ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

অক্কা পেতেই ষড়-ইন্দ্রিয়গুলো যে ভালোই চৌকস হয়েছে, তা বেশ উপলব্ধি করেছেন ত্রৈলঙ্গ রায় মহানগরীর মেস-বাড়িতে বসে তিনি অন্য-ওয়ার্ডের শুঁটকি-রান্নার বিটকেল গন্ধ পেয়েছেন, লাহাঙ্গা উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির শার্সি দিয়ে গূঢ় রমণের ছবি পষ্ট দেখতে পেয়েছেন। বিয়াইপাঁশের থানে বসে স্বেদ-মদ্যের গন্ধ পাচ্ছেন অনেকক্ষণ থেকে, মাঝেমাঝে গুজগুজ শব্দ কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেপ্রথমে অতটা গুরুত্ব দেননি ত্রৈলঙ্গ রায়,গাঁ-গঞ্জের নিশিকালের চরিত্তির তিনি বিলক্ষণ জানেন। নৈশাহারের পর গ্রাম্য-পুরুষেরা পুকুরপাড়ে হাজির হয় টর্চহাতে, আঁধারের চাদর মুড়ি দিয়ে নিকট দূরত্বে বসে প্রাকৃতিক কর্ম আর জলশৌচ সারতে সারতেই তারা পরস্পরের সঙ্গে বাত্‌চিত করেকখনো সখনো পেটে বঙ্গ-ব্র্যান্ডের সুরা থইথই করেএসব তলিয়ে ভাবেননি তিনি, আর তাছাড়া কাঙাল-একানড়ের সঙ্গে খোশগপ্পও জমে উঠেছে ততক্ষণেঅশরীরীদের আড্ডা মজলিশ মানে অবধারিতভাবে পেজোমি, লোচ্চামি, ফেলসানি, বাটপাড়ি আর আদিরস নিয়ে জমজমাট আলোচনা। পরমত অসহিষ্ণুতার জন্য কখনও বিশৃঙ্খলা হয় সেখানে, স্বভাবখুনে একানড়ে বা পেঁচো-পুশ্‌করা জুটলে তো লঙ্কাকাণ্ড বাধে কিন্তু একানড়ে ফ্যারাও, বেম্ম কাঙালচরণ বা ত্রৈলঙ্গ রায় স্বভাবনিরীহ, শিক্ষাদীক্ষাও আছে খানিক এদের আড্ডা জুড়ে সাহিত্য-নাটক-যাত্রা থাকে, প্রেম-বিরহের মতো নিষ্পাপ বিষয় থাকে। কাঙালচরণ অ্যাতোক্ষণ নটনিধি স্ফোটনকুমারের অভিনয়শৈলী করে দেখাচ্ছিলেন। যুবা বয়সে কাঙালের গলার আওয়াজটি ছিল মিহি, এখন বয়সের ভারে আর কিঞ্চিত শ্লেষ্মার প্রকোপে বেশ খোলতাই হয়েছে। কিষ্কিন্ধ্যা কেশরী পালায় কিষ্কিন্ধ্যারাজ বালীর পার্ট করতেন স্ফোটনকুমারমহিষরূপী দুন্দুভির শিং মটকে দিয়ে রোমহর্ষক এক হুংকার ছাড়তেনসামনের সারির দর্শকরা বাপ্‌ বলে পিছনে হটে যেতসেই ডাকটি ভালোই আয়ত্ত্ব করেছেন কাঙাল। আজ এমন একখানা হুঙ্কার তুললেন, গোটা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে কাঁপন ধরে গেল তাঁর অভিনয়গুণে আশেপাশে বহু বিচিত্র দত্যি-দানোর জমায়েত হয়ে গিয়েছিল, তারা সব শৃগাল আর হ্রেষাধ্বনি দিয়ে বাহবা জানাল। খুব নীচু কক্ষপথে উড়ে যাচ্ছিল এক যমপেয়াদা, আচমকা নাদের অভিঘাতে ঝুপ করে তার মর্ত্যে ঝরে যাবার জোগাড় হল হ্রেষারব শুনে নবতিপর কাঙাল দৃশ্যটির পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই বেয়াড়া যমপেয়াদার শাসানিতে ক্ষান্ত হলেনএরপর একানড়ে তার নিরুচ্চার প্রেম কাহিনিটি শোনাচ্ছিল। দীঘলগাঁয়ের বালিকা মন্দাকিনীর প্রতি সে দীর্ঘদিন আকৃষ্টএকানড়ে যে ইস্কুলের মাস্টারমশাই, মন্দাকিনী সেখানের ছাত্রীমন্দাকিনী চতুর্থ শ্রেণি, বাপ-মায়ের উদাসীনতার জন্য লেখাপড়া শুরু করতে বেশ বিলম্ব হয়েছিল, এখন সে গোটা একটি কিশোরীবেশ ডাগর-ডোগর। নাক-মুখের গড়ন ভালো, গায়ের রঙ তোফা তবে ওদের বংশে লোম আর চুলের খুব বাড়বাড়ন্তএই বয়সেই গোঁফের রেখা গজিয়ে বসে ছিল। যদিও ওসব নিয়ে একানড়ের কোনো ছুঁতমার্গ ছিল না, আজকালকার যুগে লোম-রোম-চুলের আগাগোড়া চেঁছে নিমেষে ঘৃতাচী বনে যাওয়াটা কোনো ব্যাপার নাকি! একটু পাউডার আর রঞ্জক লেপে যত্ন করে সাজিয়ে গুজিয়ে দিলে কলকাতার মেয়েদেরও হার মানিয়ে দিত মন্দাকিনী মানে মন্দিঅল বেঙ্গল প্যারা-টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের মিটিং ছিল একটা কলেজ স্ট্রিটে, ওই একবারই কলকাতা গিয়েছিল ফ্যারাওতখনই দেখেছিল কলকাতার বিটিদের, প্রেসিডেন্সি কলেজের বাইরে সব তামুক খাচ্ছেওফ সে কী চটক চেহারায়। মন্দি যদি জামা-পেন্টুল পরে আর একটু গন্ধ-সাবান টাবান মাখে, ওইরকমই বনে যাবেকল্পনা করেছিল ফ্যারাওপ্রথম সে আড়চোখে দেখেছে মন্দিকে, মন্দি বরাবর বাঁদিকের সারিতে বসেছে, ওর ডানপাশে মৌরিগাঁয়ের শিশু বটকৃষ্ণ বাউরি আর বাঁপাশে দীঘল গাঁয়ের লেদেম সাঁওতাল ধীরে ধীরে সাহস বেড়েছে, নবগণিত মুকুল-এর চতুর্থ পাঠ পড়াতে গিয়ে ফ্যারাও মন্দির চোখে চোখ রেখেছেবটকৃষ্ণকে সরিয়ে মন্দির পাশে বসে দু-চারটে জটিল ভাগও কষে দিয়েছে, খানিকটা সময় নিয়ে গুণনীয়ক আর গুণিতক বের করে দিয়েছেএকটা ক্লাস-পরীক্ষায় মন্দাকিনীর প্রতি কিঞ্চিত পক্ষপাত দেখিয়ে ফেলেছে, -সা-গুটা না উতরেলোও ফ্যারাও পার্ট-মার্কিং করেছেইস্কুল অবসানের পর মন্দাকিনী যখন বটকৃষ্ণ আর লেদেমকে দু-পাশে নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছে, একানড়ে বীর হাম্বীরের মতো সাইকেল চালিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু সেই গুহ্যকথাটি কখনও পষ্ট করে বলতে পারেনি ফ্যারাওগা-গতর খোয়ানোর কয়েকদিন আগে ভেবেছিল মন্দাকিনীর গৃহশিক্ষক হতে পারলে বেশ হত, একটু একান্তে কাল কাটানো যেত। সেদিন ভোরবেলা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিল ধম্মপুকুরেখালি ভাবছিল কী করে মন্দাকিনীর বাপের কাছে কথাটা পাড়া যায়মন্দাকিনীর বাপ মনিহারী সামগ্রী বেচে বেড়ায় গাঁয়েগাঁয়ে, গৃহশিক্ষক রাখার মতো রেস্ত নেই।ভেবেছিল সটান বলে দেবে, র খুব বুদ্ধি, আমি ওকে পড়াব পয়সা লাগবে না কিন্তু ফ্যারাও-এর মতো জোয়ান ছোকরার মুখে এসব শুনে আবার অন্যকিছু যদি ভেবে বসে, যদি না-করে দেয়! আর সেই কথা যদি রাষ্ট্র হয়ে যায়লজ্জায় মাটিতে মিশে যাবে ফ্যারাও! এইসব নানারকম ভাবতে ভাবতেই সেই মারক ছোবল! তটিনী বাউরির কু-নজর এড়াতে গহিন ঝোপে সেঁধিয়ে গিয়েছিল কখন খেয়াল হয়নি, আর সেই সুযোগে ব্যাটা কাল কেউটে বিষ ঝেড়ে চলে গেলআর বেশি কিছু ভাবার তর পায়নি একানড়ে। তটিনী বাউরিই দেখতে পেয়ে সবাইকে খবর দিয়েছিল। তারপর থেকেই একানড়ের এই জীবন, মন্দাকিনীর টানে ত্রৈলঙ্গদের দীঘল গাঁয়েই বসত। মন্দাকিনীদের বাড়ির তালগাছে সন্ধেবেলা তাকে পাওয়া যায় রোজ, সেখানে সে খানিকক্ষণ বসে, মন্দাকিনী হ্যারিকেনের আলোয় কিশলয় পড়ে। ফ্যারাও চৌকিদারি করে, মন্দমতি একানড়ের তো অভাব নেই। গন্ধেগন্ধে তারা ঠিক হাজির হয়, মন্দাকিনীকে উত্যক্ত করে, নারীদেহের অন্ধিসন্ধির স্পর্শ নেয় ফ্যারাও সারা সন্ধে মন্দিকে আগলে রাখে, তার প্রেমের ক্ষয় নেইমন্দি সে কথা আগেও বোঝেনি, এখনও বোঝে না। বেচারা একানড়ে বরাবরের আটকপালেকোন্ ছোটোবেলায় মা-বাপ ঘাটে গিয়েছে, মামা-মামির সংসারে কষ্ট করে মানুষ। প্যারা-টিচার হয়েছিল কোনোরকমেতাও মরার আগে শুনেছিল সেই চাকরিও নাকি থাকবে না, আগের সরকারের দেওয়া সব চাকরি নাকি বাতিল হয়ে যাচ্ছে। যাক, পেটের দায় আর নিতে হয়নি, কিন্তু হৃদয়-টৃদয় নিয়ে এখনও নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছেজীবনে সেরকম শান্তি পায়নি সে, মরার পরেও কপালের ফেরে একানড়ে হয়েছেপড়েছে একপাল ফাজিল-বেহড়ের পাল্লায়! আজকের এই মজলিশে সেইসব দুঃখের কথাগুলোই খুলে বলছিল একানড়ে।

 

ওর হয়ে গেলে ত্রৈলঙ্গ রায় বিয়াইপাঁশের থান-এর স্থানমাহাত্ম্য বোঝাচ্ছিলেন ওদের দুজনকেওদিকে লালটুকুরির মাঠে যাত্রাপালা শুরু হবে আর একটু পরে, জোরকদমে ঘোষণা চলছে, অ্যাতোদূর থেকেও মাইকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আলোর রোশনির আভাষ পাওয়া যাচ্ছে পুব-দিগন্তেআজ মা মাটি মানুষ পালা, যন্তরমন্তর অপেরা। কলকাতার দলঅন্যায় যে করে, অন্যায় যে সহে নামক জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিকের নায়িকা এই পালার প্রধান চরিত্রেগাঁয়ের লোকরা সব হ্যারিকেন-টর্চ হাতে বেরুবার তোড়জোড় করেছে। ত্রৈলঙ্গরা কনসার্ট শুরু হলে রওনা দেবেন। এই সব জগঝম্পের মাঝে রামবন্ধু রায়ের নামটি কর্ণপটহে জোরসে ধাক্কা মেরেছে ত্রৈলঙ্গেরচমকে উঠেছেন ত্রৈলঙ্গ। দেরি না করে তিনজনে মিলে বেরিয়ে পড়েছেন এর উৎস খুঁজতে।

দাদুভাই, এতো দেখচি ডাকাতির মতলব মর্ত্যদেশের দুটো দু-পেয়ের বাতচিত শুনে বলেছিলেন কাঙালচরণ।

সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, দাদু। আমাদের বাড়িটাই টার্গেট চোয়াল শক্ত করে বলেছিলেন ত্রৈলঙ্গ

ই ছোকরাকে খুব চেনাচেনা লাগছে, ভালো করে দেখো তো, ত্রৈলঙ্গ ভ্যাঁচানন্দের দিকে আঙুল দেখিয়ে একানড়ে বলল।

মি আগেই চিনেছি, ভাইমৌরিগাঁয়ের ভ্যাঁচানন্দ!

ঠিক। দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে বলে ঠিক বোঝা যায়নি এক্কেবারে লফেডিগ্রিমার্কা ছোকরাআমি ভেবেছিলাম ব্যাটা ফেরঙ্গ রোগে মরছে অনেকদিন। কিন্তু তুমি একে চিনলে কি করে!

র নাড়িনক্ষত্র জানি ভাই, একানড়ে। একটা কয়লা-খাদানের মালিকানা ছিল ওর রোজগার করেছে যা, সব ফুঁকে ফেলেছেতবে হার্গিস ভাবিনি ভ্যাঁচা শেষে

র সঙ্গে আলাপ-পরিচয় আছে নাকি, দাদুভাই? কাঙালচরণ জিগ্যেস করলেন।

গে ছিল, দাদুছোটোবেলায় একসঙ্গে প্রাইমারি ইস্কুলে পড়েছি, একসঙ্গে খেলেছি কত। তারপর একদিন কিতকিত খেলতে গিয়ে সেই যে আড়ি হল, আর ভাব হল না

দাদুভাই তাহলে তো বেশ মুশকিল হল। ভেবেছিলাম ঘাড়টা টুক করে মটকে দেব, ল্যাটা চুকে যাবে। এখন তো একটু মুশকিল হল দেখচি। যতই আড়ি হোক, বন্ধু তো ছিল একসময় সেদিন ময়দানে একটি ছাগশিশুর ঘাড় মুচড়ে দিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাস জন্মেছে বৃদ্ধের, ঘাড় মটকানোর কাজটায় আর ক্লেশ হয় না ওঁর।

ভায়োলেন্স করবেন না, দাদু হা-হা করে উঠল ফ্যারাও সদগোপ।

ই একই ভুল করেছিল ত্রৈলঙ্গদের গাঁয়ের মেঁও বাড়ুজ্জ্যে, দারুন ফ্যাসাদে পড়েছে তারপর থেকে। ওর ইতিহাসটা জান তো, ত্রৈলঙ্গ?

মেঁওখুড়োর ইতিহাস জানি। সাতের দশকের কংগ্রেসি গুন্ডা অভিরাম বাউরির হাতে খুন হয়েছিল খুড়ো। বেম্মদত্যি হবার অনেকদিন পরে খুড়ো অভিরামের নাড়িভুড়ি চেটে-চুমুকে খেয়ে বদলা নেয়। তারপর থেকে অভিরাম-প্রেতের উত্পাতে খুড়োর প্রাণ ওষ্ঠাগত। শুনলাম অভিরাম এখানে ওর পুরোনো দলের শাখা খুলেছে, খুড়োর পার্টির অনেকেই দল ভেঙে যাচ্ছে ওখানে

তুন খবর হল, মেঁও বাঁড়ুজ্জ্যে এখন বিচারের ধান্দায় ঘুরছে, বিচার হয়ে যা হোক একটা শাস্তি হয়ে যাওয়া নাকি এর চেয়ে ভালো! একটা যমদপ্তরের পেয়াদাকে ধরে তোষামুদিও শুরু করেছে, যাতে গেরেফতারি পরোয়ানা বের করা যায়

মেও বাঁড়ুজ্জ্যে আর তোষামুদি! পেটি বুর্জোয়ার আচরণ! অবাক হলেন ত্রৈলঙ্গ।

সব এখন রাখো, দাদুভাই। এখন ওই ছোকরাকে শায়েস্তা করতে হবে। এখুনিই ওকে উচিত শিক্ষে না দিলে একটা অনর্থ বাধবে  চিন্তিত মুখে বললেন কাঙালচরণ। বৃদ্ধ প্রেতের মুখে চিন্তার ছায়া পড়লে ভয়ানক দৃশ্যদূষণ হয়।

চ্ছা, ত্রৈলঙ্গ, বেছে বেছে তোমাদের বাড়িটাকেই ভ্যাঁচা টার্গেট করল কেন আন্দাজ করতে পার? জিগ্যেস করল একানড়ে

হ্যাঁ,ভায়া, কিছুটা তো পারি খানিক চিন্তান্বিত গলায় বললেন ত্রৈলঙ্গ। মৌরিগ্রাম হাই স্কুলের পরিচালন সমিতিতে ছিল আমার বাবা, সেবার একটা কেরানির রেক্রুটমেন্টের ব্যাপারে ভ্যাঁচানন্দের বাবা খুব ধরেছিল আমার বাবাকে। ভ্যাঁচানন্দকে নিয়ে আমাদের বাড়িও এসেছিল। কিন্তু বাবা রাজি হয়নিযোগ্যতার ব্যাপারে বাবা কখনো ডান-বাম দেখেনিতখন থেকেই ভ্যাঁচার খুব ক্ষোভ শুনতে পাই

, হ্যাঁ মনে পড়ছে। ঘটনা খুব চাউর হয়নি সেই সময়, কিন্তু আমি খানিকটা শুনেছিলাম, আমার মামা ওই ইস্কুলেই ঘণ্টা দেয় কিনা। তোমার বাবার সততা তো এখানে মুখে মুখে ফেরে ফ্যারাও বলল।

ই রকম মানুষকেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে, ফ্যারাও, এঁদেরই দরকার খুব উৎসাহের সঙ্গে বললেন কাঙাল। মাদের কালে এইসব প্রজাতির মানুষ আকছার দেখা যেত, এখন আর সেরকম জন্ম হয় না এঁদের। এখন মানুষ শুধু হ্যাঁ-হ্যাঁ-র মিঠাই খাওয়াতে ব্যস্ত, না-না-র বড়ি খাওয়ালে দাম দিতে হবে যে! বড়োবড়ো সরকারি আমলা-পুলিশ আপিসাররা অশিক্ষিত নেতামন্ত্রীর হ্যাঁ-তে হ্যাঁ পুরে বসে আছে, এমনকী এক শ্রেণির তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদেরও একই আচরণ! মানুষ বলতেও এদের লজ্জা লাগে, এদের সঙ্গে সার্কাসের ভল্লুকের কোনো তফাত নেই। যাকগে, সেসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে, এই ব্যাপারটা নিয়ে আশু কিছু করা দরকার অস্থিরভাবে বললেন কাঙাল

হে,বীর্য্যবিবর্দ্ধিনী, বল দাও, বল দাও মা, বল দাও!

তিনজনে যুক্তি করতে লাগলেন এই পরিস্থিতির কীভাবে মোকাবিলা করা যায়।

 

ওদিকে মহানগরীর একপ্রান্তে এক পুকুরপাড়ে স্বয়ংবর সভার সব ইন্তিজাম নীলাম্বরী প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছে। নীলাম্বরী একা নয়, ছোলঙ্গ আর তার দলবল বেশ সাহায্য করেছে ওকেমহাদানা-বেম্ম-একানড়ে-পেঁচো-পুশ্‌করা-বুলানে-খোক্কস-স্কন্ধকাটা-মামদো সবার নিজের রুচি অনুসারে ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। পিণ্ডখর্জুর, দ্রাক্ষা, লড্ডুক, অমৃতমণ্ডা, অমৃতগুটিকা, কর্পূরমালতির দেদার আয়োজন করা হয়েছেআশেপাশের ফল-মিষ্টির দোকান সব চেঁছে নিয়েছে নীলাম্বরীর দল। সঙ্গে আঁশটে আর বোঁটকা গন্ধও রয়েছেচারদিক তোলপাড় করে ফ্যাঁসা, বাইন, কর্কট, বড়োশামুক, সরলপুঁটি, রাইখয়রা জোগাড় করে আনা হয়েছেপ্রতিযোগীদের আপ্যায়নে আকন্দ-ঘেঁটু-ঘণ্টাকর্ণ-গুলঞ্চর মালা, ধুতরোর রস, মদনানন্দ মোদক, আফিমগুলি, গঞ্জিকাও মজুত। অগুণতি উদ্‌বিড়াল গন্ধগোকুল ভাম ধরে রাখা হয়েছে টাটকা পরিবেশন করা হবে। প্রম্লোচ্চার শখ ছিল রোশনচৌকি বসানোর, কিন্তু পাখোয়াজ শিল্পীর অভাবে সেটা বাতিল করতে হয়েছেতবে নীলাম্বরী খালি গলায় উদ্বোধনী সংগীত গাইবেটুসু অঙ্গে একটি বিয়ের গান বেঁধেছে নীলাম্বরী, সেইটিই। বড় করিত্কর্মা মানুষ নীলাম্বরী, টুসু জানে আবার ঝিঞ্জিট-খাম্বাজও জানে! প্রেতদর্শন গেজেট তো প্রতিনিধি পাঠাবেইঅলৌকিক রেডিও থেকেও নাকি ঘটনাটা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছেসিধা প্রসারণ করা হলেও হতে পারে। পুকুর পাড়ের ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটার মগডালে পা ঝুলিয়ে প্রম্লোচ্চা বসবেন, আর তার পাশে নীলাম্বরী বসে সভা পরিচালনা করবেছোলঙ্গ প্রতিযোগীদের স্কোর লিখে রাখার কাজটা করবেনীলাম্বরী শেষ মুহূর্তে প্রশ্নগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেমোটমাট দশটা প্রশ্নষড়রিপুর প্রাবল্য যাচাই করাই উদ্দেশ্যইন্দ্রিয়লালসা, কৌমার্য ইত্যাদি নিয়ে একটি সোজাসুজি প্রশ্ন আছে শেষে। পৌত্রসম ছোলঙ্গের সামনে এই বিষয় তুলবে কী করে এ নিয়ে তিলেক চিন্তায় আছে ও।

অ্যাতো আয়োজনের পরেও জনসমাগম নিয়ে চিন্তার চোরাস্রোত একটা আছেই প্রম্লোচ্চাকুমারীর মনে। তবে আজকেই একটা খবর কর্ণগোচর হয়েছে, তাতেই ওঁর মনটা প্রফুল্ল হয়ে গিয়েছে বেশ

খবরটা অবিশ্যি প্রথমে বিশ্বাস হয়নি প্রম্লোচ্চার।

তুই সত্যি শুনেচিস, বলি হ্যাঁ লো লিলে? আমার দিব্যি গেলে বল্‌! সহচরী নীলাম্বরীকে শুধিয়েছেন তিনি।

ত্যি- সত্যি- সত্যি তোর দিব্যি! গেঁড়েগিরিধারীর পুকুরপাড়ে এই সভার খবরটা জিগ্যেস করেচে একটা ক-চি বেম্ম

তাটা বিশ্বাস হতে চায়না লো লিলে, আধুনিক নওজয়ানরাও আমার নাম জানে, আমাকে বে করতে চায়!

নায়িকারা ইতিহাস হয়ে গেলেও নায়িকাই থাকে লো! আর এ তো আমি আর বানিয়ে বলচি না, খোদ্‌ ছোলঙ্গ এনেচে খবরটা একটা কলকে ফুলের রস চোঁকরে টেনে নিতে নিতে বলল নীলাম্বরী।

ছোলঙ্গ,দাদু আমার, ঠাকুমার সঙ্গে ইয়ার্কি করচ না তো? ছোলঙ্গ অতিথিদের জন্য আনা দু-চারটে অমৃতগুটিকা গোগ্রাসে গিলছিল, প্রম্লোচ্চার প্রশ্নে একটু বেকায়দা হয়ে গেল।

হ্যাঁ গো, ঠাম্মা, পাকা খবর। ওই গাব গাছের পুশ্‌করাকে একজন জিগ্যেস করে গেছেকোনোকমে বলল ছোলঙ্গ।

-য়ং ছেলে? কেমন বয়েস? উজ্জ্বল মুখে জিগ্যেস করলেন প্রম্লোচ্চা।

পুশকরাটা তো বলল বিশ-বাইশের বেশি না। আর পুশ্‌করা বলবে কীআমরা যখন ঢ্যাড়া পিটছিলাম, যত রাজ্যের ছেলে-ছোকরা যেচে এসে খবর নিয়ে যাচ্ছিল

ব ঠিক বলেছিলে তো, দাদু গেঁড়ে গিরিধারী পুকুরপাড়সন্ধে সাতটা

লেছিলাম বলেই তো লোকে এই পুকুরপাড় অব্দি এসে খবর নিয়ে যাচ্ছে গো, ঠাম্মাপ্রম্লোচ্চাকুমারী নামটা যে জুত করে উচ্চারণ করতে পারেনি, কথাটা বেমালুম চেপে গেল ছোলঙ্গ।

তা ঠাম্মা, বলছিলাম কী, তোমার কাজ তো পেরায় হয়ে গেল, এবার আমাদের ইয়েটা একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল সে।

দেব,দাদু আমার, আর কটা দিন সবুর কর, এই কাজটা ফুরিয়ে যাকতারপর তোমাদের সবকটার জম্পেশ করে একটা বে লাগিয়ে দেব বললেন প্রম্লোচ্চাকুমারী।

আজ আকণ্ঠ মদনানন্দ মোদক খেয়ে এই আনন্দসংবাদটি উদ্‌যাপন করার ইচ্ছে হল ওঁর।

 

 

ঠাকুর,যাত্রা শুনতে যাও নাই নাকি? কনসার্ট তো বাজতে আরম্ভ হয়েছে – আর দেরি করলে তো ফার্স্ট সিনটাই মিস্‌ করবেন, আজ্ঞে

পেন্টুল-টেন্টুল পরার অভ্যেস নেই ভ্যাঁচানন্দের, লুঙ্গিতেই বেশি সচ্ছন্দ সেকৈটভের পরামর্শে আজ পরতে হয়েছে, এতে অপারেশন-এ সুবিধা। বেলাগাম পেন্টুলটাকে কোনোরকমে সামলিয়ে ভ্যাঁচানন্দ দীঘলগাঁয়ের দিকে আগুয়ান হয়েছিল, পিছনে আসছিল কৈটভ। বেমক্কাখোনা গলাটা শুনে একটু যেন চমকে উঠলরামঢ্যাঙা একটা লোক, সাত আট হাত লম্বা তো হবেই। দীঘল গাঁয়ের ফর্টিন বাউরির কোলের ছেলেটা খুব লম্বাভ্যাঁচানন্দের খাদানে কয়লা কাটত ছোকরা। একদিন কয়লাচুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল, ভ্যাঁচানন্দ খুব করে উত্তমমধ্যম দিয়েছিল ব্যাটাকে। কিন্তু সে কী অ্যাতো তাল ঢ্যাঙা ছিল নাকি! আর পাশে ওই দুটো সিড়িঙ্গে কারা! ভ্যাঁচানন্দের মদিরাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক কোনো কিছুই ঠিক ঠাহর করতে পারল না।

ক্যা বটিস র‍্যা? ফইর্টনার ব্যাটা নাকি? তুই গাঁয়ের মুড়ায় কী করছিস র‍্যা? যাঃ ঘর যাঃ ভাগভ্যাঁচানন্দ ধমকে উঠল।

কে হে ছেলেটা, চেন নাকি? কৈটভ জিজ্ঞেস করল ভ্যাঁচানন্দকে

হঁ হ্ঁ- শালা বাউরিপাড়ার ছিলা বটে, ব্যাটা মাল খেইনচে মনে হইচে মুখ দিয়ে ভক করে গন্ধ ছাইড়ছে- অ্যাই সইরে যা মুখের সামনেট থিকেখালভরা কুথাকার

খাসা হাইট, ভাবছি একটা ছিনতাই টিম বানিয়ে একে তার লিডার করে দেব। লম্বা পায়ে এক ছুটে পগারপার হয়ে যাবে বলল কৈটভ

তুমার ত খালি ওইসবই কথা। লম্বাচওড়া ছিলা দেখলেই টিম বানাবার কথা ভাব অত সহজে কি হয় হে পাইকার, অনেককিছু দেইখতে শুইনতে হয়। খোঁজখবর না কইরে এই ফইর্টনার ব্যাটাটকে খাদানে লাগাঁইছিলমব্যাটা এক নম্বরের চোরা, কুনু সততা নাই!

ভ্যাঁচানন্দের কথা শুনে একানড়ে পলাশবন তোলপাড় করে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল।

খাসা কথা বলেছ, ঠাকুর, সততা না থাকলে কোনো কাজেই সফল হওয়া যায় না, সে চুরি-চামারিই হোক আর দেশ-উদ্ধারই হোক!

কয়লা-খাদান নিয়ে কারবার করা লোক ভ্যাঁচানন্দ, কত হুঁদহুঁদে কালো অমাবস্যার রাত সে খাদ-ভসকার ধারে লিসাট হয়ে পড়ে থেকেছে, এই পলাশবন দিয়ে একা গুনগুন করতে করতে বীরদর্পে হেঁটে গিয়েছে, ভয়ভীতি কবে হজম করে ফেলেছে সেখাদানের বেটাদের যমেরও ডর নেই কিন্তু আজ ভ্যাঁচানন্দেরও একটু যেন হৃত্‌কম্প হল

গুখোর ব্যাটা, রাস্তাট ছাড়বি! থাইকত শালা তুরপুন, পেট ফাসাঁই দিতম তুর! এই কেটোবাবু তুমার মেসিনট বাইর কর ত! সেদিন ছেড়ি দিনছিলম, আজ ছাইড়ব নাই। শালার ব্যাটা শালাকে আজ গুলি কইরে মাইরব! চেঁচিয়ে বলল ভ্যাঁচানন্দ, ভয় পেলে চেঁচামেচি করতে হয়, সাহস বাড়েকিন্তু এই অবস্থায় কোলাহল ভালো না একদম, কাজের সময় কোলাহল মানে গণপিটুনিকৈটভ ভালো করে জানে সেটা।

হ্‌ থাম তো তুমি ভ্যাঁচা, অতো আঁড়ুচ্চে হলে চলে! ছেলে-ছোকরার দল, কোথায় যাত্রাশালে একটু জুয়া খেলবে, একটু মদ-মাড়ি খাবেতা না তুমি মিছিমিছি বকাবকি করছ ঠান্ডা গলায় বলল কৈটভ।

দাও, ওকে কটা কড়ি দিয়ে দাও, ও খুশি মনে খেলতে যাক। ও ভাই, কত চাই তোমার?

! ওই আঁটকুড়ার ব্যাটাকে টাকা লয় কেনে এখনি! অ্যাই, তুরা যাবি! খেঁকিয়ে উঠল ভ্যাঁচানন্দ।

কৈটভ দেখল ভারি বিপদ, ভ্যাঁচানন্দ খামোকা গোঁসা করে কিছু করে বসলেই সবটা পণ্ড। সে কানেকানে কিছু বলার চেষ্টা করল ওকে

(ক্রমশ…)

 
 
top