ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

খবরটা পড়েই নবতিপর কাঙালচরণ হার্টফেল করলেন। নবতিপর হলে কী হবেযৌবনকালের দেখনদারির অন্তত সিকিভাগ অক্ষত ছিল কাঙালচরণের। দশখানা দশন শির উঁচু করে ছিল, হাতে পায়ে খিল ধরেনি, চশমা ছাড়াই ওষুধের লেবেলে লেখা ইনগ্রেডিয়েন্টসপড়তে পারতেন, ঘৃতভৃষ্ট কচুরি সেবন করার পর দুগ্ধফেনিল চা সেবন করতে গিয়ে কলিজা কাঁপত না, মেহ-তে তখনো সেই কৈশোরের ঝাঁঝ! খালি বয়েসের মারে লাহাঙ্গা চেহারাটা কোঁচবকের মতো হয়ে গিয়েছিল এই যা! আর বায়ু-পিত্ত-কফের যা অবস্থা ছিল তাতে হার্টফেল করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়, ওই রকম পরিসংখ্যান নিয়ে হার্টফেল করা যায় না। কিন্তু তেমনটা হল না।

খবরটা মাসখানেকের পুরনো, ছেদিরামের দোকান থেকে ছোলাভাজা কিনেছিলেন যে ঠোঙাটায়, সেইখানেই লেখা ছিল খবরটা। দুটো লাইন, কিন্তু ছবি ছিল সঙ্গে।

যাত্রাসম্রাজ্ঞী প্রম্লোচ্চাকুমারীর জীবনাবসান

সঙ্গে প্রম্লোচ্চা কুমারীর একটি কমবয়সের আবছায়া আলোকচিত্র।

আওরঙ্গজেবের আমলের কিছু কষের দাঁত দিয়ে দু-চারটে বেয়াদপ ছোলাকে গুড়িয়ে দিতে দিতে রদ্দি ঠোঙাটায় চোখ বোলাচ্ছিলেন কাঙালচরণ। দলমার হাতির হাতে বালকের অপমৃত্যু, ”’রায়বাহাদুর” সরকারি-উপাধির জন্য বিরোধীদলনেতার নাম বিবেচিত, সরকারি উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় মেলাপ্রাঙ্গন নির্মাণপ্রকল্পের সূচনা, ‘যাত্রাসম্রাজ্ঞী প্রম্লোচ্চাকুমারীর জীবনাবসান’… প্রথম লাইনটাও শেষ করে উঠতে পারেননি, নব্বুইবছরের পুরনো হৃদয় ধড়ফড় করে উঠেছিল, যেন প্রদীপের সেই শেষবার নিভে যাওয়ার আগে কেঁপে ওঠা। গত ষাট-সত্তর বছর ধরে এই প্রম্লোচ্চার জন্যই তাঁর হৃদয় লাবডুব’ ‘লাবডুবকরেছে, ট্রামে-বাসে-ট্রেনে আনমনা হলেই গোলাপখাস আমের মতো সেই মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, প্রম্লোচ্চা-বিরহে প্রতিদিন হৃদয় ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে। সেই প্রম্লোচ্চাকুমারীর পরলোক যাত্রার কথা জ্ঞান করে হৃদি খাঁ খাঁ করে উঠল কাঙালচরণের, কাঙালচরণ ভির্মি খেলেন, দাঁতের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ভাঙাচোরা ছোলারা গলার নলি দিয়ে গলে গেল, কাঙালচরণের নবতিপর হৃদয় বারচারেক লম্ফঝম্প করে চুপচাপ কাজে ইস্তফা দিল। সাতকূলে কেউ না-থাকার দরুণ কাঙালের দেহটি ওখানেই কেতরে রইল কিছুদিন, কটুগন্ধ ছড়ানোর পর কোতোয়াল টোতোয়াল এল— ততদিনে কাঙালের একটি প্রেতাত্মা হয়েছে।

প্রম্লোচ্চা!’ ‘প্রম্লোচ্চা!গঙ্গার পুবপাড়ে একটি বেঢপ অশ্বত্থগাছের ডালে বসে কাঙালচরণের প্রেতাত্মা সেই মন্ত্রটাই আবার সজল চোখে আওড়াল। বছর সত্তর আগের কথাগুলি আবার একবার মনে পড়ল।

শহিদ সুরাবর্দী বঙ্গের প্রধানমন্ত্রীতখনকার কথা। নগ্নবেলার স্যাঙাত ভুটুং সেনের পাল্লায় পড়ে কাঙালচরণ সেবার বাগবাজারে গেলেন যাত্রা শুনতে। ভুটুং বরাবর যাত্রাপাগল মানুষ, যাত্রার নটনটীর জীবনপঞ্জী তার ঠোঁটস্থ, জনপ্রিয় পালাকার রঙিল মুত্সুদ্দির কোন্ ব্র্যান্ডের দোক্তা পছন্দ, যাত্রাসম্রাট স্ফোটন বর্মার কণ্ঠ ক-রতি বাবার প্রসাদ টানার পর ভালো খোলে, যাত্রাকুইন সিন্ধুঘোটকীর সঙ্গে জনৈক খঞ্জনিবাদকের কী সম্পর্ক— সেসব কথাও তিনি জেনে বসে আছেন। কাঙালচরণ আবার বায়োস্কোপ-অনুরাগী, মা-বাপকে লুকিয়ে প্রায়ই মায়াছায়া, ‘ছটাছায়া, ‘ছায়ানট-এ ঢুঁ মারেন। তিনিও চিত্রতারকা বিশ্বম্ভর বক্সীর কেশবিন্যাস, তাঁর ধুতির পাড়ের কারুকার্য, তাঁর ঈষৎ লেঙচানো চালচলনে দারুণ প্রভাবিত। বলাই বাহুল্য, যাত্রা বড়ো না বায়োস্কোপ—  এই নিয়ে দুই বন্ধুর জোরালো দ্বন্দ্ব। সেদিন একরকম জোর করেই কাঙালচরণকে বাগবাজারের যাত্রাশালায় হাজির করেছিলেন ভুটুং সেন।

এই পালা একবার চাক্ষুষ করলে তুমি আর বায়োস্কোপপাড়ায় যাবার নাম করবে না, সখা।ভয়ানক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন ভুটুং সেন।

শিরা ফুলিয়ে গাড়োলের মতো কোলাহল করলেই অভিনয় হয় না হে, ভুটুং।বলেছিলেন কাঙালচরণ।

ওকে বলে দাপট বুঝলে কাঙাল, দাপট। কীচকবধ পালায় কীচকরাজার সর্বাঙ্গ ভঙ্গ করে মধ্যমপাণ্ডবের সিংহগর্জনওফ্, একবার যদি স্ফোটন বর্মার সেই কণ্ঠস্বর শুনতে, কাঙাল!

দুই বন্ধুতে এমন ধারার তক্কবিতক্ক আকছার হয়ে থাকেকিন্তু এবার ভুটুং সেন যেন খানিক মরিয়া। কাঙালচরণকে একরকম বগলদাবা করেই পৌঁছালেন বাগবাজারে।

রঙিল মুত্‌সুদ্দির লেখা ঐতিহাসিক পালা নবাব সিরাজ-উদ্‌-দৌলা স্ফোটন বর্মা সিরাজ সেজেছেন, মিরজাফর অলীক ঘোষ আর ক্লাইভ সেজেছেন সিমলেপাড়ার অচল মুস্তাফি। নবাব সিরাজ-উদ্‌-দৌলা আসন্ন পলাশীর যুদ্ধে সহযোগিতা প্রার্থনা করছেন মির্জাফরের:

আমি বাংলার নবাব মির্জা মুহম্মদ সিরাজ-উদ্‌-দৌলা, আপনি এই কোরান স্পর্শ করে শপথ করুন হে সিপাহশালার- এই জং-এ আপনি ওই ফিরিঙ্গিদের মদত দেবেন না। এই জং-এ আপনি তামাম মুর্শিদাবাদের সঙ্গে থাকবেন, বাংলার মুলুকের সঙ্গে থাকবেন, বাংলার তখত--তাজের সঙ্গে থাকবেন, আর এই মির্জা মুহম্মদের সঙ্গে থাকবেন।

স্ফোটন বর্মা গলা সপ্তমে তুলেছেন, তার নাইকুণ্ডু থেকে উত্সারিত হওয়া আবেগাপ্লুত কম্পিত কণ্ঠ চতুর্দিকে যেন অনুরনণ তুলেছে, দর্শকদের এনকোর’ ‘এনকোরকলরবে কান পাতা দায়, বায়োস্কোপ অনুরাগী কাঙালচরণও এই উত্তুঙ্গু নাটকীয়তায় বিমোহিত হয়ে পড়েছেন, তাঁর চোখ উত্তেজনায় বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছে। সেই রাতেই যাত্রার হাতে বায়োস্কোপ বধ হল বলা যায়, স্ফোটন বর্মার সেই হাতে-গরম আবেগ বেমালুম হারিয়ে দিল বিশ্বম্ভর বক্সীর তস্য বাসী মিনমিনে ইমোশনকে। এরপর থেকেই নিয়মিত বাগবাজারের যাত্রাশালায় হাজিরা দিতে শুরু করেন কাঙালচরণ। একে একে দেখে ফেলেন বর্গী এলো দেশে, শের আফগান, কবরের কান্না, সৈনিক ধর হাতিয়ার, কীচকবধ। এই বাগবাজারের এক যাত্রাশালাতেই একদিন নট্টমন্দির অপেরার মালিক বাবু সিতিকণ্ঠের নজরে পড়ে গেলেন আখাম্বা জোয়ান কাঙালচরণ। নট্টমন্দির নতুন পালা নামাচ্ছে ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গ। নামভূমিকায় নতুন মুখ খুঁজছেন সিতিকণ্ঠ। কাঙালচরণকে প্রথম দর্শনেই পছন্দ হয়ে গেল—ওঁকে সরাসরি আহ্বান করলেন। বছর পঁচিশের যুবক কাঙালচরণের মাথায় অভিনয়ের ভূত চেপছে ততদিনে।পরিবারের সকলের অলক্ষে সিতিকণ্ঠের আপিসে গিয়ে নাম লিখিয়ে এলেন। নট্টমন্দির অপেরা, ঠিকানা তিরিশেরএক চিতপুর রোড।

 

পিতা বিভাণ্ডকোহস্মাকং তস্যাহং সুত ঔরসঃ|

ঋষ্যশৃঙ্গ ইতি খ্যাতং নাম কর্ম চ মে ভুব||

 

প্রথমদিনের মহড়া, বাবু সিতিকণ্ঠ উপস্থিত, ঋষ্যশৃঙ্গের ভূমিকায় কাঙালচরণ আপন পরিচয় দিচ্ছেন সংস্কৃতে— সংস্কৃত উচ্চারণ ভালোই তাঁর, কিন্তু পার্ট বলতে গিয়ে মাঝেমাঝেই গলা চিঁচিঁ হয়ে যাচ্ছে। চেহারাটি দশাসই হলে কী হবে, গলাটি মিহিনচেষ্টা করছেন ছদ্মকণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ভেলকি দিতে। কিন্তু ও দিয়ে পার্ট আর দাঁড়াচ্ছে না, মোক্ষম সময়ে দম ফুরিয়ে চিঁ-চ্যাঁ হয়ে যাচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন এ রকম হতেই পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক, উচ্চগ্রামে অভিনয় করা তো দূর,কস্মিনকালে হই হট্টগোলটিও করেননি কাঙালচরণগাঁধির মিছিলে স্লোগান দেননি, পড়শির সঙ্গে বিবাদ করেননি, ইস্কুলে ছাত্র পড়াননি। কিন্তু দিনকয়েক যেতেও পরিস্থিতির উন্নতি হল না। এদিকে বাবু সিতিকণ্ঠ খুব অসোয়াস্তিতে পড়েছেন বুঝতে পারছেন কাঙাল, নেহাত ভদ্রলোক বলে কাঙালকে তিনি কিছু বলতে পারছেন না। কিন্তু একদিন না একদিন তো সিতিকণ্ঠ মুখ খুলবেনইইরকম মুর্খুনে নায়ক নিয়ে কি তাঁর বাণিজ্য চলবে নাকি? একদিন ঠিক কাঙালচরণের হাতটি ধরে বলবেন, এইরকম চললে ব্যবসা আমার লাটে উঠবে, কাঙালবাবুমাইনে দিতে পারব না শিল্পীদের। আমায় এবার ক্ষমা দিন, কাঙালবাবু রোজ কোনোরকমে মহড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছেন কাঙালযাত্রা-থিয়েটারের উপযুক্ত তিনি ননএই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। ঠিক করেছেন সিতিকণ্ঠের আপিসে গিয়ে অব্যাহতি চেয়ে আসবেন। সিতিকণ্ঠ কিছু বলার আগেই তিনি সম্মানের সঙ্গে প্রস্থান করবেন। সেই ভেবে নট্টমন্দিরের আপিসে গিয়েছেন সকাল সকাল।সিতিকণ্ঠ আসেননি তখনো, অপেক্ষা করছেন কাঙাল। কথাটা কীভাবে বলবেন, সেই সংলাপটাই ঝালিয়ে নিচ্ছেন মনে মনে। বলবেন, তাঁর পিতাঠাকুর একটু সেকেল মানুষ, তাঁর যাত্রায় যোগদানের ব্যাপারটি জানতে পেরে ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ত্যাজ্যপুত্র করার নিদান হেঁকেছেন। তাই যাত্রাদল তাঁকে এখুনিই ত্যাগ করতে হবে, এর জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী, ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে বাবু সিতিকণ্ঠের এখনও পাত্তা নেই, বসে বসে ঝিমুচ্ছেন কাঙাল, লালঝোল পড়ছে।

বাবুর একটু নেটহবে।হঠাৎ একটি স্ত্রীকণ্ঠ।

অ্যাঁ?সম্বিৎ ফেরে কাঙালের।

বলচি, বাবুর নেটহবে গতকাল বেজায় রাত করে ফিরেচেন কিনা।

সুড়ুৎ করে লালাঝোল টেনে নিয়ে অবাক চোখে সামনে তাকালেন কাঙালচরণ।

আজ এই অশ্বত্থগাছের ডালে ঝুলতে ঝুলতে বছর সত্তর আগের সেই রমণীর অবয়ব বিলক্ষণ খেয়াল পড়ল কাঙালচরণের। কিন্তু সেই অবয়বকে শব্দের কারিকুরিতে নির্মাণ করার উপায় আজ আর খুঁজে পেলেন না। তালগাছের মতো নির্মেদ দেহ, কালসন্ধের মতো কেশ, বাকল-ওঠা ইউক্যালিপটাসের মতো গাত্রবর্ণ- ভেবে ভেবে এর বেশি আর কুলোতে পারলেন না।

ওহ্, আমি তাহলে পরে আসব খন। আপনি একটু বলে দেবেন বাবুকে।কাঙালচরণ উঠিউঠি ভাব দেখালেন, কিন্তু নবযৌবনসম্পন্না এই নারীর সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের অভীপ্সা রইল মনে মনে।

আপনি কি বাবুর নতুন নায়ক?নিষ্পাপ গলায় শুধোলেন সেই স্ত্রীলোক।

ইয়েমানে আপনি কী করে জানলেন?কাঙাল একটু বেকায়দা হয়ে গেলেন।

কাল মহড়ায় আমি আপনাকে দেখেচি…

আপনিও ছিলেন নাকি সেখানে? আমি লক্ষ করিনি বোধহয়।

হুম, ছিলুম তো। একটু তফাতে ছিলুম। বাবু আমাকে দূর থেকে সব শিখে নিতে বলেচেন।লাজুক মুখে বললেন সেই নারী। কাঙালচরণ একটু অবাক হলেন। যাত্রাগানে নারীচরিত্রে মূলত পুরুষেরাই অভিনয় করেনট্টমন্দির অপেরাতেও সিরাজের বেগম লুৎফারের চরিত্রে অভিনয় করেন তুতেন নন্দী, দ্রৌপদীর চরিত্রে অভিনয় করে্ন নুঙি ঘোষ, সীতার চরিত্রে অভিনয় করেন চঞ্চরীক দাস। তবে নট্টমন্দির ইদানীং একটু অন্যধারার ভাবনা ভাবতে শুরু করেছেসেটা শুনেছিলেন বটে কাঙালচরণ। জিগ্যেস করলেন

আপনিও কি যাত্রায়-

বাবু বলেচেন প্রথমে সখীর পার্ট দেবেনভালো হলে আরো ভালো পার্ট।

বেশ বেশ। বাবু সিতিকণ্ঠের প্রতিভা চিনতে ভুল হয় না। বলেই ঢোক গিললেন কাঙাল, আপনি পারবেন, নিশ্চয় পারবেন

কাল আপনার পার্ট দেখে চক্ষে জল এসে গিয়েছিল বললে বিশ্বেস করবেন না- ওই যে যখন ঋষ্যিশৃঙ্গি তার বুড়োবাপকে ছেড়ে শ্বসুরবাড়ি যাচ্চেবুড়ো বেভেণ্ডিক ঠোঁট ফুলিয়ে বলচে, ‘’রাজাকে পেয়ে এই ফকিরবাপকে ভুলে যাবিনে তো, ব্যাটা?’’ আর আপনি ভ্যাঁ করে কাঁদচেনওফ পারেন বটে। একদিন একটু শেখান না আমায়…’

মুগ্ধনেত্রে স্মিত হেসে বললেন সেই নারী, বাবু সিতিকণ্ঠের আপিসে যেন আতসবাজি হল। পরপুরুষের সঙ্গে একটি নারীর এমন সহজসরল ব্যবহার অকল্পনীয় কাঙালের কাছে। সেই প্রথম মোলাকাতেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন কাঙালচরণ। জানতে পারলেন ওঁর নাম কুমারী বিড়ুললতা। দুই বোন ওরাজন্ম-অনাথদজ্জাল মামা-মামির সংসারে মানুষ। বিড়ুললতার মামিঠাকুরণ সিতিকণ্ঠের সুদূর সম্পর্কের আত্মীয়উনিই বিড়ুললতাকে বাবু সিতিকন্ঠের বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটার জন্য দান করে গিয়েছেন। বিড়ুললতার চেহারায় চটক লক্ষ করে সিতিকণ্ঠ ওকে যাত্রায় নামানোর পরিকল্পনা করেছেননামটাও পরিবর্তন করে প্রম্লোচ্চাকুমারী করা হয়েছে।

কাঙালচরণ প্রম্লোচ্চার আকর্ষণে নট্টমন্দির থেকে আর ইস্তফা দিলেন না, সিতিকণ্ঠকে বললেন তিনি নায়কের পার্ট চান না, অভিনেতা হতে চান। সিতিকণ্ঠ আপত্তি করলেন না। যাত্রামঞ্চে কাঙালকে মানাবে ভালোমৃত সৈনিক সেজে মঞ্চে যদি গড়াগড়িও খায় দৃশ্যটা খোলতাই হবেএই ভেবেই সিতিকণ্ঠ আপত্তি করলেন না। সেবার ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গ পালায় নায়িকা শান্তার সখীর পার্ট করলেন প্রম্লোচ্চা, শান্তার বাবা লোমপাদের হুঁকোবরদারের পার্ট করলেন কাঙাল। দ্বিতীয় পালা পাণ্ডুর আত্মত্যাগ-এর মহড়া চলাকালীন কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা হল, তৃতীয় পালা রাবণ বধ- প্রম্লোচ্চাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন কাঙাল। ফাগুনমাস ছিল সেটা, নট্টমন্দির গিয়েছিল রাঢ়বঙ্গের একটি অজপাড়াগাঁয়ে রাবণ বধ গাইতে। জাম্বুবান সেজেছিলেন কাঙাল আর কৈকেয়ী সেজেছিলেন প্রম্লোচ্চা। সেদিন কৈকেয়ীর বেশভূষা পরা প্রম্লোচ্চাকুমারীর থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছিলেন না কাঙালকাঙালের মতো আরো অনেকেই হয়তো পারছিল না। কাঙাল বুঝেছিলেন এটিই মোক্ষম সময়এর বেশি বিলম্ব করলে প্রম্লোচ্চার হাত বেহাত হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। প্রথম কিছু দৃশ্যের পরেই প্রম্লোচ্চার পার্ট হয়ে গিয়েছিল, জাম্বুবানের প্রথম এন্ট্রিতখনও বাকি। কাঙাল ট্যাঁকঘড়িতে দেখলেন তাঁর হাতে এখনো ঘণ্টাখানেক সময় আছে। চুপিসাড়ে প্রম্লোচ্চাকে নিয়ে একটু দূরের পুকুরপাড়ে এলেন তিনি।

আকাশে কাস্তে চাঁদ, রাঢ়বঙ্গের পুকুরপাড়। আঁশটে গন্ধ। মলয়সমীরণ বইছে, মাধবীলতার সুবাসও যে একটু আধটু পাওয়া যাচ্ছে না, তা নয়। ওদিক থেকে রাবণবেশী স্ফোটন বর্মার হুঙ্কার ভেসে আসছে।

হে কৈকেয়ী, আমায় দশরথ করবে তোমার?ভণিতা না করে সরাসরি কথাটা পাড়লেন কাঙাল।

মরণ! এই কথা বলতে আপনি আমায় এই ভূতপেরেতের আড্ডায় নিয়ে এলেন। আচ্ছা, আমি বাবুকে বলব খন আপনাকে দশরথের পার্টটা দিতে।বলেছিলেন প্রম্লোচ্চা।

না-বোঝার ভান কোরো না, প্রম্লোচ্চা। তুমি জান, আমি সত্যি সত্যিই তোমার দশরথ হতে চাই।মরিয়া হয়ে বললেন কাঙাল।

দেখ কাণ্ড! জাম্বুবান যদি কৈকেয়ীকে বে করে রামায়ণটার কী দশা হবে বলুন দিকি।ফিক করে হেসে বললেন প্রম্লোচ্চা। আঁধারে পুকুড়পাড়ে ক্ষণিক-জোছনা হল।

প্রম্লোচ্চা, তামাশার সময় নয় এটা।

না বাপু, কৈকেয়ীর সতীন ছিল, ওইটি আমি চাইনে। দশরথ সোয়ামি আমার চাইনে।

তাহলে রাম-রাম চলবে?

না রামও নাসীতের মতো অতো সহ্যশক্তি আমার নেই।

আচ্চা, ঠিক আছে প্রম্লোচ্চাতুমি যেরকমটি চাইবে আমি সেরকমটি হব। এবার বলো তোমার আপত্তি নেই তো?প্রম্লোচ্চাকুমারীর হাতটি ধরে বলেছিলেন কাঙাল।

এরপর যেটা হয়েছিল তার জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না কাঙাল। প্রম্লোচ্চা হঠাৎ ভেঙে পড়লেন, অঝোরে কান্নাকাটি করতে লাগলেন ।রাঢ়বঙ্গের দেহাতি পুকুরে সেদিন ভিনদেশি মেঘের বৃষ্টি নামল। প্রথমে কাঙাল একটু সিঁটিয়ে গেলেন, মেয়েটিকে অ্যাতোদিন হাসিখুশিই দেখে এসেছিলেন, জনমদুখিনী-স্নেহসুখবঞ্চিত মেয়ে, তবু সেসব নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখেননি কোনোদিন। কিন্তু সেদিন যে কী হল! বোধহয় কাঙালচরণের বিবাহ-প্রস্তাবে দারুণ আপ্লুত হয়েছিল মেয়েটা, আবেগের বান ডেকেছিল, সময়মতো বাঁধ দিতে পারেনি। আবেগপ্রবণ কাঙালচরণেরও ভেউভেউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়েছিল, কাউকে কাঁদতে দেখলে তিনি যে স্থির থাকতে পারেন না। কিন্তু গাঁ-গঞ্জে যামঘোষেদের বড় উত্পাত, দোঁহে মিলে রোদনকীর্তন করে তেনাদের আর দাওয়াত দিতে চাননি কাঙাল। সেদিন এরপর আর কিছু জানার ছিল না, জাম্বুবান তাঁর রোমশ হাত দিয়ে আশ্লেষে আলিঙ্গন করেছিলেন কৈকেয়ীকে, তারপর সোজা সাজঘরে ফিরিয়ে এনেছিলেন নিশ্চুপে। একটি ধাপ তো উতরানো গিয়েছে, কাঙালচরণ নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন অনেকটা।

কিন্তু প্রেমের আবেশে দিশেহারা কাঙাল বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেনএকটি আদ্যন্ত গোঁড়া হিঁদু পরিবারের ব্যাটা তিনি। একসময় ওঁর ঠাকুর্দা ফকিরচরণ রাজা রাধাকান্ত দেবের সঙ্গে একজোট হয়ে বিদ্যেসাগরমশাই-এর বিধবাবিবাহ বিলের চরম বিরোধিতা করেছিলেন, ইতিহাসে সে কথা লেখা আছে। কাঙালচরণের পিতৃদেব বাউলচরণও কম যেতেন না, কেন হিন্দুনারীদের পর্দানশীন হওয়া কাম্যএই নামে প্রবন্ধ লিখে খুব দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন একসময়। স্বভাবতই রঙ্গাবতারিণীর প্রতি কাঙালচরণের আকর্ষণকে মোটেই ভালো চোখে দেখলেন না ওঁর পিতৃদেব।

সেদিনটা আজও পষ্ট মনে পড়ে কাঙালচরণের। বাবা বাউলচরণ ডেকে পাঠিয়েছেন, মায়ের মারফত কথাটা কর্ণগোচর হয়েছে ইতিমধ্যে।

শুনলাম তুমি নাকি ময়দাগুঁড়ো-ওষ্ঠরঞ্জক মেখে যাত্রাপালায় অভিনয় করচ? কোনো কোনো রাতে বাড়ি পর্যন্ত ফিরচ না?একটা শতচ্ছিন্ন পুঁথিকে মেরামত করতে করতে বললেন বাউলচরণ। গলায় শ্লেষ আর ক্ষোভ মিলেমিশে রইল। ততক্ষণে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়েছেন কাঙালচরণের মা।

পরিস্থিতি বুঝে কাঙাল চুপ করে রইলেন।

করচ কি করচ না? হ্যাঁ কি  না?

আজ্ঞে ওই অবসর সময়ে একটু আধটু…

অবসর? তোমার আবার অবসর কখন? পৌরসভায় আপিসার নিয়োগের পরীক্ষা তো আষাঢ়ে, আর দেরি নেই। তা প্রস্তুতি কতদূর?

ওই মানেআর কী

তৈলাক্ত বাঁশ আর নাছোড়বান্দা শম্বুক-এর আঁকটা কষেচ?

কাঙাল কী একটা মিনমিন করলেন, বাউলচরণ ঠাহর করে উঠতে পারলেন না।

কষেচ? পষ্ট করে বলবে তো?

কাঙালচরণের আঁক কষতে মোটেই ভালো লাগে না, চোখের সামনে এক’ ‘দুই’ ‘তিন’ ‘চার-এর মতো চাঁছাছোলা প্যাঁচালো গাণিতিক সংকেত দেখলেই তাঁর কম্প দিয়ে জ্বর আসে। তাছাড়া কস্মিনকালেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা গণিতটনিত নিয়ে মাথা ঘামাননিবাপ-ঠাকুর্দার কারবার সংস্কৃত টোল নিয়েকাঙালচরণ নিজেও সংস্কৃত ব্যাকরণে দু-একটি উপাধি জুটিয়েছেন। সত্যাদপি হিতং বদেত্‌ছোটোবেলায় শিখেছিলেন কাঙালচরণ। পিতার প্রশ্নে শেষমেশ তাই নাতেই উত্তর দিলেন। তিনি সত্য বললেন কিন্তু তাতে হিত হবে কি-না আগাম ভাবতে পারলেন না।

কষোনি? আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম এবারের পরীক্ষায় এই অঙ্কটা থাকবেআমার বন্ধু আপিসার দ্রাক্ষাবিনোদ সেই রকমই বলেছেবলিনি তোমায়? তুমি সারাদিন যাত্রা নিয়ে মত্ত থাকলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে কী করে? পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে চিরকাল আমার মতো এই পুঁথিপত্তর নিয়ে ধুকধুক করে জীবন কাটাতে হবে তোমাকে।

ভুটুং বলছিল আগের থেকেই নাকি লোক ঠিক করা আছেপরীক্ষা-টরীক্ষা সব লোকদেখানো

ভুটুং! ওই উড়নচণ্ডীর সঙ্গে মেলামেশা করে তুমি গোল্লায় যাচ্চো দিনদিন। নিজে তো ভবঘুরেএখন তোমারও যাতে সেই দশা হয় তারই ষড় করচে সে। ওসব কথায় কর্ণপাত করো না। শোনো, দ্রাক্ষাবিনোদ বলছিল তেতাল্লিশের ঘরের নামতাটা মুখস্থ করতে। বলছিল যত বড় বড় নামতা মুখস্থ করবে তত জলদি আঁক কষতে পারবে।

বাবা, আমি অভিনয়-

চোপরাও!সাহস করে আসল কথাটা বলতে যাচ্ছিলেন কাঙালচরণ, কিন্তু তার আগেই গর্জে উঠলেন তাঁর বাবা। আমাদের বংশে ওসব মুখে আনাও পাপ। যাত্রা-থিয়েটার করে শেষমেশ পূর্বপুরুষদের মুখে চুনকালি দিতে চাও! আর তোমার অভিনয় যে সেরেফ ছুতো, সে খবর আমি পাইনি, ভেবেচ! ছি ছি! তোমার কাছে অন্তত এটা আমি আশা করিনি। শেষে এক যাত্রাভিনেত্রী! আমাদের একঘরে করে ফেলতে চাও! পাপ, মহাপাপ। তোমাকে আমি সাবধান করে রাখচি, কাঙালও পথে যাবার কথা স্বপ্নেও ভেব নাআরো কত কী বলে গেলেন বাউলচরণকাঙালের আর মাথাতে সেঁধুল না। চোখগুলো বাষ্পে ছেয়ে গেল, তারস্বরে কাঁদতে ইচ্ছে করল, রাগে-দুঃখে-অভিমানে গা-হাত-পা কাঁপতে লাগল কাঙালচরণের। কাঙালচরণের মা দিব্যিটিব্যি দিয়ে ছেলেকে ঘায়েল করে ফেললেন, ছেলেকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালেন যাত্রা-চত্বর আর কদাপি মাড়াবেন না তিনি, নটী প্রম্লোচ্চার সঙ্গে কোনোপ্রকার সম্পর্ক রাখবেন না।

দুর্বলচিত্ত কাঙালচরণ সব ছেড়েছুড়ে রাঢ়বঙ্গের এক কোলিয়ারিতে চাকরি নিলেন, নিতে বাধ্য হলেন আরকী। ত্রিভঙ্গ কোলিয়ারিতাঁর বাবার টোলের এক প্রাক্তন ছাত্র জুটিয়ে দিল কাজটি। কাঁচ-কয়লার হিসেবপত্তর রাখতে রাখতে দিন গুজরা—ন হতে লাগল কোনো রকমে, যদিও মায়ের দিব্যির চোটে প্রম্লোচ্চার প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা লোপাট হল না, বরং দিনদিন বেড়েই চলল। প্রম্লোচ্চার নাম স্মরণ করতে করতে চাকরিজীবন ওই খনিখন্দেই কাটল। অবসর নেবার পর আবার পাকাপাকিভাবে কলকাতার পৈতৃক ভিটেয় ফিরলেন ,তাঁর পিতাঠাকুর ততদিনে গত হয়েছেন, মা টিঁকে আছেন কোনো রকমে। অবশেষে বছর খানেক আগে একশো দশপেরিয়ে তাঁর মা-ও গত হয়েছেন। কলকাতার এই বসতবাড়িতে বাকি জীবনের কুড়িটা বছর প্রম্লোচ্চার ধ্যান করে বয়ে গিয়েছে কাঙালচরণের। তা সত্ত্বেও মাতৃসত্য রক্ষায় একদিনের জন্যও চিত্পুরমুখো হননি। এমনকী নট্টমন্দির অপেরা ত্রিভঙ্গ কোলিয়ারিতে অনেক যাত্রাপালাই গেয়ে গিয়েছে—প্রম্লোচ্চাকুমারী সে যাত্রায় অভিনয়ও করেছেন, কিন্তু কাঙালচরণ যাত্রাশালামুখো হননি—সেরেফ গা-ঢাকা দিয়ে থেকেছেন। এত সত্ত্বেও প্রম্লোচ্চাকুমারীর যে ছবি কাঙালচরণের হৃদপুকুরের জলে ভেসে উঠেছিল কোনো এক কালে, সেই ছবিকে কাঙালচরণ টলটল হতে দেননি কোনোদিন।

বুড়ো অশ্বত্থগাছটির শাখায় বসে প্রাচীন সেই স্মৃতিগুলিই ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন কাঙালচরণ। চতুর্দিক হুঁদহুঁদে কালো হয়ে আছে, কৃষ্ণা চতুর্দশী বোধহয়। বৃথা মানবজনম’ —মনে মনে ভাবছিলেন কাঙাল। নাহ্‌, পরের জন্মে আর মানুষ হতে চান না তিনি। চিল, শকুন, শজারু, জলহস্তী, গণ্ডার নিদেনপক্ষে খেঁকশেয়ালও চলবে, কিন্তু মানুষ নৈব নৈব চ। ধর্ম, সমাজ, লোকলজ্জা, চক্ষুলজ্জা, বিশ্বাসঘাতকতা — এসব আর নয়, অনেক হয়েছে। মানুষের ভিড়ে আর নয়, মনে মনে শপথ করলেন কাঙালচরণ— করতে গিয়ে ভাবনায় পড়লেন। তাঁর বশে কতটুকুই বা আছে! সবই তো সেই মহান কারিগর নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, কাঙালচরণের মর্জির কি কোনো মূল্য আছে! একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে শোকে শিথিল হয়ে গেলেন কাঙালচরণ।

 

. বিমল মিত্রের বেগম মেরী বিশ্বাস থেকে অংশটি নেওয়া।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top