে শিখেছিলাম সেই ছোটোবেলায়। ভর্গোকাকা যখন বন্দুক বাগিয়ে শিকারে বেরুত, ঠাকুমা ওর গা-বেঁধে দিত মন্তর পড়ে। খালি একবার মাত্তর হাড়হাঁজায় চুম্বন করেছিল কাকাকে—তাছাড়া গায়ে আঁচড়টিও লাগেনি কখনও। আমার মা-ও জানে, ঠাকুরমাই শিখিয়েছিল মাকে। জিগ্যেস করে দেখবে

, তাই মা বলে, আমি এখান থেকেই মন্তর পড়ে দিচ্ছি তোমাদের কোনো ডর নেই! গা-বাঁধার মন্তর!

মা-কে বলো ওই দেহাতি-মন্তরের অ-তো রেঞ্জ নেই। ওই মন্তর পড়তে গেলে এই দেশে পদার্পণ করতে হবে

মা-কে তো কতবার বললাম। মায়ের এখানে আসবার ইচ্ছে আছে, জানো। কিন্তু বাবা

ণ্ডুষ মাত্র জলেন সফরী ফরফরায়তে তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন বোষ্টুম। বাবার হচ্ছে এই অবস্থা, বুঝলে। ওই বোঁটা-মুচকুন্দপুরের ডাঙাতেই বাবার যত হম্বিতম্বি—আরামকেদারাটিতে এলিয়ে উনি শুধু মানসভ্রমণ করবেন

আপন নামকরণ নিয়ে সর্বেশ্বর চাটুজ্জ্যের উপর রাগ-অভিমান বরাবরই আছে বোষ্টুমের—এখন আবার যোগ হয়েছে খোকার নামকরণটাও। অবিশ্যি সেসব কখনো খোলাখুলি প্রকাশ করেন না বোষ্টুম—অষ্টমঙ্গলের নাম-এ সর্বমঙ্গলার নামের প্রাধান্য নিয়ে তিনি যে মোটেই ভাবিত নন—এসব তুচ্ছ ব্যাপার তিনি ধর্তব্যের মধ্যেও আনেন না—এইরকমই হাবভাব। কিন্তু অন্দরের গরম হাওয়া খালিখালি প্রস্থানপথ খোঁজে বোষ্টুম মাঝেমাঝেই বাবার প্রতি গুপ্তক্ষোভটি নানান ফর্ম্যাটে মুক্ত করে ফেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই সাবধানী হয়ে যান—অভিঘাতটি কড়া হয়ে গিয়েছে বুঝলেই সাবধানী হয়ে পড়েন।

সলে বাবা আর কী করবে বলো—বাবার করার কিছুই নেই গরম হাওয়া পরিপাক করতে করতে বললেন বোষ্টুম। ঠাকুমা-ঠাকুর্দা কী বাবা বিনে একদিনও রইতে পারেবাবা ঘরের কোণটি ছাড়লেই ওদের আত্মারাম ইস্তফা দেয় ঠাকুর্দা কিছুতেই চায় না ওর বড়ো ব্যাটা ওদের ছেড়ে বিদেশে যাক। আর কোন মা-বাপই সেটা চায়!

মিও চাই না বোষ্টুমের কথাটি লুফে নিয়ে বললেন সর্বমঙ্গলা। মার খোকনও দেশেই থাকবে। আমি ওকে কোত্থাও ছাড়ব না। ষ্টমঙ্গলের ফিনফিনে চুলগুলিতে আঙুল চালাতে চালাতে বললেনঅষ্টমঙ্গল নিজের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি লেহন করতে করতে মায়ের দিকে চাইল, চোখে সম্মতি যেন।

খোকার দেশ আর তোমার দেশ তুমি যে গুলিয়ে ফেললে, গিন্নি!

মার খোকার দেশই আমার দেশ

না, হল না। তথ্যগত ভুল আছে। পাসপোর্ট অনুযায়ী খোকার দেশ তোমার বিদেশ

তাহলে বাবা খোকা বিদেশেই থাকুক, দেশে থেকে ওর কাজ নেই

শুনে বোষ্টুম হাসতে লাগলেন।

চ্ছা শোনো না, খোকনের গা-টা তুমিই বেঁধে দাও তবে, যা সব ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানা করছে ও

দূ, এসবের কোনো ভিত্তি আছে নাকি? যত্তসব বালখিল্য ব্যাপার স্যাপার!

তোমার যে মাঝেমাঝে কী হয়! ওই দোকানটার সামনে দাঁড়ালে, আবার তুরন্ত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লে, খোকনকে খাওয়াতেই দিলে না। এখন আবার এইসব আধিদৈবিক মন্ত্র পড়ছ বছর তিনেক বিয়ে হয়েছে সর্বমঙ্গলার, তবু স্বামীকে এখনও ঠিকঠাক সমঝে উঠতে পারলেন না। মেজাজমর্জি অ্যাতো দ্রুত এদিক ওদিক হয়ে যায় লোকটার।

টা ভালো জায়গা না, বললাম না। এবার একেবারে চিড়িয়াখানাতেই খাওয়াবে ওকে প্রাপ্তবয়স্কদের আমোদসামগ্রীর দোকান অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ-এর সামনে পার্ক করে ফেলেছিলেন গাড়িটাকে ভুল বুঝতে পেরে ঊর্ধশ্বাসে সেই চত্বর থেকে পালিয়ে এসেছেন বোষ্টুম। মার্কিনদেশের এই সমস্ত বেলেল্লাপনা একদম পোষায় না বোষ্টুমের। সর্বমঙ্গলাকে সর্বদা এইসব অপসংস্কৃতি থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে এরকম সেন্সরশিপ করাটা তিনি নিজের অধিকার হিসেবেই দেখেন

ট্রাফিক সংকেত এখন সবুজ। বোষ্টুম ধীরে ধীরে অ্যাকসিলেটরে চাপ দিলেন। অষ্টমঙ্গল এখন জানালার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে আবার।

 

দীঘলগাঁ তার সনাতন চরিত্তিরটি খুইয়েছে এই কিছুদিন হল। সাতের দশকেও এখানের দুর্গাথানে সান্ধ্যকালীন জমাটি আসর বসেছে ত্রৈলঙ্গের ঠাকুর্দা রামরাম রায় শহরের কারখানা থেকে ফিরে তাঁর ইয়ার-দোস্তদের সঙ্গে মজলিশ করেছেনত্রৈলঙ্গের বাবা রামবন্ধু তখন যুবা—ছেলেছোকরারা মিলে ‘কৃপণের ধন’ নাটকের মহড়া দিয়েছেকালীপুজো দুর্গাপুজো হয়েছে—ভবভূতিদের বাড়িতে সত্যনারায়ণের সিন্নি নিতে গিয়েছেন রামবন্ধু, আদিম রায়রাপয়োনিধির হরির লুটের বাতাসা কুড়িয়েছে বীচিভঙ্গদের বাড়ির ছেলেরা। বৈশাখ মাসে ও-মুড়োর ধারাস্নানের ছোলাগুড় প্রসাদ নিয়েছে এ-মুড়োর কচিকাঁচারা, সন্ধেয় উদ্দাম নাম-সংকীর্তন করেছে খোল-কর্তাল বাজিয়েবৈবস্বত মিছিরের ঢেঁকিতে চাল কুটতে এসেছে—ভবভূতির মা—আদিম রায়ের বোনের বিয়ে বেবাক গাঁয়ের লোক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উতরে দিয়েছে। আটের দশক নয়ের দশক নতুন শতাব্দীর শুরু এইভাবেই পেরিয়েছে। তারপর থেকে অদ্ভূত এক ব্যারাম হয়েছে গাঁ-টার। দীঘল গাঁয়ের গোলদিঘিতে লাল-সবুজ-গেরুয়া শালুক ফুটতে লেগেছে, আর তাতেই বেধেছে আকচাআকচি। পঞ্চায়েতের তবিল দখলে রাখার লড়াই। গাঁয়ে এর আগেও ধুন্ধুমার ঝঞ্ঝাট বেধেছেতা সত্ত্বেও পুলিশ আসেনি কস্মিনকালেও। গাঁয়ের প্রবীনদের চোখের সামনে সেসবও ঘটতে শুরু করেছেবৈকুণ্ঠ চাটুজ্জ্যেদের সঙ্গে ভবভূতিদের জমিসংক্রান্ত বিবাদটিতেও রাজনৈতিক রং লেগেছে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো শুরু হয়েছে। দুর্গাপুজা হচ্ছে নমোনমো করেগাঁয়ের এখন ছত্রখান দশা! বছরে একবার যাত্রাপালার আয়োজন করত দীঘল গাঁয়ের নবারুণ সংঘ এ বছর থেকে সেটিতে দাঁড়ি পড়েছেঅবিশ্যি সেটির পিছনে অন্য একটি কারণও আছে। যাত্রানুষ্ঠানের সারেং রামবন্ধু রায় তাঁর জীবনে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে কিছুদিন আগে। তাঁর ডাগর ছেলেটি তাঁর আর নেই কিছুদিন আগে দলমার হাতিরা অতর্কিতে পিষে দিয়ে গিয়েছে। তারপর থেকেই রামবন্ধু রায়ের পরিবারটি নিঝুম হয়ে গিয়েছে অকালমৃত্যু রামরাম রায়ের গুষ্টির ফি-প্রজন্মেই রয়েছেরামরাম রায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র রামকিংকরও কচিবয়েসেই মরে হেজে গিয়েছিল

বাত্সরিক যাত্রানুষ্ঠানে যে ছেদ পড়েছে সেটি জীবন কাবার হবার আগেই জেনে গিয়েছিলেন ত্রৈলঙ্গ। কিন্তু প্রাণবিয়োগ হবার পরেও যে অভ্যেস যায় না, বছরের এই সময়টা আপিসে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে গাঁয়ে ফেরা তাঁর অভ্যেস। জীবদ্দশায় কতবার তাঁর ম্যানেজার কার্পণ্য ঘোষ নানা অছিলায় তাঁকে সেই ছুটি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেছে! কিন্তু ত্রৈলঙ্গ দমেননি। একবার তো সামনে প্রজেক্টের গো-লাইভহস্তচালিত ব্যবস্থাটি পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে ত্রৈলঙ্গের কোম্পানির তৈরি সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা শুরু করবে ত্রৈলঙ্গদের ফিরিঙ্গি মক্কেল, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তখন তুঙ্গে, ছুটি-ছাটা সব নাকচ হয়ে যাচ্চ্ছিল প্রজেক্টের সবার—তবুও ত্রৈলঙ্গ পরোয়া করেননি। বাবা-কাকা-মামাদের পাউডার-ওষ্ঠরঞ্জক লেপে রংবাহারি পোশাক পরে শখের যাত্রাভিনয়, সম্মোহিত দর্শক শ্রোতাদের এনকোর এনকোর কলরব, হ্যালোজেন-স্পটলাইট-স্টপারের আলোয় দর্শক আর মঞ্চের চোর-পুলিশ, হারমোনিয়াম-সানাই-বেহালা-বাঁশির কনসার্ট—সব মিলিয়ে এক ঘোরলাগা অনুভূতি কোনোমতেই হাতছাড়া হতে দেননি ত্রৈলঙ্গ। পরাণ পাখিউৎপিঞ্জর হবার পরেও অভ্যেসবশত এবারও এসেছেন দীঘলগাঁয়ে। দীঘলগাঁয়ে পালাগান নেই, কিন্তু পাশের গাঁ লালটুকুরির মাঠে এবারও হচ্ছে দু-রাত্রিব্যাপী যাত্রানুষ্ঠান। ত্রৈলঙ্গ এবার লালটুকুরির মাঠেই যাবেন। শুধু ত্রৈলঙ্গ নন সঙ্গে আছেন কাঙালচরণ মুখুটিময়দানে দুজনের আলাপ হওয়া ইস্তক ভালোই জমেছে ত্রৈলঙ্গ আপন গাঁয়ে যাবেন শুনে বৃদ্ধ কাঙালও ঝুলে পড়েছেন। আসলে ত্রৈলঙ্গকে দারুণ পছন্দ হয়েছে কাঙালচরণেরপরলোকে এসে ছোকরার সঙ্গে তাঁর আলাপ, অথচ তাঁর মনে হচ্ছে যেন ছোকরাকে তিনি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। সংস্কৃত-শিষ্ট-ভাবুক-স্বল্পবাক্ ছোকরা, আহা গতজীবনে এইরকম একটি নাতি যদি তাঁর থাকত! বিয়ে-থা করলে কাঙালচরণের তো ত্রৈলঙ্গের বয়সীই একটি নাতিসাহেব হবার কথা। আজকালকার যুগের ফোক্কড় ছেলেপিলেদের মতো নয় তার দাদুভাই, তাঁরই মতো যাত্রা-থিয়েটার-নাটক-নভেল নিয়ে সে মাথা ঘামায়, ফণীভূষণ-বিদ্যাবিনোদ-অহীন্দ্র চৌধুরি-পঞ্চু সেন-স্বপনকুমার-ব্রজেন দে-ভৈরব গাঙ্গুলির খবর রাখে, সে সম্বন্ধে পড়াশোনাও আছে। মহানগরীতে রোজ সন্ধেবেলা গঙ্গার পশ্চিমপাড়ের একটি বৈঁচিগাছে তাঁরা যাত্রা-থিয়েটার-কবিতা-নভেল সম্পর্কিত বৌদ্ধিক আলোচনা করেন, কখনো কখনো ত্রৈলঙ্গ তাঁর গতজন্মে লেখা পদ্য আউড়ান, কাঙালচরণ বর্গী এলো দেশে-শের আফগান-কবরের কান্না-সৈনিক ধর হাতিয়ার থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে পার্ট আওড়ান। দু-একজন ভোম্বল প্রেত ভাঙা ক্ল্যারিওনেট নিয়ে জমায়েত হয় আড্ডাটা জমে যায়। তাই -দুয়েক কিলোমিটার ওড়াটা তাঁর অ-শরীরের পক্ষে পেরেশানি জেনেও আর একাকী থাকতে চাননি কাঙাল। ত্রৈলঙ্গও আপত্তি করেননিবৃদ্ধের তালে তাল মিলিয়ে উড়ান চালাতে গিয়ে রাত্তির কাবার হয়ে গিয়েছে—দুশো কিলোমিটার ব্যোমযাত্রা করতে গিয়ে দু-বার প্রেতবিশ্রামশালায় লম্বা হতে হয়েছে। বিশ্রামশালাতেই কাঙাল তাঁর জীবনের ইতিহাস খুলে বলেছেন ত্রৈলঙ্গকেকাঙালের মুখে যাত্রাসম্রাজ্ঞী প্রম্লোচ্চাকুমারীর নামটি শুনে চমকে গিয়েছেন ত্রৈলঙ্গপ্রম্লোচ্চা কুমারীনামটি ত্রৈলঙ্গ রায় শুনেছিলেন ঠাকুর্দা রামরাম রায়ের কাছে। যাত্রামোদী মানুষ ছিলেন ঠাকুর্দা, কলকাতার দলের যাত্রা শোনার সুযোগ পেলে ছাড়তেন না—বেলটিকুরির মাঠ, বড়শাল-চাঁদবাইদের মাঠ, নদী পেরিয়ে কয়লা শহরেও যেতেন যাত্রা শুনতে। কোলিয়ারির মালিকরা সেসময় ছিল যাত্রার পৃষ্ঠপোষক বিনা টিকিটে যাত্রা দেখার দেদার আয়োজন হত। নট্টমন্দির অপেরার এন্তার যাত্রা দেখেছিলেন সেই সময়—প্রম্লোচ্চা দেবী তখন নট্টমন্দিরের নায়িকা। ত্রৈলঙ্গ ছোটোবেলায় সেসব গল্প বহুবার শুনেছেন ঠাকুর্দার মুখে, ঠাকুর্দা দাঁত খুইয়ে ফকফকে হয়ে গিয়েছিলেন, তবু গল্পের বিরাম ছিল না!

দীঘলগাঁয়ে ত্রৈলঙ্গ রায়ের আশ্রয়স্থল এবার বিয়াইপাঁশ-এর থাননিজের ভিটের পশ্চিমদিকের যে বেলগাছ, সেখানেই আশ্রয় নেবেন বলে ভেবেছিলেন প্রথমেকিন্তু অসুবিধে জেনে সেটি বাতিল করেছেন। খোকা জ্যাঠামশাই কালীকিংকর রায়ের বাস সেখানে। খুদে প্রেতটির সামনে সবধরণের গল্প করা যায় না। কাঙালচরণ আছেন, একানড়ে ফ্যারাও, সদগোপ আসে যাত্রা-থিয়েটার-সিনেমা নিয়ে আলোচনা হয়, অ্যাডাল্ট গল্পও হয়। তাছাড়া বেলগাছটার আশেপাশে বাবা রামবন্ধু রায়ও ঘোরাঘুরি করেন এসব ব্যাপারগুলো এড়াতেই এই আস্তানার নির্বাচন। আর তাছাড়া গাঁয়েগঞ্জে বিয়াইপাঁশ-এর থানের সঙ্গে ত্রৈলঙ্গের নাড়ির যোগ—নবজাতক ত্রৈলঙ্গের নাড়ি-সেঁকা ছাই এই বিয়াইপাঁশের থানে—এই মনকুড়কুড়ি গাছের তলায় সেই আটের দশকের শুরুর দিকে রেখে গিয়েছিল দাইবুড়ি।

বিয়াইপাঁশের থানে মনকুড়কুড়ি গাছের গুঁড়িটি গাট্টাগোট্টা কিন্তু উচ্চতায় খাটোঘন ডালপালায় আচ্ছন্ন। এই গাছটির জিম্মায় নবজাতকের নাড়ি-সেঁকা ছাইপাঁশ রেখে যাবার প্রথা দীঘলগাঁয়ে চলে আসছে সেই তাম্রযুগ থেকেগাঁয়ে বাচ্চা জন্মের সময় থেকেই দাইবুড়ি আগুন জ্বালায় আঁতুড়ে। সেই আগুনে বাচ্চার সেঁক-তাপ হয়, নাড়ির সেঁক হয়আগুনের ভয়ে ভূত-পেরেত-জন্তু জানোয়ারেরা আঁতুড়ের কাছ ঘেঁষতে পারে না। চারদিনের দিন ছাই নিভিয়ে দেওয়া হয় পাঁচদিনের ভোরে আঁধার থাকতে থাকতে একটি গোবরলেপা ঝুড়িতে ছাই কুড়িয়ে, সেই ছাই-এর উপর প্রদীপ জ্বালিয়ে সবার অলক্ষে সেটি দাইবুড়ি রেখে আসে মনকুড়কুড়ি গাছের তলায়। আর নবজাতকের পূর্বপুরুষেরা এই মনকুড়কুড়ি গাছের আনাচেকানাচে উসখুশ করে বেড়ায় সেই নাড়ি সেঁকা ছাই-এ নবজাতকের গায়ের গন্ধ অনুভব করে আর নবজাতকের শুভকামনায় সারারাত গান গায়:

খোকার দুয়ারগোড়ায় যা

দিবি বাবলা কাঁটায় পা

নিয়ে রক্ত পুঁজের ঘা

সারা জীবন জ্বলে যা-

বজাতকের লেট পরমাত্মীয়দের খুব খুব ইচ্ছে করে আঁতুড়ে ভিড় জমানোর। কিন্তু আঁতুড়ের বজ্র-আঁটুনি ভেদ করার হিম্মত তাদের থাকে না বিয়াই-পাঁশের থানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলছিলেন ত্রৈলঙ্গ রায়।

তুমি অ্যাতোসব কোত্থেকে জানলে,ভাই? বিয়াই-পাঁশের থান আমাদের গাঁয়েও আছে, কিন্তু অ্যাতো হিস্টিরি তো শুনিনি একানড়ে ফ্যারাও বলল।

লকাতায় বসবাস হলে কী হবে, দাদুভাই আপন ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ভোলেনি বললেন কাঙালচরণ।

বাবার মুখে শোনা এ সব। লিখেও রেখেছিলাম খাতাতে। ইচ্ছে ছিল গড়ুরপঙ্খী পত্রিকায় এ-নিয়ে একটা উত্তর-আধুনিক পদ্য লিখব। সে আর হয়ে উঠল কই! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ত্রৈলঙ্গ রায়।

আঁতুড়-টাঁতুড় এখন আর গাঁয়েগঞ্জেও হয় না, ভাই ত্রৈলঙ্গ। পোয়াতিরা সব সদর-হাসপাতালে যায়

সে তো এই গাছের তলাটা দেখেই মালুম হচ্ছে ফ্যারাও। এই থান ছাইভর্তি ঝুড়িতে গিশগিশ করত দেখেছি এককালেবেশিদিন আগের কথা নয়, বাচ্চা জন্মানোর তিনদিনের দিন ইচ্ছেময় গুণিন সরষেপোড়া ছড়িয়ে দিত আঁতুড়ের চারপাশে—আমাদের আটকানোর জন্য। -দিনের দিন হত ষষ্ঠীপুজো। আঁতুড়ের দুয়ারের বাইরের দেয়ালে দুদিকে রক্ষী হিসেবে গোবরের গোল্লা, হলুদ রাঙা ন্যাকড়া আর কড়ি রাখা হত। আর ওদিকে মনকুড়কুড়ি গাছের ডালে বসে থাকা নবজাতকের পূর্বপুরুষেরা হা-হুতাশ করত আর বলত—হায়, সন্দেহবাতিক হীনচেতা মনুষ্যকুল, তোমরা জান না যাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য অ্যাতো আয়োজন, তারা তোমার নবজাতকের মঙ্গলকামনায় একুশ দিন ধরে মনকুড়কুড়ি গাছের তলায় প্রার্থনা আর গান করে

কুশ দিনের নিয়মটা আমিও জানি, দাদুভাইআমাদেরও মানে ওটাকিন্তু বাগবাজার স্ট্রিটে কোনো বিয়াইপাঁশের থান আছে বলে কদাচিৎ শুনিনি। এবারে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে দেখচি বললেন কাঙালচরণ।

 

 

ওদিকে কৈটভ আর ভ্যাঁচানন্দ মিলে দিনক্ষণটা এঁটেছে অনেক ভেবেচিন্তে। অমাবস্যার নিশি, দীঘলগাঁয়ের লোক ঝেঁটিয়ে যাচ্ছে লালটুকুরির মাঠে ফোকটের যাত্রা শুনতে, ঘরে পড়ে থাকবে বুড়ো হাবড়া বাতিলের দল, টেঁঠা-বল্লম-তির-ধনুক নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোরও সাহস হবে না কারো। আর গাঁয়ের যা ছন্নছাড়া অবস্থা, কেউ কারো হয়ে ওসব নিয়ে খাড়াও হবে না।

কৈটভ কোমরে গুঁজে রাখা ধাতব অস্তরটায় হাত ছুঁইয়ে দিল ভ্যাঁচানন্দের।

দি কেউ বেগড়বাঁই করে গুলি চালিয়ে দেব ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল কৈটভ

কে দিলেক তুমাকে হে? কুথা থিকে পেইলে? ভ্যাঁচানন্দ এ জিনিস আগে দেখেছে কী না সন্দেহ। সে তো আর অপরাধজগতের লোক নয়। দু-বার শাবলগাঁইতি চালালেই যদি তাদের জমি উথলে কয়লা বেরোয়আর সেই কয়লা বিক্রি করে যদি তার টু-পাইস আয় হয় তাতে  অপরাধটা কোথায়! নিজের শাবল নিজের গাঁইতিনিজের মুনিশবাপঠাকুর্দার জমি আর জমির নীচের মালটাই সরকারের—এ কেমন ধারার কথা! কয়লা ব্যাবসার সঙ্গে এই চত্বরে প্রায় সবাই জড়িতকয়লার ওপর ভর করে সবার হাঁড়ি চড়ে এখানে। ওই যে বৈবস্বত মিছির—যদিও সে কয়লা-ব্যাবসায় নেইতবু তার মুদিখানা চলছে তো ওই কয়লা ব্যবসায়ীদের খরিদারীতেই। তা না হলে, যেই পুলিশের কেরদানিতে কয়লা-ব্যাবসা বন্ধ হল—ওমনি বৈবস্বত মিছিরের ভিখ মাগার মতো অবস্থা হল কেন! হ্যাঁ সত্য বটে! কয়লাখাদানগুলো সিল করে দেবার পর থেকে হাহাকার পড়ে গিয়েছে এই চত্বরের গাঁগুলোতে। চাষবাস সেরকম হচ্ছে না, চাকরিবাকরি নেই, কলকারখানা নেই। মৌরিগাঁয়ের ভ্যাঁচানন্দ তাই বাধ্য হয়ে কৈটভের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কৈটভ লোকটার সঙ্গে তার আলাপ কয়লার ব্যাবসার সূত্রেই—সে শহরের একটি রাজনৈতিক দলের পোষ্য, দীঘলগাঁয়ের জঠরে গুম হয়ে থাকা গুপ্তধনের টানে সে মাঝেই মাঝেই এই চত্বরে ঢুঁ মারত। খাদান ব্যাবসায় ভরাডুবি হবার পর তার রোজগারেও টান পড়েছিল—সে-ই ভ্যাঁচানন্দকে এই আইডিয়াটা দিয়েছিল। দীঘলগাঁয়ের রামবন্ধু রায়ের বাড়িতেই এই মাগ্‌গিগণ্ডার বাজারেও বেশ সাচ্ছল্য—এই খবরটা কৈটভকে সরবরাহ করেছিল ভ্যাঁচানন্দতাছাড়া তাদের বড়োছেলেটার সবে অকালমৃত্যু হয়েছেওদের আর চ্যাঁঘ্যাঁ-ই নেই—হামলা করার এটাই বড়ো জুত—ভ্যাঁচানন্দ বুঝিয়েছিল কৈটভকে।

ভালো ভালো মাল কড়ি আছে তো, হ্যাঁ হে? কৈটভ জিগ্যেস করেছিল ভ্যাঁচানন্দকেএই নিয়ে পঞ্চাশবার তাকে এই নিয়ে খেচরেছে কৈটভভ্যাঁচানন্দ এবার বিরক্ত হল।

তবার বইলব হে তুমাকে। আমি অনেক ছুটুবেলা থিকে ইউয়াদের ঘর যেথম, উয়াদের বড়ো ব্যাটাট ছিল আমার বন্ধুউয়ার মায়ের অনেক গয়না লুকানো আছে টিনের একট বাক্সাতে

লছ! আর টাকা-পয়সা?

চালের কুচুড়িতে গুঁজা থাকে। আর কুয়াতলার দিকে একট গত্ত আছে

তুমি জান কোন জায়গাটায়?

তুমার মেসিন আছে ত, জেনি লিব নিজের বরাখঁচ চুলে হাত বোলাতে বোলাতে খিঁক খিঁক করে হাসল ভ্যাঁচানন্দ

গোলদিঘির এই পুকুড়পাড়ের ঝোপে বিস্তর মশাদু-চারটে ইতর পোকামাকড়ও হঠাৎ হঠাৎ বিঁধে দিয়ে যাচ্ছে, বুথলুম্‌পুপেন্টুলটা তাও অনেক বাঁচিয়ে দিচ্ছেভ্যাঁচানন্দ উসখুস করতে লাগল। বড়ো-একনাথের আসার কথা ছিল ন-টায়—ও এলে আরেকবার ছকটা ঝালিয়ে নেওয়া হত, তাছাড়া আরো কিছু শুকনো অস্তরও নিয়ে আসবার কথা ওর - দশটা বাজতে চলল বেল্লিকের ব্যাটার এখনো টিকিটির দেখা নেই। দংশনযন্ত্রনা ভুলতে ভ্যাঁচানন্দ আরো এক ঢোক ঝাঁঝাঁলো তরল গলায় ঢেলে দিল। খিদে খিদেও পাচ্ছে একটু একটু, সেই কোন সন্ধেয় লালটুকুরির যাত্রা-শালায় সেদ্ধ ডিম, লবঙ্গলতিকা আর চারটে জিলিপি খেয়ে এসেছে।

গুখোর ব্যাটা একনাথের যে কী হল! কৈটভও বিরক্ত হল।

কট ফোন কর না কেনে, তুমার ত ফোন আছে

ধঘণ্টা আগেই তো করলাম হে, আমার আর ব্যালেন্স নাই। তোমার ফোনটা কই?

হঃ! বিচে দিলম, পেটের ভাত জুইটছে নাই, আবার ফোন! গামছাটা মুখে জড়িয়ে নিতে নিতে বলল ভ্যাঁচানন্দ

ল রেডি হঁইয়ে লাও, ওই দেখ গাঁয়ের লোক দল বেঁইধে সব যেইছে। গোলদিঘিট পিরালেই আমরা গাঁয়ের দিকে রওনা দিব ভ্যাঁচানন্দ তাড়া দিল, বড়োএকনাথের জন্য আর অপেক্ষা করতে রাজি নয় সে। লাল টুকুরির যাত্রাশালের রিঙ খেলায় একটা চাকু জিতেছে আজ, সেটা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেবে।

(ক্রমশ…)

 
 
top