ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

১০

সেই কোন আদ্যিকালে লাগামটা কশে টেনে ধরেছিল ভারত সরকার, দুগ্গাপুরের ম-স্ত বাঁধটা দিয়েছিল, তারপর থেকে চালচলনে হড়বড়ে ভাবটা ঘুচেছে দামোদরের। চিত্তচাঞ্চল্যও নেই, যেন অহিফেনগুলি খেয়ে অনবরত ঝিমোচ্ছে বা কেউ বাণ মেরে আক্কেল ভণ্ডুল করে রেখেছেঅথচ কী সৃষ্টিনাশা রূপটাই না ছিল একসময়, করালভৈরব রূপ! খেতাবই জুটে গিয়েছিল দক্ষিণবঙ্গের দুঃখ আষাঢ়-শাওনে সে-কী দৌরাত্ম্যি, দুই পাড়ের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে কী নির্মম ধ্বংসলীলা! চল্লিশ সনের প্লাবনে তো দীঘলগাঁয়ের পোঁতনডাঙা অব্দি জল উঠেছিল, লুপ্তপিণ্ড হয়ে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রামএখনকার এই যে মৌরিগাঁ, এর প্রায় আটআনা দামোদরের গর্ভে লোকসান গিয়েছিল সেবারসময় থাকতে মৌরিগাঁ আরো দক্ষিণে পিছিয়ে যায়

এখন সাবেক মৌরিগাঁয়ের ভগ্নাবশেষ বলতে দামোদরের পাড়ের এই পোড়ো বাড়িখানা। ছোটো ছোটো ইঁটের দাওয়া—উঁচু দোতলাবাড়ি—মৌরিগাঁয়ের আগুরিরা আউড়েছিল বড় শখ করে, ফিরিঙ্গি এঞ্জিনিয়ার নকশা করেছিলকালের হুজ্জুতি সহ্য করে একতলাটা এখনো কুঁকড়ে খাড়া হয়ে আছে।  সিংদুয়ার-পাছদুয়ার সব হাঁ, পাথরের চৌহদ্দিখানা কবেই আত্মসমর্পন করেছেআর অন্দরমহলে প্রোটোজোয়া-মেটাজোয়া-সরীসৃপ-সন্ধিপদ-মেরুদণ্ডী-অমেরুদণ্ডী-বৃক্ষ-গুল্ম-বিরুতেরা সব নির্বিবাদে সংসার পেতেছে। 

 

প্রথমদিকে বাড়িটি ছিল গেঁজেল আর দুষ্কৃতিদের আড্ডাসাতের দশকে নকশালরা কব্‌জা করেছিল, গোপন জমায়েত হত নিয়মিত। এইখানেই অভিরাম বাউরি বলে এক লুম্পেন-প্রোলেতারিয়ত  মেও বাঁড়ুজ্জ্যের কশেরুকা পিটিয়ে ভেঙে দিয়েছিলনকশালরা ছত্রখান হয়ে যাবার পরে কোন পার্টি যেন আছাড়-বোমা তৈরির কারখানা খোলেপরে কোথাকার এক উদোম-সন্ন্যেসি আস্তানা গাড়ে সেই সন্ন্যেসির তপস্যাভঙ্গ করে সব্বোনাশটি করে বুলানে বিড়ালাক্ষী – সেইটিই ওর প্রথম শিকার। তারপর থেকে এই বাড়িতে বিড়ালাক্ষীর একচ্ছত্র আধিপত্য।

বিড়ালাক্ষী দাসীর দামোদরপ্রাপ্তি হয়েছিল বহুবছর আগে। ধারাবহ গাঁয়ে ছিল ওর বাপের বাড়ি । শ্বশুরবাড়ি ছিল দামোদরের ওপারে এক কয়লা শহরে। একবার কী একটা কারণে রুগ্ন স্বামীর সঙ্গে কোন্দল করে একা একাই বাপের বাড়ি হাঁটা লাগিয়েছিল বিড়ালাক্ষী তখন ভরা জষ্টি, ঠা-ঠা রোদদামোদরের খেয়া পেরিয়ে একটা ধানের ক্ষেত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, হাঁটতে হাঁটতে বেমক্কা হোঁচট, সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণতারপর থেকেই এই চত্বরে ডেরা।

একটি তিনদিক খোলা কামরায় একাই থাকে বিড়ালাক্ষী আশেপাশে প্রতিবেশির খাঁকতি নেই, শাকচুন্নিদের কণ্ঠরোলে সরগরম হয়ে থাকে মহল্লাটা, কিন্তু স্বভাব একলাষেঁড়ে বিড়ালাক্ষীর ওদের সঙ্গে বনিবনা হয় নাএকবার এক ফোঁকরোল একানড়ের আনাগোনা হয়েছিল বাড়িটাতে, বিড়ালাক্ষীর কটা চোখ আর কটা গাত্রবর্ণের টানেই ছোকরার আগমন বিড়ালাক্ষী খানিক পরখ করেই ফেরত পাঠিয়েছিল ছোঁড়াকেঅশরীরী পেঁচো-পুশকরা-একানড়েদের চেয়ে রক্তমাংসের মনুষ্যজাতির প্রতিই আকর্ষণটা বেশি বিড়ালাক্ষীর। 

গোধূলিবেলায় সূর্যটা যখন পশ্চিম দিগন্ত চুম্বন করে, শেষ খেয়ার যাত্রীরা ক্লান্ত দেহে যে যার গাঁয়ে ফেরার রাস্তা ধরে, বুলানে-বিড়ালাক্ষীর বায়ুবৎ বডিতে আনচান শুরু হয় যাত্রীদের ভেতর দু-একজন থাকে অড়বঙা-একগুঁয়ে,বিড়ালাক্ষীর যাবতীয় কেরামতির কথা জানা সত্ত্বেও তারা পোড়োবাড়ির পাশের শুঁড়িপথটা ধরে, নিমেষে খবর পৌঁছায় বিড়ালাক্ষীর কাছে। শুরু হয় অতৃপ্ত পেত্নির ইন্দ্রজাল। ষোড়শীকণ্ঠে নিশি-ডাক ডেকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে শিকারকে, বনেবাদাড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে সঙ্গসুখ করেসারারাত্রিব্যাপী চলে এই লীলাখেলা কখনো কখনো নৈশকালীন রোমান্টক অ্যাডভেঞ্চার শেষ হবার পর শিকারটিকে গৃধিনীদের হাতে সঁপে দেয় বিড়ালাক্ষী। এই গৃধিনীরা ওর পড়শি। বাড়িটার চতুর্দিকে বিরাট বিরাট অর্জুন গাছ, এই অর্জুনগাছের মগডালে আঁটো হয়ে থাকে ওরা—দৃষ্টি থাকে অনতিদূরের একটি গো-ভাগাড়ের দিকেক্ষেমঙ্করী বলে গৃধিনী আছে একজন, শিকার দেখা মাত্তর সে ডানা ঝটপট করে বিড়ালাক্ষীকে সতর্ক করে। 

ঝটপট ঝটপট!

আজ এই মাঝরাত্তিরে ডানার ঝটপটানি শুনে বিড়ালাক্ষী একটু অবাকই হলদোতলার ভাঙা ছাদে বসে আছে ক্ষেমঙ্করী। অনিদ্রারোগ, বেবাক রাতের বেলা ওখানেই ঝিমোয় ক্ষেমঙ্করী

দ্দের নাকি রে ক্ষেমী! খুব আশা নিয়ে বলল বিড়ালাক্ষী। অস্থিসার গায়ে বেনারসিটা জড়িয়ে নিল ভালো করে। দেহসজ্জা করে সারা সন্ধেটা শিকারের জন্য হা-পিত্যেশ করে কেটেছে, একটাও দু-পেয়ের দেখা মেলেনিমেজিয়া গাঁয়ের কাছে পাকা সেতু তৈরি হবার পর থেকে এরকম প্রায়ই হচ্ছে, নদীপথে যাতায়াত কমে গিয়েছে বেশব্যাপারটা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছে ও

বিড়ালাক্ষীর প্রশ্ন শুনে না-সূচক পুচ্ছ নাড়ল ক্ষেমঙ্করী। দীঘলগাঁয়ের দিক থেকে একটা ছায়া-মূর্তি ভেসে আসছে এইদিকে, সে আর যাই হোক বিড়ালাক্ষী যাকে খদ্দের বলে সে জিনিস নয়। বিড়ালাক্ষী অবিশ্যি ক্ষেমঙ্করীর উত্তরটা দেখল না, গো-মাংসভক্ষন করে বলে গৃধিনীদের মুখ দর্শন করে না সে।

লো মাগি, তোর বাই উঠেছে নাকি, ছটফট করছিস কেনে? মেজাজটা একটু গরম বিড়ালাক্ষীর।

পিসিঠাকরুণসেই ছায়ামূর্তিটা পিছন থেকে মৃদু চেঁচাল

গলাটা চিনতে একমুহূর্ত লাগল বিড়ালাক্ষীর।

জামাইসোনা বট নাকি! বিড়ালাক্ষী প্রফুল্ল গলায় বলল। বিড়ালাক্ষী মন্দাকিনীর দূরসম্পর্কের পিসি, সেই সূত্রে ফ্যারাও পিসি ডাকে, বিড়ালাক্ষীও আদর করে জামাই সম্বোধন করে। জামাই-এর সঙ্গ ভালোই লাগে বিড়ালাক্ষীর।

হ্যাঁ গো পিসিঠাকরুন, একটু জরুরি দরকার

তোমার জরুরি দরকার মানে মন্দিরানির মান ভাঙানো! কিন্তু আজ যে আমার নিজের মনেরই জুত নাই গো, জামাই

তোমার মনের খবর রাখি বলেই তো এসেছি গো পিসি, তোমার মন ভালো করতেই তো!

ফ্যারাও পুরো ঘটনাটা খুলে বলল বিড়ালাক্ষীকে। ঘটনাচক্রে ভ্যাঁচানন্দের উপর আগে থেকেই খাপ্পা হয়ে আছে বিড়ালাক্ষীএই ভ্যাঁচানন্দই ধারাবহ গাঁয়ের গোয়ালাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দামোদরের পাড়ের এই তল্লাটে কয়লা-খাদান খোলার পরিকল্পনা করছিল। খাদান-টাদান মানে এলাকায় অশান্তি, রাতদুপুরে লোক-লস্কর-গাড়িঘোড়ার আনাগোনা, আগুনের কারবারযেদিন থেকে বিড়ালাক্ষী খবরটা শুনেছে, সেদিন থেকেই ভ্যাঁচানন্দকে উচিত শিক্ষা দেবার কথা ভেবে রেখেছে।

পিসিঠাকরুণ, আমার ইচ্ছা তুমি এদের দেশ থেকে খেদিয়ে দাও বিড়ালাক্ষীর হাত ধরে একানড়ে আব্দার করল

সে আর বলতে, জামাইসোনা! হাড়হাঁজার দলকে ঝেঁ-টি-য়ে বিদেয় করব। কিন্তু

কিন্তু কী গো পিসি?

সলে, জানোই তো জামাই, ক্ষেমঙ্করীদের সঙ্গে আমার সাঁট আছেওদের আবার ভাগ না-দিলে

চিন্তা নাই, পিসিঠাকরুন। ক্ষেমঙ্করীদের আচ্ছা সে আচ্ছা দিন আসছেখবর পেলাম, মড়ক লেগেছে মৌরিগাঁয়ে। দলে দলে সব নিয়ে এল বলে!

ড়ক লেগেছে- ঠিক বলছ তো, জামাই! তাহলে আর চিন্তা নাই, ভিটেমাটি ছাড়া করব খালভরাদের, ভিটেয় ঘুঘু চরাবোবিশ্ব নিশি অ্যাসোসিয়েন-এর আমি মেমবার বটি, দেশ-বিদেশে সখি আছে আমার। দেশের টুয়ানা ছাড়িয়ে সখিদের হাতেই তুলে দেব গতর খেকোদের…আর কোনোদিন খাদান করার নাম করবে না আশ্বস্ত করল বিড়ালাক্ষী। জলজ্যান্ত দুটো শিকার পেয়ে সবুর আর সইছিল না বুড়ির

ভ্যাঁচানন্দ আর কৈটভকে বিড়ালাক্ষীর জিম্মায় দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ত্রৈলঙ্গ রায়যাক, আপাতত দীঘলগাঁয়ের রায়রা বিপদমুক্ত।

ভা, তোমার কৃপায় এ যাত্রা তো রক্ষে হল, ভবিষ্যতের গর্ভে যে কী আছে মার্ক্সই জানেন! একানড়েকে বললেন ত্রৈলঙ্গ।

তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, ত্রৈলঙ্গভায়া, যদ্দিন এই তল্লাটে আছি, রায়দের বুকে করে আগলে রাখব—মা-মাটি-মার্ক্স কাউকে লাগবে না একানড়ে বেশ জোর দিয়ে বলল। ত্রৈলঙ্গ কৃতজ্ঞতাপাশে জড়িয়ে ধরলেন ফ্যারাওকে

কাঙালচরণও অভিভূত হলেন একানড়ের এই পরার্থপরতা দেখে।

ফ্যারাওদাদু, জীবদ্দশায় আমি তোমার মতো মানুষ দেখিনি, মরে আমি যা দেখলুমআমি চিরকাল বাপ-মাকে মান্যি করেচি—তাতে নিশ্চয় আমার কিছু পুণ্য সঞ্চয় হয়েচে। যদি সুযোগ পাই, আমার কিছু পুন্যি  তোমায় উইল করে যাব, দাদু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেলেন কাঙালচরণ।

মার আর কিচ্ছুটি চাই না, দাদুগো—শুধু আশীর্বাদ করুন মন্দাকিনী যেন বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে আর পরের জন্মে আমি যেন ওর ভাতকাপড়ের দায়িত্ব নিতে পারি বলে ফ্যারাও সদ্‌গোপ সাষ্টাঙ্গে গড় করল কাঙালচরণ মুখুটিকে। কাঙালচরণ ফ্যারাও-এর করোটিতে স্নেহচুম্বন এঁকে দিলেন।

সা-ধু, সা-ধু আশেপাশের দু-চারটে ফাজিল খোক্কস সমস্বরে ফোড়ং কাটল। 

এরপর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ভিট্টের চৌহদ্দিতে খানিক চক্কর কাটলেন ত্রৈলঙ্গ বাবা রামবন্ধু রায় আর মা ইচ্ছাময়ীর নিঃশব্দ পদসেবা করলেন খানিকক্ষণ, ঠাকুমার শিয়রে বসে অমৃতসূর্তি জর্দার আঘ্রাণ নিলেন। তারপর খোকা জ্যাঠামশাই রামকিংকরকে বিদায় জানিয়ে সোজা যাত্রাশালায়। ভেবেছিলেন সারারাত যাত্রা শুনবেনকিন্তু দু-একটি দৃশ্য দেখার পরেই এমন বিতৃষ্ণা জন্মে গেল! মা-মাটি-মানুষ পালা তো নয় যেন রূপালি-পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে নির্ভেজাল জলসা! ঢোল-গোবিন্দ জনগণ ওটাই গিলছে। রইতে না পেরে ত্রৈলঙ্গ আর কাঙালচরণ সোজা মহানগরীর উদ্দেশে রওনা দিলেনফ্যারাও রয়ে গেল দীঘলগাঁতে

মন্দাকিনী আজ যাত্রা শুনতে যায়নি, আগামীকাল তার শ্রেণি-পরীক্ষা। ওর বাপ-মা লালটুকুরির মাঠে, ঘরে অন্ধ ঠাকুমা আমানি-ভাত সেবন করে চিত্‌এদিককার কাম তামাম করে মন্দাকিনীকে আজ দর্শন দিতে গেল একানড়ে।  

মহানগরীর চৌকাঠে পৌঁছে একটি জমকালো বিবাহবাসরের দিকে নজর পড়ল ত্রৈলঙ্গেরবিজলিবাতির আলোয় ছয়লাপ চতুর্দিক, আতসবাজিও হচ্ছে, লাউডস্পিকারে গমগমে গীতবাদ্যএসব দেখে খেয়াল পড়ল সেই স্বয়ংবর সভার কথা।এক রূপসী যাত্রাশিল্পীর স্বয়ংবর—সেরকমই কানে এসেছিল সেদিন, যদিও চ্যাংড়াগুলো শিল্পীর নামটা ঠিক বলতে পারেনিকাঙালচরণকে কথাটা বলতে তিনি একটু কাঁচুমাচু হয়ে গেলেনছেলে-ছোকরাদের ব্যাপার, -পথে যাওয়াটা তাঁর কী মানায়

দাদুভাই, তোমার এবার একটি জীবনসঙ্গিনী দরকার—তুমি যাও বললেন কাঙাল।

ঙ্গিনী তো আপনারও দরকার, দাদু—আপনিও কুমার বয়স বাড়লে কৌমার্যের ক্ষয় হয় নাকি!

বই তো জানো, দাদুভাই। চোখ বন্ধ করলে এখনও যে আমি সেই তারই ছবি দেখতে পাই। আমার পক্ষে ওই আসরে যাওয়া একান্তই অসম্ভব। আর আমার দাঁতগুলো এমন কক্ষচ্যূতের মতো দেখতে লাগচে, -নিয়ে আমি প্রতিযোগিতায় টিকতেও পারব না

হা, স্বয়ংবর সভায় যাচ্ছি বলে কী প্রতিযোগিতায় নামতে যাচ্ছি নাকি, দাদু? আমরা তো সেরেফ দর্শক!

শেষমেশ কাঙালচরণকে সঙ্গে নিয়ে গেঁড়েগিরিধারীর পুকুরপাড়ে পৌঁছালেন ত্রৈলঙ্গ। পুকুরপাড়ের এই তল্লাটে আঁধারের খুব জাঁকজমক মহানগরীর যাবতীয় আলোর রোশনাই-এর এখানে এসে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়, আঁধারের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে প্রাণটাই দিয়ে বসে আকাশে নিঃসাড় কিছু তারা টিমটিম করে, জোনাকিরা জ্বলে নেভে, দূরে কিছু ম্লান ত্রিফলা বাতিস্তম্ভ জনগণের অর্থে উদ্বাহু হয়ে নগ্ননেত্য করে—তাতে আঁধারের গায়ে আঁচড়টিও লাগে নাঅশরীরীদের সভা-অনুষ্ঠান করার জায়গা বটে!

পুকুরপাড়ের সেই ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছটির তলায় দাঁড়ালেন ত্রৈলঙ্গ

কিন্তু ততক্ষণে সেখানে ভয়ানক মেইহেম হয়ে গিয়েছে। টেকটনিক প্লেটের জবরদস্ত মুষ্টিযুদ্ধ হলে ধরিত্রীর যেরকম দশা হয়, সেরকমই হয়েছে কতকটা। 

ছতিচ্ছন্ন অবস্থা স্বয়ংবরসভার—সমস্ত আয়োজন গুড়ুম! কাইনেটিক বিদ্যেধর আর তার পোঁ অ্যাসিড-ব্যান্ডের জুলুমে ভয়ানক ডামাডোলগন্ধগোকুল, ভামের দল ছিন্নমুণ্ড হয়ে দিগবিদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছেমেটুলির গামলায় ফেণী বাতাসার ছপছপি। লড্ডুক, অমৃতগুটিকা, কর্পূরমালতি গড়াগড়ি খাচ্ছে চতুর্দিকে ছিন্নভিন্ন হওয়া আকন্দ-ঘণ্টাকর্ণ-গুলঞ্চর মালা। ফ্যাঁসা, সরলপুঁটি আর বাইন-ভর্তি মটকাগুলো লুট হয়েছে, বেঁচে যাওয়া কাঁকড়া-বড়্‌শামুকদের দিকভ্রষ্ট অবস্থা

র্গি হানা দিয়েছিল নাকি! ত্রৈলঙ্গ দেখেশুনে বললেন।

দাদুভাই, চল পিটটান্‌ দিই, কোনো ঝঞ্ঝাটে পড়ার দরকার নেইকাঙালচরণ ভয় পেয়েছেন।

চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।

হিলাকণ্ঠ, দাদু! ত্রৈলঙ্গ কান্নার উৎস খুঁজতে লাগলেন। আশেপাশের কুটুসঝোপে সেঁধিয়ে দেখলেন ভালো করে, শালুক-শাপলা-পানায় চাপা পড়ে যাওয়া পুকুরের উপরিতলেও এক চক্কর মারলেনহঠাৎ নজর গেল তেঁতুলগাছটার দিকে। মৃদু বাতাস বইছে, সেই তালেতালে একটি শাড়ির আঁচল পতপত করছে। তেঁতুলগাছটার মগডালে পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাহারে শাড়ি পরা একটি পেত্নি, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। 

ত্রৈলঙ্গ এক মুহূর্ত ভাবলেন কাছে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা। মনে হল, নিজের অজান্তেই কোনো ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন না তো! নারীণৌ শত হস্তেন! সেই কোনকালে কর্ণে জপন করেছিলেন স্যার বর্গীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়সেই মন্ত্রই কানে ধ্বনিত হতে লাগলকিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, যদি সত্যিই এঁর কোনো বিপদ হয়ে থাকে! তাঁর মতো সমাজসচেতন প্রেতের পক্ষে অন্যের বিপদে উদাসীন থাকা মুশকিল। 

ত্রৈলঙ্গ এগিয়ে গেলেন। পুকুরের দিকে মুখ করে ফোঁপাচ্ছে পেত্নি। ধুম্রকেশীকর্পূর তৈলের খুশবুতে ম ম করছে চারদিক

ম্যাডাম

পেত্নীর পশ্চাতে একটি শাখায় দাঁড়িয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে ডাকলেন ত্রৈলঙ্গ ম্যাডাম সম্বোধন আপনা-আপনি জিহ্বাগ্রে চলে এল।

পেত্নির হেলদোল হল নানাগাড়ে অশ্রুপাত করতে লাগল সেওদিকে জোড়া উল্লুক উষ্মা প্রকাশ করতে করতে স্থানত্যাগ করল।

কেউ কি লাঞ্ছনা দিয়েছে, ম্যাডাম, আমি কী যমপেয়াদা ডেকে আনব? খুবই মরমি গলায় বললেন ত্রৈলঙ্গ।

লাঞ্ছনা শব্দটি শুনে পেত্নির কান্নার বেগ যেন বেড়ে গেল।

শুনছেন ত্রৈলঙ্গ কড়া নাড়লেন আবার।

পেত্নির ফোঁপানি একটু কম হল এবার। কোনোরকমে কেঁদে কঁকিয়ে সে জানাল যে, কাইনেটিক বিদ্যেধর নামের এক সমাজবিরোধী তাঁর প্রিয় সখিটিকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে, স্বয়ংবর সভাটি লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

মার সখি আমার জন্যে সব বিলিয়ে দিয়েচে জানো, বাছা। এমন সখি আর কোতায় পাবো গো আমি

ত্রৈলঙ্গ হাত-কাটা-দিলীপ, ল্যাঙড়া লেবেঞ্চি, মাইফিল মদনের নাম পড়েছেন খবরের কাগজে, কিন্তু কস্মিনকালেও কাইনেটিক বিদ্যেধর শোনেননি। বেঁচে থাকতে কমসেকম তিনখানা ই-কাগজ খুঁটিয়ে পড়তেন তিনি, এই রকম একটা নাম চোখ এড়িয়ে গেল কী করে। অবিশ্যি হতে পারে কাইনেটিকের প্রেতলোকে আগমন তাঁর জন্মের বহু আগে। যমালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আঁতাত করে এখনো সে এখানে বহাল তবিয়তে আছে। সেরকম যদি হয় তাহলে প্রশাসনের কাছে নালিশ করেও ফায়দা নেই। 

রা কোন দিকে গিয়েছে একটু বলবেন, দেখি যদি ধাওয়া করা যায়! যদিও ধাওয়া করেও কোনো সুরাহা হবে না, তবু বলার জন্যেই বললেন ত্রৈলঙ্গ।

উঁহু খবর্দার বাছা, ওরকম কাজটিও করো না কাঁদতে কাঁদতেই হা-হা করে উঠল পেত্নি। ই অনামুখো সাক্ষাৎ জল্লাদওকে কাবু করা তোমার মতো খোকার কম্ম নয়!

পেত্নির মুখে খোকা আখ্যা পেয়ে ত্রৈলঙ্গ মনে মনে একটু বিরক্ত হলেনমুখমণ্ডলে শ্মশ্রু-গুম্ফের বাড়বাড়ন্ত একটু কম, তা বলে তাঁর মতো সিড়িঙে লম্বা জোয়ানকে খোকা বলা যায় না কোনো মতেই। কল্‌জেতে প্রাণ থাকলে অ্যাতোদিনে পঁচিশ হত ওঁর

তা তুমি কে, বাছা, এখানে কী করচ! ত্রৈলঙ্গ চুপ মেরে যেতে পেত্নি বলল

মার নাম ত্রৈলঙ্গ রায় বিরক্তিটা ঢোঁক গিলে বললেন তিনি। স্বয়ংবর সভা হবার কথা ছিল এখানে, সেটি দেখতেই আসা

লে যখন, অ্যাতো দেরি করে এলে কেন বাছা! তোমরা একটু সময়মতো এলে কবেই সভার কাজ শেষ করে দিতুম—এই কাইনেটিক আর নাগাল পেত না!

সলে বহুত দূর থেকে আসছি তো, বিলম্ব হয়ে গেল একটু

সাত ঘটিকায় সভা শুরু হবার কথা ছিল—সেরমই তো ঢ্যাঁড়া পিটেছিল নাকি?

হ্যাঁ সাতটাই জানতাম। তা আপনার সখিরই কী স্বয়ংবর ছিল আজ?

না বাছা, স্বয়ংবর ছিল আমার। কাইনেটিক আমার খোঁজেই এয়েছিল এসেই আমার অ্যাতো আয়োজন স-ব এক নিমেষে হান্ডুল বান্ডুল করে দিল তারপরেই খোঁজ—কার স্বয়ংবর, আয় আমার সঙ্গে। আমার সখি বেচারা যেচে গিয়ে বলল আমাকে নাও, আমারই স্বয়ংবর সভা! হায় হায় আমাকে বাঁচাতে গিয়ে এভাবে নিজেকে শেষ করে দিলি লো… পেত্নির কান্নার বেগ বাড়ল। হঠাৎ কী মনে হতে একটু থামল পেত্নী। পিছন থেকেই ত্রৈলঙ্গ অনুভব করলেন, পেত্নীর ভুরু কুঁচকে গিয়েছে, চোখে কর্কটদৃষ্টি।

কার স্বয়ংবর—কী ব্যাপার-তুমি দেখচি কিছুই খবর রাখোনা। হোমওয়ার্ক না-করেই স্বয়ংবরে এসেচ!

ত্রৈলঙ্গ রা কাড়লেন না হে হে, সত্যি মস্ত ভুল হয়েছে দিদিমনি, আরেকটু ইয়ে হওয়া দরকার ছিল ত্রৈলঙ্গ যেন ক্ষমা যাচ্ঞা করলেন মনে মনে

বে যে ছোলঙ্গ বলেছিল তোলপাড় করে প্রচার করেচে আমার নামে—এখন দেখচি আমায় বোকা বানিয়েচে ছোকরা! ছোঁড়াগুলো আবার বে করতে চাইছিল—আসুক একবার মুখের সামনে, গরম আঙার গুঁজে দেব রাগে একটু চেঁচিয়ে বললেন প্রম্লোচ্চা কুমারী। 

ত্রৈলঙ্গকে ডানহাত দেখিয়ে বললেন, রোশো!

তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা করলেনই দেখ আমি কে…দেখ দিকি চিনতে পারো কী না! বলে তড়াক্‌ করে সামনে এসে পড়লেন। লাজুক ত্রৈলঙ্গের চোখ একপলক চেয়েই নীচু হল

পষ্ট দেখলেন, মুখমণ্ডল চুনকাম করে গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে তার ওপর গাঢ় ওষ্ঠরঞ্জক চোখদুখানি খানাতল্লাশি করে খুঁজে পেতে হবে, তবে নেত্রলেপ দেওয়াতে আঁখিগহ্বরের বর্ডারটি খোলসা হয়েছেদাঁতপাটির দর্শন না পাওয়া গেলেও, পরিপাটি বটে বলেই মনে হয়। সারা গায়ে বিবিধ পুষ্পালঙ্কারদেখলেই বোঝা যায়, যৌবনকালে চেহারার চটক ছিল ভালোই। মুখের আদলটা চেনা চেনাও ঠেকল কিন্তু এখন আর নামটা স্মরণ করতে পারলেন না ত্রৈলঙ্গ। খবরের কাগজে যাত্রার যে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন থাকে, সেখানে এনাকে দেখে থাকলেও থাকতে পারেন।

কী হল, মুখে রা নেই কেন ঝাঁঝিয়ে উঠলেন প্রম্লোচ্চা।

জ্ঞে, ইয়ে মানে একটু লজ্জায় পড়ে গেলেন ত্রৈলঙ্গ। 

ততক্ষণে কাঙালচরণও ত্রৈলঙ্গের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

দাদুভাই, --কী স-ম্ভ-! অস্ফুটে বলে উঠলেন কাঙালচরণ।

তারপর নবতিপর কাঙালচরণ পাঁইপাঁই করে ছুট লাগালেন পেত্নীর দিকে।

(ক্রমশ…)

 
 
top