ত্রৈলঙ্গ রায়ের আজ-কালের আখ্যান

 

দীঘলগাঁয়ের উত্তরদিকের এই চত্বরটায় পলাশ-বুয়ান-শ্যাওড়া-কুটুস আর শেঁয়াকুলঝোঁপের আড়ম্বরি তাল-খেজুরও আছে কিছুএকটু দূরেই আছে দাবার খোপের মতো ধানের খেত নিসর্গ নিয়ে বারফট্টাই করার মতো পুঁজি দীঘলগাঁয়ের কোনো কালেই নেই, জীববৈচিত্র্য দায়সারা, খাদ্যশৃঙ্খলও থোড়বড়িখাড়া খাড়াবড়িথোড় তবে উত্তরদিকটায় কিছু পাড়াগেঁয়ে দ্রষ্টব্য আছেফি-বছর মাঘ মাসের পয়লা ঘুঁটগাছটির তলায় হয় জয়চণ্ডী মায়ের পুজো, গাঁয়ের লোক বলে গ্রামদেব্‌তির পুজোছাগবলি হয়, ভিনগাঁ থেকেও লোকের জমায়েত হয় দুধ-গুড়-আতপের জুড়ি রান্না হয় বোম্বাই সাইজের কড়াইতে, গাঁয়ের মানুষ পোড়ামাটির ঘোড়া মানসিক করে, নেংটে, ঢাউস সবরকম ফর্মাররাতবিরেতে সেইসব ঘোড়ার ধড়ে নাকি প্রাণ আসে, রাতভর তারা গাঁয়ের ত্রিসীমানায় চক্কর কেটে বেড়ায়, চৌকিদারি করে, কখনো নিজেরাই ঢুঁসোঢুঁসি করে আর অঙ্গহানি হয়। আর ওই গোলদিঘিটি, দু-চার বিঘে তো হবেই, শালুক-পানকৌড়ি-কচুরিপানার মুক্তাঞ্চল একেবারেকয়েক-পা এগোলেই পোঁতন-ডাঙাঅকালমৃত মনুষ্যশাবকদের এখানেই পুঁতে রেখে যায় দীঘলগাঁয়ের মানুষত্রৈলঙ্গ রায়ের জ্যাঠামশাই রামকিংকর রায় এখানেই পোঁতা আছেন সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেবেলা ডুবলেই ওঁয়া ওঁয়া হারমনিতে জায়গাটা গুলজার হয়ে থাকে। পোঁতন-ডাঙার চারপাশে পাললিক শিলার বেষ্টনী। শিলার স্যাঁতসেঁতে খাঁজে ঘাপটি মেরে থাকে বেলেকাঁকড়া। দামাল শিকারিরা তক্কে তক্কে থাকে, হাতে গামছা জড়িয়ে সোজা কাঁকড়ার বাসায় সেঁধিয়ে দেয়, বেলে কাঁকড়ার জ্ঞাতিগুষ্টিসুদ্ধু টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে অতি উপাদেয় খাদ্য যে! একটু দূরেই মনকুড়কুড়ি গাছের নীচে বিঁয়াইপাশের থান। আর আছে একটি বারোয়ারি বাঁশবনএটিকে ঠিক বাঁশবন বলা চলে না বরং হাজারখানেক বাঁশের জটলা বলা চলে। মাথাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছেযেন গুহ্য বাতচিত চলছে নিজেদের মধ্যেগভীর শলা চলছে। রোদের ছটাও ঠিক মতো নাক গলাতে পারছে নাচত্বরটার ঘুষঘুষে মেজাজটাও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আর এখানেই শ্মশানযাত্রীদের জিরিয়ে নেবার জায়গাটি, শ্মশানে পৌঁছানোর আগে এখানেই শব আর শববাহীরা দম নেয় খানিকজায়গাটি নিশ্চিত গা-ছমছমে, দিনের বেলাতেও জোয়ান পুরুষেরা এই অঞ্চলে পা মাড়াতে সাহস পায় নাএমনকী জীবত্কালে ত্রৈলঙ্গ রায়ও মোটমাট এই চত্বর এড়িয়ে গিয়েছেন। বেকায়দায় পড়ে কোন্ কালে একবার এসেছিলেন, সেবার সপ্তান্তের ছুটিতে গাঁয়ে এসে দারুণ ফ্যাসাদ হয়েছিল ম্যানেজার কার্পণ্য ঘোষ একটা কাজ গছিয়ে দিয়েছিল হঠাৎ। সঙ্গে ল্যাপটপটা ছিল, ইন্টারনেটে সংযুক্ত হবার যষ্টিটাও ছিলকিন্তু সেই যষ্টিতে জান ফুঁকে দেবার জন্য দরকার বীর্যবান ঈথার তরঙ্গ — নিজের ভিটের সারা উঠোন শুঁকে শুঁকেও যার অস্তিত্ব পাননি ত্রৈলঙ্গখুঁজতে খুঁজতে শেষমেশ খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাঁয়ের মুড়োর এই বাঁশতলাতে এসে টিমটিমে দু-চারটি তরঙ্গদাঁড়ির দেখা মিলেছিল ওদের ঘাড়ে চড়েই ত্রৈলঙ্গ রায় কোনোরকমে তাঁর আপিসটাকে সচল করেছিলেন বেবাক সকালটা কেটেছিল সেখানে, তাও ওঁর ঠাকুমা পাহারা দিয়েছিলেন, তবে

কিন্তু ভ্যাঁচানন্দের মতো খাদানজীবী লোকের কথা আলাদা। ভ্যাঁচানন্দ পাশের গাঁ মৌরিগাঁয়ের লোক, কাজের প্রয়োজনে নিত্য দীঘলগাঁ দিয়ে যাতায়াত করে, দিনরাত বলে কিছু থাকে না। ভয়ডর তার কমলোকমুখে শোনা যায় সে নাকি তার সহোদর বোনটিকে নিজের হাতে গুমখুন করেছেআবাগির বেটি নাকি কোন্ বাউরিপাড়ার ছেলের সঙ্গে হৃদয় বিনিময় করেছিলএহেন মানুষও ক্রমাগত এই খ্যাঁকখ্যাঁক হাসির দাপটে ঘাবড়ে গেল। কৈটভ ঠান্ডা মাথার লোক। প্রথম থেকেই তার মনে ঘটনাক্রম নিয়ে সন্দেহ হয়েছে। তারপর যখন সেই ঢ্যাঙা টাকাপয়সা কিছু নিল না, তখন সে বুঝে গেল গতিক খারাপ

কী ভাই, নিয়ে নাও, তোমার ভ্যাঁচাঠাকুর তো দিচ্ছেযাও যাত্তা শালায় যাও এবার প্রায় অনুনয়ের স্বরেই বলেছিল কৈটভ। তার আগে ফিস্‌ফিস করে ভ্যাঁচানন্দকে রাজি করেছিল টাকাপয়সা কিছু খালাস করার জন্য।

লে লে, নিয়ে লে, অ্যাতো দেমাক দেখাইস না ভ্যাঁচানন্দও বলেছিল। স্বভাবতই একানড়ের কোনো হেলদোল দেখা যায়নি।

মি আর টাকা-কড়ি নিয়ে কী করব, আজ্ঞে। আমার ওসব লাগে নাএকানড়ে নিস্পৃহ স্বরে বলেছিল। ত্রৈলঙ্গ আর কাঙালচরণ একটু অন্তরালে দাঁড়িয়ে ঘটনার গতিপ্রকৃতির দিকে লক্ষ রাখছিলেন। লালটুকুরির দিক থেকে পুরুষকণ্ঠের আবেগঘন গান ভেসে আসছেবিবেকের গান দিয়ে বোধহয় শুরু হল যাত্রাপালা

ড় ফুটানি হইঞ্চে রে তুর! লাটসাহেবের ব্যাটা বটিস্‌ যে তুর টাকার দরকার নাই!

না, ঠাকুর আমি এখন ওসবের ঊর্ধে চলে গেছি

তুর মতলবট কী বটে বল্ দেখি! অ্যাতো ভ্যাংরাজি কেনে! সেদিন সেই মেরিছিলম বইলে দলবল নিয়ে বদলা লিতে এসিছিস নাকি! তুর পিছনে ওই আবছা মতন ওগুলা কারা বটেআমাদের গাঁয়ের ছিলা মনে হইচে! শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে ভ্যাঁচানন্দের গলা একটু কেঁপে গেল।

নাগো ঠাকুর, ও তোমার মনের ভুল! ইচ্ছে করেই একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলেছিল ফ্যারাও।

শুন্‌ শুন্‌ ভ্যাঁচানন্দ এবার যেন সমঝোতা করতে চাইছিল।

বর আছে। খাদান আবার খুইলবেক শুইনলম। তখন আসবি তুরা, তুদের সবাইকে কাজ দিব। তুর বউটকেও পাঠাঁই দিবি, কাজে লাগাঁই দিব

ঠাকুর আমি ফর্টিন বাউরির ব্যাটা নই!

হ্‌, মাল খেঁইয়ে আছি বইলে আমি কিছু বুইঝতে লারছি ভেবিছিস। দু’টা দুগগাপুরের সইভ্য বুলি বইল্যেও তুই ফইর্টনার ব্যাটাই থাকবিকেনে কথা বাড়াছিস! যাত্তা শুরু হঁইয়ে গেল, দেখ্‌গা যা।অ্যাক সে অ্যাক ফিমেল এসিছেকী কেটোবাবু সত্যি বটে কী না?

র্চলাইটটা বের কর ফিসফিস করে বলেছিল কৈটভ। লম্বা একটা ছায়ামূর্তি, চোখদুটোও জ্বলজ্বলেসুরাপান করে থাকলেও বিচারবুদ্ধি তার টনটনে ছিল।

দূর চাঁদির! কী বইলছ জোরে জোরে বলো!

র্চ লাইট!

টো আমার কাছে কুথায় হে, তুমার পাকিটে দেখ। আর টর্চ দিঁয়ে কী হবেক, দেইখছ ত, ই ছিলা ভালো কথায় ভুলার ছিলা লয়। ইয়াকে এইখেনেই খতম কইরে দিতে হবেক

তোমার সঙ্গে জুটি বাঁধাটাই আমার মিস্টেক হয়েছেঅ্যাতো অড়বঙা হলে কোনো কাজ হয়!

ওদিকে অধৈর্য হয়ে গিয়েছিলেন ত্রৈলঙ্গ রায়। সংলাপের পর সংলাপ জুড়ে অনর্থক দৃশ্যটিকে দীর্ঘায়িত করছে ফ্যারাওএদিকে চারপাশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এক পেঁচো আর পেত্নী শ্যাওড়াঝোপে ঘনবদ্ধ হয়ে বসে বিশ্রম্ভালাপ করছিল, বেমতলব কলরব হওয়ায় এখন বিরক্তি প্রকাশ করছে, বিগড়ে গিয়ে কিছু না-করে বসেপোঁতন-ডাঙার জুভেনাইল-প্রেতরা পুঞ্জে পুঞ্জে এসে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে। রগড়ের লোভে কিছু ব্রহ্মদত্যি আর শাকচুন্নি এসেছে। ত্রৈলঙ্গের ভয় হল, এরা আবার অন্তর্ঘাত না করে বসে!

ফ্যারাও দেরি না-করে দর্শন দাও এবার। যাত্রা জুড়ে দিয়েছে ওদিকে, ফার্স্ট সিন এমনিতেই মিস্‌ করব

বিলম্ব যে একটু হচ্ছে সেটা ফ্যারাও বুঝতে পারছিলআসলে এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম, তাই একটু রয়েসয়ে কাজটা করছিল।আর আচমকা ভয় পাইয়ে হার্টফেল করিয়ে দিলে পুরো উদ্দেশ্যটাই তো মাটি।

ততক্ষণে ভ্যাঁচানন্দের পেন্টুলের ডান পকেট থেকে ছয়সেলের আখাম্বা টর্চটা টেনেহিঁচড়ে বের করেছে কৈটভ। কিন্তু বিস্তর চেষ্টা করেও টর্চের সুইচটা নড়াতে পারেনি।

চ্ছা বেয়াক্কেলে লোক মাইরি তুমিমুখেই তোমার যত বড়বড় বুলি, টর্চ এনেছ তাও রাগে গজগজ করতে শুরু করেছে কৈটভ।

বাজে বইকো নাতুমারই বরং টর্চলাইট জ্বালাবার আক্কেল নাই! দাও আমাকে দাও দেখি বলেছে ভ্যাঁচানন্দ

ওদিকে ত্রৈলঙ্গের হড়বড়ানিতে ঠিক তখনই একানড়ে ফ্যারাও পূর্ণদর্শন দেবার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। লম্বা-লম্বা ঠ্যাং নিয়ে একপা-দু-পা করে এগিয়ে গিয়েছে ভ্যাঁচানন্দ আর কৈটভের দিকে, চিমসে আঙুলগুলো কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো করে মুখের কাছে এনেছে, চোখে ভয়াবহ আক্রোশধুতি পরার অভ্যেস ছিল, সেই ধুতিটি দিয়ে অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গটি আচ্ছাদিত করেছেতাতে ভয়ালতা আরো বেড়েছে। এবার দন্তবিকাশ করে অট্টহাসিটি দিলেই চিরাচরিত পৈশাচিক আলেখ্যটি সম্পূর্ণ হয়—এমন সময় জ্বলে উঠেছে কৈটভের টর্চ! আর তত্ক্ষণাৎ একানড়ে বাবাজি চিত্পটাং—দাঁতি লেগে একাকার! একবার জ্বলেই টর্চটিও ইস্তফা দিয়েছে।

এরকম যে একটা কিছু হবে আগাম আন্দাজ করতে পারেননি ত্রৈলঙ্গ। আলোর সঙ্গে অশরীরীদের শত্রুতা আছে, আচমকা আলোর অভিঘাত এদের নাস্তানাবুদ করে। আর সে আলো যদি বেমক্কা অবয়ব ভেদ করে যায় তাহলে তো কাটাস্ট্রফিক কাণ্ড হয়।

বেমক্কা সেটাই হতে বসেছে, কৈটভের টর্চের আলোর চোটে একানড়ে বেমালুম মুর্চ্ছা যাওয়ায় ত্রৈলঙ্গের মাথায় হাত। অ্যাতো পরিকল্পনা শেষে ভণ্ডুল হয়ে যাবে নাকি!

ভ্যাঁচানন্দকে যে প্রাণে মারা হবে না সেটা আগেই গোলদিঘির পাড়ে যুক্তি করেছিল তিনজনে। ওকে জব্দ করার অন্য কোনো উপায় নিয়েই তিনজনের জোর শলাপরামর্শ হয়েছিল

প্রচণ্ড প্রহার করে ওকে চির-শয্যায় পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়, দাদুভাইরা? কাঙালচরণ প্রস্তাব দিয়েছিলেন তখন

ক্ষুত্‌কাতর হয়ে মরবে দাদু, ক-দিন পরেই মরবেআর ত্রৈলঙ্গদের হবে বিপদ! একানড়ে বলেছিল।

ন্য রাজ্যে যদি পাঠিয়ে দি, এই ধরো, রাঁচিরায়পুরত্রৈলঙ্গ বলেছিলেন। শারীরিক নিগ্রহ করার লোক তিনি নন, মনে হাজার আক্রোশ হোক না কেন। আক্রোশ খুব হয়, রাগে দাঁত কিড়মিড় করেন। চিরপরিচিত সব্জিওয়ালাটা অম্লানবদনে যখন কুরু বৃদ্ধ লাউটা থলেতে ভরে দিত, দেবার সময় হাজার যুক্তি দিয়ে তার কচিত্ব প্রমাণ করে ছাড়ত আর রান্নার মাসি ওটার পেট ফাঁসিয়ে বিচিদের একান্নবর্তী সংসার আবিষ্কার করে চিত্কার চেঁচামেচি জুড়ে দিত তখন মনেমনে সব্জিওয়ালাকে অভিশাপ দিতেন কিংবা ট্রেনের নিত্যযাত্রী যখন ওঁর দখল করা মহার্ঘ্য আসন থেকে ওঁকে বেমালুম উত্খাত করে দিত, আর উনি উদ্বাস্তুদের মতো ট্রেনের এ কামরা সে কামরায় ঘুরে হদ্দ হতেনতখনো মনে মনে খেপে উঠতেন ত্রৈলঙ্গ রায়তাঁর আপশোস হত এই ভেবে যে, নগ্নবেলায় কেন কিঞ্চিৎ মুগুর ভাঁজেননি। খালি মনে হত এইসব অসৎ-অর্থগৃধ্নু-ব্যাভিচারী মানুষগুলোকে যদি সাবাড় করে দিতে পারতেন!

ও সব জায়গা এ হাতের তালুর মত চেনে হে, ত্রৈলঙ্গ, গন্ধে গন্ধে ঠিক ফিরে চলে আসবে। তার চেয়ে ভাবছি বুলানে বিড়ালাক্ষীর সাহায্য নিলে কেমন হয় একানড়ে বলেছিল।

বুলানে বিড়ালাক্ষী! ঠাকুর্দার মুখে শুনেছিলাম বটে নামটাদামোদরের পাড়ের সেই পোড়ো বাড়িতে থাকে না? ত্রৈলঙ্গ বলেছিলেন।

ঠিক ধরেছ ভাই। দামোদরের শেষ খেয়া হতে হতে সন্ধে নামে, প্রচুর মানুষ শহরের কাজ সেরে গাঁয়ে ফেরেওই পোড়োবাড়ির পাশ দিয়ে যারাই শর্টকাট করে, নির্ঘাত বুলানে বিড়ালাক্ষীর শিকার হয়ে যায় চেহারা টেহারা সব চৌপাট হয়ে গিয়েছে বুড়ির, কিন্তু গলার স্বরটিতে ঠিক যেন ষোড়শী। অ্যাতো মাদকতা সেই গলায়, বুঝলে ভাই ত্রৈলঙ্গ, ওই ডাকে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পথ হারানো ছাড়া গতি নেই

জানি ভাই, আমার ঠাকুর্দাকে এই বুলানেতেই ধরেছিল একবার। ঠাকুর্দার বয়েস হয়েছে তখন, অন্দরের আগুন এক্সটিংগুইশড হয়েছে তাই বিশেষ জুত করতে পারেনি বিড়ালাক্ষী

কালে-কাকের মতো স্বভাবটা এখনও আছে বুড়ির। শিকার নিয়ে বাছবিচার কম

নিশির ডাক জানি দাদুভাইরা, কিন্তু বুলানে কী বস্তু? কাঙালচরণ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

নিশিকে পাড়াগেঁয়ে ভাষায় বুলানে বলে দাদুবুলানে বিড়ালাক্ষীর সঙ্গে ভালোই খাতির আছে আমারইনি আসলে মন্দাকিনীর দূরসম্পর্কের পিসিঠাকরুণএকটু বায়না করলেই এই দুটোকে নিশির ডাক ডেকে দেশান্তরি করে দেবে!

শেষমেশ একানড়ের প্রস্তাবটাই মনে ধরেছিল দু-জনের। ঠিক হয়েছিল, ফ্যারাও প্রথমে পর্যুদস্ত করবে ভ্যাঁচানন্দ আর কৈটভকে। তারপর একনিশ্বাসে ছুটে গিয়ে বিড়ালাক্ষীকে ডেকে আনবে। বুলানে বিড়ালাক্ষী দুজনকে মোহাচ্ছন্ন করে দেশের পুব সীমানা ডিঙিয়ে দেবেন।

কিন্তু অ্যাতোসব ফিরিস্তির আগেই একানড়ে পপাত ধরণীতলে!

এদিকে একানড়ের আংশিক দর্শন পেয়েই কৈটভ ভির্মি খেয়েছে। ভীতিবিহ্বল অবস্থা ভ্যাঁচানন্দেরও, তবে এখনো টিকে আছে, নিদান অবস্থা

ছেইড়ে দাও দ্যাবতারা, আমার বড়ো ভুল হঁইয়ে গেইছে। আর কখনও এমনি কইরব নাই। আমাকে মেইরো না! আমার কুনু দোষ নাই অঝোরে কাঁদছে আর বলছে ভ্যাঁচানন্দকৃতাঞ্জলি হয়ে হাওয়ার কাছেই প্রার্থনা করছেত্রৈলঙ্গ বা কাঙাল কেউই দর্শন দেননি।

হেই বাবারা, এইবারের মতো আমাকে ছেইড়ে দাও। একট সুযোগ দাওআমার কুনু দোষ নাইএই কৈটভ আমাকে ভুঁলাই ভুঁলাই নিয়ে এসিছে রামরামরামরাম

বহু উঁচু থেকে দুজন নাইট-শিফট-এর দেবতা দীঘলগাঁয়ের ঘটনাবলির উপর নজর রাখছিলেন। ভ্যাঁচানন্দের মুখে রামনাম শুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন ওঁরা।

ছিল লাল, পরে সবুজ, এই মুহূর্তে গেরুয়া। পরিবর্তন লক্ষ করেচ, মিত্রওদেরই একজন আরেকজনকে বললেন।

ঠাকুর তুষ্ট হয়ে আবার দলে ভিড়িয়ে না নেন! শঙ্কিত হয়ে বললেন অন্যজন।

ভ্যাঁচানন্দের রামনামে সেরকম কাজ হল না। ত্রৈলঙ্গদের গায়ে আঁচড়টিও লাগল না।

ত্রৈলঙ্গ দেখলেন ভ্যাঁচানন্দ মুর্ছা যাবার লোক নয়। হাড় হিম করা করালরূপ না দেখালে এই লোক জব্দ হবার নয়।

দাদু, একটু দাঁতের ঝলকানি দিন না, একটু আতঙ্ক হোক ত্রৈলঙ্গ তাই আব্দার করলেন কাঙালচরণের কাছে

দাঁত আমি বসিয়েও দিতে পারি, দাদু। কিন্তু কী জানো তো, সেরকম মূলধন তো আর নেইছাগলটাকে কায়দা করতে গিয়ে একটা খুলেও গিয়েছে। এ দেখে আতঙ্কের বদলে হাই না ওঠে

ত্রৈলঙ্গ ভাবলেন বলবেন, ই যে ক্যানাইন দুটো তো নতুন গজিয়েছেআর কানের বাহারও মন্দ নয়, কিন্তু কী ভেবে চুপ করে গেলেন। বরং তাঁর একটু অভিমান মতো হল।

সলে আমি আর সেধে বিপদ ডেকে আনতে চাই না। কোনোভাবে যদি ভ্যাঁচা অক্কা পায় আর মরার আগে আমাকে শনাক্ত করে ফেলে, নির্ঘাত সে আমার বাপ-মাকে অতিষ্ঠ করে ছাড়বে বললেন ত্রৈলঙ্গ।

ঠিক সেই সময় গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল একানড়ে ফ্যারাও।

বাজখাঁই গলায় হাঁও মাও খাও বলে সে পূর্ণরূপে ভেসে উঠল। বেয়াড়া রকমের লম্বা আর নির্মেদমূর্তি, আরক্ত নয়ন যেন জ্বলছে। চোখে মুখে দারুণ হিংস্রতাজখমি পশুরাজের মতো অতটা না হলেও প্রতিশোধকামী খেঁকশেয়াল তো বটেই।

ওতেই কার্যসিদ্ধি হল।

 

লাঁঙল ধঁরো নাঁগর আঁমার,

কুঁসুমকোমল ভুঁই,

           ডাঁক দিঁয়ে যাঁয় বাঁটপাড়েতে,

           কেঁমনে এঁকা শুঁই।

গেঁড়েগিরিধারীর পুকুরপাড়ের তেঁতুলগাছের তিনতলায় বসে গুনগুন করে গান গাইছিলেন প্রম্লোচ্চাকুমারীদ্বাদশমদ্যের আয়োজন ছিল, ওই স্টক থেকেই যৎকিঞ্চিৎ পান করে আছেন। মৌতাত হয়েছে ভালোই।

কী লো লিলে কতদূর! মাঝেমাঝেই হাঁক পাড়ছেন।

সাতটা বেজেছে অনেকক্ষণ। গভীর রাত হয়েছে। খালি ভাবছেন নীলাম্বরীর আহ্বানের অপেক্ষা করতে করতে লগ্ন না পেরিয়ে যায়!

লিলে! আবার হাঁক পাড়লেন প্রম্লোচ্চা।

আসলে নীলাম্বরী চায়নি যে প্রম্লোচ্চাকুমারী ধড়াচুড়ো পরে ঠিক সময়মতো সভায় হাজির হন। প্রম্লোচ্চা একজন বঙ্গবিশ্রুত নায়িকাতাঁর দর্শন অতো সহজলভ্য করলে চলে নাকি

তিনতলায় থাক ঘাপটি মেরে, আমি ডেকে নেব দু-তলায় বলেছিল নীলাম্বরী।

সেই তখন থেকে হাঁ করে বসে থেকে মুখ শুকিয়ে গেল প্রম্লোচ্চার। পিণ্ডখর্জুর খেয়ে খেয়ে মুখে ক্ষত হবার জোগাড়।

নীলাম্বরীও পড়েছে মহা ফাঁপরে। তখন থেকে অপেক্ষা করে আছেসেরকম আন্তরিক আর পরিপক্ব প্রতিযোগী কই! দু-চারজন যা আসছে মুখেচোখে বালখিল্যভাবদুটো লড্ডুক গলাধঃকরণ করেই উসখুস করছে, একটু ধৈর্য বলতে নেই। আর যাত্রা-থিয়েটারই চাক্ষুষ করেনি জীবনে, প্রম্লোচ্চাকুমারীর নাম শোনা তো দূর! দু-একজন বাতিল বয়স্ক ভাম প্রেত এসেছিল অবিশ্যিযা সব চেহারাব্যাভিচার যেন চুঁইয়ে পড়ছে।

জিতলে হাড়-মাস সব বুঝে লিব কিন্তু মোদক আর ধুতরোর রস পান করতে করতে বলছিল সেই চণ্ডুখোর নির্লজ্জগুলো। আর অশালীন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল নীলাম্বরীর দিকে। অনেকদিন পরে নীলাম্বরীও সুন্দর কাপড়চোপড় পরেছে, গর্জাস সাজগোজ করেছে। নিম্নাঙ্গে মস্ত ঘেরের একটি জমকালো ঘাগরা, ঊর্ধাঙ্গে গা-আঁটো একখানা জামাযদিও জামার রঙও ঘোর উজ্জ্বল-শ্যামবর্ণ হওয়াতে মনেই হয় না আবরণ আছে বলে, গলায় আর হাতে নানান লারালাপ্পা অলংকার, ডান-হাতে একটা বটুয়ামেদ যেন শরীরের বাঁধ প্লাবিত করে উপচে পড়তে চাইছে। ছোলঙ্গের মতো দুধের শিশুও ঠাকুরমাকে দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিল প্রথমে। নীলাম্বরী লক্ষ করেছিল সেটা আর প্রেতদর্শন গেজেট থেকে যে সাংবাদিক এসেছে, সে-ও বেশ সপ্রশংস দৃষ্টিতে ঘুরঘুর করছিল ওর পিছনে। নীলাম্বরী কঠিনমুখ করে ছিল, যদিও মনে মনে ভালোই লাগছিল। ও অবিশ্যি সেই নির্লজ্জের দলকে বিদায় করেছে, যদিও খুব কড়া কিছু বলেনি

তোর মতলবটা কী বল দিকি লিলে। আমার নাম ভাঁড়িয়ে শেষে নিজে স্বয়ংবর করে নিচ্চিস নাকি? আবার চেঁচালেন প্রম্লোচ্চা।

নীলাম্বরী কিছু বলল না, কিছু মনেও করল না এতে। সে জানে প্রম্লোচ্চা কথাটা মন থেকে বলেননি। ধৈর্যচ্যুতি হলে ওরকম হয়।

অ্যাই লিলে, শুনতে পাচ্চিস না কতাটা!

ছোলঙ্গ বলে গেল আজ দু-চার জায়গায় আসর আছেকোন্ ফিলিমের নায়িকা নাকি নেত্যনাট্য করবে। এদিকে আরেকটু দেখি কোঁচড় থেকে কলকে ফুল বের করে রসটা টেনে নিয়ে বলল নীলাম্বরী। গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে মজুমদারবাড়িতে জলসা একটা ছিল, তবে সেটা আজ নয়, দু-চার দিন আগেই হয়েছে। আর সেখানে কোনো চলচ্চিত্রতারকা নৃত্য করেনি, করেছে বিজ্ঞাপন জগতের এক অল্পপরিচিত মডেল প্রম্লোচ্চাকে প্রবোধ দিতে গিয়ে মিথ্যে বলতে হল। সে না হয় হল, কিন্তু অ্যাতো প্রচারের পরেও স্বয়ংবরসভার এই খাঁ খাঁ দশা কেনএই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে নীলাম্বরীর মনে। দোআনির মডেলও শেষে যাত্রাসম্রাজ্ঞীকে জনপ্রিয়তায় গোহারা করে দিল! মহানগরীতে স্বয়ংবরসভা করাটাই ভুল হয়েছেএর চেয়ে গড়বেতা বা গঙ্গাজলঘাঁটি গেলে হয়তো মানরক্ষা হত সেখানে যাত্রাশিল্পীর কদর নিশ্চিত আছে এখনো এই কথাটাই খালি মনে হতে লাগল নীলাম্বরীর!

খনই বললুম, মদন চতুর্দশীটা ছেড়ে দে, অন্যদিন দ্যাখ আর করলিই যখন আমাদেরই বা একটা লাস্য-নেত্য রেখে দিলিনে কেন! অ্যাতোই যখন আয়োজন হল একটা নেত্যই বা বাদ গেল কেন!

স্বয়ংবরসভায় নেত্য! কে করত শুনি!

ই যে কুমারী কলম্বিকে না কে যেন আছে বলছিলি

যা হোক একটা বললেই হল। ও এখন একটা মামদোর সঙ্গে মরিচপুরের বাঁশবনে সুখে ঘর করচে বলিনি তোকে! কথা বলতে বলতেই নীলাম্বরী হুশ করে তিনতলায় উঠে এসেছে।

বার তাহলে কী করবি লো ভয়ানক চিন্তিত গলায় বললেন প্রম্লোচ্চা।

ঘাবড়াসনি দাঁড়া, আমায় ভাবতে দে বলল বটে নীলাম্বরী, তবে ভেবে কুলকিনারা পেল না। শেষে বলল, ই ছোলঙ্গদের যে দলটা আছে, ভলিনটিরি করচে, ওদের দলে কয়েকটা বলবান লোক আছে লক্ষ করেছিস?

কেন বল্ দিকি! তুই কী

মি ভাবচি সেরকম না এলে ওদের দলের ভেতরেই প্রতিযোগিতা

নীলাম্বরীর কথা শেষ হল না হন্তদন্ত হয়ে হাজির হল ছোলঙ্গ

গো আমার সোঁদরী ঠাকুমারা, সব্বোনাশ হয়েছে

কী হয়েচে দাদু আমার!

কাইনেটিক বিদ্যেধর! ছোলঙ্গ চেঁচিয়ে বলল।

কাইনেটিক! তার এখানে কী, তার তো উত্তরপাড়ায় বাসপ্রম্লোচ্চা বললেন।

 

ওদিকে কাইনেটিক বিদ্যেধর আর তার অ্যাসিড-ব্যান্ড স্বয়ংবর সভার আশেপাশে পৌঁছে গিয়েছে প্রায়। কলকাতা শহরের এই অ্যাসিড-ব্যান্ডটা একান্তই কাইনেটিক বিদ্যেধরের আবিষ্কার। আদতে ওরা যাত্রাদলের কনসার্ট পার্টি ফেরারি অপেরায় গানবাজনা করত। অনেকদিন আগের এক রাতে খাট-গোবিন্দপুরে পালা গাইতে যাচ্ছিল, উত্তরপাড়ার কাছে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডে ওদের ছ্যাকড়া গাড়ির সঙ্গে উল্টোমুখী একটা লরির কলিশন হয় দলের ছ-জনের ছ-জনই থেঁতলে লেপ্টালেপ্টি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে পুরো দলটা আস্তানা গেড়েছিল উত্তরপাড়া রেল-ইয়ার্ডের কাছে সন্ধে হলেই এলোপাথাড়ি গানবাজনা জুড়ে দিত তারা। উত্তরপাড়া রেল-ইয়ার্ডের কাছে ওয়াগন ভেঙে অপকর্মে হাতেখড়ি হয়েছিল কাইনেটিক বিদ্যেধরের। সেইখানেই এক ঠেঁটা পুলিশের গুলিতে ফৌতও হয়ে গিয়েছিল একদিন। গতাসু হবার পর আস্তানা পরিবর্তন করে নিলেও ওই চত্বরে তার যাতায়াত ছিল নিয়মিত তার অনেক স্যাঙাতের আস্তানা ছিল সেটা। সেখানেই একদিন এই কনসার্ট পার্টির গানবাজনা কানে আসে কাইনেটিক বিদ্যেধরের, গুণ্ডা-মস্তান হলে কী হবে, গান-বাজনার বেশ সমঝদার সে। বেঁচে থাকতে তার খামার-বাড়িতে নিয়মিত মাইফেল বসত, লক্ষ্ণৌ থেকে বাইজিরা আসত, অঞ্চল প্রধান থেকে শুরু করে থানার আপিসারবাবু সবাই হাজিরা দিত। সে-সব দিন ছিল বটে! অবিশ্যি এইখানেও খুব একটা মন্দ নেই কাইনেটিক বিদ্যেধর। মস্ত দল বানিয়েছেযমদপ্তরের বড়ো বড়ো যমদূত থেকে শুরু করে ছোটোখাটো যমদপ্তরিসবার সঙ্গেই তার বিস্তর খাতির। আজকের মাইফেলে খোদ মহামতি ভীমঘণ্টের আসবার কথাঊর্ধতম সপ্তলোক থেকে নেমে আসবেন তিনিযমদপ্তরের এক জাঁদরেল দূত-যমরাজের অন্যতম সেবক কালেংড়া, তার সেবক কালমিতি, তার ঠিক নীচেই ভীমঘণ্ট। এই ভীমঘণ্টের জন্যেই কাইনেটিক শিকার খুঁজতে বেরিয়েছে আজ। ভীমঘণ্টের চরণে একটি রূপলাবণ্যবতী প্রেতিনি ভেট দিতে পারলেই এ-যাত্রা যমরাজের বিচারব্যবস্থা এড়ানো যাবে, সেই রকমই প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছেএই করেই বহু বছর তার চুরি ছিনতাই রাহাজানির জগৎটিকে পরলোকে টিকিয়ে রেখেছে বিদ্যেধর।

দিনকয়েক আগে স্বয়ংবরসভার খবরটা এনেছিল উলোন, অ্যাসিড-ব্যান্ডের এক যন্ত্রী একদিন কিছু ছোকরা হন্যে হয়ে পাখোয়াজ শিল্পীর খোঁজ করছিল, তখনই উলোন জানতে পারে ব্যাপারটা। সেই সূত্রেই কাইনেটিক বিদ্যেধরের গেঁড়েগিরিধারীর পুকুরপাড়ে আগমন, সঙ্গে তার সেই ব্যান্ড। অ্যাসিড-ব্যান্ডের জগঝম্প সংগীত ছাড়া কোনোও অপারেশনই ঠিক জমে না।

তোদের কার জানি বরের দরকার! এই নে, আমি চলে এয়েছি ঘোষণা করল কাইনেটিক বিদ্যেধর। আকণ্ঠ টঙ্কমাধ্বীক পান করে আছে, টুপভুজঙ্গ অবস্থাছোলঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। ওদিকে কাষ্ঠপুত্তলিকার মত দাঁড়িয়ে নীলাম্বরী আর প্রম্লোচ্চা।।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top